📄 কুরআন মানলেই কি রাসূলের আনুগত্য পরিপূর্ণ হয়
কুরআন মানলেই কি রাসূলের আনুগত্য পরিপূর্ণ হয়?-এ প্রশ্নের উত্তর আমরা পূর্বের আলোচনায় পেয়ে গেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আনুগত্য ও অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়ে নাযিল হওয়া আয়াতগুলোকে যখন হাদীস মান্য করার আবশ্যকতার পক্ষে উদ্ধৃত করা হয় তখন হাদীস অস্বীকারকারীরা বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন মানতে আদিষ্ট ছিলেন। সারা জীবন তিনি কুরআনই মান্য করে গেছেন। তাই কুরআন মানলেই তাঁর আনুগত্য হয়ে যায়। সুতরাং এ সকল আয়াত দ্বারা হাদীস মান্য করার আবশ্যকতা প্রমাণিত হয় না। তাদের এ দাবির ভ্রান্তিও উপরের আলোচনায় প্রস্ফুটিত হয়েছে।
তাছাড়া 'কুরআন-বহির্ভূত ওহি নাযিলের কারণ কী' শিরোনামের আলোচনায় আমরা দেখব, মহান আল্লাহ রাসূলের আনুগত্যের পরীক্ষা নিতে চায় কুরআন-বহির্ভূত ওহির নির্দেশনা প্রতিপালনের মাধ্যমে। সুতরাং কেউ কুরআনের অতিরিক্ত ওহি, অর্থাৎ হাদীস না মানলে নবীজির আনুগত্যের পরীক্ষায় কৃতকার্য হবে না।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহি মানতে আদিষ্ট ছিলেন। তাই তিনি মহান আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসাবে ওহির নির্দেশনা পরিপূর্ণরূপে প্রতিপালন করেছেন—সে ওহি আল কুরআনে সংকলিত হোক অথবা আল কুরআনের অতিরিক্ত হোক। অতএব কেউ যদি শুধু আল কুরআনে বর্ণিত বিধিবিধান প্রতিপালন করে আর হাদীস অমান্য করে সে যেমন আংশিক ওহি মান্য করল তেমনিভাবে আল্লাহ ও রাসূলেরও আংশিক ও খণ্ডিতভাবে আনুগত্য করল। সে 'কুরআন দ্বারা প্রমাণিত' কুরআন-বহির্ভূত ওহিকে অস্বীকার করল। এবং যে সকল আয়াতে কুরআন-বহির্ভূত ওহি মানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আল কুরআনের সেসব আয়াতকেও অস্বীকার করল। কুরআনের আলোকে এটা ভয়ংকর অপরাধ। মহান আল্লাহ বলেন :
أَفَتُؤْمِنُوْنَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِ الْعَذَابِ.
“তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস করবে আর কিছু অংশ অস্বীকার করবে? তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এমনটি করবে তার প্রতিদান এ ছাড়া আর কী হবে যে, পার্থিব জীবনে তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা আর কিয়ামতের দিন তাকে নিয়ে যাওয়া হবে কঠোর আযাবের দিকে!”১১০
তাছাড়া হাদীস মান্য করা ব্যতীত কুরআনের উপর আমল করা এবং এ পরিমাণ নবীজির আনুগত্য করাও সম্ভব নয়। কেননা কুরআনে বর্ণিত কোন বিধানটির কী মর্ম তিনি বুঝেছেন এবং কীভাবে তার উপর আমল করেছেন তা হাদীস ছাড়া কুরআন থেকে জানা যায় না। আর ঐতিহাসিক সূত্রে এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীন হিসাবে কুরআন-বহির্ভূত অনেক কিছু পালন করেছেন। অথচ আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) তাঁর সমগ্র জীবনকেই 'কুরআন' বলে দাবি করেছেন। কেননা তাঁর কুরআনের অতিরিক্ত আমলগুলোও ওহির নির্দেশনা। আর কুরআনের অতিরিক্ত এই সকল ওহি মান্য করা আল কুরআনের বহুসংখ্যক আয়াতের নির্দেশনা।
সা'দ ইবন হিশাম (রাহ.) বলেন, আমি আয়িশা (রা.)-কে বললাম, হে উম্মুল মুমিনীন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আখলাক কেমন ছিল? জবাবে তিনি বললেন :
كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ أَمَا تَقْرَأُ الْقُرْآنَ قَوْلَ اللَّهِ: وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ.
তাঁর আখলাক ছিল কুরআন। তুমি কি কুরআন কারীমে মহান আল্লাহর এই বাণী পড়োনি, 'নিশ্চয় আপনি আছেন সুমহান আখলাকের উপর।'?১১১
সুতরাং হাদীস অস্বীকার করে কুরআন মানা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের দাবি করা বাতুলতা এবং অর্থহীন প্রলাপ মাত্র।
টিকাঃ
১১০. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ৮৫。
১১১. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৪৬০১。
📄 কুরআন-বহির্ভূত ওহির গুরুত্ব ও মর্যাদা
আমরা দেখছি, আল কুরআনের বেশ কিছু আয়াত সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, মহান আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কুরআনের অতিরিক্ত ওহি নাযিল করেছেন। আর এর ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফ আমাদের জানাচ্ছে, তার পরিমাণ কুরআনের অনুরূপ বা তারও অধিক।
এখন কোনো ব্যক্তি যদি এ দাবি করে যে, আমি কুরআনের অতিরিক্ত ওহি তথা হাদীস মানি না, তবে কুরআন মানি। তার এ দাবি যথার্থ নয়। সে মূলত ওহিই অস্বীকারকারী। আল কুরআনের এ সকল আয়াত অস্বীকারের পাশাপাশি এ সকল আয়াত দ্বারা প্রমাণিত বিপুল সংখ্যক (অর্থাৎ কুরআনের পরিমাণ বা তারও অধিক) ওহি সে অস্বীকার করছে।
ওহি, যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, তা কুরআনে সংকলিত হোক আর না হোক, বিশ্বাসে ও বিধান প্রণয়নে তার গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম। বেশ কিছু হাদীসে কুরআন-বহির্ভূত ওহিকে কুরআনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি হাদীস আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। অন্য হাদীসে এসেছে, মিকদাম (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
أَلَا وَإِنَّمَا حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ فَهُوَ مِثْلُ مَا حَرَّمَ اللَّهُ.
"শুনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল যা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন তা মহান আল্লাহ নিষিদ্ধ করার মতোই।”১১২
আমরা আল কুরআনকে আল্লাহর কিতাব বলে জানি। হাদীস শরীফে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের অতিরিক্ত ওহিকেও 'আল্লাহর কিতাব' বলে অভিহিত করেছেন। আবু হুরাইরা (রা.) ও যাইদ ইবন খালিদ জুহানি (রা.) বলেন :
جَاءَ أَعْرَابِيُّ فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ اقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللَّهِ فَقَامَ خَصْمُهُ فَقَالَ: صَدَقَ اقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللَّهِ فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ: إِنَّ ابْنِي كَانَ عَسِيفًا عَلَى هُذَا فَزَلَى بِامْرَأَتِهِ فَقَالُوْا لِي: عَلَى ابْنِكَ الرَّجْمُ فَفَدَيْتُ ابْنِي مِنْهُ بِمِائَةٍ مِنَ الْغَنَمِ وَوَلِيْدَةٍ ثُمَّ سَأَلْتُ أَهْلَ الْعِلْمِ فَقَالُوْا: إِنَّمَا عَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيبُ عَامٍ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَأَقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بِكِتَابِ اللَّهِ أَمَّا الْوَلِيْدَةُ وَالْغَنَمُ فَرَدُّ عَلَيْكَ وَعَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيبُ عَامٍ وَأَمَّا أَنْتَ يَا أُنَيْسُ لِرَجُلٍ فَاغْدُ عَلَى امْرَأَةِ هُذَا فَارْجُمْهَا فَغَدَا عَلَيْهَا أُنَيْسُ فَرَجَمَهَا.
এক বেদুইন এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব মোতাবেক ফায়সালা করে দিন। তখন তার প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে বলল, জি, সে ঠিকই বলেছে, আপনি আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব মোতাবেক ফায়সালা করুন। তারপর বেদুইন লোকটি বলল, আমার ছেলে এই লোকটির বাড়িতে কাজ করত। এমতাবস্থায় সে লোকটির স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করে। লোকেরা বলল, তোমার ছেলের উপর রজম আবশ্যক হয়ে গেছে। তখন আমি একশত ছাগল ও একটি দাসীর বিনিময়ে এর কাছ থেকে ছেলেকে মুক্ত করে আনি। তারপর আলিমদের জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, তোমার ছেলের উপর একশ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন ওয়াজিব হয়েছে। এসব শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই আমি তোমাদের মাঝে 'আল্লাহর কিতাব' অনুযায়ী ফায়সালা করব। দাসী ও ছাগল তুমি ফেরত পাবে। আর তোমার ছেলেকে একশ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন দেওয়া হবে। আর তুমি হে উনাইস, এই লোকের স্ত্রীর কাছে যাবে এবং তাকে রজম করবে। উনাইস তার নিকট গিয়ে তাকে রজম করে। ১১৩
ইমাম কুরতুবি (রাহ.) বলেন, এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি অবশ্যই তোমাদের মাঝে 'আল্লাহর কিতাব' অনুযায়ী ফায়সালা করে দেব। অতঃপর রজমের ফায়সালা করেছেন। কিন্তু রজমের বিধান আল কুরআনে লিপিবদ্ধ নেই। অর্থাৎ এখানে তিনি 'আল্লাহর কিতাব' বলে 'আল্লাহর বিধান' বুঝিয়েছেন। ১১৪
যে বিধান আল কুরআনে উল্লেখ নেই, বরং কুরআনের অতিরিক্ত ওহির মাধ্যমে এসেছে।
আল কুরআনেও 'আল্লাহর কিতাব' শব্দবন্ধ 'আল্লাহর বিধান' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ كِتَابَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ.
"এবং তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক হয়েছে তারা ব্যতীত সকল সধবা নারী তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ; এটা তোমাদের উপর (কিতাবুল্লাহ বা) আল্লাহর বিধান।"১১৫
টিকাঃ
১১২. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৬৪; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ১২; সুনান দারিমি, হাদীস : ৬০৬। ইমাম তিরমিযি হাদীসটিকে হাসান বলেছেন; ইবনুল মুলাক্কিন, আলবানি প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
১১৩. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ১৭৬০; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৭০৪২; সহীহ বুখারি, হাদীস : ২৬৯৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৬৯৭; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪৪৪৫; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১৪৩৩; সুনান নাসায়ি, হাদীস: ৫৪১১; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ২৫৪৯。
১১৪. কুরতুবি, আল জামি' লি-আহকামিল কুরআন: ২০/১৪৩。
১১৫. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ২৪। আরো দেখুন: সূরা [৮] আনফাল, আয়াত: ৭৫; সূরা [৩৩] আহযাব, আয়াত: ০৬。
📄 কুরআন-বহির্ভূত ওহি নাযিলের কারণ কী
এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে, মহান আল্লাহ শরীআতের বিধান-সংবলিত সকল ওহি আল কুরআনের অন্তর্ভুক্ত না করে কিছু বিধান কুরআনের বাইরে কেন রাখলেন, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'কুরআন' বলে দাবি না করে উম্মাতকে শিক্ষা দিলেন— যা আমাদের কাছে 'হাদীস' বা 'সুন্নাহ' নামে সংকলিত?
আল্লাহর আনুগত্যের পাশাপাশি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যও আবশ্যক। আল কুরআনে মহান আল্লাহ বারংবার নিজের আনুগত্যের সাথে সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। বিশ্বাসী মানুষ আল্লাহর হুকুম আল্লাহর জন্য পালন করে মহান আল্লাহর আনুগত্য করে। এ বিধান নবীজিই মানুষকে জানান এবং আমলের পদ্ধতিও তিনিই শেখান। এভাবে নবীজির দেওয়া সংবাদের উপর বিশ্বাস করে তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে আমল করার দ্বারা যদিও নবীজির আনুগত্য প্রকাশ পায়, তবুও মহান আল্লাহ চান, আরো সুস্পষ্টভাবে নবীজির আনুগত্যের বিষয়টি পরখ করতে। এ উদ্দেশ্যে তিনি কিছু ওহি এমনভাবে নাযিল করেন, যা কুরআন হিসাবে উদ্ধৃত না করে বিবৃত বিধানকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই ঘোষণা করেন। বিষয়টি আল কুরআনে সুস্পষ্টরূপেই বর্ণিত হয়েছে।
মাদানি জীবনের শুরুতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইতুল মুকাদ্দাসকে কিবলা করে মুসলিমদের নিয়ে সালাত আদায় করতেন। সতেরো মাস পর কুরআন কারীম এ বিধানকে রহিত করে নতুন বিধান জারি করে:
قَدْ نَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ فَلَنُوَلِيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَحَيْثُ مَا كُنْتُمْ فَوَلُّوا وُجُوهَكُمْ شَطْرَةً.
“(হে নবী) আমি বারবার আপনার চেহারাকে আকাশের দিকে ফেরাতে দেখছি। সুতরাং আমি আপনাকে আপনার পছন্দনীয় কিবলার দিকেই ফিরিয়ে দেব। সুতরাং আপনি এবার আপনার চেহারাকে মসজিদুল হারামের দিকে ফেরান। আর তোমরা যেখানেই থাকো তোমাদের চেহারাকে সেদিকেই ফেরাবে।”১১৬
বাইতুল্লাহ বা কা'বাকে কিবলা করার এই বিধান আসার পর কিছু মানুষ নানাভাবে আপত্তি উত্থাপন করতে থাকে। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের জবাবে বলেন:
وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنْتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ يَتَّبِعُ الرَّسُوْلَ مِمَّنْ يَنْقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ.
“আপনি পূর্বে যে কিবলার উপর ছিলেন আমি তা নির্ধারণ করেছিলাম এ কথা জেনে নিতে যে, কে রাসূলের আনুগত্য করে আর কে পিছুটান দেয়।"১১৭
এ আয়াতে দুটি বিষয় লক্ষ করুন: ১. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্বে যে কিবলার উপর ছিলেন, অর্থাৎ বাইতুল মুকাদ্দাস, মহান আল্লাহ বলেন, 'এ বাইতুল মুকাদ্দাসকে আমিই কিবলা হিসাবে নির্ধারণ করেছিলাম।' কিন্তু আল কুরআনে বাইতুল মুকাদ্দাসকে কিবলা হিসাবে নির্ধারণ করার নির্দেশ বিষয়ক কোনো আয়াত নেই। তাহলে বোঝা গেল, এ বিধান নির্ধারিত হয়েছিল কুরআন-বহির্ভূত ওহির মাধ্যমে।
২. তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন, এ বিধানটি আমি এভাবে দিয়েছিলাম এ কথা জেনে নিতে যে, কে আমার রাসূলের আনুগত্য করে আর কে পিছুটান দেয়। অর্থাৎ এ কথা পরিষ্কার যে, কুরআন-বহির্ভূত এ ওহি ছিল মানুষের কাছ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের পরীক্ষা নেবার জন্য। ১১৮
সুতরাং যারা কুরআনের অতিরিক্ত ওহি, অর্থাৎ হাদীসকে অস্বীকার করে তারা মহান আল্লাহর এ পরীক্ষায় অকৃতকার্য, অনুত্তীর্ণ-আল কুরআনের অগণিত স্থানে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের আদেশ করা হয়েছে, মহান আল্লাহর সে আদেশ অমান্যকারী বলে গণ্য।
টিকাঃ
১১৬. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ১৪৪。
১১৭. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ১৪৩。
১১৮. ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম : ১/৪৫৭-৪৫৮; মাওদূদি, সুন্নাতে রাসূলের আইনগত মর্যাদা, পৃ. ৮৩-৮৩ ও ১৯০-১৯৫; তাকি উসমানি, হাদীসের প্রামাণ্যতা, পৃ. ৩৮-৪০。
📄 কুরআনের অতিরিক্ত ওহি : সাহাবিদের বুঝ
তাবিয়ি আলকমা (রাহ.) বলেন, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) হাদীসে নিষিদ্ধ কিছু কাজ সম্পাদনকারী নারীর উপর অভিশাপ করেন। তখন বনি আসাদের উম্মু ইয়াকুব নামের এক মহিলা এসে তাঁকে বলেন, আপনি নাকি এই এই নারীর উপর অভিশাপ করেন? তিনি বলেন, কেন তাকে অভিশাপ করব না, যাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিশাপ করেছেন? যার কথা আল্লাহর কিতাবে আছে? তখন ওই মহিলা বলেন, আমি পুরো কুরআন পড়েছি। কিন্তু আপনি যা বলছেন তা তাতে কোথাও পাইনি। ইবন মাসউদ (রা.) বলেন, তুমি যদি কুরআন পড়তে তবে অবশ্যই পেতে। তুমি কি পড়োনি, মহান আল্লাহ বলেছেন :
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا .
“যা রাসূল নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ করো। আর তিনি যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করো।?”১১৯
তখন মহিলাটি বললেন, অবশ্যই। ইবন মাসউদ (রা.) বললেন, জি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগুলো সম্পর্কে নিষেধ করেছেন। ১২০
দেখুন, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) এ আয়াতটিকে হাদীসের প্রামাণ্যতার পক্ষে-হাদীসের ওহি হওয়া, শরীআতের দলীল হওয়ার পক্ষে-প্রমাণ হিসাবে পেশ করছেন এবং হাদীসের বিধিবিধানকে কুরআনে থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করছেন। কিন্তু হাদীস অস্বীকারকারী সম্প্রদায় আয়াতের এ ব্যাখ্যা মানেন না। তারা বলেন, এ আয়াত হাদীসের প্রামাণ্যতার দলীল নয়। কেননা আয়াতে বলা হয়েছে, 'রাসূল যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ করো। আর তিনি যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করো।' রাসূল নিয়ে এসেছেন কুরআন আর কুরআনের আদেশ-নিষেধই তিনি প্রচার করেছেন। সুতরাং এ আয়াতের মর্ম হচ্ছে, তোমরা রাসূলের নিয়ে আসা কুরআনকে আঁকড়ে ধরো। এর বাইরের কিছু মান্য করার কথা এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায় না।
কিন্তু আমরা তো কিছুতেই এ কথা মানতে পারি না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিদের থেকে এইসব হাদীস অস্বীকারকারী ব্যক্তিবর্গ কুরআনের মর্ম ভালো বোঝেন। কুরআন নাযিল হয়েছে তাঁদের সামনে, তাঁরা রাসূলের কাছ থেকে তার ব্যাখ্যা শিখেছেন, তাঁরাই কুরআনের বিশুদ্ধ মর্মের উপর সব থেকে নিখুঁতভাবে আমলকারী, যে কারণে আল্লাহ তাআলা আল কুরআনে তাঁদের উপর নিজের সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। উপরন্তু এই ব্যাখ্যা তো সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, যাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَا حَدَّثَكُمْ ابْنُ مَسْعُوْدٍ فَصَدِّقُوْهُ.
ইবন মাসউদ তোমাদেরকে যা বর্ণনা করে তোমরা তা সত্য বলে মেনে নেবে। ১২১
[তাবিয়ি প্রজন্মও সূরা হাশরের ৭ নং আয়াতটি হাদীসের প্রামাণ্যতার পক্ষে দলীল বলে বিশ্বাস করতেন। যেমন তাবিয়ি ইসমাঈল ইবন উবাইদুল্লাহ (রাহ.) বলেন:
يَنْبَغِي لَنَا أَنْ نَحْفَظَ حَدِيثَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمَا يُحْفَظُ الْقُرْآنُ لِأَنَّ اللَّهَ يَقُوْلُ: وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ.
আমাদের কর্তব্য কুরআনের মতোই গুরুত্ব দিয়ে হাদীস মুখস্থ ও সংরক্ষণ করা। কেননা মহান আল্লাহ বলেন, রাসূল যা নিয়ে এসেছেন তোমরা তা গ্রহণ করো। ১২২
তাবিয়ি উমাইয়া ইবন আব্দুল্লাহ (রাহ.) আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.)-কে বলেন, আমরা আবাসের সালাতের কথা এবং ভীতির সালাতের কথা কুরআনে পেয়েছি, কিন্তু সফরের সালাতের কথা তো কুরআনে পাইনি? উত্তরে ইবন উমার (রা.) বলেন:
يَا ابْنَ أَخِي! إِنَّ اللَّهَ بَعَثَ إِلَيْنَا مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا نَعْلَمُ شَيْئًا فَإِنَّمَا نَفْعَلُ كَمَا رَأَيْنَاهُ يَفْعَلُ.
হে ভাতিজা, আল্লাহ আমাদের নিকট মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠিয়েছেন, তখন আমরা তো কিছুই জানতাম না। তাই আমরা তেমন আমল করি তাঁকে যেমন করতে দেখেছি। ১২৩
কুরআনের অতিরিক্ত ওহির ব্যাপারে সাহাবিদের ঈমান-আকীদা এমনই ছিল। আর আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে তাঁদের মতো ঈমান-আকীদা গ্রহণের। তাঁদের বিপরীত ঈমান-আকীদা ধারণকারীর ঈমানের দাবিকে নাকোচ করে দিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ.
“কিছু মানুষ দাবি করে, আমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান এনেছি; কিন্তু তারা মুমিন নয়।” ১২৪
টিকাঃ
১১৯. সূরা [৫৯] হাশর, আয়াত: ০৭。
১২০. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৮৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১২৫。
১২১. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৩২৭৬; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩৯৯৯। সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস: ৩৯০২। হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযি ও ইবন হিব্বান প্রমাণিত বলেছেন।
১২২. খতীব বাগদাদি, আল কিফায়াহ: ১৭; ইবন আসাকির, তারীখ দিমাঙ্ক, ৮/৪৩৬; মিয্যি, তাহযীবুল কামাল, ৩/১৪。
১২৩. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ৩৭৫; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৫৬৮৩; সুনান নাসায়ি, হাদীস: ১৪৩৪; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ১০৬৬; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস: ৯৪৬; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস : ১৪৫১, ২৭৩৫, মুস্তাদরাক, হাদীস: ৯৪৬; জিয়া মাকদিসি, আল আহাদীসুল মুখতারাহ: ১৩/১৩৭। হাদীসটিকে ইবন খুযাইমা, ইবন হিব্বান, হাকিম, জিয়া মাকদিসি প্রমুখ মুহাদ্দিস প্রমাণিত বলেছেন。
১২৪. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ০৮。