📄 নবী (সা)-এর কথাবার্তা বলার নীতি
١٩٦ ، عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ سَأَلْتُ خَالِى هِنْدًا قُلْتُ صِفْ لِي مَنْطِقَهُ؟ فَقَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مُتَوَاصِلَ الأَحْزَانِ دَائِمُ الْفِكْرِ، لَيْسَتْ لَهُ رَاحَةٌ لا يَتَكَلَّمُ فِي غَيْرِ حَاجَةٍ طَوِيلُ السِّكْتِ، يَفْتَتِحُ الْكَلَامَ وَيَخْتِمُهُ بِأَشْدَاقِهِ ، وَيَتَكَلَّمُ بِجَوَامِعِ الْكَلِمِ فَصْلاً لَا فُضُولَ فِيْهِ وَلَا تَقْصِيرَ دَمَثُ لَيْسَ بِالْجَافِي وَلَا بِالمَهِيْنِ يُعَظِمُ النِعْمَةَ وَإِنْ دُقَّتْ وَلَا يَذُمُّ مِنْهَا شَيْئًا، لَا تُغْضَبُهُ الدُّنْيَا وَمَا كَانَ لَهَا، فَإِذَا تَعُوطِي الْحَقَّ لَمْ يَعْرِفْهُ أَحَدٌ ، وَلَمْ يَقُمْ بِغَضَبِهِ شَيْ حَتَّى يَنْتَصِرَ لَهُ وَإِذَا أَشَارَ أَشَارَ بِكَفِّهِ كُلُّهَا وَإِذَا تَعَجَّبَ قَلْبُهَا ، وَإِذَا تَحَدَّثَ اتِّصَلَ بِهَا يَضْرِبُ بِرَاحَتِهِ الْيُمْنَى بَاطِنَ إِبْهَا مِهِ الْيُسْرَى -
১৯৬. হযরত হাসান ইব্ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মামা হযরত হিন্দা ইব্ন আবূ হালা (রা)-কে নবী -এর কথাবার্তা বলার নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী তাঁর নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য মহান আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি মোতাবেক পালন করার চিন্তায় চির আত্মনিমগ্ন এবং উম্মতের সফলতা ও কল্যাণ চিন্তায় সর্বদা বিভোর থাকতেন। সামান্য পরিমাণের অস্থিরতাও তাঁর ছিলো না। কাজেই অধিকাংশ সময় তিনি চুপ থাকতেন, প্রয়োজন ব্যতিরেকে কোন কথা বলতেন না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কথা বলতেন খুবই স্পষ্টভাবে। তাঁর কথাগুলি ছিলো উপযুক্ত শব্দমালার দ্বারা গঠিত সৌষ্ঠবতাপূর্ণ বাক্য। এক বাক্য অন্য বাক্য থেকে পৃথক থাকতো। কথাগুলির মধ্যে না কোন অতিরিক্ত শব্দ থাকতো, আর না মর্ম প্রকাশে অক্ষম কোন শব্দ পাওয়া যেত। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী। কদর্যতা কিংবা রূঢ়তা তাঁর ভাষায় ছিলো না। আল্লাহ্ পাকের কোন নিয়ামত তা যতই ছোট হোক, তিনি এর খুবই কদর করতেন। কখনো তা হেয় কিংবা তুচ্ছ মনে করতেন না। জাগতিক কোন কাজ তাকে ক্রোধান্বিত করতো না, (কেননা তাঁর দৃষ্টিতে জাগতিক বিষয়াদির তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না) আর জাগতিক কাজকর্ম ক্রোধ নিপাতের বস্তুও নয়। তবে সত্য ও ন্যায়ের উপর হস্তক্ষেপ করা হলে তার চেহারা এত পরিবর্তন হয়ে যেতো যে, কেউ তাঁকে তখন চেনা কঠিন হতো। আর সে মুহূর্তে তাঁর ক্রোধের সামনে দাঁড়িয়ে কোন বিষয় টিকতে সক্ষম হতো না; যতক্ষণ না তিনি অন্যায়ের প্রতিকার করতেন। তিনি যখন কারোর দিকে ইশারা করতেন তখন সম্পূর্ণ হাত দ্বারা ইশারা করতেন। (কেননা শুধু অঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করা ভালো নয়।) তিনি কখনো কোন কাজে বিস্ময় প্রকাশ করলে হাত মুবারক ঘুরিয়ে নিতেন। কথা বলার সময় কখনো কখনো হাতও নাড়াচাড়া করতেন। এভাবে কখনো তিনি ডান হাতের তালু বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের পেটের উপর মারতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটি অনেক দিক থেকে ব্যাপক একটি হাদীস। এ হাদীসে নবী -এর কথাবার্তা বলা, বলার ভঙ্গি ও ধরন, বাক্যের মিষ্টতা ও আকর্ষণ, মন-মানসিকতার স্বরূপ এবং কথাবার্তা বলার নীতি সম্পর্কীয় যাবতীয় বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হয়েছে। এ হাদীসে নবী-এর কথাবার্তা বলার ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শের এ অংশটুকুর দ্বারা মানবীয় স্বভাব ও উন্নত নৈতিকতা- বোধের এমন একটি অধ্যায়ের সন্ধান মেলে যা সকল মুসলিমের জন্য জীবন-পাথেয় হওয়ার যোগ্যতা রাখে। হাদীসটির মধ্যে এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাগুলি পাওয়া যায়, যেগুলি থেকে উম্মতের শিক্ষা গ্রহণ বাঞ্ছনীয় সেগুলি হলো নিম্নরূপ:
তিনি বিনা প্রয়োজনে কথাবার্তা বলতেন না। নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন চিন্তায় সারাক্ষণ আত্ম-নিমগ্ন থাকতেন। উম্মতের সফলতা ও কল্যাণ লাভের চিন্তা সর্বদা তাঁকে বিভোর করে রাখতো। এ সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজের চিন্তা-ভাবনার কারণে প্রয়োজনের মুহূর্তে যখন কথাবার্তা বলতেন তখন খুবই স্পষ্টভাষায় পরিষ্কারভাবে কথা বলতেন। কথার মধ্যে কোন মারপ্যাঁচ থাকতো না। কথাগুলি হতো সৌষ্ঠবতাপূর্ণ উপযুক্ত শব্দমালার দ্বারা সুগঠিত। বাক্যগুলি ছিলো যাচাইকৃত ও যথাযথ। তাতে অযথা শব্দ কিংবা দুর্বোধ্য শব্দের মিশ্রণ ছিলো না। শ্রোতাদের বুঝতে কষ্ট হয় এমন কোন সংযুক্ত বাক্য কিংবা অর্ধবাক্য তাঁর কথায় পাওয়া যেতো না। তাঁর কথাবার্তাগুলি হতো অতিশয় মিষ্ট, শ্রোতাদের মনে রাখার মতো এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ। গরিমা অহংকারবোধ কিংবা বাজারি অভদ্রতার কোন লেশমাত্রও তাঁর কথায় ছিলো না। কথাবার্তা বলা প্রসঙ্গে নবী-এর এই কয়েকটি বুনিয়াদী নীতিকে মানুষ যদি অনুসরণ করে তা হলে ইহকাল ও পরকালের সর্বত্র তাদের জন্য মান-সম্মান, প্রতিপত্তি ও বন্ধুত্ব এবং সার্বিক নিরাপত্তা অবধারিত।
১৯৭. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ رَدَّدُهَا ثَلَاثًا وَإِذْ أَتَى قَوْمًا سَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثَلَاثًا -
১৯৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন (গুরুত্বপূর্ণ) কোন কথা বলতেন, তখন কথাটি তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন। আর যখন কোন সম্প্রদায়ের কাছে যেতেন তখন তাদেরকে তিনবার সালাম দিতেন (যেন প্রত্যেকে শুনতে পায়)।
ফায়দা: নবী করীম তাঁর উম্মতের প্রতি খুবই দয়ালু ও উদার ছিলেন। সে কারণে প্রিয় সাহাবাদেরকে তিনি যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতেন তখন তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে কথাটি পুনঃ পুনঃ বলতেন যেন শ্রোতাদের সকলে কথাটি ভালভাবে শুনে নিতে এবং বুঝতে সক্ষম হয়। যেন অর্ধ কথা শোনে কিংবা মোটেই না শোনার কারণে কারোর মনে এমন ধরনের কোন খুঁতখুঁত ভাব অবশিষ্ট না থাকতে পারে যে, না জানি নবী কি কথাটি বলেছেন, কিংবা আমরাও যদি কথাটি শুনতে পেতাম! অনুরূপ তিনি কোথাও গেলে কিংবা কোন সম্প্রদায়ে তাঁর আগমন ঘটলে উপস্থিত লোকদেরকে তিনি তিনবার সালাম উচ্চারণ করতেন। এর কারণ ছিলো যেন সকলেই প্রিয় নবী -এর এই সালাম ও দু'আর কথাটি শুনতে পারে এবং আনন্দিত হতে পারে। কারোর মনে যেন এমন কোন দুঃখ অবশিষ্ট না থাকে যে, তিনি তো আমাদের সালাম প্রদানের দ্বারা কৃতার্থ করলেন না। এ বিষয়ে আরো আলোচনা সম্মুখস্থ হাদীসেও আসবে।
۱۹۸. أَخْبَرَنَا الزُّهْرِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ لَا يُسْرِدُ سَرْدَكُمْ هَذَا وَلَكِنَّ يَتَكَلَّمُ بِكَلَامٍ فَضْلٍ يَحْفَظُهُ مَنْهُ -
১৯৮. যুহরী (র) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ তোমাদের দ্রুত কথা বলার মত দ্রুতগতিতে কথা বলতেন না। তিনি কথাবার্তা বলতেন ধীরে ধীরে থেমে থেমে। তাঁর কথাগুলি এতো স্পষ্ট হতো যে, যে কোন ব্যক্তিই তা একবার শোনার দ্বারা মুখস্থ করে ফেলতো।
۱۹۹. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا عَنِ النَّبِيِّ ﷺ
১৯৯. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন।
۲۰۰. عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا حَدَّثَ بِحَدِيثٍ تَبَسَّمَ فِي حَدِيثِهِ -
২০০. হযরত আবূ দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোনো কথা বলতেন তখন (মমত্ববোধের কারণে) কথা বলার মুহূর্তে তার ওষ্ঠাধারে স্মিত হাসির রেখা ফুটে থাকতো।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, নবী অতিশয় হাসিমুখে কথাবার্তা বলতেন। দম্ভপূর্ণ ও রূঢ় কথাবার্তা তাঁর জীবনে আদৌ ছিলো না।
۲۰۱ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ طَوِيلَ الصَّمْتِ -
২০১. হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী অধিকাংশ সময় চুপ থাকতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, বাচালতা ও বেশি কথা বলার তুলনায় স্বল্পভাষিতা ও কম কথা বলা অধিকতর ভালো অভ্যাস। নীরবতা ও মৌনতার মধ্যেই বস্তুত ইহকাল ও পরকালের মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ কারণেই প্রিয় নবী -এর হাদীস-সমূহে এ বিষয়ের যথেষ্ট আলোচনা বিদ্যমান। যেমন ইরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি চুপ থাকে সে মুক্তি পায়। কোন সন্দেহ নেই যে, বাচালতা ও অনর্থক কথা বলা মানুষের জন্য নানা রকম বিপদের কারণ হয়ে। নবী -এর হাদীসে এ ধরনের বদ অভ্যাসের অনেক নিন্দা করা হয়েছে।
📄 নবী (সা)-এর কথাবার্তা বলার নীতি
١٩٦ ، عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ سَأَلْتُ خَالِى هِنْدًا قُلْتُ صِفْ لِي مَنْطِقَهُ؟ فَقَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مُتَوَاصِلَ الأَحْزَانِ دَائِمُ الْفِكْرِ، لَيْسَتْ لَهُ رَاحَةٌ لا يَتَكَلَّمُ فِي غَيْرِ حَاجَةٍ طَوِيلُ السِّكْتِ، يَفْتَتِحُ الْكَلَامَ وَيَخْتِمُهُ بِأَشْدَاقِهِ ، وَيَتَكَلَّمُ بِجَوَامِعِ الْكَلِمِ فَصْلاً لَا فُضُولَ فِيْهِ وَلَا تَقْصِيرَ دَمَثُ لَيْسَ بِالْجَافِي وَلَا بِالمَهِيْنِ يُعَظِمُ النِعْمَةَ وَإِنْ دُقَّتْ وَلَا يَذُمُّ مِنْهَا شَيْئًا، لَا تُغْضَبُهُ الدُّنْيَا وَمَا كَانَ لَهَا، فَإِذَا تَعُوطِي الْحَقَّ لَمْ يَعْرِفْهُ أَحَدٌ ، وَلَمْ يَقُمْ بِغَضَبِهِ شَيْ حَتَّى يَنْتَصِرَ لَهُ وَإِذَا أَشَارَ أَشَارَ بِكَفِّهِ كُلُّهَا وَإِذَا تَعَجَّبَ قَلْبُهَا ، وَإِذَا تَحَدَّثَ اتِّصَلَ بِهَا يَضْرِبُ بِرَاحَتِهِ الْيُمْنَى بَاطِنَ إِبْهَا مِهِ الْيُسْرَى -
১৯৬. হযরত হাসান ইব্ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মামা হযরত হিন্দা ইব্ন আবূ হালা (রা)-কে নবী -এর কথাবার্তা বলার নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী তাঁর নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য মহান আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি মোতাবেক পালন করার চিন্তায় চির আত্মনিমগ্ন এবং উম্মতের সফলতা ও কল্যাণ চিন্তায় সর্বদা বিভোর থাকতেন। সামান্য পরিমাণের অস্থিরতাও তাঁর ছিলো না। কাজেই অধিকাংশ সময় তিনি চুপ থাকতেন, প্রয়োজন ব্যতিরেকে কোন কথা বলতেন না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কথা বলতেন খুবই স্পষ্টভাবে। তাঁর কথাগুলি ছিলো উপযুক্ত শব্দমালার দ্বারা গঠিত সৌষ্ঠবতাপূর্ণ বাক্য। এক বাক্য অন্য বাক্য থেকে পৃথক থাকতো। কথাগুলির মধ্যে না কোন অতিরিক্ত শব্দ থাকতো, আর না মর্ম প্রকাশে অক্ষম কোন শব্দ পাওয়া যেত। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী। কদর্যতা কিংবা রূঢ়তা তাঁর ভাষায় ছিলো না। আল্লাহ্ পাকের কোন নিয়ামত তা যতই ছোট হোক, তিনি এর খুবই কদর করতেন। কখনো তা হেয় কিংবা তুচ্ছ মনে করতেন না। জাগতিক কোন কাজ তাকে ক্রোধান্বিত করতো না, (কেননা তাঁর দৃষ্টিতে জাগতিক বিষয়াদির তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না) আর জাগতিক কাজকর্ম ক্রোধ নিপাতের বস্তুও নয়। তবে সত্য ও ন্যায়ের উপর হস্তক্ষেপ করা হলে তার চেহারা এত পরিবর্তন হয়ে যেতো যে, কেউ তাঁকে তখন চেনা কঠিন হতো। আর সে মুহূর্তে তাঁর ক্রোধের সামনে দাঁড়িয়ে কোন বিষয় টিকতে সক্ষম হতো না; যতক্ষণ না তিনি অন্যায়ের প্রতিকার করতেন। তিনি যখন কারোর দিকে ইশারা করতেন তখন সম্পূর্ণ হাত দ্বারা ইশারা করতেন। (কেননা শুধু অঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করা ভালো নয়।) তিনি কখনো কোন কাজে বিস্ময় প্রকাশ করলে হাত মুবারক ঘুরিয়ে নিতেন। কথা বলার সময় কখনো কখনো হাতও নাড়াচাড়া করতেন। এভাবে কখনো তিনি ডান হাতের তালু বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের পেটের উপর মারতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটি অনেক দিক থেকে ব্যাপক একটি হাদীস। এ হাদীসে নবী -এর কথাবার্তা বলা, বলার ভঙ্গি ও ধরন, বাক্যের মিষ্টতা ও আকর্ষণ, মন-মানসিকতার স্বরূপ এবং কথাবার্তা বলার নীতি সম্পর্কীয় যাবতীয় বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হয়েছে। এ হাদীসে নবী-এর কথাবার্তা বলার ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শের এ অংশটুকুর দ্বারা মানবীয় স্বভাব ও উন্নত নৈতিকতা- বোধের এমন একটি অধ্যায়ের সন্ধান মেলে যা সকল মুসলিমের জন্য জীবন-পাথেয় হওয়ার যোগ্যতা রাখে। হাদীসটির মধ্যে এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাগুলি পাওয়া যায়, যেগুলি থেকে উম্মতের শিক্ষা গ্রহণ বাঞ্ছনীয় সেগুলি হলো নিম্নরূপ:
তিনি বিনা প্রয়োজনে কথাবার্তা বলতেন না। নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন চিন্তায় সারাক্ষণ আত্ম-নিমগ্ন থাকতেন। উম্মতের সফলতা ও কল্যাণ লাভের চিন্তা সর্বদা তাঁকে বিভোর করে রাখতো। এ সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজের চিন্তা-ভাবনার কারণে প্রয়োজনের মুহূর্তে যখন কথাবার্তা বলতেন তখন খুবই স্পষ্টভাষায় পরিষ্কারভাবে কথা বলতেন। কথার মধ্যে কোন মারপ্যাঁচ থাকতো না। কথাগুলি হতো সৌষ্ঠবতাপূর্ণ উপযুক্ত শব্দমালার দ্বারা সুগঠিত। বাক্যগুলি ছিলো যাচাইকৃত ও যথাযথ। তাতে অযথা শব্দ কিংবা দুর্বোধ্য শব্দের মিশ্রণ ছিলো না। শ্রোতাদের বুঝতে কষ্ট হয় এমন কোন সংযুক্ত বাক্য কিংবা অর্ধবাক্য তাঁর কথায় পাওয়া যেতো না। তাঁর কথাবার্তাগুলি হতো অতিশয় মিষ্ট, শ্রোতাদের মনে রাখার মতো এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ। গরিমা অহংকারবোধ কিংবা বাজারি অভদ্রতার কোন লেশমাত্রও তাঁর কথায় ছিলো না। কথাবার্তা বলা প্রসঙ্গে নবী-এর এই কয়েকটি বুনিয়াদী নীতিকে মানুষ যদি অনুসরণ করে তা হলে ইহকাল ও পরকালের সর্বত্র তাদের জন্য মান-সম্মান, প্রতিপত্তি ও বন্ধুত্ব এবং সার্বিক নিরাপত্তা অবধারিত।
১৯৭. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ رَدَّدُهَا ثَلَاثًا وَإِذْ أَتَى قَوْمًا سَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثَلَاثًا -
১৯৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন (গুরুত্বপূর্ণ) কোন কথা বলতেন, তখন কথাটি তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন। আর যখন কোন সম্প্রদায়ের কাছে যেতেন তখন তাদেরকে তিনবার সালাম দিতেন (যেন প্রত্যেকে শুনতে পায়)।
ফায়দা: নবী করীম তাঁর উম্মতের প্রতি খুবই দয়ালু ও উদার ছিলেন। সে কারণে প্রিয় সাহাবাদেরকে তিনি যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতেন তখন তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে কথাটি পুনঃ পুনঃ বলতেন যেন শ্রোতাদের সকলে কথাটি ভালভাবে শুনে নিতে এবং বুঝতে সক্ষম হয়। যেন অর্ধ কথা শোনে কিংবা মোটেই না শোনার কারণে কারোর মনে এমন ধরনের কোন খুঁতখুঁত ভাব অবশিষ্ট না থাকতে পারে যে, না জানি নবী কি কথাটি বলেছেন, কিংবা আমরাও যদি কথাটি শুনতে পেতাম! অনুরূপ তিনি কোথাও গেলে কিংবা কোন সম্প্রদায়ে তাঁর আগমন ঘটলে উপস্থিত লোকদেরকে তিনি তিনবার সালাম উচ্চারণ করতেন। এর কারণ ছিলো যেন সকলেই প্রিয় নবী -এর এই সালাম ও দু'আর কথাটি শুনতে পারে এবং আনন্দিত হতে পারে। কারোর মনে যেন এমন কোন দুঃখ অবশিষ্ট না থাকে যে, তিনি তো আমাদের সালাম প্রদানের দ্বারা কৃতার্থ করলেন না। এ বিষয়ে আরো আলোচনা সম্মুখস্থ হাদীসেও আসবে।
۱۹۸. أَخْبَرَنَا الزُّهْرِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ لَا يُسْرِدُ سَرْدَكُمْ هَذَا وَلَكِنَّ يَتَكَلَّمُ بِكَلَامٍ فَضْلٍ يَحْفَظُهُ مَنْهُ -
১৯৮. যুহরী (র) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ তোমাদের দ্রুত কথা বলার মত দ্রুতগতিতে কথা বলতেন না। তিনি কথাবার্তা বলতেন ধীরে ধীরে থেমে থেমে। তাঁর কথাগুলি এতো স্পষ্ট হতো যে, যে কোন ব্যক্তিই তা একবার শোনার দ্বারা মুখস্থ করে ফেলতো।
۱۹۹. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا عَنِ النَّبِيِّ ﷺ
১৯৯. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন।
۲۰۰. عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا حَدَّثَ بِحَدِيثٍ تَبَسَّمَ فِي حَدِيثِهِ -
২০০. হযরত আবূ দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোনো কথা বলতেন তখন (মমত্ববোধের কারণে) কথা বলার মুহূর্তে তার ওষ্ঠাধারে স্মিত হাসির রেখা ফুটে থাকতো।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, নবী অতিশয় হাসিমুখে কথাবার্তা বলতেন। দম্ভপূর্ণ ও রূঢ় কথাবার্তা তাঁর জীবনে আদৌ ছিলো না।
۲۰۱ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ طَوِيلَ الصَّمْتِ -
২০১. হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী অধিকাংশ সময় চুপ থাকতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, বাচালতা ও বেশি কথা বলার তুলনায় স্বল্পভাষিতা ও কম কথা বলা অধিকতর ভালো অভ্যাস। নীরবতা ও মৌনতার মধ্যেই বস্তুত ইহকাল ও পরকালের মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ কারণেই প্রিয় নবী -এর হাদীস-সমূহে এ বিষয়ের যথেষ্ট আলোচনা বিদ্যমান। যেমন ইরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি চুপ থাকে সে মুক্তি পায়। কোন সন্দেহ নেই যে, বাচালতা ও অনর্থক কথা বলা মানুষের জন্য নানা রকম বিপদের কারণ হয়ে। নবী -এর হাদীসে এ ধরনের বদ অভ্যাসের অনেক নিন্দা করা হয়েছে।
📄 নবী (সা)-এর পথচলা এবং চলার পথে এদিক-সেদিক দৃষ্টিপাত করার নীতি
۲۰۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ كَانَ النَّبِيُّ الإِذَا مَشَى كَأَنَّهُ يَتَوَكَّا -
২০২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন পথ চলতেন তখন মনে হতো তিনি যেন (লাঠি কিংবা অন্য কোন জিনিসের উপর) ভর দিয়ে পথ চলছেন। (অর্থাৎ তিনি সম্মুখের দিকে ঝুঁকে পথ চলতেন।)
، قَالَ كَانَ رَسُولُ الله ﷺ إِذَا مَشَى تَكَفَّا - ۲۰۳ . عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ الله الله
২০৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাঁটার সময়ে রাসূলুল্লাহ্ সম্মুখের দিকে ঝুঁকে পথ চলতেন।
٢٠٤ عَنْ عَاصِمِ بْنِ لَقِيْطِ بْنِ صَبُرَةَ عَنْ أَبِيْهِ أَنَّهُ أَتَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا هُوَ وَصَاحِبُ يَطْلُبَانِ النَّبِيُّ الله فَلَمْ يَجِدَاهُ فَلَمْ يَنْشَبْ أَنْ جَاءَ النَّبِيُّ يَتَقَلْعُ يَتَكَفَّ -
২০৪. হযরত আসিম ইব্ন লাকীত ইব্ন সাবুরা (রা) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি (হযরত আসিমের পিতা) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর খেদমতে উপস্থিত হন। এ সময় তিনি ও তাঁর এক সাথী উভয়ে নবী -কে খুঁজছিলেন। কিন্তু তারা নবী -কে উপস্থিত পাননি। তারা কিছুক্ষণ পরেই নবী এমন অবস্থায় আগমন করলেন যেন তিনি (মাটিতে পা টেনে চলার পরিবর্তে) মাটি থেকে পা তুলে তুলে সম্মুখের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে হাঁটছেন।
٢٠٥ . عَنْ أَبِي عِنَبَةَ الْخَوْلَانِيَّ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى أَقْلَعَ -
২০৫. হযরত আবূ ইনাবা খাওলানী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন হাঁটতেন তখন মাটি থেকে সবলে পা তুলে তুলে হাঁটতেন।
٢٠٦ . عَنْ عَلِيٍّ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى تَكَفَّأُ تَكَفِّيًا كَأَنَّمَا يَتَقَلَّعُ مِنْ صَبَبٍ لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ الصَّبَبُ الْمُنْحَدِرُ مِنَ الْأَرْضِ -
২০৬. হযরত আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিয়ম ছিলো তিনি যখন পথ চলতেন তখন সম্মুখের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে চলতেন। (আপাত দৃষ্টিতে মনে হতো) তিনি যেন সবলে পা উত্তোলন পূর্বক ঢালু জায়গা দিয়ে অবতরণ করছেন। আমি তাঁর মত (গুণাবলি সম্পন্ন) মানুষ না পূর্বে কখনো দেখেছি আর না পরে। আরবী ভাষায় 'الصبب.' শব্দের অর্থ হলো ঢালুভূমি।
۲۰۷ . عَنْ رَبِيعَةَ قَالَ دَخَلْنَا عَلَى أَنَسِ بْنِ مَالِكَ فَسَأَلْنَا عَنْ صِفَةِ النَّبِيِّ فَقَالَ كَانَ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَمْشِي فِي صَبَب -
২০৭. হযরত রাবীয়া (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা হযরত আনাস ইব্ন মালিক (রা)-এর দরবারে গেলাম এবং তাঁকে নবী -এর অনুপম গুণাবলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন পথ চলতেন তখন তিনি যেন কোনো ঢালু ভূমি দিয়ে চলছেন। (অর্থাৎ চলার পথে তাঁর হাঁটার গতি ছিল কিছুটা দ্রুত।)
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসসমূহে নবী -এর পথ চলার নিয়মনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। এ সকল হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, তাঁর পথ চলার মধ্যে তিন ধরনের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিলো :
এক. তিনি নম্রতা অবলম্বনের লক্ষ্যে সম্মুখের দিকে ঝুঁকে চলতেন। অহংকারসুলভ বুকটান করে হাঁটতেন না। (তবে যুদ্ধের ময়দানে মুজাহিদগণের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। কেননা তাদের ব্যাপারে নির্দেশ হলো কাফিরদের মুকাবিলায় বিনয় ও নম্রতার প্রকাশ নয়; বরং নিজেদের শক্তি, বীরত্ব ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার প্রকাশ করা আবশ্যক।)
দুই. নবী পথ চলার সময় মাটি থেকে পা তুলে তুলে সবল পুরুষের মত হাঁটতেন। অলস ও খোঁড়ার মত মাটিতে পা টেনে চলতেন না। কেননা এটি অপছন্দনীয় ও দোষের।
তিন. তিনি তুলনামূলকভাবে দ্রুত চলতেন। খুব ধীর গতিতে অলসের মত কিংবা মেয়েলি চলন তাঁর ছিলো না।
দীন ইসলামের হেফাযতকারীগণ যেভাবে নবী-এর অন্যান্য গুণ, বৈশিষ্ট্য, নীতি ও চরিত্রের আমলী সংরক্ষণ করেছেন তদ্রূপ তাঁর চাল-চলন ও হাঁটার পদ্ধতিও তাঁরা যথার্থভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তাঁরা নবী এর ছোট থেকে ছোট কোন গুণ কিংবা কোন অভ্যাসকে উপেক্ষা করেননি। বস্তুত এটি সাহাবায়ে কিরামের এমন এক কৃতিত্ব যার উপমা ইতিহাসের কোনো কালেও দেখা যায় না। এটি নবী-এর শেষ নবী হওয়ার এত প্রকৃষ্ট দলীল যা কেউই অস্বীকার করতে পারে না। অর্থাৎ যে ভাবে রাসূলুল্লাহ্-এর রিসালাত ও নবুওয়াতের যাবতীয় বিষয় কিয়ামত পর্যন্ত সময়কালের জন্য সংরক্ষিত হয়ে আছে, সেভাবে তাঁর আকার-আকৃতি, চাল-চলন, উঠা-বসা ইত্যাদির পদ্ধতিও যথাযথভাবে সংরক্ষিত। আর এভাবেই অনাগত ভবিষ্যত বংশধরের জন্য নবী-এর মহান সত্তা একটি সমুজ্জ্বল আদর্শ হয়ে অটুট থাকবে।
۲۰۸. عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ إِذَا خَرَجَ مَشَى أَصْحَابُهُ أَمَامَهُ وَتَرَكُوا ظَهْرَهُ لِلْمَلَائِكَةِ -
২০৮. হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন বাড়ির বাহির হতেন তখন সাহাবায়ে কিরাম তাঁর আগে আগে চলতেন। তাঁরা নবী -এর পশ্চাৎদিক ফেরেস্তাগণের চলার জন্য ছেড়ে দিতেন।
ফায়দা : অন্যান্য হাদীসে বলা হয়েছে যে, নবী-এর সঙ্গে ফেরেস্তাগণও হেঁটে থাকেন। এ ফেরেস্তাগণ হাঁটতেন নবী-এর পেছনে পেছনে। এ কারণেই সাহাবীগণ বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখতেন এবং নিজেরা তাঁর পশ্চাৎ দিকে হাঁটতেন না। বরং পশ্চাৎ দিকটি ফেরেস্তাগণের জন্য ছেড়ে দিয়ে নিজেরা আগে আগে হাঁটতেন। তাছাড়া আরো কতিপয় হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী নম্রতা ও বিনয় অবলম্বনের লক্ষ্যেও নিজে লোকজনের আগে আগে চলাকে পছন্দ করতেন না। বরং নিজে পেছনে থেকে সাহাবীদেরকে আগে আগে চলতে দিতেন।
۲۰۹. عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَانَ إِذَا مَشَى مَشَى مَشْيَا مُجْتَمِعًا لَيْسَ فِيْهِ كَسْلٌ -
২০৯. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ যখন হাঁটতেন তখন পা তুলে সবল পুরুষের মত হাঁটতেন। তাঁর হাঁটার মধ্যে কোনরূপ আলস্য ও কুঁড়েমির লেশমাত্রও ছিল না।
٢١٠. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كُنَّا إِذَا آتَيْنَا النَّبِيَّ ﷺ جَلَسْنَا خَلْفَهُ -
২১০. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যখন নবী -এর দরবারে উপস্থিত হতাম তখন আমরা তাঁর পেছনে বসে যেতাম।
٢١١. عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ سَأَلْتُ هِنْدَ ابْنَ أَبِي هَالَةَ عَنْ مَشْيِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ كَانَ يَمْشِي تَكَفَّيًا وَيَخْطُوْ هَوْنًا ذَرِيعَ الْمَشْيَةِ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَتَصَبَّبُ أَوْ يَمْشِي فِي صَبَبِ إِذَا الْتَفَتَ الْتَفَتَ جَمِيْعًا، خَافِضَ الطَّرْفِ نَظْرُهُ إِلَى الْأَرْضِ أَكْثَرُ مِنْ نَظْرِهِ إِلَى السَّمَاءِ جُلُّ نَظَرِهِ الْمُلَاحَظَةُ يَسُوقُ أَصْحَابَهُ وَيَبْدَا مَنْ لَقِيَهُ بِالسَّلَام -
২১১. হযরত হাসান ইব্ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত হিন্দ ইব্ন আবূ হালা (রা)-এর কাছে নবী-এর পথচলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী সামান্য ঝুঁকে পথ চলতেন। গাম্ভীর্য ও ঔদার্য রক্ষাপূর্বক তিনি পা তুলতেন। তাঁর পথ চলায় ঈষৎ দ্রুততা ছিলো। চলার সময় মনে হতো তিনি যেন ঢালু ভূমি দিয়ে অবতরণ করছেন। কিংবা বর্ণনাকারী বলেছেন, তিনি যেন কোনো ঢালু ভূমিতে হাঁটছেন। এভাবে তিনি যখন কারোর দিকে দৃষ্টিপাত করতেন তখন সম্পূর্ণভাবে তার দিকে ফিরে তিনি দৃষ্টিপাত করতেন। (পথ চলার সময়) তাঁর চোখের দৃষ্টি যমীনের দিকে অবনমিত থাকতো। এ জন্য আসমানের দিকে তাকানো অপেক্ষা যমীনের দিকে তাঁর দৃষ্টি অধিক থাকতো। অধিকাংশ সময় তিনি চোখের পার্শ্বদেশ দিয়ে তাকাতেন। (লজ্জাশীলতার কারণে) পূর্ণচোখে তাকানো পছন্দ করতেন না। পথচলার সময় সাহাবীদেরকে এভাবে আগে আগে হাঁটতে দিতেন যেন নিজে পেছন থেকে তাদের পরিচালনা করছেন। পথিমধ্যে কারো সঙ্গে দেখা হলে সর্বাগ্রে তিনিই সালাম দিতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসেও নবী-এর পথচলার নীতি আলোচনা করা হয়েছে। পূর্বে উল্লেখিত হাদীসের তুলনায় আলোচ্য হাদীসে কতিপয় অতিরিক্ত গুণের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমনঃ
১. নবী অধিকাংশ সময় চোখের দৃষ্টি অবনমিত করে রাখতেন। এদিক সেদিক তাকাতেন না। সাধারণত মাটির দিকেই পতিত থাকতো তাঁর দৃষ্টি। কখনো কখনো আকাশের দিকে দৃষ্টি তুলে তাকাতেন কিন্তু তা ছিলো ওহী লাভের অপেক্ষায়।
২. তিনি যখন কারোর দিকে তাকাতেন তখন অতিশয় লজ্জাশীলতার কারণে কখনো পূর্ণচোখে তাকাতেন না। বরং একপার্শ্ব দিয়ে তাকাতেন।
৩. তিনি যেহেতু কিছুটা দ্রুত চলতেন তাই সাহাবীদেরকে নিজের সামনে হাঁটতে দিতেন। ফলে তারাও যেন সমান্তরালে দ্রুত চলেন এবং তাদের কেউ যেন পিছিয়ে না পড়েন। সাথে সাথে এ ভাবে পেছনে চলার মধ্যে নিজের নম্রতা ও বিনয়ের প্রকাশও উদ্দেশ্য ছিল। দাম্ভিক ও অহংকারীদের ন্যায় সকলের আগে আগে চলাকে তিনি পছন্দ করতেন না। অপর হাদীসে বলা হয়েছে যে, সাহাবীগণ নবী -এর আগে আগে চলার মধ্যে আরো একটি গূঢ় রহস্য ছিল এই যে, তার পশ্চাৎ দিকটি ফেরেস্তাদের হাঁটার জন্য রক্ষিত হতো। হাদীসটিতে বলা হয়েছে, নবী -এর পশ্চাদদিকে ফেরেস্তাগণ হাঁটেন। উভয় বর্ণনার মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। একটি কাজের পেছনে একাধিক রহস্য বিদ্যমান থাকা বিচিত্র নয়। বিশেষত নবী -এর কাজকর্মসমূহ অগণিত হিকমত ও রহস্যপূর্ণ ছিল। আর তিনি শ্রেষ্ঠ নবী হিসাবে এমনটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়।
৪. নবী -এর নিয়ম ছিলো তিনি যখনই কারোর সাক্ষাতে যেতেন তখন সালাম দানে নিজেই অগ্রবর্তী থাকতেন। মহান আল্লাহ্ এ মহান নবী ﷺ ও তাঁর বংশধরের প্রতি অগণিত ও অসংখ্য দরূদ ও সালাম নাযিল করুন। আমীন!
۲۱۲. عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ يُسْرِ صَاحِبُ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا أَتَى الْمَنْزِلَ لَمْ يَأْتِهِ مِنْ قَبْلِ الْبَابِ وَلَكِنْ يَأْتِيهِ مِنْ قِبْلِ جَانِبُهِ حَتَّى يَسْتَأْذِنَ -
২১২. নবী -এর সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন বুস্র (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কারো বাড়ি যেতেন তখন দরজার ঠিক সম্মুখে দাঁড়াতেন না বরং এক পার্শ্বে দাঁড়াতেন। (যেন অজান্তে গৃহবাসীদের উপর দৃষ্টি পতিত না হয়) আর অনুমতি পাওয়া ব্যতিরেকে গৃহে প্রবেশ করতেন না।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস হলো অনুমতি চাওয়া বিষয়ক। রাসূলুল্লাহ্ -এর নীতি ছিলো তিনি যখন কারোর বাড়ি যেতেন তখন সতর্কতা অবলম্বনের জন্য সেই বাড়ির দরজা বরাবর হয়ে প্রবেশ করতেন না, বরং এক পার্শ্ব বরাবরে প্রবেশ করতেন। উদ্দেশ্য ছিলো যেন অজান্তে গৃহবাসীদের উপর তার দৃষ্টি গিয়ে না পড়ে। তারপর গৃহকর্তার পক্ষ থেকে অনুমতি লাভের পর তিনি গৃহে প্রবেশ করতেন। আলোচ্য হাদীসে আরো বলা হয়েছে যে, তিনি 'আস্সালামু আলাইকুম' বলে প্রবেশ করতেন। তিনি এ সালামকেও একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করে বলতেন, যেন ঘরের লোকজন তা ভালভাবে শুনতে পায়।
কারোর গৃহে প্রবেশ করার পূর্বে অনুমতি নেয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে অত্যাবশ্যক। অনুমতি ব্যতীত কারো গৃহে প্রবেশ জায়েয নয়। অবশ্য নিজের ঘরে যখন অপর কোন গায়র মুহাররাম মহিলা নেই বলে নিশ্চিতভাবে জানা থাকে তখন অনুমতি ব্যতিরেকে প্রবেশ করতে কোন আপত্তি নেই। এতদসত্ত্বেও উত্তম হলো নিজের ঘরেও অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করা।
দ্বিতীয়ত: ঘরে প্রবেশ করার সময় 'আস্সালামু আলাইকুম' বলা চাই। এটি ঘরে উপস্থিতদের জন্য সালামতী ও নিরাপত্তার একটি দু'আ। অপরের গৃহে প্রবেশের জন্য তিনবার পর্যন্ত অনুমতি প্রার্থনা করা যেতে পারে। তৃতীয়বারেও যদি কোন উত্তর না পাওয়া যায় কিংবা অনুমতি না মিলে তখন ফিরে আসা চাই।
۲۱۳. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ أَبْوَابُ النَّبِيِّ تُقَرَّعُ بِالْأَطْفَارِ -
২১৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর গৃহের দরজাগুলিতে আঙ্গুলের অগ্রভাগ দ্বারা টোকা দেওয়া হতো।
ফায়দা: এ হাদীস দ্বারা ঘরের দরজায় টোকা দেয়ার নীতি সম্পর্কে জানা যায়। ঘরের দরজায় টোকা দেওয়ার সময় ভারসাম্য বজায় রাখা আবশ্যক। জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দেওয়া কিংবা আঘাত করা ভদ্রতা ও আদবের খেলাফ। তাতে গৃহবাসী লোকজনের মনকষ্ট হয়ে থাকে। টোকা দেওয়ার উত্তম পদ্ধতি হলো আগন্তুক প্রথমে মুখে আওয়াজ করবে। আওয়াজ ঘরের ভিতর পর্যন্ত না পৌঁছার আশংকা থাকলে সেখানে আস্তে আস্তে টোকা দিবে।
٢١٤ . عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ أَنَّهُ سَمِيعَ أَبَا ذَرِّ يَصِفُ النَّبِيُّ ﷺ قَالَ كَانَ يَطَأُ بِقَدَمَيْهِ لَيْسَ لَهُ أَخْمَصَ يَقْبُلُ جَمِيعًا وَيَدْبُرُ جَمِيعًا ، لَمْ أَرَمِثْلَهُ -
২১৪. হযরত সাঈদ ইব্ন মুসাইয়্যাব (রা) বলেন, তিনি হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-কে নবী-এর নিয়ম-নীতি ও গুণাবলি বর্ণনা করতে শুনেছেন যে, নবী তাঁর পা যুগল উপরে তুলে এভাবে হাঁটতেন যেন তাঁর পায়ের কোন তালুই ছিলো না। তিনি (সামনে অগ্রসর হতে চাইলে) পূর্ণভাবে অগ্রসর হতেন। আবার (পেছনের দিকে যেতে ইচ্ছা করলে) পূর্ণভাবে পেছনে সরে যেতেন। আমি কখনো তাঁর মত কোন মানুষকে দেখিনি।
ফায়দা: পা তুলে হাঁটার অর্থ হলো তিনি মাটির উপর পা স্থাপন করতেন। কিন্তু স্থাপনের পর কোনরূপ বিলম্ব না করেই তৎক্ষণাৎ এমনভাবে পা তুলে নিতেন যে, মনে হতো পায়ের তালুদ্বয়কে মাটিতে পূর্ণভাবে স্পর্শ করতেই দেননি। আসলে তাঁর পায়ের তালু (মাটি থেকে) সামান্য উপরে উঠা অবস্থায় থাকতো। এটিও এক ধরনের পৌরুষ সুলভ সৌন্দর্য।
٢١٥ عَنْ أَبِي الطُّفَيْلِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَمْشِي فِي صُبُوب -
২১৫. হযরত আবূ তুফায়েল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন হাঁটতেন তখন মনে হতো তিনি কোন ঢালু ভূমিতে হাঁটছেন।
ফায়দা: আলোচ্য হাদীসের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা অনুচ্ছেদের শুরুভাগে আলোচিত হয়েছে। নবী-এর পবিত্র সত্তা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছিলো দিব্যি মুজিযাপূর্ণ। এ জন্য তাঁর পথ চলার নীতির মধ্যেও অতিপ্রকৃত বিষয়ের ন্যায় কতিপয় অলৌকিক পদ্ধতি বিদ্যমান ছিলো। যেমন :
এক, তিনি কিছুটা দ্রুতবেগে হাঁটতেন। অথচ তিনি দ্রুতবেগে হাঁটার মোটেই ইচ্ছা করতেন না। এদিকে সাহাবীদের অবস্থা ছিলো নবী -এর সঙ্গে দ্রুতগতিতে হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা হাঁপিয়ে পড়তেন। আর এ কারণেই তিনি নিজে সাহাবীদের পেছনে হাঁটতেন যেন তাঁরা নবী -এর সঙ্গ থেকে পেছনে দূরে রয়ে না যান।
দুই, তিনি সম্মুখের দিকে ঝুঁকে দৃঢ় পদে একজন পুরুষের ন্যায় হাঁটতেন। মাটির উপর পায়ের তালুর স্পর্শ লাগতে দিতেন না। এমন কি হযরত আবূ যার গিফারী (রা) তাঁর বর্ণনায় বলেন, لَيْسَ لَهُ أَخْمَصَ প্রিয় নবী -এর পায়ের তালু ছিলোই না। বর্ণিত রহস্যটি সম্মুখে না রাখা হলে নবী -এর হাঁটা সম্পর্কীয় উভয় উক্তির মাঝে সমন্বয় সৃষ্টি করা জটিল হবে। এ কারণেই হযরত আবূ যার (রা) আরো বলেন, لَمْ أَرَى مِثْلَهُ আমি তাঁর ন্যায় কোন মানুষকে দেখিনি।
তিন, তিনি সমতল ভূমিতে এভাবে হাঁটতেন যেন কোনো ঢালু যমীন দিয়ে নিচের দিকে অবতরণ করছেন। উপরোক্ত রহস্য জানা না থাকলে পথ চলার এই অলৌকিক পদ্ধতিটিও হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন। এ কারণে হযরত আলী (রা) স্পষ্টভাবে বলতে বাধ্য হন যে, لَمْ اَزَل قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلُهُ আমি নবী -এর ন্যায় পূর্বে আর না তাঁর পরে তাঁর গুণাবলীর কোনো মানুষকে দেখেছি।
কাজেই আমরাও সম্মানিত পাঠক বৃন্দের কাছে আবেদন করবো যে, নবী -এর পবিত্র আকার-আকৃতি সম্পর্কীয় হাদীসসমূহ বিশেষত তাঁর পথচলা সম্পর্কীয় হাদীসগুলি অধ্যয়ন করার সময় একথাটি অবশ্যই সামনে রাখতে হবে যে, যেভাবে তাঁর মহান সত্তা মাথা থেকে পা পর্যন্ত সবটুকু ছিলো অলৌকিক। ঠিক তেমনি তার পথ চলার বিষয়টিও ছিলো একটি অলৌকিক ব্যাপার। হযরত আলী ও হযরত আবূ যার (রা) প্রমুখ উচ্চমানের সাহাবী যাঁরা নবী -কে খুবই নিকট থেকে পর্যবেক্ষণ করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন তাঁরাও নিজেদের বক্তব্যে সেই রহস্যের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
📄 নবী (সা)-এর পথচলা এবং চলার পথে এদিক-সেদিক দৃষ্টিপাত করার নীতি
۲۰۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ كَانَ النَّبِيُّ الإِذَا مَشَى كَأَنَّهُ يَتَوَكَّا -
২০২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন পথ চলতেন তখন মনে হতো তিনি যেন (লাঠি কিংবা অন্য কোন জিনিসের উপর) ভর দিয়ে পথ চলছেন। (অর্থাৎ তিনি সম্মুখের দিকে ঝুঁকে পথ চলতেন।)
، قَالَ كَانَ رَسُولُ الله ﷺ إِذَا مَشَى تَكَفَّا - ۲۰۳ . عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ الله الله
২০৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাঁটার সময়ে রাসূলুল্লাহ্ সম্মুখের দিকে ঝুঁকে পথ চলতেন।
٢٠٤ عَنْ عَاصِمِ بْنِ لَقِيْطِ بْنِ صَبُرَةَ عَنْ أَبِيْهِ أَنَّهُ أَتَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا هُوَ وَصَاحِبُ يَطْلُبَانِ النَّبِيُّ الله فَلَمْ يَجِدَاهُ فَلَمْ يَنْشَبْ أَنْ جَاءَ النَّبِيُّ يَتَقَلْعُ يَتَكَفَّ -
২০৪. হযরত আসিম ইব্ন লাকীত ইব্ন সাবুরা (রা) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি (হযরত আসিমের পিতা) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর খেদমতে উপস্থিত হন। এ সময় তিনি ও তাঁর এক সাথী উভয়ে নবী -কে খুঁজছিলেন। কিন্তু তারা নবী -কে উপস্থিত পাননি। তারা কিছুক্ষণ পরেই নবী এমন অবস্থায় আগমন করলেন যেন তিনি (মাটিতে পা টেনে চলার পরিবর্তে) মাটি থেকে পা তুলে তুলে সম্মুখের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে হাঁটছেন।
٢٠٥ . عَنْ أَبِي عِنَبَةَ الْخَوْلَانِيَّ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى أَقْلَعَ -
২০৫. হযরত আবূ ইনাবা খাওলানী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন হাঁটতেন তখন মাটি থেকে সবলে পা তুলে তুলে হাঁটতেন।
٢٠٦ . عَنْ عَلِيٍّ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى تَكَفَّأُ تَكَفِّيًا كَأَنَّمَا يَتَقَلَّعُ مِنْ صَبَبٍ لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ الصَّبَبُ الْمُنْحَدِرُ مِنَ الْأَرْضِ -
২০৬. হযরত আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিয়ম ছিলো তিনি যখন পথ চলতেন তখন সম্মুখের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে চলতেন। (আপাত দৃষ্টিতে মনে হতো) তিনি যেন সবলে পা উত্তোলন পূর্বক ঢালু জায়গা দিয়ে অবতরণ করছেন। আমি তাঁর মত (গুণাবলি সম্পন্ন) মানুষ না পূর্বে কখনো দেখেছি আর না পরে। আরবী ভাষায় 'الصبب.' শব্দের অর্থ হলো ঢালুভূমি।
۲۰۷ . عَنْ رَبِيعَةَ قَالَ دَخَلْنَا عَلَى أَنَسِ بْنِ مَالِكَ فَسَأَلْنَا عَنْ صِفَةِ النَّبِيِّ فَقَالَ كَانَ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَمْشِي فِي صَبَب -
২০৭. হযরত রাবীয়া (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা হযরত আনাস ইব্ন মালিক (রা)-এর দরবারে গেলাম এবং তাঁকে নবী -এর অনুপম গুণাবলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন পথ চলতেন তখন তিনি যেন কোনো ঢালু ভূমি দিয়ে চলছেন। (অর্থাৎ চলার পথে তাঁর হাঁটার গতি ছিল কিছুটা দ্রুত।)
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসসমূহে নবী -এর পথ চলার নিয়মনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। এ সকল হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, তাঁর পথ চলার মধ্যে তিন ধরনের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিলো :
এক. তিনি নম্রতা অবলম্বনের লক্ষ্যে সম্মুখের দিকে ঝুঁকে চলতেন। অহংকারসুলভ বুকটান করে হাঁটতেন না। (তবে যুদ্ধের ময়দানে মুজাহিদগণের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। কেননা তাদের ব্যাপারে নির্দেশ হলো কাফিরদের মুকাবিলায় বিনয় ও নম্রতার প্রকাশ নয়; বরং নিজেদের শক্তি, বীরত্ব ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার প্রকাশ করা আবশ্যক।)
দুই. নবী পথ চলার সময় মাটি থেকে পা তুলে তুলে সবল পুরুষের মত হাঁটতেন। অলস ও খোঁড়ার মত মাটিতে পা টেনে চলতেন না। কেননা এটি অপছন্দনীয় ও দোষের।
তিন. তিনি তুলনামূলকভাবে দ্রুত চলতেন। খুব ধীর গতিতে অলসের মত কিংবা মেয়েলি চলন তাঁর ছিলো না।
দীন ইসলামের হেফাযতকারীগণ যেভাবে নবী-এর অন্যান্য গুণ, বৈশিষ্ট্য, নীতি ও চরিত্রের আমলী সংরক্ষণ করেছেন তদ্রূপ তাঁর চাল-চলন ও হাঁটার পদ্ধতিও তাঁরা যথার্থভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তাঁরা নবী এর ছোট থেকে ছোট কোন গুণ কিংবা কোন অভ্যাসকে উপেক্ষা করেননি। বস্তুত এটি সাহাবায়ে কিরামের এমন এক কৃতিত্ব যার উপমা ইতিহাসের কোনো কালেও দেখা যায় না। এটি নবী-এর শেষ নবী হওয়ার এত প্রকৃষ্ট দলীল যা কেউই অস্বীকার করতে পারে না। অর্থাৎ যে ভাবে রাসূলুল্লাহ্-এর রিসালাত ও নবুওয়াতের যাবতীয় বিষয় কিয়ামত পর্যন্ত সময়কালের জন্য সংরক্ষিত হয়ে আছে, সেভাবে তাঁর আকার-আকৃতি, চাল-চলন, উঠা-বসা ইত্যাদির পদ্ধতিও যথাযথভাবে সংরক্ষিত। আর এভাবেই অনাগত ভবিষ্যত বংশধরের জন্য নবী-এর মহান সত্তা একটি সমুজ্জ্বল আদর্শ হয়ে অটুট থাকবে।
۲۰۸. عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ إِذَا خَرَجَ مَشَى أَصْحَابُهُ أَمَامَهُ وَتَرَكُوا ظَهْرَهُ لِلْمَلَائِكَةِ -
২০৮. হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন বাড়ির বাহির হতেন তখন সাহাবায়ে কিরাম তাঁর আগে আগে চলতেন। তাঁরা নবী -এর পশ্চাৎদিক ফেরেস্তাগণের চলার জন্য ছেড়ে দিতেন।
ফায়দা : অন্যান্য হাদীসে বলা হয়েছে যে, নবী-এর সঙ্গে ফেরেস্তাগণও হেঁটে থাকেন। এ ফেরেস্তাগণ হাঁটতেন নবী-এর পেছনে পেছনে। এ কারণেই সাহাবীগণ বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখতেন এবং নিজেরা তাঁর পশ্চাৎ দিকে হাঁটতেন না। বরং পশ্চাৎ দিকটি ফেরেস্তাগণের জন্য ছেড়ে দিয়ে নিজেরা আগে আগে হাঁটতেন। তাছাড়া আরো কতিপয় হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী নম্রতা ও বিনয় অবলম্বনের লক্ষ্যেও নিজে লোকজনের আগে আগে চলাকে পছন্দ করতেন না। বরং নিজে পেছনে থেকে সাহাবীদেরকে আগে আগে চলতে দিতেন।
۲۰۹. عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَانَ إِذَا مَشَى مَشَى مَشْيَا مُجْتَمِعًا لَيْسَ فِيْهِ كَسْلٌ -
২০৯. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ যখন হাঁটতেন তখন পা তুলে সবল পুরুষের মত হাঁটতেন। তাঁর হাঁটার মধ্যে কোনরূপ আলস্য ও কুঁড়েমির লেশমাত্রও ছিল না।
٢١٠. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كُنَّا إِذَا آتَيْنَا النَّبِيَّ ﷺ جَلَسْنَا خَلْفَهُ -
২১০. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যখন নবী -এর দরবারে উপস্থিত হতাম তখন আমরা তাঁর পেছনে বসে যেতাম।
٢١١. عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ سَأَلْتُ هِنْدَ ابْنَ أَبِي هَالَةَ عَنْ مَشْيِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ كَانَ يَمْشِي تَكَفَّيًا وَيَخْطُوْ هَوْنًا ذَرِيعَ الْمَشْيَةِ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَتَصَبَّبُ أَوْ يَمْشِي فِي صَبَبِ إِذَا الْتَفَتَ الْتَفَتَ جَمِيْعًا، خَافِضَ الطَّرْفِ نَظْرُهُ إِلَى الْأَرْضِ أَكْثَرُ مِنْ نَظْرِهِ إِلَى السَّمَاءِ جُلُّ نَظَرِهِ الْمُلَاحَظَةُ يَسُوقُ أَصْحَابَهُ وَيَبْدَا مَنْ لَقِيَهُ بِالسَّلَام -
২১১. হযরত হাসান ইব্ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত হিন্দ ইব্ন আবূ হালা (রা)-এর কাছে নবী-এর পথচলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী সামান্য ঝুঁকে পথ চলতেন। গাম্ভীর্য ও ঔদার্য রক্ষাপূর্বক তিনি পা তুলতেন। তাঁর পথ চলায় ঈষৎ দ্রুততা ছিলো। চলার সময় মনে হতো তিনি যেন ঢালু ভূমি দিয়ে অবতরণ করছেন। কিংবা বর্ণনাকারী বলেছেন, তিনি যেন কোনো ঢালু ভূমিতে হাঁটছেন। এভাবে তিনি যখন কারোর দিকে দৃষ্টিপাত করতেন তখন সম্পূর্ণভাবে তার দিকে ফিরে তিনি দৃষ্টিপাত করতেন। (পথ চলার সময়) তাঁর চোখের দৃষ্টি যমীনের দিকে অবনমিত থাকতো। এ জন্য আসমানের দিকে তাকানো অপেক্ষা যমীনের দিকে তাঁর দৃষ্টি অধিক থাকতো। অধিকাংশ সময় তিনি চোখের পার্শ্বদেশ দিয়ে তাকাতেন। (লজ্জাশীলতার কারণে) পূর্ণচোখে তাকানো পছন্দ করতেন না। পথচলার সময় সাহাবীদেরকে এভাবে আগে আগে হাঁটতে দিতেন যেন নিজে পেছন থেকে তাদের পরিচালনা করছেন। পথিমধ্যে কারো সঙ্গে দেখা হলে সর্বাগ্রে তিনিই সালাম দিতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসেও নবী-এর পথচলার নীতি আলোচনা করা হয়েছে। পূর্বে উল্লেখিত হাদীসের তুলনায় আলোচ্য হাদীসে কতিপয় অতিরিক্ত গুণের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমনঃ
১. নবী অধিকাংশ সময় চোখের দৃষ্টি অবনমিত করে রাখতেন। এদিক সেদিক তাকাতেন না। সাধারণত মাটির দিকেই পতিত থাকতো তাঁর দৃষ্টি। কখনো কখনো আকাশের দিকে দৃষ্টি তুলে তাকাতেন কিন্তু তা ছিলো ওহী লাভের অপেক্ষায়।
২. তিনি যখন কারোর দিকে তাকাতেন তখন অতিশয় লজ্জাশীলতার কারণে কখনো পূর্ণচোখে তাকাতেন না। বরং একপার্শ্ব দিয়ে তাকাতেন।
৩. তিনি যেহেতু কিছুটা দ্রুত চলতেন তাই সাহাবীদেরকে নিজের সামনে হাঁটতে দিতেন। ফলে তারাও যেন সমান্তরালে দ্রুত চলেন এবং তাদের কেউ যেন পিছিয়ে না পড়েন। সাথে সাথে এ ভাবে পেছনে চলার মধ্যে নিজের নম্রতা ও বিনয়ের প্রকাশও উদ্দেশ্য ছিল। দাম্ভিক ও অহংকারীদের ন্যায় সকলের আগে আগে চলাকে তিনি পছন্দ করতেন না। অপর হাদীসে বলা হয়েছে যে, সাহাবীগণ নবী -এর আগে আগে চলার মধ্যে আরো একটি গূঢ় রহস্য ছিল এই যে, তার পশ্চাৎ দিকটি ফেরেস্তাদের হাঁটার জন্য রক্ষিত হতো। হাদীসটিতে বলা হয়েছে, নবী -এর পশ্চাদদিকে ফেরেস্তাগণ হাঁটেন। উভয় বর্ণনার মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। একটি কাজের পেছনে একাধিক রহস্য বিদ্যমান থাকা বিচিত্র নয়। বিশেষত নবী -এর কাজকর্মসমূহ অগণিত হিকমত ও রহস্যপূর্ণ ছিল। আর তিনি শ্রেষ্ঠ নবী হিসাবে এমনটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়।
৪. নবী -এর নিয়ম ছিলো তিনি যখনই কারোর সাক্ষাতে যেতেন তখন সালাম দানে নিজেই অগ্রবর্তী থাকতেন। মহান আল্লাহ্ এ মহান নবী ﷺ ও তাঁর বংশধরের প্রতি অগণিত ও অসংখ্য দরূদ ও সালাম নাযিল করুন। আমীন!
۲۱۲. عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ يُسْرِ صَاحِبُ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا أَتَى الْمَنْزِلَ لَمْ يَأْتِهِ مِنْ قَبْلِ الْبَابِ وَلَكِنْ يَأْتِيهِ مِنْ قِبْلِ جَانِبُهِ حَتَّى يَسْتَأْذِنَ -
২১২. নবী -এর সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন বুস্র (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কারো বাড়ি যেতেন তখন দরজার ঠিক সম্মুখে দাঁড়াতেন না বরং এক পার্শ্বে দাঁড়াতেন। (যেন অজান্তে গৃহবাসীদের উপর দৃষ্টি পতিত না হয়) আর অনুমতি পাওয়া ব্যতিরেকে গৃহে প্রবেশ করতেন না।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস হলো অনুমতি চাওয়া বিষয়ক। রাসূলুল্লাহ্ -এর নীতি ছিলো তিনি যখন কারোর বাড়ি যেতেন তখন সতর্কতা অবলম্বনের জন্য সেই বাড়ির দরজা বরাবর হয়ে প্রবেশ করতেন না, বরং এক পার্শ্ব বরাবরে প্রবেশ করতেন। উদ্দেশ্য ছিলো যেন অজান্তে গৃহবাসীদের উপর তার দৃষ্টি গিয়ে না পড়ে। তারপর গৃহকর্তার পক্ষ থেকে অনুমতি লাভের পর তিনি গৃহে প্রবেশ করতেন। আলোচ্য হাদীসে আরো বলা হয়েছে যে, তিনি 'আস্সালামু আলাইকুম' বলে প্রবেশ করতেন। তিনি এ সালামকেও একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করে বলতেন, যেন ঘরের লোকজন তা ভালভাবে শুনতে পায়।
কারোর গৃহে প্রবেশ করার পূর্বে অনুমতি নেয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে অত্যাবশ্যক। অনুমতি ব্যতীত কারো গৃহে প্রবেশ জায়েয নয়। অবশ্য নিজের ঘরে যখন অপর কোন গায়র মুহাররাম মহিলা নেই বলে নিশ্চিতভাবে জানা থাকে তখন অনুমতি ব্যতিরেকে প্রবেশ করতে কোন আপত্তি নেই। এতদসত্ত্বেও উত্তম হলো নিজের ঘরেও অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করা।
দ্বিতীয়ত: ঘরে প্রবেশ করার সময় 'আস্সালামু আলাইকুম' বলা চাই। এটি ঘরে উপস্থিতদের জন্য সালামতী ও নিরাপত্তার একটি দু'আ। অপরের গৃহে প্রবেশের জন্য তিনবার পর্যন্ত অনুমতি প্রার্থনা করা যেতে পারে। তৃতীয়বারেও যদি কোন উত্তর না পাওয়া যায় কিংবা অনুমতি না মিলে তখন ফিরে আসা চাই।
۲۱۳. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ أَبْوَابُ النَّبِيِّ تُقَرَّعُ بِالْأَطْفَارِ -
২১৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর গৃহের দরজাগুলিতে আঙ্গুলের অগ্রভাগ দ্বারা টোকা দেওয়া হতো।
ফায়দা: এ হাদীস দ্বারা ঘরের দরজায় টোকা দেয়ার নীতি সম্পর্কে জানা যায়। ঘরের দরজায় টোকা দেওয়ার সময় ভারসাম্য বজায় রাখা আবশ্যক। জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দেওয়া কিংবা আঘাত করা ভদ্রতা ও আদবের খেলাফ। তাতে গৃহবাসী লোকজনের মনকষ্ট হয়ে থাকে। টোকা দেওয়ার উত্তম পদ্ধতি হলো আগন্তুক প্রথমে মুখে আওয়াজ করবে। আওয়াজ ঘরের ভিতর পর্যন্ত না পৌঁছার আশংকা থাকলে সেখানে আস্তে আস্তে টোকা দিবে।
٢١٤ . عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ أَنَّهُ سَمِيعَ أَبَا ذَرِّ يَصِفُ النَّبِيُّ ﷺ قَالَ كَانَ يَطَأُ بِقَدَمَيْهِ لَيْسَ لَهُ أَخْمَصَ يَقْبُلُ جَمِيعًا وَيَدْبُرُ جَمِيعًا ، لَمْ أَرَمِثْلَهُ -
২১৪. হযরত সাঈদ ইব্ন মুসাইয়্যাব (রা) বলেন, তিনি হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-কে নবী-এর নিয়ম-নীতি ও গুণাবলি বর্ণনা করতে শুনেছেন যে, নবী তাঁর পা যুগল উপরে তুলে এভাবে হাঁটতেন যেন তাঁর পায়ের কোন তালুই ছিলো না। তিনি (সামনে অগ্রসর হতে চাইলে) পূর্ণভাবে অগ্রসর হতেন। আবার (পেছনের দিকে যেতে ইচ্ছা করলে) পূর্ণভাবে পেছনে সরে যেতেন। আমি কখনো তাঁর মত কোন মানুষকে দেখিনি।
ফায়দা: পা তুলে হাঁটার অর্থ হলো তিনি মাটির উপর পা স্থাপন করতেন। কিন্তু স্থাপনের পর কোনরূপ বিলম্ব না করেই তৎক্ষণাৎ এমনভাবে পা তুলে নিতেন যে, মনে হতো পায়ের তালুদ্বয়কে মাটিতে পূর্ণভাবে স্পর্শ করতেই দেননি। আসলে তাঁর পায়ের তালু (মাটি থেকে) সামান্য উপরে উঠা অবস্থায় থাকতো। এটিও এক ধরনের পৌরুষ সুলভ সৌন্দর্য।
٢١٥ عَنْ أَبِي الطُّفَيْلِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَمْشِي فِي صُبُوب -
২১৫. হযরত আবূ তুফায়েল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন হাঁটতেন তখন মনে হতো তিনি কোন ঢালু ভূমিতে হাঁটছেন।
ফায়দা: আলোচ্য হাদীসের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা অনুচ্ছেদের শুরুভাগে আলোচিত হয়েছে। নবী-এর পবিত্র সত্তা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছিলো দিব্যি মুজিযাপূর্ণ। এ জন্য তাঁর পথ চলার নীতির মধ্যেও অতিপ্রকৃত বিষয়ের ন্যায় কতিপয় অলৌকিক পদ্ধতি বিদ্যমান ছিলো। যেমন :
এক, তিনি কিছুটা দ্রুতবেগে হাঁটতেন। অথচ তিনি দ্রুতবেগে হাঁটার মোটেই ইচ্ছা করতেন না। এদিকে সাহাবীদের অবস্থা ছিলো নবী -এর সঙ্গে দ্রুতগতিতে হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা হাঁপিয়ে পড়তেন। আর এ কারণেই তিনি নিজে সাহাবীদের পেছনে হাঁটতেন যেন তাঁরা নবী -এর সঙ্গ থেকে পেছনে দূরে রয়ে না যান।
দুই, তিনি সম্মুখের দিকে ঝুঁকে দৃঢ় পদে একজন পুরুষের ন্যায় হাঁটতেন। মাটির উপর পায়ের তালুর স্পর্শ লাগতে দিতেন না। এমন কি হযরত আবূ যার গিফারী (রা) তাঁর বর্ণনায় বলেন, لَيْسَ لَهُ أَخْمَصَ প্রিয় নবী -এর পায়ের তালু ছিলোই না। বর্ণিত রহস্যটি সম্মুখে না রাখা হলে নবী -এর হাঁটা সম্পর্কীয় উভয় উক্তির মাঝে সমন্বয় সৃষ্টি করা জটিল হবে। এ কারণেই হযরত আবূ যার (রা) আরো বলেন, لَمْ أَرَى مِثْلَهُ আমি তাঁর ন্যায় কোন মানুষকে দেখিনি।
তিন, তিনি সমতল ভূমিতে এভাবে হাঁটতেন যেন কোনো ঢালু যমীন দিয়ে নিচের দিকে অবতরণ করছেন। উপরোক্ত রহস্য জানা না থাকলে পথ চলার এই অলৌকিক পদ্ধতিটিও হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন। এ কারণে হযরত আলী (রা) স্পষ্টভাবে বলতে বাধ্য হন যে, لَمْ اَزَل قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلُهُ আমি নবী -এর ন্যায় পূর্বে আর না তাঁর পরে তাঁর গুণাবলীর কোনো মানুষকে দেখেছি।
কাজেই আমরাও সম্মানিত পাঠক বৃন্দের কাছে আবেদন করবো যে, নবী -এর পবিত্র আকার-আকৃতি সম্পর্কীয় হাদীসসমূহ বিশেষত তাঁর পথচলা সম্পর্কীয় হাদীসগুলি অধ্যয়ন করার সময় একথাটি অবশ্যই সামনে রাখতে হবে যে, যেভাবে তাঁর মহান সত্তা মাথা থেকে পা পর্যন্ত সবটুকু ছিলো অলৌকিক। ঠিক তেমনি তার পথ চলার বিষয়টিও ছিলো একটি অলৌকিক ব্যাপার। হযরত আলী ও হযরত আবূ যার (রা) প্রমুখ উচ্চমানের সাহাবী যাঁরা নবী -কে খুবই নিকট থেকে পর্যবেক্ষণ করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন তাঁরাও নিজেদের বক্তব্যে সেই রহস্যের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।