📄 বিনয়ের জন্য শায়েখের সহচার্য
অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দমন-নিপীড়ন ছাড়া বিনয় সৃষ্টি হয় না। মানুষের মাথায় খন্নাস বাসা বেঁধে আছে। সে খন্নাস হলো এই যে, মানুষ নিজ মতকে শ্রেষ্ঠ গণ্য করে। নিজ চিন্তাকে নির্ভুল মনে করে। ভাবে আমি যা চিন্তা করি তাই সঠিক। অন্যের চিন্তা-ভাবনা সব ভুল। নিজেকে সঠিক মনে করার এ খন্নাস যতক্ষণ দূর না হবে, ততক্ষণ আত্মশুদ্ধি সম্ভব নয়। এটা দূর করতে হলে নিজেকে এমন কারো হাতে সমর্পণ করতে হবে, যার কাছে পাওয়া যাবে নিজেকে মিটিয়ে দেয়ার তা'লীম। যেখানে ভাবনার গতি উল্টে যাবে। ভাববে, আমি যা চিন্তা করি তা ভুল। তিনি যা চিন্তা করেন তাই সঠিক। তাতে আমার চোখে তার চিন্তা-ভাবনা যতই বেঠিক মনে হোক না কেন। এমনকি দলিল-প্রমাণ ও স্পষ্ট বুদ্ধি-বিবেচনারও পরিপন্থী মনে হোক না কেন। নিজেকে তার হাতে সমর্পণ করতে হবে। বলতে হবে আমি সর্বাবস্থায় আপনার কথা মেনে চলবো। তাতে সে কথা আমার বুঝ-বুদ্ধির যত বিপরীতই মনে হোক না কেন। যতক্ষণ পর্যন্ত এভাবে নিজ চিন্তা-ভাবনাকে বিলীন করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকাব্বুর খতম হবে না এবং তাওয়াযু জন্ম নেবে না।
📄 হযরত শায়খুল হাদীস রহ.-এর নসীহত
আল্লাহ তায়ালা হযরত শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ.-কে আখেরাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমার শ্রদ্ধেয় পিতা হযরত মুফতি মুহাম্মাদ শফী রহ.-এর ইন্তিকাল হয়ে গেলে তিনি আমাকে ও আমার ভাই হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মাদ রফী উছমানীকে সমবেদনা জানিয়ে দীর্ঘ একখানি চিঠি লেখেন। তাতে তিনি আমাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে নসীহত করেন। তার মধ্যে একটা নসীহত ছিল এরকম 'আমি আমার বুযুর্গদের মুখে শুনেছি, সাহেবযাদাত্বের শূকর (মন-মস্তিষ্ক থেকে) বের হতে অনেক দিন লাগে'।
অর্থাৎ কোন ব্যক্তির পুত্র হওয়ার কারণে মন-মস্তিষ্কে এক ধরনের খন্নাস জন্ম নেয়। তাকেও তিনি শূকর শব্দে ব্যক্ত করেছেন। এই খন্নাস হলো, অহমিকা। এ শূকর বের হয় অনেক দেরিতে। অর্থাৎ অন্যান্য রোগের চিকিৎসা অল্পতেই হয়ে যায়, কিন্তু এ রোগের চিকিৎসা সময় লাগে।
যা হোক হযরত শায়खুল হাদীস রহ. সেই পত্রের মাধ্যমে এই রোগের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং কিভাবে এর এলাজ হতে পারে সেই দিকে মনোযোগী হতে উৎসাহ দেন। তারপর বলেন, 'কেউ যখন নিজেকে কারো সামনে ফানা করে (মিটিয়ে) দেয় এবং নফসের উপর দমন-নিপীড়ন চালায়, তারপরেই এ রোগ দূর হয়। এটা দূর না হওয়া পর্যন্ত উন্নতির পথ উন্মুক্ত হয় না।
📄 জ্ঞানের ‘শূকর’ বের হতে সময় লাগে
অনুরূপ জ্ঞানের শূকর আছে। তা হচ্ছে আমি জ্ঞানী, আমি একজন আলেম এই অহমিকা। এটাও অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটাও অনেক দেরিতে দূর হয়। নিজেকে অন্য কারো সামনে ফানা করে না দেয়া পর্যন্ত এটা বের হয় না। কারো মধ্যে এই দুই শূকর একত্র হয়ে গেলে তার তো মহা বিপদ। ইলম বা জ্ঞানও অর্জন করেছে, আবার সাহেবজাদাও আছে। এ দুইয়ের গৌরব যাকে পেয়ে বসে তার চিকিৎসা সহজ নয়। তাকে অবশ্যই কারো হাতে দলন-নিপীড়ন সহ্য করতে হবে এবং নিজেকে তাঁর পায়ে পিষ্ট করতে হবে। মাওলানা রূমী রহ. বলেন,
قال را بگزار مرد حال شو
پیش مرد کا ملے پامال شو
‘কথা বলা ছাড়, ভাবের মানুষ হও। দলিত হয়ে যাও কোন কামেল ব্যক্তির পায়ে’।
কামেল ব্যক্তির পায়ে দলিত পিষ্ট হওয়ার অর্থ হলো, নিজেকে তাঁর কাছে সমর্পণ করা এবং তিনি যখন যা বলেন তা করতে থাকা। তাতে তাঁর কথা বুঝে আসুক বা নাই আসুক। এমনকি বোধ-বুদ্ধির পরিপন্থীই মনে হোক না কেন। সর্বাবস্থায় তাঁর কথা এমনভাবে মেনে চলবে, যেন তোমাকে পা দ্বারা পিষ্ট করা হচ্ছে। এরকম না হওয়া পর্যন্ত মন-মস্তিস্ক থেকে এ শূকর কখনো বের হওয়ার নয়। তাকাব্বুর ও অহঙ্কার দূর হওয়ার নয়।
তাকাব্বুর যতদিন মন-মস্তিস্কে সাওয়ার থাকবে, ততদিন এর পাশাপাশি হিংসা, বিদ্বেষ, গীবত, পরশ্রীকাতরতা, ক্রোধ সবই থাকবে। আর যখন এ ব্যাধি দূর হবে এবং বিনয় জন্ম নেবে, তখন এসব রোগও চলে যাবে।
গীবত হয়ে গেলে তার ক্ষতিপূরণ
তাওয়াযু ও বিনয় রাতারাতি জন্ম নেয় না। এর জন্য মেহনত ও অনুশীলনের প্রয়োজন। কামেল শায়েখের সাহচর্য অবলম্বনের জরুরী। তারপরই এ গুণ অর্জিত হয়। এ কারনেই হযরত থানভী রহ. বলেন, যতদিন পর্যন্ত তাওয়াযু অর্জিত না হবে, ততদিন প্রতিটি কথা চিন্তা-ভাবনা করে বলবে। যা মুখে আসবে তাই বলে ফেলবে না। তারপরও যদি কখনো গীবত হয়ে যায়, তবে নিজের উপর জরিমানা আরোপ করবে। পূর্বে একটা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। তা ছিল একবেলা না খেয়ে থাকা। এ স্থলে আরেক জরিমানার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, তাওবার নিয়তে দুই রাকআত নামায পড়ে নিবে। ইনশাআল্লাহ এভাবে ক্রমান্বয়ে রোগের অবসান ঘটবে।