📄 গাইরত বলতে কী বোঝায়?
গাইরত (غيرة) শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ—আন্তরিক পরিবর্তন বা অন্তরে জেগে ওঠা ক্রোধ।' তবে সাধারণত শাব্দিক অর্থে বাংলায় এটাকে আত্মগরিমা, আত্মাভিমান, আত্মসম্মানবোধ, আত্মমর্যাদাবোধ বলে। আর ইংরেজিতে 'প্রটেক্টিভ জেলাসি' বলে।
কোনো পরিভাষাই তো আর তার শাব্দিক অর্থে পুরোপুরি চেনাজানা যায় না; পারিভাষিক অর্থের প্রয়োজন হয়। তাই গাইরতের পারিভাষিক অর্থটা জেনে নিলেই ক্লিয়ার হয়ে যাবে।
প্রসিদ্ধ আরবি ভাষাবিদ নাহহাস বলেছেন, 'গাইরত হলো কোনো দায়িত্বশীল পুরুষের পক্ষ থেকে স্বীয় স্ত্রী কিংবা নিকটস্থ কন্যা-জায়াদেরকে রক্ষা করা এবং প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, যাতে কোনো নন-মাহরাম পুরুষ তাদের কাছে ভিড়তে না পারে অথবা নারীরা নন মাহরাম পুরুষদের কাউকে দেখতে না পারে।'২
ইমাম জুরজানি বলেছেন, 'গাইরত হলো নিজের একান্ত অধিকারের ক্ষেত্রে অন্যের অংশীদারত্বকে অপছন্দ করা।'৩
কাজি ইয়াজ মালিকি গাইরতের পারিভাষিক পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, 'স্বামী-স্ত্রী হলো একে-অপরের একান্তজন। এই ঐকান্তিকতার ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর অন্য নারী বা পুরুষের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে অন্তরে যে পরিবর্তন ও ক্রোধের উদ্রেক হয়; স্বামীকে অন্য নারী থেকে ফিরিয়ে রাখা এবং স্ত্রীকে অন্য পুরুষ থেকে রক্ষার যে মানসিকতা—এটাই হলো গাইরত।'৪
কাজি ইয়াজ মালিকির এ পরিচয়টিকে আরেকটু সার্বিকভাবে দিয়েছেন হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থনা ফাতহুল বারিতে। তিনি লেখেন, 'গাইরত হলো-যা কিছু একান্ত নিজের; তাতে অন্যের অংশীদারত্বের কারণে অন্তরের অবস্থার পরিবর্তন এবং ক্ষোভ জেগে ওঠা।'১
একজন মানুষের গাইরত কখন এবং কোথায় জাগ্রত হয়? এই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন স্বয়ং ইবনে হাজার আসকালানি। গাইরতের পরিচয় শেষ করতে না করতেই তিনি বলেছেন, 'মানুষের মধ্যে এই গাইরত জাগ্রত হওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে কঠিনভাবে ঘটে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে।'২
ইমাম নববি ও ইবনে হাজারের কথাকে সোজা কথায় বোঝাতে গেলে যা বলতে হয়, গাইরত মানে আত্মাভিমানবোধ, একান্ত নিজের কোনো বিষয়ে অন্যের হস্তক্ষেপজনিত মনোবেদনা এবং কারও নিরঙ্কুশ অধিকারে অন্যের ভাগ বসানোর দ্বারা সৃষ্ট মানসিক উত্তেজনা। কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীর প্রতি অন্যের আসক্তি বা কুদৃষ্টি দেখতে পায়, তখন তার ভেতর যে চিত্তচাঞ্চল্য ও ক্ষোভ সঞ্চার হয়, সেটাই গাইরত। এমনিভাবে কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীকে অন্য নারীতে আসক্ত দেখে বা তার স্বামীর প্রতি অন্য নারীর আকর্ষণ লক্ষ করে, তখন তার যে মানসিক উত্তেজনা ও বেদনাবোধ হয়, তাকেই গাইরত বলে। কারণ, তাতে স্বামীর বা স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকারে ভাগ বসানো হয়ে থাকে।
তো আশা করি বুঝতে পেরেছেন, গাইরত শব্দের আবেদন ও ব্যাপকতা কতটুকু? বাংলা ভাষায় যে গাইরতের অর্থ নেওয়া হয় আত্মসম্মান বা আত্মাভিমান কিংবা আত্মমর্যাদাবোধ, তা গাইরতের প্রতিশব্দ হিসেবে মোটামুটি উপযুক্ত হলেও 'গাইরত' শব্দের সম্পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। আত্মসম্মান বা আত্মমর্যাদাবোধ তো মানুষের অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে তাকে। কিন্তু শরিয়ার পরিভাষায় নিজের মাহরাম নারীদের বেলায় নন-মাহরাম পুরুষের সামান্য সংশ্লিষ্টতা কেন্দ্র করে পুরুষের অন্তর্জগতে যে ভাব, অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, এটাকেই গাইরত বলে। এই ব্যাপক অর্থকে বাংলা আত্মসম্মানবোধ কিংবা আত্মমর্যাদাবোধ অথবা আত্মাভিমান শব্দাবলি সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না।
গাইরতের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থের টানাপোড়েনে পড়ে এখনও যদি কেউ ঠিকমতো গাইরত শব্দের অর্থ বুঝতে না পারেন, তার জন্য আসলে এসব শাব্দিক-পারিভাষিক অর্থ বলা বেমানান। তাকে একটা উদাহরণ দিয়েই বুঝিয়ে দিতে হবে। সেই উদাহরণটাই এখানে দিচ্ছি-
যেমন ধরুন আপনি আপনার স্ত্রী (কন্যা অথবা মা কিংবা বোন বা মাহরাম কোনো নারীও হতে পারে)-কে নিয়ে কোথাও যেতে বের হয়েছেন। একটা সিএনজির পেছনে আপনারা দুইজন বসেছেন। এখনও পেছনে একটা সিট খালি। আপনি বসেছেন সিএনজির ভেতরে একেবারে ডান পাশে। এরপর আপনার স্ত্রী। তো কোথাকার একজন অপরিচিত পুরুষ যাত্রী আপনার স্ত্রীর পাশে বসে গেল। এতে করে আপনার মনের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। কোথাকার একজন অপরিচিত যাত্রী আপনার স্ত্রীর পাশে বসবে কেন—এমন একটা অস্ফুট প্রশ্ন আপনার মনোজগতের সবকিছু ওলট-পালট করে দিচ্ছে। ব্যাপারটা আপনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
তো আপনি কী করলেন; আপনি উঠে সিটের মাঝখানে বসলেন আর আপনার স্ত্রীকে দিলেন ডানপাশে। এতে করে পরপুরুষ যাত্রীর পাশে আপনিই থাকলেন, আপনার স্ত্রীকে থাকতে হলো না। আপনার স্ত্রীর পাশে একজন পরপুরুষের বসাকে কেন্দ্র করে গোপনে আপনার মনোজগতে এই যা কিছু ঘটে গেল, এটাই হলো গাইরত।
তবে এখানেও কথা আছে। আপনি যদি সত্যিই গাইরতমন্দ পুরুষ হন, তাহলে আপনি অবশ্যই আগে থেকে সতর্কতা অবলম্বন করবেন। সিএনজিতে উঠার সময়েই আপনার স্ত্রীকে একেবারে ডান পাশে কোণায় বসিয়ে আপনি তার পাশে সিটের মাঝামাঝি বসবেন। যাতে করে অন্য কোনো যাত্রী এসে আপনার পাশেই বাম পাশের সিটে বসে। আপনার স্ত্রী ও পরপুরুষের মাঝে আপনিই বাধা হয়ে থাকেন।
কেউ কেউ তো আরও একটু বেশিই গাইরতমন্দ হন। স্ত্রী কিংবা মেয়ে বা বোনকে নিয়ে সিএনজির পেছনের সিটে বসেন আর দুইজনের জায়গায় তিনজনের ভাড়া দেন। যাতে পেছনের সিটে ড্রাইভার আর কোনো যাত্রী না উঠায়। পেছনের তিন সিটের রাজ্য একমাত্র নিজেদের দখলেই থাকে। প্রাইভেট গাড়ি কিংবা পুরো সিএনজি ভাড়া করতে না পারলে ন্যূনতম এটাই করা যায়। দুইজনের ভাড়া দিতে পারলে তিনজনের ভাড়াটাও অবশ্যই আপনি দিতে পারবেন। আপনার গাইরতের কাছে নিশ্চয়ই টাকাটা বড় কিছু নয়! আর যাদের পয়সা আছে, তারা তো প্রাইভেট গাড়ি রিজার্ভ নিয়ে থাকেন।
টিকাঃ
১ আন-নিহায়া ফি গারিবিল হাদিস ওয়াল আসার: ৩/৪০১।
২ আওদাতুল হিজাব: ৩/১১৪, ড. শাইখ ইসমাইল মুকাদ্দিম।
৩ তারিফাত: ২১।
৪ মাশারিকুল আনওয়ার: ২/১৪১, কাজি ইয়াজ মালিকি।
১ ফাতহুল বারি: ৯/২৬৪, ইবনে হাজার আসকালনি
২ প্রাগুক্ত।
📄 দূরসম্পর্কের নারীর ক্ষেত্রেও গাইরত
জাহিলি যুগে শুধুমাত্র নিজের রক্ত সম্পর্কীয় কোনো নারীর ইজ্জত-আব্রু রক্ষার জন্যই পুরুষের গাইরত জেগে উঠত না; বরং রক্তের সম্পর্কের বাইরের কোনো নারীর শ্লীলতাহানি ঘটলেও সে যুগের পুরুষদের গাইরত জেগে উঠত।
বর্ণিত আছে, আরবের খাসআম গোত্রের একজন নারী ছিল খুবই সুন্দরী ও রূপসী। সুলাইক নামক এক বদমাইশ লোক সেই নারীর পাশ দিয়ে গমন করার সময় একাকী সুন্দরী নারীর ওপর তার বদনজর পড়ে। এত সুন্দর নারী দেখে সে আর নিজেকে সামলাতে পারেনি; সে নারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। জোরজবরদস্তি করে নারীকে ধর্ষণ করে নিজের পশুলিপ্সা চরিতার্থ করে।
খাসআম গোত্রের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ছিলেন আনাস বিন মুদরিকাহ। তারই গোত্রের একজন নারীর বেইজ্জতি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি ধর্ষককে ধরে এক কোপে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন! এরপর সেই হত্যার রক্তপণ তিনি নিজের গাঁটের পয়সা দিয়ে পরিশোধ করে দেন। এ প্রসঙ্গেই আনাস বিন মুদরিকাহ কবিতা আবৃত্তি করেন :
إني وقتلي سليكا ثم أعقله .... كالثور يضرب لما عافت البقر
(কাব্যানুবাদ) বদমাইশ সুলাইককে হত্যা করেছি, দিয়েছি আমি রক্তপণ এর ফলে, ষাঁড়কে প্রহার করে আগে নামানো হয় গাভীরা নামতে না চাইলে জলে।
(ব্যাখ্যা)
রাখাল গরুর পালকে পানি পান করানোর জন্য পানির ঘাটে নিয়ে আসে। তখন বিশাল পানি দেখে প্রথমে গাভী পা বাড়াতে চায় না। এমতাবস্থায় ষাঁড়ের গায়ে আঘাত করে আগে পানিতে নামতে বাধ্য করা হয়। যাতে ষাঁড়ের দেখাদেখি গাভী পানিতে নামে। কিন্তু গাভীকে আঘাত করা হয় না। কেননা, গাভী দুধেল হয়ে থাকে।
কবিতার মাধ্যমে ইলিয়াস বিন মুদরিকাহ বোঝাতে চেয়েছেন, তার গোত্রীয় নারী ও সুলাইক নামক পুরুষ যে কুকর্ম করেছে, তাতে অপরাধ একমাত্র সুলাইকের। নারীর কোনো অপরাধ ছিল না। সুলাইক তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছে। এজন্য শাস্তি দিতে গিয়ে নারীকে বাদ দিয়ে তিনি কেবলমাত্র সুলাইকের মস্তক বিচ্ছিন্ন করেছেন।১
টিকাঃ
১ ফাযাইলুল গাইরাহ আলান-নিসা: ৩১, হাম্মাদাহ মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ ইসমাইল।
📄 যুদ্ধের উদ্দীপনা সৃষ্টিতে গাইরত
জাহিলি যুগে আরবের একটি গোত্রের নাম ছিল ইয়াদ। সে সময় আলে নাসর নামে আরবে একটি শাসক রাজপরিবার ছিল। এরা কিসরা তথা পারস্য সাম্রাজ্যের অনুগত ছিল। আলে নাসর রাজপরিবারের সাথে ইয়াদ গোত্রের বিরোধ ছিল। এই বিরোধের জের ধরেই একবার ইয়াদ গোত্রের লোকেরা পারস্যের এক আজমি নববধূকে অপহরণ করে। নববধূ বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি যাচ্ছিল।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই পারস্য সাম্রাজ্য কর্তৃক আরবে তাদের অনুগত আলে নাসর রাজপরিবারের মাধ্যমে যুদ্ধ করে এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এটা নিয়ে ইয়াদ গোত্রের যেন কোনো ভাবান্তর ছিল না। আগাম বিপদ বুঝতে পেরে সজাগ হয়েছিলেন ইয়াদ গোত্রের নামকরা কবি লাকিত ইবনে ইয়ামুর ইয়াদি। তিনি কবিতা রচনার মাধ্যমে নিজ গোত্রকে সম্ভাব্য যুদ্ধ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। কবিতার প্রথম দুটি চরণ হলো:
يا قوم لا تأمنوا إن كنتم غيرا .... على نسائكم كسرى وما جمعا .
(কাব্যানুবাদ)
হে জাতি, নারীদের ব্যাপারে যদি একটু গাইরত থাকে তোমাদের, তবে মোটেও নিশ্চিন্ত থেকো না পারস্যরাজ ও তার সৈন্যদলের।
(ব্যাখ্যা)
সে সময় শত্রুরা কোনো গোত্রের ওপর হামলা করলে পুরুষদের হত্যার পাশাপাশি নারীদেরকে বন্দি করে নিয়ে যৌনদাসী বানাত। এজন্য কবি লাকিত ইবনে ইয়ামুর ইয়াদি নিজ গোত্রের পুরুষদেরকে কিসরার প্রতিশোধমূলক হামলার ব্যাপারে সতর্ক করার জন্য নারীদের ইজ্জতের ব্যাপারটা উল্লেখ করেছেন। নারীদেরকে বেইজ্জতির শিকার হতে না দিতে গোত্রের পুরুষেরা আগাম মোকাবিলার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে উদ্দীপক কাব্য রচনা করেছেন। কারণ, আইয়ামে জাহিলিয়াতেও আরবরা নিজেদের নারীদের ব্যাপারে খুব গাইরতমন্দ ছিল।১
শুধু তাই নয়; আইয়ামে জাহিলিয়াতে আরবদের ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যায়, যুদ্ধের সময় তারা তাদের নারীদেরকে নিয়ে রণক্ষেত্রে হাজির হতো। যাতে করে পরাজিত হলে তাদের নারীদেরকে বন্দি করে যৌনদাসী বানানো হবে—এই ভয়ে তারা যেন রণক্ষেত্রে ছেড়ে না পালায়; নারীদের দিকে চেয়ে হলেও জীবন বাকি রেখে মরণপণ লড়াই করে! আহঃ, কী সেই গাইরত!২
টিকাঃ
১ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩২।
২ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৩।
📄 জাহিলি যুগে অতিমাত্রার গাইরত
জাহিলি যুগের পুরুষদের মধ্যে শুধু গাইরতই ছিল না; যা ছিল সেটাকে 'অতিমাত্রার গাইরত' বলতে হয়। তাদের কারও গাইরত তো এমন মারাত্মক ছিল, যা কিনা রীতিমতো পাগলামো আখ্যা দেওয়া যায়। তাদের কেউ কেউ নিজের কন্যাদেরকে বিয়ে পর্যন্ত দিত না—পরপুরুষের হাত লাগার ভয়ে!’
আরবি ভাষা ও সাহিত্যের প্রথিতযশা পণ্ডিত আবুল আব্বাস মুবাররিদ ‘আল-কামিল ফিল লুগাহ ওয়াল আদাব’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন, আইয়ামে জাহিলিয়াতের সময়ে আরবের একজন লোক ছিল যুল ইসবা উদওয়ানি নামে। বেচারার চারজন কন্যাসন্তান ছিল। সকলেই সেয়ানা। বিয়ের উপযুক্ত। লোকটা ছিল চরম পর্যায়ের গাইরতওয়ালা। পরপুরুষের ছোঁয়া লাগবে তার কন্যাদের গায়ে—এটা সে মেনে নিতে পারেনি। তাই কাউকেই বিয়ে না দিয়ে ঘরেই আইবুড়ো বানিয়ে রেখেছিল!
বাবার এই অতিমাত্রার গাইরত দেখে মেয়েরা সরাসরি মুখ ফুটে কিছু বলতে পারত না ঠিকই; কিন্তু নিজেদের মধ্যে বিয়ে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করত। আলাপ-সালাপ করত। মেয়েরা নিজেদের মধ্যে কী আলাপ করে—এটা জানার জন্য বেচারা একদিন মেয়েদের ঘরে আড়ি পাতল। আড়ি পেতে বেচারা যা শুনল, তাতে সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না! কিন্তু কী শুনল বেচারা?
তার আইবুড়ো মেয়েরা নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতা করছে বিয়ে নিয়ে! বিয়ের ব্যাপারে কার মনে কী আছে—সে কথা একে অপরের কাছ থেকে জানতে চাচ্ছে! এমনকি তারা এটাও তাগিদ দিচ্ছে যে, কেউ যেন মনের খবর গোপন না করে।
প্রথমেই এলো বড় মেয়ের পালা। বেচারি একটি কবিতা আবৃত্তি করে নিজের মনের মণিকোঠায় লুক্কায়িত বাসনা ফুটিয়ে তুলল—
ألا ليت زوجي من أناس ذوي غنى ... حديث الشباب طيب النشر والذكر لصوق بأكباد النساء كأنه ... خليفة جان لا يقيم على هجر
(কাব্যানুবাদ)
হায়, আমার স্বামী যদি হতো এমন এক ধনী পুরুষ যে এক নওজোয়ান, সুগন্ধময়, সকলেই তার ফানা; এমন প্রেমিক, যে নারীদের অন্তরে করে সদা বাস, যেন সে জিনের প্রতিনিধি, স্ত্রীকে ছাড়া ঘুমায় না।১
এরপর দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয়, সবশেষে চতুর্থ মেয়ে নিজেদের মনোবাসনা ব্যক্ত করে কবিতার মাধ্যমে। বড় মেয়ের কবিতা থেকে এটাই প্রকাশ পায় যে, সে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে অন্যান্য গুণের সাথে ধনী যুবক চায়। দ্বিতীয় মেয়ের কথা থেকে প্রকাশ পায়, সে সর্দার গোছের পুরুষকে পছন্দ করে। আর তৃতীয় মেয়ের কথা থেকে বোঝা যায়, সে তার চাচাতো ভাইকে ভালোবাসে।
অবশ্য চতুর্থ মেয়ে প্রথমে কিছু বলা থেকে বিরত থাকে। সে কিছুই বলতে চায় না। তার পেটে কী আছে—সেটা বের করতে না পারলে বাকি বোনদের গোপন মনোভাব তার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়েছে যে! তাই বোনেরাও নাছোড়বান্দা। তাদের পিড়াপীড়িতে শেষমেশ সে মুখ খুলতে বাধ্য হয়। সে যা বলে তা রীতিমতো বিস্ফোরক! সে বলে, ‘আইবুড়ো হয়ে বসে থাকার চেয়ে শুকনো কাঠের মতো একজন স্বামীও ভালো!’
কন্যাদের মনোভাব বুঝতে পেরে বাবা তার গাইরতের মাথা খেয়ে হলেও মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করে। আড়ি পেতে মেয়েদের মনোভাব বুঝতে না পারলে লোকটা তার আজিব গাইরতের কারণে মেয়েদেরকে আজীবন বিয়ে বঞ্চিতা রেখে দিত!২
এরচেয়েও পিলে চমকানোর মতো খবর হলো, আইয়ামে জাহিলিয়াতে কোনো কোনো লোক তার কন্যাসন্তানকে এজন্যই জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলত যে, বড় হয়ে এই মেয়ে না জানি কারও সাথে কুকর্ম ঘটিয়ে ফেলে! তাই আগেভাগেই অতি সতর্কতাস্বরূপ কন্যাকে মাটিতে চাপা দিয়ে বাবা তার অতি গাইরতের বহিঃপ্রকাশ ঘটাত!
বোঝা গেল, আইয়ামে জাহিলিয়াতে আরবের মুশরিকদের কন্যাসন্তান জীবন্ত দাফন করার পেছনে শুধু দারিদ্র্যের ভয়ই ছিল না; ছিল গাইরতের প্রশ্নও। আর বাস্তবেও ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আরবে কন্যাসন্তান জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলার পেছনে রয়েছে তাদের অতিমাত্রার গাইরত।
আরবের রাবিআহ গোত্রই প্রথম কন্যাসন্তান দাফন করার প্রথা শুরু করে। এ গোত্রেরই সর্দারের কন্যাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় অন্য গোত্রের একজন পুরুষ। সম্ভবত প্রেমঘটিত কারণে হবে। যুদ্ধে না গিয়ে সর্দার সন্ধির পথ বেছে নেন। কন্যাকে ছাড় দেওয়া হয় দুটির যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে হবে। হয়তো বাবার কাছে ফিরে আসতে হবে। নয়তো অপহরণকারী পুরুষের কাছে থাকতে হবে।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটি অপহরণকারীকেই বেছে নিল! এই গ্লানি সহ্য করতে পারলেন না মেয়ের গাইরতমন্দ সর্দার বাবা। এরপর থেকেই তিনি তার রাবিআহ গোত্রে কন্যাসন্তান জীবিত দাফন করার রীতি চালু করেন! আস্তে আস্তে এই ঘৃণ্য প্রথা গোটা আরবে ছড়িয়ে পড়ে।১
যাহোক, এমন গাইরত নিছক মূর্খতা ও অমানবিকতা। এজন্য ইসলাম এসে এসব জাহিলি প্রথা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে এবং যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গাইরতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে।২
টিকাঃ
১ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৪।
১ কবিতাটির চরণগুলোতে বেশ ভিন্নতা রয়েছে। সবগুলোর বিবেচনায় কাব্যানুবাদ করার চেষ্টা করেছি।
২ আল-কামিল ফিল-লুগাহ ওয়াল আদাব: ১১১, মুবাররিদ।
১ বুলুগুল আরাব: ১/১৪০, আলুসি।
২ প্রাগুক্ত।