📄 আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর নিকট ফিতনাবিষয়ক বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ
ফিতনাবিষয়ক সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে সিহাহ সিত্তাহ তথা প্রসিদ্ধ ছয়টি সহিহ হাদিস গ্রন্থ।²⁹ আর এ সবগুলোর মাঝে সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হলো সহিহ বুখারি। এটি খুবই প্রসিদ্ধ কথা। বরং পবিত্র কুরআনের পর এটিকেই সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয়। জারহ এবং তাদিল শাস্ত্রবিদগণ এমনটিই বলেছেন। তারা সকলে বলেছেন, নিশ্চয় বুখারির প্রমাণ বিরোধী পক্ষের প্রমাণের চেয়ে শক্তিশালী।
ইমাম বুখারি রহ. তার গ্রন্থে দ্বিরুক্তি-সহ ৭৩৯৭টি এবং দ্বিরুক্তি ব্যতীত ২৬০২টি হাদিস চয়ন করেছেন।³⁰ এই হাদিসসমূহ তিনি নির্বাচিত করেছেন ৬০ লাখ হাদিসের মধ্য থেকে। প্রতিটি হাদিস চয়ন করার আগে দুই রাকাত ইস্তেখারার নামাজ আদায় করে আল্লাহ তাআলার কাছে সমাধান চেয়েছেন যে, তিনি এই হাদিসটি লিখবেন নাকি লিখবেন না। তিনি একটি হাদিস শোনার জন্য মাইলের পর মাইল সফর করতেন। ১৯৪ হিজরিতে তৎকালীন খোরাসানের বুখারা নামক গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন না। ৬২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
সহিহ বুখারির পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সহিহ মুসলিম। রাসুল ﷺ-এর হাদিস নিয়ে রচিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এটি। বরং কোনো কোনো আলেম এই গ্রন্থকে বুখারির পর্যায়ে উন্নীত মনে করেন। কোনো কোনো আলেম সহিহ মুসলিম নিয়ে আরও উচ্চ মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, সনদ বা বর্ণনাসূত্র সংকলন এবং গঠন বিন্যাসের দিক দিয়ে সহিহ মুসলিম, সহিহ বুখারির চেয়েও উত্তম। কিন্তু বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে সহিহ বুখারি এগিয়ে। এরপরই সহিহ মুসলিম-এর অবস্থান। কিছু হাদিসের ক্ষেত্রে ইমাম মুসলিম রহ.-এর ওপর আপত্তি করা হয়েছে। যদিও তা খুবই অল্প। যারা আপত্তি করেছেন তাদের আপত্তি যথাযথ। সহিহ মুসলিম-এ দ্বিরুক্তিহীন বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ৪ হাজার। যেখানে সহিহ বুখারিতে দ্বিরুক্তিহীন হাদিসের সংখ্যা ২৬০২টি। ইমাম মুসলিম রহ. জন্মগ্রহণ করেন পারস্যের নিশাপুরে। তিনিও আরব বংশোদ্ভূত নন। তার ইন্তেকাল হয়েছিল ৫৭ বছর বয়সে।
সহিহ মুসলিম-এর পরের অবস্থানে আছে আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি। ইমাম নাসায়ি রহ. খোরাসানের অন্তর্গত নাসা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন না। তিনি ২১৫ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ইলমুর রিজালশাস্ত্রে তিনি খুবই সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।
এরপরের অবস্থানে আছে সুনানু আবি দাউদ। এই গ্রন্থে ৪৮০০টি হাদিস রয়েছে। ইমাম আবু দাউদ রহ. আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন। ২০২ হিজরিতে তিনি বসরায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
এরপরের অবস্থান সুনানুত তিরমিজির। এই গ্রন্থে কিছু দুর্বল হাদিসও রয়েছে। তবে এগুলোর মাননির্ণয়কৃত; ইমাম তিরমিজি রহ. তার গ্রন্থে হাদিসের বিশুদ্ধতা এবং দুর্বলতার দিক ইঙ্গিত করেছেন। তবে কিছু হাদিসের দুর্বলতার ক্ষেত্রে তিনি কোনো ইঙ্গিত প্রদান করেননি। ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিল সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেমগণ এই গ্রন্থকে বিশুদ্ধ বলেছেন। ২০৯ হিজরিতে আফগানিস্তানের আমুদরিয়া নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অবস্থিত তিরমিজ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইমাম তিরমিজি রহ.। তিনি আরব বংশীয় ছিলেন না। ইন্তেকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। ইমাম বুখারি রহ. ছিলেন ইমাম তিরমিজি রহ.-এর শিক্ষক। তা সত্ত্বেও তিনি ইমাম তিরমিজি রহ.-এর ওপর খুবই আস্থা রাখতেন এবং তার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করতেন।
অতঃপর ষষ্ঠ অবস্থানে আছে সুনানু ইবনি মাজাহ। এ গ্রন্থের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, ইমাম ইবনে মাজাহ রহ. অন্য ইমামদের থেকে পৃথক যেসব হাদিস এনেছেন সেগুলোর অধিকাংশই দুর্বল। তবে যেসব হাদিস ইবনে মাজাহ-এর সঙ্গে অন্যান্য ইমামগণও বর্ণনা করেছেন সেগুলো ব্যতীত। ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, ঢালাওভাবে এ কথা বলা যাবে না। অর্থাৎ, ইমাম ইবনে মাজাহ এমন কিছু পৃথক হাদিসও এনেছেন যেগুলো দুর্বল নয়।³¹
ইবনে মাজাহ রহ. ২০৯ হিজরিতে কাজবিন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও আরব বংশোদ্ভূত নন। লক্ষণীয় যে, ছয় বিশুদ্ধ গ্রন্থের পাঁচজনই ছিলেন অনারব। সুবহানাল্লাহ! এসব অনারব অঞ্চল বিজিত করে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের ওপর কতই-না অনুগ্রহ করেছেন। এ বিজয়ের ফলে ওই সকল মনীষীগণের মধ্যে ইসলামের আলো প্রবেশ করেছে, যারা আমাদের জন্য প্রিয় নবীজির সুন্নাহ তথা হাদিসগুলো সংরক্ষণ করেছেন।
সিহাহ সিত্তাহ তথা ছয় বিশুদ্ধ গ্রন্থের পরের অবস্থানে আছে আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ। এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসনাদ গ্রন্থ। এখানে প্রশ্ন আসে যে, আলেমগণ আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদকে পূর্বের ছয় গ্রন্থের সঙ্গে কেন রাখেননি?
এর উত্তরে বলা যায় যে, সহিহ, সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সহিহ এবং সুনান গ্রন্থগুলোতে হাদিস লিখিত হয় অধ্যায় এবং বিষয়ভিত্তিক আকারে। আর মুসনাদ গ্রন্থে হাদিস লেখা হয় সাহাবিগণের নাম অনুসারে। যেমন, বলা হয়ে থাকে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত হাদিসসমূহ, আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসসমূহ ইত্যাদি।
আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ-এ দ্বিরুক্তিহীন ৩০ হাজার হাদিস রয়েছে এবং দ্বিরুক্তি-সহ হাদিসের সংখ্যা ৪০ হাজার। বর্ণিত আছে, ইমাম আহমাদ রহ. ৭ অথবা ১০ লক্ষ হাদিস থেকে বাছাই করে এই হাদিসগুলো সংকলন করেছেন। আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর মৃত্যুর পর তার ছেলে আবদুল্লাহ মুসনাদে আহমাদ-এ কিছু হাদিস বৃদ্ধি করেন। বর্ণিত আছে, মুসনাদে আহমাদ-এ কোনো মওজু তথা জাল হাদিস নেই। যদি কয়েকটি থেকেও থাকে, তবে সেগুলো ইমাম আহমাদের ছেলের মাধ্যমে এসেছে।
এগুলো হলো আমাদের নিকট এবং ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিল সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেমগণের কাছে পরিচিত এবং প্রসিদ্ধ নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। তাই ফিতনা সম্পর্কে অধ্যয়নের সময় এগুলোই আমাদের নির্ভরতার উৎস হওয়া উচিত। অন্য যেসব অনির্ভরযোগ্য এবং মিথ্যা ও জাল হাদিস বর্ণনার উৎস রয়েছে, সেগুলো বর্জন করা উচিত।
কেউ কেউ মনে করেন যে, আব্বাসি শাসনামলে আব্বাসি খলিফাদের নৈকট্যলাভের উদ্দেশ্যে উমাইয়াদের কুৎসা রটনায় এসব মিথ্যার সয়লাব ঘটেছিল। কিন্তু এখন কেন এসব মিথ্যার মাধ্যমে ইসলামের ওপর আঘাত করা হবে? এসব কারা করবে?
বর্তমানে যারা ইসলামের ওপর আঘাত করছে তারা হচ্ছে কিছু বিকৃত মতাদর্শের অনুসারী। তাদের প্রত্যেকেই নিজস্ব দলের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ইসলামের ওপর আঘাত করছে। তাদের ভ্রান্ত এবং বিকৃত মতের সমর্থনে দুর্বল এবং জাল হাদিস বর্ণনা করছে। ওরিয়েন্টালিস্ট তথা প্রাচ্যবিদরা যখন সব ইসলামি ঐতিহাসিক গ্রন্থের সমালোচনা শুরু করে, তখন এসব বানোয়াট ও জাল হাদিসের বিশাল ভান্ডার তাদের হস্তগত হয়। তারা বিভিন্ন ভাষায় এসব বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করে ছড়িয়ে দেয়। তারা প্রচার করে যে, ইসলাম যুদ্ধের মাধ্যমে বিস্তৃতি লাভ করেছে। তাই কোনো মুসলিম যখন ক্ষমতার অধিকারী হয়, তখন তারা অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ফিতনাসংক্রান্ত ঘটনাকে তারা এসব মিথ্যা বর্ণনা এবং দাবির সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে।
এ ছাড়াও পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট অক্সিডেন্টালিস্ট তথা পাশ্চাত্যবিদরা নিজ নিজ দেশে ইসলামের ওপর আঘাত হানতে শুরু করে। এরা মুসলিম নাম ধারণ করে মুসলিম সমাজে বসবাস করলেও এবং কখনো নামাজ-রোজা পালন করলেও ইসলামের ওপর কঠিন আঘাত হানতে এরা কোনোরূপ কুণ্ঠাবোধ করে না।
এদের একজন হচ্ছে তহা হুসাইন। একদিক দিয়ে তিনি খুবই প্রসিদ্ধ। তাকে বলা হয়ে থাকে আরবি সাহিত্যের খুঁটি। তিনি আরবি সাহিত্যিক হলেও ইসলামের একজন ঘোরতর শত্রু। তার রচিত সব গ্রন্থেই ইসলামের ওপর আঘাতমূলক বক্তব্য রয়েছে। তিনি তার ছাত্রদের কুরআনের সমালোচনা শেখাত। এভাবে বলত যে, এসব আয়াতের ভিত্তি মজবুত এবং ওই সব আয়াতের ভিত্তি দুর্বল (নাউজুবিল্লাহ)।
সে কুরআনের অপব্যাখ্যা করে বলে যে, কুরআনে ইবরাহিম আ. এবং ইসমাইল আ.-এর ঘটনা বর্ণিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, এ ঘটনা বাস্তব। কখনো কখনো কুরআনে গল্পের মতো বর্ণনাও এসেছে। এগুলো বাস্তব হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান থাকা জরুরি।
এমনইভাবে তহা হুসাইন তার গ্রন্থাবলিতে অনেক সাহাবিগণের সমালোচনা করেছে। এতটাই সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে যে, অবশেষে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে কাফের এবং মুরতাদ ফতোয়া দেওয়া হয়। তখন সে আল-আজহারের লিটারেচার তথা সাহিত্য অনুষদের অধ্যাপক ছিল। এরপর সবাই মনে করেছিল, সে তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে এসেছে। আল-আজহারের আলেমগণের নৈকট্যলাভের জন্য সে নতুন একটি গ্রন্থ রচনা করে। এই গ্রন্থটিকে বাহ্যিকভাবে ইসলামের পক্ষে মনে হলেও, অন্তর্নিহিতভাবে এতেও ইসলামের ওপর আঘাত করা হয়েছে এবং বানোয়াট বর্ণনার সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। তহা হুসাইনের সামসময়িক অনেক ব্যক্তি যারা ফ্রান্স, ইংল্যান্ড প্রভৃতি ইউরোপীয় দেশে পড়ালেখা করেছে, তারাও একই কাজ করেছে।
এই বিষয়ে আবদুর রহমান শারকাবি রচিত গ্রন্থাবলিও বিপজ্জনক। এসব গ্রন্থাবলি থেকে যারা ফিতনা সম্পর্কে অধ্যয়ন করবেন তারা দেখতে পাবেন যে, কোনো যাচাই-বাছাই না করেই এসব গ্রন্থে সকল সাহাবিগণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এমনইভাবে খালিদ মুহাম্মাদ খালিদ রচিত রিজালুন হাওলার রাসুল এবং খোলাফাউর রাসুল গ্রন্থদুটিতেও আলি রা.-এর বিরুদ্ধে মুআবিয়া রা.-এর পক্ষাবলম্বনকারী সাহাবিগণের সমালোচনা করা হয়েছে। ভ্রান্ত ও মিথ্যা ঘটনার সূত্র তুলে ধরে সে প্রখ্যাত সাহাবি আবু মুসা আশআরি রা.-এর সমালোচনাও করেছে।
সাহাবিগণের সমালোচনাকারীদের মধ্যে অন্যতম হলো লেবানন ইউনিভার্সিটির সাহিত্য ও মানব বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ডিন ড. জাহিয়া কাদুরা। সে তার আয়েশা : উম্মুল মুমিনিন গ্রন্থে এ ধরনের ঘৃণ্য পন্থার আশ্রয় নিয়েছে। তার এই গ্রন্থে যে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তা পড়ে আমার বমি আসার উপক্রম হয়েছিল। সে তার গ্রন্থে লিখেছে, আলি রা. এবং আয়েশা রা.-এর মধ্যকার বিরোধের মূল কারণ হলো রাসুল কর্তৃক আয়েশা রা.-কে বিয়ে করা। আয়েশা রা. ছিলেন রাসুল-এর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। তাই ফাতেমা রা. তার প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়ে তাকে অপছন্দ করতেন। তিনি আলি রা.-কে এ বিষয়টি বললে তিনিও আয়েশা রা.-কে অপছন্দ করতে থাকেন। এ ব্যাপারটিই আলি রা.-কে আয়েশা রা.-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে। এদিকে রাসুল ফাতেমা রা.-কেও ভালোবাসতেন। এ দেখে আয়েশা রা.-ও তার প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়েছিলেন।
সে আরও বলে যে, আয়েশা রা.-এর ওপর অপবাদ আরোপের সময় তার ওপর যেসব সাহাবি অপবাদ আরোপ করেছিলেন, তাদের মধ্যে আলি রা.-ও ছিলেন। তাই আয়েশা রা. তাকে অপছন্দ করতেন এবং এটিই তাকে আলি রা.-এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই লেখিকা আরও বলেছে যে, আয়েশা রা.-এর ওপর অপবাদ আরোপের সময় আলি রা. ও ফাতেমা রা. আয়েশা রা.-কে নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন। এর পর নিষ্পাপ প্রমাণিত হওয়ার পর আয়েশা রা. এ নিয়ে তাদের সঙ্গে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়েছিলেন।
এমনইভাবে তার আরেকটি জঘন্য মন্তব্য হলো যে, উসমান রা.-এর শাহাদাতের পর আলি রা. খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার কারণে আয়েশা রা. আলি রা.-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। আয়েশা রা. চেয়েছিলেন সগোত্রীয় তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. খলিফা হোক।
এই লেখিকার দৃষ্টিতে তৎকালীন মুসলিম সমাজ বর্তমান সময়ের মুসলিম সমাজের তুলনায় অধিক অধঃপতনের শিকার ছিল। এই লেখিকার সব আলোচনার রেফারেন্স এবং উৎস শিয়াদের রচিত। জানি না সে এসব জেনেই লিখেছে নাকি না জেনে লিখেছে! যদি না জেনে লিখে থাকে তবে এটিও বিপজ্জনক। আর যদি জেনে লিখে থাকে তবে এটি আরও বেশি বিপজ্জনক।
এই লেখিকা আরও লিখেছে যে, আয়েশা রা. এবং আলি রা.-এর মধ্যকার এই বিদ্বেষ এবং পারস্পরিক অপছন্দের ফলেই তাদের মধ্যে জঙ্গে জামাল সংঘটিত হয়েছে। লেখিকার বক্তব্য অনুযায়ী তাদের এই পারস্পরিক অপছন্দের কারণেই এসব সাহাবিগণের পবিত্র রক্ত বিনষ্ট হয়েছে।
এই ভ্রান্ত লেখিকার বক্তব্য অনুযায়ী আয়েশা রা. উসমান রা.-এর ওপরও প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। ফলে লোকেরা তার আহ্বানে সাড়া দেয়। তখন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. উসমান রা.-এর পক্ষে প্রতিরোধ গড়ার জন্য মদিনায় থেকে যান। অথচ তিনি ছিলেন সে বছরের হজের আমির। তখন আয়েশা রা. তাকে বলেছিলেন, হে আবদুল্লাহ, এই শহরে থেকো না। এই পথভ্রষ্ট লোকের পক্ষে লোকদের নিবৃত্ত রেখো না।
এসব অক্সিডেন্টালিস্ট তথা পাশ্চাত্যবিদরা এভাবেই তাদের মিথ্যা এবং বাতিল চিন্তাধারা ছড়িয়েছে। এভাবেই তারা মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তান সাহাবিগণের ওপর অপবাদ আরোপ করার চেষ্টা চালিয়েছে।
টিকাঃ
২৯. সিহাহ সিত্তা : হাদিসের বিশুদ্ধ ছয়টি গ্রন্থ। এর দ্বারা সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি, সুনানু আবি দাউদ, সুনানুত তিরমিজি এবং সুনানু ইবনি মাজাহকে বুঝানো হয়েছে। এ ছয় কিতাবের মধ্যে সহিহ বুখারি এবং সহিহ মুসলিম-এর সব হাদিস সহিহ বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত। অবশিষ্ট চারটি গ্রন্থ সার্বিক বিবেচনায় নির্ভরযোগ্য হলেও তাতে বর্ণিত সব হাদিস নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত নয়। এ কারণে মুহাদ্দিসগণ এ ছয় গ্রন্থকে সিহাহ সিত্তার পরিবর্তে 'আল-কুতুবুস সিত্তাহ' বলাকে অধিক সমীচীন মনে করেন। উল্লেখ্য, হাদিসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ উপরিউক্ত ছয়টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং হাদিসের আরও বহু গ্রন্থ রয়েছে। যা সার্বিক বিবেচনায় নির্ভরযোগ্য। যেমন, সহিহ ইবনি খুযাইমা, সহিহ ইবনি হিব্বান, আল-মুনতাকা লি ইবনিল জারুদ, আল-হাদিসুল মুখতারা লিজ জিয়া মাকদিসি ইত্যাদি।-সম্পাদক
৩০. এ নিয়ে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। উল্লেখিত মতটি ইবনে হাজার আসকালানি রহ.-এর।-অনুবাদক
৩১. তাহযিবুত তাহযিব, ৯/৪৬৮
📄 সাহাবিগণের পরিচয়
এখানে সাহাবিগণের পরিচয় তুলে ধরাও প্রয়োজন মনে করছি। যেন আমরা যাদের নিয়ে কথা বলছি, তাদের মর্যাদা সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকতে পারি। সাহাবি হলেন প্রত্যেক এমন ব্যক্তি, যিনি রাসুল ﷺ-এর ওপর ঈমান এনেছেন। তাঁকে স্বচক্ষে দেখেছেন, জীবনে একবার হলেও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করেছেন। আশআস ইবনে কায়স রা.-এর মতো যারা ইসলাম গ্রহণ করার পর মুরতাদ হয়ে পুনরায় ইসলামে ফিরে এসেছেন, তারাও এ সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবেন। বিশুদ্ধতম মতানুযায়ী সাহাবিগণের সংখ্যা হলো ১ লক্ষ ১৪ হাজার।³²
আর তাবেয়ি হলেন, যারা রাসুল ﷺ-এর ওপর ঈমান এনেছেন, সাহাবিগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। তাবেয়িগণের কয়েকটি স্তর রয়েছে। সর্বোচ্চ স্তরে আছেন সাইদ ইবনে মুসাইয়িব রহ. প্রমুখ। কারণ, তাদের অধিকাংশ বর্ণনা সরাসরি সাহাবিগণের থেকে। মধ্যম স্তরে আছেন ইকরিমা রহ., কাতাদা রহ., উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. এবং হাসান বসরি রহ. প্রমুখ। এরপর হলেন সর্বনিম্ন স্তরের তাবেয়িগণ। তারা সাহাবিগণ থেকে খুব কমই হাদিস বর্ণনা করেছেন।
মুখাদরাম নামেও একশ্রেণির তাবেয়ি রয়েছেন, যারা রাসুল ﷺ-এর জীবদ্দশায় তাঁর ওপর ঈমান এনেছেন, কিন্তু তাঁকে স্বচক্ষে দেখতে পারেননি। যেমন, নাজ্জাশি প্রমুখ।
জারহ ওয়াত তাদিলশাস্ত্রবিদ আলেমগণের ঐকমত্য অনুযায়ী সকল সাহাববিগণ ন্যায়পরায়ণ এবং তারা যা বলেন তা-ই সত্য। কখনো কখনো এতে ভুল হয়ে গেলেও তা মিথ্যা, খেয়ানত এবং সত্য গোপন হিসাবে গণ্য হবে না।³³
আলেমগণ বলেছেন, সাহাবিগণের নাম, পরিচয় অজ্ঞাত থাকা ক্ষতিকর নয়।³⁴ অর্থাৎ, আপনি যখন জানতে পারবেন যে, অমুক ব্যক্তি সাহাবি ছিলেন; এ ছাড়া তার সম্পর্কে আর কিছুই জানেন না। শুধু জানেন, তিনি রাসুলের সান্নিধ্য পেয়েছেন। তবেই তিনি যা বলবেন তাই বিশুদ্ধ গণ্য হবে। এতে কোনো মিথ্যার আশঙ্কা নেই। সাহাবিগণের ব্যাপারে এটিই আমাদের নীতি।
তাই কোনো সাহাবির সমালোচনা করা জায়েজ নেই। যখন কোনো সাহাবি এমন কোনো কাজ করেন, যে কাজে দুই ধরনের উদ্দেশ্য থাকার সম্ভাবনা থাকে, তখন কাজটিকে উত্তম উদ্দেশ্যেই বিবেচনা করা হবে। প্রতিটি মুসলিমের ক্ষেত্রেই সুধারণা রাখা প্রয়োজন। তাই সাহাবিগণের ওপর সর্বাগ্রে সুধারণা রাখতে হবে।
কোনো সাহাবির ভুল প্রকাশিত হলে আমরা বলব যে, তিনি এখানে ইজতেহাদ³⁵ করেছেন ও ইজতেহাদে ভুল করেছেন। তাই এতেও তিনি সওয়াব পাবেন। কয়েকজন সাহাবির খুব বেশি সমালোচনা করা হয়েছে। মুআবিয়া রা. হলেন তাদের একজন। অথচ রাসুল ﷺ তার সম্পর্কে বলেছেন, 'হে আল্লাহ, আপনি তাকে সুপথপ্রাপ্ত এবং সুপথ প্রদর্শনকারী হিসাবে কবুল করুন।'³⁶
যারা মুআবিয়া রা.-এর সমালোচনা করে, তারা সারা জীবন নেক আমল করলেও তাদের আমল মুআবিয়া রা.-এর এক বছর কিংবা আরও কম সময়ের নেক আমলের সমানও হবে না। আল্লাহ তাআলা তার হাতে অনেক জাতিকে সুপথ দেখিয়েছেন।
তবে শিয়াদের আকিদা এবং তাদের জাল হাদিস রচনার প্রতি ঘৃণাপোষণ যেন আমাদেরকে আলি রা., হাসান রা., হুসাইন রা., ফাতেমা রা. এবং সম্মানিত আহলে বাইতের³⁷ কারও মর্যাদাহানিতে প্ররোচিত না করে। নিশ্চয় ইসলামে তাদের বিরাট মর্যাদা রয়েছে। কিন্তু এতে কোনো বাড়াবাড়ি অথবা ছাড়াছাড়ির সুযোগ নেই।
টিকাঃ
৩২. আল-জামি লিল খতিব, ২/২৯৩
৩৩. আল-ইসতিয়াব, ১/৩; আল-ইসাবা, ১/১০; আত-তাকরিব ওয়াত তাইসির, পৃ. ৯২
৩৪. আল-বাদরুল মুনির লি ইবনিল মুলাক্কিন, ২/২৪০
৩৫. ইজতেহাদ: কুরআন ও সুন্নাহয় যে সমাধান সুস্পষ্টভাবে দেওয়া হয়নি বা যে সমাধান উল্লেখ করা হয়নি, এমন ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি কুরআন ও সুন্নাহ গবেষণা করে সমাধান দেওয়াকে ইজতেহাদ বলা হয়।-সম্পাদক
৩৬. সুনানুত তিরমিজি, ৩৮৪২; আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ১৭৮৯৫
৩৭. আহলে বাইত : রাসুল ﷺ-এর পরিবার, বংশধর ও তাদের মুক্ত দাসগণকে আহলে বাইত বলা হয়।-সম্পাদক
📄 ফিতনাবিষয়ক নির্ভরযোগ্য আরও কিছু গ্রন্থ
ফিতনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে এমন কিছু নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ নিম্নে উল্লেখ করা হলো—
১. কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবি রহ. রচিত আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম। সাহাবিগণের সমালোচকদের জবাবে লিখিত উৎকৃষ্ট গ্রন্থাবলির মধ্যে এটি অন্যতম। তবে এটিকে যেন আল-আওয়াসিম ওয়াল কাওয়াসিম গ্রন্থ মনে না করা হয়। সেটি ভিন্ন গ্রন্থ। কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবি পঞ্চম হিজরি শতাব্দীর শেষভাগে আন্দালুসের ইশবেলিয়া তথা বর্তমান স্পেনের সেভিলায় জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ বছর বয়সেই তিনি কুরআন হিফজ সমাপ্ত করেন। ১৬ বছর বয়সে কুরআনের ১০ কেরাত আয়ত্ব করেন। এরপর ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্যে একের পর এক অঞ্চল ভ্রমণ করতে থাকেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি আলজেরিয়া, মিশর, হিজায, শাম এবং ফিলিস্তিন প্রভৃতি অঞ্চলে সফর করেন। এই সময়ে তিনি অনেক প্রসিদ্ধ আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তাদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেন। এরপর রচনা এবং লেখালেখিতে মনোযোগী হওয়ার জন্য ফিরে আসেন জন্মভূমিতে। ৩৫টিরও বেশি গ্রন্থ তার হাতে রচিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি তাফসিরুল কুরআন বিষয়ে লিখিত আনওয়ারুল ফজর ফি তাফসিরিল কুরআন। এটি ছিল ১ লক্ষ ৬০ হাজার পৃষ্ঠায় লিখিত। এই গ্রন্থটি বহন করা হতো উটের পিঠে করে। পঞ্চম হিজরি শতাব্দীর একেবারে শেষদিকে তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেন। একাধিক স্থানে এই গ্রন্থকে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অবশেষে অষ্টম হিজরিতে এই অমূল্য গ্রন্থটি বাদশাহর হস্তগত হয়। এরপর গ্রন্থটির আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবি দীর্ঘ ২০ বছর সময় নিয়ে এই গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। তার লিখিত সবচেয়ে চমৎকার গ্রন্থগুলোর একটি হচ্ছে আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম গ্রন্থটি। সামসময়িক প্রসিদ্ধ আলেম মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব রহ. এই গ্রন্থে টীকা সংযোজন করেছেন। আলোচ্য গ্রন্থের সঙ্গে তিনি আরও অনেক মূল্যবান আলোচনা সংযোজন করেছেন। যা পাঠকদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে তুলবে।
২. ইবনে তাইমিয়া রহ. রচিত মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা। প্রকৃতপক্ষেই তিনি শাইখুল ইসলাম উপাধির উপযুক্ত। তিনি ছিলেন বিদআতিদের বিরুদ্ধে সুন্নাহর উন্মুক্ত তরবারি। শিয়া ও কদরিয়্যা³⁸ আকিদা এবং ফিতনার ঘটনাবলি নিয়ে যারা জানতে চায়, তাদের জন্য এই গ্রন্থের বিকল্প নেই। গ্রন্থটি চার খণ্ডে লিখিত। সাহাবিগণের ওপর আরোপিত প্রশ্ন এবং অপবাদের জবাবে তিনি গ্রন্থটিতে মানতেক তথা তর্কশাস্ত্র এবং যুক্তির ব্যবহারও করেছেন।
৩. আল্লামা ইবনে কাসির রহ. রচিত আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া। এটিকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য এবং উত্তম গ্রন্থসমূহের একটি বিবেচনা করা হয়। প্রত্যেক মুসলিমের জন্যই আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া সংগ্রহে রাখা উচিত। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, ইবনে কাসির রহ. কিছু কিছু স্থানে ওয়াকিদি থেকে বর্ণনা করেছেন। এসব বর্ণনা নির্ভরযোগ্য নয়। তবে ইবনে কাসির রহ. বর্ণিত অনেক গ্রহণযোগ্য বর্ণনাও রয়েছে। তিনি ইমাম তবারি রহ. প্রণীত তারিখুল উমামি ওয়াল মুলুক থেকেও অনেক বর্ণনা এনেছেন।
৪. ইহসান ইলাহি জহির রচিত আশ-শিয়াতু ওয়াত তাশাইয়ু। এটি শিয়া এবং তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে আলোকপাতকারী সবচেয়ে সুন্দর গ্রন্থের একটি। সাম্প্রতিক সময়ে রহস্যজনকভাবে লেখককে হত্যা করা হয়েছে। তার রচিত এই গ্রন্থটি শিয়া এবং শিয়া মতাদর্শ সম্পর্কে রচিত সর্বোত্তম গ্রন্থগুলোর একটি।
৫. আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহ. রচিত তারিখুল খুলাফা। এ গ্রন্থে প্রত্যেক খলিফার ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। যদিও ফিতনাসংক্রান্ত ঘটনার বর্ণনায় তিনি খুব বেশি সতর্কতা অবলম্বন করেননি। ইমাম সুয়ুতি ৯১১ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।
৬. মোস্তফা নাজিব রচিত হুমাতুল ইসলাম। এটি সংক্ষিপ্ত হলেও খুবই মূল্যবান একটি গ্রন্থ। এ গ্রন্থের অধিকাংশই নির্ভরযোগ্য। গ্রন্থটির বিভিন্ন স্থানে লেখকের পক্ষ থেকে যে টীকা যুক্ত করা হয়েছে তাও খুব চমৎকার।
৭. আল্লামা ইবনে কাসির রহ. রচিত ইসতিশহাদুল হুসাইন।
৮. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. রচিত রাঅসুল হুসাইন।
৯. নাসিরুদ্দিন শাহ রচিত আল-আকাইদুশ শিইয়্যা।
১০. সাইদ ইসমাইল রচিত হাকিকতুল খিলাফ বাইনা উলামায়িশ শিয়া ওয়া জুমহুরি উলামায়িল মুসলিমিন।
১১. আল্লামা মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব রহ. রচিত আল-উসুসুল্লাতি কামা আলাইহা দ্বীনুশ শিয়াতিল ইমামিয়্যাতিল ইসনা আশারিয়্যা।
আল্লামা মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব রহ. তার জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করেছেন শিয়া এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মধ্যে সামঞ্জস্যতার দাবিদারদের অপনোদন এবং তাদের নিয়ে গবেষণা করে। তিনি বলেন, আহলুস সুন্নাহ এবং শিয়াদের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। শিয়া মতবাদ ইসলাম ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। শিয়াদের গ্রন্থসমূহে তাদের আকিদাগুলো অধ্যয়ন করলে এ বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে যাবে।
এই আকিদাগুলো আমাদের ভালোভাবে বোঝা এবং আয়ত্ব করা উচিত। ফিতনাসংক্রান্ত এই স্পর্শকাতর বিষয়ে অধ্যয়ন করার সময় আমরা যেসব গ্রন্থ অধ্যয়ন করব, কিছুতেই কোনো লেখককে ত্রুটিমুক্ত মনে করব না। কারণ, শিয়ারা লোকদের বুঝাতে চায় যে, কেবল আবু বকর রা. এবং উমর রা.-এর সময়েই ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল। এরপর ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। তাদের দাবি অনুযায়ী এরপর থেকে ইসলাম রক্তারক্তি এবং হানাহানির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। তাই ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কোনো প্রয়োজন নেই। নয়তো আমাদের পরিণতি, তাদের পরিণতির মতোই হবে। তাদের দাবি অনুযায়ী, রাসুল ﷺ থেকে সরাসরি দীক্ষা গ্রহণকারী সাহাবিগণই যদি এমন সব অন্যায়কর্ম করে থাকেন, তাহলে অন্যরা কী করবে তা বলার অপেক্ষা রাখা না। এই কথাটি প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যেই তারা এসব বানোয়াট এবং মিথ্যা বর্ণনা ছড়িয়ে থাকে।
অতএব, ফিতনাসংক্রান্ত ঘটনা পাঠ করার সময় আপনার জন্য উচিত হবে এ ঘটনা উল্লেখকারী উৎস এবং রেফারেন্সগুলো খতিয়ে দেখা এবং সেগুলোর বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা যাচাই করে নেওয়া।
টিকাঃ
৩৮. কদরিয়্যা: তাকদিরকে অস্বীকারকারী একটি কাফের দল। তাদের দাবি হলো, যেকোনো ঘটনা ঘটার পূর্বে আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে জানেন না। নাউজুবিল্লাহ। এ দলটির উৎপত্তি হয় হিজরি প্রথম শতাব্দীতে। তুহফাতুল আহওয়াযি, ৬/৩০৩ (শামেলা)-সম্পাদক
📄 দুই নুরের অধিকারী উসমান ইবনে আফফান রা.
ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, ফিতনার ঘটনা অধ্যয়ন দ্বারা আমাদের প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে সাহাবিগণের ওপর আরোপিত অপবাদ এবং আপত্তিসমূহের জবাব দেওয়া। এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ কাজ। আমরা রাসুল ﷺ-এর সাহাবি জাবের রা.-এর হাদিসও উল্লেখ করেছি। তিনি বলেন, রাসুল ﷺ বলেছেন, যখন এ উম্মতের শেষাংশ প্রথমাংশের (সাহাবিগণের) ওপর (তাদের মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞতাবশত) অভিসম্পাত করবে, তখন যারা এ বিষয়ে (তাদের মর্যাদার বিষয়ে) জানে তারা যেন তাদের জ্ঞান প্রকাশ করে। নয়তো এই জ্ঞান গোপন করার কারণে মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ জ্ঞানকে গোপন করার সমতুল্য অপরাধ হবে।³⁹
আমরা এ কথার কারণও উল্লেখ করেছি। নিশ্চয় ওই সকল সাহাবিগণ আমাদের কাছে রাসুল ﷺ থেকে কুরআন ও সুন্নাহ বর্ণনা করেছেন। তাই তাদেরকে যদি কাফের, ফাসেক, মিথ্যাবাদী অথবা খেয়ানতকারী বলা হয় এবং যারা এ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে তারা চুপ থাকে, তাহলে এর অর্থ এই দাঁড়াবে যে, আমাদের কাছে তাদের বর্ণিত যা-কিছু আছে সেগুলো নির্ভরযোগ্য নয়, গ্রহণযোগ্যও নয়। এতে পুরো দ্বীনই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং রাসুল ﷺ-এর ওপর যে জ্ঞান অবতীর্ণ করা হয়েছে তা গোপন করা হবে।
তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের উচিত, সকল সাহাবির ন্যায়পরায়ণতা জোর দিয়ে প্রমাণ করা। কোনো অবস্থায়ই তাদের ওপর আরোপিত কোনো অপবাদ মেনে নেওয়া যাবে না। যদি তারা কোনো কথায় ভুলও করে ফেলেন তাহলে আমরা বলব যে, তিনি ইজতেহাদের ক্ষেত্রে ভুল করেছেন। এতেও তিনি সওয়াব পাবেন। আর তাদের যেসব বর্ণনার সূত্র বিশুদ্ধ সেগুলো সম্পূর্ণরূপে গ্রহণযোগ্য।
আল্লাহ তাআলা রাসুল ﷺ ও তাঁর জাতিকে সম্বোধন করে বলেন, 'তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য।' [সুরা আলে ইমরান: ১১০]
তিনি আরও বলেন, 'এভাবেই আমি তোমাদের বানিয়েছি মধ্যপন্থী জাতি।' [সুরা বাকারা: ১৪৩]
আরও বলেন, 'আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইআত গ্রহণ করছিল। আল্লাহ অবগত ছিলেন সে সম্পর্কে যা তাদের অন্তরে ছিল। তাই তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি অবতীর্ণ করেছেন এবং তাদেরকে পুরস্কারস্বরূপ দিয়েছেন আসন্ন বিজয়।' [সুরা ফাতহ : ১৮]
আয়াতে উল্লেখিত বাইআতে (বাইআতে রিদওয়ানে) অংশগ্রহণকারী অনেক সাহাবির ওপরও অপবাদ আরোপ করা হয়েছে। শিয়ারা তাদের শুধু ফাসেক বলেই থেমে যায়নি, বরং কাফেরও আখ্যা দিয়েছে। আমরা এ থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'অগ্রগামী মুহাজির ও আনসারগণ এবং তাদেরকে যারা নিষ্ঠার সঙ্গে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহ তাআলার প্রতি সন্তুষ্ট। তাদের জন্য আল্লাহ তাআলা প্রস্তুত করেছেন জান্নাত। যার তলদেশ দিয়ে বয়ে যায় প্রস্রবণধারা। তারা সেখানে হবে চিরস্থায়ী। এটিই বিরাট সফলতা।' [সূরা তাওবা : ১০০]
তিনি আরও বলেন, 'হে নবী, আপনার জন্য আল্লাহ তাআলা এবং যে-সকল মুমিন আপনার অনুসরণ করেছে তারাই যথেষ্ট।' [সূরা আনফাল : ৬৪]
আরও বলেন, 'এই ধনসম্পদ ওই সকল মুহাজির দরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য, যাদেরকে নিজ ভিটেমাটি এবং সম্পদ থেকে উৎসাত করা হয়েছে। যারা আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ এবং সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সাহায্য করেন, তারাই প্রকৃত সত্যবাদী।' [সূরা হাশর : ৮]
আরও বলেন, 'তোমরা কেন আল্লাহ তাআলার পথে ব্যয় করছ না? অথচ আসমান এবং জমিনের সব মিরাস তাঁরই। তোমাদের মধ্যে যারা (মক্কা) বিজয়ের পূর্বে দান করেছে এবং জিহাদ করেছে তারা পরবর্তীদের সমান নয়। (মক্কা) বিজয়ের পর যারা দান করেছে এবং জিহাদ করেছে তাদের তুলনায় (মক্কা) বিজয়ের আগে যারা দান করেছে এবং জিহাদ করেছে তারা অধিক মর্যাদাবান। তবে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রত্যেককেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সম্যক অবগত।' [সূরা হাদিদ : ১০]
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. প্রিয় রাসুল ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, সর্বোত্তম জাতি হচ্ছে আমার সময়কার লোকেরা, এরপর তাদের পরবর্তীগণ। এরপর তাদের পরবর্তী সময়ে যারা আসবে তারা। এই তিন সময়ের পর এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হবে, যারা সাক্ষ্য দেওয়ার পূর্বেই শপথ করে নেবে এবং সাক্ষ্য দিতে বলার আগেই সাক্ষ্য দিয়ে বসবে।⁴⁰
হাদিসটি আবু হুরাইরা রা. এবং ইমরান ইবনে হুসাইন রা. থেকেও বর্ণিত হয়েছে। এ হাদিসটি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম উভয় গ্রন্থেই উল্লেখ করা হয়েছে। আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, তোমরা আমার সাহাবিগণকে গালি দিয়ো না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও ব্যয় করে ফেলে, তবুও তাদের এক মুদ⁴¹ অথবা অর্ধেক মুদের সমান হবে না।⁴²
কিন্তু শিয়া আলেমদের মত হলো যে, প্রথম তিন খলিফা রাসুল-এর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। মাহদি আসকারি তার গ্রন্থে এমনটিই ব্যক্ত করেছে। এদিকে গণপ্রজাতন্ত্রী ইরানের ইসলামবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি নতুন পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। যাতে সকল সাহাবিগণকে নিম্নোক্ত তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে।
প্রথম শ্রেণি : যাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়েছেন। মূলত যাদের প্রতি শিয়া আলেমগণ সন্তুষ্ট এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে। মাত্র পাঁচজন সাহাবিকে তারা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করেছে। তারা হলেন, আলি ইবনে আবু তালেব রা., আম্মার ইবনে ইয়াসির রা., মিকদাদ ইবনে আমর রা., আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এবং সালমান ফারসি রা.।
দ্বিতীয় শ্রেণি : উক্ত পুস্তিকার বক্তব্য মতে তারা সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি এবং তারা অবাধ্যদের অনুসরণে জীবন বিসর্জন দিয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে তাদের একজন বলা হয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণি : পুস্তিকার বক্তব্য মতে এই শ্রেণির সাহাবিগণ তাঁদের মর্যাদা বিকিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের প্রতিটি হাদিসকে তারা দিনারের বিনিময়ে বিক্রি করেছেন। তাঁদের এই মত থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় চাইছি। আবু হুরাইরা রা. এবং আবু মুসা আশআরি রা. প্রমুখ সাহাবিকেও তারা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করেছে।
আমরা জানি, আবু হুরাইরা রা. হলেন সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি। যদি তিনি কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে ধর্ম বিক্রি করে থাকেন, তবে তাদের দাবি অনুযায়ী তাঁর বর্ণিত সব হাদিসই বাতিল হয়ে যাবে। এমনিভাবে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একাই বর্ণনা করেছেন ৪ হাজার হাদিস। তাঁর হাদিসগুলোও তাদের মতে গ্রহণযোগ্য নয়। দেখা যাচ্ছে, ব্যাপারটি খুবই বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.-কে তারা বলে বেপরোয়া। উসমান রা.-কে বলে সামাজিক প্রতিপত্তিশালী। আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.-কে বলে সম্পদের পূজারি। সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-কে বলে তাকওয়াহীন।
অথচ উসমান রা., আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এবং সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. হলেন রাসুল ﷺ-এর মুখে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন সাহাবির অন্তর্ভুক্ত। তাহলে তারা কাদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে? সাহাবিগণকে নাকি রাসুল ﷺ-কে? খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.-কে আমরা সাইফুল্লাহ তথা আল্লাহ তাআলার উন্মুক্ত তরবারি বলে জানি।
শিয়া নেতা খোমেনি তাঁর কাশফুল আসরার গ্রন্থে লিখেছেন, আবু বকর রা., উমর রা. এবং উসমান রা. রাসুল ﷺ-এর খলিফা ছিলেন না। বরং আরও আগ বাড়িয়ে তিনি লেখেন, তারা আল্লাহ তাআলার বিধানে পরিবর্তন সাধন করেছে। হারামকে হালাল করেছে। রাসুল ﷺ-এর বংশধরগণের ওপর অত্যাচার করেছে এবং ঐশী নিয়মকানুন ও ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে তারা ছিল অজ্ঞ।⁴³
এই হলো সাহাবিগণকে নিয়ে তাদের মিথ্যা রটনার সমুদ্র থেকে সামান্য কয়েক ফোঁটা।
টিকাঃ
৩৯. আল-মুজামুল আওসাত লিত তবারানি, ৪৩০
৪০. সহিহ মুসলিম, ২৫৩৩; আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি, ১১৭৫০; সহিহ ইবনি হিব্বান, ৭২২৩; সহিহ বুখারি, ২৬৫২
৪১. মুদ: একটি পরিমাপের নাম। এক মুদ = ৮১৭.৬৫ গ্রাম।
৪২. সহিহ বুখারি, ৩৬৭৩; সহিহ মুসলিম, ২৫৪১
৪৩. কাশফুল আসরার, পৃ. ১২০-১২৫