📄 ক্রয়-বিক্রয়ের পরিচয় ও তার হুকুম
ক. পরিচয়: আভিধানিক অর্থে ক্রয়-বিক্রয়: أخذ شيء وإعطاء شيء “কিছু দিয়ে কিছু নেওয়া।” পরিভাষিক অর্থে: নগদ অথবা বাকিতে কোনো অর্থ-সম্পদ কিংবা বৈধ উপকার নেওয়ার বিনিময়ে স্থায়ীভাবে সম্পদের লেনদেন করা। তবে অবশ্যই এটি কোনো ধরনের ঋণ কিংবা সুদ হবে না।
খ. ক্রয়-বিক্রয়ের হুকুম: ক্রয়-বিক্রয় করা বৈধ। মহান আল্লাহ বলেন: وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا “আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” [সূরা বাক্বারাহ: ২৭৫] ইবনু উমার বর্ণনা করেন। নাবী বলেন: إِذَا تَبَايَعَ الرَّجُلانِ، فَكُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا، وَكَانَا جَمِيعًا “যখন দুই ব্যক্তি ক্রয়-বিক্রয় করে, তখন তাদের উভয়ে যতক্ষণ বিচ্ছিন্ন না হবে অথবা একে অপরকে ইখতিয়ার প্রদান না করবে, ততক্ষণ তাদের উভয়ের ক্রয়-বিক্রয় বাতিল করা বা না করার স্বাধীনতা থাকবে।”৬৭৪
আর সকল মুসলমানও ক্রয়-বিক্রয় বৈধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
মানুষের প্রয়োজনীয়তার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এর প্রয়োজন রয়েছে। কারণ অন্যের নিকটে থাকা জিনিস মানুষের প্রয়োজন হয়, তাই এর সাথে কল্যাণ জড়িত রয়েছে। কারণ ক্রয়-বিক্রয় ব্যতীত বৈধ পন্থায় কোনো বস্তু অন্যের কাছে পৌছার কোনো উপায় নেই। সমস্যা দূর করে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করার জন্যই ক্রয়-বিক্রয়কে বৈধ ও শরীয়ত সম্মত করা হয়েছে।
টিকাঃ
৬৭৪. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১২১; সহীহ মুসলিম, হা. ফুয়া. ১৫৩১।
📄 ক্রয়-বিক্রয়ের রুকন
ক্রয়-বিক্রয়ের তিনটি রুকন রয়েছে। সেগুলো হলো- ১. চুক্তিকারী; ২. চুক্তিকৃত বস্তু; ৩. চুক্তি করার শব্দ।
এখানে চুক্তিকারী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ক্রেতা এবং বিক্রেতা। আর চুক্তিকৃত বস্তু দ্বারা উদ্দেশ্য বিক্রীত পণ্য; চুক্তি করার শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য ইজাব ও কবুল তথা বিক্রিকারীর পক্ষ থেকে বলা যে, আমি বিক্রি করলাম আর ক্রেতার পক্ষ থেকে বলা যে, আমি তা ক্রয় করলাম।
এটি হলো কথা বলার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে ক্রয়-বিক্রয় করা।
এ ছাড়া কথা না বলে শুধু কর্মের মাধ্যমেও ক্রয়-বিক্রয় হয় আদান-প্রদানের মাধ্যমে। যেমন- ক্রেতা বিক্রেতার কাছ থেকে কোনো পণ্য নিয়ে কোনো কথা না বলে নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে দিলো।
📄 ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখা
ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَشْهِدُوا إِذَا تَبَايَعْتُمْ "তোমরা ক্রয়-বিক্রয়ে সাক্ষী রাখো।” [সূরা বাক্বারাহ: ২৮২]
মহান আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সাক্ষ্যর বিষয়ে মানুষদেরকে উৎসাহিত করতে এখানে সাক্ষী রাখার আদেশ করেছেন। আদেশ করা হলেও তা ওয়াজিব নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُمْ بَعْضًا فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَانَتَهُ "তোমাদের কেউ যদি একে অপরকে নিরাপদ মনে করে তাহলে সে তার কাছে রাখা আমানত অন্যকে দিতে পারে।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৮৩]
এর দ্বারা প্রমাণ করে, এই আদেশ নিরাপদ ও কল্যাণকর দিকনির্দেশনার জন্য।
উমারাহ বিন খুঝাইমা থেকে হাদীস বর্ণিত। তার চাচা হাদীস বর্ণনা করেছেন- যিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবী।
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ابْتَاعَ فَرَسًا مِنْ أَعْرَابِي، وَاسْتَتْبَعَهُ لِيَقْبِضَ ثَمَنَ فَرَسِهِ، فَأَسْرَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبْطَأَ الْأَعْرَابِيُّ، وَطَفِقَ الرِّجَالُ يَتَعَرَّضُونَ لِلْأَعْرَابِيِّ، فَيَسُومُونَهُ بِالْفَرَسِ، وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ابْتَاعَهُ ...
“নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক বেদুঈন হতে একটি ঘোড়া ক্রয় করলেন। তারপর বেদুঈন ঘোড়ার মূল্য গ্রহণের জন্য তার পিছনে চলল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্রুত চলছিলেন আর সে ধীরে। এ সময় লোকজন তার সামনে পড়লে তারা ঘোড়ার দরদাম করতে লাগল। তারা জানত না যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা ক্রয় করেছেন। তাই তারা তার স্থিরীকৃত মূল্যের উপর আরও মূল্য বাড়িয়ে বলতে লাগল।...'৬৭৫
হাদীসে বর্ণিত يسومونه শব্দের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তারা তার থেকে তা ক্রয় করতে চাইল।
উক্ত হাদীস থেকে কয়েকটি বিষয় বুঝা যায়। সেগুলো হলো- ক. নাবী গ্রাম্য লোকের কাছ থেকে ঘোড়াটি কিনেছিলেন। কিন্তু তাদের মাঝে কোনো সাক্ষী ছিল না। সুতরাং ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে যদি সাক্ষী রাখা ওয়াজিব হতো তাহলে তিনি সাক্ষী না রেখে তা ক্রয় করতেন না।
খ. নাবী এর যুগে সাহাবীরাও বাজারে ক্রয়-বিক্রয় করতেন তবে এটা বর্ণিত হয়নি যে, তিনি সাহাবীদেরকে ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখতে আদেশ করেছেন কিংবা তিনি নিজে তা করেছেন।
গ. দৈনন্দিন জীবনে মানুষের অনেক কিছুই ক্রয় করতে হয়। সব ধরনের ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রেই যদি সাক্ষী রাখা ওয়াজিব হতো, তাহলে তা মানুষদের জন্য কষ্টকর হয়ে যেত।
ঘ. যদি বড়ো কোনো বস্তু ক্রয়-বিক্রয় করা হয় এবং তার কোনো মূল্য বাকি থাকে, তাহলে অবশ্যই তা লিখে রাখা ও সাক্ষী রাখা উচিত। যেন কোনো ধরনের সমস্যা হলে ঐ লেখা ও সাক্ষীর দিকে ফিরে যাওয়া যায়।
টিকাঃ
৬৭৫. আহমাদ ৫/২১৫; সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৬০৭; নাসাঈ, হা. ৪৬৪৭; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহুন নাসাঈ, হা. ৪৩৩২।
📄 ক্রয়-বিক্রয়ে ইচ্ছাধিকার
خيار বা খিয়ার: ক্রেতা-বিক্রেতা প্রত্যেবের জন্য ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি ঠিক রাখা অথবা বাতিল করার অধিকার থাকা।
যদিও ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো, যখন বেচা-কেনার রুকন ও শর্তসমূহ পূর্ণ হয়ে যাবে এবং ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হবে তখন তা থেকে ফিরে আসার কারো অধিকার থাকবে না।
কিন্তু ইসলাম ধর্ম হলো, সহজতা ও সহমর্মিতার ধর্ম। সুতরাং, প্রতিটি ব্যক্তির কল্যাণ ও অবস্থার দিকে লক্ষ্য রেখেছে। এজন্যই কোনো মুসলিম যখন কোনো কারণে কিছু কিনবে বা বিক্রি করবে, তারপর সে আবার ক্রয়-বিক্রয় থেকে ফিরে আসতে ইচ্ছা করবে, ইসলামী শরীয়ত তার জন্য এই ইচ্ছাধিকারের বৈধতা দিয়েছে যেন সে তার বিষয়ে চিন্তা করতে পারে এবং নিজের কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রাখতে পারে। সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে দেখতে পারবে যে, সে তার ক্রয়-বিক্রয় ঠিক রাখবে না বাতিল করবে।
الخيار বা ইচ্ছাধিকারের প্রকারভেদ: الخيار বা ইচ্ছাধিকারের বিভিন্ন প্রকার আছে। সেগুলোর মধ্য হতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
১. خيار المجلس তথা বৈঠকের ইচ্ছাধিকার। মজলিস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যেখানে ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। সুতরাং যতক্ষণ ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ে মজলিসে থাকবে ততক্ষণ ক্রয়-বিক্রয় বাতিল করার অধিকার থাকবে। যখন ক্রেতা এবং কিক্রেতার কেউ মজলিস ত্যাগ করবে তখন এই خیار বা স্বাধীনতা বাতিল হয়ে যাবে। ইবনু উমার বলেন, নাবী বলেন:
البَيِّعَانِ بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا “ক্রেতা-বিক্রেতা পৃথক না হলে উভয়েরই (ক্রয়-বিক্রয় বাতিল করার) অধিকার থাকবে।”৬৭৬
২. خيار الشرط তথা শর্তসাপেক্ষে ইচ্ছাধিকার। আর তা হলো ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে কিংবা তাদের একজন ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি ঠিক রাখা বা না রাখার ব্যাপারে নির্ধারিত কিছু সময়ের শর্ত করা। তারপর যদি এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি বাতিল না করে তাহলে চুক্তি সংঘটিত হয়ে যাবে। পরে তা বাতিল করার ইচ্ছাধিকার থাকবে না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ব্যক্তি কারো থেকে গাড়ি ক্রয়ের সময় বিক্রেতাকে বলল, আমার জন্য পূর্ণ এক মাসের ইচ্ছাধিকার থাকবে। এই সময়ের মধ্যে আমি ক্রয়ের চুক্তি ঠিক রাখতে পারি আবার বাতিলও করতে পারে। কিন্তু ক্রেতা যদি নির্দিষ্ট এক মাসের মধ্যে সেই চুক্তি বাতিল না করে, তাহলে উল্লিখিত সময় শেষ হলেই চুক্তি পরিপূর্ণভাবে সংঘটিত হয়ে যাবে। তারপর আর চুক্তি বাতিল করার কোনো অধিকার থাকবে না।
৩. خيار العيب তথা ত্রুটি থাকার কারণে ইচ্ছাধিকার। এই ইচ্ছাধিকারটা থাকবে শুধু ক্রেতার জন্য। ক্রেতা যদি তার বস্তু ক্রয়ের পর এমন কোনো ত্রুটি সম্পর্কে অবগত হয়, যেই বিষয়ে বিক্রেতা তাকে পূর্বে জানায়নি অথবা বিক্রেতা নিজেও সেই ত্রুটি সম্পর্কে জানত না, আর ত্রুটি যদি পণ্যের মূল্য কমিয়ে দেয়, তাহলে এই অধিকার থাকবে। তবে ত্রুটিকে ত্রুটি হিসাবে সাব্যস্ত করার জন্য অবশ্যই গ্রহণযোগ্য অভিজ্ঞদের মতামত নিতে হবে। তারা যদি ত্রুটিকে ত্রুটি বলে বিবেচনা করে তাহলেই তা ত্রুটি বলে গণ্য হবে। অন্যথায় ত্রুটি হিসেবে গণ্য হবে না।
৪. خيار التدليس তথা কোনো বিষয় গোপন করা। আর তা হলো, ক্রয়-বিক্রয়ের সময় বিক্রেতা ক্রেতার কাছে এমন কিছু গোপন করা যার কারণে পণ্যের মূল্য বেড়ে যায়। এটি অবশ্যই হারাম। নাবী বলেন: مَنْ غَشْنَا فَلَيْسَ مِنَّا
"যে ব্যক্তি ধোকা দেয় সে আমাদের দলভুক্ত না।”৬৭৭
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ব্যক্তির কাছে একটি গাড়ি আছে। আর সেই গাড়িটিতে অনেক ত্রুটি রয়েছে। কিন্তু বিক্রেতা গাড়ির উপর সুন্দর রং দিয়ে ক্রেতার সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করল যেন তা একটি ত্রুটিমুক্ত গাড়ি। ক্রেতা সেটি কিনে নিলো। এই অবস্থায় ক্রেতা পণ্য ফেরত দিয়ে তার মূল্য ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার রাখবে।
টিকাঃ
৬৭৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১১০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫৩২।
৬৭৭. সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১০১।