📄 অষ্টম সংশয় : যুগের পরিবর্তন ও ফাহমুস সালাফ
সালাফদের বুঝ তাদের যুগের সাথে সংগতিপূর্ণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। যুগের পরিবর্তন ঘটেছে। সুতরাং যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে টেক্সটের (মূল নসের) বুঝেরও পরিবর্তন হওয়া জরুরি। কারণ কুরআন-সুন্নাহ প্রত্যেক যুগ ও স্থানের জন্য উপযোগী। সালাফদের বুঝকে আঁকড়ে ধরা নুসুসে শরিয়াহর এই গতিশীলতাকে নষ্ট করে দেয়।
নিরসন :
বর্তমান সময়ে এসে আমরা আধুনিক শিক্ষিত কিংবা পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত স্কলারদের মুখেও এ ধরনের বক্তব্য শুনতে পাই। এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করা কিছু কিছু 'দুকতুর' এ বক্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের ইজতিহাদি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ জাহির করে থাকেন। বরাবরের মতো কোনো ব্যক্তির নাম ও বক্তব্যকে উল্লেখ করা ছাড়াই আমরা মূল আপত্তির বিষয়টি নিরসন করার চেষ্টা করব।
এক. এই বক্তব্যের মাধ্যমে শরয়ি নসসমূহের পবিত্রতা নষ্ট করে তা আপেক্ষিক বানিয়ে দেওয়া হয়। তখন প্রত্যেকের সামনে নিজের মনমতো কুরআন-সুন্নাহ ব্যাখ্যা করার পথ খুলে যায়। নুসুস বোঝার ক্ষেত্রে তখন একমাত্র কেন্দ্র হয়ে যায় মানুষের আকল ও কথিত বাস্তবতা, যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল এবং ত্রুটিযুক্ত।
ফলে এই দাবি মেনে নিলে শরিয়াতের বিধানসমূহ তার শ্বাশত মর্যাদা হারিয়ে ফেলে। নস বোঝার মৌলিক কোনো কেন্দ্র তখন অবশিষ্ট থাকে না।
এই চিন্তার পেছনে টেক্সট পাঠ-সংক্রান্ত একটি বিশেষ পশ্চিমা নীতি প্রভাব রেখেছে। সেই বিশেষ পদ্ধতিটির নাম হলো- 'তারিখিয়্যাহ বা ইতিহাসবাদ'। তারিখিয়্যাহর মূল কথা হলো, ওহির টেক্সট ও তার বুঝকে কেবলই একটি ঐতিহাসিক আবিষ্কার হিসেবে দেখা। ইতিহাসের নির্দিষ্ট সময় এই টেক্সটগুলো এসেছে এবং একে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বুঝ তৈরি হয়েছে। ফলে এই বুঝগুলো নির্দিষ্ট ওই জমানার সাথেই বিশেষিত হয়ে থাকবে। ইতিহাস ও যুগের অগ্রসরের সাথে সাথে টেক্সটের এই বুঝগুলো নতুন নতুন রূপ ধারণ করবে। মানুষের জীবনযাত্রার অগ্রসরের সাথে সাথে প্রত্যেক জমানার লোক নিজেদের মতো করে নতুন নতুন বুঝ তৈরি করে নেবে। অর্থাৎ বক্তার উদ্দেশ্য কী, এই বিষয়ের চেয়ে এখানে যুগের পরিবর্তন বা বাস্তবতা বেশি গুরুত্ব পাবে।
আধুনিকপন্থি মুসলিমরা ইতিহাসবাদের মাধ্যমে চরমভাবে প্রভাবিত। এজন্য তারা মনে করে, 'সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফদের ফাহম তাদের যুগের বাস্তবতা ও সংস্কৃতি অনুযায়ী তৈরি হয়েছিল। সেগুলো আমাদের বাস্তবতা ও সংস্কৃতির জন্য উপযোগী নয়। এজন্য আমাদেরকে বর্তমান সময়ের সাথে মিলিয়ে নুসুসে শরিয়াহ পাঠ করতে হবে। এই পাঠের ক্ষেত্রে আমাদের বাস্তবতার আলোকে নুসুসে শরিয়াহ বুঝতে হবে। নুসুসে শরিয়াহর কারও বুঝই অকাট্য না, সব বুঝই আপেক্ষিক, অকাট্য কিছু নয়।'
এ ধরনের দাবি সম্পূর্ণ ভুল। নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে সালাফে সালেহিনের মূল মনোযোগ কেবল তাদের যুগের সংস্কৃতির প্রতি ছিল না। আর না তাদের ফাহম নির্দিষ্ট বাস্তবতা ও সামাজিকতা নির্ভর ছিল। সাহাবায়ে কেরাম নুসুসে শরিয়াহকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল ও বুঝ, আরবি ভাষা, নুসুস অবতরণের প্রেক্ষাপট ইত্যাদি নুসুস সংশ্লিষ্ট বিষয় থেকে বুঝেছেন। এই বুঝ কিয়ামত পর্যন্ত আগত সময় ও বাস্তবতার সমাধান দিতে সক্ষম। তাই এর মাধ্যমে তারা উম্মতকে আপেক্ষিক নয়, বরং সার্বজনীন এক ফাহমের সিলসিলা উপহার দিয়েছেন। এরপর তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়ি ও আইম্মায়ে কেরামের সেই ফাহমের ওপর ভিত্তি করে ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রের একটি বিশাল কাঠামো গঠিত হয়েছে, যেটি আমরা তাদের কিতাবাদিতে সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাই। সুতরাং সালাফরা নির্দিষ্ট যুগ ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কুরআন-সুন্নাহকে বুঝেছেন এমন দাবি সম্পূর্ণ বাতিল। এই ধারণার কোনো ঐতিহাসিক বাস্তবতাও আমরা সালাফদের ইলমি কারনামায় পাব না। সালাফে সালেহিনের বুঝকে সাধারণভাবে আপেক্ষিক বানিয়ে দিয়ে, প্রত্যেকের বুঝের কাছে নুসুসে শরিয়াহ ছেড়ে দিলে দীনের কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। শরিয়াত তখন ওহির মর্যাদা হারিয়ে মানুষের অবাধ্য ও বিভ্রান্ত আকলের কাছে খেলনার পাত্রে পরিণত হবে। তখন আকলের ওপর ওহির কর্তৃত্ব থাকবে না; বরং ওহির ওপর প্রবৃত্তি প্রভাবিত মানবীয় আকল রাজ করবে, যা নির্ভুল জ্ঞানতত্ত্বকে ধ্বংস করে দেয়। কারণ মানব আকলের ওপর ওহির কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো যথার্থ ও বিশুদ্ধ জ্ঞানতত্ত্ব অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না।
এই দাবির আবশ্যিক ফল হলো, শরিয়াতের বিধানসমূহকে নির্দিষ্ট একটি জমানার জন্য বিশেষায়িত করে দেওয়া এবং শরয়ি নুসুসকে যুগের অনুগামী বানিয়ে নতুন ব্যাখ্যার আবিষ্কার করা। এভাবে কখনো শরিয়াতের অনুসরণ হয় না, তখন নিজের আকল কিংবা প্রবৃত্তির অনুসরণ করা হয়। ইসলামের দাবি এটা নয় যে, যুগের আলোকে কুরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যা পরিবর্তন করা হবে; বরং শরিয়াতের আলোকে যুগ পরিবর্তন করাই নবি-রাসুলদের কাজ ছিল।
ওহি প্রেরণ করে তার অনুসরণ ও তা আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেওয়া এবং বিমুখ হলে শাস্তির ভীতি প্রদর্শন, আবার একই সাথে সকল ধরনের মানুষের জন্য ইচ্ছামতো ওহির মর্ম বের করার উন্মুক্ত অনুমোদন দেওয়া পদ্ধতিগতভাবে একটি সাংঘর্ষিক বিষয়। মহান আল্লাহ তাআলা এ ধরনের সাংঘর্ষিক নির্দেশনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
দুই. কুরআন ও সুন্নাহ কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি যুগ এবং প্রতিটি স্থানের জন্য উপযুক্ত। এই কথার অর্থ এটা নয় যে, যুগের সাথে সাথে কুরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যায় পরিবর্তন আসবে এবং যুগের যেকোনো পরিবর্তনকে ইসলাম গ্রহণ করে নেবে। ইসলাম মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ এক জীবনব্যবস্থা। মানবজীবনের এমন কোনো অনুষঙ্গ নেই, যার ব্যাপারে ইসলামের বিধান নেই। ইসলামের এমন কিছু প্রিন্সিপাল (মূলনীতি) আছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত যত পরিবেশ ও পরিস্থিতি আসবে, সবগুলোর ওপর তার বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।
এটিই হচ্ছে ইসলামের গতিশীলতা। একজন মুজতাহিদ ফকিহের দায়িত্ব হলো, তিনি নবউদ্ভাবিত পরিস্থিতিতে শরিয়তের বক্তব্য কী, তা গবেষণা করে বের করবেন। তার গবেষণার উদ্দেশ্য থাকবে আল্লাহর বিধান পর্যন্ত পৌঁছা, নিজের প্রবৃত্তি কিংবা যুগের কাছে শরিয়াহকে বলি দেওয়া নয়।
যুগের প্রয়োজনই মানবজীবনের চূড়ান্ত প্রয়োজন নয়। অনেক সময় কৃত্রিম প্রয়োজনও তৈরি হয়। কাফের বা শত্রু পক্ষ থেকে কোনো অবস্থা চাপিয়ে দেওয়া, অথবা দীনের প্রভাব কমে যাওয়ার কারণে শরিয়াহর কিছু বিধান আমাদের জন্য কষ্টকর বা অসম্ভবপর মনে হতে পারে। এই অবস্থার জন্য আমাদের শরিয়াতের বিধান পরিবর্তন বা সংস্কার করে ফেলা কাম্য নয়; বরং যে অবস্থায় আমরা পতিত আছি, সে অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টাই এখানে ইসলাম আমাদের থেকে কামনা করে। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানবি রহিমাহুল্লাহ শরিয়াহর বিধান পরিবর্তনের ব্যাপারে মডার্নিস্টদের জবাব দিতে গিয়ে বলেন, 'শরিয়াহর কোনো বিধান পালন করতে গিয়ে আমরা যদি কষ্টের সম্মুখীন হই তার মানে এই নয় যে, সমস্ত মানুষ এটি পালন করছে, তারপর কষ্টে পতিত হচ্ছে। এই বিষয়টি কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। এই কাঠিন্যের বাস্তব কারণ হলো, শরিয়াহর বিধান পালনকারীর সংখ্যা পালন না করা ব্যক্তিদের তুলনায় খুবই নগণ্য। যখন অল্প সংখ্যক মানুষ শরিয়ahর বিধান পালন করতে চাচ্ছে, তখনই অধিকাংশরা তার বিরোধিতা করছে কিংবা তার সঙ্গ দিচ্ছে না। তখন সাধারণতই সংকীর্ণতা ও জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। সুতরাং এখানে কঠোরতা এই কারণে সৃষ্টি হয়নি যে, স্বয়ং এই বিধানগুলোই জটিল; বরং এর জন্য দায়ী হলো, আমরা যে জীবনব্যবস্থায় বসবাস করছি, সেখানে অধিকাংশ অধিবাসী এই বিধানগুলোর বিরোধিতা করছে।’১৭৬
তিন. এই সংশয়ের আরেকটি মৌলিক ভিত্তি হলো, 'যুগের পরিবর্তনে ফতোয়ার পরিবর্তন' ফিকহের এই মূলনীতিটি। ফুকাহায়ে কেরামের বিভিন্ন ইবারত থেকে বোঝা যায় যে, জমানার পরিবর্তনে বিধানের পরিবর্তন হয়। তবে এই বক্তব্যটি সামগ্রিক কোনো উসুল বা মূলনীতি নয় যে, শরিয়াতের সকল বিধানই যুগের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তন হয়ে যাবে। যেমনটা বর্তমানের অনেক মুলহিদ ও মুক্তচিন্তার দাবীদাররা মনে করে থাকে। অথচ উল্লিখিত বক্তব্যের দ্বারা ফুকাহায়ে কেরামের উদ্দেশ্য হলো এমন সব বিধানাবলি, যেগুলো কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা নেই এবং যে বিধানগুলো নির্দিষ্ট কোনো কারণ বা প্রচলনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৭৭
শরিয়াতের মৌলিক আহকামে যুগ ও অবস্থার পরিবর্তনে কোনো পরিবর্তন আসে না; পরিবর্তন আসে ফতোয়ায়। ফতোয়া হলো নির্দিষ্ট অবস্থার ওপর শরয়ি কোনো আহকামের প্রায়োগিক নির্দেশ। ফতোয়া আর শরয়ি বিধানের ভেতর পার্থক্য আছে। যেমন, 'সুদ হারাম' এটি হলো শরয়ি বিধান। আর নির্দিষ্ট কোনো লেনদেনকে সুদি লেনদেন হিসেবে চিহ্নিত করা, কিংবা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে সুদের সাথে যুক্ত বলে মতামত দেওয়া হলো ফতোয়া। 'সুদ হারাম' এই হুকুম কিয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো লেনদেন বা ব্যক্তি সারা জীবন সুদের ওপর অবিচল নাও থাকতে পারে। লেনদেনের অবস্থার পরিবর্তন কিংবা ব্যক্তির অবস্থান পরিবর্তন হতেই পারে। সেই পরিবর্তনের ফলে যদি উক্ত লেনদেন বা ব্যক্তি সুদের সংজ্ঞা থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে তাদের ব্যাপারে ফতোয়াতেও পরিবর্তন আসবে। তখন আর সেই লেনদেন সুদি অথবা সেই ব্যক্তি সুদের সাথে জড়িত হিসেবে ফতোয়া আসবে না।
সুতরাং শরিয়াতের বিধানে কোনো পরিবর্তন নেই। পরিবর্তন আসে ফতোয়ার ক্ষেত্রে। কারণ ফতোয়া প্রদান করা হয় নির্দিষ্ট অবস্থার পরিপেক্ষিতে। আবার অনেক সময় শরিয়ahর বিধান প্রয়োগ করা হয় নির্দিষ্ট প্রথা ও প্রচলনের ভিত্তিতে। এই ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অবস্থা বা প্রচলনের পরিবর্তন হলে বিধানের প্রয়োগেও পরিবর্তন আসে। একটি দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টি ভালো করে বুঝে আসবে-যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তির করায়ত্তে (দখলে) নেই এমন জিনিস বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।১৭৮ এই হাদিস থেকে বিধান প্রমাণিত হয় যে, করায়ত্তে আসা ছাড়া কোনো পণ্য বিক্রি বৈধ নয়। এই বিধানে কোনো পরিবর্তন আসবে না। কিয়ামত পর্যন্ত এই বিধান বহাল থাকবে। কিন্তু কোনো জিনিস কারও কাছে কীভাবে আসলে সেটা তার কবজায় বা দখলে এসেছে বলা হবে? এ বিষয়টির মাঝে যুগ ও সমাজের ভিন্নতায় পরিবর্তন এসেছে। ভিন্ন ভিন্ন প্রচলন চালু হয়েছিল। তাই মাসআলার প্রায়োগিক রূপ এবং ফাতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে ভিন্নতা ও পরিবর্তন এসেছে।
মহান আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, 'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদাচরণ করো।'১৭৯ এখন স্ত্রীদের সাথে সদাচারের নির্দেশ কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে। কিন্তু সদাচারের মর্ম স্থান কাল পাত্রভেদে ভিন্ন হওয়ার ফলে নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে সদাচার পালন বা লঙ্ঘন-সংক্রান্ত বিধান প্রয়োগে পরিবর্তন আসবে। যেমন কোনো এলাকায় বা পরিবারে তুই করে সম্বোধন সদাচারের পরিপন্থি হতে পারে; আবার কোনো এলাকায় বা পরিবারে এই সম্বোধন স্বাভাবিকও হতে পারে। তাই দুই অবস্থায় স্বামীর ওপর বিধানে ভিন্নতা আসবে। ১৮০
চার. আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যুগের পরিক্রমায় মানবজাতি যেসব পরিস্থিতি ও অভ্যাস অতিক্রম করেছে, সেগুলো সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়া একটি স্বীকৃত বিষয়। এসব পরিস্থিতি ও অভ্যাস অসীম নয়; বরং সাদৃশ্যের দিক থেকে সীমাবদ্ধ বলা যায়। কারণ বুদ্ধি, আত্মা ও শরীর ইত্যাদির দিক থেকে পুরো মানবপ্রকৃতি সাদৃশ্যপূর্ণ। একমাত্র কৃত্রিমতা এসে এই জায়গায় বৈসাদৃশ্য তৈরি করতে পারে।
সুতরাং নব্য ও উদ্ভব কোনো পরিস্থিতির ওপর বিধান প্রয়োগের জন্য শরয়ি নুসুসের এমন কোনো বুঝ আবিষ্কারের প্রয়োজন নেই, যা সালাফদের বুঝ থেকে ভিন্ন হবে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সালাফদের বুঝ ভালোভাবে অনুধাবন করে, উদ্ভব পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করে তার ওপর সালাফদের বুঝ অনুপাতে শরয়ি বিধান প্রয়োগ করা। যা প্রত্যেক যুগের ফকিহদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
টিকাঃ
১৭৬ অনুম গ্রহি বাহাতুল মুফিদাহ, পৃষ্ঠা ১১৫
১৭৭. আত তাসলিম লিন নাসসিশ শরইয়্যি, পৃষ্ঠা ১৪১
১৭৮. মুজামুল আওসাত লিত তাবারানি, ৯০০৭
১৭৯. সুরা নিসা, আয়াত ১৯
১৮০. তবে উরফ তথা প্রথা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত আছে। যেমন: সমাজে প্রথাটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত থাকা, প্রথাটি কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমার বিপরীত না হওয়া, এর বিরুদ্ধে অন্য কোনো প্রথা প্রচলিত না থাকা ইত্যাদি।
📄 নবম সংশয় : ফেমিনিজম ও ফাহমুস সালাফ
‘সালাফে সালেহিন কুরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে নিজেদের পুরুষ সত্তার পক্ষাবলম্বন করতে গিয়ে শরয়ি টেক্সটের পুরুষতান্ত্রিক তাফসির ও ব্যাখ্যা আবিষ্কার করেছে। তাদের ব্যাখ্যা নারীদের স্বার্থবিরোধী। তাই আমাদেরকে নতুন করে ইসলামি টেক্সটের নারীবাদী ব্যাখ্যা সংকলন করতে হবে (নাউজুবিল্লাহ)।'
নিরসন :
বর্তমান সময়ে মুসলিম-সমাজ ও নারীদেরকে প্রভাবিত করছে এমন একটি পশ্চিমা মতবাদ হলো—'ফেমিনিজম বা নারীবাদ'। নারীবাদের একটি মৌলিক সমস্যা হলো, তা নারী-পুরুষের মাঝে যেকোনো প্রকার পার্থক্যকে নাকচ করে দেয়। চাই সেই পার্থক্য ন্যাচারাল (প্রাকৃতিক) কিংবা ন্যায়সঙ্গতই হোক না কেন। কিন্তু ইসলামি শরিয়াতে নারী-পুরুষের মাঝে শারীরিক, মানসিক ও দায়িত্ব- কর্তব্যের দিকে থেকে ইনসাফভিত্তিক পার্থক্য একটি স্বীকৃত বিষয়। পশ্চিমা ফেমিনিজম দ্বারা প্রভাবিত এক শ্রেণির মুসলিম নামধারী ফেমিনিস্ট নারীর আবির্ভাব ঘটেছে মুসলিম বিশ্বে। তারা ফেমিনিজমকে ইসলামাইজেশন করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় যে বাধার সম্মুখীন হয়েছে সেটা হলো- 'সালাফদের ফাহম ও ফিকহ'। এই বাধাকে অপসারণের জন্য এরা অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে সালাফদের ফিকহ ও ফাহমকে পুরুষতান্ত্রিক বলে ট্যাগ দেওয়া শুরু করে দেয়। উল্লিখিত এ বক্তব্যটি তারই বহিঃপ্রকাশ।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে একই সাথে ইসলামি ফেমিনিস্টদের (মানে ইসলামের লেভেলধারী, ফেমিনিজম কখনো ইসলামি হতে পারে না) ভয়ংকর মানসিকতা ফুটে ওঠে। তারা নিজেদের নারীবাদী চিন্তার জন্য ইসলামি শরিয়াহর যেকোনো কিছু প্রত্যাখ্যান ও বিকৃতি করতেও প্রস্তুত। এজন্য দেখা যায়, তাদের নারীবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে গেলে সহিহ হাদিসকে পর্যন্ত তারা অস্বীকার করে বসে। পাশাপাশি এটাও ফুটে ওঠে যে, ইসলামি শরিয়াহর কাঠামো, ফিকহ ও তাফসিরের মূলনীতি, সিলসিলা, উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া এবং সালাফে সালেহিনের জীবনী সম্পর্কে তারা কতটা অজ্ঞ! কারণ এগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত কোনো ব্যক্তি (সালাফে সালেহিনের রেখে যাওয়া) ইসলামি তুরাসের ওপর কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ও প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ তুলতে পারে না।
সালাফে সালেহিনের সামগ্রিক বুঝ ও ফিকহ আল্লাহপ্রদত্ত মানদণ্ড ও বস্তুনিষ্ঠতার জায়গায় পরিপূর্ণ উত্তীর্ণ। ইসলামি শরিয়াহর মুতাওয়ারিস ফাহম ও ইলমের ক্রমবিকাশ, পূর্ববর্তী সালাফদের সাথে এর সম্পর্ক ও তাদের ভূমিকা সম্পর্কে অজ্ঞতা ছাড়া এ ধরনের ট্যাগ কেউ দিতে পারে না। এই কারণে দেখা যায়, অনেকেই ধারণা করে, ইসলামি ফিকহ, তাফসির এগুলো নিছক কিছু মানুষের কাজ। যারা নিজেদের আবেগ, ধারণা ও স্বার্থের শিকার হয়ে এগুলো সংকলন করেছে। এগুলোর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। এই চিন্তা কেবল জাহালাত আর পূর্ববর্তী সালাফের ব্যাপারে বিষোদগার ছাড়া কিছুই না।
বাস্তবতা হলো, 'ফিকহ' ইসলামি শরিয়াহর বিধানের সমষ্টির নাম। যার মাঝে অধিকাংশই হলো আল্লাহর ওহি। এগুলো জিবরাইল আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে এসেছেন কুরআন ও সুন্নাহ আকারে। এখানে কোনো মানুষের কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। এগুলোকে প্রত্যাখ্যান, পরিবর্তন কিংবা সংস্কার করার অধিকারও কারও নেই। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَ مَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَ مَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا مُّبِينًا.
'আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যখন কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত ফায়সালা করেন, কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর নিজেদের বিষয়ে কোনো অধিকার নেই। ইখতিয়ার বাকি থাকে না। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা করলে সে তো সুস্পষ্ট গোমরাহিতে পতিত হলো।’১৮১
অন্য আয়াতে বলেন,
لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِيْنَ يَتَسَلَّلُونَ مِنْكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِةٍ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ.
'(হে মানুষ!) তোমরা নিজেদের মধ্যে রাসুলের ডাককে তোমাদের পারস্পরিক ডাকের মতো (মামুলি) মনে করো না; তোমাদের মধ্যে যারা একে অন্যের আড়াল নিয়ে চুপিসারে সরে পড়ে, আল্লাহ তাদের ভালো করে জানেন। সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের ভয় করা উচিত, না জানি তাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হয় অথবা যন্ত্রণাদায়ক কোনো শাস্তি তাদেরকে আক্রান্ত করে।’১৮২
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ.
'মুমিনদেরকে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দিকে ডাকা হয়, যাতে রাসুল তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেন, তখন তাদের কথা কেবল এটাই হয় যে, তারা বলে, আমরা (হুকুম) শুনলাম এবং মেনে নিলাম। আর তারাই সফলকাম। ১৮৩
আর কিছু বিষয় এমন আছে, যেগুলো সালাফদের ইজতিহাদি তথা গবেষণালব্ধ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। তবে এ ক্ষেত্রে তারা কখনোই স্বাধীন ছিলেন না যে, যা ইচ্ছে তাই বিধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছেন। আবার এমনও ছিলেন না যে, নিজস্ব কোনো স্বার্থ কিংবা কারও প্রতি আকর্ষণ বা বিদ্বেষী মনোভাব থেকে তারা কোনো কিছুকে বিধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন; বরং এ ক্ষেত্রে তারা কুরআন-সুন্নাহ ও এর থেকে আহরিত নির্দিষ্ট কিছু মূলনীতির কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন। বস্তুত তারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসন্ধানী ছিলেন না। তারা ছিলেন আল্লাহর বিধানের অনুসারী। কুরআন-সুন্নাহর নুসুস নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে তারা নিজেদের প্রবৃত্তি পর্যন্ত নয়, বরং আল্লাহর আনুগত্যের সীমায় পৌঁছার জন্য চেষ্টা করতেন।
এজন্য দেখা যায়, তারা কুরআন-সুন্নাহ থেকে যা জানতেন, তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতেন এবং অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতেন। আর যা জানতেন না, সে ব্যাপারে নিরবতা অবলম্বন করতেন, কিংবা কেউ জিজ্ঞেস করলে না করে দিতেন। চাই এতে মানুষ জাহেল কিংবা স্বল্প ইলমের অধিকারী মনে করুক না কেন, এ ব্যাপারে তাদের কোনো পরোয়া ছিল না।
আমরা যদি আমাদের সালাফে সালেহিনের জীবনী অধ্যয়ন করি, তাহলে দেখব, তারা কারও প্রতি বিদ্বেষ কিংবা আসক্তির জায়গা থেকে ইলম তলব করতেন না। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও আল্লাহর বিধান পর্যন্ত পৌঁছা। এমনকি নারীদের প্রতি বিদ্বেষ রাখতে হবে কিংবা তাদের প্রতি অবিচার করতে হবে—এমন কোনো ধারাও ইসলামি ফিকহ কিংবা তাফসিরের নীতিমালায় নেই। এসব নীতিমালা না পুরুষবান্ধব ছিল, না নারীবান্ধব; বরং এগুলো পরিপূর্ণ শরিয়াহবান্ধব। এজন্য দেখা যায়, ফিকহ ও তাফসিরের ভাণ্ডারে এমনও সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়, যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে পুরুষদের বিরুদ্ধে মনে হয়।
আরও মজার বিষয় হলো, কথিত ইসলামি ফেমিনিস্ট বোনেরা আম্মাজান হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে তাদের আইডল হিসেবে দেখাতে চান। তারা দাবি করেন যে, হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন একজন ফেমিনিস্ট মহিলা। তিনি নারী-অধিকার নিয়ে পুরুষ সাহাবিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। অথচ দেখা যাবে স্বয়ং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ফতোয়া কিছু কিছু বিষয়ে বাহ্যত (ফেমিনিস্ট) নারীদের বিরুদ্ধেই গিয়েছে। শুধু আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাই নন, বরং ইসলামি ইতিহাসে এরকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত দেখা যায়, যেখানে পুরুষদের ফতোয়া নারীদের পক্ষে মনে হলেও নারী স্কলারদের সিদ্ধান্ত তাদের বিরুদ্ধে মনে হবে। আমরা এখানে কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি-
১. নামাজের জন্য নারীদের মসজিদে যাওয়ার মাসআলায় হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মত ছিল তারা মসজিদে যাবে না। তিনি বলেছিলেন, 'যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই জমানার (সাহাবিদের জমানার কথা বলা হচ্ছে) নারীদের অবস্থা দেখতেন, তাহলে তিনি মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারে তাদেরকে নিষেধ করতেন।'১৮৪ পক্ষান্তরে ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মত ছিল, মহিলারা নামাজের জন্য মসজিদে যেতে পারবে। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা নারীদেরকে মসজিদে যাওয়া থেকে নিষেধ করো না। তবে তাদের জন্য ঘরে সালাত আদায় করাই উত্তম।'১৮৫
২. বিবাহের ক্ষেত্রে নারীর ওয়ালায়াত (স্বেচ্ছায় বিয়ে সম্পাদনের অধিকার) তথা নারী নিজের বিয়ের আকদ নিজে সম্পাদন করার অধিকারের মাসআলায় হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার অবস্থান ছিল, মহিলাদের কোনো অধিকার নেই নিজের বিয়ে নিজে সম্পাদন করার। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিয়ে করে, তার বিয়ে বাতিল—তিনি এ কথাটি তিন বার বলেছেন।'১৮৬ পক্ষান্তরে অন্য হাদিসের আলোকে ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহর মত হলো, সুস্থ বিবেক সম্পন্ন বালেগা নারীর বিবাহের ওয়ালায়াত আছে, যেভাবে তার নিজ সম্পদ ব্যয় করার অধিকার আছে। ১৮৮
৩. বাইন১৮৯ তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দতের সময়ে স্বামীর জন্য তার বাসস্থান ও ভরনপোষণ দেওয়া আবশ্যক কিনা—এই মাসআলায় হজরত ফাতেমা বিনতে কায়স রাদিয়াল্লাহু আনহার মত ছিল, স্বামীর জন্য উক্ত নারীর বাসস্থান ও ভরনপোষণ করা জরুরি না। পক্ষান্তরে হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মত হলো, ওই নারী স্বামীর পক্ষ থেকে বাসস্থান ও ভরনপোষণ পাবে। আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহর ফতোয়া হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতের ওপর। ১৯০
৪. আল মুতাওয়াফফা আনহা তথা যে নারীর স্বামী মারা গেছে, সে নারী ইদ্দত পালন করার সময় স্বামীর পরিবারের পক্ষ থেকে বাসস্থান পাবে কিনা-এই মাসআলায় হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মত হলো, সে স্বামীর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বাসস্থানের ব্যবস্থা পাবে না। পক্ষান্তরে হজরত ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মত হলো, ইদ্দত পালনের সময় অবশ্যই স্বামীর পরিবারের পক্ষ থেকে তার থাকার জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে।১৯১
৫. স্বামী মৃত্যু শয্যাকালীন সময়ে বাইন তালাকপ্রাপ্তা নারী উত্তরাধিকারের মাসআলাতেও হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মত ছিল, সে স্বামীর পক্ষ থেকে উত্তরাধিকারী হিসেবে কিছু পাবে না। পক্ষান্তরে ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহর মত হলো, সেই নারী অবশ্যই স্বামীর উত্তরাধিকারী হবে। এমনকি সেই নারী (ইদ্দত পালনের পর) আরেকজন পুরুষের সাথে বিবাহে আবদ্ধ হলেও পূর্বের স্বামীর উত্তরাধিকারী হবে, অর্থাৎ সে আগের স্বামীর উত্তরাধিকারী সম্পত্তি পাবে। ১৯২
৬. মুরতাদ নারীর ক্ষেত্রে হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মত হলো, তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে মুসলিম তার দীন পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করো।১৯৩ পক্ষান্তরে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর মত ছিল তাকে হত্যা করা হবে না।
এমন আরও অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে, যেখানে সালাফে সালেহিনের নারী ফকিহদের ফতোয়া বাহ্যত নারীদের বিরুদ্ধে গিয়েছে, কিন্তু পুরুষ ফকিহরা নারীদের পক্ষে মত দিয়েছেন। এই আলোচনা দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য এটা প্রমাণ করা নয় যে, কে নারীবাদী আর কে পুরুষতান্ত্রিক ছিলেন! এ ধরনের জঘন্য বাইনারি (বিভাজন) থেকে আমাদের সালাফরা মুক্ত। তারা কোনো মাসআলা প্রদানের ক্ষেত্রে এটা মাথায় রাখতেন না যে, মাসআলাটা নারী বা পুরুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেল কি-না; বরং তাদের মূল মাকসাদ থাকত সত্য পর্যন্ত পৌঁছা।
বর্তমান সমাজে নারী-পুরুষের মাঝে শত্রুতাপূর্ণ যে বাইনারি আমরা দেখতে পাই, এটা পশ্চিমা সমাজের তৈরি। কথিত ইসলামি ফেমিনিস্ট বোনদের মূল সমস্যা এটাই যে, তারা ফেমিনিজমের তৈরিকৃত নারী-পুরুষের মাঝে বিদ্বেষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মনোভাবের জায়গা থেকে সালাফে সালেহিনের ফাহম ও ফিকহকে দেখছেন। তারা নিজেদের অধিকার ও দায়িত্বের ধারণাকে পশ্চিম থেকে সরবরাহ করছেন, ইসলাম থেকে নয়। এজন্য তারা নারী-অধিকারের পশ্চিমা কাঠামো দিয়ে ইসলামি শরিয়াহর মুতাওয়ারিস ইলমি ভিতকে পুরুষতান্ত্রিক বলে অপবাদ দিচ্ছেন।
অথচ আমাদের সালাফরা নারী-পুরুষকে একে অপরের শত্রু কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতেন না। তারা তাই বিশ্বাস করতেন, যা মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘মুমিন নারী-পুরুষরা তো একে অপরের বন্ধু।’ ১৯৪ ফিকহের ভাণ্ডারে আমরা এমন অসংখ্য বন্ধুত্ব ও সহযোগিতামূলক সিদ্ধান্ত দেখতে পাব, যেগুলো আমাদের নারীবাদী বোনদের দৃষ্টিতে পড়ছে না। কারণ তারা নিজেদের উৎসকে পরিত্যাগ করে বহিরাগত উৎসের কাছে নতি স্বীকার করে বসে আছে। আর সেখান থেকেই তারা নিজেদের অধিকারের পরিচয় গ্রহণ করছে।
মূলত যারা সালাফে সালেহিনের মুতাওয়ারিস ফাহম ও ফিকহের ওপর আপত্তি তোলে, দেখা যাবে কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক টেক্সট নিয়েই তাদের আপত্তি আছে; কিন্তু তারা সেটা মুখ ফুটিয়ে বলতে পারে না। কিংবা তারা মৌলিক টেক্সটের মনমতো বিকৃত ঘটিয়ে সেই আপত্তি দূর করার ঘৃণ্য প্রয়াস চালায়। আর এ ক্ষেত্রে যেহেতু মূল বাধা সালাফদের মুতাওয়ারিস ফাহম, এইজন্য তারা এটাকে নানাভাবে, নানা ট্যাগ দিয়ে প্রত্যাখ্যান ও গুরুত্বহীন করার চেষ্টা করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলামের পুরো জ্ঞান কাঠামোর এক সক্রিয় ও শক্তিশালী সিলসিলা (সনদ) আছে। যার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাআলা এই দীনকে পরিচ্ছন্নভাবে আমাদের পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত নিয়ে যাবেন। এই সিলসিলা মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের হেদায়াতের জন্য তৈরি করে রেখেছেন। যেন যুগে যুগে মানুষ সত্যের সন্ধান পায় কোনো প্রকার পরিবর্তন ও বিকৃতি ছাড়াই। এখন আমরা যদি এই সিলসিলাকে সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরি এবং এটিকে অক্ষুণ্ণ রেখে সমৃদ্ধ করতে থাকি, তবে একই সাথে আমরা সত্য পথেও থাকতে পারব, আবার আগামী প্রজন্ম পর্যন্ত এই সিলসিলা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে একজন সৌভাগ্যবান সেবকও হতে পারব।
আর যদি এই সিলসিলা প্রত্যাখ্যান করি, সেটা আংশিকভাবেই হোক কিংবা পূর্ণাঙ্গরূপে, নিশ্চিতভাবেই আমরা সঠিক ও হেদায়াতের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব এবং পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সালাফে সালেহিন থেকে আসা মুতাওয়ারিস ইলমি ধারায় প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং সালাফে সালেহিনের মতো নেক জীবন দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
১৮১. সুরা আহযাব, আয়াত ৩৬
১৮২. সুরা নূর, আয়াত ৬৩
১৮৩. সুরা নূর, আয়াত ৫১
১৮৪. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৮৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৬৯
১৮৫. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৫৬৭, সনদ সহিহ।
১৮৬. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২০৮৩, সনদ সহিহ।
১৮৭. মুআত্তা মালেক, কিতাবুত তালাক, হাদিস নং ১১৭২, ১১৮২, এই হাদিসের সনদ সম্পর্কে বিখ্যাত হাদিস বিশারদ শায়খ আবদুল কাদের আরনাউত রহ, বলেন, এর সনদ সহিহ। (জামিউল উসুল, ৭/৫৯৫)
১৮৮. মিরকাত শরহে মিশকাত, ৬/২৬৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ।
১৮৯. যে তালাকের মাধ্যমে স্ত্রী চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাকে বাইন তালাক বা বিচ্ছিন্নকারী
১৯০. তহাবি শরিফ, ৪১৭৪ ও ৪১৯৭ নং হাদিসের ব্যাখ্যাস্থল।
১৯১. বিনায়া শরহুল হিদায়া, ৫/১-১৩
১৯২. আল মুহাল্লা, ১০/৩১৯
১৯৩. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩০১৭, ৬৯২২
১৯৪. সুরা তাওবা, আয়াত ৭১
📄 দশম সংশয় : পোশাকতন্ত্র ও ফাহমুস সালাফ
ইসলাম সমগ্র মানবজাতির জন্য এসেছে। আর কুরআন-সুন্নাহ এই মানবজাতির হেদায়াতের জন্যই প্রেরণ করা হয়েছে। তাই প্রত্যেক মানুষেরই স্বাধীনতা আছে কুরআন-সুন্নাহ থেকে বুঝ গ্রহণ করার এবং নিজস্ব বিবেক-বুদ্ধি নিয়ে ভাবার। যদি কুরআন-সুন্নাহর বুঝ নির্দিষ্ট কোনো প্রজন্ম বা গোষ্ঠী কিংবা নির্দিষ্ট কারও পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল থাকে, তবে এটা পোপতন্ত্রের সাথে সামঞ্জস্যশীল হয়ে যায়। অথচ ইসলামে কোনো ‘পোপতন্ত্র’ নেই।
নিরসন :
আমরা জানি প্রত্যেকে মানুষের চিন্তাভাবনা ও বুঝশক্তি একরকম নয়। আবার মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ব্যক্তির খায়েশাত, চারপাশের পরিবেশ ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবিত হওয়াও প্রমাণিত সত্য। এমতাবস্থায় যদি কুরআন-সুন্নাহ বোঝার জন্য সুস্পষ্ট পদ্ধতি ও মানদণ্ড ইসলামি জ্ঞান-শাখায় না থাকে, তবে মানুষের বিচিত্র ও প্রভাবিত বিবেক শরয়ি নুসুসের ওপর এমন স্বেচ্ছাচারিতা চালাবে, যা দ্বীনে ইসলামকে বিকৃত করে বিলীন করে দেবে। শরিয়তের শাশ্বত কাঠামোকে খেলনার পাত্রে পরিণত করবে এবং মানব-সমাজ ও চিন্তার ওপর ইসলামি শরিয়াহর কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দেবে। নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে মানুষ যেন উল্লিখিত বিপদগামিতার পথে ধাবিত না হয়; বরং প্রত্যেকের বুঝ যেন সঠিক প্রবাহে প্রবাহিত হয়, সেজন্য ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে কষ্টিপাথরের মর্যাদা দেওয়া হয়। কারণ তারা ওহি নাজিলের যুগ কিংবা তার নিকটতম সময়ে উপস্থিত ছিলেন। যে সময়টাতে চৌদ্দশ বছর পরের এই আমরা উপস্থিত ছিলাম না। সুতরাং নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে সালাফদের ওপর অত্যাবশ্যকীয় নির্ভরতাকে 'পোপতন্ত্র' বলা যায় না। এটাকে পোপতন্ত্র বললে পৃথিবীতে কোনো শাস্ত্রই নিরাপদ থাকবে না। যেকোনো শাস্ত্রীয় টেক্সটকে নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় পদ্ধতিতেই বুঝতে হয়। চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে লিখিত কোনো গ্রন্থকে সাধারণ মানুষ নিজ থেকে পড়ে চিকিৎসাশাস্ত্রের সঠিক বুঝ লাভ করতে পারবে না; বরং তার মাধ্যমে এই শাস্ত্র চরমভাবে ক্ষতবিক্ষত হবে।
আর ইসলামি শরিয়াহ তো চিকিৎসাশাস্ত্রের অনেক ঊর্ধ্বের বিষয়। অন্যান্য শাস্ত্রের ক্ষেত্রে আমরা এই কথা মানলেও ইসলামের ক্ষেত্রে এসে বিষয়টি বেমালুম ভুলে যাই। মূলত যারা ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রের এই নিরাপদ শৃঙ্খলাবোধকে পোপতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করে, তারা না ইসলামকে বুঝেছে আর না পোপতন্ত্রকে বুঝতে পেরেছে। পোপতন্ত্রের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। আমরা নিচে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরছি, যার মাধ্যমে পোপতন্ত্র এবং সালাফদের ফাহম ও মানহাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার পার্থক্যগুলো খুব সহজেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।
১. পোপতন্ত্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ট ছিল, তারা শুধু খ্রিষ্টানদের বিকৃত ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যাকার ছিল না; বরং নিজ থেকে আইন প্রণয়ন করত। তা ছাড়া তাদের বক্তব্যের কোনো ধর্মীয় সূত্র থাকত না; বরং তারা যাই বলত সেটাকেই বিধান হিসেবে গণ্য করা হতো। পক্ষান্তরে আমাদের সালাফরা নিজ থেকে কোনো বিধান প্রণয়ন করতেন না; বরং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তারা যে বুঝ সরাসরি কিংবা এক বা দুই প্রজন্ম পরম্পরায় লাভ করেছেন, সেটাই উম্মতের সামনে প্রকাশ করে গেছেন। এমনকি তাদের বুঝ ও মতের পেছনে আছে সুস্পষ্ট ওহির সূত্র।
২. পোপতন্ত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, পোপরা প্রতিনিয়ত নিজেদের স্বার্থে মানুষের ওপর নিত্যনতুন বিধান চাপিয়ে দিত এবং এই পদ্ধতিতে দুদিন পর পর নতুন নতুন বিধান প্রণয়ন করত। এই বৈশিষ্ট্যের বিচারে মডার্নিস্ট মুসলিমদেরকেই বরং পোপতন্ত্রের অভিযোগ দেওয়া যায়। কারণ তারাই যুগের পরিবর্তনে ইসলামের বিধান পরিবর্তন করার দাবি করে। তারাই নিজের প্রবৃত্তির স্বার্থে ইসলামের সুস্পষ্ট ও ইজমায়ি বিষয়কে বিকৃত করে নতুন নতুন বিধান প্রণয়ন করার আওয়াজ তোলে। পক্ষান্তরে সালাফদের পথ ও ফাহমের ওপর নির্ভরশীলতা এবং এগুলোর প্রতি শৃঙ্খলা থাকলে নুসুসে শরিয়াহকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা এবং যখন-তখন শরয়ি বিধান পরিবর্তন করার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এখানে পোপতন্ত্রের মতো ইচ্ছামতো বিকৃতি ও পরিবর্তন আনার কোনো সুযোগই থাকে না। আর আমাদের সালাফরা ব্যক্তিগত স্বার্থে কিংবা কারও চাপে প্রভাবিত হয়ে দীনের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে এই দীনকে ব্যবহারও করেননি। কাজেই ফাহমুস সালাফ পোপতন্ত্র নয়, বরং এটি হলো নিজেদের ইচ্ছেমতো শরিয়াতকে পরিবর্তনকারী পোপতন্ত্রের বিরোধী বিষয়।
৩. পোপতন্ত্রের আরেকটি অন্যতম দিক হলো, ধর্মশিক্ষা ও ব্যাখ্যার অধিকার কেবল বিশেষভাবে পোপদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই বিশেষ শ্রেণির বাইরে ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা ও পাণ্ডিত্য অর্জনের সুযোগ অন্য কারও জন্য ছিল না। পক্ষান্তরে সালাফদের ফাহম ও বুঝের ওপর নির্ভরশীলতা এবং এগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতার ফলে শরয়ি নুসুসের ইলম লাভ কারও জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায় না; বরং উল্লিখিত কষ্টিপাথরকে সামনে রেখে যেকোনো বর্ণের, যেকোনো গোত্রের, যেকোনো পেশার লোক শরিয়াহর ইলম অর্জন করতে পারে এবং এই বিষয়ে বিশেষ পাণ্ডিত্যের অধিকারী হতে পারে। স্বয়ং সালাফদের ভেতরও ইলম অর্জনের ময়দানে পোপতন্ত্রের মতো সংকীর্ণতা ছিল না; বরং মনিব, দাস, খলিফা, জনগণ, কাজি, শ্রমিক নির্বিশেষে সকলের জন্যই ইলম অর্জনের দরজা উন্মুক্ত ছিল। এর বাইরে প্রজন্ম ও যুগ ভিত্তিক তাদের ওপর যে নির্ভরতার নির্দেশনা ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে বিবৃত হয়েছে, সেটিও কারও স্বার্থ কিংবা মূলনীতিহীন পদ্ধতির কারণে নয়; বরং কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনাসহ যৌক্তিক ও বাস্তব কিছু কারণেই সালাফদের এই শ্রেষ্ঠত্ব অনিবার্যতা লাভ করেছে। যা পূর্বে আমরা আলোচনা করে এসেছি।
সুতরাং দীনে ইসলাম বোঝার ক্ষেত্রে সালাফের ফাহম ও মানহাজের শ্রেষ্ঠত্ব এবং সেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি আহবান করার ফলে আলেম-সমাজকে কখনোই পোপতন্ত্রের সাথে মিলানো যায় না। আমরা যে তিনটি তুলনা এখানে উল্লেখ করলাম, এর মাধ্যমে এ বিষয়টি একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। যারা সালাফের ফাহম ও মানহাজের ওপর নির্ভরশীলতা ও এগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতাকে পোপতন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করতে চায়, তারা আসলে নিজেদের এ দাবির ব্যাপারে সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ না।
📄 একাদশ সংশয় : মাকাসিদে শরিয়াহ ও ফাহমুস সালাফ
সালাফদের মুতাওয়ারিস ফাহম ও মানহাজকে পরিত্যাগ করার ক্ষেত্রে অনেকেই ফিকহের ইজতিহাদি কিছু মূলনীতির আশ্রয় নেন। যেমন মাকাসিদে শরিয়াহ ও মাসলাহাতকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে শরিয়াতের স্বতসিদ্ধ, প্রসিদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যাকে পরিবর্তন করার দাবি তোলেন। আমরা এখন এই দুটি বিষয়ের সংশয় নিয়ে আলোচনা করব।
সংশয় : এ যুগের নামধারী কিছু আলেমরা বলে বেড়ায় যে, মাকাসিদ হলো মূল। ইসলাম এসেছেই মাকাসিদে শরিয়াহ বাস্তবায়নের জন্য। সুতরাং মাকাসিদে শরিয়াহর আলোকে সালাফদের সিদ্ধান্তগুলো আমাদের পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং উম্মাহর কল্যাণের দিকে লক্ষ রেখে আমাদেরকে বর্তমান যুগের সাথে মানানসই ফিকহ আবিষ্কার করতে হবে।
নিরসন :
ইসলামি শরিয়াহর উসুলের দুটি দিক আছে। একটি মৌলিক দিক, অপরটি ইজতিহাদি দিক। মৌলিক উসুলগুলো হলো—কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মাহর ইজমা। আর ইজতিহাদি দিক হলো—কিয়াস, মাকাসিদে শরিয়াহ, মাসলাহাত ইত্যাদি। যে বিধানগুলো মৌলিক উসুল দ্বারা প্রমাণিত হয়ে আছে, সেখানে ইজতিহাদি মূলনীতি দিয়ে কোনো প্রকার পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধন করা যাবে না।
এর থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, মাকাসিদে শরিয়াহ কোথায় কার্যকর হবে। কালের আবর্তনে যখন নতুন কোনো বিষয় আমাদের সামনে আসে এবং কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার কোনো বক্তব্য পাওয়া না যায়, তখন নতুন আপতিত বিষয়ের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য কিয়াস ও মাকাসিদের আলোকে গবেষণা করতে হয়। এটা হলো মাকাসিদে শরিয়াহর কর্মসীমা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, আধুনিক কিছু স্কলার ও মুসলিম মাকাসিদে শরিয়াহর দোহাই দিয়ে ইসলামি শরিয়াহর মানসুস (নস দ্বারা প্রমাণিত), মুসতামবাত (উম্মাহর মুজতাহিদে কেরামের গবেষণা দ্বারা উন্মোচিত) ও স্বীকৃত অনেক মাসায়েলে পরিবর্তন সাধন করছে।
শরিয়াতের মাকাসিদ হলো উবুদিয়্যাত, তথা আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের মাধ্যমে তাঁর ইবাদত করা। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম পালনের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদাতে নিয়োজিত থাকে, সে মাকাসিদে শরিয়াহ পুরোপুরি অর্জন করতে সক্ষম। উবুদিয়্যাত ব্যতীত কেবলই মাসলাহাত মাকাসিদের শরিয়াহর উদ্দেশ্য নয়। তথাপি আলেমগণ জাগতিক দিক থেকে ইসলামি শরিয়াহর মৌলিক পাঁচটি মাকসাদ বর্ণনা করেছেন-
১. দীনের সংরক্ষণ
২. জীবনের নিরাপত্তা
৩. মানসম্মানের হেফাজত
৪. বিবেক-বুদ্ধির সুরক্ষা
৫. সহায় সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ
ইসলামি শরিয়াহর প্রতিটি বিধানের পেছনে এই মাকসাদগুলো সংরক্ষিত হয়। যদি শরিয়াহর বিধানগুলো বাস্তবায়িত হয়, তবে মৌলিকভাবে এই মাকসাদগুলোও পাওয়া যাবে। আর যদি শরিয়াহর বিধান বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে এই মাকসাদগুলোও পাওয়া যাবে না। এটাই হলো মাকাসিদের পেছনে প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি।
কিন্তু আমাদের আধুনিকমনা ভাইয়েরা শরিয়াহর মানসুস ও স্বীকৃত বিষয়গুলোর এদিকে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে মাকসাদগুলো সামনে রেখে ইসলামি শরিয়াহর স্বীকৃত বিধান পরিবর্তন করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যান। আল্লামা তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহর ভাষায় তাদের যুক্তি হলো, 'নসগুলো মূলত এ সকল মাকাসিদ অর্জনের জন্যেই এসেছে। ফলে যখন আহকামসমূহের আপাত ফলাফল মাকাসিদের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হবে, তখন আমরা বাহ্যিক নসের ওপর আমল না করে উল্লিখিত মাকসাদগুলো অর্জনের চেষ্টা করব।' এ ধরনের যুক্তি-কাঠামো মূলত পুরো শরিয়াতকেই নাকচ করে দেয় এবং অনুমাননির্ভর ও আপেক্ষিক মাকাসিদের ভিত্তিতে আবদিয়্যাতের রশ্মিকেই নিভিয়ে দেয়।
সত্য কথা হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য দীনের যেসব বিধিবিধান দান করেছেন, তা কোনো না কোনো উপকারী লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই দিয়েছেন। তিনি কোনো ক্ষতিকর বা উপকারহীন অপ্রয়োজনীয় বিধান আমাদের দেননি। কিন্তু মাকাসিদ ও মাসালিহ কথাগুলো খুবই আপেক্ষিক। একজন মানুষ যেটাকে মাসলাহাত (কল্যাণকর) মনে করছে, অন্যজন সেটাকে নিজের জন্য মাসলাহাত ও মাকসাদ নাও মনে করতে পারে। এজন্য ওহির সূত্র ছাড়া মানবীয় আকল এমন কোনো সার্বজনীন মানদণ্ডে পৌঁছতে পারবে না, যেটা দিয়ে মাকাসিদ ও মাসালিহ চিহ্নিত করা যাবে।
তা ছাড়া শরিয়াহর মাধ্যমে চিহ্নিত মাকসাদগুলোও চিরন্তন ও শাশ্বত না। এগুলোর কিছু নির্দিষ্ট সীমা ও নীতিমালা আছে। উদাহরণস্বরূপ প্রাণ রক্ষার কথাই ধরা যাক। নিশ্চয় এটা শরিয়াহর গুরুত্বপূর্ণ মাকাসিদের অংশ। কিন্তু একজন খুনি জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে মাকাসিদের কথা বলে তার জীবন ভিক্ষা পাবে না। এ কথা সকল মাকাসিদে শরিয়াহর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এখন মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে, এ সকল মাকাসিদ নির্ধারণ কে করবে? এবং সে অনুযায়ী প্রায়োগিক শর্ত ও সীমাগুলো কে নির্ধারণ করবে?
আমরা যদি এই নির্ধারণ-ক্ষমতাকে কেবল মানবীয় আকলের ওপর ন্যস্ত করে দিই, তাহলে বড় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। শরিয়াত অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিধান প্রদান করেছে, যা কেবল যৌক্তিকতা দিয়ে বোঝা সম্ভব না। যদি মানবীয় প্রজ্ঞা এ সকল বিষয় সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম হতো, তাহলে রাসুল ও ওহি প্রেরণের কোনো দরকার ছিল না। সত্য হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহকে এড়িয়ে এ সকল মাকাসিদ নির্ধারণের কোনো উপায় নেই। তাই কোনোভাবেই এসব আপেক্ষিক ও এক মাকাসিদকে আমরা কোনো পরিচ্ছন্ন আহকামের ওপর প্রাধান্য দিতে পারি না, চাই সেই আহকাম কুরআন থেকে আহরিত হোক অথবা সুন্নাহ থেকে। আমাদের এই অধিকার নেই যে, আমরা এ সকল মাকাসিদ ও মাসালিহকে শরিয়াহর মৌলিক উৎস হিসেবে গ্রহণ করব এবং এগুলোর ভিত্তিতে শরিয়াহর নুসুসকে ছুঁড়ে ফেলব।১৯৫
মাকাসিদে শরিয়াহর ওপর আলোচনা ও পর্যালোনাকারী কিছু মহলের দৃশ্য হলো এমন যে, তারা যেকোনো প্রকার মুনাসাবাতের কারণেই কোনো বিষয়কে মাকাসিদ সাব্যস্ত করে বসে এবং এর বিপরীত প্রমানিত শত মাসআলা ও বিধানে সংস্কারের শোরগোল শুরু করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, কুরআন-সুন্নাহতে কোনো বিষয়ের হুকুম দেওয়া হয়েছে, কিংবা কোনো বিষয় থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর উক্ত বিষয়ে ঘটনাক্রমে কোনো বাহ্যিক কল্যাণকর অথবা ক্ষতিকর দিক রয়েছে। এখন উক্ত কল্যাণকে অর্জন কিংবা উক্ত ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকাকে মাকসাদ বানিয়ে এর ভিত্তিতে সমাধান ও সংস্কারের কাজ শুরু করে দেওয়া হচ্ছে।
সাধারণত দেখা যায়, মাকাসিদে শরিয়াহর নামে এখানে কেবল গাইরে মানসুস (সুস্পষ্ট নস দ্বারা প্রমাণিত নয়) মাসায়েলেই বিধান জারি করা হচ্ছে না; বরং মানসুস (সুস্পষ্ট নস দ্বারা প্রমাণিত) মাসায়েলকেও বলির পাঠা বানানো হচ্ছে। যেখানেই কোনো মাসআলা উক্ত ধারণাকৃত মাকসাদের বিপরীত মনে হচ্ছে, সেখানেই পরিবর্তন বা সংস্কারের আওয়াজ তোলা হচ্ছে। চাই সেই মাসআলা মানসুস অথবা মুত্তাফাক আলাইহি (সর্বসম্মত) হোক না কেন?
উদাহরণস্বরূপ, শান্তি, নিরাপত্তা সংক্রান্ত নুসুসগুলো দেখে ধরে নেওয়া হলো— শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবতার মাঝে স্বাধীনতা ও সমতা বজায় রাখা মাকসাদে শরিয়াহ। এখন মুরতাদ হত্যার বিধান, জিহাদের বিধান, জিম্মির বিধান, কাফেরদের সাথে আন্তরিক ভালোবাসা ও সম্পর্কের নিষেধাজ্ঞা, পুরুষের তুলনায় মহিলাদের সাক্ষী, দিয়্যাত ও মিরাসের অংশ কম হওয়া ইত্যাদি মাসআলা যেহেতু উক্ত ধারণাপ্রসূত মাকসাদের মানদণ্ডে পরিপূর্ণ উত্তীর্ণ হয় না, এজন্য এখন উক্ত মাকসাদের সীমা নির্ধারণ ও তাতে পুনর্বিবেচনা না করার পরিবর্তে মানসুস মাসায়েলকেই পরিবর্তন করতে শুরু করে। এর জন্য তাবিল ও তাহরিফের নতুন নতুন এমন পন্থা বের করা হয়, যেন কোনোভাবেই এই মাসআলা ধারণাপ্রসূত মাকসাদের বিরুদ্ধে না যায়। ১৯৬
অথচ মাকাসিদের ইমামদের উসুল হলো, মাকাসিদের ভিত্তিতে উসুল তো দূরের বিষয়, কোনো শাখাগত বিধানকেও বাতিল বা পরিবর্তন করা যাবে না; বরং তা আলাদা মূলনীতির আলোকে নিয়ে আসতে হবে। ইমাম শাতেবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যে ব্যক্তি শরিয়াতের মৌলিক বিষয় উপেক্ষা করে শাখাগত বিষয় গ্রহণ করবে, সে যেমন ভুল কাজ করবে; তেমনিভাবে যে ব্যক্তি শাখাগত বিষয় বর্জন করে কেবলই মৌলিক বিষয়গুলো আমলে নেবে, সেও ভুল কাজ করবে।'১৯৭
তিনি আরও বলেন, 'সর্বোচ্চ অনুসন্ধানের পর যখন কোনো একটি সাধারণ মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়, অতঃপর শরিয়াতের অন্য কোনো নসের বিধান কোনোভাবে সে মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখন উভয়টির মধ্যে সমন্বয় সাধন করা আবশ্যক। কারণ শরিয়াহ প্রবর্তক সাধারণ মূলনীতিসমূহের প্রতি সচেতন থেকেই শাখাগত এই বিধান প্রদান করেছেন।'১৯৮
শুধু তাই নয়, যদি সাধারণ মূলনীতি আর শাখাগত বিধানে সমন্বয় সাধন সম্ভব না হয়, তাহলে শাখাগত বিধানকে বাতিলকে করা যাবে না; বরং তখন সেই শাখাগত বিধানই স্বতন্ত্র মূলনীতির স্থান লাভ করবে। ১৯৯
যেমন আধুনিক কিছু স্কলার মুরতাদের হদকে অস্বীকার করেন এই যুক্তিতে যে, এই বিধান শাখাগত একটি বিধান। যা শরিয়াহর মৌলিক মাকাসিদ তথা রহমত, কারও ওপর দীনের ব্যাপারে জোরাজুরি করা যাবে না—এ ধরনের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে। সুতরাং মাকাসিদের আলোকে এই বিধান প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এমনিভাবে কেউ কেউ সদাচারকে শরিয়াহর একটি মাকসাদ বানিয়ে অমুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছাপ্রদান হারাম হওয়ার ইজমাকে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। একই যুক্তি জিযিয়ার ক্ষেত্রেও দেখানো হচ্ছে। অথচ এই বিধানগুলো শরিয়াহর পৃথক নস ও মূলনীতি দ্বারা প্রমাণিত। আর নিয়ম হলো, প্রমাণিত কোনো বিধানকে মাকাসিদের দোহাই দিয়ে পরিবর্তন করা যাবে না।
মূলত মাসালিহ ও মাকাসিদ কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাহ থেকেই আহরিত হবে। তাই আল্লাহ এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেটিকে কল্যাণ বলেছেন, সেটিই একমাত্র কল্যাণ হিসেবে বিবেচিত হবে। নিজেদের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির খাহেশ অনুযায়ী কল্যাণ নির্ধারিত হবে না। মাকাসিদুশ শরিয়াহ বিষয়ক সকল আলেম, যেমন ইমাম শাতেবি, ইমাম গাজালি, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি রহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ সকলেই একমত যে, কোনো হুকুম নির্ভর করে তার নিজস্ব ইল্লতের (কারণের) ওপর, নিছক হিকমত বা প্রজ্ঞার ওপর নয়। তারা এ ব্যাপারেও একমত যে, যেসব মাকাসিদ নুসুসের সাথে সাংঘর্ষিক, সেগুলো কুরআনিক পরিভাষায় কেবল খাহেশাত ছাড়া আর কিছুই না।২০০
মাকাসিদ বর্ণনাকারীদের অগ্রদূত আল্লামা শাতেবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'শরিয়াহ এসেছে মানুষকে তাদের প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রকৃত গোলামে পরিণত করার জন্য। এই মূলনীতি যখন প্রতিষ্ঠিত তখন এ কথা বলা যায় না- শরিয়াহ সর্বদা মানুষের খাহেশাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং তাৎক্ষণিকভাবেই বিধানগুলি তাদের জন্য উপকারী হবে। আল্লাহ পাক সত্যিই বলেছেন, 'যদি হক তাদের খাহেশাতের অনুসরণ করত, তাহলে আকাশ ও পৃথিবী এবং তার মাঝে যা আছে সবকিছুতে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতো।'২০১
তিনি আরও বলেন, 'যে মাকাসিদ শরিয়াহর সাধারণ কোনো মূলনীতি বা কোনো বিধানকে আঘাত করে, সেটা প্রকৃতপক্ষে গ্রহণযোগ্য কোনো মাকাসিদের পর্যায়ে পড়ে না।'২০২
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ পাক যে বিধান দিয়েছেন, সেটা উপেক্ষা করে যদি কোনো ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশিমতো কোনো কিছুকে ন্যায় ও সঠিক মনে করে এবং সে অনুযায়ী মানুষের মাঝে ফায়সালা করাকে বৈধ বলে বিশ্বাস করে, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে।২০০
অনেক আলেমই শরিয়াহর বিধানসমূহের উপকারিতা (মাসালিহ) এবং তার উদ্দেশ্য (মাকাসিদ) নিয়ে কিতাব রচনা করেছেন। তাদের এসব আলোচনার উদ্দেশ্য কখনো এটি ছিল না যে, শরিয়াহর বিধানগুলো কেবল এসব উপকারিতা ও উদ্দেশ্যের মাঝে সীমাবদ্ধ, কিংবা এসব উপকারিতা অর্জন হওয়াই শরিয়াতের মূল লক্ষ্য, শরয়ি নসের কোনো ধর্তব্য নেই। প্রকৃতপক্ষে তাদের বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল এ কথা বোঝানো যে, শরিয়াহর এমন কোনো বিধান নেই, যা দীন অথবা দুনিয়ার উপকারিতা থেকে শূন্য। পাশাপাশি যেসকল ক্ষেত্রে শরয়ি নস (ট্যাক্সট) অনুপস্থিত ও যেসকল বিষয় মুবাহ পর্যায়ের, সে ক্ষেত্রে এ সকল মাসালিহ (কল্যাণ) ও মাকাসিদের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টি রাখা। তবে কোন বিষয়টা মাসলাহাত, তা নির্ণয় করবে একমাত্র শরিয়াহ ও তার নসসমূহ। কোনো মানুষের অধিকার নেই যে, সে নিজের যৌক্তিকতাবোধ ও খেয়ালখুশির ভিত্তিতে মাসলাহাত নির্ধারণ করবে। কারণ এসব মাকাসিদ (যেমন জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষার মূলনীতি) চূড়ান্ত না বা সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য না; বরং মূল কথা হলো ইমাম শাতেবি রহিমাহুল্লাহ যা বলেছেন। তিনি বলেছেন, 'উপকার ও ক্ষতি চিরন্তন না; বরং আপেক্ষিক। এ ক্ষেত্রে আপেক্ষিকতার অর্থ হচ্ছে, ভিন্ন ভিন্ন স্থান-কাল-পাত্রের জন্য উপকার ও ক্ষতি ভিন্ন ভিন্ন।'২০৪
শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যেভাবে কোনো সুন্নাহর ওপর ইজমা হয়ে গেলে তাঁর ওপর আমল ওয়াজিব হয়ে যায়, ঠিক সেভাবে কোনো বিষয়ে আদেশ বা নিষেধ জারি করে এমন ওহিই সেই আদেশ-নিষেধের ওপর আনুগত্য বাধ্যতামূলক হওয়ার জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে যায়। এর ভিত্তিতেই (আল্লাহর) অনুগতদের পুরস্কৃত করা হবে, অবাধ্যদের লাঞ্ছিত করা হবে। সুন্নাহ এটিও আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করে যে, যখন কোনো হুকুম নুসুসের দ্বারা প্রমাণিত হয় এবং বর্ণনার সনদও বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়ে যায়, তখন আমলের ক্ষেত্রে এ সকল মাকাসিদের ওপর নির্ভর করা আমাদের জন্য আর বৈধ থাকে না।'২০৫
আল্লামা শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহিমাহুল্লাহ তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ মুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ-তে শরয়ি আহকামের যোসার ব্যাখ্যা ও কল্যাণের কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোও সর্বোচ্চ রহস্য ও হিকমাত হিসেবে এনেছেন যার ওপরে কখনো শরয়ি হুকুমের ভিত্তি রাখা যায় না। ফাদেলা তারি সমাকামী আলেমরা এবং তাঁর পরবর্তী মুসতানিদ আহলে ইলমগণও এই কিতাবকে শালা উক্ত দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেছেন এবং গ্রহণ করেছেন। এমনকি তার নিকটস্থ সন্তান, নাতি, প্রিয়জন ও ছাত্রদের কর্মপদ্ধতি এমনই ছিল। তাদের কাছে শাররি আহকামের মাকাসিদ ও নানাবিধ কল্যাণের ভাণ্ডার ছিল। কিন্তু আমল, ফতোয়া ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা সর্বদা উসুলবিদ ও ফুকাহায়ে কেরামের মূলনীতিসমূহের অনুসরণ করেছেন এবং মাকাসিদে শরিয়াহর নামে মানসুস ও মুত্তাফাক আলাইছি মাসআলায় কখনো সংস্কার ও পরিবর্তনের দুঃসাহস দেখাননি। বিশেষত শাহ ওয়ালি উল্লাহর সুযোগ্য সন্তান সিরাজুল হিন্দ শাহ আবদুল আজিজ বহিমাহুল্লাহ, যাঁকে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য গুণাবলি আর বিশেষত্ব দিয়ে ধন্য করেছেন, তাঁর কর্মপদ্ধতিও অনুরূপ ছিল। তাঁর ফতোয়া ও লেখাসমূহ থেকে খুব সহজেই বিষয়টি বোঝা যায়।
সুতরাং মাকাসিদে শরিয়াহর আলোকে কখনোই শরিয়াহর মানসুস, ফকিহদের মুসতামবাত ও স্বীকৃত বিধানকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা ছুড়ে ফেলা যায় না। মাসলাহাতের দোহাই দিয়ে আমাদের সালাফদের ফিকহের ভাণ্ডারকে পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত সমাজের সাথে মিলানোর জন্য কাটছাট করা শরিয়াহকে বিকৃত করার নামান্তর।
ইসলামি শরিয়াহর মাকাসিদ ও কল্যাণের ব্যাপারে সালাফদের চেয়ে বেশি কেউ অবগত ছিলেন না। যখন কেউ মাকাসিদ ও মাসালিহের দোহাই দিয়ে সালাফদের ফিকহি সিদ্ধান্তকে ছুড়ে ফেলে, কিংবা শরিয়াহর উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে, তখন সে মূলত সালাফদের ওপর অজ্ঞতার অপবাদ দিচ্ছে; যা থেকে তারা মুক্ত।
সালাফদের বক্তব্যসমূহ মাকাসিদে শরিয়াহকে যথার্থভাবে অনুসরণ করার মাধ্যম। কারণ ইসলামি শরিয়াহ সম্পর্কে তারাই ছিলেন সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী। এবং শরিয়াহর বিধানসমূহের ব্যাপারে তারাই ছিলেন গভীর বুঝের অধিকারী।২০৭ নিঃসন্দেহে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের মতো সালাফে সালেহিনরাই কুরআন, তার ইলম ও তার ভেতর গচ্ছিত রহস্যের ব্যাপারে অধিক জ্ঞানী ছিলেন।২০৮
টিকাঃ
১৯৫. উসুলুল ইফতা লি মুহাম্মাদ তাকি উসমানি, পৃষ্ঠা ২৪৫-২৪৮, মাকতাবাতুল আফকার থেকে প্রকাশিত নুসখা।
১৯৬. মুফতি উবায়দুর রহমান পাকিস্তানিকৃত 'মাকাসিদে শরিয়ত কী আহমিয়্যাত আওর উস কে হুদুদ ওয়া জাওয়াবেত' নামক উর্দু মাকালা থেকে গৃহীত।
১৯৭. আল মুত্তাফাকাত, ৩/৮
১৯৮. আল মুওয়াফাকাত, ৯/৩
২০০. উসুলুল ইফতা লি মুহাম্মাদ তাকি উসমানি, পৃষ্ঠা ২৪৭
২০১. আল মুওয়াফাকাত, ২/৬২
২০২. আল মুওয়াফাকাত, ২/৫৫৬
২০৩. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাওইয়্যাহ, ৫/১৩০
২০৪. উসুলুল ইফতা লি মুহাম্মাদ তাকি উসমানি, পৃষ্ঠা ২৪৫
২০৫. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, পৃষ্ঠা ৩২-৩৩
২০৬. মুফতি উবায়দুর রহমান পাকিস্তানিকৃত 'মাকাসিদে শরিয়ত কর্মী অ্যাইমিয়্যাত আওর উস কে হলুদ ওয়া জাওয়াবেত' নামক উর্দু মাকালা থেকে গৃহীত।
২০৭. মাকাসিদুশ শরিয়াতিল ইসলামিয়্যাহ ওয়া আলাকাতুহা বিল আদিল্লাতিশ শারইয়্যাহ লিল ইউবি, পৃষ্ঠা ৬০১
২০৮. আল মুওয়াফাকাত, ২/৩৮৯