📄 সাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক ওহির অবতরণ এবং তার প্রেক্ষাপটকে সরাসরি প্রত্যক্ষ করা
এই বিষয়টি শরয়ি নুসুসের ক্ষেত্রে তাদের বুঝকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে এবং এই বিষয়টির ক্ষেত্রে অন্য কোনো জমানার লোক তাদের অংশীদার হওয়াও সম্ভব নয়। আর সাহাবায়ে কেরাম থেকে এই বুঝ অর্জন করেছেন তাদের ছাত্র তাবেয়িরা ও তাবেয়িদের থেকে তাদের ছাত্র তাবে-তাবেয়িরা। এই তিন যুগকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের স্বর্ণযুগ হিসেবে আখ্যায়িত করে গেছেন।
পূর্বে ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বক্তব্য বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, 'প্রত্যেক আয়াত কেন এবং কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে তিনি তা জানেন।' একইভাবে হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তোমরা আমাকে আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করো। আমি আল্লাহর কিতাবের প্রতিটি আয়াত সম্পর্কে জানি— তা কি রাতে অবতীর্ণ হয়েছে না দিনে, সমুদ্র-তীরে অবতীর্ণ হয়েছে না পাহাড়ে।'৬৬
ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'নুসুসে কুরআনের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের এমন অনন্য ফাহম অর্জিত আছে, যা পরবর্তীদের জন্য অর্জন করা সম্ভব ছিল না। এমনিভাবে রাসুলের সুনান ও আহওয়ালের (অবস্থা) ব্যাপারে তাদের এমন ইলম আছে, যা পরবর্তী অধিকাংশের কাছে জানা সম্ভব ছিল না। কারণ তারা সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম ও ওহীর অবতরণকে দেখেছেন। সর্বক্ষণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজেদের দৃষ্টির সামনে রেখেছেন এবং তাঁর কথা, কাজ, অবস্থাকে কাছ থেকে জেনেছেন। যার ভিত্তিতে সাহাবায়ে কেরام নিজেদের ফাহমের ওপর দলিল প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর এই বিষয়গুলো পরবর্তীদের জন্য সরাসরি জানা সম্ভব না। ফলে তারা সাহাবিদের ইজমা অথবা কিয়াসের ভিত্তিতে বিধান গ্রহণ করেছেন।’৬৭
আল্লামা শাতেবি রহিমাহুল্লাহ সাহাবিদের বুঝের ওপর নির্ভরতার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, দ্বিতীয়ত সাহাবায়ে কেরام ওহি তথা কুরআন-সুন্নাহর অবতরণ এবং তার বাস্তব প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তারা ওহির পারিপার্শ্বিক অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং শানে নুযুলের ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো অবগত। এজন্য তারা এমন কিছু বুঝতে সক্ষম, যা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব না। তা ছাড়া উপস্থিত ব্যক্তি যা দেখে, অনুপস্থিত ব্যক্তি তা দেখে না। সুতরাং যখন সাহাবায়ে কেরام থেকে কোনো মুতলাককে (সাধারণ বিধান) তাকয়িদ (শর্তযুক্ত) করার কিংবা কোনো আম্ম বর্ণনাকে খাস করার বিবরণ পাওয়া যাবে, তখন এর ওপর আমল করাই সঠিক। আর এই কথা তখন প্রযোজ্য হবে, যখন এর বিরোধী কোনো বক্তব্য তাদের থেকে না পাওয়া যাবে। যদি কোনো সাহাবি উক্ত বর্ণনার বিরোধিতা করেন, তাহলে সেটি তার ইজতিহাদি বিষয় বলে গণ্য হবে。
সুতরাং উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যটি শরয়ি টেক্সট বোঝার ক্ষেত্রে তাদের ওপর নির্ভরতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কারণ এটি এমনই এক বৈশিষ্ট্য, যা সাহাবায়ে কেরام ছাড়া অন্য কারও নেই। নিম্নে দুটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো। যার থেকে সাহাবায়ে কেরামের ফাহমের গুরুত্ব পরিষ্কার হয়ে উঠবে।
এক. কুসতানতিনিয়ার যুদ্ধে যখন মুসলিমরা জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ে শাহাদাত বরণ করছিল, তখন এক লোক বলে উঠল, এই লোকেরা কী করছে! নিজেদের জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَأَنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ.
‘আর আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করো এবং নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না। এবং সৎকর্ম অবলম্বন করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ ৭১
সাহাবি আবু আইয়ুব আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু তার এই কথা শুনে বললেন, এই আয়াত আমাদের মাঝে অবতীর্ণ হয়েছে, আমি এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত আছি। আয়াতে নিজের জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, জিহাদ ছেড়ে দিয়ে সম্পদ বৃদ্ধিতে মগ্ন হয়ে যাওয়া। ৭২
দুই. এরকম আরও একটি উদাহরণ হলো, হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কর্তৃক উরওয়া রহিমাহুল্লাহ এর বুঝকে সংশোধন করে দেওয়া। উরওয়া রহিমাহুল্লাহ সুরা বাকারার ১৫৮ নং আয়াত থেকে বুঝেছিলেন যে, সাফা মারওয়া তাওয়াফ না করলে কোনো সমস্যা নেই। হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার এই বুঝকে সংশোধন করে দিয়ে বলেন, ‘এই আয়াত সেসব আনসারদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা সাফা মারওয়া তাওয়াফ করাকে সমস্যা মনে করত। কারণ জাহেলি যুগে তারা তাদের দেবতাকে তাওয়াফ করত। ফলে তারা এই ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করে। তখন আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন।’
এ ধরনের আরও অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেগুলোতে সাহাবায়ে কেরামের ফাহমের বিশুদ্ধতা ও গুরুত্ব ফুটে ওঠে।
টিকাঃ
৬৬. তারিখে দিমাশক, ৪২/৩৯৮; তবাকাতু ইবনে সাদ, ২/৩৩৮
৬৭. মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৯/২০০
৬৮. আম -এর শাব্দিক অর্থ ব্যাপক। পারিভাষিকভাবে আম বলা হয়, যে শব্দটি কোনো প্রকার সংখ্যা, ধরন ও অবস্থার সীমাবদ্ধতা ছাড়াই অনেক সংখ্যক সদস্যকে শামিল করে নেয়。
৬৯. খাস -এর শাব্দিক অর্থ নির্দিষ্ট। পারিভাষিকভাবে খাস বলা হয়, যে শব্দটি এককভাবে নির্দিষ্ট ধরন, নির্দিষ্ট অবস্থা ও নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্যকে বুঝিয়ে থাকে।
৭০. আল মুওয়াফাকাত, ৪/১২৮
৭১. সুরা বাকারা, আয়াত ১৯৫
৭২. আস সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি, হাদিস নং ১৮৬৫৯
📄 কুরআনের ভাষা তথা আরবি ভাষা সম্পর্কে তারাই সবচেয়ে জ্ঞাত
কারণ কুরআন তাদের ভাষাতেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং আরবি ভাষা-সংক্রান্ত শাস্ত্রগুলো পরবর্তীতে তাদের ভাষা অনুযায়ীই গঠিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُّبِين.
'নাজিল হয়েছে এমন আরবি ভাষায়, যা বাণীকে সুস্পষ্ট করে দেয়। ৭৩
প্রথম জমানার লোকদের থেকে বিশুদ্ধভাষী এবং শক্তিশালী বাগ্মী ব্যক্তি পরবর্তী জমানার কেউ না। আল্লামা শাতেবি রহিমাহুল্লাহ অন্য সকলের বুঝের ওপর তাদের বুঝকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'আরবি ভাষা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান। তারা ছিলেন বিশুদ্ধভাষী আরব, তাদের ভাষায় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি এবং আরবিতে তাদের বিশুদ্ধতার মাত্রা বিন্দুমাত্র কমেনি। সুতরাং অন্য যে কারও তুলনায় তারাই কুরআন-সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যোগ্য। যখন তাদের থেকে কোনো বক্তব্য কিংবা বক্তব্যের সমতুল্য কোনো কাজ আমাদের নিকট বিশুদ্ধ সনদে পৌঁছবে, তখন তার ওপর নির্ভর করাই সঠিক। '৭৪
তিনি আরও বলেন, 'কুরআনের ব্যাপারে সালাফে সালেহিনের যে বুঝসমূহ বর্ণিত হয়েছে, তার সবগুলোই আরবি ভাষার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ এবং শরয়ি দলিল সবগুলোর ওপর প্রমাণ বহন করে।’৭৫
আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আরবি ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা শরয়ি নুসুস বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ। ইমাম হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বিদআতিদের সম্পর্কে বলেন, 'অনারবতা তথা আরবির সাথে সম্পর্কহীনতাই তাদেরকে ধ্বংস করেছে।’৭৬
ইমাম শাফেয়ি রহিমাহুল্লাহ বলেন, '(দীনের ব্যাপারে) মানুষের অজ্ঞতা ও বিরোধের অন্যতম একটি কারণ হলো, আরবিকে বর্জন করা এবং এরিস্টটলের ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়া।’৭৭
আল্লামা সুয়ুতি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ইমাম শাফেয়ি যে বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, আমি তার আগের সালাফদেরও সে বিষয়ে সতর্ক করতে দেখেছি যে, বিদআতের অন্যতম একটি কারণ হলো, আরবি ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা।’৭৮
টিকাঃ
৭৩. সুরা শুআরা, আয়াত ১৯৫
৭৪. আল মুত্তায়ফাকাত, ৪/১২৮
৭৫. প্রাগুক্ত, ৪/২৫৩
৭৬. আত তারিখুল কাবির লিল বুখারি, ৫/৯৩
৭৭. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১০/৮৪
৭৮. সওতুল মানতিক, পৃষ্ঠা ২২