📄 কিতাব ও সুন্নাহ
প্রশ্ন: রেডিও বা টিভিতে কুরআন শুনতে শুনতে খবরের সময় হলে তা শোনা বাদ দিয়ে খবর শোনা হয়। এ কাজ কি কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর্যায়ে পড়ে?
উত্তর: কুরআন যে কোন সময়ে শোনা যায় এবং কোন ব্যক্তি যদি যথাসময়ে কুরআন শোনে অতঃপর খবরের সময় কুরআনের সেন্টার বা চ্যানেল বন্ধ ক'রে খবর শোনে--- যেহেতু খবর নির্দিষ্ট সময়েই হয়, তাহলে তা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর্যায়ে পড়বে না। (লাদা)
প্রশ্ন: অনেকের রেডিও, টিভি, টেপ বা মোবাইলে কুরআন তিলাঅত চলতে থাকে এবং তারা আপোসে গল্পতে মগ্ন থাকে। এ আচরণ কি ঠিক?
উত্তর: মোটেই ঠিক নয়। কুরআন তিলাঅত হলে নিশ্চুপ শুনতে হবে। গল্প করলে কুরআন তিলাঅত বন্ধ ক'রে দিতে হবে। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন, {وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ} (٢٠٤) سورة الأعراف অর্থাৎ, যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ কর এবং নিশ্চুপ হয়ে থাক; যাতে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়। (আ'রাফঃ ২০৪)
প্রশ্নঃ বিতর্কিত সমস্যায় কার সমাধান গ্রহণ করব?
উত্তর: কোন বিষয়ে মতভেদ থাকলে অথবা একই সময়ে দুই আলেমের ভিন্নমুখী ফতোয়া হলে তাঁর ফতোয়া গ্রহণ করতে হবে, যাঁর ফতোয়া কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর বেশি নিকটবর্তী মনে করেন। যাঁকে ইল্ম ও তাক্বওয়ায় বেশি বড় মনে হয়। যেমন একই রোগের দুই ডাক্তারের দুই রকম চিকিৎসা-পদ্ধতি ও রায় শোনেন, তাহলে যাঁকে আপনি বড় ও অভিজ্ঞ ডাক্তার মনে করেন, তাঁর চিকিৎসা ও পথ্য গ্রহণ করবেন।
যদি তুলনা করার উপায় না থাকে, তাহলে যাঁর ফতোয়াটা মানার দিক থেকে সহজ, তাঁর ফতোয়া অনুযায়ী আমল করবেন। যেহেতু দ্বীন সহজ। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ} (١٨٥) سورة البقرة অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদের (জন্য যা) সহজ (তা) করতে চান, তিনি তোমাদের কষ্ট চান না। (বাক্বারাহঃ ১৮৫) {مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ} (٦) سورة المائدة অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট দিতে চান না। (মায়িদাহঃ ৬) {وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ} (۷৮) سورة الحج অর্থাৎ, তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠিনতা আরোপ করেননি। (হাজ্জঃ ৭৮)
আর মহানবী বলেছেন, يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا .... অর্থাৎ, সহজ কর, কঠিন করো না।
আবারও বলি যে, এ হল সাধারণ মানুষের জন্য, যারা নিজে দলীল যাচাই-বাছাই করতে পারে না এবং দুই আলেমের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না। পক্ষান্তরে যাদের সে ক্ষমতা আছে, তাদের জন্য অনুসন্ধান চালিয়ে সঠিক সমাধান জেনে নেওয়া জরুরী। (ইউ)
প্রশ্নঃ অনেক শিক্ষিত মুসলিম পরিবার আছে, যারা কুরআন শেখে না, শিখে থাকলেও নিয়মিত তিলাঅত করে না, তিলাঅত করলেও মানে বুঝে (পড়ে) না, বুঝলেও যথাযথভাবে আমল করে না। এদের আলমারী অথবা দেওয়ালের তাকে বড় যত্নের সাথে কুরআন রাখা থাকে। এদের ব্যাপারে উপদেশ কী?
উত্তর: এই শ্রেণীর মুসলিমরা সেই লোকেদের মতো, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কুরআন বর্জন করার অভিযোগ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا} (٣٠) سورة الفرقان অর্থাৎ, রসূল বলে, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো এ কুরআনকে পরিত্যাজ্য মনে করেছে।' (ফুরক্বান: ৩০) তাদের মধ্যে এমন লোকও থাকতে পারে, যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى} (١٢٤) طه অর্থাৎ, যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, অবশ্যই তার হবে সংকীর্ণতাময় জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।' (ত্বা-হাঃ ১২৪) {وَعَرَضْنَا جَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ لِّلْكَافِرِينَ عَرْضًا (۱۰۰) الَّذِينَ كَانَتْ أَعْيُنُهُمْ فِي غِطَاء عَن ذِكْرِي وَكَانُوا لا يَسْتَطِيعُونَ سَمْعًا} (۱۰۱) سورة الكهف অর্থাৎ, সেদিন আমি জাহান্নামকে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত করব সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের নিকট। যাদের চক্ষু ছিল আমার স্মরণ (কুরআন) এর ব্যাপারে অন্ধ এবং যারা শুনতেও ছিল অপারগ। (কাহফঃ ১০০-১০১)
এদের মধ্যে অনেকে দুনিয়াদার, এরা পত্র-পত্রিকা পড়ে, গল্প-উপন্যাস পড়ে, কিন্তু কুরআন পড়ার সময় পায় না। এই শ্রেণীর লোকদের থেকে বিমুখ হতে নির্দেশ রয়েছে, {فَأَعْرِضْ عَن مَّن تَوَلَّى عَن ذِكْرِنَا وَلَمْ يُرِدْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا (۲۹) ذَلِكَ مَبْلَغُهُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ اهْتَدَى} (٣٠) سورة النجم অর্থাৎ, অতএব তাকে উপেক্ষা ক'রে চল, যে আমার স্মরণে বিমুখ এবং যে শুধু পার্থিব জীবনই কামনা করে। তাদের জ্ঞানের দৌড় এই পর্যন্ত। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই ভাল জানেন, কে তাঁর পথ হতে বিচ্যুত এবং তিনিই ভাল জানেন, কে সৎপথপ্রাপ্ত। (নাজম: ২৯-৩০)
অনেকে কুরআনকে কেবল তাবীয ও মৃতের আত্মার কল্যাণে ব্যবহার করে। অথচ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে জীবিত মানুষের আমলের জন্য। মহান আল্লাহ বলেছেন, {كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُوا الْأَلْبَابِ} (۲۹) سورة ص অর্থাৎ, আমি এ কল্যাণময় গ্রন্থ তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণ গ্রহণ করে উপদেশ। (স্বাদঃ ২৯) {إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً يَرْجُونَ تِجَارَةً لَّن تَبُورَ (۲۹) لِيُوَفِّيَهُمْ أُجُورَهُمْ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضْلِهِ إِنَّهُ غَفُورٌ شَكُورٌ} (۳۰) سورة فاطر অর্থাৎ, নিশ্চয় যারা আল্লাহর গ্রন্থ পাঠ করে, যথাযথভাবে নামায পড়ে, আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে; তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার যাতে কখনোই নোকসান হবে না। এ জন্য যে, আল্লাহ তাদেরকে (তাদের কর্মের) পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং তিনি নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে আরও বেশী দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। (ফাত্বিরঃ ২৯-৩০)
আর মহানবী বলেছেন, "তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, তা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত হবে।” (মুসলিম ৮০৪ নং)
"যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব (কুরআন মাজীদ) এর একটি বর্ণ পাঠ করবে, তার একটি নেকী হবে। আর একটি নেকী, দশটি নেকীর সমান হয়। আমি বলছি না যে, 'আলিফ- লাম-মীম' একটি বর্ণ; বরং আলিফ একটি বর্ণ, লাম একটি বর্ণ এবং মীম একটি বর্ণ।” (অর্থাৎ, তিনটি বর্ণ দ্বারা গঠিত 'আলিফ-লাম-মীম, যার নেকীর সংখ্যা হবে ত্রিশ।) (তিরমিযী)
প্রশ্নঃ উম্মতের ইখতিলাফ কি রহমত?
উত্তর: উম্মতের ইখতিলাফ রহমত নয়। বরং ইবনে মাসউদ বলেছেন, 'ইখতিলাফ খারাপ জিনিস।' (আবু দাউদ ১৯৬০নং) ইখতিলাফ হলে কিতাব ও সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজেব। আর সাহাবাদের ইখতিলাফ ইজতিহাদী। আর ইজতিহাদে ভুল করলেও একটি সওয়াব। কিন্তু ভুল তো ভুলই। সঠিকতা জানার পর আর ইজতিহাদী ভুল বা ইখতিলাফে পড়ে থাকা বৈধ নয়? পরন্ত 'ইখতিলাফ উম্মাতী রাহমাহ' হাদীস সহীহ নয়। (বানী)
📄 দ্বীন
প্রশ্নঃ দ্বীনে মধ্যমপন্থা কী?
উত্তর: দ্বীন মানতে কিছু লোক চরমপন্থী আছে, কিছু আছে নরম ও ঢিলেপন্থী এবং কিছু আছে মধ্যমপন্থী। কেউ দ্বীন ও ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন করে, সহজটাকে কঠিন করে এবং কেউ একেবারে ঢিলেমি করে, অবজ্ঞা ও অবহেলা করে এবং কঠিনটাকে সহজ মনে করে। অথচ প্রত্যেক জিনিসের মাঝামাঝিটাই ঠিক।
আমাদের দ্বীনই হল মধ্যমপন্থী। তাতে অতিরঞ্জন নেই। মহানবী ও তাঁর সাহাবাবর্গের পথই হল মধ্যমপন্থা। মহানবী-এর তরীকাই হল মাঝামাঝি আচরণ। আনাস বলেন যে, তিন ব্যক্তি নবী-এর স্ত্রীদের বাসায় এলেন। তাঁরা নবী- এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর যখন তাঁদেরকে এর সংবাদ দেওয়া হল তখন তাঁরা যেন তা অল্প মনে করলেন এবং বললেন, 'আমাদের সঙ্গে নবী-এর তুলনা কোথায়? তাঁর তো আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মোচন ক'রে দেওয়া হয়েছে। (সেহেতু আমাদের তাঁর চেয়ে বেশী ইবাদত করা প্রয়োজন)।' সুতরাং তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, 'আমি সারা জীবন রাতভর নামায পড়ব।' দ্বিতীয়জন বললেন, 'আমি সারা জীবন রোযা রাখব, কখনো রোযা ছাড়ব না।' তৃতীয়জন বললেন, 'আমি নারী থেকে দূরে থাকব, জীবনভর বিয়েই করব না।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁদের নিকট এলেন এবং বললেন, "তোমরা এই এই কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করি, তার ভয় অন্তরে তোমাদের চেয়ে বেশী রাখি। কিন্তু আমি (নফল) রোযা রাখি এবং রোযা ছেড়েও দিই, নামায পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আর নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (বুখারী-মুসলিম)
সুতরাং তাঁর তরীকাতেই রয়েছে মধ্যমপন্থী আচরণ। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয় দ্বীন সহজ। যে ব্যক্তি অহেতুক দ্বীনকে কঠিন বানাবে, তার উপর দ্বীন জয়ী হয়ে যাবে। (অর্থাৎ মানুষ পরাজিত হয়ে আমল ছেড়ে দেবে।) সুতরাং তোমরা সোজা পথে থাক এবং (ইবাদতে) মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর। তোমরা সুসংবাদ নাও। আর সকাল-সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশে ইবাদত করার মাধ্যমে সাহায্য নাও।” (বুখারী)
বুখারীর অন্য এক বর্ণনায় আছে, "তোমরা সরল পথে থাকো, মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, সকাল-সন্ধ্যায় চল (ইবাদত কর) এবং রাতের কিছু অংশে। আর তোমরা মধ্যমন্থা অবলম্বন কর, মধ্যমন্থা অবলম্বন কর, তাহলেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবে।" যারা ঢিলেপন্থী, তারা সুন্নতের উপর আমল করে না, নফল আদায় করতে সচেষ্ট হয় না, বরং অনেক সময় ফরয আদায়েও শৈথিল্য করে।
উদাহরণ স্বরূপঃ-
(ক) একটি লোক ফাসেক (পাপাচার), সে কাবীরা গোনাহ করে, কিন্তু নামায পড়ে এবং শির্ক করে না। চরমপন্থী বলে, 'আমি তাকে সালাম করব না, তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব, তার সাথে কথা বলব না।'
নরমপন্থী বলে, 'পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়। আমি তাকে সালাম করব, তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব, তার সাথে হেসে-খেলে উঠাবসা করব।'
আর মধ্যমপন্থী বলে, 'আমি তার পাপের জন্য তাকে ঘৃণা করব এবং ঈমানের জন্য ভালোবাসব। তাকে বর্জন করায় যদি কোন উপকার থাকে, তাহলে তাকে বর্জন করব।'
(খ) চরমপন্থী লোক স্ত্রীকে চরণের দাসী মনে করে। নরমপন্থী তাকে নিজের প্রভু মনে করে, বানরের মতো তার কথায় ওঠ-বস করে। আর মধ্যমপন্থী তাকে বন্ধু মনে করে। সে জানে,
{وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} (۲۲۸)
অর্থাৎ, নারীদের তেমনি ন্যায়-সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের কিছুটা মর্যাদা আছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (বাক্বারাহঃ ২২৮)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারী (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে।” (মুসলিম)
প্রশ্ন: মহান আল্লাহ যে জিনিসকে হালাল করেছেন, তা হারাম এবং যে জিনিসকে হারাম করেছেন, তা হালাল করার ব্যাপারে কোন ইমাম, আলেম বা সরকারের আনুগত্য করা কী?
উত্তর: এই শ্রেণীর আনুগত্য তিনভাবে হতে পারে:-
(ক) আল্লাহর বিধানে অসন্তোষ প্রকার ক'রে অথবা তা অপছন্দ ক'রে গায়রুল্লাহর বিধানকে পছন্দ ক'রে তার আনুগত্য করা। এর ফলে মুসলিম 'কাফের' হয়ে যায়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ} (۹) سورة محمد
অর্থাৎ, এটা এ জন্যে যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তারা তা অপছন্দ করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল ক'রে দেবেন। (মুহাম্মাদঃ ৯) আর এ কথা বিদিত যে, একমাত্র কাফেরদেরই যাবতীয় আমল নিষ্ফল করা হয়।
(খ) গায়রুল্লাহর বিধানের আনুগত্য করে। তবে এ কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহর বিধানই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং মানুষের জন্য অধিক কল্যাণকর। কিন্তু কোন কুপ্রবৃত্তিবশে, কোন লোভ বা লাভের খাতিরে গায়রুল্লাহর বিধানের আনুগত্য করে। এ আনুগত্যে মুসলিম 'কাফের' হবে না। যেহেতু সে আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে না। বরং স্বার্থবশে তা পালন করে না। সুতরাং তাকে ফাসেক বলা যাবে।
(গ) না জেনে গায়রুল্লাহর বিধানের আনুগত্য করে। অথবা সে মনে করে যে, সেটাই আল্লাহর বিধান। এ ক্ষেত্রে দুই অবস্থা হতে পারে:-
এক: তার পক্ষে আল্লাহর বিধান জানা সম্ভব। কিন্তু সে জানার চেষ্টা করে না। অথচ মহান আল্লাহ অজানা বিধান উলামার নিকট জিজ্ঞাসা ক'রে জেনে নিতে আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
{فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} (٤٣) سورة النحل، الأنبياء 7
অর্থাৎ, তোমরা যদি না জান, তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর; (নাহল: ৪৩, আম্বিয়া: ৭) এ অবস্থায় সে গোনাহগার হবে।
দুই: তার পক্ষে আল্লাহর বিধান জানা সম্ভব নয়। সুতরাং সে কোন আলেম, নেতা বা সরকারের অন্ধানুকরণ করে। এমতাবস্থায় তার কোন অপরাধ হবে না। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
« مَنْ أُفْتِيَ بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ إِثْمُهُ عَلَى مَنْ أَفْتَاهُ ».
অর্থাৎ, যে ব্যক্তিকে বিনা ইল্মে (ভুল) ফতোয়া দেওয়া হয়, তার পাপ বর্তে মুফতীর উপর। (আবু দাউদ ৩৬৫৭, ইবনে মাজাহ ৫৭, দারেমী ১৫৯নং) এ অবস্থায় যদি অন্ধানুকরণকারীর অপরাধ গণ্য করা হয়, তাহলে তাতে বড় সমস্যা দেখা দেবে এবং ভুলের আশঙ্কায় কেউ কোন আলেমের কথায় ভরসাই রাখবে না। (ইউ)
প্রশ্নঃ যে ব্যক্তি শরীয়তের কোন বিধানকে 'অচল' বা 'বস্তাপচা' মনে করে, সে ব্যক্তির বিধান কী?
উত্তর: সে ব্যক্তি কাফের। যেহেতু শরীয়তের কোন বিধান অচল ও বস্তাপচা নয়। শরীয়তের বিধান বুঝার জন্য অথবা তা বহাল করার জন্য মানুষের বিবেক-বুদ্ধি অচল হতে পারে। কিন্তু সে বিধান শাশ্বত, চিরন্তন ও কালজয়ী। (ইবা)
প্রশ্নঃ যে ব্যক্তি মনে করে, নারী-পুরুষের সমান অধিকার না দিয়ে ইসলাম নারীর প্রতি যুলুম করেছে, সে ব্যক্তির বিধান কী?
উত্তর: ইসলাম নারীকে পুরুষের সমান অধিকার না দিলেও, তাকে তার যথাযথ অধিকার দান করেছে। ইসলাম তার প্রতি কোন অন্যায় করেনি। ইসলামের এ অধিকার বণ্টনকে যদি কেউ অস্বীকার করে এবং অন্যায় ও অবিচার মনে করে, তাহলে সে কাফের। (ইবা)
📄 বিদআত
প্রশ্নঃ 'বিদআত' কাকে বলে? কখন কোন্ কাজকে 'বিদআত' বলে আখ্যায়ন করা হবে?
উত্তর: বিদআত বলা হয় দ্বীন ও ইবাদতে নব আবিষ্কৃত কাজকে। অর্থাৎ, দ্বীন বা ইবাদত মনে ক'রে করা এমন কাজকে বিদআত বলা হবে, যে কাজের কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর কোন দলীল নেই। রাসূলুল্লাহ বলেন,
(( وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُور ؛ فَإِنَّ كلَّ بدعةٍ ضَلالَة )). رواه أبو داود والترمذي
অর্থাৎ, তোমরা (দ্বীনে) নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ (বিদআত) থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” (আবু দাউদ, তিরমিযী)
(( مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌ )) . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ ، وفي رواية المسلم : (( مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ)).
অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কিছু উদ্ভাবন করল---যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” (বুখারী ও মুসলিম) মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে, "যে ব্যক্তি এমন কাজ করল, যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই, তা বর্জনীয়।” বলা বাহুল্য, নব আবিষ্কৃত পার্থিব কোন বিষয়কে বিদআত বলা যাবে না। যেমন শরীয়াতে নিষিদ্ধ কোন কাজকে বিদআত বলা হয় না। বরং তাকে অবৈধ, হারাম বা মকরূহ বলা হয়।
প্রশ্নঃ বিদআত কাকে বলে? 'বিদআতে হাসানাহ' বলে কি কোন বিদআত আছে?
উত্তর: বিদআত বলা হয় দ্বীন বিষয়ক কোন নতুন কর্মকে, যার কোন দলীল শরীয়তে নেই। মহানবী বলেছেন, "অবশ্যই তোমাদের মধ্যে যারা আমার বিদায়ের পর জীবিত থাকবে তারা অনেক রকমের মতভেদ দেখতে পাবে। অতএব তোমরা আমার এবং আমার সুপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ অবলম্বন করো, তা দাঁত দ্বারা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করো। (তাতে যা পাও মান্য কর এবং অন্য কোনও মতের দিকে আকৃষ্ট হয়ো না।) আর (দ্বীনে) নবরচিত কর্মসমূহ হতে সাবধান! কারণ, নিশ্চয়ই প্রত্যেক বিদআত (নতুন আমল) হল ভ্রষ্টতা।” (আবু দাউদ ৪৪৪৩, তিরমিযী ২৮১৫, ইবনে নাজাহ ৪২ নং) আর নাসাঈর এক বর্ণনায় আছে, "আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতা জাহান্নামে (নিয়ে যায়)।" উক্ত হাদীস থেকে এ কথাও প্রমাণ হয় যে, বিদআতে হাসানাহ (ভাল বিদআত) বলে কোন বিদআত নেই। কারণ মহানবী বলেছেন, "প্রত্যেক বিদআত হল ভ্রষ্টতা।”
প্রশ্ন: 'বিদআতে হাসানাহ' নামক কোন বিদআত আছে কি, যা করলে সওয়াব হয়। যেহেতু হাদীসে আছে, “যে ব্যক্তি ইসলামে ভাল রীতি চালু করবে, সে তার নিজের এবং ঐ সমস্ত লোকের সওয়াব পাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের সওয়াবের কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।” (মুসলিম)
উত্তর: 'বিদআতে হাসানাহ' (ভাল বিদআত) বলে কোন বিদআত নেই। বরং প্রত্যেক বিদআতই 'সাইয়্যিআহ' (মন্দ)। মহানবী বলেছেন,
((فَإِنَّ كلَّ بِدْعَةٍ ضَلالَة )) . رواه أبو داود والترمذي
অর্থাৎ, প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” (আবু দাউদ, তিরমিযী) আর হাদীসে যে ভাল রীতি চালু করার কথা বলা হয়েছে, তা নতুন কোন রীতি নয়। বরং যে রীতি শরীয়ত সম্মত কিন্তু কোন জায়গায় তা চালু ছিল না। কোন ব্যক্তি তা চালু করলে তার ঐ সওয়াব হয়। পূর্ণ হাদীসটি পড়লে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন, কোন্ শ্রেণীর রীতির কথা বলা হয়েছে।
জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, একদা আমরা দিনের প্রথম ভাগে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ছিলাম। অতঃপর তাঁর নিকট কিছু লোক এল, যাদের দেহ বিবস্ত্র ছিল, পশমের ডোরা কাটা চাদর (মাথা প্রবেশের মত জায়গা মাঝে কেটে) পরে ছিল অথবা 'আবা' (আংরাখা) পরে ছিল, তরবারি তারা নিজেদের গর্দানে ঝুলিয়ে রেখেছিল। তাদের অধিকাংশ মুযার গোত্রের (লোক) ছিল; বরং তারা সকলেই মুযার গোত্রের ছিল। তাদের দরিদ্রতা দেখে রাসূলুল্লাহ-এর চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। সুতরাং তিনি (বাড়ির ভিতর) প্রবেশ করলেন এবং পুনরায় বের হলেন। তারপর তিনি বেলালকে (আযান দেওয়ার) আদেশ করলেন। ফলে তিনি আযান দিলেন এবং ইকামত দিলেন। অতঃপর তিনি নামায পড়ে লোকদেরকে (সম্বোধন ক'রে) ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, “হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন ও তা হতে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাদের দু'জন থেকে বহু নরনারী (পৃথিবীতে) বিস্তার করেছেন। সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাজ্ঞা কর এবং জ্ঞাতি-বন্ধন ছিন্ন করাকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।” (সূরা নিসা ১ আয়াত) অতঃপর দ্বিতীয় আয়াত যেটি সূরা হাশরের শেষে আছে সেটি পাঠ করলেন, "হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক যে, আগামীকালের (কিয়ামতের) জন্য সে অগ্রিম কী পাঠিয়েছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।” (সূরা হাশর ১৮ আয়াত) "সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন নিজ দীনার (স্বর্ণমুদ্রা), দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা), কাপড়, এক সা' গম ও এক সা' খেজুর থেকে সাদকাহ করে।” এমনকি তিনি বললেন, "খেজুরের আধা টুকরা হলেও (তা যেন দান করে)।” সুতরাং আনসারদের একটি লোক (চাঁদির) একটি থলে নিয়ে এল, লোকটির করতল যেন তা ধারণ করতে পারছিল না; বরং তা ধারণ করতে অক্ষমই ছিল। অতঃপর (তা দেখে) লোকেরা পরস্পর দান আনতে আরম্ভ করল। এমনকি খাদ্য সামগ্রী ও কাপড়ের দু'টি স্তূপ দেখলাম। পরিশেষে আমি দেখলাম যে, রাসুলুল্লাহ-এর চেহারা যেন সোনার মত ঝলমল করছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বললেন, "যে ব্যক্তি ইসলামে ভাল রীতি চালু করবে, সে তার নিজের এবং ঐ সমস্ত লোকের সওয়াব পাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের সওয়াবের কিছু পরিমাণও কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির প্রচলন করবে, তার উপর তার নিজের এবং ঐ লোকদের গোনাহ বর্তাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের গোনাহর কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।” (মুসলিম)
লক্ষণীয় যে, দান করা একটি ভাল রীতি। কিন্তু অনেকের মধ্যে যে প্রথম শুরু করবে, তার হবে উক্ত সওয়াব। কোন নতুন রীতি আবিষ্কার করা উদ্দেশ্য নয়। হাদীসের শব্দে ঐ রীতিকে 'সুন্নাহ' বলা হয়েছে, যা বিদআতের বিপরীত। সুতরাং 'বিদআতে হাসানা'র দলীল তাতে নেই।
বলা বাহুল্য, উক্ত হাদীসে নতুন রীতি চালু করার পর্যায়ভুক্ত তিন প্রকার কাজ:- (ক) শরীয়তসম্মত ভাল কাজ। কিন্তু অনেকের মধ্যে সর্বপ্রথম করা। (খ) কোন সুন্নত কাজ, যা উঠে গিয়েছিল বা লোকমাঝে প্রচলিত ছিল না অথবা অজানা ছিল, তা নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করা, লোকমাঝে প্রচলিত করা অথবা জানিয়ে তার প্রচলন করা। (গ) কোন এমন কাজ করা, যা কোন শরীয়তসম্মত ভাল কাজের মাধ্যম। যেমন দ্বীনী মাদ্রাসা নির্মাণ করা, দ্বীনী বই-পত্র ছাপা ইত্যাদি। (ইউ)
প্রশ্নঃ ঈদে মীলাদুন নাবী বিদআত কেন?
উত্তর: যেহেতু শরীয়তে তার কোন দলীল নেই। খোদ নবী বা তাঁর কোন সাহাবী, কোন তাবেঈ বা ইমাম তা পালন করে যাননি, করার নির্দেশও দেননি।
সর্বপ্রথম ঈদে মীলাদ (নবীদিবস) আবিষ্কার করেন ইরাকের ইরবিল শহরের আমীর (গভর্নর) মুযাফ্ফারুদ্দীন কুকুবুরী ঠিক হিজরী সপ্তম শতাব্দীর গোড়ার দিকে ৬০৪ (মতান্তরে ৬২৫) হিজরীতে। মিসরে সর্বপ্রথম চালু করে ফাতেমীরা; যাদের প্রসঙ্গে ইবনে কাসীর বলেন, “(ফাতেমী শাসকগোষ্ঠী) কাফের, ফাসেক, পাপাচার, ধর্মধুজী, ধর্মদ্রোহী, আল্লাহর সিফাত (গুণাবলী) অস্বীকারকারী ও ইসলাম অস্বীকারকারী মাজুসী ধর্ম-বিশ্বাসী ছিল।” (আল-বিদায়াহ অন-নিহায়াহ' ১১/৩৪৬)
অনেকে বলেছেন, মীলাদে মোস্তফা একটি নব্য আবিষ্কার; যা আজ থেকে প্রায় বার শত বছর পূর্বে হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগে শায়খ উমার বিন মুহাম্মাদ সর্বপ্রথম প্রবর্তন করেন। মাওসেলের অধিবাসী উক্ত উমার বিন মুহাম্মাদ নাকি খুবই আশেকে রসূল ও আল্লাহর অলী ছিলেন। তিনি রসূল-এর ভালবাসায় একান্ত অনুরাগের বশে এ মীলাদ তথা রসূল-এর জন্ম-বৃত্তান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় ব্রতী হন। বিখ্যাত সীরাতে শামী গ্রন্থে এ কথা স্বীকার করা হয়েছে। (দেখুনঃ ছহীহ মাকছুদে মু'মেনীন ৩৬৯পৃঃ) তাছাড়া এতে রয়েছে বিজাতির অনুকরণ এবং শরীয়ত-বিরোধী বহু কর্মকান্ড। ('বারো মাসে তেরো পরব' দ্রঃ)
প্রশ্নঃ 'ঈদে মীলাদুন নাবী' (নবী-দিবস) পালন করা বৈধ নয় কেন?
উত্তর: মহান আল্লাহ আমাদের দ্বীন ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন তাঁর নবীর জীবদ্দশাতেই। মহান আল্লাহ বলেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دينا) (۳) المائدة
অর্থাৎ, আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ (নেয়ামত) সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্মরূপে মনোনীত করলাম। (সূরা মায়েদাহ ৩ আয়াত)
আর মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এ (দ্বীন) ব্যাপারে নতুন কিছু আবিষ্কার করে, সে ব্যক্তির সে কাজ প্রত্যাখ্যাত।” (বুখারী ও মুসলিম) "যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করে, যার উপর আমাদের কোন নির্দেশ নেই, সে ব্যক্তির সে কাজ প্রত্যাখ্যাত।” (মুসলিম) ইসলামে পালনীয় ঈদ হল মাত্র দুটি; ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আযহা। তৃতীয় কোন ঈদ ইসলামে নেই। মহানবী নবুয়তের ২৩ বছর কাল নিজের জীবনে কোন বছর নিজের জন্মদিন পালন করে যাননি। কোন সাহাবীকে তা পালন করার নির্দেশও দেননি। তাঁর পূর্ববর্তী নবীদের জন্ম-মৃত্যু উপলক্ষ্যে কোন আনন্দ অথবা শোকপালন করে যাননি। তাঁর পরবর্তীকালে তাঁর চারজন খলীফা তাঁদের খেলাফতকালে রাষ্ট্রীয়ভাবে অথবা এককভাবে নবীদিবস পালন করে যাননি। অন্য কোন সাহাবী বা আত্মীয়ও তাঁর প্রতি এত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে আনন্দ অথবা মৃত্যুদিন উপলক্ষ্যে শোক পালন করেননি। তাঁদের পরেও কোন তাবেঈ অথবা তাঁদের কোন একনিষ্ঠ অনুসারী অথবা কোন ইমাম তাঁর জন্ম কিংবা মৃত্যুদিন পালন করার ইঙ্গিত দিয়ে যাননি। সুতরাং তা যে নব আবিষ্কৃত বিদআত, তা বলাই বাহুল্য। খ্রিষ্টানরা আন্দাজে ২৫শে ডিসেম্বর যীসু খ্রিস্টের জন্মোৎসব (মীলাদ, বড়দিন বা ক্রিস্টমাস ডে) এবং তাদের পরিবারের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্মদিন (বার্থডে') বড় আনন্দের সাথে পালন করে থাকে। মুসলিমরা তাদের মত আনন্দে মাতোয়ারা হওয়ার উদ্দেশ্যে এই বিদআত ওদের নিকট হতেই গ্রহণ করে নিয়েছে। তাই এরাও ওদের মত নবীদিবস (ঈদে-মীলাদুন-নবী) এবং পরিবারের সভ্যদের (বিশেষ করে শিশুদের) 'হ্যাপি বার্থ ডে'র অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে থাকে। অথচ তাদের রসূল তাদেরকে সাবধান করে বলেন, “যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করে সে তাদেরই একজন।” (আবুদাউদ)
প্রশ্নঃ কেক কেটে, মোমবাতি নিভিয়ে বার্থ-ডে বা জন্মদিন পালন করা কি?
উত্তর: বার্থ-ডে বা জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী পালন করা সুন্নত। তবে সেই সুন্নত, যার জন্য মহানবী বলেছেন, "অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির সুন্নত (তরীকা) অনুসরণ করবে বিঘত বিঘত এবং হাত হাত পরিমাণ (সম্পূর্ণরূপে)। এমনকি তারা যদি সান্ডার (গোসাপ জাতীয় এক প্রকার হালাল জন্তর) গর্তে প্রবেশ করে, তবে তোমরাও তাদের অনুসরণ করবে (এবং তাদের কেউ যদি রাস্তার উপর প্রকাশ্যে স্ত্রী- সংগম করে তবে তোমরাও তা করবে)!" সাহাবাগণ বললেন, 'আল্লাহর রসূল ইয়াহুদ ও খ্রিস্টানরা?' তিনি বললেন "তবে আবার কারা?” (বুখারী, মুসলিম ও হাকেম) বলা বাহুল্য, বিজাতীর অনুকরণে এমন উৎসব বা অনুষ্ঠান পালন করা বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের আনুরূপ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই দলভুক্ত।” (আবু দাউদ, ইবা) একই পর্যায়ে পড়েঃ ভালবাসা-দিবস, মাতৃ-দিবস ইত্যাদি।
প্রশ্নঃ তসবীহ গুনতে তসবীহ-মালা ব্যবহার করা কি বিদআত?
উত্তর: অনেকে বিদআত বলেছেন। তা না হলেও তা ব্যবহার না করাই উত্তম। কারণঃ- ১। মহানবী আঙ্গুল দ্বারা তসবীহ করেছেন এবং বলেছেন,
(إِنَّهُنَّ مَسْئُولَاتٌ مُسْتَنْطَقَاتٌ).
অর্থাৎ, আঙ্গুলগুলোকে (তার দ্বারা কৃত কর্মের ব্যাপারে) জিজ্ঞাসা করা হবে, কথা বলানো হবে। (আহমাদ ৬/৩৭১, আবু দাউদ ১৫০ ১, তিরমিযী ৩৫৮৩নং) সুতরাং কিয়ামতে আঙ্গুলগুলো তসবীহ পড়ার সাক্ষ্য দেবে, মালা সাক্ষ্য দেবে না। ২। মালা ব্যবহার ক'রে তসবীহ পড়লে সাধারণতঃ মনোযোগ ও একাগ্রতা বিচ্ছিন্ন হতে পারে। আঙ্গুল গুনলে তা হয় না। ৩। তসবীহ-মালা ব্যবহারে লোক-দেখানি বা 'রিয়া' হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রঙ- বেরঙের মালা ও তার খটখট শব্দ মানুষের দৃষ্টি ও মন আকর্ষণ করে। আর আমলে 'রিয়া' ঢুকলে সওয়াবের জায়গায় শির্ক ঘটে বসবে। বলা বাহুল্য, তসবীহ-দানার চাইতে আঙ্গুল গোনাই শরীয়তসম্মত। (ইউ)
প্রশ্ন: মুর্দার নামে কুরআনখানি, ফাতেহাখানি, কুলখানি শরীয়তসম্মত কি?
উত্তর: না। বরং তা বিদআত। এ কাজ মহানবী এবং তাঁর পরে তাঁর সাহাবাগণ, তাবেঈন ও সলফগণ ক'রে যাননি। আর আল্লাহর রসুল বলেন, "যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীন বিষয়ে অভিনব কিছু রচনা করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয় তা প্রত্যাখ্যাত।” (বুখারী ২৬৯৭, মুসলিম ১৭১৮নং)
মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি এমন কোন কর্ম করে, যাতে আমাদের কোন নির্দেশ নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” (মুসলিম ১৭১৮নং)
প্রশ্ন: ক্বারীদের কুরআন তিলাঅতের শেষে 'স্বাদাক্বাল্লাহুল আযীম' পড়া কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: না। উপর্যুক্ত কারণে তা বিদআত। (লাদা) শরীয়তে এ কাজের কোন ভিত্তি নেই। একদা মহানবী ইবনে মাসউদ-এর নিকট ক্বিরাআত শুনলেন। পরিশেষে তিনি তাঁকে 'হাসবুক' বলে থামতে বললেন। (বুখারী ৫০৫০নং) তখন তিনিও 'স্বাদাক্বাল্লাহুল আযীম' বলেননি এবং ইবনে মাসউদও বলেননি। (ইবা)
প্রশ্নঃ তিলাঅত শেষে কুরআন চুম্বন দেওয়া কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: একই কারণে এ কাজও বিদআত। (লাদা)
প্রশ্নঃ 'মাতৃ-দিবস' পালন করা কি বৈধ?
উত্তর: এটি আসলে অমুসলিমদের আবিষ্কৃত একটি ঈদ। সুতরাং মুসলিমদের তা পালন করা বিদআত এবং সেই সাথে কাফেরদের সাদৃশ্য অবলম্বন ও অন্ধ অনুকরণও। মুসলিমদের বাৎসরিক ঈদ দু'টি এবং সাপ্তাহিক ঈদ একটি। এ ছাড়া আর কোন ঈদ বা পালনীয় 'দিবস' নেই। বলা বাহুল্য কাফেরদের অনুকরণে অনুরূপ সকল ঈদ বর্জনীয়। রাসূলুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কথা উদ্ভাবন করল---যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” (বুখারী ও মুসলিম)
মায়ের যে হক আছে, তা বৎসরের একটি দিবসকে তার নামে পালন ক'রে, দু'-চারটি উপহার-উপঢৌকন পেশ ক'রে, পান-ভোজনের অনুষ্ঠান ক'রে আদায় হয়ে যায় না। মায়ের প্রতি কর্তব্য আছে প্রাত্যহিক। মায়ের পদতলে আছে ছেলের বেহেস্ত। মায়ের কথার অবাধ্য হয়ে 'মাতৃ-দিবস' পালন ক'রে পার্থিব আনুষ্ঠানিক আনন্দোপভোগ ছাড়া আর কী হতে পারে? (ইউ)
প্রশ্ন: হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ-কে সোমবার দিনে রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, "ওটি এমন একটি দিন, যেদিন আমার জন্ম হয়েছে।” (মুসলিম) এ হাদীস থেকে কি প্রমাণ হয় না যে, মহানবী নিজের জন্মদিন পালন করতেন?
উত্তর: এ হাদীস থেকে জন্মদিন পালন করার কথা প্রমাণিত হয় না। যদি হয়েও থাকে, তাহলে প্রত্যেক সোমবারকে তাঁর জন্মদিন হিসাবে পালন করতে হবে এবং কেবল রোযা রাখার মাধ্যমে। নচেৎ তা কামার-পুকুরের দলীল দেখিয়ে কুমোর-পুকুর দখল করার মতো ব্যাপার হবে।
প্রশ্নঃ তসবীহ গুনতে 'তসবীহ-দানা' বা 'তসবীহ-মালা' ব্যবহার করা কি বিদআত?
উত্তর: 'তসবীহ-দানা' ব্যবহারকে বিদআত বলা হয় না। যেহেতু তা ইবাদতের একটি অসীলা। আর ইবাদতের অসীলাকে বিদআত বলা হয় না। তবে তা সুন্নাহর পরিপন্থী। যেহেতু মহানবী ডান হাতের আঙ্গুল দ্বারা তসবীহ গুনেছেন। সুতরাং 'তসবীহ-মালা' ব্যবহার না করাই উত্তম। এর আরও দু'টি কারণ আছে। এক: এতে তসবীহকারী উদাস হয়ে থাকে। যেহেতু গোনা মালা তো গাঁথাই আছে। তাই খেয়াল থাকে না গণনায় এবং খেয়াল থাকে না তসবীহতে। দুই: এতে 'রিয়া' বা লোকপ্রদর্শনের সম্ভাবনা আছে অনেক। যেহেতু 'তসবীহ-মালা' দেখে লোকে তার প্রশংসাই করবে। (ইবা, ইউ)
অনেকে বলবেন, 'আঙ্গুল দ্বারা গণনায় সংখ্যায় ভুল হতে পারে। মালা দ্বারা নির্ভুল গণনা সম্ভব।' আমরা বলি, 'গণনায় ভুল হলে সমস্যা কি? নিয়ত যখন ঠিক থাকে, তখন সওয়াব তো কমে যাবে না। বিশেষ ক'রে আঙ্গুল যখন কিয়ামতে কথা বলে তসবীহকারীর জন্য সাক্ষ্য দেবে, (আহমাদ ৬/৩৭১, আবু দাউদ ১৫০১, তিরমিযী ৩৫৮৩নং) তখন তাতেই ফযীলত বেশী নয় কি?'
প্রশ্নঃ কুরআন তিলাঅত শেষে 'স্বাদাক্বাল্লাহুল আযীম' বলা কি বিধেয়?
উত্তর: কুরআন তিলাঅত শেষে 'স্বাদাক্বাল্লাহুল আযীম' বলা বিধেয় নয়, বরং বিদআত। যেহেতু এ কাজ মহানবী, তাঁর কোন সাহাবী অথবা তাঁদের পরবর্তী কোন ইমাম ক'রে যাননি। অথচ তাঁরা ছিলেন অধিক অধিক কুরআন তিলাঅতকারী। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আমাকে বললেন, “(হে ইবনে মাসঊদ!) আমাকে কুরআন পড়ে শুনাও।” আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি আপনাকে পড়ে শোনাব, অথচ আপনার উপরেই তা অবতীর্ণ করা হয়েছে?' তিনি বললেন, "অপরের মুখ থেকে (কুরআন পড়া) শুনতে আমি ভালবাসি।” সুতরাং তাঁর সামনে আমি সূরা নিসা পড়তে লাগলাম, পড়তে পড়তে যখন এই (৪১নং) আয়াতে পৌঁছলাম---যার অর্থ, "তখন তাদের কী অবস্থা হবে, যখন প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং তোমাকেও তাদের সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব?” তখন তিনি বললেন, "যথেষ্ট, এখন থাম।” অতঃপর আমি তাঁর দিকে ফিরে দেখি, তাঁর নয়ন যুগল অশ্রু ঝরাচ্ছে। (বুখারী, মুসলিম) কই? এখানে তিনি 'স্বাদাক্বাল্লাহুল আযীম' বলেননি।
মহান আল্লাহ বলেছেন, বল, 'স্বাদাক্বাল্লাহ'। (আলে ইমরান: ৯৫) কিন্তু তিনি বলেননি যে, কুরআন পড়া শেষ হলে 'স্বাদাক্বাল্লাহ' বল। বলা বাহুল্য, কোন আম নির্দেশকে বিশেষ কাজের জন্য খাস করা শরয়ী নীতি নয়। (ইবা, লাদা)
প্রশ্ন: কলোম্বোর এক মসজিদের ডান দিকে নবী-এর কবরের ছবি টাঙ্গানো আছে। তার সামনে মুসল্লীরা দাঁড়িয়ে নবী-এর উপর দরূদ পাঠ করে। এ কাজ কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর: মসজিদের ভিতরে নবী-এর কবরের (বা সবুজ গম্বুজের) ছবি রাখা একটি আপত্তিকর বিদআত। পরন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে দরূদ পাঠ করা অন্য একটি আপত্তিকর বিদআত। এটি অতিরঞ্জনবশতঃ কৃত আচরণ। আর নবী বলেছেন, "তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে অতিরঞ্জন করা থেকে দূরে থেকো। কেননা অতিরঞ্জনই পূর্ববর্তী বহু উম্মতকে ধ্বংস করেছে।” (আহমদ ১/২১৫, ৩৪৭, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ৩০২৯নং) তিনি আরো বলেছেন,
((لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ)).
অর্থাৎ, তোমরা আমাকে নিয়ে (আমার তা'যীমে) বাড়াবাড়ি করো না, যেমন খ্রিস্টানরা (ঈসা) ইবনে মারয়্যামকে নিয়ে করেছে। আমি তো আল্লার দাস মাত্র। অতএব তোমরা আমাকে আল্লাহর দাস ও তাঁর রসূলই বলো।” (বুখারী ৩৪৪৫, মুসলিম, মিশকাত ৪৮৯৭নং)
দরূদ যে কোন (পবিত্র) জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে-বসে পড়া যায়। মহানবী-এর কবরের ছবি সামনে রেখে দাঁড়িয়ে দরূদ পড়া বিদআত। তাঁর তা'যীমের উদ্দেশ্যে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দরূদ পড়া বিদআত। এক সাথে জামাআতী দরূদ পড়া বিদআত।
তাছাড়া মসজিদের দেওয়ালে নবী-অলীর কবরের ছবি অঙ্কন করা অথবা টাঙ্গানো মসজিদে তাঁদেরকে দাফন করার বিধানের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু তা মানুষকে শির্কের দিকে টেনে নিয়ে যায়। ঐ ছবির সামনে দরূদ পড়তে পড়তে নবী-এর কাছে প্রার্থনাও শুরু হয়ে যায়। সুতরাং এমন কাজ তওবার সাথে বর্জনীয়। (লাদা)
📄 ইখলাস ও নিয়ত
প্রশ্ন: অনেক সময় ভাল কাজ করি। অতঃপর মনের ভিতরে প্রশংসার লোভ হয়। তাতে কি তা বাতিল হয়ে যাবে?
উত্তর: এ হল শয়তানী অসঅসা (কুমন্ত্রণা)। এর প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা উচিত নয়। তবে অসঅসার সাথে সাথে শয়তান থেকে পানাহ চেয়ে নেওয়া উচিত। (ইউ)
প্রশ্ন: অনেক সময় ভাল কাজ করি। অতঃপর তার ফলে লোকমাঝে তার চর্চা হয়, আমার সুনাম ও সুখ্যাতি হয়। অথচ আমি মনে মনে তা চাইনি। তাতে কি তা বাতিল হয়ে যাবে?
উত্তর: মনে সুনামের কামনা না থাকা সত্ত্বেও যদি মানুষের মাঝে কারো সুনাম হয়, তাহলে জানতে হবে এটা তার সত্বর সওয়াব। তবে তাতে তার পরকালের সওয়াব বরবাদ হয়ে যাবে না। একদা রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হল; বলুন, 'যে মানুষ সৎকাজ করে, আর লোকে তার প্রশংসা ক'রে থাকে, (তাহলে এরূপ কাজ কি রিয়া বলে গণ্য হবে?)' তিনি বললেন, "এটা মু'মিনের সত্বর সুসংবাদ।” (মুসলিম)
প্রশ্নঃ এক কর্মচারী বেনামাযী ছিল। মালিক বলল, 'তুমি নামায পড়লে তোমার বেতন ১০০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তখন থেকে সে নামায পড়া শুরু করল। প্রশ্ন হল, তার নামায কি আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য?
উত্তর: আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে, অর্থ, গদি, সুনাম, সুবিধা ইত্যাদি উপার্জনের উদ্দেশ্যে কোন ইবাদত করলে তা মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
রসূল বলেছেন, "যাবতীয় কার্য নিয়ত বা সংকল্পের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষের জন্য তাই প্রাপ্য হবে, যার সে নিয়ত করবে। অতএব যে ব্যক্তির হিজরত (স্বদেশত্যাগ) আল্লাহর (সন্তোষ লাভের) উদ্দেশ্যে ও তাঁর রসূলের জন্য হবে; তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্যই হবে। আর যে ব্যক্তির হিজরত পার্থিব সম্পদ অর্জন কিংবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যেই হবে, তার হিজরত যে সংকল্প নিয়ে করবে তারই জন্য হবে।” (বুখারী-মুসলিম)
আবু মুসা আব্দুল্লাহ ইবনে কায়স আশআরী বলেন, আল্লাহর রসূল -কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, যে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য যুদ্ধ করে, অন্ধ পক্ষপাতিত্বের জন্য যুদ্ধ করে এবং লোক প্রদর্শনের জন্য (সুনাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে) যুদ্ধ করে, এর কোন্ যুদ্ধটি আল্লাহর পথে হবে? আল্লাহর রসূল বললেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর কালেমাকে উঁচু করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে, একমাত্র তারই যুদ্ধ আল্লাহর পথে হয়।” (বুখারী ও মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, "আমি সমস্ত অংশীদারদের চাইতে অংশীদারি (শিক) থেকে অধিক অমুখাপেক্ষী। কেউ যদি এমন কাজ করে, যাতে সে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করে, তাহলে আমি তাকে তার অংশীদারি (শির্ক) সহ বর্জন করি।” (অর্থাৎ তার আমলই নষ্ট ক'রে দিই।) (মুসলিম)
সুতরাং সেই কর্মচারীর উচিত, নিয়ত পাল্টে নিয়ে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে নামায পড়া। বেতন সে গ্রহণ করুক, কিন্তু নামায পড়ুক আল্লাহর ভয়ে।
উল্লেখ্য যে, অভিভাবকের ভয়ে নামায পড়া, সমাজে দুর্নামের ভয়ে রোযা রাখা, অর্থ লোভে বদল হজ্জ করা, চাকরির আশায় দ্বীনী ইল্ম অর্জন করা, বেতনের লোভে ইমামতি করা, খ্যাতির লোভে দান করা, নাম ও অর্থের লোভে দ্বীনী দাওয়াতের কাজ করা ইত্যাদি 'রিয়া'র বিধান একই।
প্রশ্নঃ কোন কোন ভাল আমলের প্রশংসা শোনা গেলে তার ফলে কি ঐ আমল বাতিল গণ্য হয়?
উত্তর: আমলকারীর নিয়তে প্রশংসা নেওয়ার নিয়ত না থাকলে প্রশংসনীয় আমল বাতিল হয় না। যেহেতু
عَنْ أَبِي ذَرٍ قَالَ : قِيلَ لِرَسُولِ اللهِ ﷺ : أَرَأَيْتَ الرَّجُلَ الَّذِي يَعْمَلُ العَمَلَ مِنَ الخَيْرِ ، وَيَحْمَدُهُ النَّاسُ عَلَيْهِ ؟ قَالَ : (( تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ )). رواه مسلم
আবু যার হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হল; বলুন, 'যে মানুষ সৎকাজ করে, আর লোকে তার প্রশংসা ক'রে থাকে (তাহলে এরূপ কাজ কি রিয়া বলে গণ্য হবে?)' তিনি বললেন, "এটা মু'মিনের সত্বর সুসংবাদ।” (মুসলিম)
প্রশ্নঃ ওযু, নামায ইত্যাদির নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা কি বিধেয়?
উত্তর: ইবাদতের নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা বিদআত। যেহেতু তা মহানবী অথবা তাঁর কোন সাহাবী কর্তৃক প্রমাণিত নয়। সুতরাং তা বর্জন করা ওয়াজেব। নিয়ত মানে সংকল্প। আর তার স্থান হল মনে। অতএব তা মুখে উচ্চারণ করার কোনই প্রয়োজন নেই। (ইবা, ইউ)