📄 ১. আল্লাহর আইনকানুনকে পার্লামেন্ট এর মুখাপেক্ষী বানানো:
প্রাচ্যের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শরীয়াহবিরোধী ও কুফরীর এ প্রকারটি খুবই আশ্চর্যজনক। এ কুফরী সেই প্রাচ্যের গণতন্ত্রে অনুপস্থিত, যাকে তারা পশ্চিমা, লিবারেল বা ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র নামে অবহিত করে। কারণ, তারা তো সরাসরি অস্বীকার করে এবং নতুন শরীয়াহ প্রবর্তনে নিজেদেরকে স্বাধীন মনে করে। তারা ধর্মকে রাষ্ট্রীয় সব কার্যকলাপ থেকে শুরু থেকেই ঝেটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। আর ভারতের মতো কুফরী রাষ্ট্রের জন্য কুফরের এ নতুন প্রকারটির সাথে পরিচিত হওয়ার প্রয়োজনই নেই।
কুফরের এই আশ্চর্যজনক প্রকরণটি সেই গণতন্ত্রের ফসল, যেটিকে ইসলামী প্রমাণের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আল্লাহর অকাট্য আয়াত অর্থাৎ যেসব আইন-কানুন আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে বর্ণনা করেছেন অথবা যা রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, সেগুলোকে ইসলামী গণতন্ত্রে ঐ সময় পর্যন্ত আইন হিসেবে মেনে নেওয়া হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সংসদে সদস্যদের বৈঠক করার পর ওগুলোকে অনুমোদন করার প্রতি মুখাপেক্ষী বানায়। নাউযুবিল্লাহ! এরপর সংসদ তা পাশ করলে আইনে পরিণত হবে। নয়তো বলে দেবে যে-
﴿ائْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هَذَا أَوْ بَدِّلْهُ ﴾
"এটি ছাড়া অন্য একটি কুরআন নিয়ে এসো, যেটিকে আমরা ধর্ম হিসেবে মানতে পারব বা এটিতে পরিবর্তন করে অনুমোদন করে দাও।” (নাউযুবিল্লাহ!)
অতএব, উলামায়ে হক্কের কাছে আরয হলো, এসব বাতিলের প্রতারণা সর্বদা আলোচনা করবেন। আমাদের সবাইকে সেই রবের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, যেখানে কারো ক্ষমতা, কারো শক্তি, কারো ধমক চলবে না। এ সরকারি প্রটোকল কোনো কাজে আসবে না। এটিকে স্পষ্টভাবে আলোচনা করা আবশ্যক। আল্লাহর আইনকে অনুমোদন করতে পার্লামেন্ট এর মুখাপেক্ষী হওয়া এমন কুফরী, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। এটাই প্রত্যেক গণতান্ত্রিক সরকারের রাষ্ট্রীয় ধর্ম। এটিই গণতন্ত্রের প্রাণ ও মনন।
তারপরও দাবি হলো, সেই সরকারের সর্বোচ্চ আইনপ্রণেতা তো আল্লাহই। আল্লাহ কুরআনে কতই না সুন্দর বলেছেন! যেন এখনই তাজা তাজা অবতীর্ণ হচ্ছে-
وَجَعَلُوا لِلَّهِ مِمَّا ذَرَأَ مِنَ الْحَرْثِ وَالْأَنْعَامِ نَصِيبًا فَقَالُوا هُذَا لِلَّهِ بِزَعْمِهِمْ وَهُذَا لِشُرَكَائِنَا فَمَا كَانَ لِشُرَكَائِهِمْ فَلَا يَصِلُ إِلَى اللَّهِ وَمَا كَانَ لِلَّهِ فَهُوَ يَصِلُ إِلَى شُرَكَائِهِمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ ﴿الأنعام: ১৩৬﴾
"আল্লাহ যেসব শস্যক্ষেত্র ও জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো থেকে তারা এক অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে অতঃপর নিজ ধারণা অনুসারে বলে এটা আল্লাহর এবং এটা আমাদের অংশীদারদের। অতঃপর যে অংশ তাদের অংশীদারদের, তা তো আল্লাহর দিকে পৌঁছে না এবং যা আল্লাহর তা তাদের উপাস্যদের দিকে পৌছে যায়। তাদের বিচার কতই না মন্দ।" (সূরা আন'আম: ১৩৬)
২. আল্লাহর সাথে কুফরী:
তাশরী' তথা আইন প্রণয়নের অধিকার পার্লামেন্টকে দিয়ে দেওয়া। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে কৃত এটি এমন এক কুফর, যা ছাড়া কোনো সরকারকেই গণতান্ত্রিক বলা হবে না। সেই গণতন্ত্রের সুরক্ষার জন্য রয়েছে প্রত্যেক দেশে জাতীয় নিরাপত্তাবাহিনী। যারা সেটিকে সুরক্ষা দিতে সদা তৎপর। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের সুরক্ষা দিতে বদ্ধপরিকর।
পাকিস্তানে ক্ষমতাসীনরা ধর্মীয় নেতাদেরকে প্রতারণা করে বলে যে, পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র। কারণ, তার আইন ইসলামী। প্রমাণ হলো, তার সংবিধানে লেখা আছে—কুরআন-সুন্নাহই হবে পাকিস্তানের আইন। সেনাবাহিনী ও গোপন এজেন্সিগুলো বা ক্ষমতাসীনশ্রেণী, যারা ক্ষমতার মজা লুটছে; তারা এসব কথা বলে সাধারণ মুসলমানকে যে ধোঁকা দিচ্ছে, তা সহজেই বুঝা যায়। কিন্তু উলামায়ে কেরামের কী হলো, তারা জেনে বুঝেই অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় এ ফাঁদ থেকে বের হতে পারছে না যে, পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র বা এর আইন শুধু এ জন্য ইসলামী যে, এর সংবিধানে এক বাক্য লেখা আছে।
আল্লাহ তা'আলা সবার হৃদয়ের রহস্য ভালোভাবেই জানেন। কারা আল্লাহর বাণীর পরিবর্তন করছে? কারা ব্যাখ্যার মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাকে সুরক্ষা দেয়? কারা এর বিনিময়ে জানের নিরাপত্তা পায়? কারা এর বিনিময়ে এ তুচ্ছ দুনিয়ার দুর্গন্ধে কতবার মুখ ঘষছে?—সর্বজ্ঞানী আল্লাহ সবই ভালোভাবে জানেন।
বাস্তবতা সবার সামনে স্পষ্ট, পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা আল্লাহ জন্য বরাদ্দ নাকি ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গের হাতে? আজ সত্তর বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও এ দেশে আল্লাহর হুকুমত চলেছে নাকি সংসদের হুকুমত চলেছে? বাস্তবতা হলো, অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো পাকিস্তানের আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতাও সেই ক্ষমতাশালীদের হাতেই। এর সবচেয়ে বড় দলিল হলো, পাকিস্তানের সংবিধানে যদিও এ কথা লিখা আছে যে, কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন পাশ করা হবে না। বা কুরআন-সুন্নাহই পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আইন; কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিদিন কুরআন-সুন্নাহর বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে আইন পাশ করা হচ্ছে। সংবিধানে যদিও উক্ত বাক্যটি লিখা আছে; তবুও আসল ক্ষমতা পার্লামেন্টের কাছেই। এ পার্লামেন্ট যতক্ষণ পর্যন্ত কুরআনের আইনকে অনুমোদন না করবে, তা আইনে পরিণত হবে না। পাকিস্তানের জন্মের পর থেকে আজকের দিন পর্যন্ত এর নির্মম সাক্ষী। সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য এ সময়টি কি যথেষ্ট নয় যে, এখানে আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা কার কাছে আছে? এর বিপরীতে আপনি এমন কোনো ঘটনা বলুন, এ ইসলামী গণতন্ত্রে আল্লাহর আইনকে পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়াই আইনে পরিণত করা হয়েছে। অথবা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, যেহেতু বিবাহিত ব্যভিচারী-ব্যভিচারিনীকে প্রস্তরনিক্ষেপে হত্যা করা আল্লাহর আইন। তাই রাষ্ট্রের আইনও এটিই। এটিকে পার্লামেন্টের মুখাপেক্ষী বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। তেমনি সুদ আল্লাহর আইনে হারাম। তাই পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়াই আজ থেকে সুদ হারাম ও অবৈধ।
কিন্তু এমনটি হবে না! কারণ, তাতে গণতন্ত্রের হৃদয় ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী স্থানীয় নিরাপত্তাবাহিনীগুলো এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তি আমেরিকা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়ে এমন প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টকে পদচ্যুত করে দেবে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, গণতন্ত্রের প্রাণ (আইন প্রণয়নে পার্লামেন্টের অনুমোদনই আসল হওয়া)—ই রাষ্ট্রের ক্রীড়নক। সংবিধানে কালো কালিতে লিপিবদ্ধ এ বাক্যটি নয়—কুরআন-সুন্নাহই পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আইন।
📄 ৩. আল্লাহ কর্তৃক অবৈধ ও হারামকৃত বস্তুকে বৈধ ও হালাল বানানো এবং অবশ্য পালনীয় ফরযকে হারাম ও অবৈধ বানানো:
এ জাহেলী ব্যবস্থায় একটি বড় শরীয়াহবিরোধী কাজ হলো, নিজেরাই যা ইচ্ছা বৈধ সাব্যস্ত করে, আর যা ইচ্ছা অবৈধ সাব্যস্ত করে। অথচ এ অধিকার আল্লাহ কাউকে দেননি।
وَقَالُوا هَذِهِ أَنْعَامٌ وَحَرْثٌ حِجْرٌ لَّا يَطْعَمُهَا إِلَّا مَن نَّشَاءُ بِزَعْمِهِمْ وَأَنْعَامٌ حُرِّمَتْ ظُهُورُهَا وَأَنْعَامٌ لَّا يَذْكُرُونَ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا افْتِرَاءً عَلَيْهِ سَيَجْزِيهِم بِمَا كَانُوا يَفْتَرُونَ ﴿الأنعام: ১৩৮﴾
"তারা বলেঃ এসব চতুষ্পদ জন্তু ও শস্যক্ষেত্র নিষিদ্ধ। আমরা যাকে ইচছা করি, সে ছাড়া এগুলো কেউ খেতে পারবে না, তাদের ধারণা অনুসারে। আর কিছুসংখ্যক চতুষ্পদ জন্তুর পিঠে আরোহন হারাম করা হয়েছে এবং কিছু সংখ্যক চতুষ্পদ জন্তুর উপর তারা ভ্রান্ত ধারনা বশতঃ আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না, তাদের মনগড়া বুলির কারণে, অচিরেই তিনি তাদের কে শাস্তি দিবেন।” (সূরা আন'আম: ১৩৮)
আফসোস! এ গণতান্ত্রিক কুফরী ব্যবস্থাকে ইসলামী প্রমাণ করার জন্য শেষমেষ সেই কথাই বলা হয়, যা কুফফারে মক্কা দলিল দিতে ব্যর্থ হয়ে বলত-
وَقَالَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا عَبَدْنَا مِن دُونِهِ مِن شَيْءٍ نَحْنُ وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن دُونِهِ مِن شَيْءٍ كَذَلِكَ فَعَلَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَهَلْ عَلَى الرُّسُلِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ ﴿النحل: ৩৫﴾
"মুশরিকরা বললঃ যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে আমরা তাঁকে ছাড়া কারও এবাদত করতাম না এবং আমাদের পিতৃপুরুষেরাও করত না এবং তাঁর নির্দেশ ছাড়া কোন বস্তুই আমরা হারাম করতাম না। তাদের পূর্ববর্তীরা এমনই করেছে। রাসূলের দায়িত্ব তো শুধুমাত্র সুস্পষ্ট বাণী পৌছিয়ে দেয়া।” (সূরা নাহল: ৩৫)
📄 ৪. অসৎকর্মে আদেশ এবং সৎকর্মে বাধাপ্রদান
এ ব্যবস্থায় এ কাজটি রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় করা হয়। আল্লাহ তা'আলা সূরা তাওবায় ইরশাদ করেছেন-
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴿التوبة: ৬৭﴾
"মুনাফেক নর-নারী সবারই গতিবিধি একরকম; শিখায় মন্দ কথা, ভাল কথা থেকে বারণ করে এবং নিজ মুঠো বন্ধ রাখে। আল্লাহকে ভুলে গেছে তার, কাজেই তিনিও তাদের ভুলে গেছেন নিঃসন্দেহে মুনাফেকরাই নাফরমান।” (সূরা তাওবা: ৬৭)
খেলাফতে উসমানিয়ার ধ্বংসের পর পৃথিবীর বুকে আল্লাহর শরীয়ত পুরোপুরি শাসিত ও পরাভূত হয়ে গেছে। মুসলিম ভূখণ্ডসমূহে শরীয়াহব্যবস্থা শেষ করে দিয়ে ইংরেজি, ফরাসি ও অন্যান্য মিশ্র ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫ খৃ.) পর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যখন নিজেদের অধীনস্থ মুসলিম দেশগুলো ত্যাগ করছিল, তখন তারা খুব ভালোভাবেই খেয়াল রেখেছে যে, তাদের চলে যাওয়ার পরও যাতে কোনো ভূখণ্ডে মুহাম্মাদ (ﷺ) এর শরীয়াহ বাস্তবায়িত হতে না পারে। তাই অধিকাংশ মুসলিম দেশে গণতন্ত্র চালু করা হয় এবং এ কথা আবশ্যক করে দেওয়া হয় যে, কোনো মুসলিম দেশে শরীয়াহ চালু করা যাবে না। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘের চার্টারকে জীবনব্যবস্থা (ধর্ম) হিসেবে প্রত্যেক রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছে। সরকারগুলো এসব কানুন গুরুত্বের সাথে বাস্তবায়ন করছে। রাষ্ট্রের পুলিশবাহিনী তা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে।
ফলে মুসলিম সাম্রাজ্য থেকে ইসলামের কর্তৃত্ব শেষ হয়েছে। যে ব্যবস্থা মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার পোশাকটি নতুন হলেও তার বাস্তবতা ফেরআউন, নমরুদ, সামিরী, শাদদাদ, আবু লাহাব ও আবু জাহালদের মতোই ছেঁড়া ও পুরাতন। আসলে এ জীবনব্যবস্থা হলো, সেই পুরানো জাহিলিয়্যাতের নতুন সংস্করণ। এটির কর্তৃত্বকালীন মানুষ শুধু পাপাচারেই লিপ্ত হয় না; বরং পাপাচার প্রসার করার দাওয়াত, তার প্রতি অনুরাগ ও উৎসাহিতকরণ এবং পাপাচারের সব উপকরণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যোগাড় করা হয়। পাপাচারের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার দাওয়াত, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এগুলোর প্রচার ও সুরক্ষাদান রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাব্যস্ত হয়। সুদের ভাগাড় (ব্যাংক) হোক বা বেহায়াপনার আখড়া (মালিশকেন্দ্র, সিনেমাহল, ক্যাবল, টিভি, ইন্টারনেট, ক্যাফে ইত্যাদি) হোক বা গানবাজনার অনুষ্ঠান হোক—এদের কারো কোনো আশঙ্কা হলে রাষ্ট্রের আইনশৃংখলা বাহিনী তাদের নিরাপত্তা দেওয়াকে নিজেদের উপর ফরয মনে করে। এমন মুহূর্তে কোনো ঈমানদার পাপাচার রুখতে ওঠে দাঁড়ালে তাকে লাল-মাসজিদ ও জামিয়া হাফসার মতো টার্গেট করা হয়।
মুহাম্মাদ (ﷺ) এর শরীয়তকে রুখার জন্য রাষ্ট্রের সব শাখা (সরকার, প্রশাসন, বিচারবিভাগ, গণমাধ্যম) নিজেদের মতো করে কাজ করে যাচ্ছে। তেমনিভাবে ইসলাম সম্পর্কে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা, ইসলামের নিদর্শনাবলি (দাড়ি, টুপি, হুদূদ-কিসাস ইত্যাদি) কে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা, উম্মাহকে জিহাদ থেকে দূরে সরানোর বিভিন্ন পায়তারা করা, মাদরাসা, উলামা ও দ্বীনিশিক্ষার প্রতি ঘৃণা ছড়ানো ওদের মৌলিক মিশনের অন্তর্ভুক্ত।
📄 ৫. সুদব্যবস্থার জয়জয়কার
কুরআন-হাদীসের অসংখ্য স্থানে সুদের দুর্নাম করা হয়েছে। এটিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ অবহিত করা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা, হোক সেটা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক, এটি সুদব্যবস্থার উপরই দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ গণতন্ত্র হোক বা রাজতন্ত্র, দারুল আমান হোক বা দারুল হারব, এ সময়ের যেসব দেশ জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত, সব দেশই সুদের সাথে জড়িত। যেন বিশ্বব্যবস্থা প্রত্যেক রাষ্ট্রের জন্য সুদকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। আর সব রাষ্ট্রই জনগণের উপর বিভিন্ন করারোপ করে সেই সুদ সংগ্রহ করে। করের নামে দেশে দেশে যে পরিমাণ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে, এর একটি বিশেষ অংশ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর কাছে কিস্তি আকারে পৌঁছে যাচ্ছে।
আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন-
فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِن تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ ﴿البقرة: ২৭৯﴾
"অতঃপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমরা নিজের মূলধন পেয়ে যাবে। তোমরা কারও প্রতি অত্যাচার করো না এবং কেউ তোমাদের প্রতি অত্যাচার করবে না।" (সূরা বাকারাহ: ২৭৯)
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ... ﴿البقرة: ২৭৫﴾
“যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছেঃ ক্রয়-বিক্রয় ও তো সুদ নেয়ারই মত! অথচ আল্লাহ তা'আলা ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।” (সূরা বাকারাহ: ২৭৫)
নবী কারীম কতই না শক্তভাবে সুদের তুলনা বর্ণনা করেছেন-
عَنْ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ : الرِّبَا اثْنَانِ وَسَبْعُونَ بَابًا، أَدْنَاهَا مِثْلُ إِتْيَانِ الرَّجُلِ أُمَّهُ، وَأَرْبَى الرِّبَا اسْتِطَالَةُ الرَّجُلِ فِي عِرْضِ أَخِيهِ.
হযরত বারা ইবনে আযিব রাযি. বলেন, রাসূল ইরশাদ করেছেন, “সূদের (পাপের) ৭২টি দরজা বা স্তর রয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নতম স্তর হচ্ছে—স্বীয় মায়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া তুল্য পাপ এবং ঊর্ধ্বতম স্তর হল কোন ব্যক্তি কর্তৃক তার এক ভাইয়ের মান-সম্ভ্রমের হানি ঘটান তুল্য পাপ। (সিলসিলা ছহীহাহ, হাদীস নং-১৮৭১)
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حَنْظَلَةَ غَسِيلِ الْمَلَائِكَةِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دِرْهَمْ رِبًا يَأْكُلُهُ الرَّجُلُ وَهُوَ يَعْلَمُ أَشَدُّ مِنْ سِتَّةٍ وَثَلَاثِينَ زَنْيَةً.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হানজালা (যাকে ফেরেশতাগণ গোসল দিয়েছিলেন) থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন, “এক টাকা সুদও যদি কেউ জেনেবুঝে খায়, তা ছত্রিশবার ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে মারাত্মক।” (মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড-৩৬, হাদীস নং-২১৯৫৭, শামেলা)
عَنْ جَابِرٍ، قَالَ: لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا، وَمُؤْكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ
হযরত জাবের রাযি. বলেন, রাসূল অভিশাপ দিয়েছেন সুদদাতা, সুদগ্রহীতা, সুদলেখক, সুদের সাক্ষ্যদাতার উপর। আরো বলেছেন, এরা সবাই সমান (অপরাধী)। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৪১৭৭, শামেলা)
عَنْ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، قَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : مَا مِنْ قَوْمٍ يَظْهَرُ فِيهِمُ الرِّبَا، إِلَّا أُخِذُوا بِالسَّنَةِ، وَمَا مِنْ قَوْمٍ يَظْهَرُ فِيهِمُ الرُّشَا، إِلَّا أُخِذُوا بِالرُّعْبِ
হযরত আমর ইবনুল আস রাযি. বলেন, আমি রাসূল (ﷺ) কে বলতে শুনেছি যে, “যে জাতির মধ্যেই সুদ ব্যাপক আকার ধারণ করে, তারা দুর্ভিক্ষের শিকার হয়। যে জাতির মধ্যে ঘুষ ব্যাপক হয়ে যায়, তারা ভয়ের শিকার হয়।” (মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড-২৯, হাদীস নং- ১৭৮২২, শামেলা)
সুতরাং প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মতামত কী? যেটি সুদি ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে আছে; বরং এর গভীরে যাওয়ার পর মনে হয় যে, এটির মৌলিক উদ্দেশ্যসমূহের অন্যতম হলো, সুদের লেনদেন থেকে মানুষ যেন বাঁচতে না পারে। তাই তো একদম নিম্নস্তর পর্যন্ত সুদের কারবার। আপনারা দেখছেন, সুদি কারবার শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে সুদি কারবারকে শুধু বৈধই বলছে না; বরং অনেক কাজের মধ্যে তা আবশ্যক করে দেওয়া হয়েছে। ইচ্ছায় অনিচ্ছায় মানুষ সুদে জড়িত হচ্ছে।