📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 খিলাফত

📄 খিলাফত


রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিপ্লবী দর্শন বলতে আসলে কী বোঝায়? এক শব্দে বলতে গেলে ‘তাওহিদ’, যার ব্যাপারে ইকবাল বলেছেন—
زندہ قوت تھی جہاں میں یہی توحید کبھی
آج کیا ہے, فقط اک مسئلہ علم کلام
কখনও এই তাওহিদ ছিল জীবন্ত শক্তি,
কিন্তু আজ তা শুধু শুধু দর্শনের رفیق।
অর্থাৎ, কখনও এ তাওহিদ রাষ্ট্র ও সমাজের বিপ্লবী দর্শন ছিল, কিন্তু কালের পালাবদলে আজ তা শুধু একটি বিতর্কের বিষয় হয়ে গেছে।
এখন আমরা এই বিপ্লবী দর্শন তথা তাওহিদের দাবি ও ফলাফলের ওপর সংক্ষেপে আলোকপাত করব।
আগেই বলেছি, বিপ্লবী দর্শন ও চিন্তাধারার প্রথম বৈশিষ্ট্য হবে এমন যে, তা আগে থেকে চলে আসা ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে দেবে। তাওহিদের দর্শনের অন্যতম দাবি হচ্ছে—‘তাওহিদুল হাকিমিয়্যাহ’।
অর্থাৎ আল্লাহর জমিনে না কোনো মানুষ বা জাতির শাসন চলবে, আর না কোনো মানব রচিত আইনের শাসন চলবে। কারণ, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ—‘জমিনের শাসন একমাত্র আল্লাহরই’।৬
سوری! ضیا فقط اس ذات بے ہمتا کی ہے
حکمران ہے اک وہی, باقی بتان آذری!
পরিচালনা ও নেতৃত্বের সেই মহান সত্তারই যোগ্য,
শাসক তো তিনি একজনই, বাকি সব তাগুতের খুঁটি শুধু নয়।
তাওহিদের দর্শন বা এ প্রকার তা হতে পারে, তাওহিদের দর্শন সবকিছুরকে অস্বীকার করে। না ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন অর্থাৎ বাদশাহকে স্বীকার করে, আর না কোনো জাতির অন্য জাতির ওপর শাসনকে স্বীকার করে, যেমন—ইংরেজরা আমাদের ওপর শাসনকে চালিয়েছিল। এমনিভাবে ‘তাওহিদুল হাকিমিয়্যাহ’-এর কাছে গণতন্ত্র বা জনসাধারণের কোনো ভিত্তি নেই। হাকিমিয়্যাহ বা সার্বভৌমত্ব (Sovereignty)-এর মালিক শুধু আল্লাহই। শাসনের অধিকারও কেবল তাঁরই। মানবজাতি হচ্ছে ‘খিলাফত’। অর্থাৎ, মানবজাতি আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে কেবল প্রতিনিধি হবে, আল্লাহপ্রদত্ত বিধানের কোনো বিশেষজ্ঞ নয়।
হাকিমিয়্যাহ তথা সার্বভৌমত্বের অন্য সব ধরন শিরকের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান যুগের প্রচলিত গণতন্ত্রের অন্য সব (Popular Sovereignty) তাও তো বলাই বাহুল্য। ‘বিধানদাতা কেবল আল্লাহই আর রাসূল তাঁর প্রতিনিধি’। বলুন তো, এরচেয়ে তেজস্বী আর কোনো বিপ্লবী স্লোগান হতে পারে?

টিকাঃ
৬. সূরা আনআম : ৫৭, সূরা ইউসুফ : ৪০, ৬৭

আল্লাহ ﷺ-এর বিপ্লবী দর্শন বলতে আসলে কী বোঝায়? এক শব্দে বলতে গেলে ‘তাওহীদ’, যার ব্যাখ্যা ইকবাল বলেছেন—

যিন্দে কুওত থী জাঁহা মেঁয় যহী তওহীদ কভী,
আও ক্য়ায়া হ্যায়? ফকত এক মসअला-এ ইলমে কালাম।

অর্থাৎ, কখনও এ তাওহীদ ছিল জীবন্ত শক্তি,
কিন্তু আজ তা হয়ে গেছে শুধু দর্শনের বস্তু।

অর্থাৎ, কখনও এ তাওহীদ রাষ্ট্র ও সমাজের বিপ্লবী দর্শন ছিল, কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ তা শুধু একটি বিতর্কের বিষয় হয়ে গেছে।

এখন আমরা এই বিপ্লবী দর্শন তথা তাওহীদের দাবি ও ফলাফলর ওপর সংক্ষেপে আলোকপাত করব।

আগেই বলেছি, বিপ্লবী দর্শন ও চিন্তাধারার প্রথম বৈশিষ্ট্য হবে এমন, তা তা আগে থেকে আসা ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে দেবে। তাওহীদের দর্শনের অন্যতম দাবি হচ্ছে—‘তাওহীদুল হাকিমিয়্যাহ’।

অর্থাৎ আল্লাহর জমিনে না কোনো মানুষ বা জাতির শাসন চলবে, আর না কোনো মানব রচিত আইনের শাসন চলবে। কারণ, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ‘জমিনের শাসন একমাত্র আল্লাহরই’।

সوری نیا فقط اس ذات بے ہمتا کی ہے،
حکمران ہے اک وہی، باقی بتانِ آذری!

পরিচালনা ও নেতৃত্বের সেই মহান সত্তাই যোগ্য,
শাসক তো তিনি একজনই, বাকি সব তাগুতের গুচ্ছ বই কিছু নয়।

তাওহীদের দর্শন ঐ প্রকারের সব শাসনব্যবস্থা অস্বীকার করে। না ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন অর্থাৎ বাদশাহকে স্বীকার করে, আর না কোনো জাতির অন্য জাতির ওপর শাসনকে স্বীকার করে। মানবজাতির ইতিহাসে ইংরেজরা আমাদের ওপর শাসন চালিয়েছে। তাওহীদুল হাকিমিয়্যাহ’ এর কাছে গণতন্ত্র বা জনগণেরও কোনো ভিত্তি নেই। হাকিমিয়্যাহ বা সার্বভৌমত্ব (Sovereignty)-এর মালিক শুধু আল্লাহই। শাসনের অধিকারীও কেবলমাত্র তিনিই। অর্থাৎ, মানবজাতি জমিনে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে কেবল প্রতিনিধি হবে, আল্লাহপ্রদত্ত বিধানের কোনো বিশেষজ্ঞ নয়।

হাকিমিয়্যাহ তথা সার্বভৌমত্বের অন্য সব ধরন শিরকের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান যুগের প্রচলিত গণতন্ত্রের শাসন (Popular Sovereignty) ও শিরক।

টিকাঃ
১. সূরা আনআম : ৫৭, সূরা ইউসুফ : ৪০, ৬৭

📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 আমানত

📄 আমানত


তাওহিদের দ্বিতীয় দাবি হচ্ছে, ‘সবকিছুর প্রকৃত মালিক আল্লাহ’। এই বিপ্লবী স্লোগান প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার শিকড়ে ধ্বংসাত্মক খনিত্রের মতো কাজ করে। ‘কোনো ব্যক্তিই কোনো কিছুর মালিক নয়—না ব্যক্তিগতভাবে আর না জাতিগতভাবে।’ এই দর্শনের মাধ্যমে পুঁজিবাদের অস্তিত্বই বাতিল হয়ে যায়! সঙ্গে কমিউনিজমের অস্তিত্বও। ‘মালিক কেবল আল্লাহই’। لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ। ‘আকাশসমূহ ও ভূমিতে যা কিছু আছে, সবকিছু তাঁরই মালিকানাধীন’। প্রকৃতপক্ষে সবকিছুর মালিক তিনিই আর মানুষের কাছে যা কিছু আছে, সবকিছু ‘আমানত’।
ایل امانت چند روزہ نزد ما ست
در حقیقت مالک ہر شے خدا ست
দুনিয়ার বুকে সব আমানত, আমরা শুধু কদিনের মালিক,
আসলে বন্ধু তাঁরই তো সব, মাঝখানের যিনি মালিক।
মানুষ তার শরীরেরও মালিক নয়; শরীরের মালিক আল্লাহ। এ জন্যই বলা হয়, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন—আমাদের সবকিছুই আল্লাহর আর আমরা তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করব। এই সবকিছুর হাত-পা, চোখ, মন-মস্তিষ্ক সবকিছুই আমাদের কাছে আমানত। বসবাসের জন্য যে ঘর তিনি আমাদের দান করেছেন, সেটাও আমার কাছে তাঁর আমানত। সন্তানসন্ততি দিয়েছেন, তা-ও আমানত। কারণ, পরিপূর্ণ মালিকানা কেবল তাঁরই। আমরা কিছুই অধীন মালিক নই যে, যা ইচ্ছা করে বেড়াব।
নবি শুআইব আ.-এর সম্প্রদায় কী বলেছিল? তারা বলেছিল, ‘হে শুআইব, তোমার নামায (ইবাদত) কি তোমাকে এ শিক্ষা দেয় যে, আমরা সেসব উপাস্যের পরিত্যাগ করব, যাদের উপাসনা করত আমাদের বাপদাদারা? আর নিজেদের সম্পদে নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো খরচ করার অধিকার থাকবে না?’
পুঁজিবাদের আদর্শধারী কোনো ব্যক্তি চিন্তাভাবনা হবে, ‘এই সম্পদ যেহেতু আমার, সেহেতু আমার যেভাবে ইচ্ছা তা খরচ করব—মনে চাইলে তা দিয়ে সুদি কারবার করব কিংবা কাউকে সুদের ওপর ঋণ দেবো।’ যেহেতু নিজেকে এই অর্থসম্পদের মালিক মনে করে, সেহেতু যেভাবে ইচ্ছা তা ব্যবহারের অধিকার খাটাতে কথা ভাবে। বিপরীতে যদি সে নিজেকে এর ‘আমানতদার’ মনে করত, তাহলে তার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতো। তখন সে নিজের সম্পদ সেভাবেই ব্যবহার করত, যেখানে ব্যবহার করার অনুমতি আল্লাহ দিয়েছেন। নিজের গা দিয়েই সে রাস্তায় চলার অনুমতি আল্লাহ দিয়েছেন। উপরন্তু নিজের ধনসম্পদ সেখানেই খরচ করত, যেখানে খরচ করার কথা আল্লাহ বলেছেন।

কথা তো বলাই বাহুল্য। ‘বিধানদাতা কেবল আল্লাহই আর রাসূল তাঁর প্রতিনিধি’। বলুন তো, এরচেয়ে তেজস্বী আর কোনো বিপ্লবী স্লোগান হতে পারে?

এই বিপ্লবী স্লোগান প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার শিকড়সুদ্ধ ধ্বংসাত্মক এসিডের মতো কাজ করে। ‘কোনো ব্যক্তি কোনো কিছুর মালিক নয়—না ব্যক্তিগতভাবে আর না জাতিগতভাবে।’ এই দর্শনের মাধ্যমে পুঁজিবাদের অস্তিত্ব বাতিল হয়ে যায়; সঙ্গে কমিউনিজমের অস্তিত্বও। ‘মালিক কেবল আল্লাহই’। لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ‘আকাশসমূহ ও ভূমিতে যা কিছু আছে, সবকিছু তাঁরই মালিকানাধীন’। প্রকৃতপক্ষে সবকিছুর মালিক তিনিই আর মানুষের কাছে যা কিছু আছে, সবকিছু ‘আমানত’।

ایل امانت چند روزه تا است
در حقیقت مالک ہر شے خداست

দুনিয়ার বুকে সব আমানত, আমরা শুধু কদিনের মালিক,
আসলে বন্ধু তাঁরই তো সব, মাঝখানের যিনি মালিক।

মানুষ তার শরীরেরও মালিক নয়; শরীরের মালিক আল্লাহ। এ জন্যই বলা হয়, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ —আমাদের সবকিছু আল্লাহর আর আমরা তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করব। এই সবকিছুর হাত-পা, চোখ, মন-মস্তিষ্ক সবকিছু আমাদের কাছে আমানত। বসবাসের জন্য যে ঘর তিনি আমাদের দান করেছেন, সেটাও আমার কাছে তাঁর আমানত। সন্তানসন্ততি দিয়েছেন, তা-ও আমানত। কারণ, পরিপূর্ণ মালিকানা কেবল তাঁরই। আমরা কিছুই স্বাধীন মালিক নই যে, যা ইচ্ছা করে বেড়াব।

নবি শুআইব আ.-এর সম্প্রদায় কী বলেছিল? তারা বলেছিল, ‘হে শুআইব, তোমার নামাজ (ইবাদত) কি তোমাকে এ শিক্ষা দেয় যে, আমরা সেসব উপাস্যের পরিত্যাগ করব, যাদের উপাসনা করত আমাদের বাপদাদারা? আর নিজেদেরকে নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো খরচ করার অধিকার থাকবে না?’

পুঁজিবাদের আদর্শধারী কোনো ব্যক্তির চিন্তাভাবনা হবে, ‘এই সম্পদ যেহেতু আমার, সেহেতু আমার যেভাবে ইচ্ছা তা খরচ করব—মনে চাইলে তা দিয়ে সুরার কারবার করব কিংবা কাউকে সুদের ওপর ঋণ দেবো।’ যেহেতু নিজেকে এই অর্থসম্পদের মালিক মনে করে, সেহেতু যেভাবে ইচ্ছা তা ব্যবহার করবে। বিপরীতে যদি সে নিজেকে এর ‘আমানতদার’ মনে করত, তাহলে তার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতো। তখন সে নিজের সম্পদ সেখানেই ব্যবহার করত, যেখানে ব্যবহার করার অনুমতি আল্লাহ দিয়েছেন। নিজের পা দিয়ে সে রাস্তায় চলারই অনুমতি আল্লাহ দিয়েছেন। উপরন্তু নিজের ধনসম্পদ সেখানে খরচ করত, যেখানে খরচ করার আল্লাহ বলেছেন।

📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 পূর্ণ সমতা

📄 পূর্ণ সমতা


সামাজিকভাবে তাওহিদের দাবি হচ্ছে—মালিকতাকে বঞ্চনা বা জন্মগতভাবে সকল মানুষ সমান। উঁচু-নিচু কোনো ভেদাভেদ নেই। এই প্রসঙ্গে হারবার্ট জর্জ ওয়েলসের সাক্ষ্য তো আমরা পেশ করেছি। তিনি বলেন, “যদিও ভ্রাতৃত্ব, সমতা ও স্বাধীনতার নীতিকথা পৃথিবীতে বহুকাল আগেও অনেক দেওয়া হয়েছিল এবং এমন উপদেশমূলক কথা আমরা মাসিহের উপদেশমালাতেও প্রচুর পেয়ে থাকি। কিন্তু এটা স্বীকার করতেই হবে যে, মুহাম্মদই এমন মনীষী, যিনি মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম এই মূলনীতিগুলোর ওপর একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন।”
মুসলিম সমাজে যদি কোনো ভেদাভেদ থেকে থাকে, তবে তা ব্যক্তির গুণের ওপর নির্ভর করে হয়। যদি আপনি ইলম হাসিল করে থাকেন, তবে আপনি সবার কাছে সম্মানিত হিসেবে বরিত হবেন। আপনি তাকওয়া অর্জন করে থাকেন, আধ্যাত্মিক মাকাম হাসিল করেন; তবে সবাই আপনাকে সম্মানের চোখে দেখবে, মর্যাদাবান জ্ঞান করবে। কারণ, ইসলামের সৌন্দর্য ও সুমহান আদর্শ হচ্ছে, إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ—‘তোমাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বড়ো মুত্তাকি, তিনিই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত’। জন্মগতভাবে সকল মানুষ সমান। অদ্ভুত বা ব্রাহ্মণ, সাদা অথবা কালো, নারী কিংবা পুরুষ— কোনো পার্থক্য নেই। তবে হ্যাঁ, নারী-পুরুষের মধ্যে যে পার্থক্য শরিয়ত বলেছে, তা হচ্ছে ব্যবস্থাপনার দিক থেকে। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে। যেমন দেখুন, কোনো বিভাগের ইনচার্জ আর তার বাইরে বা ভেতরে দায়িত্ব পালন করা কর্মচারীর মধ্যে মানুষ হিসেবে মৌলিকভাবে কোনো পার্থক্য আছে? নেই। পদপদবি ও কাজের ধরনের দিক থেকে পার্থক্য আছে, তাই না? একইভাবে ব্যবস্থাপনার দিক থেকে হোক বা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাপনার দিক থেকে হোক; নওব্বা মানুষ হিসেবে দুজনই সমান। মানবিক সম্মান ও অধিকারের দিক থেকে হোক থেকে ইসলাম দুজনের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখেনি।
আমাদের এখানে সাধারণের মধ্যে এমন সমতা দৃষ্টিকোণ হয়। সবাই একই ধরনের পোশাক পরে। বড়ো জমিদার হোক অথবা তার চাকরবাকর—উভয় শ্রেণির পোশাকই একই ধরনের হয়। এমনকি তারা তারা খাবারও একসঙ্গে বসে খায়। যার জুড়ি, আরবদের মধ্যেও সমতার এমন নজির পাওয়া যায়। লাঞ্চটাইমে দারোয়ান ও ড্রাইভার—দুজনই মিনিস্টারের সঙ্গে এক টেবিলে বসে আহার করে।
তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, নারী-পুরুষের মধ্যে মানুষ হওয়ার দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই, পার্থক্য শুধু ব্যবস্থাপনার দিক থেকে। কুরআনের ভাষায়—
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ
পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক। (সূরা নিসা : ৩৪)
অর্থাৎ, পুরুষরা পরিবারের পরিচালকের মর্যাদাপ্রাপ্ত। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, পুরুষ মর্যাদাবান আর নারীর কোনো মর্যাদা নেই। কারণ, এমনও হতে পারে, কোনো নারী নিজের অবদান ও কৃতিত্বের বিচারে হাজারো পুরুষকে ছাড়িয়ে মর্যাদার সর্বোচ্চ আরোহণ করতে সক্ষম হবে। আচ্ছা বলুন তো, এমন পুরুষের সংখ্যা কি আমরা গণনা করে শেষ করতে পারব, যারা মারইয়াম, আসিয়া, খাদিজা, আয়িশা, ফাতিমা রা. প্রমুখের সমান সম্মান ও মাহাত্ম্যের উচ্চতাকে এমনভাবে দেখে, যেভাবে কেউ আকাশ দেখে।
তাহলে তাওহিদের দর্শন থেকে আমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক এই তিনটি প্রধানত ফল দেখতে পাই :
এক. হাকিমিয়্যাহ তথা সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর জন্য। জমিনের শাসনভারের ক্ষেত্রে মানুষের মর্যাদা প্রতিনিধির বেশি কিছু নয়। একে পরিভাষায় আমরা ‘খিলাফত’ বলি।
দুই. অর্থব্যবস্থায় মালিকানা বলতে যা বোঝায়, তা কেবল আল্লাহরই। বান্দার কাছে যা কিছু আছে, সবকিছু তার কাছে আল্লাহর আমানত। একে আমরা ‘আমানত’ বলতে পারি।
তিন. সমাজের সব মানুষের মধ্যে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, জন্মগতভাবে মানুষের মধ্যে কোনো মর্যাদাগত পার্থক্য নেই। একে পরিভাষায় ‘মুসাওয়াত’ বলা হয়। একে আমরা ‘সমতা’ বলে অভিহিত করতে পারি।
রাসূল ﷺ মক্কার অলিতে-গলিতে ঘুরেফিরে তাওহিদের এই দর্শনই প্রচার করেছেন। বলেছেন—يَا أَيُّهَا النَّاسُ قُولُوا لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ تُفْلِحُوا—‘হে লোকসকল! বলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তবেই তোমরা সফল হবে’। দাওয়াতের প্রাথমিক ধাপে রাসূল ﷺ শুধু নিজের রিসালাতের কথাও খুব একটা বলেননি। সর্বোচ্চ জোর (emphasis) তাওহিদের ওপর দিয়েছেন। বিপ্লবী এই দর্শনের প্রচার-প্রসারে রাসূল ﷺ যে অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সব ব্যবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন। ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি তাওহিদের দাওয়াতও পেশ করেছেন। এরপর সবার নিজের বংশের (বনু হাশিম) লোকদের অপমানের জন্য ভোজের দাওয়াত দিয়েছেন। শুধুমাত্র তো তারা কথাই শোনেনি, কটূক্তি করে বসে। বিভিন্ন সময়ে ঠাট্টা-মশকরা করে। উৎপীড়নের মধ্যে শুধু গালিই নয়; যদিও তিনি এর আগেই সমাপ্ত হয়েছিলেন।
আলি রা. দাঁড়িয়ে উপস্থিত সকলেরعلان, ‘যদিও আমার চোখের মধ্যে এখনও পাতলা, যদিও আমার ছোটো, দুটো তখনও শীর্ণ, কিন্তু আমি আপনাকে দাওয়াতে সাড়া দিচ্ছি।

সামাজিকভাবে তাওহীদের দাবি হচ্ছে—মালিকের বচন বা জাতিগতভাবে সকল মানুষ সমান। উঁচু-নিচু কোনো ভেদাভেদ নেই। এই প্রসঙ্গে হারবার্ট জর্জ ওয়েলসের সাক্ষ্য আমি আগেই পেশ করেছি। তিনি বলেন, “যদিও ভ্রাতৃত্ব, সমতা ও স্বাধীনতার নীতি কথা পৃথিবীতে বহুকাল আগেও অনেক দেওয়া হয়েছিল এবং উপদেশমূলক কথা আমরা মাসিহের উপদেশমালাতেও প্রচুর পেয়ে থাকি। কিন্তু এটা অস্বীকার্য যে, মুহাম্মাদই এমন মনীষী, যিনি মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম এই মূলনীতিগুলোর ওপর একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন।”

মুসলিম সমাজে যদি কোনো ভেদাভেদ থেকে থাকে, তবে তা ব্যক্তির গুণের ওপর নির্ভর করে হয়। যদি আপনি ইলম হাসিল করেন, তবে আপনি সবার কাছে সম্মানিত হিসেবে বরিত হবেন। আপনি তাকওয়া অর্জন করলে, আধ্যাত্মিক মাকাম হাসিল করলে; তবে সবাই আপনাকে সম্মানের চোখে দেখবে, মর্যাদাবান জ্ঞান করবে। কারণ, ইসলামের সৌন্দর্য ও সুমহান আদর্শ হচ্ছে, إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ —‘তোমাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বড় মুত্তাকি, তিনিই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানীয়’। জাতিগতভাবে সকল মানুষ সমান। অদ্ভুত বা ব্রাহ্মণ, সাদা অথবা কালো, নারী কিংবা পুরুষ— কোনো পার্থক্য নেই। তবে হ্যাঁ, নারী-পুরুষের মধ্যে যে পার্থক্য শরিয়ত বলেছে, তা হচ্ছে ব্যবস্থাপনার দিক থেকে। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে। যেমন দেখুন, কোনো বিভাগের ইনচার্জ আর তার বাইরে বা অধীনে দায়িত্ব পালন করা কর্মচারীর মধ্যে মানুষ হিসেবে মৌলিকভাবে কোনো পার্থক্য আছে? নেই। পদপদবি ও কাজের ধরনের দিক থেকে পার্থক্য আছে, তাই না? এটা ব্যবস্থাপনার দিক থেকে পার্থক্য। ঠিক তেমনি ব্যবস্থাপনার দিক থেকে ইসলাম দুজনের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখেনি। নতুবা মানুষ হিসেবে দুজনই তৈরি সমান। মানবিক সম্মান ও অধিকারের দিক থেকে ইসলাম দুজনের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখেনি।

আমাদের এখানে সাধারণত পদে আর এমন সমতা দৃশ্যমান হয়। সবাই একই ধরনের পোশাক পরে। বড় জমিদার হোক অথবা তার চাকরবাকর—উভয় শ্রেণির পোশাকই একই ধরনের হয়। এমনকি তারা খাবারও একসঙ্গে বসে খায়। যাদব গুনেছি, আরবদের মধ্যেও সমতার এমন নজির পাওয়া যায়। লাঞ্চটাইমে দারোয়ান ও ড্রাইভার—দুজনেই মিনিস্টারের সঙ্গে এক টেবিলে বসে আহার করে।

তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, নারী-পুরুষের মধ্যে মানুষ হওয়ার দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই, পার্থক্য শুধু ব্যবস্থাপনার দিক থেকে। কুরআনের ভাষায়—

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক। ( সূরা নিসা : ৩৪)

অর্থাৎ, পুরুষরা পরিবারের পরিচালকের মর্যাদাপ্রাপ্ত। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, পুরুষ মর্যাদাবান আর নারীর কোনো মর্যাদা নেই। কারণ, এমনও হতে পারে, কোনো নারী নিজের অবদান ও কৃতিত্বের বিচারে হাজারো পুরুষকে ছাড়িয়ে মর্যাদার সর্বোচ্চ আরোহণ করতে সক্ষম হবে। আচ্ছা বলুন তো, এমন পুরুষের সংখ্যা কি আমরা গণনা করে শেষ করতে পারব, যারা মারইয়াম, আসিয়া, খাদিজা, আয়িশা, ফাতিমা রা. প্রমুখের সমান সম্মান ও মাহাত্ম্যের উচ্চতাকে এমনভাবে দেখে, যেভাবে কেউ আকাশ দেখে?

তাহলে তাওহীদের দর্শন থেকে আমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক এই তিনটি প্রধানতম ফল দেখতে পাই:

এক. হাকিমিয়্যাহ তথা সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর জন্য। জমিনের শাসনক্ষমতার ক্ষেত্রে মানুষের মর্যাদা প্রতিনিধির বেশি কিছু নয়। একে পরিভাষায় আমরা ‘খিলাফত’ বলি।

দুই. ধনসম্পদের মালিকানা বলতে যা বোঝায়, তা কেবল আল্লাহরই। বান্দার কাছে যা কিছু আছে, সবকিছু তার কাছে আল্লাহর আমানত। একে আমরা ‘আমানত’ বলতে পারি।

তিন. সমাজের সব মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, জাতিগতভাবে মানুষের মধ্যে কোনো মর্যাদাগত পার্থক্য নেই। একে পরিভাষায় ‘মুসাওয়াত’ বলা হয়। একে আমরা ‘সমতা’ বলে অভিহিত করতে পারি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00