📘 ডারউইনবাদঃ বিশ্বমানবতার অভিশাপ > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


আমরা সম্প্রতি যুদ্ধ ও সংঘাতময় বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে এসেছি যা বিশ্ব মানবতাকে দিয়েছে দুঃখ বেদনা, গণহত্যা, দারিদ্র্য আর সীমাহীন ধ্বংস যজ্ঞ। লক্ষ লক্ষ লোক নিহত ও বেপরোয়া হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। অগণিত লোক ক্ষুধায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। বহু জনগোষ্ঠী গৃহ, আশ্রয় ও সহায় সম্বলহীন হয়েছে। ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত হয়ে সার্বিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে লক্ষ লক্ষ আদম সন্তান। লক্ষ লক্ষ মানুষকে এমন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে যে, কোনো পশুকেও এমন ধরনের নির্যাতন করা হয় না। আর এ সব কিছুই করা হয়েছে একটি বিভ্রান্তিকর ও ভ্রষ্ট মতাদর্শ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে প্রতিটি নির্যাতন ও দুর্ভোগের জন্য কোনো না কোনো স্বৈরশাসক বা একনায়ক বা স্বেচ্ছাচারী শাসকদের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। লেনিন, স্টালিন, ট্রটস্কি, মাওসেতুং, পলপট, হিটলার, মুসোলিনী, ফ্রাংকো, ইত্যাদি। এদের অনেকেই একই মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। আবার কেহ কেহ প্রতিপক্ষের মৃত্যু না দেখা পর্যন্ত তাদের বিরোধিতা করা থেকে বিরত হতেন না। এ সমস্ত কর্মকাণ্ডের মূলে রয়েছে পরস্পর বিরোধী মতাদর্শ। এ সমস্ত স্বৈরশাসক তাদের সমাজকে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের পথে নিয়ে গেছেন এবং ভাইকে ভাইয়ের বিরুদ্ধে লেলিয়ে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করে দেন। ফলে শুরু হয় ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ। আর ঘটে বোমাবাজি, অগ্নি সংযোগের মাধ্যমে গাড়ি, যানবাহন, বাড়িঘর, দোকানপাট ধ্বংসের ঘটনা এবং আক্রমণাত্মক ও সহিংস মিছিল দাঙ্গা-হাঙ্গামা। এ সকল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী নিষ্ঠুরভাবে-নির্বিচারে শিশু, কিশোর, যুবক, মহিলা ও বৃদ্ধকে মারপিট করে এবং যারাই এদের বিরোধিতা করে তাদেরকেই হত্যা করে। তারা এমন হৃদয়হীন ও পাষণ্ড যে, এরা একজন নিরীহ লোকের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বিনা দ্বিধায় হত্যা করে। এ সব সন্ত্রাসীরা নিরীহ মানুষের মগজ পদদলিত করতে দ্বিধা করে না। তারা নিরীহ জনসাধারণকে বাড়ি থেকে বহিষ্কার করে, তা তিনি বৃদ্ধ, মহিলা, শিশু যেই হোন না কেন। এ সব নির্যাতিত মানুষের একমাত্র অপরাধ ছিল অন্য মতাদর্শে বিশ্বাসী।

বিংশ শতাব্দীর দুঃস্বপ্নের বিভীষিকা থেকে আমরা উঠে এসেছি। মানব জাতিকে দুঃসহ বেদনা ও রক্তের বন্যায় বইয়ে দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র বিভ্রান্তিকর একটি মতাদর্শে বিশ্বাস ও তা বাস্তবায়ন করার নামে। ফ্যাসিজম ও কমিউনিজম—এ দুটি মতাদর্শকেই মানব জাতির বিপর্যয় ও দুঃখ কষ্টের কালো অধ্যায় সৃষ্টির জন্য শীর্ষ মতবাদ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। যদিও আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী মতবাদ দুটি একটি অপরটির ধ্বংস করার প্রচেষ্টায় অব্যাহত ছিল, কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো দুটি আদর্শই একটি মাত্র উৎস থেকে তাদের পুষ্টি, শক্তি ও সহযোগিতা প্রাপ্ত হয়েছে। আর এই উৎস তথা মতাদর্শ মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে না বরং সবসময়ই একটি নিষ্পাপ/নিরীহ তত্ত্ব/মতাদর্শ/ধারণা/মতবাদ হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই উৎস তথা মতবাদ হলো: বস্তুবাদী দর্শন এবং ডারউইনবাদ তথা প্রকৃতিবাদ।

অপেশাদার জীব বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন উনবিংশ শতাব্দীতে সুমেরীয় ও প্রাচীন গ্রীসের পৌরাণিক গল্প কথা পুনর্ব্যক্ত করার মাধ্যমে ডারউইনবাদ প্রকাশ ও প্রচার করেন। আর এর ভিত্তিতে যতগুলি মতবাদের ভিত্তিভূমি রচিত হয়েছে সবগুলো মানবতার জন্য অভিশাপ হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। ডারউইনবাদ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মুখোশ ধারণ করে এসব ভ্রান্ত মতাদর্শ ও এদের অনুসারীদের তখন থেকে এক ধরনের মিথ্যা বৈধতা দান করেছে। এই মিথ্যা বৈধতার বদৌলতে বিবর্তনবাদ তথা ডারউইনবাদ অল্পদিনের মধ্যে জীব বিজ্ঞান ও জীবাশ্ম বিজ্ঞানের অধিক্ষেত্র অতিক্রম করে মানব সম্পর্ক থেকে শুরু করে ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ বিজ্ঞান ও মানুষের সার্বিক জীবন যাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিস্তার করে। উনবিংশ শতাব্দীতে যে সব মতবাদ বা চিন্তাধারা সমাজকে প্রভাবিত করেছিল এর কয়েকটি চিন্তার স্রোতধারা ডারউইনবাদের তত্ত্বের মধ্যে তাদের যৌক্তিকতা বা তথাকথিত প্রমাণ খুঁজে পেল। ফলে ডারউইনবাদে এ সকল চিন্তাধারা বা মতবাদের ব্যাপক সমর্থন পেতে সক্ষম হলো।

অস্তিত্বের সংগ্রাম “সবলই বেঁচে থাকে” অন্যরা ধ্বংসপ্রাপ্ত/পরাজিত হয়ে “সমাজ থেকে অদৃশ্য তথা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়” প্রভৃতি মতবাদ মানবীয় চিন্তা চেতনায় অনুপ্রবেশ করে এবং তা লালনের মাধ্যমে মানব সমাজে প্রয়োগ করতে শুরু করে। ডারউইনবাদ যখন দাবী করতে থাকে যে, “অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম ও দ্বন্দ্ব” একটি প্রাকৃতিক বিধান এবং যা শুধুমাত্র উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতে নয় বরং তা সার্বিকভাবে মানব সমাজের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। এই নীতিরই ধারাবাহিকতার আলোকে হিটলার এর বিকৃত চিন্তাধারায় জার্মান জাতিকে “প্রভুর জাতি”, কার্ল মাকর্স এর দাবী “মানব জাতির ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস” এবং পুঁজিপতিদের নীতিতে ধনীরা গরীবদের “বঞ্চনা তথা শোষণের” মাধ্যমে “ধনী অধিকতর ধনী হবে” এবং উপনিবেশবাদীদের তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্র সমূহের জনগণকে শোষণ ও বঞ্চনার মাধ্যমে অধিনস্ত রাখার সাম্রাজ্যবাদী নীতি প্রবর্তনের দ্বারা বর্ণবাদী আক্রমণ, নিগ্রহ, প্রবঞ্চনা, বৈষম্য ও অপশাসনের তাত্ত্বিক যৌক্তিকতা পাওয়া যায়।

রবার্ট রাইট (Robert Wright) একজন বিবর্তনবাদী হওয়া সত্ত্বেও তার বই ‘The Moral Animal’-এ মানব জাতিকে বিবর্তনবাদ কিভাবে এক মহা বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছে তা নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণনা করেছেন: “বিবর্তনবাদ প্রকৃত পক্ষে মানবীয় কর্মকাণ্ডের ইতিহাসে একটি দীর্ঘ ও নীতিজ্ঞানহীন অপপ্রয়োগ। এই শতাব্দীর শেষের দিকে রাজনৈতিক মতবাদের সাথে মিলেমিশে একটি অবোধ্য রাজনৈতিক মতবাদ সৃষ্টি করে এটি ‘সামাজিক ডারউইনবাদ’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে এবং তখন থেকেই এই জঘন্য মতবাদ বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী ও সবচেয়ে হৃদয়হীন পুঁজিপতিদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।”

এই পুস্তকে যে তত্ত্ব, তথ্য ও প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হয়েছে তার মাধ্যমে জানা যায় যে, ডারউইনবাদ শুধুমাত্র জীবের উৎপত্তি ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার মধ্যে এর বক্তব্য সীমিত রাখে না বরং ডারউইনবাদ একটি গোঁড়া মতবাদ যা ধর্মীয় বিশ্বাসের মতো এর অনুসারীদের মধ্যে এক ধরনের অন্ধ উন্মাদনা সৃষ্টি করে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদিও ডারউইনবাদ সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তবুও বহু বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদ ডারউইনবাদের অন্ধকার দিক অর্থাৎ এর বিভ্রান্তি জেনে বা না জেনেও এই গোঁড়া ও বিভ্রান্তিকর মতবাদকে এখন পর্যন্ত সমর্থন দিয়ে আসছেন। যদি সমাজের আপামর জনগণ এই অবৈজ্ঞানিক মতবাদের ভুলত্রুটি ও সামাজিক ক্ষতি তথা সার্বিক বিপর্যয় সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতে পারেন তাহলে স্বৈরশাসক, নির্দয় ও অমানবিক স্বার্থপর ব্যক্তিদের এ মতবাদ কার্যকরী করার সুযোগ থাকবে না। ফলে এই বিভ্রান্তিকর মতবাদের অপপ্রয়োগ সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব হবে। ডারউইনবাদের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে যারা মানব সমাজে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, শোষণ, বঞ্চনা ও স্বার্থপর চিন্তাধারা ও মতাদর্শ প্রচার, প্রসার ও প্রয়োগ করে বলেন যে এটাই “প্রাকৃতিক বিধান”, তখন এটা বলার আর কোনো সুযোগ থাকবে না বা সমাজে তা গৃহীত হবে না।

মানবতাবিরোধী সকল মতাদর্শের মূল ডারউইনবাদ যদি সম্পূর্ণরূপে সমাজ থেকে চূড়ান্তভাবে উৎপাটিত হয়, সে ক্ষেত্রে একটি মাত্র সত্য বিদ্যমান থাকবে। সেই মহাসত্য হলোঃ “এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ও মানব জাতিকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। যে সকল ব্যক্তিবর্গ এই সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবেন তারা এও বুঝতে পারবেন যে প্রকৃত বাস্তব সত্য হলো মানব জাতির সকল সমস্যা সমাধানের উপায় ও পন্থা ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত ঐশী গ্রন্থেই নিহিত আছে।” ব্যাপক জনগোষ্ঠী যদি এই ধারণা পোষণ করে তবে বিশ্ব সমাজ থেকে দুঃখ, বেদনা, অন্যায়, অবিচার, দুর্ভোগ-দুর্দশা, গণহত্যা ও দারিদ্র্য অপসারিত হবে এবং এর পরিবর্তে প্রজ্ঞা, ধনসম্পদ, সুস্বাস্থ্য, প্রাচুর্য ও মুক্তি মানব সমাজে বিরাজ করবে। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন সকল মিথ্যা ও মানব জাতির জন্য ক্ষতিকারক মতবাদ সমাজ থেকে অপসৃত হবে এবং শুধু সেই পবিত্র ও ঐশী মতবাদ সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে প্রকৃত জনকল্যাণ সাধন করা সম্ভব হবে। “ঢিল মারলে পাটকেল ছোড়া” বা “ঘুষির বদলে ঘুষি মারা” অথবা আক্রমণকারীকে অধিকতর বড় আঘাত দিয়ে কোনো সমস্যার বাস্তব সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং যারা এ ধরনের কাজ করে তাদের কাছে ধৈর্য, দয়া ও সহানুভূতির সাথে প্রকৃত সত্য বিস্তারিতভাবে বর্ণনার মাধ্যমে তাদের চিন্তাধারা বা ধ্যান ধারণা পরিবর্তন করানোর মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

এই পুস্তক লেখার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো যারা ডারউইনবাদের অন্ধকারময় দিক জেনে অথবা না জেনে এতে বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করে থাকেন, তাদেরকে এ মর্মে অবহিত করা যে, তারা প্রকৃতপক্ষে কোন মতবাদকে সমর্থন করছেন। আর যারা এই মতবাদকে বিশ্বাস করেন না ঠিকই, তবে তারা ডারউইনবাদকে বিশ্ব মানবতার জন্য হুমকি স্বরূপ বলেও মনে করেন না, তাদেরকে ডারউইনবাদের অন্ধকার দিক সম্পর্কে সতর্ক করাও এ পুস্তকে লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00