📄 পেট্রোডলার ধারণা (Petro Dollar)
কালের পরিক্রমায় এই অপরাধীদের জন্য একটি স্বর্ণসদৃশ সুযোগ তৈরি হয়, যা আজও চলমান। সেই সুযোগ হলো, ডলারের মানকে তেলের দামের সঙ্গে সংযুক্ত করা। বিশেষ করে আরব দেশগুলোর তেল রপ্তানির বিনিময়ে তাদের নিরাপত্তা দেওয়া, যাতে তারা যেকোনো হুমকি থেকে সুরক্ষিত থাকে। ফলে বিশ্ব আবারও ডলারের আধিপত্যের অধীনে চলে আসে, যে ডলার তৈরি ও ছাপানো হয় মাত্র কয়েকজন চোরের হাতে। নিচে এই চোরদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো, যা লিখেছেন একজন চীনা-আমেরিকান সম্পাদক, যিনি 'Currency Wars' বইয়ের লেখক। বইটি এক মিলিয়ন পঞ্চাশ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে!
টিকাঃ
৫. পেট্রোডলারের ইতিহাস: ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সৌদি আরবের নেতৃত্বে তেল উৎপাদনকারী রাষ্ট্রগুলো আমেরিকার ওপর তেল-অবরোধ শুরু করে। তখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সৌদি আরবকে এই অবরোধ শেষ করতে রাজি করান। একই সঙ্গে সৌদি আরব সিদ্ধান্ত নেয়, এরপর থেকে তেল বিক্রির জন্য শুধুমাত্র ডলার ব্যবহার হবে। এর বিনিময়ে আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দেয় যে, যেকোনো বিপদ, অভ্যুত্থান বা যুদ্ধে তারা সৌদি রাজপরিবারকে রক্ষা করবে। বাস্তবে আমেরিকা এটি প্রমাণ করেছিল ১৯৯০ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে। কিসিঞ্জারের প্রচেষ্টায় অন্যান্য উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র এবং পরে সব ওপেকভুক্ত (OPEC) দেশও ডলারে তেল বিক্রি শুরু করে। ফলে তেলকে কেন্দ্র করে ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ কারেন্সি হয়ে ওঠে। বিশ্ব অর্থনীতি ডলারের ওপর নির্ভরশীল হয় এবং ডলার হয়ে ওঠে শক্তিশালী একক মুদ্রা। এটিটিকে বলা হয় পেট্রোডলার চুক্তি। ডলারের ওপর এই নির্ভরশীলতা আমেরিকাকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে দেয়। তারা নিজের ইচ্ছামতো বিভিন্ন দেশের ওপর অবরোধ আরোপ করে, ফরেন রিজার্ভ ফ্রিজ করে এবং সুইফট সিস্টেম থেকে দেশকে বের করে দেয়। ফলস্বরূপ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক দেশ ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। ইউরো ও চীনের ইউয়ানও এখন বেশকিছু তেল-লেনদেনে ব্যবহার হচ্ছে।
📄 স্বর্ণ (Gold)
মানবজাতির প্রতি আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ হলো, স্বর্ণ মানুষের হাতে তৈরি করা যায় না এবং স্বর্ণ ছাপানোও যায় না। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত অসংখ্য প্রচেষ্টা হয়েছে বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে কৃত্রিমভাবে স্বর্ণ উৎপাদনের; কিন্তু সবই ব্যর্থ হয়েছে। অতীতে এই ব্যর্থ প্রচেষ্টার বিদ্যাকে বলা হতো ইলমুস সিমিয়া, যা আজকের দিনে ইলমুল কিমিয়া (রসায়নবিদ্যা) নামে পরিচিত।
স্বর্ণ কেবল সৃষ্টি হয় মহাবিশ্বের বিরাট নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণ 'সুপারনোভা' থেকে, যা সংঘটিত হয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
টিকাঃ
১০. জ্যোতির্বিজ্ঞানে সুপারনোভা বলতে বোঝায় একটি নক্ষত্রের মৃত্যুর সময় ঘটে যাওয়া প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। যখন কোনো বৃহৎ নক্ষত্র তার জ্বালানি শেষ করে ফেলে, তখন তার অভ্যন্তরের মহাকর্ষীয় চাপ ও শক্তির ভারসাম্য ভেঙে গিয়ে বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে। এতে নক্ষত্রের বাইরের স্তর মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং অস্থায়ীভাবে সেই নক্ষত্র সূর্যের থেকেও কোটি গুণ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সুপারনোভা মহাবিশ্বে নতুন ভারী মৌল তৈরির অন্যতম প্রধান উৎস।
📄 মুদ্রা ও অর্থ
অতীতে যখন মানুষের কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের প্রয়োজন হতো, তখন সে তা অন্য কারও কাছ থেকে গ্রহণ করত; বিনিময়ে নিজের কোনো পণ্য তাকে দিয়ে দিত। এ ব্যবস্থাটি পরিচিত ছিল 'বিনিময়-পদ্ধতি' নামে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই পদ্ধতিটি অকার্যকর হয়ে ওঠে। কারণ অনেক সময় একজন মানুষের কোনো পণ্যের প্রয়োজন হলেও অপর পক্ষের কাছে এমন কোনো পণ্য না-ও থাকতে পারে, যা বিনিময়যোগ্য।
অর্থনীতিবিদরা তখন পণ্যের বিনিময়ে নতুন একটি ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। অবশেষে তারা এমন একটি পণ্যের কথা চিন্তা করেন, যা প্রতিটি সমাজে সবার জন্য সহজলভ্য এবং যাকে বাকি সকল পণ্যের জন্য মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এ ব্যবস্থাটিকে বলা হয় 'হিসাবি মুদ্রা' বা অ্যাকাউন্টিং কারেন্সি। প্রাচীন সমাজে গবাদিপশু ছিল সবার কাছে সহজলভ্য এবং মূল্যবান, তাই অর্থনীতিবিদরা সেটিকেই বেছে নেন।
এ কারণেই ভারতের মুদ্রার নাম রুপি (RUPEE)। কারণ এই শব্দটির উৎস হলো রুপা (RUPAA), যার অর্থ 'পশু'। একইভাবে আরবি 'নকদ' (نقد) শব্দটির উৎস হলো প্রাচীন আরবদের ব্যবহৃত 'নকদি', যা এক বিশেষ প্রজাতির খাটো পায়ের ভেড়াকে বোঝাত।
সময়ের সাথে সাথে এবং বিভিন্ন সমাজের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার ফলে মানুষ হিসাবি মুদ্রাকে আরও সহজে ব্যবহারযোগ্য করার চেষ্টা করতে থাকল। এজন্য তারা ধাতুর দিকে ঝুঁকল। প্রথমে এক ধাতু, পরে আরেক ধাতু। এভাবে একপর্যায়ে তারা পৌঁছাল সবচেয়ে মূল্যবান ধাতুর কাছে, স্বর্ণ। কারণ স্বর্ণের মূল্য অনেক বেশি এবং এটি যেকোনো বিনিময়যোগ্য মুদ্রার তুলনায় স্থিতিশীল।
যে শ্রমিকেরা মুদ্রা তৈরির কাজে নিয়োজিত থাকত, তাদের বলা হতো সায়ারিফা (الصيارفة) বা মানি চেঞ্জারস (money changers)। তারা খুব সাধারণ ও প্রাথমিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে মুদ্রা তৈরি করত। সরঞ্জামগুলোর মধ্যে ছিল একটি ছোট টেবিল, সেখানে তারা নিজেদের জিনিসপত্র রাখত ও কাজ করত।
📄 ঋণের চক্র, টাকার চক্র ও ডলারের পতন-ধ্বনি
এখন প্রশ্ন হলো, এই প্রক্রিয়া কতদিন চলতে থাকবে? ঋণের সীমা (Debt Ceiling) অতিক্রমের কারণে কি পরিস্থিতি ভেঙে পড়বে? আর কতদিন সরকার এই বেসরকারি ব্যাংক (ফেডারেল রিজার্ভ) থেকে ধার করতে থাকবে? যেখানে এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না যে, সরকারের ঋণ এখন জাতীয় উৎপাদনের চেয়েও বেশি!
এমতাবস্থায় যদি সরকার ঋণ নেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে নোট ছাপানোও বন্ধ হয়ে যাবে। তখন মানুষও আর ঋণ নিতে পারবে না। কেননা প্রতিটি ডলার ধার নেওয়ার মাধ্যমে আরেকজন উপকৃত হয়। এটিকেই বলা হয় 'টাকার ঘূর্ণনচক্র' (Cycle of Money)।
কিন্তু যখন মানুষ ঋণ নেওয়া বন্ধ করবে, তখন ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাবে। এর পরিণামে তৈরি হবে মন্দা (Recession)। চাহিদা কমে যাবে আর সরবরাহ বেড়ে যাবে। এটি এক ভয়াবহ জটিল অবস্থা। কারণ যদি সরকার ঋণ নেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে মানুষ বাধ্য হবে সাশ্রয়ী হতে, নিজেদের হাতে যা আছে তাই আঁকড়ে ধরতে। পরিস্থিতি তখন ভয়াবহ হয়ে যাবে। তারচেয়েও ভয়ংকর আশঙ্কা হলো, যদি সরকার দেউলিয়া ঘোষণা করে বসে!
ভাবুন তো, আপনি যদি ঋণ নেওয়া বন্ধ করে দেন, ব্যাংকগুলো কি চুপচাপ বসে থাকবে? নিশ্চয়ই না। তারা আপনার কাছে তাদের প্রাপ্য ঋণ ফেরত চাইবে। একইভাবে ফেডারেল রিজার্ভ ক্রমাগত ট্রেজারির কাছে ঋণ পরিশোধের দাবি জানাবে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান তাদের পাওনা আদায়ের চেষ্টা করবে। তখন মানুষের একমাত্র মনোযোগ থাকবে, যেভাবেই হোক ঋণ পরিশোধ করা। ফলে কী হবে? ধীরে ধীরে বাজার থেকে প্রকৃত অর্থ গায়েব হতে শুরু করবে। কিন্তু ঋণ থেকে যাবে পাহাড়সম! যা শোধ করা কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না। আর তখনই নেমে আসবে ভয়াবহ ধ্বস।
এভাবেই শুরু হবে ডলারের পতন। আর যদি ডলার ধ্বসে পড়ে, তাহলে পুরো বিশ্বের মুদ্রাব্যবস্থা এক নিমিষেই ভেঙে পড়বে! আমেরিকান সরকার ঋণ শোধ করছে না, ব্যাংকগুলোও ঋণ শোধ করছে না, আমার রাষ্ট্রও ঋণ শোধ করছে না, আপনার রাষ্ট্রও ঋণ শোধ করছে না। কেউই কিছু করছে না, করতে পারছে না। ফলে নিশ্চিতভাবেই সরকারগুলো ভেঙে পড়বে, কোম্পানিগুলো ধ্বসে পড়বে, চাকরির ক্ষেত্র ভেঙে পড়বে এবং কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।
যদি এমন ঘটে, তবে ভয়াবহ পতন ঘটবে, আর এতে সবাই ডুবে যাবে কষ্টের সাগরে। সবাই ক্ষুধার্ত হবে, বস্ত্রহীন হবে, পৃথিবী ডুবে যাবে কালো অন্ধকার দিনের মধ্যে। অপরাধ বেড়ে যাবে, চেতনা কমে যাবে। কারণ ক্ষুধায় মরার ভয়ে মানুষ তখন সবকিছুকে তুচ্ছ মনে করবে। এখন পুরো ব্যাপারটাই আল্লাহ তাআলার হাতে। তিনি ছাড়া রক্ষা করার কেউ নেই। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য।