📄 তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ
[৫৮৫-৫৮৭ হিজরি/১১৮৯-১১৯২ খ্রিষ্টাব্দ]
হিত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের শোচনীয় পরাজয় এবং এরপর আল-কুদস নগরীর পতনের ফলে ইউরোপে নতুন করে ক্রুসেড অভিযানের আওয়াজ ওঠে। তৎকালীন পোপ ৮ম গ্রেগরি (Gregory VIII) ১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র নগরী আল-কুদস পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের ডাক দেন।
পোপের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইউরোপের শক্তিশালী কয়েকজন শাসক এবারের অভিযানে যোগদান করেন। তারা হলেন—
* জার্মানির রাজা ও পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের (The Holy Roman Emperor) সম্রাট ১ম ফ্রেডেরিক (Frederick Barbarossa)।
* ফ্রান্সের রাজা ২য় ফিলিপ (Philip Augustus) |
* ইংল্যান্ডের রাজা 'সিংহহৃদয়' খ্যাত প্রথম রিচার্ড (Richard the Lionheart) ।
ইউরোপের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রুসেডার বাহিনী আক্কা অভিমুখে রওনা হয়। জার্মানি থেকে প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে রওনা হওয়ার পর রাজা ১ম ফ্রেডেরিক ৫৮৬ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (১১৯০ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে) পথিমধ্যে ডুবে মারা গেলে তার নেতৃত্বাধীন জার্মান বাহিনীর সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং অধিকাংশই দেশে ফিরে যায়। অল্প কিছু সৈন্য আক্কায় পৌঁছতে সক্ষম হয়।
অপরদিকে ২য় ফিলিপের নেতৃত্বাধীন ফরাসি বাহিনী ও ১ম রিচার্ডের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বাহিনী প্রথমে সিসিলিতে একত্র হয়। এরপর তারা নিজেরা পরস্পরে বিরোধে জড়িয়ে পড়ায় দীর্ঘ সময় সিসিলিতেই অবস্থান করে। কিছুদিন পর ফরাসিরা সিসিলি ত্যাগ করে আক্কা অভিমুখে রওনা হয়।
ইংরেজরাও আক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে ইংরেজ নৌবহর সাইপ্রাস দ্বীপে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সাইপ্রাস তখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। সাইপ্রাসে অবতরণ করার পর রাজা রিচার্ড বাইজান্টাইনদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং সাইপ্রাস দখল করে সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। এরই মধ্যে বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গায় রিচার্ডের কাছে দ্রুত ক্রুসেড অভিযানে যোগ দেওয়ার আবেদনবার্তা পাঠালে রিচার্ড সমুদ্রপথে আক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন। এই গায়কেই সুলতান সালাহুদ্দিন বন্দি করার পরও ক্ষমা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফরাসি ও ইংরেজ বাহিনী আক্কায় পৌঁছে যাওয়ায় অবরোধকারী ক্রুসেডারদের মনোবল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনী আক্কার পতন ঘটানোর জন্য পূর্ণ উদ্যমে অবরোধ অব্যাহত রাখে।
৫৮৭ হিজরি সনের ১৭ জুমাদাল উখরা (১১৯১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই) শুক্রবার হঠাৎ করেই আক্কা নগরপ্রাচীরের শীর্ষদেশে ক্রুশচিহ্নিত পতাকা উড়তে থাকে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুসলমানরা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং ক্রুসেডারদের হিংস্র হামলার শিকার হয়। ষাট হাজার মুসলিম নাগরিকের প্রাণ-বিয়োগের পর আক্কার কর্তৃত্ব চলে যায় ক্রুসেডারদের হাতে।
আক্কা দখল করার পর ক্রুসেডার বাহিনীর সদস্যরা সেখানেই আনন্দ-উল্লাসে মত্ত হয়ে যায় এবং দীর্ঘ দিন সেখানেই কাটিয়ে দেয়। অথচ তারা বের হয়েছে 'পবিত্র ভূমি' আল-কুদস পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে!
এদিকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের রাজার মধ্যে নতুন করে শুরু হয় বিরোধ ও সংঘাত। এর পরিণতিতে ফরাসি রাজা ফিলিপ দেশে ফিরে যান। এরপর সালাহুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী ও ১ম রিচার্ডের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনীর মাঝে একের পর এক রক্তক্ষয়ী লড়াই চলতে থাকে। জয়-পরাজয়ের পাল্লা ছিল উভয়দিকেই দোদুল্যমান।
এসব যুদ্ধের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আরসুফের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ক্রুসেডাররা জয়ী হয়। ক্রুসেডারদের দৃষ্টিতে এ বিজয় ছিল হিত্তিনের যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ।
ক্রুসেডাররা এ সময় আসকালান ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দিক থেকে আল-কুদস দখলের চেষ্টা করলেও মুসলিম প্রহরীদের তীব্র প্রতিরোধের কারণে কাছে ভিড়তে ব্যর্থ হয়। প্রহরীদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তাদের লড়াই হচ্ছিল এবং লড়াইতে কখনো মুসলিম প্রহরীরা, আবার কখনো ক্রুসেডাররা জয়ী হচ্ছিল। অবশ্য এ সময় তারা উপকূলীয় বিভিন্ন নগরী দখল করতে সক্ষম হয়। একদিকে প্রচুর জনবল ক্ষয়, অপরদিকে দীর্ঘ দিনের মাতৃভূমির বিচ্ছেদের কারণে রাজা রিচার্ড এ সময় অস্থির হয়ে ওঠেন এবং সন্ধিচুক্তির চেষ্টা চালান। তিনি একের পর এক কয়েকজন দূতকে সুলতানের কাছে প্রেরণ করেন। তার সন্ধিপ্রস্তাবে উল্লেখ ছিল— উভয়পক্ষ তিন বছর যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে, আসকালানের অধিকার ক্রুসেডারদের ফিরিয়ে দিতে হবে, বাইতুল মুকাদ্দাসের আল-কিয়ামা গির্জা তাদেরকে দান করতে হবে এবং খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদেরকে বিনা মাশুলে আল-কিয়ামা গির্জা পরিদর্শন ও তীর্থযাত্রার সুযোগ দিতে হবে।
সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি আল-কিয়ামা গির্জা তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে সম্মত হলেও আসকালান ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তীর্থযাত্রীদের উপর যৎসামান্য অর্থ আরোপের কথা বলেন। কিন্তু ইংরেজরা দাবি জানায়, মুসলমানরা যদি আসকালানের নিরাপত্তাপ্রাচীর পুনর্নির্মাণ করে নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ইংরেজদের বুঝিয়ে না দেয়, তাহলে তারা সন্ধি করবে না। ফলে সুলতানও তাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর সুলতান সালাহুদ্দিন জাফা পৌঁছে কঠিন অবরোধ আরোপ করেন এবং জাফা জয় করেন। ক্রুসেডারদের আবেদনের কারণে তাদের ছোট-বড় সকলকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। এরই মধ্যে সমুদ্রপথে সামরিক সহায়তা চলে আসায় ইংরেজ বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে মুসলিম বাহিনীর উপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। রাজা রিচার্ড আক্রমণ চালিয়ে জাফা পুনরুদ্ধার করেন। যেসব মুসলমান পেছনে পড়ে গিয়েছিল, তাদেরকে বন্দি করে ইংরেজ রাজার সামনে হত্যা করা হয়।
এভাবে উভয় পক্ষের মধ্যে লড়াই চলতে থাকে। এরই মাঝে ইংল্যান্ডের রাজা দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। অসুস্থ ইংরেজ রাজা মুসলিম সুলতানের কাছে ফলমূল ও বরফ চেয়ে বার্তা পাঠালে সুলতান উদার চিত্তে তার চাওয়া পূরণ করেন। অল্প কদিনের মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। সুস্থ হওয়ার পরই পরিবার-পরিজন ও মাতৃভূমির বিরহে অস্থির ইংরেজ রাজা বারবার দূত পাঠিয়ে সুলতানকে সমঝোতাচুক্তি করার অনুরোধ জানান এবং আসকালানের দাবি ছেড়ে দিয়ে সুলতানের দাবিমতো চুক্তি করতেই সম্মতি জানান। ১৭ শাবান উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধিচুক্তি লিপিবদ্ধ হয়। 'রামলা চুক্তি' নামে খ্যাত চুক্তিটির উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ধারা হলো—
• ক্রুসেডাররা সুর থেকে হাইফা পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করতে পারবে।
• কোনো প্রকার 'দর্শনার্থী মাশুল' প্রদান ছাড়াই খ্রিষ্টানরা আল-কুদসে ভ্রমণ করতে পারবে।
• আগামী তিন বছর আট মাস উভয় পক্ষের মাঝে শান্তি অবস্থা বিরাজমান থাকবে।
এই চুক্তি সম্পাদনের কারণে ইংল্যান্ডের রাজা ১ম রিচার্ড ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। চুক্তি সম্পাদনের কিছুদিন পর ৫৮৮ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১১৯২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) তিনি নিজ দেশে ফিরে যান। অপরদিকে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ.-এর দিক থেকে বিবেচনা করলে বলতে হয়, আরসুফ ও জাফার যুদ্ধে প্রচুর সৈন্যক্ষয় এবং শাম অঞ্চলের প্রশাসকদের অসহযোগিতার কারণে তিনি কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হন এবং যেকোনো মূল্যে আল-কুদসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে উপকূলীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
এভাবেই দীর্ঘ কয়েক বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অসংখ্য প্রাণহানি ও বিভিন্ন নগরী সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হওয়ার পর তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধে জার্মানি হারায় তাদের রাজাকে, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড হারায় তাদের নির্বাচিত ও সুদক্ষ অনেক সৈনিক ও সেনাপতিকে। যদিও সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনী আল-কুদস পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন নিয়ে অভিযানে বের হয়েছিল; কিন্তু তাদের চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। এ অভিযানে তারা কেবল আক্কা দখল করতে সক্ষম হয়।
📄 তৃতীয় ক্রুসেড-পরবর্তী সময়
ক্রুসেডার বাহিনীর প্রস্থানের পর সুলতান সালাহুদ্দিনের সুশাসনে জনসাধারণ নিরাপদে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকে। তার উদার আচরণের কারণে আল-কুদসে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের আগমনও প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। এমনকি ইংল্যান্ডের রাজা ১ম রিচার্ড অধিক হারে তীর্থযাত্রীদের আগমনে সুলতান সালাহুদ্দিনের ক্রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা করে সুলতানের কাছে বার্তা প্রেরণ করেন যে, তিনি যেন আল-কুদসে তীর্থযাত্রীদের অবাধ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং রাজা রিচার্ডের লিখিত অনুমতিপত্র বা নিদর্শন ছাড়া কাউকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি না দেন। কিন্তু সুলতান এ প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়ে প্রত্যুত্তরে লেখেন, তারা এত দূর থেকে এই পবিত্র স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে এসে পৌঁছেছে। আমি তাদের বাধাদান মোটেও বৈধ মনে করি না।
এর কিছুদিন পরই মহান সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বারো দিন অসুস্থ থাকার পর ৫৮৯ হিজরি সনের ২৭ সফর (১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ) বুধবার তার বিদেহী আত্মা পরম প্রভুর সান্নিধ্যে গমন করে। আল-কুদস মুক্তকারী এই মহান মুসলিম বীর যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তার ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে ছিল মাত্র সাতচল্লিশটি দিরহাম ও একটি দিনার! এ ছাড়া অন্য কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তার ছিল না।
সুলতান সালাহুদ্দিনের ইন্তেকালের পর তার পুত্র আল-আজিজ ইমাদুদ্দিন আইয়ুবি রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু শুরুতেই তিনি তার ভাই ও দামেশকের প্রশাসক আফজালের সঙ্গে বিরোধ ও লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। দু-ভাইয়ের সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে আফজালকে দামেশক থেকে নির্বাসিত করার মাধ্যমে। দামেশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সালাহুদ্দিনের ভাই ও জাযিরার প্রশাসক আল-আদিল সাইফুদ্দিন মুহাম্মাদ। সাইফুদ্দিন অত্যন্ত দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ শাসক ছিলেন। দামেশকের অভ্যন্তরীণ সমস্যাদি দমন করার পর শামের সকল অঞ্চল তার বশীভূত হয়ে যায়।
৫৯৫ হিজরি সনে (১১৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) আল-আজিজ ইমাদুদ্দিন ইন্তেকাল করেন। তখন তার চাচা সাইফুদ্দিন মিশরে এসে সালাহুদ্দিনের অপর দুই পুত্রকে পরাভূত করেন এবং নতুন প্রশাসক (আল-আজিজ ইমাদুদ্দিনের পুত্র) মাত্র নয় বছর বয়সী মানসুর বিন আল-আজিজকে বরখাস্ত করে মিশরের শাসনভার গ্রহণ করেন। ৫৯৬ হিজরি সনের মধ্যেই সালাহুদ্দিনের সাম্রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চল আল-আদিল সাইফুদ্দিনের আয়ত্তে চলে আসে। তার শাসনাধীন আইয়ুবি রাষ্ট্র পরিণত হয় সমকালীন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রে।
৫৯৩ হিজরি সনে সুলতান সাইফুদ্দিন যখন শাম অঞ্চলে রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুতকরণে ব্যস্ত ছিলেন, তখন স্থানীয় ক্রুসেডাররা জার্মানির সামরিক সহায়তা লাভ করে। মুসলমানদের পারস্পরিক বিভেদের সুযোগ নিয়ে তারা এ সময় আবারও আল-কুদস পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালায়। ক্রুসেডার বাহিনী যুদ্ধে সাইফুদ্দিনকে পরাজিত করে তার কাছ থেকে বৈরুতের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু এরপরই তারা নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। আল-আদিল সাইফুদ্দিন জাফা ও রামলা ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন।
📄 চতুর্থ ক্রুসেড যুদ্ধ
[৫৯৯-৬০০ হিজরি/১২০২-১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ]
খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মীয় গুরু পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট (Innocent III) ১২০২ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে ইউরোপে নতুন ক্রুসেডের ডাক দেন। এবারের অভিযানে নেতৃত্ব প্রদান করে ফ্রান্সের আঞ্চলিক রাজন্যবর্গ। তারা ফ্রান্স থেকে প্রথমে মিশরে গমন করে তৎকালীন ইসলামি বিশ্বের প্রধান শক্তি আইয়ুবি রাষ্ট্রকে পরাভূত করে তারপর আল-কুদস অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ শেষে ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ক্রুসেডার বাহিনী যখন রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই হঠাৎ করে পট পরিবর্তন ঘটে। এ সময় কনস্টান্টিনোপলে বাইজান্টাইন সম্রাট ২য় ইসহাক (Isaac II Angelos) তার বিরুদ্ধে পরিচালিত এক বিদ্রোহে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং তার পুত্র ৪র্থ অ্যালেক্সিয়াস (Alexius IV Angelus) পালিয়ে পশ্চিম ইউরোপে এসে পোপ ও ক্রুসেডারদের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। বিনিময়ে তিনি পূর্ব ইউরোপের অর্থোডক্স চার্চকে পোপের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়ার এবং ক্রুসেডারদের মিশর অভিযানে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য কর্তৃক সামরিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন।
ফলে সংগঠিত ক্রুসেড শক্তি নিজেদের লক্ষ্যপথ পরিবর্তন করে এবার কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে রওনা হয়! ক্রুসেডাররা কনস্টান্টিনোপলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সেখানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পরিস্থিতি এত শোচনীয় হয়ে পড়ে যে, অনেক বাইজান্টাইন নাগরিক তখন মনেপ্রাণে কামনা করছিল, হায়! এর পরিবর্তে যদি কনস্টান্টিনোপল মুসলমানদের কর্তৃত্বে চলে যেত! ক্রুসেডাররা বিভিন্ন গির্জা ও উমাইয়া শাসনামলে নির্মিত প্রাচীন মসজিদটি জ্বালিয়ে দেয় এবং নগরীজুড়ে ব্যাপক লুটতরাজ চালায়।
এই অভিযানের ফলে (বিভক্ত হওয়ার পর) প্রথমবারের মতো প্রাচ্যকেন্দ্রিক অর্থোডক্স চার্চ পশ্চিমা ক্যাথলিক চার্চের বশীভূত হয়ে পড়ে। এরপর ক্রুসেড যোদ্ধাদের যুদ্ধস্পৃহায় ভাটা সৃষ্টি হয় এবং মিশর ও বাইতুল মুকাদ্দাস অভিযানের চিন্তা বাতিল হয়ে যায়।
ক্রুসেডারদের আগ্রাসনের ফলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য কার্যত ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং কয়েকটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের এই ক্ষয়িষ্ণু পরিস্থিতি পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মুসলমানদের সামনে বলকান ও এশিয়া মাইনর অঞ্চলে বিজয়াভিযান পরিচালনার পথ সুগম করেছিল।
এ অভিযানের মাধ্যমে এ বিষয়টি আরও সুষ্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয়ে যায় যে, ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী খ্রিষ্টান নেতৃবৃন্দ মোটেও ধর্মীয় চেতনায় উদ্দীপ্ত ছিল না; তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদের ক্ষমতা ও সম্পদের লালসা চরিতার্থ করা।
📄 পঞ্চম ক্রুসেড যুদ্ধ
[৬১০-৬১৮ হিজরি/১২১৩-১২২১ খ্রিষ্টাব্দ]
৬১০ হিজরিতে (১২১৩ খ্রিষ্টাব্দে) পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট পঞ্চম ক্রুসেড অভিযানের ডাক দেন। চতুর্থ ক্রুসেড যুদ্ধের মতো পঞ্চম ক্রুসেডেরও লক্ষ্য ছিল আইয়ুবি রাষ্ট্রকে পরাভূত করে আল-কুদস পুনর্দখল করা। পোপের নির্দেশে পরবর্তী দু-বছর ক্যাথলিক ইউরোপজুড়ে ক্রুসেড অভিযানের প্রচারণা চালানো হয়। ১২১৫ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে রোমে পোপের নেতৃত্বে এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং পুরো অভিযানের রূপরেখা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি অভিযানে রওনা হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয় ১২১৭ খ্রিষ্টাব্দ।
পঞ্চম ক্রুসেডে ইউরোপের যেসব শাসক অংশগ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন-
• ডিউক অব অস্ট্রিয়া ৬ষ্ঠ লিওপোল্ড (Leopold VI) ।
• হাঙ্গেরির রাজা ২য় অ্যান্ড্রু (Andrew II) ।
• সাইপ্রাসের শাসক ১ম হিউ (Hugh I)।
• কাউন্ট অব ত্রিপোলি ৪র্থ বোহেমন্ড (Bohemond IV of Antioch) ।
কিন্তু অভিযান শুরু হওয়ার পূর্বেই ৬১৩ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১২১৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে) পোপ ৩য় ইনোসেন্ট ইহধام ত্যাগ করেন। এরপর অভিযান শুরু হতে না হতেই হাঙ্গেরির রাজা ২য় অ্যান্ড্রু নিজ দেশে ফিরে যান।
ক্রুসেডার বাহিনী মিশরে পৌঁছার পূর্বেই ৬১৫ হিজরি সনে (১২১৮ খ্রিষ্টাব্দে) সুলতান আল-আদিল সাইফুদ্দিন মাহমুদ মৃত্যুবরণ করেন। এরপর আইয়ুবি সাম্রাজ্যের হাল ধরেন তার পুত্র আল-কামিল মুহাম্মাদ।
ক্রুসেডার বাহিনী মিশর অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং ১২১৮ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে দিমইয়াতে পৌঁছে নৌবন্দরটি অবরোধ করে। ভূমধ্যসাগর হয়ে কায়রোতে পৌঁছতে আলেকজান্দ্রিয়া বা দিমইয়াত দুই নৌবন্দরের যেকোনো একটি অবশ্যই ব্যবহার করতে হয়। তুলনামূলক কম সুরক্ষিত হওয়ায় ক্রুসেডাররা দিমইয়াতকেই বেছে নেয়। আল-কামিল দিনরাত তাদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখলেও তাদেরকে দিমইয়াত থেকে সরাতে ব্যর্থ হন। বাধ্য হয়ে তিনি ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দকে দিমইয়াত ত্যাগের বিনিময়ে প্রলুব্ধকর সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব দেন। কিন্তু নিজেদের সামরিক শক্তি ও সংখ্যাধিক্যের গর্বে অন্ধ ক্রুসেড শিবির সরাসরি সন্ধিপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। দীর্ঘ দেড় বছরের অবরোধের পর ১২১৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে তারা দিমইয়াত দখল করে নেয় এবং নগরজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
এরপর ক্রুসেডাররা কায়রো অভিমুখে অগ্রসর হয়। সুলতান আল-কামিল এ সময় পুনরায় তাদেরকে সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব দিলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। ক্রুসেডার বাহিনী তিনদিক থেকে জলভাগ দ্বারা বেষ্টিত একটি এলাকা দিয়ে কায়রোর দিকে অগ্রসর হয়। এলাকাটি পূর্ব দিক থেকে মানজালা হ্রদ (Lake Manzala), পশ্চিম দিক থেকে দিমইয়াত (শাখা) নদী এবং দক্ষিণ দিক থেকে আল-বাহরুস সগির নদী দ্বারা বেষ্টিত ছিল। ইসলামি নৌবহর তাদের প্রতিরোধের জন্য নীলনদে অবস্থান নিয়েছিল। নীলনদে তখন ভরা জোয়ার চলছিল। মুসলমানরা নদীর বিভিন্ন বাঁধ কেটে দিলে উক্ত এলাকা পানিতে ডুবে যায় এবং ক্রুসেডারদের সামনে গমনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তারা দিমইয়াতে ফিরে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু দিমইয়াতে প্রত্যাবর্তনের একমাত্র সংকীর্ণ পথটিতে আল-কামিল তার সৈন্যদের মোতায়েন করে রেখেছিলেন। আল-কামিলের সৈন্যরা এবার ক্রুসেডারদের পথ আগলে দাঁড়ায়।
অবরুদ্ধ ও কোণঠাসা ক্রুসেডাররা এবার নিজেরাই সন্ধিচুক্তির আবেদন জানায়। আল-কামিল এই শর্তে তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে সম্মত হন যে, তারা দিমইয়াত অঞ্চল ফেরত দেবে এবং এর নিশ্চয়তাস্বরূপ আপাতত কয়েকজন খ্রিষ্টান রাজন্যকে জামানত হিসেবে আল-কামিলের হাতে তুলে দেবে। অবশেষে ৬১৮ হিজরি সনের রজব (১২২১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর) মাসে ক্রুসেডাররা দিমইয়াত ত্যাগ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে। এভাবে ইউরোপের খ্রিষ্টানশক্তির পঞ্চম ক্রুসেড অভিযানও পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।