📄 রাসূল আকরাম (সা)-এর মহাজ্বলপ্রস্থ
এখানে আমি ইসলামের প্রথম দান মুহাম্মদ রাসুল (সা)-এর মহা অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করছি। তা হলো, তিনি বিশ্বমানবতাকে দান করেছেন নির্ভেজাল মূল্যবান তাওহীদের আকীদা-বিশ্বাস- যা স্বচ্ছ, পবিত্র ও নজীরবিহীন এক মূল্যবান বিপ্লবী আকীদা; শক্তি ও বিশ্বাসে ভরা জীবনবোধ থেকে উৎসারিত। এই আকীদা পাল্টে দেয় সব প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তি; বিলীন করে দেয় বাতিল প্রভুদের রাজত্ব। এটা এমন এক আকীদা-বিশ্বাস- যা বিশ্বমানবতা না ইতিপূর্বে পেয়েছিল আর না কিয়ামত পর্যন্ত পাবে।
মানব জীবনে শিরিক ও মূর্তিপূজার প্রভাব প্রভাবান্বিত সেইসব মানুষ যারা কবিতা ও দর্শন, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের বিষয়ে বড় বড় বড়ত্বের দাবি করে, চমৎকার বুঝ-সমঝের অধিকারী, যারা দেশ ও জাতিকে অসংখ্যবার গোলামে পরিণত করেছিল, যারা কঠিন শিলা-পাথরকে প্রস্ফুটিত ঘ্রাণযুক্ত পুষ্পে পরিণত করেছিল, যারা মরুর পাহাড়ের বুক দিয়ে বইয়ে দিয়েছে কত প্রবহমান ঝর্ণাধারা, এরা কখনো কখনো নিজেকে আল্লাহ্ বলেও দাবি করে বসেছিল। এই মানুষই আবার অতি নগণ্য জড় বস্তুর সামনে মাথা অবনত করত, যার নেই উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা, আর না আছে কাউকে কিছু দেয়া বা না দেয়ার ক্ষমতা। পবিত্র কুরআনে এ মর্মে বর্ণিত হচ্ছে:
وَإِنْ يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لَّا يَسْتَنْقِذُوهُ مِنْهُ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ.
"এবং যদি মাছি তাদের সামনে থেকে কোন জিনিস ছিনিয়ে নেয়, তাহলে তারা মাছির কবল হতে তা উদ্ধার করতে পারে না। এমন তালেব (উপাসক) এবং মাতলুব (উপাস্য) কতই দুর্বল!" [সূরা হাজ্জ: ৭৩]
এ মানুষই এমন বস্তুর সামনে মাথানত করত, তাকে ভয় করত এবং তার কাছেই কল্যাণের আশা করত, যাকে সে নিজেই তৈরি করেছে। মানুষ শুধু পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, গাছ-পালা, জীব-জন্তু, আত্মা-প্রেতাত্মা, মানুষ ও শয়তানের সামনেই সিজদায় লুটিয়ে পড়ত না, বরং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অতি নগণ্য কীট-পতঙ্গ, পোকা-মাকড়কেও সিজদা ও আরাধনা করত। তারা সারা জীবন অতিবাহিত করত কুমন্ত্রণা, সন্দেহ, অপ্রাসঙ্গিক চিন্তা-ভাবনায়, অবাস্তব ধ্যান- ধারণায়, নিরর্থক আশা-আকাঙ্ক্ষায়- যার স্বাভাবিক পরিণতি হলো তার মধ্যে কাপুরুষতা ও দুর্বলতা, চিন্তা-চেতনার দীনতা ও মানসিক অস্থিরতা, আত্মবিশ্বাসশূন্যতা ও অস্থিতিশীলতার মত অসংখ্য রোগ-ব্যাধি তাকে গ্রাস করে ফেলে। সনাতন ভারতবর্ষে দেব-দেবীর আধিক্য বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য। যখন ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে তা পূর্ণতার শেষ সোপানে পা রেখেছিল, তখন তাদের মাবৃদ-ভগবানের সংখ্যা তেত্রিশ কোটিতে উন্নীত হয়েছিল' এবং প্রতিটি পছন্দনীয় বস্তু, প্রতিটি ভয়ঙ্কর বস্তু, বাহ্যত কল্যাণকর জিনিসমাত্রই পূজার যোগ্য মনে করা হত। (বিশ্ব কি হারাল পৃ. ৫৭)
টিকাঃ
১. R. C. Dutt. Ancient India. Vol. III. P. 276. (1891) And L. S. S. D. Malley: Popular Hinduism-The religon of Masses (cambridge. 1935)
📄 একত্ববাদের বিশ্বাস ও জীবনের উপর-এর প্রভাব
পবিত্র কুরআন এবং মুহাম্মদ (সা)-এর রিসালাত এ ঘোষণা দিল যে, এ দুনিয়া মালিকবিহীন বা অসংখ্য মালিকের এজমালী সম্পত্তি নয়, বরং এর বাদশাহ মাত্র একজন, তিনিই স্রষ্টা, তিনিই নির্মাতা এবং তিনিই এর পরিচালক ও নিয়ন্ত্রক। সৃষ্টি করা ও নির্দেশ দান করার অধিকার একমাত্র তাঁরই। اَلا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمُرُ “জেনে রাখ, সৃষ্টি করা তাঁরই কাজ এবং আদেশ দেয়াও তাঁরই কাজ।" [সূরা আ'রাফ: ৫৪]
এ দুনিয়ার ছোট-বড় সকল বস্তুই তাঁর হুকুম ও কুদরতের দ্বারা আপন অস্তিত্ব লাভ করে। বস্তুত প্রতিটি বস্তুর অস্তিত্বের প্রকৃত কারণ হলো আল্লাহ্ ইচ্ছা ও তাঁর কুদরত। অনুরূপ, এ বিশ্বজগতও তাঁর সৃষ্টি ও অস্তিত্ব লাভের জন্য তাঁর হুকুম ও আদেশের মুখাপেক্ষী। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে: وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ "আসমান ও জমীনের মাঝে যা কিছু আছে সবই তাঁর সামনে আত্মসমর্পণ-কারী।" [সূরা আলে ইমরান: ৮৩]
আর এজন্যই যেসব মাখলুক নিজস্ব ইচ্ছা ও এখতিয়ারের মালিক, তাদেরও তাঁর হুকুমের সামনে মাথানত করা উচিত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে: الَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ . "জেনে রাখ, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহ্রই প্রাপ্য।" [সূরা যুমার: ৩]
মানুষের উপর এ আকীদা-বিশ্বাসের প্রথম মানসিক প্রতিক্রিয়া এ হল যে, (মানুষ বুঝতে সক্ষম হলো) এ বিশ্ব একক কেন্দ্র ও একই নিয়মের অন্তর্ভুক্ত। আর এ নিয়মের মাঝে মানুষ তার বিস্তৃত সদস্যদের মধ্যে অটুট বন্ধন ও সুগভীর সম্পর্ক খুঁজে পেল। এ আকীদা-বিশ্বাসের প্রভাবে মানুষ জীবনের পরিপূর্ণ অর্থ খুঁজে পেল এবং সৃষ্টি সম্পর্কে হিকমত ও প্রজ্ঞার সাথে সুনির্দিষ্ট মতামত পোষণ করতে সক্ষম হলো।
রাসূলুল্লাহ (সা) বিশ্বমানবতাকে দান করলেন সহজ, স্বচ্ছ, সুন্দর-পবিত্র, গ্রহণযোগ্য, প্রাণ সঞ্জীবনী সাহস ও হিম্মতে ভরপুর জীবন ও শক্তিসঞ্চারী এক আকীদা, যার মাধ্যমে মানবতা পেল নবজীবন। ফলে, তারা নিষ্কৃতি পেল তাগূতের ভয় ও শংকা হতে। তখন এক আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করার প্রয়োজন আর রইলো না। তাদের অন্তরে এখন এমন ইয়াকীন পয়দা হলো যে, এক আল্লাহই ক্ষতি করেন এবং কল্যাণ দান করেন, দানও করেন, বিমুখও করেন। তিনিই মানুষের প্রয়োজন পূরণকারী। তাওহীদের এ নতুন পরিচয় এবং নতুন আবিষ্কারের কারণে দুনিয়ার ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল। তারা সব ধরনের গোলামী থেকে, মাখলুকের ভয় ও আশা এবং মন ও মগজের পেরেশানী থেকে মুক্ত হয়ে গেল। তারা এখন আধিক্যের মাঝে একত্ববাদের সন্ধান খুঁজে পেয়েছে। সৃষ্টিলোকের মাঝে তারা নিজের অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। আল্লাহ্র সৃষ্টির মাঝে তারাই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি; আল্লাহ্র পক্ষ থেকে পৃথিবীর শাসক ও ব্যস্থাপক এবং আল্লাহ্র খলীফা পদমর্যাদায় ভূষিত। এখন তারা নিজেদের প্রকৃত স্রষ্টা ও প্রভুর অনুসরণ ও আনুগত্যের এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ বাস্তবায়ন করাই তাদের দায়িত্ব বলে মনে করে। আর এভাবেই সে চিরন্তন মানবিক সম্মান-সফলতার সন্ধান পেল, দীর্ঘকাল ধরে মানব জাতি যা থেকে বঞ্চিত ছিল।
📄 পৃথিবীতে তাওহীদের কলেবরমুখর গুঞ্জরণ ও অন্য ধর্মের উপর এর প্রতিক্রিয়া
এটা মহানবী মুহাম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবেরই ফল ছিল- যা বিশ্বমানবতাকে আকীদায়ে তাওহীদের মত এক দুর্লভ উপহার দান করল- যা ছিল শতাব্দীকাল পর্যন্ত দুষ্প্রাপ্য ও বিস্মৃত এক বাস্তবতা, কিন্তু প্রিয় নবী (সা)-এর আবির্ভাবের পর সারা দুনিয়া জুড়ে গুঞ্জরিত হলো তাওহীদের আকীদা-বিশ্বাস। ফলে, পৃথিবীর প্রায় সকল পার্থিব ধর্ম-দর্শন ও ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনার উপর একত্ববাদের কম-বেশি প্রভাব পড়ল।
যেসব বড় বড় ধর্ম শিরক ও বহুত্ববাদের ওপর গড়ে উঠেছিল এবং যা তাদের শিরা-উপশিরায় মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত আকীদায়ে তাওহীদের প্রভাবে (অনুচ্চ কণ্ঠে ও ফিস ফিস করে হলেও) তাদেরকে এ কথা স্বীকার করতে হয়েছে যে, আল্লাহ্ এক এবং তাঁর কোন শরীক নেই। তারা নিজেদের শিরকি মতবাদের দার্শনিক ব্যাখ্যা করতে শুরু করল যাতে নিজেদেরকে শিরক ও বিদআতের অপবাদ থেকে বাঁচাতে পারে এবং আকীদায়ে তাওহীদের সাথে কিছুটা সামঞ্জস্য প্রমাণিত হয়। কাজেই এখন আর ধর্মগুরু ও তাদের অনুসারীরা পর্যন্ত শিরকের অপবাদ শুনতে প্রস্তুত নয়। ফলে, সারা শিরকী কর্মকান্ডে তারা এক ধরনের হীনম্মন্যতার শিকার হয়ে পড়ল। এ অবস্থায় তাওহীদের উপহার ছিল সবচেয়ে মূল্যবান উপহার- যা রাসূল (সা)-এর আবির্ভাবে বিশ্বমানবতা লাভ করে ধন্য হয়েছে। এ বাস্তবতার উপর আলোকপাত করতে গিয়ে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক হযরত মাওলানা সৈয়দ সুলায়মান নদভী (রহ) বলেন-
"ঐ জাতি-গোষ্ঠী, যারা আকীদায়ে তাওহীদ থেকে বেখবর ছিল, তারা মানুষের মর্যাদার ব্যাপারে ছিল পূর্ণ অজ্ঞ। তারা মানুষকে প্রাকৃতিক নিয়মেরই গোলাম মনে করত, কিন্তু মুহাম্মদ (সা)-এর আনীত তাওহীদী শিক্ষার প্রভাবে মানুষের দিল থেকে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সবকিছুর ভয়-ভীতি দূর হয়ে গেল। আকাশের সূর্য থেকে যমীনের নদী-নালা ও পুকুর পর্যন্ত প্রভু হবার পরিবর্তে মানুষের গোলাম হয়ে তাদের সামনে আবির্ভূত হলো। রাজা-মহারাজাদের শান- শওকতের জৌলুস ভেঙ্গে গেল এবং তারা বাবেল (ব্যাবিলন) শহর, মিসর, ভারত ও ইরানের আল্লাহ্ ও মহাপ্রভু )أَنَا رَبَّكُمْ الْأَعْلَى( হবার পরিবর্তে মানুষের খাদেম, সেবক ও পাহারাদার হিসেবে দৃষ্টিগোচর হলো।
"মানবীয় ভ্রাতৃত্ববোধ- যা দেবতাদের রাজত্ব উঁচু-নিচু, ক্ষমতাধর-দুর্বল ভদ্র ও ইতর প্রভৃতি শ্রেণীতে বিভক্ত করে রেখেছিল, তাদের বিশ্বাস ছিল যে, তাদের কোন জাতকে পরমেশ্বরের মুখ দ্বারা, আবার কোন জাতকে পরমেশ্বরের হাত দ্বারা এবং কোন জাতকে পা দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে, আর এ আকীদা-বিশ্বাসের কারণে মানবতা এমন সব জাত-পাতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল যে, তাদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন হওয়া কোনক্রমেই সম্ভব ছিল না, আর এভাবে সাম্য ও সম্প্রীতি দুনিয়া থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল, যমীন জাতিগত বা গোষ্ঠীগত জুলুম- নির্যাতন, অহংকার ও গৌরবের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। তাওহীদ এসে ঐ সকল মান-মর্যাদা, উঁচু-নিচু, ভদ্র-ইতর ও জাত-পাতের বিভেদকে একাকার করে দিল। সব মানুষ আল্লাহ্ বান্দা, তাঁর কাছে সব মানুষ সমান, সকলে পরস্পরে ভাই ভাই এবং সব ব্যপারে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। এ শিক্ষা দুনিয়াতে সামাজিকতা, রীতি-নীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে সংস্কার সাধন করেছে, ইতিহাসের পাতা তার স্বাক্ষী।"
পরিশেষে তারাও এ মূলনীতির (তাওহীদের) অনুগ্রহ স্বীকার করেছে- যারা প্রকৃত অর্থে তাওহীদের সঠিক ধারণা হতে ছিল পূরোপুরি অজ্ঞ। আর এ কারণেই তারা আজও পর্যন্ত সাম্য ও সাম্য-প্রীতির মূল্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় নি। চূড়ান্ত অবস্থা এই যে, তারা আল্লাহ্র ঘরে যাবার পরেও তাদের দিল-দেমাগ হতে বৈষম্যের ধারণা দূর হয় না এবং আল্লাহ্র সামনে মাথানত করেও ঐশ্বর্য ও দারিদ্র্য, বর্ণ ও জাতিগত পার্থক্যের কথা ভুলতে পারে না। অন্যদিকে, মুসলিম জাতি তেরশত বছর যাবত তাওহীদের আকীদা-বিশ্বাসের কারণে সাম্য ও সম্প্রীতির অমূল্য নিয়ামত পেয়ে ধন্য হয়ে আছে। তারা সকল প্রকার কৃত্রিম ভেদাভেদ থেকে মুক্ত। ইসলামের দৃষ্টিতে সবাই এক আল্লাহ্র বান্দা, সকলেই সমান, তাঁর সামনে সকলেরই মস্তক অবনত। ধনী বা দরিদ্র, রং ও রূপ, বংশ ও গোত্র পরিচয় তাদের মাঝে কোন বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে না। যদি কোন বিশেষত্ব থাকে, তাহলে শুধু তাকওয়া ও আল্লাহ্র আনুগত্যের মাধ্যমে। ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ أَتْقَكُمْ .
"তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্র কাছে সবচেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারী সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মাঝে বেশি তাকওয়া অবলম্বনকারী।" [সূরা হুজুরাত : ১৩]
📄 ভারতের ওপর একত্ববাদের প্রভাব
ভারতীয় চিন্তা-চেতনা এবং দর্শনের ওপর ইসলামের এ একত্ববাদী আকীদা-বিশ্বাসের যে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে, এ সম্পর্কে ভারতের বিশিষ্ট গবেষক কে, এম, পানিক্কর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন:
“এটা সর্বজনস্বীকৃত কথা যে, ইসলামি যুগে হিন্দু ধর্মের উপর ইসলামের গভীর প্রভাব পড়েছে। হিন্দুদের মধ্যে আল্লাহ্ ইবাদতের ধারণা ইসলামের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। তৎকালীন সময়ে যদিও বা হিন্দু ধর্মের ধর্ম ও দর্শনের নেতৃস্থানীয়রা নিজেদের উপাস্যদের বিভিন্ন নামে নামকরণ করেছিল, তথাপি তারা আল্লাহ্ ইবাদতের দাওয়াত দিত এবং তারা আল্লাহ্ এক হবার কথা স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করত এবং আরো বলত, তিনিই একমাত্র ইবাদতের ও উপাস্য হবার যোগ্য এবং তাঁর কাছে মুক্তি এবং সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা উচিত। ইসলামের এ প্রভাব ইসলামি যুগে ভারতের ধর্ম ও সংস্কার আন্দোলনের মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ভগতি ও কবীর দাসের' সংস্কার আন্দোলন।”২
প্রসিদ্ধ গবেষক ডঃ তারাচাঁদ ভারতবর্ষে ইসলামের প্রভাব সম্পর্কে লিখেছেন- "ইসলামী খিলাফতের যুগ থেকে আরব মুসলমানেরা (দক্ষিণ ভারতের) উপকূলীয় অঞ্চলে পর্যটক হিসেবে আসত এবং নিজেদের স্বধর্মী আফগান, তুর্কী এবং মোঙ্গল বিজয়ীদের আগমনের অনেক আগেই তারা এখানে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয়দের সাথে সৌহার্দ্য গড়ে তুলেছিল। উপমহাদেশের এ অঞ্চলে নবম শতাব্দী হতে দ্বাদশ শতাব্দীকাল পর্যন্ত ব্যাপক ধর্মীয় আন্দোলন শুরু হয়, যে আন্দোলনের সম্পর্ক শংকর রামনুজ (Sankara Ramanu JA) আনন্দতীর্থ (Anandatirtha) এবং বসু (Basaua) এর সাথে ছিল। এদের মাধ্যমে ঐতিহাসিক মতবাদ সৃষ্টি হয়েছিল- যার নজীর পরবর্তী হিন্দু মতবাদের মধ্যে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দেখা যায় না।
এ আন্দোলন পুনর্জীবিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ, দক্ষিণ ভারতের এ ধর্ম ও দর্শনগুলো পৃথক পৃথকভাবে সনাতন চিন্তা-চেতনার উৎস হতে গৃহীত ছিল কিন্তু সমষ্টিগতভাবে এবং বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে এতে ইসলাম ধর্মের প্রভাব প্রকাশ পায়। আর এ কারণে ইসলাম থেকে প্রভাবিত হবার ধারণা অধিক যুক্তিসঙ্গত বলে মন হয়।"৩
মান্যবর ডঃ তারাচাঁদ তাঁর অন্য এক বইয়ে ভগতী মতবাদের উপর ইসলামের প্রভাব আলোচনা করতে গিয়ে বলেন:
"মিস্টিক্স (Mastics) নামে আরেকটি মতবাদ ছিল। এ মতবাদের প্রবর্তক সাধারণ ভাষা ব্যবহার করে তার বিপ্লবী চিন্তা-চেতনার প্রচার করে। এরা বেশির ভাগ নীচুজাতের মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখত। ফলে, তার আন্দোলন বঞ্চিত মানুষদেরকে উপরে উঠার ব্যাপারে আশাবাদী করে তুলেছিল। এদের অনেককে সরকারের রোষানলে পড়তে হয় এবং কেউ সামাজিক অসন্তুষ্টির মুখোমুখি হয়।
আর কিছু এমন ছিল যে, তাদের ব্যাপারে কোন মাথা ব্যথা ছিল না। কিন্তু বঞ্চিত গরীবেরা তাকে যথেষ্ট সমীহ করত এবং তার শিক্ষা-দীক্ষা অতি আগ্রহ সহকারে পালন করা হতো। এ সকল মনীষী মানবতার সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন। কারণ, তাদের শিক্ষার উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব কর্মদ্বারা মানবতার শিখরে উন্নীত হতে পারে। এ মতবাদগুলো পনের শতাব্দীর দিকে শুরু হয়ে সতের শতাব্দীর মধ্যকাল পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল। অতঃপর ধীরে ধীরে এগুলো বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। ঐ সকল মতবাদের অনুসারীরা হিন্দুস্থানের বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল। তথাপি তাদের শিক্ষা ও আকীদা- বিশ্বাসের উপর ইসলামের প্রভাব সুস্পষ্টভাবেই পরিলক্ষিত হয়।”১
শিখ ধর্মাবলম্বীদের অবস্থাও এটাই- যারা ভারতীয় সমাজ ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামরিক ও সভ্যতা-সংস্কৃতির অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। (হিন্দুধর্মের) মাঝে এ ধর্মাবলম্বীদের জন্ম ও উত্থানের মূল কারণ ইতিহাসের আলোকে ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাসের শুদ্ধিকরণরূপেই পরিদৃষ্ট হয়। এ ধর্মের প্রবর্তক বাবা গুরু নানক ইসলামি শিক্ষা-দীক্ষাদ্বারা খুবই প্রভাবিত ছিলেন। তিনি ফারসি ভাষা ও ধর্মীয় জ্ঞান সাইয়েদ হাসানশাহ নামক একজন সূফী মুসলমানের কাছ থেকে অর্জন করেন। তিনি সূফী সাহেবকে খুব ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। গুরু নানকের আরো অন্যান্য মুসলমান শিক্ষক ও গুরুরও উল্লেখ করা হয়েছে- যাদের সংখ্যা ছয়জন পর্যন্ত পাওয়া যায়। কথিত আছে, তিনি মক্কা-মদীনা শরীফ যিয়ারতও করেছিলেন এবং কিছুদিন বাগদাদে অবস্থান করেন। পাঞ্জাবের একজন বড় পীরে তরীকত জনাব শায়খ ফরীদের সাথেও তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ছিল।
বাবা নানক তাঁর শিক্ষা ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাওহীদী বিশ্বাস, সাম্য ও সম্প্রীতি এবং মূর্তিপূজা ত্যাগের ব্যাপারে খুব তাকিদ করতেন।
টিকাঃ
১. কবীর দাস একজন সূফীবাদী কবি। তিনি ভারতীয় সমাজের উপর সমালোচনা করতেন এবং সংস্কারের দাবি জানাতেন। তার ধর্মমত সম্পর্কে মতভেদ আছে।
২. A Survey of Indian History. P. 132
৩. Influence of Islam on Indian Culture. P.107
১. Society And The State in the Muhgal Period by Dr Tarachand. (Delhi.1941) P.91