📄 হযরত মূসা আঃ কোন নদী দিয়ে পার হয়েছিলেন?
কারো কারো মুখে শোনা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা যে নদী দিয়ে মুসা আলাইহিস সালাম ও তার সাহাবীদেরকে কুদরতীভাবে পার করেছিলেন আর ফেরাউনকে ও তার দলবলকে নিমজ্জিত করেছিলেন তা হচ্ছে নীলনদ। এই ধারণা ঠিক নয়। যেহেতু নীলনদ মিশরের নদী আর ফেরাউন ছিল মিশরের অধিপতি। সম্ভবত এই জন্য এই কথা অনেকের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। ফলে এই ভুল ধারণা ব্যাপকভাবে সয়লাব করে। সঠিক তথ্য হচ্ছে, ফেরাউন যে স্থানে নিমজ্জিত হয়েছিল তা হচ্ছে লোহিত সাগরের উত্তরের অংশ মিশরের-পূর্বে যেখানে সুয়েজ খাল খনন করা হয়েছে, তার সঙ্গে সংলগ্ন দক্ষিনে সমুদ্রের দুটি মাথা পরিলক্ষিত হয়। আমাদের আলোচিত স্থান হচ্ছে পশ্চিমের মাথা। এ স্থান বর্তমানে সুয়েজ উপসাগর নামে পরিচিত।
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহ তাআলার আদেশ ক্রমে মজলুম বনী-ইসরাঈলকে সঙ্গে নিয়ে রাতের বেলা এখানে পৌঁছলেন এবং সাথে থাকা লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত করলেন তখন সমুদ্র আল্লাহ তায়ালার আদেশ তার জন্য পথ করে দিলো। পানি উঁচু টিলার মতো দুই পাশে স্থির হয়ে গেল আর তিনি শুকনা রাস্তা দিয়ে সমুদ্র পার হলেন। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গীরা সিনা উপদ্বীপে উপনীত হয়েছিলেন। এদিকে ফেরাউন যখন তার বাহিনী নিয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল এবং সে রাস্তা অতিক্রম করতে চাইল তখন আল্লাহ তায়ালা উভয় পার্শ্ব থেকে পানিকে মিলিত হওয়ার আদেশ দিলেন। ফলে তারা সবাই নিমজ্জিত হয়ে গেল।
মূসা আলাইহিস সালাম সেসময় মিশর থেকে সিনা উপদ্বীপে পৌঁছেছিলেন তা একটি স্বীকৃত বিষয়। মিশর থেকে সিনা উপদ্বীপে যাওয়ার পথে যে জলভাগ রয়েছে তা হচ্ছে লোহিত সাগর। নীল নদের প্রশ্ন এখানে অবান্তর। তাই লোকমুখে নীল নদের ব্যাপারে যে সমস্ত কথা শোনা যায় সেগুলো ঠিক নয়。
📄 জিবরীল আ.-এর জান্নাত মাপার কাহিনী
লোকমুখে একটি কাহিনী প্রসিদ্ধ আছে, 'একবার জিবরীল আলাইহিস সালামের জান্নাত মেপে দেখার ইচ্ছা হল। তিনি আল্লাহ্র কাছে অনুমতি চাইলেন। আল্লাহ অনুমতি দিলেন। জিবরীল আলাইহিস সালামের ডানা আসমান থেকে যমীন সমান। তো এই ডানা দিয়ে তিনি জান্নাত পরিমাপ করার জন্য উড়তে আরম্ভ করলেন। উড়তে উড়তে এক পর্যায়ে তিনি হাঁপিয়ে উঠলেন এবং তাঁর ডানা ভেঙে গেল, অচল হয়ে গেল। তিনি থেমে গেলেন। তখন আল্লাহ বললেন, হে জিবরীল তুমি তো এখনো জান্নাতের এক খুঁটি (বা চৌকাঠ) থেকে আরেক খুঁটি পর্যন্তও পৌঁছতে পারনি।' কেউ কেউ এভাবেও বলে, '...জিবরীল আলাইহিস সালাম অনুমতি চাইলে আল্লাহ অনুমতি দিলেন। তিনি তিনশত বছর চললেন। তারপর আবার আল্লাহর কাছ থেকে আরো তিনশত বছরের অনুমতি চাইলেন। তিনশত বছর চললেন। তারপর আবার তিনশত বছরের অনুমতি চাইলেন। এভাবে নয়শত বছর চলার পর এক প্রাসাদের সামনে থামলেন। প্রাসাদ থেকে এক হ্রর উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, জিবরীল আমীন! আপনি এখানে কী করছেন? তিনি বললেন, জান্নাত পরিমাপ করছি। হুর বললেন, আপনি নিজেকে কষ্টে ফেলবেন না। আপনি এই নয়শত বছরে আমার রাজ্যই শেষ করতে পারেননি। জিবরীল আ. জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? হুর বললেন, আমি একজন সাধারণ মুমিনের স্ত্রী।' এগুলো বানোয়াট কিসসা। কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে তা পাওয়া যায় না। সুতরাং এগুলো বিশ্বাস করা ও বলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। জান্নাত কত বড়- এ ব্যাপারে কুরআনে কারীমের বহু আয়াত রয়েছে। সহীহ হাদীস রয়েছে, যেগুলো থেকে জান্নাতের বিশালতা অনুমান করা যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন অর্থ- তোমরা একে অন্যের অগ্রণী হওয়ার চেষ্টা কর তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাত লাভের জন্য, যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবীর প্রশস্ততা তুল্য। -সূরা হাদীদ (৫৭): ২১
সহীহ হাদীসে জান্নাতের গাছ সম্বন্ধেই বলা হয়েছে- অর্থ- জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়ায় আরোহী একশ বছর চললেও তার ছায়া অতিক্রম করতে পারবে না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৩২৫১ এছাড়া সবচেয়ে সাধারণ জান্নাতীর জান্নাতের পরিধি বলা হয়েছে অর্থ- দুনিয়া (পৃথিবী) ও তার মত আরো দশ দুনিয়া সমান। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৫৭১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৮৬ এসকল আয়াত-হাদীস থেকেই জান্নাতের বিশালতা অনুমান করা যায়। সুতরাং জান্নাতের বিশালতা বোঝানোর জন্য আমরা এসকল আয়াত ও সহীহ হাদীস বলব; কোনো অলীক কাহিনী বলব না。
📄 দুই ব্যক্তির রূহ কবজ করতে মালাকুল মাউতের কষ্ট হয়েছে
লোকমুখে প্রসিদ্ধ- আল্লাহ মালাকুল মাউতকে জিজ্ঞেস করলেন, হে মালাকুল মাউত! বনী আদমের রূহ কবজ করতে কি তোমার কখনো কষ্ট হয়নি? মালাকুল মাউত উত্তরে বললেন, জী, দুই ব্যক্তির রূহ কবজ করতে আমার কষ্ট হয়েছে। এক. একবার জাহাজ ডুবে গেলে এক মহিলা কাষ্ঠখ- ধরে সমুদ্রে ভাসছিল। এমতাবস্থায় তার একটি ছেলে সন্তান প্রসব হয়। এমন সময় ঐ মহিলার মৃত্যুর সময় চলে আসে। তো ঐ সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর দিকে তাকিয়ে তার মায়ের জান কবজ করতে আমার খুব কষ্ট হযেছিল। দুই. শাদ্দাদের জান কবজ করতে আমার কষ্ট হয়েছিল; যখন সে তার দুনিয়ার জান্নাত বানায় এবং সেখানে প্রবেশ করার মুহূর্তে এক পা ভেতরে দেওয়ার সাথে সাথে আরেক পা বাইরে থাকা অবস্থায়ই তার মৃত্যুর পরওয়ানা চলে আসে আর আমি তার জান কবজ করে নিই।
আল্লাহ বললেন, ওহে মালাকুল মাউত! সমুদ্রের মধ্যে যে শিশুর মায়ের জান কবজ করতে তোমার কষ্ট হয়েছিল সে শিশুটিই ছিল শাদ্দাদ!
কেউ কেউ কিসসাটিকে এভাবেও বলে- (সংক্ষেপে) ... জনমানবশূন্য মরুভূমির মধ্যে সদ্যভূমিষ্ঠ দুগ্ধপোষ্য শিশুর মায়ের জান কবজ করতে... এবং এক অশীতিপর বৃদ্ধ কামারকে তার লাঠির নিচের অংশে লোহা লাগিয়ে দিতে বলছিল, যাতে লাঠিটি অনেক বছর টেকসই হয়। এমতাবস্থায় বৃদ্ধের মৃত্যু চলে আসে আর আমি তার জান কবজ করি। তো এ কথা শুনে আল্লাহ বলেন, ঐ শিশু ও এই বৃদ্ধটি একই ব্যক্তি।
কেউ কেউ এভাবেও বলে, আল্লাহ মালাকুল মাউতকে জিজ্ঞাসা করলেন, বনী আদমের রূহ কবজ করতে তোমার কখনো কান্না আসেনি? মালাকুল মাউত উত্তরে বললেন, হে আমার রব! বনী আদমের রূহ কবজ করতে গিয়ে আমি একবার কেঁদেছি, একবার হেসেছি এবং একবার ভীত-সন্ত্রস্ত হয়েছি। ... জনমানবশূন্য মরুভূমিতে সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর মায়ের জান কবজ করতে গিয়ে শিশুটির কান্না ও অসহায়ত্ব দেখে কেঁদেছি। আর ভয় পেয়েছি এক আলেমের জান কবজ করতে গিয়ে। আমি যখন তার জান কবজ করতে যাই তো তার কামরা থেকে এক নূর বের হয় তা দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। আল্লাহ বললেন, ঐ আলেমই হল মরুভূমির ঐ শিশু; তাকে আমি লালন-পালন করেছি।
(মালাকুল মাউত বলেন,) আর এক ব্যক্তি মুচির কাছে তার জুতা দিযে বলল, এটা এমনভাবে সেলাই করে দাও যাতে এক বছর পরতে পারি। সে ঐ জুতা পায়ে দেয়ার পূর্বেই তার জান কবজ করেছি আর হেসেছি- কয়েক মুহূর্ত তার হায়াত নেই আর সে এক বছরের জন্য জুতা ঠিক করছে। যাইহোক এগুলো সবই ভিত্তিহীন কিসসা-কাহিনী। কোনো নির্ভরযোগ্য সনদে তা বর্ণিত হয়নি।
- শাদ্দাদের বেহেশতের কাহিনীর কোনো ভিত্তি নেই, এর কোনো অস্তিত্ব নেই। (আলইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল, মাউযূআত ফী কুতুবিত তাফসীর ২৮২-২৮৪)। তেমনি এই ঘটনায়ও আমরা শাদ্দাদের বেহেশতের আলোচনা দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং তা কখনোই সত্য হতে পারে না।
এছাড়াও এ ঘটনায় আমরা আরেকটি বিষয় দেখতে পাচ্ছি, শাদ্দাদের মত নাফরমানের জান কবজ করতে মালাকুল মাউতের কষ্ট হচ্ছে; সে তার আল্লাহদ্রোহিতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে চাচ্ছে এবং আল্লাহদ্রোহিতায় লিপ্ত রয়েছে অথচ মালাকুল মাউত তার জান কবজ করতে কষ্ট পাচ্ছেন। এটি এ ঘটনা বাতিল হওয়ার আরেকটি প্রমাণ। (আল-কাউসার:সংখ্যা: ০২: জুমাদাল উলা ১৪৩৮)
📄 আওজ ইবনে উনুক, নূহ আলাইহিস সালাম এবং বিসমিল্লাহর ঘটনা
বিসমিল্লাহর বরকত বিষয়ে মানুষের মুখে একটি কিসসা শোনা যায়- হযরত নূহ আলাইহিস সালামের জামানায় এক লোক ছিল। সে এত লম্বা ছিল যে, সাগরের তলদেশ থেকে মাছ ধরে সূর্যের কাছে নিয়ে সেদ্ধ করে খেত। আবার সে ছিল অনেক মোটা, কখনও পেট ভরে খেতে পারত না। কিস্তি বানানোর সময় নূহ আলাইহিস সালাম তাকে গাছ এনে দিতে বললেন।
তখন সে কিছু শর্ত দিল। ১. পেট ভরে খেতে দিতে হবে। ২. মন ভরে গোসল করতে দিতে হবে ইত্যাদি। নূহ আলাইহিস সালাম তার শর্ত মেনে নিলেন। সে দুই হাতে অনেক বড় বড় দুটি গাছ এনে দিল। তা দিয়ে নূহ আলাইহিস সালাম কিস্তি বানালেন। তখন সে বলল, আমার শর্ত পূরণ করুন। নূহ আলাইহিস সালাম তাকে দুইটি রুটি দিয়ে বললেন, 'বিসমিল্লাহ' বলে খাও। সে বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করল। দেড়টা রুটি খেয়েই তার পেট ভরে গেল, সে আর খেতে পারল না। তারপর হাঁটু পানি দেখিয়ে বললেন, যাও বিসমিল্লাহ বলে এখানে গোসল করতে নামো। সে বিসমিল্লাহ বলে পানিতে নামতেই তার পুরো শরীর পানিতে ডুবে গেল।
এটি একটি অলীক কাহিনী, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। না এমন কোনো ব্যক্তির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব ছিল, না এ ধরনের কিসসার সাথে নূহ আলাইহিস সালামের বা 'বিসমিল্লাহ'-এর ফযীলতের কোনো সম্পর্ক রয়েছে। উপরে উল্লেখিত বিশালদেহী লোকটি আউজ ইবনে উনুক নামে প্রসিদ্ধ। কেউ কেউ উস পালোয়ান বলে। তার কেন্দ্রিক লোকমুখে অনেক কাহিনী প্রসিদ্ধ আছে। সে নাকি তিন হাজার তিনশত তেত্রিশ হাত লম্বা ছিল। নূহ আলাইহিস সালামের প্লাবন নাকি তার হাঁটু পর্যন্তও পৌঁছেনি। সে সমুদ্রের তলদেশ থেকে বিশাল বিশাল মাছ ধরে সূর্যের কাছে নিয়ে সেদ্ধ করে খেত। আবার কেউ কেউ বলে, সে মূসা আলাইহিস সালামের যামানা পর্যন্ত হায়াত পেয়েছে। যাকেই মূসা আলাইহিস সালাম তার কাছে দাওয়াত দিয়ে পাঠাতেন তাকেই ধরে পকেটে ভরে রাখত। একবার মূসা আলাইহিস সালাম তার উপর রুষ্ট হলেন। মূসা আলাইহিস সালাম ছিলেন দশ হাত লম্বা। তাঁর লাঠি ছিল দশ হাত। তিনি লাফ দিতে পারতেন দশ হাত। তো তিনি লাফ দিয়ে নিজ লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করলেন। তা গিয়ে লাগল তার হাঁটুতে। এর ফলে সেখান থেকে পচন ধরল এবং এক পর্যায়ে সে মারা গেল ইত্যাদি। আউজ ইবনে উনুক কেন্দ্রিক এ সব কিচ্ছা-ই অলীক ও ভিত্তিহীন। হাদীসশাস্ত্রবিদগণ এগুলোকে ভিত্তিহীন বলেছেন। ইবনে কাসীর রাহ. এগুলো উল্লেখ করার পর বলেন-
وهذا كذب وافتراء এগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। -তাফসীরে ইবনে কাসীর, তাফসীরে সূরা মায়েদা, আয়াত ২০-২৬ দ্রষ্টব্য ইবনুল কায়্যিম রাহ. 'আলমানারুল মুনীফ' কিতাবে মূলনীতি আলোচনা করেন যে, কিছু বর্ণনা আছে, যেগুলোর ভিত্তিহীন হওয়ার উপর স্পষ্ট দলীল বিদ্যমান। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি আউজ ইবনে উনুকের বর্ণনার কথা উল্লেখ করেন। -আলমানারুল মুনীফ, পৃ ৭৬ আরও দ্রষ্টব্য : কাশফুল খফা ২/৫১০; আলআসরারুল মারফুআহ ফিল আখবারিল মাউযূআহ, পৃ. ৪৪৭; আসনাল মাতালিব, পৃ. ৩৫২; আলইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাউযূআত ফী কুতুবিত তাফাসীর, পৃ. ১৮৬