📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস > 📄 আর্য সমাজ

📄 আর্য সমাজ


অপরদিকে ১৮৫৭ সালে বোম্বাই শহরে দয়ানন্দ আর্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে এর প্রধান কার্যালয় লাহোরে স্থানান্তরিত হয়। দয়ানন্দ ভারতে গো-সংরক্ষণ প্রচারণা শুরু করেন এবং এতদুদ্দেশ্যে একটি সমিতি গঠন করেন।
দেশে গরু জবাই বন্ধের জন্যে আর্য সমাজের পক্ষ থেকে সরকারের নিকটে বিরাট আবেদন পত্র প্রেরণ করা হয়। তিনি প্রাচীন বৈদিক বিশ্বাসের প্রতি হিন্দু সমাজকে আহবান জানান এবং ইসলাম ও খৃস্টধর্মের মতো বৈদেশিক ধর্মের মূলোচ্ছেদের জন্যে জোর প্রচারণা চালান। “ভারত ভারতীয়দের জন্যে”— তাঁর এই সংগ্রামের আহবান বিরাট রাজনৈতিক পরিণাম ডেকে আনে। [১]
মুসলমানদের বেলায় ত কথাই নেই, হিন্দুদের সাথে ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক কারণে গভীর মিতালি বিদ্যমান থাকলেও, শাসক ও শাসিতের মনোভাব পুরাপুরিই ছিল। Sir Bampfylde Fuller তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সম্বলিত গ্রন্থে বলেন: “কিছু সংখ্যক ইংরেজ ভারতে এসে ভদ্রতাসুলভ আচরণের প্রাথমিক রীতিপদ্ধতিও ভুলে গিয়েছিল। ইংরেজদের মহলে, রেস্তোরাঁ ও ক্লাবে ভারতীয়দের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল। সিপাহী বিদ্রোহে নিহত ইংরেজদের স্মরণার্থে কানপুরে একটি উদ্যান তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে কোন ভারতীয় প্রবেশ করতে পারত না। যেসব স্থানে ইংরেজরা ঘুরাফেরা করতো সেখানে ভারতীয়দের যাতায়াত বিপজ্জনক ছিল। ভারতীয়দের প্রতি তাদের ঘৃণা বিদ্বেষ এতোটা চরমে পৌঁছেছিল যে, প্রায়ই তাদের উপর বর্বরতা চালানো হতো এবং হত্যাও করা হতো। অপরাধীর কোন শাস্তিই হতো না, অথবা হলে অত্যন্ত সামান্য জরিমানা পর্যন্তই তা সীমিত থাকতো। তাদের কাছে ভারতীয়দের জীবনের কোন মূল্যই ছিল আদি। বিনা বিচারে আসামীদের গুলী করে উড়িয়ে দেয়ার অথবা প্রাণদন্ড দেয়ার দৃষ্টান্তও পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে অফিসারদের বাড়াবাড়িও উপেক্ষা করা হতো। স্যার ব্যামফিন্ড তাঁর ডাইরীতে এ ঘটনাও লিপিবদ্ধ করেন যে, যখন তিনি কানপুরের রাস্তা দিয়ে চলছিলেন তখন জেলার কর্তা রাস্তা ছেড়ে দেয়ার জন্যে পথচারীদেরকে বেত্রাঘাত করছিলেন। [২]

টিকাঃ
১. A Hamid Muslim Separatism in India, p. 27; Farquhar Modern Religious Movement in India, p. 205
২. Sir Fuller Bampfylde: Some Personal Experiences, p-56, Muorag, London-1930; A Hamid: Muslim Separatism in India. p. 28

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস > 📄 ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস

📄 ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস


এ ধরনের আরও ছোটো বড়ো বহু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে, যার ফলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটা চাপা অসন্তোষ গুঞ্জরিত হচ্ছিল। এ সময়ে ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠিত হয়। মজার ব্যাপার এই যে, কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ‘অ্যালেন হিউম’ নামে জনৈক অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজ সিভিলিয়ান। তাঁর যোগ্যতা যেমন ছিল, তেমনি প্রভুত অর্থ সম্পদের মালিকও ছিলেন তিনি। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠান গঠনে তাঁর যেমন ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিল, তেমনি এর পেছনে ছিল তৎকালীন ভারতের বড়োলাট ডাফরিনের (Dufferin) আশীর্বাদ। মিঃ হিউম বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস থেকে অবসর গ্রহণের পর ভারতেই রয়ে যান এবং ভারতের সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে রাজনৈতিক উৎকর্ষ লাভের উদ্দেশ্যে একটি নিখিল ভারত সংগঠনের আবশ্যকতা উপলব্ধি করেন। কংগ্রেসের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে মাদ্রাজের গভর্নর প্রতিনিধিদেরকে বৈকালিক চায়ের মজলিসে আতিথ্য দ্বারা আপ্যায়িত করেন। অতএব প্রাথমিক পর্যায়ে কংগ্রেস এবং সরকারের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। কংগ্রেসের দুজন অবিসংবাদিত নেতা বাল গংগাধর তিলক ও সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির নীতি ও আদর্শ থেকে কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য জানতে পারা যায়।

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস > 📄 বালগংগাধর তিলক

📄 বালগংগাধর তিলক


বাল গংগাধর তিলক বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভের পর বিগত শতকের আটের দশকে সাংবাদিকতা ও রাজনীতি ক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে তাঁকে রাজনীতির পুরোভাগে দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন সুদক্ষ রাজনীতিবিদ। পার্লামেন্টারী পদ্ধতিতে বিরোধিতার পরিবর্তে তিনি প্রত্যক্ষ সংগ্রামের (Direct Action) নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি যুদ্ধপ্রিয় মারাঠা জাতির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য পুনর্জীবিত করে তা কংগ্রেসের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট করেন। [১]
বিগত শতাব্দীর ছয়ের দশকে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। ক'বছর পর চাকুরী থেকে অপসারিত হওয়ার পর সাংবাদিকতায় যোগদান করেন। তিনি যুব সমাজকে স্বাধীন ও আক্রমণাত্মক ভাবাপন্ন হওয়ার দীক্ষা দেন।
তিলকের ভালভাবে জানা ছিল কিভাবে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা ও সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ জাগ্রত করে দিতে হয়। তিনি বহু আগে থেকেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, হিন্দুজাতীয়তা তার ধর্মনিরপেক্ষতার রূপ পরিহার না করলে কিছুতেই শক্তি অর্জন করতে পারবে না। অতএব কয়েক বছর আগে থেকেই তিনি তাঁর গো-বধ প্রতিরোধ সমিতির (Ati-cow-killing society) কর্মতৎপরতা প্রসারিত করেন এবং গণপতি উৎসব পালনের উদ্দেশ্যে বিশেষ এক সংগীত রচনা, তার প্রকাশনা ও বিতরণের ব্যবস্থাদি করেন। ঐতিহাসিক 'হিন্দু মুসলিম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ' এবং তার 'হিসাব নিকাশের দিনের আগমনী' সম্পর্কিত বিষয়াদিতে পরিপূর্ণ ছিল এসব সংগীত। তিনি উগ্র হিন্দু শ্রেণী-চেতনা জাগ্রত করেন এবং মুসলিম সমাজ ও ধর্মের বিরুদ্ধে তীব্র মারাঠা বিদ্বেষ বহ্নি প্রজ্জ্বলিত করেন। তিলকের গো-বধ প্রতিরোধ সমিতি মূলতঃ দাক্ষিণাত্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও, তার কর্মতৎপরতা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। প্রচারক বাহিনী দেশের শহরে শহরে, গ্রামেগঞ্জে 'গো মাতার আর্তনাদ' The cry of the cow শীর্ষক প্রচারপত্র বিতরণ করতে থাকে। জনসভায় হিন্দুগণ গোহত্যার প্রতিবাদ করে প্রস্তাবাদি গ্রহণ করতে থাকেন এবং সংবাদপত্রের মাধ্যমে তা জনগণের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে থাকে। স্বভাবতঃই তার ফলে স্থানে স্থানে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষও হতে থাকে। [২]
সারাদেশে যে সময়ে এ ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, সে সময়ে ১৮৯৯ সালে, লর্ড কার্জন ভারতের বড়োলাট হিসাবে দায়িত্বগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, সে সময়ে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল কোলকাতায়। প্রথম কয়েক বৎসর কার্জন বাঙালী হিন্দুদের প্রিয়পাত্র ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন প্রশাসন ক্ষেত্রে দক্ষতার উপর অতিমাত্রায় গুরুত্ব আরোপ করেন এবং অযোগ্যতা, দুর্নীতি, কর্তব্যে অবহেলা, প্রভৃতি উচ্ছেদ করে প্রশাসনের মানোন্নয়নে মনোযোগ দেন, তখন স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর প্রশংসা, মাহাত্ম্যকীর্তন ও স্তুতির পরিবর্তে নিন্দা ও সমালোচনা শুরু করে। কার্জন প্রশাসন ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করেন। তার সবগুলি, মনঃপূত না হলেও, বিনাবাক্যে গৃহীত হয়। কিন্তু তাঁর বংগভংগ প্রতিক্রিয়াশীলদের অতিমাত্রায় ক্ষিপ্ত করে তোলে।
বংগভংগ ছিল কার্জন প্রশাসনের সবচেয়ে সুফলপ্রদ ব্যবস্থা। কিন্তু তথাপি এ এক অশুভ পরিণাম ডেকে আনে, ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির পরিবর্তন সাধন করে, হিন্দু ও মুসলিম জাতির মধ্যে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। যে মুসলিম জাতি কিছুকাল যাবত রাজনৈতিক অংগন থেকে দূরে সরে ছিল, তাদের মধ্যে পুনরায় রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত হয়। অতএব বংগভংগ ভারতীয় রাজনীতিতে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে সন্দেহ নেই।
এখন আমাদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভংগীসহ আলোচনা করা দরকার যে, বংগভংগের প্রকৃত কারণই বা কি ছিল, এবং তা অর্ধযুগ পরে বাতিলই বা হলো কেন।
বংগভংগ করা হয়েছিল সুষ্ঠু ও সুফলপ্রসূ প্রশাসনিক কারণে। বাংলা তখন ব্রিটিশ ভারতের সর্বপ্রধান প্রদেশ ছিল। বিহার ও উড়িষ্যা এই প্রদেশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। এবং আয়তন ছিল ১৭৯,০০০ বর্গমাইল এবং লোকসংখ্যা ৭৯,০০০,০০০। এত বড়ো একটি প্রদেশ একজন ছোটলাট বা গভর্নরের শাসনাধীন ছিল। এত বড়ো প্রদেশের সুষ্ঠু শাসন পরিচালনা, আইন শৃংখলা মজবুত রাখা এবং সকল অঞ্চলের উন্নয়নের প্রতি দৃষ্টি রাখা ছিল একেবারে অসম্ভব ব্যাপার। বাংলার পূর্বাঞ্চল যেহেতু নদীবহুল এবং যাতায়াতের সুযোগ সুবিধা না থাকায় ছোটলাটের পক্ষে এ অঞ্চল দেখাশুনা করা সম্ভব ছিল না। ছোটলাটের পাঁচ বৎসরের কার্যকালের মধ্যে একবারও এ অঞ্চল পরিদর্শন করার সুযোগ হতো না বলে, এ দিকটা ছিল অত্যন্ত অবহেলিত ও অনুন্নত। [৩]
বিগত শতকের ছয়ের দশকে উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে নিযুক্ত তদন্ত কমিটি মন্তব্য করেন যে, বিশাল বাংলা প্রদেশের প্রশাসনিক অব্যবস্থাই এই দুর্ভিক্ষের কারণ। বাংলার গভর্নর উইলিয়াম গ্রে ১৮৬৭ সালে এবং স্যার জন ক্যাম্পবেল ১৮৭২ সালে অভিযোগ করেন যে, এত বড়ো প্রদেশের শাসন কার্য পরিচালনা করা একজনের পক্ষে বড়োই কঠিন। তার ফলে শ্রীহট্ট, কাহার ও গোয়ালপাড়া একজন চীফ কমিশনারের শাসনাধীন করা হয়। তবুও বাংলা প্রদেশের আয়তন বিশালই রয়ে যায় এবং শাসন পরিচালনায় অসুবিধার সৃষ্টি হয়। পুনরায় ১৮৯২ সালে এবং ১৮৯৬ সালে সরকারী মহল থেকেই প্রস্তাব করা হয় যে, আসাম ও পূর্ব বাংলার চট্টগ্রাম বিভাগ ও ঢাকা ময়মনসিংহ জেলাদ্বয় নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হোক। এ শতকের শেষে লর্ড কার্জন যখন বড়োলাটের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তখন তাঁর নিকটে উক্ত প্রস্তাব পেশ করা হয়।
উক্ত প্রস্তাব সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করার পূর্বে আর একটি গুরুতর বিষয় লর্ড কার্জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মধ্য প্রদেশের চীফ কমিশনার স্যার অ্যান্ড্রু ফ্রেজার (Andrew Fraser) প্রস্তাব দেন যে, যেহেতু মধ্য প্রদেশের অধীন সম্বলপুরের আদালতে উড়িয়া ভাষা ব্যবহৃত হয়, অথচ সমগ্র প্রদেশে এ ভাষায় প্রচলন নেই, সেজন্যে উড়িয়া ভাষার পরিবর্তে হিন্দি ভাষা ব্যবহার করা হোক, অথবা সম্বলপুরকে উড়িষ্যার সাথে যুক্ত করে দেয়া হোক। উল্লেখ্য যে উড়িষ্যা ছিল বাংলার সাথে যুক্ত। এ প্রস্তাবও করা হয় যে, অন্যথায় গোটা উড়িষ্যাকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে যুক্ত প্রদেশের সাথে শামিল করা হোক।
একদিকে বাংলার গভর্নরদের পক্ষ থেকে বাংলার আয়তন হ্রাস করার প্রস্তাব এবং অপরদিকে স্যার অ্যান্ড্রু ফ্রেজারের প্রস্তাব লর্ড কার্জনকে বিব্রত করে। তিনি স্বয়ং বেরারকে ব্রিটিশ ভারতের সাথে সংশ্লিষ্ট করার চেষ্টায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯০২ সালের মে মাসে সেক্রেটারিয়েট ফাইলে এভাবে তাঁর মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেন যে, বেরারের বিষয়টির সাথে বাংলার সমস্যা বিবেচনা করা যেতে পারে।
আলোচনার পর চট্টগ্রাম বন্দরকে আসামের সাথে সংযুক্ত করার প্রস্তাব পেশ করা হয়। তার জন্যে যুক্তি প্রদর্শন করা হয় যে, এর দ্বারা বাংলা সরকারের প্রশাসনিক গুরুভার লাঘব করা হবে, পূর্ব বাংলার জেলাগুলিতে শাসন পরিচালনায় পরিলক্ষিত ত্রুটি বিচ্যুতিসমূহ দূরীভূত হবে এবং আসামের জন্যে যে সমুদ্রপথ একান্ত আবশ্যক, চট্টগ্রামের সংযুক্তিতে সে আবশ্যক পূরণ হবে। ১৯০৩ সালে লর্ড কার্জন এ প্রস্তাব অনুমোদন করে তারত সচিবকে অবহিত করেন।
অতঃপর তিনি এ বিষয়ে জনগণের মতামত ও প্রতিক্রিয়া জানার জন্যে পূর্ববংগে ব্যাপক সফর করেন। চট্টগ্রাম বিভাগের সাথে ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলা দু'টিকেও আসামের সাথে সংযুক্ত করার কথাও প্রস্তাবের মধ্যে শামিল ছিল বলে জনগণের মধ্যে তিনি বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেন। পূর্ব বাংলাকে আসামের অন্তর্ভুক্তকরণ জনগণ কিছুতেই মেনে নিবে না এ কথা কার্জন স্পষ্ট উপলব্ধি করেন।
অতঃপর লর্ড কার্জন ইংলন্ড গমন করেন এবং ১৯০৫ সালের প্রথম দিকে বাংলায় প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে বৃহত্তর আসাম গঠনের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। কার্জনের প্রত্যাবর্তনের পর পরিকল্পনাটি ভারত সচিব ব্রডরিক সমীপে পেশ করা হয়। ব্রডরিক পরিকল্পিত নতুন প্রদেশের নাম দেন ইস্টার্ন বেঙ্গল এন্ড আসাম (পূর্ব বংগ ও আসাম)। [৪]
বংগভংগ নানা ঘাত প্রতিঘাতে ক্ষতবিক্ষত ও বিধ্বস্ত মুসলিম সমাজের জন্যে অত্যন্ত মংগলময় হলেও এর পিছনে তাদের কোন প্রচেষ্টাই ছিল না। বংগভংগের পর তাদের যে প্রভূত মংগল সাধিত হতে যাচ্ছিল, তা ছিল তাদের কাছে একেবারে অপ্রত্যাশিত। শাসন কার্য সহজ, দ্রুততর, সুষ্ঠু ও সুন্দর করার জন্যে এবং এর সুফল যাতে অবহেলিত ও অনুন্নত বাংলার পূর্বাঞ্চলও ভোগ করতে পারে তার জন্যে এ বংগভংগের পরিকল্পনা ছিল শাসকদের। মুসলমানদের নয়। এর কারণগুলি ছিল অত্যন্ত ন্যায়সংগত এবং তা নিম্নরূপঃ-
প্রথমতঃ এ অঞ্চলটি ছিল সর্বদিক দিয়ে অনুন্নত। হিন্দু জমিদারগণ এ অঞ্চলের কৃষক প্রজাদের শোষণ করে সে শোষণলব্ধ অর্থ কোলকাতায় বসে বিলাসিতায় উড়িয়ে দিতেন। প্রজাদের শিক্ষাদীক্ষা, সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ও অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধার প্রতি ছিল তাঁদের চরম অবহেলা ঔদাসিন্য। কোলকাতা শহর ও পশ্চিম বাংলা উত্তরোত্তর উন্নতির উচ্চশিখরে আরোহণ করছিল। প্রশাসন ব্যবস্থাও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তার জন্যে পূর্বাঞ্চলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছিল। এ অঞ্চল নদীবহুল ছিল বলে নৌকা যাত্রীদের ধনসম্পদ জলদস্যুগণ নির্বিবাদে লুণ্ঠন করে নিয়ে যেতো যার প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা করা যেতো না। পুলিশ বাহিনী ছিল অপর্যাপ্ত ও দুর্বল যার ফলে সমাজের সর্বস্তরে অরাজকতা ও বিশৃংখলা বিরাজ করতো। প্রদেশের শাসকগণ এ অঞ্চলের শাসন পরিচালনার দায়িত্ব পরিহার করে বসেছিলেন এবং তাদের সকল সময় ও শ্রম কোলকাতার জন্যে ব্যয়িত হতো। পূর্বাঞ্চলের শিক্ষার জন্যে কোন অর্থ বরাদ্দও করা হতো না। কর্মচারীগণ পূর্বাঞ্চলের নামে ভীত শংকিত হয়ে পড়তেন এবং পূর্বাঞ্চলে বদলী হওয়াকে নির্বাসন দন্ড মনে করতেন।
উপরে বর্ণিত সমস্যাগুলির সমাধানের জন্যে বংগভংগ করা হয়েছিল। নতুন প্রদেশ আসাম, উত্তর ও পূর্ববংগ নিয়ে গঠিত হলো এবং এর আয়তন দাঁড়ালো ১০৬,৫০০ বর্গমাইল যার দুই তৃতীয়াংশ ছিল মুসলমান। অর্থাৎ প্রদেশটি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ হয়ে পড়লো। ১৯০৫ সালের ২০শে জুলাই নতুন প্রদেশ গঠন ঘোষিত হলো এবং ১৬ই অক্টোবর থেকে এর কাজ শুরু হলো। নতুন প্রদেশের প্রথম গভর্নর স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার (Sir Bampfylde Fuller) প্রথম দিন ঢাকায় উপনীত হয়ে বিব্রত হয়ে পড়েন। মুসলমানগণ নতুন গভর্নরকে সাদর অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন এবং হিন্দুগণ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন। নতুন গভর্নরকে চিরাচরিত প্রথানুযায়ী অভিনন্দন জ্ঞাপন করতে হিন্দুগণ অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। ক্রুদ্ধ জনতা তিনজন ইংরেজ মহিলাকে পথ চলাকালে আক্রমণ করে। [৫]
হিন্দুবাংলা বংগভংগের ফলে উগ্রমূর্তি ধারণ করে। এটাকে হিন্দুমহল প্রথমতঃ 'জাতীয় ঐক্যের' প্রতি আঘাত বলে অভিহিত করে। অতঃপর নানানভাবে এর ব্যাখ্যা দিতে থাকে, যথা তাদের 'রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার শাস্তি', 'মুসলমানদের প্রতি সরকারের পক্ষপাতিত্ব', এবং অবশেষে এটাকে 'মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা' নামে অভিহিত করে। রাতারাতি বংগভংগের বিরুদ্ধে হিন্দুগণ আন্দোলন শুরু করে দিলেন। 'জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করা হলো', 'পবিত্র বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করা হলো', 'ব্রিটিশ সরকার এবং দেশদ্রোহী মুসলমানদের মধ্যে এক অশুভ আঁতাত' প্রভৃতি উত্তেজনাকর উক্তির দ্বারা বাংলার আকাশ বাতাস বিষাক্ত করা শুরু করলো বাংলার হিন্দু সমাজ।
হিন্দু আইনজীবীগণ এর আইনগত বৈধতার প্রশ্ন উত্থাপন করলেন, বাংলা ভাষার সাহিত্যিকগণ প্রচার শুরু করলেন যে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি চরম আঘাত হানা হলো। সমগ্র হিন্দুবাংলা এ ধরনের প্রলাপোক্তি শুরু করলো।
এ ধরনের অসংগত ও অবাস্তব প্রচারণার কারণ কি ছিল? মুসলমানদের উপরে হঠাৎ এ আক্রমণ ও অশোভন উক্তি শুরু হলো কেন? প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই যে বংগতংগে কায়েমী স্বার্থ বিপন্ন ও বেসামাল হয়ে পড়েছিল। যে সংখ্যাধিক্যের কারণে বাংগালী হিন্দুগণ উভয় বাংলার চাকুরী বাকুরী ও জীবন জীবিকার উপর একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছিল, তা বংগভংগের ফলে বিনষ্ট হয়ে গেল। নতুন বাংলায় মুসলমানরা হলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলার পূর্বাঞ্চলের মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর বশ্যতা ও পরাভব থেকে মুক্তি লাভ করলেন এবং তাঁদের মনে এ আশার সঞ্চার হলো যে, এখন স্থানীয় সমস্যাদির উপর তাঁদের কথা বলার অধিকার থাকবে। সমসাময়িক লেখক সরদার আলী খান বলেন, "যত সব হৈ হল্লা এবং হঠাৎ রাতারাতি যে দেশপ্রেমের আন্দোলন শুরু হলো মাতৃভূমি অথবা ভারতের কল্যাণের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। যে প্রদেশে হিন্দুগণ সুস্পষ্ট সংখ্যালঘু সেখানে তাদের শ্রেণীপ্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখা ব্যতীত অন্য কোন মহৎ উদ্দেশ্য এ আন্দোলনের নেই। [৬]
বংগভংগ বিরোধী আন্দোলনে অন্যতম নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি বলেন- বংগভংগের ঘোষণা আকস্মিক বজ্রপাতের ন্যায়। যে ১৬ই অক্টোবর নতুন বাংলার (পূর্ব বাংলা ও আসাম) সূচনা হয়, সেদিন কোলকাতায় হিন্দুগণ জাতীয় শোকদিবস পালন করেন। ঐ দিন তারা কালো ব্যাজ পরিধান করেন, মাথায় ভস্ম মাখেন, পানাহার পরিত্যাগ করে নানারূপ বিক্ষোভ ধ্বনি সহকারে মিছিল করে গঙ্গাস্নান করেন। অপরাহ্নে এক জনসভায় মিলিত হয়ে তাঁরা বংগভংগ রদের শপথ গ্রহণ করেন।
মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ তাঁর 'আমাদের মুক্তি সংগ্রাম' গ্রন্থে বলেন: "যে সময়ের কথা বলা হইতেছে তখন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা একই লেফ্যান্ট গভর্নরের শাসনাধীন ছিল। শাসন কার্যের সুবিধার জন্য পূর্ব বাংলাকে আসামের সহিত সংযুক্ত করিয়া দিয়া একটি নূতন প্রদেশ গঠনের বিষয় ব্রিটিশ সরকার অনেকদিন হইতে চিন্তা করিতেছিলেন। বড়লাট লর্ড কার্জন অবশেষে ভারত সচিবের সহিত পরামর্শ করিয়া বংগ বিভাগের অনুকূলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ হওয়া মাত্রই বাংলার শিক্ষিত হিন্দু সমাজ ইহার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হইয়া উঠে। দূর মফঃস্বলেও বংগভংগের বিরোধিতা করিয়া সভাসমিতিতে প্রস্তাব গৃহীত হইতে থাকে।” [৭]
বংগভংগ বিরোধী আন্দোলন কিভাবে বিস্তৃতি লাভ ও শক্তি সঞ্চয় করে তার উল্লেখ করে ওয়ালিউল্লাহ বলেন- "আন্দোলন শহর হইতে গ্রামে এবং গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে বিস্তৃতি লাভ করিতে থাকে। নেতৃস্থানীয় বিপ্লববাদীরা একটু দূরে থাকিয়া ভাবপ্রবণ ছাত্র সমাজ হইতে সদস্য সংগ্রহ পূর্বক তাহাদের দলের পুষ্টি সাধন করিতে লাগিলেন। ইতিমধ্যে শ্রী অরবিন্দ ঘোষ বরোদা রাজ্যের চাকুরীতে ইস্তাফা দিয়া বাংলায় ফিরিয়া আসেন। বিপ্লবীরা তাঁহার নিকট নতুন প্রেরণা লাভ করে। শ্রী বিপিনচন্দ্র পাল তাঁহার স্বভাবসুলভ ওজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতার সাহায্যে দেশের সর্বত্র বিপ্লবের বীজ ছড়াইতে থাকেন।” [৮]
কতিপয় মুসলমান হিন্দুদের প্রচার ও তথাকথিত দেশপ্রেম আন্দোলনে বিভ্রান্ত হয়ে বংগভংগ বিরোধী আন্দোলনে যোগদান করেন। কিন্তু যখন দেখলেন যে, বালগংগাধর তিলক প্রমুখ হিন্দু নেতৃবৃন্দ শিবাজীকে আন্দোলনের প্রতীক হিসাবে উপস্থাপিত করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুজাতির সুপ্ত ঘৃণা ও বিদ্বেষ জাগ্রত করতে লাগলেন, তখন তাঁরা বংগভংগের সুদূরপ্রসারী মংগল ও তার বিরোধিতার মূল রহস্য উপলব্ধি করে আন্দোলন পরিত্যাগ করেন। এ প্রসংগে আবদুল মওদূদ তাঁর "মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ: সংস্কৃতির রূপান্তর” গ্রন্থে বলেন- "কিন্তু এই বংগভংগ বিভাগকে কেন্দ্র করে শিক্ষিত বর্ণহিন্দু সম্প্রদায় যে তুমুল আন্দোলন করে, তার প্রতিধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল ব্রিটেনের সংবাদপত্রগুলি ও বেতনভুক সাংবাদিকরা। নিজস্ব সংবাদদাতার পত্র ও ডিসপ্যাচসমূহে যেসব পরস্পর বিরোধী সংবাদ পরিবেশিত হতে লাগলো 'দি টাইমস' ও 'মানচেস্টার গার্জেনে' তাতে ব্রিটিশ জনমত বিভ্রান্ত হ'য়ে পড়লো সঠিক পরিস্থিতি অনুধাবন করতে অসমর্থ হয়ে। টাইমস পত্রিকায় বংগভংগকে সমর্থন করে ও কার্জনের কার্যাবলীকে পূর্ণ অনুমোদন জানিয়ে সুন্দর সুন্দর সম্পাদকীয় প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়; মানচেস্টার গার্জেনে বিভাগকে নিন্দা করে গরম গরম প্রবন্ধ বের হ'তে থাকে, নিজস্ব সংবাদদাতার লোমহর্ষক বিবরণ প্রকাশিত হতে থাকে আন্দোলন সম্পর্কে ও বিক্ষোভকে সমর্থন জানিয়ে। কটন, নেভিন্সন্ ও হার্ডি বিক্ষোভকে সমর্থন করে বিবৃতি প্রচার করতে থাকেন। নেভিন্সন্ ছিলেন মানচেস্টার গার্জেনের কলকাতাস্থ রিপোর্টার ও কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ লোক। তিনি বিলেতে এক কৌতুকপ্রদ সংবাদ পরিবেশন করেন: 'জাতীয় অন্যায়ের বার্ষিকী পালনটা ভারতের 'ভষ্মবধূবারে' পরিণত হয়েছে। ঐদিন সহস্র সহস্র ভারতীয় কপালো ভখের তিলক ধারণ করে। প্রভাতে তারা ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে নীরবে গংগাস্নান করে ও উপবাস করে। গ্রামে, শহরে, বাজারে সব দোকানপাট বন্ধ করে, স্ত্রীলোকেরা রান্না করে না ও অলংকার প্রসাধন ত্যাগ করে। পুরুষগণ পরস্পর হাতে হলদে সুতার রাখীবন্দ করে লজ্জার এ দিনটিকে স্মরণীয় করার উদ্দেশ্যে এবং সারাদিনটি প্রায়শ্চিত্তে, শোক পালনে ও উপবাসে কাটায়। [৯]
জনৈক ব্যারিস্টার আবদুর রসূল ও কতিপয় মুসলমান ব্যক্তিগত স্বার্থে এ আন্দোলনে যোগদান করেন। সেটাকে ফলাও করে বলা হয়, বংগভংগ বিরোধী আন্দোলনে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই শরীক ছিল। এ সম্পর্কে আবদুল মওদূদের প্রকাশিত তথ্যটি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন: "মিঃ রসূল ১২৫ টাকা, নোয়াখালীর লিয়াকত হোসেন ৬০ টাকা, ও মাদারীপুরের জনৈক দিলওয়ার আহমদ ৪০ টাকা মাসিক ভাতায় কংগ্রেস কর্তৃক মুসলমানদের নিকট আন্দোলন প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন, সমসাময়িক পুলিশ রিপোর্টে দেখা যায়। রিপোর্টে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল: Mr. Rasul is a Muslim Leader of the Hindus (মিঃ রসূল হিন্দুদের মুসলমান নেতা)। [১০]
মজার ব্যাপার এই যে, ১৯০৭ সালের শেষের দিকে মিঃ হার্ডি এ দেশে আসেন আন্দোলন দেখার জন্যে। তিনি বাংলায় পৌঁছলে 'অমৃত বাজার' পত্রিকা প্রচার করে, "লোকে তাঁকে দেখে আনন্দে উন্মত্ত হয়েছে। এবং ঈশ্বর তাঁকে হিন্দুর বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র ফাঁস করতে প্রেরণ করেছেন।”
এভাবে হিন্দুদের নিকটে 'ঈশ্বর প্রদত্ত দেবতা' হার্ডি তাদের অসীম শ্রদ্ধা ও গরম গরম সম্বর্ধনা লাভ করে দেশে ফিরে গিয়ে বলেন- হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায় বংগভংগ বিভাগের তীব্র বিরোধী। সিরাজগঞ্জে তিনি মুসলমানদের মুখে 'বন্দেমাতরম' গান শুনেছেন, বরিশালে হিন্দু মুসলমান উভয়ে তাঁকে এ গান শুনিয়েছে, ইত্যাদি। কিন্তু ইংলিশম্যান পত্রিকার সম্পাদক তাঁকে দু'একজন মুসলমানের নাম করতে বললে তিনি বলেন, এটা অত্যন্ত গোপনীয়। তাঁর দুর্ভাগ্যই বলতে হবে যে আবদুর রসূলের নামটাও হয়তো তার জানা ছিল না। টাইম্‌স্ পত্রিকা তাঁকে তীব্র ভৎসনা করে ও অন্যান্য সংবাদপত্রে তাঁকে 'মূর্খ', 'হাস্যাস্পদ', 'বিদূষক ও পাগল' উপাধিতে ভূষিত করে। [১১]
বিভাগ বিরোধী আন্দোলনে মুসলমানদের যে সমর্থন ছিল না তার জ্বলন্ত প্রমাণ ঢাকার খাজা সলিমুল্লাহ ও মুসলিম বাংলার তৎকালীন উদীয়মান নেতা এবং পরবর্তীকালের শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বক্তৃতা বিবৃতি। বংগভংগ রদ ঠেকাবার বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে খাজা সলিমুল্লাহ অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং ১৯১২ সালের মার্চ মাসে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি যে উক্তি করেন তাতে বাংলার মুসলমানদের অসন্তোষ বিক্ষোভই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তিনি বলেন যে, বংগভংগ রদের ফলে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মনে চরম আঘাত লেগেছে এবং তাদের ঘরে ঘরে বিষাদের সঞ্চার হয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, বংগভংগের ফলে অনুন্নত পূর্ব বাংলা ও আসামের অবহেলিত অধিবাসীগণ যে সুযোগ পেয়েছিল, এবং বিশেষ করে মুসলমানদের উন্নতির যে সুযোগ তা সহ্য করতে না পেরে বিভাগ বিরোধীরা বংগভংগ বানচাল করার জন্যে রাজদ্রোহিতা মূলক ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে। এতে করে, তিনি বলেন, ব্রিটিশ সরকার এ আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছেন। নবাব সলিমুল্লাহ ব্রিটিশ সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "এতদিন সমগ্র প্রাচ্যে মনে করা হতো যে যাই ঘটুক না কেন ব্রিটিশ সরকার কখনো প্রতিশ্রুতি ভংগ করেন না। যদি কোন কারণে এ বিশ্বাস খর্ব হয়, তাহলে ভারতে ও প্রাচ্যে ব্রিটিশের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে।” [১২]
নবাব সলিমুল্লাহ উক্ত অধিবেশনে আরও বলেন:
"বাংলা বিভাগে আমরা তেমন বেশী কিছু লাভ করিনি। কিন্তু তবুও তা আমাদের দেশবাসী অন্য সম্প্রদায়ের সহ্য হলো না বলে তারা তা আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে আকাশ-পাতাল আলোড়ন সৃষ্টি করলো। খুন খারাবি ও ডাকাতির মাধ্যমে তারা প্রতিশোধ নেয়া শুরু করলো। তারা বিলেতী দ্রব্যাদি বর্জন করলো। এ সবকিছুই সরকারের কাছে অর্থহীন ছিল। মুসলমানরা এসব অপরাধ যজ্ঞে শরীক না হয়ে সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে। মুসলিম কৃষক সম্প্রদায় এ বিভাগে লাভবান হয়েছিল। তাদের হিন্দু জমিদারগণ তাদেরকে বিরোধিতার সংগ্রামে টেনে আনবার চেষ্টা করে। এতে তারা কর্ণপাত করেনি।
এতে হিন্দু মুসলিম সংঘর্ষ বাধে। সরকার দমননীতি অবলম্বন করেন। তাতেই লাভ হয়নি। একদিকে ছিল ধনশালী বিক্ষুব্ধ সম্প্রদায়। অপরদিকে ছিল দরিদ্রমুসলমান- যারা সরকারের পক্ষ অবলম্বন করে। এভাবে চলে বছরের পর বছর। হঠাৎ সরকার বংগভংগ রদ করে দেন প্রশাসনিক কারণে। এর আগে আমাদের সাথে কোন পরামর্শও করা হয়নি। আমরা সব কিছু নীরবে সহ্য করেছি।” অতঃপর সরকার দিল্লী দরবারে তাঁকে যে জি সি আই ই উপাধিতে ভূষিত করেন, তার জন্যে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে এ উপাধিকে ঘুষ ও তাঁর গলায় অপমানের বন্ধন বলে গণ্য করেন। [১৩]
পরবর্তীকালে মওলানা মুহাম্মদ আলী বলেন: পূর্ব বাংলার মুসলমানদেরকে তাদের শাসকদের যুদ্ধে নামানো হ'য়েছিল... এবং যখন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আর সুবিধাজনক রইলো না, তখন তারা সন্ধি করে বসলো সুবিধাজনক গতিতে।
ইতিহাসের এর চেয়ে ঘৃণ্যতর কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না যে, আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ সদ্যলব্ধ অধিকারসমূহ কেড়ে নেওয়া হলো এবং সন্তোষ প্রকাশকে চরম অপরাধ গণ্য করে শাস্তি দেয়া হলো। [১৪]
বংগভংগের ফলে পূর্ববাংলার হতভাগ্য মুসলমানদের সুযোগ সুবিধার আশার আলোক দেখা দিয়েছিল। বংগভংগ রদ করে তা নস্যাৎ করার যে তীব্র আন্দোলন শুরু করেছিল হিন্দুবাংলা, তাতে দূরদর্শী মুসলিম রাজনীতিবিদগণ আতংকিত হয়ে পড়লেন। হিন্দুদের চক্রান্ত উন্মোচন করে বাংলা তথা ভারতের মুসলিম স্বার্থ সমুন্নত করার জন্যে ভারতের সকল মুসলমান চিন্তাশীল ও রাজনীতিবিদগণ চেষ্টা করতে লাগলেন। ১৯০৬ সালে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকা শহরে নিখিলভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন নাম দিয়ে এক সম্মেলন আহবান করেন। মুসলমানদের সংকট মুহূর্তে এমন সম্মেলনের প্রয়োজনীয়তা সকলে উপলব্ধি করলেন এবং ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে আট হাজার প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগদান করেন।
তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মুহসিনুল মুল্ক, ভিখারুল মূল্ক, আগা খান, হাকিম আজমল খান ও মওলানা মুহাম্মদ আলী। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ভারতীয় মুসলমানদের জন্যে একটি পৃথক রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত এবং 'মুসলিম লীগ' নামে একটি পৃথক দল গঠিত হয়। কারণ বিভাগ বিরোধী আন্দোলনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কাজে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে যে এ দলটির লক্ষ্য শুধু হিন্দুস্বার্থ সংরক্ষণ ও মুসলিম স্বার্থ দলন। বিভাগকে বানচাল করার জন্যে নানান অপকৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল।
কোলকাতায় বর্ণহিন্দুদের ঘনো ঘনো বৈঠকে আলোচনার পর ঘোষণা করা হয়, 'ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বাঙালী জাতিকে নির্মূল করার জন্যে বংগমাতাকে দ্বিখন্ডিত করেছে, বাঙালী কৃষককূলকে আসামের চা বাগানে কুলিমজুর হিসাবে নিয়োগ করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। অতএব হে বাঙালী জাতি! 'বংগভংগ রদকে' বাঙালীর 'মুক্তি সনদ' হিসেবে গ্রহণ করে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়। যারা 'মুক্তি সনদে' বিশ্বাসী নয় তারা বাঙালী নয়, বিশ্বাসঘাতক ও ইংরেজের দালাল। মুসলিম লীগ অধিবেশনে নবাব সলিমুল্লাহর উপর অর্পিত হলো বাংলার মুসলমানদেরকে হিন্দুদের উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত 'মুক্তিসনদ' আন্দোলন থেকে দূরে রাখার দায়িত্ব। ফলে বর্ণহিন্দুদের সমস্ত আক্রোশ গিয়ে পড়লো খাজা সলিমুল্লাহর উপর। শুরু হলো ফ্যাসিবাদী ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ। খাজা সাহেব বরিশাল ভ্রমণ করলে তাঁকে কালো পতাকা দেখানো হয়, তাঁকে ইংরেজের দালাল, 'বাংলার দুশমন' বলে গালি দেয়া হয়।
কুমিল্লার জনসভায় তাঁকে আক্রমণ করা হয়। তাঁকে নিয়ে হোসামিয়া মাদ্রাসার ছাত্রশিক্ষক ও মুসলিম জনগণ শোভাযাত্রা করা কালে যোগীরাম পাল নামক জনৈক হিন্দু কর্তৃক একটি দোতলার বারান্দা থেকে একটি ঝাড়ু দেখিয়ে দেখিয়ে অপমান করা হয়। রাজগঞ্জের রাস্তা অতিক্রমকালে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলী ছোড়া হয়। তিনি প্রাণে রক্ষা পেলেও সাঈদ নামে জনৈক যুবক প্রাণ হারায়। বাংলার সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন বাহ্যতঃ ইংরেজদের বিরুদ্ধে হলেও এর দ্বারা 'এক ঢিলে দুই পাখী' মারার লক্ষ্যই আন্দোলনকারীদের ছিল। অর্থাৎ মুসলমানদেরকে ইংরেজদের দালাল হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের নির্মূল করা এবং ইংরেজদের কে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া।
১৯০৮ সালে ৩০শে মে কোলকাতার যুগান্তর পত্রিকা হিন্দুদের প্রতি এক উদাত্ত আহবান জানিয়ে বংগমাতার খন্ডনকারীদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। বলা হয়, "মা জননী পিপাসার্ত হয়ে নিজ সন্তানদেরকে জিজ্ঞেস করছে, একমাত্র কোন্ বস্তু তার পিপাসা নিবারণ করতে পারে। মানুষের রক্ত এবং ছিন্ন মস্তক ব্যতিত অন্য কিছুই তাকে শান্ত করতে পারে না। অতএব জননীর সন্তানদের উচিত মায়ের পূজা করা এবং তার ইপ্সিত বস্তু দিয়ে সন্তুষ্টি বিধান করা। এসব হাসিল করতে যদি নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে হয়, তবুও পশ্চাৎপদ হওয়া উচিত হবে না। যেদিন গ্রামে গ্রামে এমনিভাবে মায়ের পূজা করা হবে, সেদিনই ভারতবাসী স্বর্গীয় শক্তি ও আশীর্বাদে অভিষিক্ত হবে।” [১৫]
বংগমাতাকে খুশী করার জন্যে যে উদাত্ত আহবান জানানো হলো, তার পর শুরু হলো হিংসাত্মক কার্যকলাপ ও রক্তের হোলিখেলা।
মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ তাঁর 'আমাদের মুক্তি সংগ্রাম' গ্রন্থে বলেন, "কলিকাতা এবং ঢাকাকে কেন্দ্র করিয়াই প্রধানতঃ বিপ্লব আন্দোলন গড়িয়া উঠিয়াছিল। কলিকাতার বিপ্লববাদীরা 'যুগান্তর' এবং ঢাকার বিপ্লববাদীরা 'অনুশীলন' নাম দিয়া তাহাদের সমিতি গঠন করেন। সাধারণতঃ এই দুইটি সমিতির সদস্যগণই বোমা তৈরী ও আগ্নেয়াস্ত্র আমদানীর ব্যবস্থা করিতেন। ইহার পর অন্যান্য নামেও মফঃস্বলের কোন কোন স্থানে গুপ্ত সমিতি গঠিত হইয়াছিল।” [১৬]
স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি বংগভংগের তীব্র নিন্দা করে বলেন, বাংলাদেশ বিভক্ত করে হিন্দুদেরকে অপমান ও অপদস্ত করা হয়েছে। বংগভংগের প্রতিবাদে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট স্বদেশী আন্দোলন শুরু করে। বিলাতী দ্রব্য বর্জন করা হয় এবং আগুন লাগানো হয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ শিক্ষাংগন পরিত্যাগ করে। বালগংগাধর তিলক বংগভংগের বিরুদ্ধে হিন্দু জাতীয়তা জাগ্রত ও সুসংহত করার জন্যে মারাঠা নায়ক শিবাজীকে ভারতের সকল হিন্দুদের জাতীয় বীরের আসনে প্রতিষ্ঠার আয়োজন করেন। দেশের সর্বত্র শিবাজীর জন্মবার্ষিকী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিপালিত হয়। সভায় সভায় কংগ্রেসের নেতাগণ মুসলমান সম্রাটের বিরুদ্ধে শিবাজীর সংগ্রামের প্রশংসা করতে থাকেন। শিবাজীকে হিন্দুদের জাতীয় বীর ও তাঁর সংগ্রামকে জাতীয় সংগ্রাম বলে অভিহিত করেন। এ সময় বাংলাদেশের হিন্দুদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদী সংস্থা গড়ে উঠে। উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মচারীদেরকে হত্যা করে বংগভংগ রদ করাই ছিল এসবের উদ্দেশ্য। [১৭]
বংগভংগের পর হিন্দুবাংলা মুসলমানদের প্রতি এতখানি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে যে সংবাদপত্রে এবং জনসভায় মুসলমানদের প্রতি নানারূপ অসম্মানকর ও বিদ্রূপাত্মক বিশ্লেষণ প্রয়োগ করা হতে থাকে। মুসলমানদের অতীত বর্বরতার বিবরণসহ কল্পিত ইতিহাস লিখিত হয়। সাইয়েদ আহমদ খানকে দেশদ্রোহী এবং মুসলমানদেরকে ইংরেজের দালালরূপে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিদিন সংবাদপত্রে এ ধরনের সংবাদ পরিবেশ করা হয় যে, সরকার হিন্দুদের উপর আক্রমণ চালাতে মুসলমানদেরকে উত্তেজিত করছেন এবং তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে উপেক্ষা প্রদর্শন করছেন। আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার জন্যে হিন্দুদেরকে আহবান জানানো হয়। একটি সংবাদপত্র এতদূর পর্যন্ত বলে যে মুসলিম গুন্ডাদেরকে এবং তাদের সাহায্যকারী সরকারী কর্মচারীদেরকে জীবন্ত দগ্ধীভূত করলেও হিন্দু সমাজের প্রতিশোধ গ্রহণ যথেষ্ট হবে না। [১৮]
মিঃ এন সি চৌধুরী বলেন, বংগভংগ হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক চিরদিনের জন্যে বিনষ্ট করে দেয় এবং বন্ধুত্বের পরিবর্তে আমাদের মনে তাদের জন্যে ঘৃণার উদ্রেক করে। রাস্তাঘাটে, স্কুলে, বাজারে সর্বত্র এ ঘৃণার ভাব পরিস্ফুট হয়। স্কুলে হিন্দু ছেলেরা মুসলমানদের নিকটে বসতে ঘৃণা প্রকাশ করে এই বলে যে তাদের মুখ থেকে পিয়াজের গন্ধ বেরুচ্ছে। মিঃ চৌধুরী বলেন যে, তিনি স্কুলে গিয়ে এ আচরণ স্বচক্ষে দেখেছেন। ফলে ক্লাশে হিন্দু ও মুসলমানদের পৃথক পৃথক আসনের ব্যবস্থা করা হয়। তিনি আরও বলেন, "আমরা লেখাপড়া শিখবার আগেই আমাদেরকে বলা হতো যে এককালে মুসলমানরা এ দেশ শাসন করতে গিয়ে আমাদের উপর অত্যাচার করেছে। এক হাতে কোরআন এবং অন্য হাতে তরবারী নিয়ে এ দেশে তারা ইসলাম জারী করেছে। মুসলমান শাসকগণ আমাদের নারী হরণ করেছে, মন্দির ধ্বংস করেছে, আমাদের ধর্মীয় স্থানসমূহ অপবিত্র করেছে। অতএব বংগভংগই মুসলমানদের প্রতি হিন্দুদের ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করেনি। এ ছিল বহু পূর্ব থেকেই। বংগভংগ তা বর্ধিত করেছে মাত্র। [১৯]
বংগভংগ রদ করার জন্যে উভয় বাংলার হিন্দু মুসলমান ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়েছে বলে বিকৃত, কাল্পনিক ও উদ্ভট ইতিহাস পরিবেশন করে পরবর্তী বংশধরগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। এ কথাও বলা হয় যে, এক খাজা সলিমুল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন বাংগালী মুসলমান বংগভংগ মেনে নেয়নি। এ প্রকৃত সত্যের অপলাপ ব্যতীত কিছু নয়। উপরের আলোচনায় এ কথা সুস্পষ্ট হয়েছে যে, বংগভংগের ফলে অবহেলিত মুসলমান সমাজের আশা-আকাংখা প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল বলে হিন্দুবাংলা নিছক হিংসা পরবশ হয়ে বিভাগ বিরোধী আন্দোলন শুরু করে। তাদের বক্তৃতা বিবৃতি, তাদের আচরণ, মারাঠা নেতা শিবাজীকে দৃশ্যপটে টেনে এনে হিন্দু জাতীয়তা জাগ্রত করার প্রচেষ্টা ইত্যাদি হিন্দু মুসলিম ঐক্য ও মিলনকে নস্যাৎ করে দিয়েছে, চারদিকে দাংগা হাংগামা শুরু হয়েছে, মুসলমানদের উপর নির্যাতন শুরু হয়েছে। এতসবের পর হিন্দু মুসলমান ঐক্যবদ্ধ হয়ে বংগভংগ রদ করেছে এ কথা বলা মস্তিষ্ক বিকৃতিরই পরিচায়ক অথবা দুরভিসন্ধিমূলক সন্দেহ নেই。
উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বংগভংগের ফলে বাংলায় যে সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি করেছিল বাংলার হিন্দুগণ, যার প্রতি মুসলমানদের কোন সমর্থন ছিল না, বরঞ্চ মুসলমানদের জীবন ও ধনসম্পদ বিপন্ন হয়েছিল, সে সন্ত্রাসবাদ থেকে আত্মরক্ষার জন্যে এবং সে সংকটসন্ধিক্ষণে মুসলমানদের কর্তব্য নির্ধারণের জন্যে ১৯০৬ সালে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন আহত হয়। এ সম্মেলন সাফল্যমন্ডিত করার পিছনে বাংলার মুসলমানদের তৎকালীন উদীয়মান নেতা আবুল কাসেম ফজলুল হকের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশী। উক্ত সম্মেলনের জন্যে যে প্রস্তুতি কমিটি গঠিত হয় তার যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন এ, কে, ফজলুল হক ও ভিখারুল মুল্ক। সম্মেলনকে জয়যুক্ত করার জন্যে ৩৩ বৎসর বয়স্ক যুবক এ, কে, ফজলুল হক প্রভূত উৎসাহ উদ্যমসহ সারা ভারত সফর করেন যার ফলে সম্মেলনে ৮০০০ প্রতিনিধি যোগদান করেন। এ সম্মেলনেই বাংলা তথা সারা ভারতের মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে এবং জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
বলতে গেলে বংগভংগের ফলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে হিন্দু বিদ্বেষ, ক্রোধ ও প্রতিহিংসার বহ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল, তাই মুসলিম লীগের জন্ম দিয়েছিল। ফজলুলহক তারপর কোন রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে পারেন নি। কারণ ১৯০৬ সালেই তিনি ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন এবং ১৯১১ সাল পর্যন্ত সরকারী চাকুরী করেন। ১৯১১ সালে চাকুরী ইস্তফা দেয়ার পর খাজা সলিমুল্লাহর পরামর্শক্রমেই তিনি কোলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৯১৩ সালে বংগীয় ব্যবস্থাপক সভায় সদস্য নির্বাচিত হন। ঢাকা বিভাগ নির্বাচনী এলাকা থেকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রায় বাহাদুর কুমার মহেন্দ্র মিত্রকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে জয়যুক্ত হন। অতঃপর ব্যবস্থাপক সভার প্রথম বাজেট অধিবেশনে তাঁর প্রথম বক্তৃতায় বিভাগ রদের তীব্র সমালোচনা করেন।
একথা অনস্বীকার্য যে এ কে ফজলুল হককে বাদ দিয়ে বাংলার মুসলমান বলে আর কিছু চিন্তা করা যায় না। অতএব তিনি যখন বংগভংগের সপক্ষে ছিলেন এবং বংগতংগ রদের বিরুদ্ধে বংগীয় ব্যবস্থাপক সভায় প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন, তখন এ কথা অবিশ্বাস্য, হাস্যকর ও চিন্তার অতীত যে হিন্দু মুসলমান ঐক্যবদ্ধ হয়ে বংগভংগ রদ আন্দোলন পরিচালনা করে।
বংগীয় ব্যবস্থাপক সভায় এ কে ফজলুল হক সাহেবের বক্তৃতায় এ কথা অধিকতর সুস্পষ্ট হয় যে বংগভংগ রদ ছিল মুসলমানদের স্বার্থের পরিপন্থী এবং এর দ্বারা তাদের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করা হয়। ১৯১৩ সালে ৪ঠা এপ্রিল, বংগীয় ব্যবস্থাপক সভার ১৯১৩-১৪ সালের বাজেট অধিবেশনে বাংলার মুসলমানদের জনপ্রিয় নেতা জনাব এ কে ফজলুল হক তাঁর প্রথম বক্তৃতায় বলেন,
"I would only remind the officials that they are in honour bound to render adequate compensations to the Muslim Community for all the grievous wrong inflicted on them by the unceremonious annulment of the partition. Our share we claim as our indevisible right, and the excess we claim by way of compensation for the wrong done to us by the annulment of the partition. This is the view of the general Muslim public, and if the officials will not meet the demands in full, there is certain to be discontent in the community." [২০]
—আমি সরকারী কর্মচারীদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, লৌকিকতাহীনভাবে বংগভংগ রদ করে তাঁরা মুসলিম সমাজের প্রতি যে মর্মান্তিক অত্যাচার করেছেন, তার যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে তাঁরা নীতিগতভাবে বাধ্য। অখন্ডনীয় অধিকার হিসাবে আমরা আমাদের অংশ দাবী করছি এবং ক্ষতিপূরণ হিসাবে অতিরিক্ত দাবী আমরা এ জন্যে করছি যে বিভাগ রদ করে আমাদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। এ দাবী হচ্ছে মুসলিম জনসাধারণের এবং এ দাবী পূরণ করা না হলে মুসলিম সমাজের বিক্ষুব্ধ হওয়া সুনিশ্চিত।”
বাঙালী মুসলমানদের নেতা জনাব ফজলুল হকের উপরোক্ত বাজেট বক্তৃতায় বাংলার মুসলমান জনগণের অন্তরের কথাই ব্যক্ত করা হয়েছে। বংগভংগ রদ করে মুসলমানদের প্রতি যে চরম অন্যায় করা হয়েছিল এবং এতদ্বারা মুসলমানগণ যে মর্মাহত ও বিক্ষুব্ধ হয়েছিল, সে বিক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল হক সাহেবের উপরোক্ত বক্তৃতায়। এর পর কি করে বলা যেতে পারে যে বংগভংগ ছিল মুসলমানদের কাছে অবাঞ্ছিত? এবং বংগভংগ রদের জন্যে তারা এমন শ্রেণীর সাথে হাত মিলিয়েছিল যাদের মুসলিম বিদ্বেষ এবং মুসলিম দলন নীতি ও কর্মসূচী বাংলা তথা সারা ভারতে দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে পড়েছিল?

টিকাঃ
১. C. Y. Chintamoni Indian Politics Since the Mutiny, p. 81, Andhara University, Waltar-1937; A Hamid Muslim Separatism in India, p. 29
২. A Hamid Muslim Separatism in India, pp. 45, 48
৩. A. R. Mallick Partition of Bengal, p. 1-2; এম এ রহিম: বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, পৃঃ ২০১
৪. A Hamid: Muslim Separatism in India, pp. 51-52
৫. Fuller Some Personal Experiences- p. 126; A Hamid Muslim Separatism in India, p. 53
৬. Sarder Ali Khan India of Today, p-62, Bombay, Times Press, 1908
৭. আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, পৃঃ ১৭৭
৮. আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, পৃঃ ১৭৯
৯. The New Spirit of India, pp. 167-70
১০. আবদুল মওদূদ, মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ: সংস্কৃতির রূপান্তর, পৃঃ ২৮২
১১. আবদুল মওদূদ: ঐ পৃঃ ২৮২-৮৩
১২. ডাঃ এম এ রহিম: বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, পৃঃ ২০৯-১০, A Hamid Muslim Separatism in India, pp. 94-95
১৩. A Hamid Muslim Separatism in India, p. 92; আহমদ: রুহে রওশন মুস্তাক্কেল, পৃঃ ৫৮-৫৯
১৪. Iqbal Select Writings and Speeches, p. 262
১৫. বংগভংগের ইতিকথা, ইবনে রায়হান, পৃঃ ৬-৭
১৬. মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ: আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, পৃঃ ১৮০
১৭. এম এ রহিমঃ বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, পৃঃ ২০৫-৬; সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি: নেশন্ ইন্ মেকিং, ১৮; এ হামিদ: মুসলিম সেপারেটিজম্ ইন্ ইন্ডিয়া, ৫৭, ৬৯-৭০
১৮. Khan, India of Today, p. 87; A Hamid Muslim Separatism in India, p. 61
১৯. N. C. Chowdhury: The Auto-biography of an Unknown Indian pp. 227, 230; Zuberi TAZKIRA WADAR, p. 169-70; A Hamid : Muslim Separatism in India, pp. 61-62
২০. Budget Speech of Mr. A. K. Fazlul Huq. Bengal Legislative Council, dated 4th April, 1913 Bangladesh Historical Studies-Journal of the Bangladesh Itihash Samiti, vol 1, 1976, p. 148

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00