📄 ইলিয়াস শাহী বংশের পুনরুত্থান
উপরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গণেশ ইলিয়াস শাহী বংশের দু'জন সুলতানকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন। গণেশ পৌত্র শামসুদ্দীন আহমদ শাহকে হত্যা করে পুনরায় ইলিয়াস শাহী বংশ বাংলার মসনদে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়।
নাসীর উদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৪৪২-৫৯ খৃঃ)
রুকন উদ্দীন বাররাক শাহ (১৪৫৯-৭৪ খৃঃ)
শামসুদ্দীন ইউসূফ শাহ (১৪৭৪-৮২ খৃঃ)
দ্বিতীয় সিকান্দর শাহ (১৪৮২ খৃঃ)
জালালউদ্দীন ফতেহ শাহ (১৪৮২-৮৬ খৃঃ)
📄 বাংলার মসনদে হাবশী সুলতান
কিছুকাল যাবত আবিসিনিয়াবাসীগণ বাংলায় আগমন করতে থাকে। বাররাক শাহ ও ইউসূফ শাহ তাঁদেরকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন। এদের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ফতেহ শাহ তাঁদেরকে দমন করার চেষ্টা করলে তিনি নিহত হন এবং জনৈক হাবশী সুলতান শাহজাদা বাররাক নামে সিংহাসনে আরোহণ করেন।
সুলতান শাহজাদা বাররাক (১৪৮৬-৮৭ খৃঃ)
সাইফুদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৪৮৭-৯০ খৃঃ)
নাসীরুদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৪৯০-৯১ খৃঃ)
শামসুদ্দীন মুজাফফর শাহ (১৪৯১-৯৩ খৃঃ)
আলাউদ্দীন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯ খৃঃ)
উপরে বর্ণিত চতুর্থ হাবশী সুলতান শামসুদ্দীন মুজাফফর শাহ, হোসেন নামে এক অজ্ঞাত কুলশীল ব্যক্তিকে তাঁর সরকারের অধীনে চাকুরীতে নিযুক্ত করেন। ক্রমশঃ তাঁর পদোন্নতি হতে থাকে এবং অবশেষে মুজাফফর শাহের প্রধানমন্ত্রীর পদে তিনি বরিত হন। পরবর্তীকালে নানান ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হোসেন আপন প্রভুকে নিহত করে বাংলার সিংহাসন অধিকার করেন। তিনি বাংলার ইতিহাসে আলাউদ্দীন হোসেন শাহ শরীফ মক্কী নামে পরিচিত। পরে তিনি 'খলিফাতুল্লাহ' উপাধিও ধারণ করেন।
📄 হোসেন শাহ
ইতিহাসের এক অতি বিস্ময় এ হোসেন শাহ। তাঁর পঞ্চমুখ প্রশংসায় বিরাট বিরাট গ্রন্থ লিখিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান কালে ইতিহাসের অনুসন্ধিৎসু ছাত্রের মনে তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন জাগে। সেসব জবাব ইতিহাস থেকে খুঁজে বের করতে হবে।
মওলানা আকরাম খাঁ তাঁর 'মুসলেম বংগের সামাজিক ইতিহাস' গ্রন্থে হোসেন শাহের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন- "সুলতান হোসেন শাহ নামে পরিচিত এই ভদ্রলোকটির জাতি, ধর্ম, পূর্বাসন এবং তাঁহার উপাধি সম্বন্ধে কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বহু অনুসন্ধান সত্ত্বেও আমরা এ পর্যন্ত খুঁজিয়া পাই নাই।”
প্রকৃতপক্ষে তাঁর সম্পর্কে কিছু ইতিহাস, কিছু কিংবদন্তী এবং কিছু অলীক কাহিনীর জগাখিঁচুড়ি তৈরী হয়ে আছে।
স্যার যদুনাথ সরকার তাঁর 'দি হিষ্ট্রী অব বেঙল'-এ বলেন- "প্রায় সব ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁকে একজন আরব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি তাঁর পিতাসহ বাংলায় এসে বসবাস করতে থাকেন। তাঁর প্রথম জীবনের ঘটনাবলী বহু লোককাহিনী ও উপাখ্যানের বিষয়বস্তু হয়ে পড়েছে। তার অধিকাংশের ঘটনাকেন্দ্র হচ্ছে মুর্শিদাবাদ জেলার জংগীপুর মহকুমার একটি গ্রাম যাকে বলা হয়—‘একআনি চাঁদপাড়া’। বেশ কিছু প্রাচীন ভগ্নাবশেষ আছে এ গ্রামে। জনশ্রুতি ও শিলালিপি অনুযায়ী এগুলোকে হোসেন শাহের আমলের বলা হয়ে থাকে।” (উক্ত গ্রন্থ, ২য় খন্ড ১৪২-৪৩)
তাঁর সম্পর্কে আরও প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, সাইয়েদ আশরাফ তাঁর দুই পুত্রসহ গৌড় যাবার কালে চাঁদপাড়া নামে একটি রাঢ় গ্রামে স্থানীয় মুসলমান কাজীর গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করেন। কাজী অতিথির বংশ পরিচয় জানতে পেরে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র হোসেনের সাথে আপন কন্যার বিয়ে দেন। অতঃপর বিদ্যাশিক্ষা করার পর হোসেন গৌড়ে হাবশী সুলতান মুজাফফর শাহের অধীনে একটি সামান্য চাকুরী গ্রহণ করেন। এ ধরনের কাহিনী সলিম লিপিবদ্ধ করেন একটি বেনামী পুস্তিকার বরাত দিয়ে।
এ ধরনের গল্পও তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত আছে যে, বাল্যকালে হোসেন একজন স্থানীয় ব্রাহ্মণের অধীনে রাখালের চাকুরী করতেন। এ বালক ভবিষ্যতে এক বিরাট ব্যক্তি হবে এরূপ অলৌকিক লক্ষণ তাঁর মধ্যে দেখতে পেয়ে উক্ত ব্রাহ্মণ তাঁকে গৌড়ে নিয়ে যান।
পরবর্তীকালে হোসেন বাংলার সুলতান হলে সেই ব্রাহ্মণকে মাত্র এক আনা খাজনার বিনিময়ে চাঁদপাড়া গ্রাম দান করেন। এ গল্পটি হুবহু হাসান গাংগু বাহনীর বাল্যজীবনের কাহিনীর অনুরূপ। তবে বিনা বিচারে একে সত্য বলে গ্রহণ করা যেতে পারে না। সামান্য ব্যক্তি থেকে কেউ একটি রাজ্যের মালিক মোখতার হয়ে বসলে তার সম্পর্কে নানান ধরনের আজগুবি কাহিনী তৈরী করা হয়ে থাকে। হোসেন শাহ সম্পর্কেও তা-ই হয়েছিল বলে আমাদের ধারণা।
কোন কোন ঐতিহাসিক বলেন, হোসেনের পিতা সাইয়েদ আশরাফ মক্কার শরীফ ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘকাল তিরমিজে বাস করেন। বুকানন হ্যামিল্টন বলেন, হোসেন রংপুর জেলার অধিবাসী ছিলেন বলেও জনশ্রুতি আছে। গোবিন্দগঞ্জ থেকে ষোল মাইল দূরে অবস্থিত দেবনগর গ্রামে তাঁর জন্ম। কোন কোন ঐতিহাসিক আবার তাঁকে গৌড়ের সুলতান ইব্রাহীম শাহের প্রপৌত্র বলেও উল্লেখ করেছেন। অতএব দেখা যাচ্ছে তাঁর বংশপরিচয় ও জন্মস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যেও যথেষ্ট মতানৈক্য রয়েছে।
ঐতিহাসিকগণের কেউ কেউ বলেন, তিনি শুধু আরবই ছিলেন না, ছিলেন সাইয়েদ বংশীয়। তারপর কিছুটা কল্পনার রং দিয়ে হোসেনের বংশমর্যাদা রঞ্জিত করার চেষ্টা করে বলা হয়েছে যে, তাঁর পিতা সাইয়েদ আশরাফ ছিলেন মক্কার শরীফ। ভাগ্য অন্বেষণের জন্যে তিনি তাঁর দুই পুত্রসহ বাংলায় আগমন করেন।
এখন অতি ন্যায়সংগতভাবেই প্রশ্ন জাগে যে, হোসেনের পিতা মক্কার শরীফ হওয়াতো দূরের কথা, মোটেই আরববাসী ছিলেন কিনা। হোসেনের সাইয়েদ হওয়া কেন, মুলসমান হওয়াটাও সন্দেহমুক্ত নয় বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর আচরণ ও কার্যকলাপই তার সাক্ষ্য দান করে।
প্রথমতঃ তাঁর বংশ পরিচয়ের কথাই ধরা যাক। তাঁর পিতা সাইয়েদ আশরাফ মক্কার অধিবাসী ও শরীফ ছিলেন—এর কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় না। উপরন্তু মক্কার শরীফ তাঁর দুই পুত্রসহ ভাগ্য অন্বেষণের জন্যে বাংলায় আগমন করেন, এ এক অলীক কল্পনা মাত্র। তিনি কি কোন কারণে শরীফের পদমর্যাদা থেকে অপসারিত হয়ে স্থাবর অস্থাবর সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন যার জন্যে তাঁকে বাংলায় আসতে হয়েছিল অন্ন বস্ত্রের অনুসন্ধানে? কেউ কেউ আবার তাঁকে তিরমিজের অধিবাসীও বলেছেন। তাহলে কোন্টাকে সত্য বলে গ্রহণ করা যাবে?
উল্লেখ্য যে, মক্কার শরীফ ছিলেন সেকালে হেজাজের সর্বময় কর্তা, একচ্ছত্র বাদশাহ, বিপুল ঐশ্বর্যের মালিক, অতুলনীয় রাজপ্রাসাদের ভোগদখলকারী। ইতিহাসে এমন কোন তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় না যে, মক্কার কোন শরীফ কোন কালে তাঁর মসনদ ত্যাগ করে ভাগ্যোন্নয়নের জন্যে স্ত্রীপুত্রসহ বাংলায় এসে অপরের আশ্রয়প্রার্থী হয়েছেন। সম্ভবতঃ সুচতুর ও প্রতারক হোসেন নিজকে সাইয়েদ বংশীয় ও শরীফপুত্র বলে পরিচয় দিয়ে মুসলমানদের ভক্তিশ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিলেন।
তারপর মজার ব্যাপার এই যে, সিংহাসন লাভের পর হোসেন চাঁদপাড়া গ্রামের কাজী সাহেবকে (তাঁর শ্বশুর), মতান্তরে তাঁর বাল্যজীবনের প্রভু জনৈক ব্রাহ্মণ ঠাকুরকে মাত্র একআনা রাজস্বের বিনিময়ে গোটা গ্রাম দান করলেন, পরে সে গ্রাম বা মৌজা 'একআনি চাঁদপাড়া' নামে অভিহিত হয়। কিন্তু হতভাগ্য পিতা ও জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার অন্ন সংস্থানের কোন ব্যবস্থা হোসেন করেছেন কিনা, তাঁর বিবরণ ইতিহাসে কোথাও নেই।
তারপর আবার লক্ষ্য করুন, হোসেনের কথিত পিতা সাইয়েদ আশরাফ মুর্শিদাবাদের জংগীপুর মহকুমার চাঁদপুর গ্রামের জনৈক কাজীর বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কাজী সাহেব সাইয়েদ বংশীয় লোক দেখে তাড়াতাড়ি হোসেনকে তাঁর কন্যা দান করে বসেন। আবার একথা সমানভাবে প্রচলিত আছে যে, হোসেন চাঁদপাড়া গ্রামের জনৈক ব্রাহ্মণের অধীনে রাখালের চাকুরী করেন। এ সময়ে একদিন কোন গুরুতর অপরাধে ব্রাহ্মণ তাঁকে বেদম বেত্রাঘাত করেন। আবার কখনো হোসেনকে বলা হচ্ছে রংপুর জেলার দেবনগর গ্রামের অধিবাসী। এসব বিপরীতমুখী বিবরণ থেকে একথাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, হোসেন প্রকৃতপক্ষে ছিলেন অজ্ঞাত কুলশীল। একজন অজ্ঞাত কুলশীলের স্বার্থের খাতিরে সুযোগ বুঝে মুসলমান না হলেও মুসলমান বলে পরিচয় দেয়াটাও আশ্চর্যের কিছু নয়।
মোটকথা ষড়যন্ত্র ও প্রতারণার মাধ্যমে বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর বংশ পরিচয় ও বাল্যজীবন সম্পর্কে নানান কল্পিত কাহিনী রচনা করা হয়। কল্পনাবিলাসী গল্পকারগণ হয়তো হোসেনের কথিত পিতার কোন সমাধি আবিষ্কার করে তৎপার্শ্বে হোসেন কর্তৃক বিরাট মসজিদ ও মাদ্রাসা স্থাপনের উল্লেখ করতে পারতেন, কিন্তু তাঁরা বাংলার পরম পরাক্রমশালী বাদশাহ হোসেনের কাহিনী রচনায় এত মশগুল ছিলেন যে, হতভাগ্য পিতা ও ভ্রাতার কথা তাঁরা বেমালুম ভুলে গেছেন।
কিভাবে হোসেন ক্ষমতা লাভ করেন এবং ক্ষমতা লাভের পর তাঁর কার্যকলাপ কি ছিল তারও বিশদ আলোচনা করে দেখা যাক।
হাবশী শাসক মুজাফফর শাহ হোসেনকে প্রথমতঃ সামান্য চাকুরীতে নিযুক্ত করেন। অতঃপর প্রখর বুদ্ধি বলে হোসেন তাঁর প্রভুকে প্রীত ও সন্তুষ্ট করে অবশেষে প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ লাভ করেন। সুচতুর হোসেন বুঝতে পেরেছিলেন হাবশী শাসকগণ বাংলার লোকের কাছে ছিলেন অনভিপ্রেত। অতএব আপন প্রভুকে সেনাবাহিনী, অমাত্যবর্গ ও জনসাধারণের কাছে অধিকতর অপ্রিয় করে তুলে হোসেন স্বয়ং ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। তিনি তাঁর প্রভু মুজাফ্ফর শাহকে নানাভাবে কুপরামর্শ দিতে থাকেন।
রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন- "সৈয়দ হোসেন শরীফ মক্কী মুজাফ্ফর শাহের উজির ও প্রধান কর্মচারী নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তাঁহার পরামর্শ অনুসারে মুজাফ্ফর শাহ সৈনিকদিগের বেতন হ্রাস করিয়া অর্থ সঞ্চয়ে মনঃসংযোগ করিয়াছিলেন।” (বাংলার ইতিহাস, ২য় খন্ড পৃঃ ১৮৭)।
'রিয়াযুস সালাতীন ও তারিখে ফেরেশতায় বলা হয়েছে যে, হোসেন উজির হওয়ার পর জনসাধারণের সাথে সদ্ব্যবহার করতে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে একথাও বলতে থাকেন যে, মুজাফ্ফর শাহ অত্যন্ত নীচ প্রকৃতির লোক এবং বাদশাহ হওয়ার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। হোসেন শাহের পরামর্শে মুজাফ্ফর শাহ অবাঞ্ছিত কাজ করতেন। ফলে হোসেন তাঁকে জনসাধারণের কাছে দোষী ও হেয় প্রতিপন্ন করার সুযোগ পেতেন। এভাবে তিনি সেনাবাহিনী, আমীর-ওমরা ও জনগণকে মুজাফ্ফর শাহের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে তোলেন। অবশেষে তাঁর নেতৃত্বে এক বিরাট বাহিনী মুজাফ্ফর শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ঐতিহাসিকগণ বলেন, যুদ্ধে উভয়পক্ষের এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য নিহত হয়। সেকালে এতবড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পৃথিবীর অন্য কোথাও হয়েছে বলে জানা যায় না।
যুদ্ধে মুজাফ্ফর শাহ নিহত হন। কেউ বলেন, হোসেন প্রাসাদ রক্ষীকে হাত করার পর প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে স্বহস্তে আপন প্রভুকে হত্যা করেন।
মওলানা আকরাম খাঁ তাঁর 'মুসলেম বংগের সামাজিক ইতিহাস' গ্রন্থে বিশ্বকোষের বরাত দিয়ে বলেন, "সকল শ্রেণীর মুসলমান সামন্ত এবং হিন্দুরাজগণ তাঁহাকেই (সৈয়দ হোসেন) রাজ সিংহাসনের উপযুক্ত পাত্র বিবেচনা করিয়া রাজপদে অভিষিক্ত করেন। তিনিও তাঁহাদের মনোরঞ্জনার্থ নির্দিষ্ট সময়মত গৌড় রাজধানী লুণ্ঠনের আদেশ দেন। ঐ সময়ে গৌড় নগরে অনেক ধনশালী হিন্দু প্রজা সর্বস্বান্ত হইয়াছিলেন।”
মজার ব্যাপার এই যে, হোসেনেরই আদেশে যারা লুন্ঠন করেছিল, তাদেরকে আবার হোসেনের আদেশেই হত্যা করা হয়। এদের সংখ্যা ছিল বার হাজারেরও বেশী। হোসেন তাঁর আপন হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে লক্ষ লক্ষ লোকের রক্তে নিজের হাত রঞ্জিত করেন। হয়তো লুণ্ঠনের আদেশ কিছু সংখ্যক মুসলমান হত্যার বাহানা মাত্র।
এত গণহত্যার পর, যার মধ্যে ছিল সেনাবাহিনীর লোক, আমীর ওমরা, আমাত্যবর্গ, জ্ঞানীগুণী প্রভৃতি, হোসেনের বিরুদ্ধে টু শব্দ করার আর কেউ রইলো না। ফলে তিনি হয়ে পড়েন দেশের সর্বময় কর্তা।
সাইয়েদ হোসেন মক্কী (?) সিংহাসন লাভের পর কোন্ ভূমিকা পালন করেন তা পাঠকগণের কৌতূহল সঞ্চার না করে পারবে না। রাজপদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি তাঁর মন্ত্রীপরিষদ নতুন করে ঢেলে সাজালেন। তাঁর উজির ও প্রধান কর্মকর্তা হলেন— গোপীনাথ বসু ওরফে পুরন্দর খান, রাজ চিকিৎসক মুকুন্দ দাস, প্রধান দেহরক্ষী কেশব ছত্রী, টাকশাল প্রধান অনুপ। নানা শাস্ত্র বিশারদ ও বৈষ্ণব চূড়ামনী শ্রীরূপ ও সনাতনও তাঁর মন্ত্রী হলেন। স্যার যদুনাথ সরকার বৈষ্ণব লেখকদের বরাত দিয়ে বলেন যে, শ্রীচৈতন্য যে অবতার ছিলেন, হোসেন শাহ তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। চৈতন্য গৌড় নগরে আগমন করলে হোসেন তাঁর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং রাজকর্মচারীগণের প্রতি ফরমান জারী করেন যেন প্রভু চৈতন্যকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় ও তাঁর ইচ্ছামত যত্রতত্র ভ্রমণের সুযোগ-সুবিধা করে দেয়া হয়।
শ্রদ্ধেয় আকরাম খাঁ তাঁর উপরোক্ত গ্রন্থের ৯৮ পৃষ্ঠায় বলেনঃ
"হিন্দু লেখকগণের মতে হোসেন শাহের সিংহাসন আরোহণের পর হইতে গৌড় দেশে 'রামরাজ্য' আরম্ভ হইয়া গেল। মাননীয় দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় এ বিষয়ের ভূমিকা হিসাবে বলিতেছেন: মুসলমান ইরান, তুরান প্রভৃতি স্থান হইতেই আসুন না কেন, এদেশে আসিয়া সম্পূর্ণ বাঙালী হইয়া পড়িলেন। মসজিদের পার্শ্বে দেব মন্দিরের ঘন্টা বাজিতে লাগিল, মহরম, ঈদ, শবে বরাত প্রভৃতির পার্শ্বে দুর্গোৎসব, রাম, দোল উৎসব চলিতে লাগিল।... এহেন পরিস্থিতির মধ্যে সুলতান হোসেনের অভ্যুদয় ঘটিল। তিনি রাজকীয় ঝামেলা হইতে মুক্ত হইয়া খুব সম্ভব সর্বপ্রথমে চৈতন্যদেবের খেদমতে উপস্থিত হইলেন এবং তাঁহার ভক্ত শ্রেণীভুক্ত হইয়া গেলেন। 'চৈতন্য চরিতামৃতে' লিখিত আছে যে, ইনি (হোসেন) শ্রীচৈতন্যের একজন ভক্ত হইয়াছিলেন।”
সুলতান হোসেন ও শ্রীচৈতন্য ছিলেন সমসাময়িক এবং চৈতন্যের সাথে হোসেনের গভীর সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক সত্য। অতএব শ্রীচৈতন্যের কিঞ্চিৎ আলোচনা এখানে অপ্রাসংগিক হবেনা নিশ্চয়।
📄 শ্রীচৈতন্য
শ্রী চৈতন্যকে বৈষ্ণব সমাজ শ্রীকৃষ্ণের অবতার রূপে, এমনকি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণরূপে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। গোটা হিন্দু সমাজের মধ্যে শ্রীচৈতন্য এক নব জাগরণ সৃষ্টি করেন।
স্যার যদুনাথ সরকার বলেন:
এ এমন এক সময় যখন প্রভু গৌরাংগের প্রতীক স্বরূপ বাংগালীর মনের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। তাঁর প্রেম ও ক্ষমার বাণী সমগ্র ভারতকে বিমোহিত করে। বাংগালীর হৃদয়মন সকল বন্ধন ছিন্ন করে রাধাকৃষ্ণের লীলা গীতিকার দ্বারা সম্মোহিত হয়। বৈষ্ণব ধর্মের আবেগ অনুভূতিতে, কাব্যে, গানে, সামাজিক সহনশীলতা এবং ধর্মীয় অনুরাগে মনের উচ্ছ্বাস পরবর্তী দেড় শতাব্দী যাবত অব্যাহত গতিতে চলে। এ হিন্দু রেনেসাঁ এবং হোসেন শাহী বংশ ওতপ্রোত জড়িত। এ যুগে বৈষ্ণব ধর্মের এবং বাংলা সাহিত্যের যে উন্নতি অগ্রগতি হয়েছিল তা অনুধাবন করতে গেলে গৌড়ের মুসলমান প্রভুর উদার ও সংস্কৃতি সম্পন্ন শাসকের কথা অবশ্যই মনে পড়ে।”
(যদুনাথ সরকার, দি হিষ্ট্রী অব বেঙল, ২য় খন্ড পৃঃ ১৪৭)
প্রকৃতপক্ষে চৈতন্যের আবির্ভাবের উদ্দেশ্য কি ছিল, তা তাঁর নিজের কথায় আমরা সুস্পষ্টরূপে জানতে পারি। চৈতন্য চরিতামৃত আদি লীলা, ১২০ পৃষ্ঠায় তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন-
"পাষন্ডি সংহারিতে মোর এই অবতার। পাষন্ডি সংহারি ভক্তি করিমু প্রচার।"
এখন বুঝা গেল পাষন্ডি সংহার করাই তাঁর জীবনের আসল লক্ষ্য। ইতিহাস আলোচনা করলে জানা যায়, মুসলমানগণ বাংলা অধিকার করার সময় বৌদ্ধ মতবাদ দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়েছিল। নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের যে বিপুলসংখ্যক লোক এদেশে বাস করতো, ব্রাহ্মণগণ তাঁদেরকে ধর্মের আশ্রয়ে আনতে অস্বীকার করেন। তার ফলে তারা বৈষ্ণব সমাজে প্রবেশ করতে থাকে। তাহলে এদেশে হিন্দু, বৈষ্ণব সমাজ ও মুসলমান ব্যতীত সে সময়ে আর কোন ধর্মাবলম্বীর অস্তিত্ব ছিল না। তাহলে পাষন্ডি ছিল কারা যাদের সংহারের জন্যে চৈতন্যের আবির্ভাব হয়েছিল?
মওলানা আকরাম খাঁ তাঁর উপরে বর্ণিত গ্রন্থে বলেন:
"মনুর মতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী অহিন্দু মাত্রই এই পর্যায়ভুক্ত (সরল বাংলা অভিধান)। আভিধানিক সুবল চন্দ্র মিত্র তাঁহার Beng-Eng Dictionary তে পাষন্ডি শব্দের অর্থে বলিতেছেন- "Not conforming himself to the tenets of Vedas: Atheistic, Jaina or Buddha, a non-Hindu- বেদ অমান্যকারী, অন্য বর্ণের চিহ্নধারী এবং অহিন্দু- পাষন্ডির এই তিনটি বিশ্লেষণ সর্বত্র প্রদত্ত হইয়াছে।”
এখন পাষন্ডি বলতে যে একমাত্র মুসলমানদেরকেই বুঝায়, তাতে আর সন্দেহের অবকাশ রইলো না。
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, সত্য সত্যই-কি চৈতন্য পাষন্ডি তথা মুসলমানদেরকে এদেশ থেকে উচ্ছেদ করতে পেরেছিলেন? আপাতঃদৃষ্টিতে দেখা যায়, চৈতন্যের সমসাময়িক সুলতান হোসেন শাহের পরেও এদেশে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু হোসেন শাহ কর্তৃক চৈতন্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ ও বৈষ্ণব সমাজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর সাহায্য সহযোগিতার দ্বারা মুসলমানদের আকীদাহ বিশ্বাসের মধ্যে শির্ক বিদয়াতের যে আবর্জনা জমে উঠেছিল তা-ই পরবর্তী যুগে মুসলিম সমাজের অধঃপতনের কারণ হয়।
'মুসলেম বংগের সামাজিক ইতিহাস' গ্রন্থ প্রণেতা বলেন- "প্রকৃত কথা এই যে, বৌদ্ধ সমাজ ও বৌদ্ধ ধর্মকে তাহাদের মাতৃভূমি হইতে সমূলে উৎখাত করার পর তাঁহাদের নেকনজর পড়িয়াছিল মুসলমান সমাজের উপর। তাই যুগপৎভাবে তাঁহারা চেষ্টা করিতে লাগিলেন 'যবন' রাজাদিগকে রাজনৈতিক কৌটিল্যের মাধ্যমে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত করিয়া ফেলিতে। পক্ষান্তরে ধর্মের নামে একটা মোহজাল বিস্তার করিয়া মুসলমান সমাজকে আত্মবিস্মৃত ও সম্মোহিত করিয়া রাখিতে। পূর্বে বলিয়াছি, ইহাই তৎকালের অবতার ও তাঁহার তক্ত ও সহকারীদের চরম ও পরম উদ্দেশ্য।”
সত্য নারায়ণের পূজা পদ্ধতির উল্লেখ হিন্দু পুরাণে আছে। হিন্দুর প্রায় প্রতি ঘরে ঘরে এই পূজার অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। কিন্তু মুসলমানকে দিয়ে এ সত্য নারায়ণের পূজা কিছুতেই সম্ভব ছিলছিল না। তাই হিন্দু মুসলমানের বিভেদ মিটাবার মহান (?) উদ্দেশ্যে সুলতান হোসেন সত্যপীরের প্রতিষ্ঠা ও তাঁর পূজা পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। প্রকৃতপক্ষে সত্যপীরের দরগাহ প্রতিষ্ঠা, সত্যপীরের নামে মানৎ ও শির্ণি বিতরণ, ঢাক-ঢোলের বাদ্য-বাজনাসহ সত্যপীরের দরগায় অনুষ্ঠানাদি পালন প্রকৃতপক্ষে সত্যনারায়ণ পূজারই মুসলিম সংস্করণ যার প্রবর্তক ছিলেন হোসেন শাহ। এসব কারণেই হোসেন শাহকে অবতার বলে মান্য করে হিন্দু সমাজ।
নৃপতি হুসেন শাহ হয়ে মহামতি। পঞ্চম গৌড়েতে যার পরম সুখ্যাতি।। অস্ত্রশস্ত্রে সুপন্ডিত মহিমা অপার। কলিকালে হবু যেন কৃষ্ণ অবতার।। ('বংগভাষা ও সাহিত্য' দীনেশ চন্দ্র সেন)।
দীনেশ চন্দ্র সেন তাঁর 'বংগভাষা ও সাহিত্যে' বলেন: "কবীন্দ্র পরমেশ্বর ইঁহাকে (হোসেন শাহ) কৃষ্ণের অবতার বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। চৈতন্য চরিতামৃত ও চৈতন্য ভাগবতে দৃষ্ট হয়, তিনি চৈতন্যপ্রভুকে ঈশ্বরের অবতার বলিয়া স্বীকার করিয়াছিলেন। যে গুণে আকবর ভারত ইতিহাসের কণ্ঠে কণ্ঠহার হইয়া আছেন, সেই গুণে হোসেন শাহ বংগের ইতিহাসে উজ্জ্বল রত্ন বলিয়া গণ্য হইবেন।”
হিন্দুদের সাধারণ ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী চৈতন্য শ্রীকৃষ্ণের অবতার। অথবা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। এজন্যে তাঁর ভক্তবৃন্দ অতি মারাত্মকভাবে কৃষ্ণলীলায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। ধর্মের নামে বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীদের মধ্যে যে অতি জঘন্য ধরনের যৌন অনাচার চলে, তা পুরাণে বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণের যৌন আবেদনমূলক প্রেমলীলার পরিপূর্ণ অনুকরণ। এসবের পূর্ণ বিবরণ বহু হিন্দু শাস্ত্র গ্রন্থে দেখা যায়। বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার ও প্রসারের ফলে হিন্দু সমাজের মধ্যে যৌন অনাচারের মাধ্যমে যে সর্বনাশটা হয়েছে তা হিন্দু সমাজের চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ স্বীকার করেন। পরম পরিতাপের বিষয় এই যে, বাংলার একজন শক্তিশালী মুসলিম শাসক হোসেন শাহের এ বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি অনুরাগের কারণে মুসলিম বাংলার লক্ষ লক্ষ লোকও এ সমস্ত নোংরা ও অশ্লীল আচার অনুষ্ঠানকে তাদের জীবনের আদর্শরূপে গ্রহণ করে মুসলিম সমাজকে অভিশপ্ত ও অধঃপতিত করেছে। এভাবেই শ্রীচৈতন্য পাষন্ডি সংহারে পূর্ণ সফলতা অর্জন করেছেন বল্লে অত্যুক্তি হবে না。
এখানে আমরা রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়ের উক্তির পুনরাবৃত্তি করে তার মধ্যে কিছু সংশোধনীসহ বলতে চাই- 'দনুজমর্দন দেব-গণেশ যাহা করিতে পারেন নাই, আর্যাবর্তের কোনও হিন্দু রাজা যাহা করিতে পারেন নাই তাহাই সাধন করিয়াছিলেন বলিয়া সুলতান হোসেন শাহের নাম ইতিহাসে চিরস্মরণীয় থাকিবে।”
এত আলোচনার পর এখন হোসেন শাহের বংশ ও জাতিধর্ম সম্বন্ধে সন্দেহ অধিকতর ঘনীভূত হচ্ছে। হতে পারে যে, হোসেন শাহ আদৌ মুসলমান ছিলেন না। একজন সাইয়েদ বংশীয় মুসলমান হিসাবে পরিচয় দিয়ে মুসলমানদের ভক্তি শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে প্রতারণার মাধ্যমে ক্রমশঃ উচ্চতম ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। অথবা বাংলারই অজ্ঞাত কুলশীল হিন্দু অথবা মুসলমান কোন নিরাশ্রয় বালককে মুর্শিদাবাদের চাঁদপাড়া গ্রামের জনৈক ব্রাহ্মণ আশ্রয় দান করে রাখালের কাজে নিযুক্ত করেন। উক্ত ব্রাহ্মণ এ বালকের মধ্যে এক বিরাট প্রতিভা দেখতে পান এবং 'পাষন্ডি সংহার নিমিত্ত' তাঁকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মুজাফ্ফর শাহের দরবারে অন্নসংস্থানের অজুহাতে প্রেরণ করেন। এখানেই সাইয়েদ ও মক্কী বলে তাঁর পরিচয় দেয়া হয়। মুজাফ্ফর শাহের অনুগ্রহে তাঁর ভাগ্যের দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়। তাঁর গোটা জীবন, তাঁর সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের পরস্পর বিরোধী বিবরণ, তাঁর পরবর্তীকালের ধর্মবিশ্বাস, কার্যকলাপ ও আচার-আচরণ, অসংখ্য প্রতিভাবান মুসলমান হত্যা করে হিন্দু ও বৈষ্ণব সমাজের লোকদের দ্বারা তাঁর মন্ত্রীসভা ও রাজদরবারের শোভাবর্ধন, প্রভৃতি লক্ষ্য করার পর তাঁর জাতিধর্ম সম্পর্কে উপরোক্ত ধারণা পোষণ করলে কি ভুল হবে?
মোটকথা, হোসেন শাহ মুসলমানই হন, আর যা-ই হন, অসংখ্য অগণিত মুসলমান সৈন্য, আমীর ওমরা ও সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের হত্যার পর শক্তিশালী হিন্দু সামন্ত প্রভুদের তুষ্টি সাধন করে মুসলিম সমাজের কোন্ সর্বনাশটা করেছেন, তা চিন্তা করার অবকাশ তাঁর ছিল কোথায়? ইতিহাসের বিভিন্ন সময়কালে এমনি এক একজন মুসলমানকে কাষ্ঠপুত্তলিকা সাজিয়ে ইসলাম বৈরীগণ তাঁদের অভীষ্ট সিদ্ধ করেছেন। সেজন্যে অমুসলিম ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিকগণকে আমরা হোসেন শাহের প্রশংসায় পঞ্চমুখ দেখতে পাই।
তাঁর আমলে বাংলা ভাষার মাধ্যমে হিন্দু জাতির রেনেসাঁ আন্দোলন জোরদার হয়েছিল। বাংলা গ্রন্থ প্রণেতা মালাধর বসু, বিপ্রদাস, বিজয়গুপ্ত এবং যশোরাজ খান তাঁদের সাহিত্যে হোসেন শাহের উচ্ছ্বসিত প্রশংসাসহ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। মালাধর বসু ভাগবতের দশম ও একাদশ স্কন্ধ বাংলায় অনুবাদ করেন। তিনি শ্রীকৃষ্ণের প্রণয়লীলা বিষয়ক 'শ্রীকৃষ্ণ বিজয়' নামক একখানি বাংলা মহাকাব্য রচনা করেন। হোসেন প্রীত হয়ে তাঁকে 'গুণরাজ খান' উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি বলেন-
"নির্গুণ অধম মুঞি নাহি কোন ধাম গৌড়েশ্বর দিল নাম গুণরাজ খান।”
মালাধর বসুর ভ্রাতা গোপীনাথ বসু ওরফে পুরন্দর খান শ্রীকৃষ্ণের প্রণয়লীলা বিষয়ে কৃষ্ণমংগল নামক একখানি মহাকাব্য রচনা করেন। ব্রাহ্মণ বিপ্রদাস মনসামংগল কাব্য রচনা করেন। পরাগল খাঁকে হোসেন শাহ চট্টগ্রামে বিরাট ভূসম্পত্তি দান করেন।
এসব গ্রন্থাদি ও মহাকাব্য রচনায় হোসেন শাহ ও তাঁর পুত্র নসরৎ শাহের সাহায্য সহযোগিতা ছিল বলে মুসলিম সমাজে তার বিরাট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
উপরে বর্ণিত বিপ্রদাস রচিত মনসামংগল কাব্য মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর এতখানি প্রভাব বিস্তার করে যে পরবর্তীকালে মুসলিম সমাজে মনসাপূজা প্রচলিত হয়। পাঠকগণের অবগতির জন্যে মওলানা আকরাম খাঁ'র গ্রন্থের কিঞ্চিৎ এখানে সন্নিবেশিত করছি।
"মহাভারত ও দেবী ভাগবতে আমরা মনসার আংশিক বিবরণ দেখিতে পাই। তাহার জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে মতভেদ থাকিলেও আমরা তাহাকে শিবের কন্যা বলিয়া ধরিয়া লইতে পারি। ভাষার শালীনতা রক্ষা করিয়া মনসার কাহিনী বর্ণনা করা সম্ভব নহে। মোদ্দাকথা, জন্মের পর মুহূর্তেই তিনি পরিপূর্ণ যৌবনবতী হইয়া উঠেন এবং শিব বা মহাদেব তাঁহাকে স্বগৃহে লইয়া যান। শিবের পত্নী চন্ডী বা দুর্গা যে কারণেই হউক তাঁহাকে দেখা মাত্র আক্রোশে ফাটিয়া পড়েন। ফলে দুই দেবীর মধ্যে যে সংঘর্ষ বাধে তাহাতে মনসা তাঁহার একটি চক্ষু হারান। মনসা দুর্গার প্রতি ক্রোধে ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন। শিবও তাঁহার রোষ হইতে বাদ পড়িলেন না। (সাপ নাচানো বর্ণনা এখানে আমরা বাদ দিতেছি- মনসা কিন্তু সাপের দেবী হিসাবে পূজিত হন)। মনসা প্রতিজ্ঞা করিলেন যে তাঁহার এই অপমানের প্রতিশোধ না লইয়া ছাড়িবেন না। তাঁহার সহচরী নেত্রবতীর সহিত পরামর্শ করিয়া তিনি শিব ও দুর্গা-ভক্তদের মনসা পূজায় বাধ্য করিবেন বলিয়া স্থির করিলেন। এই উদ্দেশ্য লইয়া বাংলাদেশে তিনি এক বিশেষ রূপে আবির্ভূত হইলেন এবং অতি অল্পায়াসে ধীরে ধীরে রাখাল, জেলে ও গরীব মুসলমানদের তাহার পূজায় প্রবৃত্ত করিতে সমর্থ হইলেন। (বাংলা সাহিত্যের কথা-১৬ পৃষ্ঠা)
চাঁদ সওদাগরের স্ত্রী একজন মনসাভক্ত নারী ছিলেন। কিন্তু তাঁহার স্বামী কোনক্রমেই মনসার পূজা করিতে রাজী হইলেন না। রাগান্বিত হইয়া মনসা তাঁহাকে নানা বিপদ ও ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে ফেলিতে লাগিলেন। কিন্তু সাতটি সন্তান ও প্রচুর ধনসম্পদসহ তাঁহার সমুদয় জাহাজ সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া সত্ত্বেও সওদাগর নিজের মতে অটল রহিলেন। অবশেষে কঠোর সতর্কতা সত্ত্বেও তাঁহার একমাত্র জীবিত পুত্র লখিন্দর সর্পাঘাতে নিহত হয় এবং লখিন্দরের স্ত্রী বেহুলা তাহার প্রগাঢ় ভক্তি ও মনসার দয়ায় তাহাকে পুনর্জীবিত করিতে সক্ষম হয়। চাঁদ সওদাগরের হারানো সকল পুত্র ও ধনৈশ্বর্য পুনরায় তাঁহাকে ফিরাইয়া দেওয়া হয়। এই মনসা পূজা এবং ইহার সহিত সম্পর্কযুক্ত বেহুলার ভাসান বিংশতি শতাব্দীর প্রথম পাদ পর্যন্ত যশোহর, খুলনা ও চব্বিশ পরগণা প্রভৃতি অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।” (মুসলেম বংগের সামাজিক ইতিহাস-পৃঃ ৭৮-৭৯)
শুধু দক্ষিণ বংগেরই নয় বাংলার প্রায় সকল অঞ্চলের একশ্রেণীর মুসলমান উপরোক্ত শির্ক ও কুফরী ধারণা পোষণ করে গ্রামে গ্রামে বেহুলার ভাসান বা ভাসান যাত্রা উৎসাহ উদ্যম সহকারে অনুষ্ঠিত করতো।
এখন আমরা স্পষ্টই দেখতে পাই যে, হোসেন শাহ ও তাঁর বংশধরগণের সাহায্যে কিভাবে পৌত্তলিকতার বিষবাষ্প মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সংক্রমিত করেছিল। যার ফলে পরবর্তীকালে হিন্দু মুসলমান সমাজ ও সংস্কৃতিকে এক ও অভিন্ন করার হাস্যকর প্রচেষ্টা চলেছে।