📄 একজন পুরুষ শর্ত সাপেক্ষে সর্বাধিক চার নারীকে বিয়ে করতে পারবে
وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَى فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَ ثُلثَ وَرُبَعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ذَلِكَ أَدْنَى إِلَّا تَعُولُوا.
অর্থ: আর যদি তোমরা ভয় কর যে, ইয়াতীমদের (মেয়েদের) প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে নারীগণের মধ্য হতে তোমাদের মনমত দু'জন ও তিনজন ও চারজনকে বিয়ে কর; কিন্তু যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, (একাধিক স্ত্রীর মধ্যে) ন্যায়বিচার করতে পারবে না তবে মাত্র একটি (বিয়ে কর) অথবা তোমাদের অধিকারে যেসব মেয়ে আছে (ক্রীতদাসী) তাদেরকে বিয়ে করো। এটা অবিচার না করার নিকটবর্তী। (সূরা আন নিসা: আয়াত-৩)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে মুফাস্সিরগণ এর তিনটি দিকের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন-
১. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, জাহেলী যুগে যেসব এতিম মেয়ে লোকদের অভিভাবকত্বাধীন থাকতো তাদের সম্পদ ও সৌন্দর্যের কারণে অথবা তাদের ব্যাপারে তো উচ্চবাচ্য করার কেউ নেই, যেভাবে ইচ্ছা তাদের দাবিয়ে রাখা যাবে এই ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেক অভিভাবক নিজেরাই তাদেরকে বিয়ে করতো, তারপর তাদের ওপর জুলুম করতে থাকতো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়েছে, তোমরা যদি আশঙ্কা করো যে তাদের সাথে ইনসাফ করতে পারবে না, তাহলে সমাজে আরো অনেক মেয়ে আছে, তাদের মধ্যে থেকে নিজের পছন্দমতো মেয়েদেরকে বিয়ে করো। এ সূরার ১৯ রুকূর প্রথম আয়াতটি এ ব্যাখ্যা সমর্থন করে।
২. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর ছাত্র ইকরামা এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, জাহেলী যুগে স্ত্রী গ্রহণের ব্যাপারে কোনো নির্ধারিত সীমা ছিল না। একজন লোক দশ দশটি বিয়ে করতো। স্ত্রীদের সংখ্যাধিক্যের কারণে সংসার খরচ বেড়ে যেতো। তখন বাধ্য হয়ে তারা নিজেদের এতিম ভাইঝি ও ভাগ্নীদের এবং অন্যান্য অসহায় আত্মীয়াদের অধিকারের দিকে হাত বাড়াতো। এ কারণে আল্লাহ বিয়ের জন্য চারটির সীমা নির্ধারিত করে দিয়েছেন। জুলুম ও বেইনসাফী থেকে বাঁচার পন্থা এই যে, এ থেকে চারটি পর্যন্ত স্ত্রী গ্রহণ করবে যাতে তাদের সাথে সুবিচার করতে পার।
৩. সাঈদ ইবনে জুবাইর, কাতাদাহ এবং অন্যান্য কোনো কোনো মুফাস্সির বলেন, এতিমদের সাথে বেইনসাফী করাকে জাহেলী যুগের লোকেরাও সুনজরে দেখতো না। কিন্তু মেয়েদের ব্যাপারে ইনসাফ ও ন্যায়নীতির কোনো ধারণাই তাদের মনে স্থান পায়নি। তারা যতগুলো ইচ্ছা বিয়ে করতো। তারপর তাদের ওপর জুলুম-অত্যাচার চালাতো ইচ্ছে মতো। তাদের এ ব্যবহারের প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে, যদি তোমরা এতিমদের ওপর জুলুম ও বেইনসাফী করতে ভয় করে থাকো, তাহলে মেয়েদের সাথেও বেইনসাফী করার ব্যাপারে ভয় করো। প্রথমত চারটির বেশি বিয়েই করো না। আর চারের সংখ্যার মধ্যেও সেই ক'জনকে স্ত্রী হিসেব গ্রহণ করতে পারবে যাদের সাথে ইনসাফ করতে পারবে।
আয়াতের শব্দাবলি এমনভাবে গ্রথিত হয়েছে, যার ফলে সেখান থেকে এ তিনটি ব্যাখ্যারই সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি একই সঙ্গে আয়াতটির এ তিনটি অর্থই যদি এখানে উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তাহলে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই। এ ছাড়া এর আর একটা অর্থও হতে পারে। অর্থাৎ এতিমদের সাথে যদি এভাবে ইনসাফ না করতে পারো তাহলে যেসব মেয়ের সাথে এতিম শিশু সন্তান রয়েছে তাদেরকে বিয়ে করো।
এ আয়াতের ওপর মুসলিম ফকীহগণের 'ইজমা' অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাঁরা বলেন, এ আয়াতের মাধ্যমে স্ত্রীর সংখ্যা সীমিত করে দেয়া হয়েছে এবং একই সঙ্গে এক ব্যক্তির চারজনের বেশি স্ত্রী রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাদীস থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়।
হাদীসে বলা হয়েছে, তায়েফ প্রধান গাইলানের ইসলাম গ্রহণ কালে নয়জন স্ত্রী ছিল। নবী তাঁকে চারজন স্ত্রী রেখে দিয়ে বাকি পাঁচজনকে তালাক দবার নির্দেশ দেন। এভাবে আর এক ব্যক্তির (নওফল ইবনে মুআবীয়া) ছিল পাঁচজন স্ত্রী। নবী তালাক দেবার হুকম দেন।
এছাড়াও এ আয়াতে একাধিক স্ত্রী রাখার বৈধতাকে ইনসাফ ও ন্যায়নিষ্ঠ ব্যবহারের শর্ত সাপেক্ষ করা হয়েছে। যে ব্যক্তি ইনসাফ ও ন্যায়নিষ্ঠতার শর্ত পূরণ না করে একাধিক স্ত্রী রাখার বৈধতার সুযোগ ব্যবহার করে সে মূলত আল্লাহর সাথে প্রতারণা করে। যে স্ত্রী বা যেসব স্ত্রীর সাথে সে ইনসাফ করে না ইসলামী সরকারের আদালতসমূহ তাদের অভিযোগ শুনে সে ব্যাপারে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। কোনো কোনো লোক পাশ্চাত্যবাসীদের খ্রিস্টবাদী ধ্যান-ধারণার প্রভাবে আড়ষ্ট ও পরাজিত মনোভাব নিয়ে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করে থাকে যে, একাধিক বিয়ের পদ্ধতি (যা আসলে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিতে একটি খারাপ পদ্ধতি) বিলুপ্ত করে দেয়াই কুরআনের আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু সমাজে এ পদ্ধতির খুব বেশি প্রচলনের কারণে এর ওপর কেবলমাত্র বিধি-নিষেধ আরোপ করেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ ধরনের কথাবার্তা মূল নিছক মানসিক দাসত্বের ফলশ্রুতি ছাড়া আর কিছুই নয়। একাধিক স্ত্রী গ্রহণকে মূলগতভাবে অনিষ্টকর মনে করা কোনোক্রমেই সঠিক হতে পারে না। কারণ কোনো কোনো অবস্থায় এটি একটি নৈতিক ও তামাদ্দুনিক প্রয়োজনে পরিণত হয়। যদি এর অনুমতি না থাকে তাহলে যারা এক স্ত্রীতে তুষ্ট হতে পারে না, তারা বিয়ের সীমানার বাইরে এসে যৌন বিশৃংখলা সৃষ্টিতে তৎপর হবে। এর ফলে সমাজ-সংস্কৃতি-নৈতিকতার মধ্যে যে অনিষ্ট সাধিত হবে তা হবে একাধিক স্ত্রীর গ্রহণের অনিষ্টকারিতার চাইতে অনেক বেশি। তাই যারা এর প্রয়োজন অনুভব করে কুরআন তাদেরকে এর অনুমতি দিয়েছে। তবুও যারা মূলগতভাবে একাধিক বিয়েকে একটি অনিষ্টকারিতা মনে করেন, তাদেরকে অবশ্যই এ ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে যে, তারা কুরআনের রায়ের বিরুদ্ধে এ মতবাদের নিন্দা করতে পারেন এবং একে রহিত করারও পরামর্শ দিতে পারেন কিন্তু নিজেদের মনগড়া রায়কে অনর্থক কুরআনের রায় বলে ঘোষণা করার কোনো অধিকার তাদের নেই। কারণ কুরআন সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় একে বৈধ ঘোষণা করেছে। ইশারা ইংগিতেও এর নিন্দায় এমন একটি শব্দ ব্যবহার করেনি, যা থেকে বুঝা যায় যে, সে এর পথ বন্ধ করতে চায়।
রাসূলুল্লাহ -এর বহু বিবাহ
ইউরোপীয় নাস্তিক ও বস্তুবাদীরা রাসূলুল্লাহ -এর বহু বিবাহের বিষয়টিকে অন্য দৃষ্টি কোণ থেকে বিচার করে আসছে। তাদের মতে (নাউযুবিল্লাহ) তিনি যৌন স্পৃহা দমন করার জন্যেই এমনটি করেছেন। কিন্তু দুনিয়ার ভোগবাদী মানুষের সাথে তো মহানবী -এর কোনো তুলনাই চলে না। যে কোনো নিরপেক্ষ চিন্তার বৃদ্ধিজীবি লোক মহানবীর জীবন-পদ্ধতির প্রতি লক্ষ্য করলে এরূপ চিন্তা করতে পারে না। কারণ তাঁর
জীবন-পদ্ধতিই প্রমাণ করবে যে, তিনি এ উদ্দেশ্যে তা করেননি।
রাসূলুল্লাহ -এর জীবন তৎকালীন আরব জাহানের সামনে উন্মুক্ত ছিল। বাল্য জীবন থেকে তিনি সবার কাছে ছিলেন নির্মল চরিত্রের অধিকারী আল আমীন বা বিশ্বাসী হিসেবে। পঁচিশ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন চল্লিশ বছর বয়স্কা এমন এক বিধবাকে যার ইতিপূর্বে আরও দু'জন স্বামী মারা গিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার পর মহানবী হেরা গুহায় মাসের পর মাস সময় ধরে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। আরবের কে এ ঘটনা জানতো না? তাঁর সেই প্রথমা স্ত্রী বিবি খাদিজা এর সাথে তিনি সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করেন।
এ পঞ্চাশ বছর বিশেষ করে তাঁর যৌবনকাল সবটাই মক্কাবাসীদের চোখের সমানেই অতিক্রান্ত হয়েছে। মক্কায় কোনো শত্রু তাঁর চরিত্রের ব্যাপারে কোনো প্রকার সন্দেহ পোষণ করতো না। শত্রুরা তাঁকে যাদুকর, উম্মাদ ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করেছে সত্য, কিন্তু কখনো তাকে ভোগ সর্বস্ব বা যৌন বিকার গ্রস্ত হওয়ার মিথ্যা দাবী করতে পারেনি।
আমরা দেখতে পাচ্ছি ৫৪ বছর বয়স পর্যন্ত মহানবী একজন স্ত্রী নিয়েই ঘর সংসার করেছিলেন। অর্থাৎ পঁচিশ বছর খাদিজা -কে নিয়ে এবং চার বছর সাওদা -কে নিয়ে তিনি দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করেছেন। তারপর আটান্ন বছর বয়সে তাঁর চারজন স্ত্রী একত্রিত হন। অন্যান্যদেরকে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ করেন পরবর্তী দু'তিন বছরে। আমরা জানি সাহাবায়ে কিরাম পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সবাই ছিলেন মহানবী -এর উপর নিবেদিত প্রাণ। এমতাবস্থায় তিনি তো ইচ্ছা করলে অনেক সংখ্যক কুমারী মেয়েকেই স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি করেননি। একমাত্র আয়েশা -কে কুমারী স্ত্রী হিসেবে নবী -এর সান্নিধ্যে আসেন। কাজেই তথাকথিত বুদ্ধিজীবিদের সমালোচনার কোনো ভিত্তিই ধোপে টিকে না। ইতিহাস তার জীবন্ত সাক্ষী।
📄 স্ত্রীদের মোহর দিতে হবে সন্তুষ্ট চিত্তে
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَرِيئًا.
অর্থ: আর নারীগণকে তাদের দেন-মোহর প্রদান কর কিন্তু পরে যদি তারা সন্তুষ্ট চিত্তে কিছু অংশ তোমাদেরকে প্রদান করে, তবে তৃপ্তির সাথে ভোগ কর। (আন নিসা: আয়াত-৩)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: স্ত্রীদের মোহরানার টাকা পরিশোধের ব্যাপারে তখনকার দিনে নানা ধরনের যুলুম অত্যাচার চলতো। যেমন মোহরানার টাকা স্ত্রীদের হাতে না পৌঁছিয়ে পৌঁছানো হতো অভিভাবকদেরকে। আর অনেক সময় অভিভাবকরা তা আদায় করে নিজেরাই আত্মসাৎ করতো। তাই উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা স্বামীর প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন যে, মোহরানার টাকা তাকেই পরিশোধ কর, অন্যকে নয়। এখানে
অভিভাবকদের প্রতিও এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, মোহরানা আদায় করে তা যার প্রাপ্য তার হাতেই অর্পণ কর। তার অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ যেন তা খরচ না করে।
দ্বিতীয়: স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধ করার ব্যাপারে কোনো প্রকার সংকীর্ণতা ও তিক্ততা থাকতে পারবে না। তখনকার দিনে মোহরানা পরিশোধ করাকে জরিমানা দেয়ার মতো মনে করা হতো। স্বামীর এ অনাচার ও অভিভাবকদের সংকীর্ণতা রোধ করার লক্ষ্যেই রাব্বুল আলামীন نِحْلَۂ )নিব্লাতান) শব্দ ব্যবহার করেছেন। অভিধানে نِحْلَةً বলতে ঐ দানকে বলা হয় যা অত্যন্ত খুশীমনে ও আন্তরিকতা সহকারে প্রদান করা হয়। মূলত স্ত্রীদের মোহরানা অবশ্য পরিশোধযোগ্য ঋণ বিশেষ। এ ঋণ পরিশোধ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যান্য ঋণ যেমন সন্তুষ্টচিত্তে অবশ্য দেনা হিসেবে পরিশোধ করা হয়, স্ত্রীর মোহরানাও তেমনি হৃষ্টচিত্তে ও উদারমনে পরিশোধ করা কর্তব্য।
তৃতীয়ত: অনেক স্বামী স্ত্রীকে অসহায় অবলা পেয়ে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে বা কৌশল অবলম্বন করে মোহরানা মাফ করিয়ে নিয়ে থাকে। তখনকার দিনেও এমনটি করা হতো। কিন্তু এভাবে মাফ করিয়ে নিলে প্রকৃতপক্ষে তা মাফ হয় না। কারণ এ ধরনের মাফ করা তো স্বেচ্ছায় না হয়ে পরিবেশ পরিস্থিতির চাপের মুখে হয়ে থাকে।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও কাযী শুরাইহর ফায়সালা হচ্ছে, যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে সম্পূর্ণ মোহরানা বা তার অংশবিশেষ মাফ করে দেয় এবং তারপর আবার তা দাবী করে, তাহলে তা আদায় করার জন্য স্বামীকে বাধ্য করা হবে। কেননা তার দাবী করাই একথা প্রমাণ করে যে, সে নিজের ইচ্ছায় মোহরানার সমুদয় অর্থ বা তার অংশবিশেষ ছাড়তে রাজী নয়।
স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধের বিষয়টি ইসলামী শরীয়তে অনেক গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত। কিন্তু মুসলিম সমাজ অন্যান্য জরুরি বিষয়ের ব্যাপারে যেমন উদাসীনতা প্রদর্শন করে ঠিক স্ত্রীর মোহারানার বেলায়ও তাই করে আসছে। অধিকন্তু আজকের মুসলিম সমাজে বিজাতীয়দের অনুকরণে যৌতুকের অভিশাপ জেঁকে বসেছে অত্যন্ত ব্যাপকভাবে। মেয়েদের মীরাস থেকে বঞ্চিত করার মত জঘন্য তৎপরতাও এজন্যে কম দায়ী নয়। এমনকি ইসলামের মৌলিক ইবাদাত পালনে অভ্যস্ত দীনদার ব্যক্তিরাও দীনের সঠিক তাৎপর্য অনুধাবনে পশ্চাদপদ বিধায় এমনিভাবে দীনের বহু মৌলিক বিষয় সম্পর্কে উদাসীনতা প্রদর্শন করে থাকে। ফলে সমাজে দেখা দিয়েছে নানান অনাচার ও ইসলামী শরীয়ত পরিপন্থী রীতিনীতি। আর বাস্তব জীবনে মুসলিম অমুসলিমের জীবন ধারা এককার হয়ে পড়েছে। পরিণামে পৃথিবীর মানব সাধারণ বঞ্চিত হচ্ছে ইসলামী জীবন বিধানের অনিবার্য সুফল থেকে।
বস্তুত আল্লাহ, রাসূল ও আখিরাতে বিশ্বাসী লোকদের ঈমানী দায়িত্ব হলো সমাজে প্রচলিত এসব জুলুম-অত্যাচার থেকে দূরে থাকা। স্ত্রীর মোহরানার টাকা ও বোনদের প্রাপ্য মীরাস এবং ভাইদের মৃত্যুর পর ভাতিজা ও ভাইঝীদের মীরাস ও যাবতীয় সম্পদ সংরক্ষণ করা এবং প্রাপকদের পাওনা হিসাব-নিকাশ করে পুরোপুরি তাদের পরিশোধ করা। নামায-রোযার চেয়ে এসবের গুরুত্ব দেয়া উচিত। কারণ নামায-রোযা তো আল্লাহর হক, অথচ এসবই হচ্ছে বান্দার হক। আল্লাহ সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন।
📄 সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের অংশ নির্ধারিত
لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَ الْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدُنِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ نَصِيبًا مَفْرُوضًا.
পুরুষদের জন্যে পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পদে অংশ রয়েছে এবং নারীদের জন্যেও পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পদে অংশ রয়েছে কম বা বেশি হোক, এসব অংশ নির্ধারিত। (সূরা আন নিসা: আয়াত-৭)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে সুস্পষ্টভাবে পাঁচটি আইনগত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন- ১. মীরাস কেবল পুরুষদের নয়, মেয়েদেরও অধিকার। ২. যত কমই হোক না কেন মীরাস অবশ্যই বণ্টিত হতে হবে। এমন কি মৃত ব্যক্তি যদি এক গজ কাপড় রেখে গিয়ে থাকে এবং তার দশজন ওয়ারিস থাকে, তাহলেও তা ওয়ারিসদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে। একজন ওয়ারিস অন্যজনের থেকে যদি তার অংশ কিনে নেয় তাহলে তা আলাদা কথা। ৩. এ আয়াত থেকে একথাও সুস্পষ্ট হয়েছে যে, মীরাসের বিধান স্থাবর-অস্থাবর, কৃষি- শিল্প বা অন্য যে কোনো ধরনের সম্পত্তি হোক না কেন সব ক্ষেত্রে জারী হবে। ৪. এ থেকে জানা যায় যে, মীরাসের অধিকার তখনই সৃষ্টি হয় যখন মৃত ব্যক্তি কোনো সম্পদ রেখে মারা যায়। ৫. এ থেকে এ বিধানও নির্দিষ্ট হয় যে, নিকটতম আত্মীয়ের উপস্থিতিতে দূরতম আত্মীয় মীরাস লাভ করবে না।
📄 সম্পত্তি বণ্টনে কন্যার অংশই মূল ভিত্তি
يُوصِيكُمُ اللهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ فَإِنْ كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُنَا مَا تَرَكَ، وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ وَلا بَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِنْ كَانَ لَهُ وَلَدٌ فَإِنْ لَمْ يَكُن لَّهُ وَلَدٌ وَوَرِثَةَ آبَاهُ فَلِأُمِّهِ الثُّلُثُ فَإِنْ كَانَ لَةَ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُؤْصِى بِهَا أَوْ دَيْنٍ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا.
অর্থ: আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে এ বিধান জারি করেছেন যে, এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান। তবে যদি শুধু কন্যা হয় এবং দু'জনের বেশি হয়
তাহলে তারা পরিত্যাক্ত সম্পদের তিনভাগের দু'ভাগ পাবে। আর যদি কন্যা এক হয় তবে সে অর্ধেক পাবে। যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকে তবে তার পিতা-মাতা প্রত্যেকে তার রেখে যাওয়া সম্পদের ছয়ভাগের একভাগ পাবে। আর যদি সে নিঃসন্তান এবং পিতা-মাতাই ওয়ারিস হয় তাহলে মা পাবে তিনভাগের একভাগ, কিন্তু যদি তার একাধিক ভাই-বোন থাকে তবে মা ছয়ভাগের একভাগ পাবে। এসব মৃত ব্যক্তির ওসীয়ত অথবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও তোমাদের সন্তানদের মধ্যে উপকারের দিক থেকে কারা নিকটবর্তী তোমরা তা জান না। এ বণ্টন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সূরা আন নিসা: আয়াত-১১)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা : মীরাসের ব্যাপারে এটি প্রথম ও প্রধান মৌলিক বিধান যে, পুরুষদের অংশ হবে মেয়েদের দ্বিগুণ। যেহেতু পারিবারিক জীবন ক্ষেত্রে শরীয়াত পুরুষদের ওপর অর্থনৈতিক দায়িত্বের বোঝা বেশি করে চাপিয়ে এবং অনেকগুলো অর্থনৈতিক দায়িত্ব থেকে মেয়েদেরকে মুক্তি দিয়েছে, তাই মীরাসের ব্যাপারে মেয়েদের অংশ পুরুষদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম রাখা হবে, এটিই ছিল ইনসাফের দাবী।
দু'টি মেয়ের ব্যাপারেও এই একই বিধান কার্যকর। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির যদি কোনো পুত্রসন্তান না থাকে এবং সবগুলোই থাকে কন্যা সন্তান, কন্যাদের সংখ্যা দুই বা দু’য়ের বেশি হোক না কেন, তারা সমগ্র পরিত্যক্ত সম্পত্তির তিন ভাগের দু'ভাগ পাবে। অবশিষ্ট তিনভাগের একভাগ অন্যান্য ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। কিন্তু যদি মৃত ব্যক্তির শুধুমাত্র একটি পুত্র থাকে, তাহলে এ ব্যাপারে ইজমা অনুষ্ঠিত হয়েছে অর্থাৎ ফিক্হবিদগণ সবাই এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, অন্যান্য ওয়ারিসদের অনুপস্থিতিতে সে-ই সমস্ত সম্পত্তির ওয়ারিস হবে। আর যদি অন্যান্য ওয়ারিসরাও থাকে, তাহলে তাদের অংশ দিয়ে দেবার পর বাকি সমস্ত সম্পত্তিই সে পাবে।
মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তার বাপ-মা প্রত্যেকে ছয়ভাগের একভাগ পাবে। আর সন্তান যদি সবগুলোই হয় কন্যা বা সবগুলোই পুত্র অথবা পুত্র কন্যা উভয়ই হয় বা একটি পুত্র অথবা একটি কন্যা হয়, তাহলে বাকি তিনভাগের দু'ভাগে এ ওয়ারিসরা শরীক হবে।
বাপ-মা ছাড়া যদি আর কেউ ওয়ারিস না থাকে তাহলে বাকি তিনভাগের দু'ভাগ বাপ পাবে। অন্যথায় তিনভাগের দু'ভাগে বাপ ও অন্যান্য ওয়ারিসরা শরীক হবে।
ভাই-বোন থাকলে মায়ের অংশ তিনভাগের এক ভাগের পরিবর্তে ছয় ভাগের একভাগ করে দেয়া হয়েছে। এভাবে মায়ের অংশ থেকে যে ছয় ভাগের এক ভাগ বের করে নেয়া হয়েছে তা বাপের অংশে দেয়া হবে। কেননা এ অবস্থায় বাপের দায়িত্ব বেড়ে যায়। মনে রাখতে হবে, মৃতের বাপ-মা জীবিত থাকলে তার ভাই-বোনরা কোনো অংশ পাবে না।
অসিয়তের বিষয়টি ঋণের আগে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ঋণ রেখে মারা যাওয়া কোনো জরুরি বিষয় নয়। কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে অসিয়ত করা তার জন্য একান্ত জরুরি। তবে বিধানের গুরুত্বের দিক দিয়ে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এ
ব্যাপারে একমত যে, ঋণের স্থান অসিয়তের চাইতে অগ্রবর্তী। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি ঋণ রেখে মারা যায়, তাহলে সর্বপ্রথম তার পরিত্যাক্ত সম্পত্তি থেকে তা আদায় করা হবে, তারপর অসিয়ত পূর্ণ করা হবে এবং সবশেষে মীরাস বণ্টন করা হবে। অসিয়ত সম্পর্কে সূরা বাকারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার সমগ্র সম্পত্তির তিন ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত অসিয়ত করতে পার। অসিয়তের এই নিয়ম প্রবর্তনের কারণ হচ্ছে এই যে, মীরাসী আইনের মাধ্যমে যেসব আত্মীয়-স্বজন পরিত্যক্ত সম্পত্তির কোনো অংশ পায় না, এখান থেকে তাদের যাকে যে পরিমাণ সাহায্য দেবার প্রয়োজন উপলদ্ধি করা হয়, তা নির্ধারণ করা যেতে পারে। যেমন কোনো এতিম নাতি বা নাতনী রয়েছে। মৃত পুত্রের কোনো বিধবা স্ত্রী কষ্টে জীবন যাপন করছে। অথবা কোনো ভাই, বোন, ভাবী, ভাই-পো, ভাগনে বা কোনো আত্মীয় সাহায্য-সহায়তা লাভের মুখাপেক্ষী। এ ক্ষেত্রে অসিয়তের মাধ্যমে তাদের অন্য হকদারদের জন্য বা কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে সম্পত্তির অংশ অসিয়ত করা যেত পারে। সারকথা হচ্ছে এই যে, সম্পদ-সম্পত্তির তিন ভাগের দু'ভাগ বা তার চাইতে কিছু বেশি অংশের ওপর ইসলামী শরীয়াত মীরাসের আইন বলবৎ করেছে। শরীয়াতের মনোনীত ওয়ারিসদের মধ্যে তা বণ্টন করা হবে।
আর তিন ভাগের এক ভাগ বা তার চেয়ে কিছু কম অংশের বণ্টনের দায়িত্বভার নিজের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। নিজের বিশেষ পারিবারিক অবস্থার প্রেক্ষিতে (যা বিভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন হয়ে থাকে) সে যেভাবে সংগত মনে করবে বণ্টন করার জন্য অসিয়ত করে যাবে। তারপর কোনো ব্যক্তি যদি তার অসিয়তে জুলুম করে অথবা অন্য কথায় নিজের ইখতিয়ারকে এমন ত্রুটিপূর্ণভাবে ব্যবহার করে যার ফলে কারো বৈধ অধিকার প্রভাবিত হয়, তাহলে এর মীমাংসার দায়িত্ব পরিবারের লোকদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। তারা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এ ত্রুটি সংশোধন করে নেবে অথবা ইসলামী আদালতের কাযীর কাছে এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার আবেদন জানাবে এবং তিনি অসিয়তের ত্রুটি দূর করে দেবেন।
মীরাসে আল্লাহ প্রদত্ত আইনের গভীর তত্ত্ব উপলব্ধি করতে যারা সক্ষম নয়, এ ব্যাপারে যাদের জ্ঞান অজ্ঞতার পর্যায়ভুক্ত এবং যারা নিজেদের অপরিপক্ক বুদ্ধির সাহায্যে (তাদের জ্ঞান অনুযায়ী) আল্লাহর এই আইনের ত্রুটি দূর করতে চায়, তাদেরকে এ জবাব দেয়া হয়েছে।