📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 পূর্ববর্তী আলোচনার সারনির্যাস

📄 পূর্ববর্তী আলোচনার সারনির্যাস


১. কুরআন ও হাদীসের অকাট্য দলীল বাদ দিলেও মানুষের সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি একটি দেশের শাসন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার জন্য একটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার অপরিহার্যতা একান্তভাবে অনুভব করে। সেজন্য প্রবলভাবে তাকীদ জানায়। কেননা এইরূপ রাষ্ট্র না হলে যেমন একটি সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না, তেমনি সমাজের লোকদের মধ্যে সুবিচার ও ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠা, প্রত্যেকটি নাগরিকের মানবিক মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা কোন প্রকারেই সম্ভব নয়। সম্ভব নয় জনগণের স্বাধীনতা রক্ষা ও সকল প্রকার বিজাতীয় বা বৈদেশিক আগ্রাসন থেকে নিরাপত্তা দান করা। এরূপ একটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যকর না হলে চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা, লুট-পাট ও মারমারি রক্তা-রক্তি দেখা দেয়া অনিবার্য হয়ে পড়বে।

২. বিশেষত মুসলিম জনগণ একটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা কায়েম করতে বাধ্য। আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাত স্পষ্ট ও উদাত্ত কণ্ঠে সেজন্য আদেশ দিয়েছে, যা মেনে চলতে তারা সকলেই বাধ্য। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান-আদেশ ও নিষেধসমূহ বাস্তবায়িত করার জন্য রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা একান্তই অপরিহার্য। মানুষের ব্যক্তিগত, সমাজগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে পালন ও অনুসরণের জন্য আল্লাহ ও রাসূলের দেয়া বিধান কার্যকর ও বাস্তবায়িত হতে পারে না একটি রাষ্ট্র ও সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থা ব্যতিরেকে।

৩. দ্বীন ইসলামের প্রতিষ্ঠা, নির্বিঘ্নে জনগণের দ্বীন পালন ও সকল ভয়-ভীতি প্রতিবন্ধকতা মুক্ত আদর্শিক জীবন যাপনের সুযোগ লাভের জন্যই একটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা-সরকার-কায়েম করা অপরিহার্য।

৪. ইসলামী প্রশাসন সরকার-রাজতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক, অভিজাত লোকদের বা ধনী লোকদের শাসন ব্যবস্থা নয়। তা তথাকথিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কায়েম হওয়া সরকার-ও নয়-যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দেশসমূহে চালু রয়েছে এবং তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশসমূহে যা প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া হচ্ছে বা যার দিন-রাত দোহাই দেয়া হচ্ছে।

এই সব কয়টি কথার বিশ্লেষণ পূর্ববর্তী আলোচনায় বিস্তারিতভাবে করা হয়েছে। প্রমাণ করা হয়েছে যে, মানুষ কল্পিত সব কয়টি শাসন ব্যবস্থাই বাতিল। এক্ষণে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তাহলে সর্বোত্তম শাসন ব্যবস্থা-ইসলামী শাসন ব্যবস্থা-কি, কি তার পরিচয়?

ইসলামী হুকুমাত বা শাসন-ব্যবস্থার রূপরেখা কি, এ পর্যায়ে প্রাচীনকালীন মুসলিম চিন্তাবিদদের নিকট থেকে সুস্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে কিছু পাওয়া গেছে এমন দাবি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যে দু'চারখানি গ্রন্থ এ পর্যায়ে পাওয়া গেছে, তার কোন একটিতেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত ও সহজবোধ্যভাবে কিছুই লেখা হয়নি। মোটামুটিভাবে কয়েকটি কথা লিখে-ই দায়িত্ব পালন করতে চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে হয়। কুরআন ও সুন্নাতে প্রায় সব মৌলিক বিষয়াদি আলোচিত হওয়া সত্ত্বেও মনীষীদের লেখনীপ্রসূত গ্রন্থাদিতে তার বিস্তাতির আলোচনা না থাকা আমাদের-বিশেষ করে এই পর্যায়ের-দীনতাই প্রমাণ করে। ১

প্রাচীন মনীষীদের লিখিত গ্রন্থাদিতে ইসলামী হুকুমাতের প্রকৃত রূপরেখা বিস্তারিত ও স্পষ্ট আলোচিত না হওয়ার মূলে কতকগুলি বাস্তব ও ঐতিহাসিক কারণ নিহিত রয়েছে বলে মনে হয়। কারণগুলি নিম্নরূপঃ

১. 'খিলাফতে রাশেদা'র পর-গ্রন্থ প্রণয়ন শুরু হওয়ার সময় - মুসলিম জাহানে কুরআন-সুন্নাহ মুতাবিক প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম না হওয়া- কায়েম না থাকা। রাষ্ট্র-শাসনে প্রকৃত ইসলামী আদর্শ অনুসরণ না করা ও তার উপর প্রতিষ্ঠিত না থাকার দরুণ-অত্যাচারী গায়ের-ইসলামী হুকুমাতের সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে। ফলে 'কুরআন-সুন্না'র মৌলনীতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা সম্বলিত গ্রন্থ রচনা অসম্ভব হয়ে দেখা দিয়েছিল।
এ সময়ে মুসলমানদের শাসন ব্যবস্থা 'খিলাফত' নামে অভিহিত করা হলেও তা প্রকৃত 'খিলাফত' ছিল না। মুসলমানের শাসন চললেও ইসলামের শাসন চলেনি। ইসলামী শাসনের জরুরী শর্তাবলী সে শাসনে ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

২. রাসূলে করীম (স) ও 'খিলাফতে রাশেদা'র আমল থেকে অনেক দূরে সরে যাওয়ার দরুন কুরআন-সুন্নায় ব্যবহৃত যে সব পরিভাষা নির্ভুলভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের সঠিক রূপরেখা প্রকাশ করে, তার যথার্থ তাৎপর্য অনুধাবন করা কঠিন হয়ে যায়। প্রথম যুগে তা বুঝতে পারা যতটা সহজ ছিল, পরবর্তী যুগে তা আর সহজ থাকে না।

৩. এই আমলের ইতিহাস থেকে মুসলিম শাসনের রূপরেখা তো জানা যায়; কিন্তু ইসলামী শাসনের রূপরেখা বোঝার জন্য তা কিছুমাত্র সহায়ক নয়। বরং তা নির্ভুল ধারণা (Conception) লাভের পথে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুসলিম ইতিহাস ও ইসলামের ইতিহাস তাতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বলা বাহুল্য, আমরা ইসলামী জ্ঞান-গবেষণার প্রাথমিক যুগের মনীষীদের মহান অবদানের কথা অস্বীকার করছি না। তাঁরা ইসলামী চিন্তার প্রণয়ন, তার সমর্থন সংরক্ষণ, তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও তাতে গভীরতা ব্যাপকতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে দিনরাত পরিশ্রম করে গেছেন। তা না হলে আজকের দিনে আমরা ইসলাম সম্পর্কে কোন জ্ঞানই লাভ করতে পারতাম না, তার কোন মাধ্যমও পেতাম না, তা অকপটে স্বীকার করতে হবে।

কিন্তু তা সত্ত্বেও একথাও বলতে আমরা বাধ্য যে, তাঁদের জ্ঞান-গবেষণা আজকের দিনের প্রয়োজন পূরণ করতে পুরাপুরিভাবে সমর্থন হচ্ছে না। এজন্য আজ নতুনভাবে প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে ইসলামের মৌল উৎস কুরআন ও সুন্নাতকে ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় বিষয় চিন্তা-গবেষণা চালানো অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। এখানে আমরা সেই কাজে-ই প্রবৃত্ত হচ্ছি।

আজকের দিনে মুসলিম চিন্তাবিদদের নিকট প্রকৃত ইসলামী হুকুমাতের রূপরেখা অস্পষ্ট ও ম্লান হয়ে গেছে। বহু মুসলিম দেশের শাসকরা ইসলামী পদ্ধতির সরকার না হওয়া সত্ত্বেও এবং নিছক মুসলমান নামধারী ব্যক্তিদের রাজতান্ত্রিক বাদশাহী ও স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হয়েও নিজেদের ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হওয়ার দাবি করছে। আর এই ধরনের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্র প্রধানদের ঐক্য সংস্থাকে 'ইসলামী শীর্ষ সম্মেলন' এবং এসব রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সংস্থাকে 'ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলন' নামে অভিহিত করছে। শুধু তা-ই নয়, এ সব সম্মেলন অনুষ্ঠানকালে তাদের সকল প্রকার কার্যকলাপকেই ইসলামী বলে চালিয়ে দিচ্ছে, যদিও কুরআন-সুন্নাহ নিঃসৃত ইসলামের সাথে তার দূরতম সম্পর্কও নেই।

এখানেই শেষ নয়। ইসলামের প্রকৃত তত্ত্ব ও রূপ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞানহীন মুসলিম রাজনীতিকরা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে ইসলামী রাজনীতি, নিজেদের কায়েম করা বা পরিচালিত রাষ্ট্রকে 'ইসলামী রাষ্ট্র' নামে অভিহিত করতে লজ্জা পান না। পাশ্চাত্যের আল্লাহ্ অস্বীকারকারী ধর্মহীন গণতন্ত্রকে 'ইসলামী' ও ইসলামী হুকুমাত কায়েমের একমাত্র উপায় বলে প্রচার করছে। এসব কারণে বর্তমানে প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা অস্পষ্ট ও ম্লান হয়ে যাওয়া এবং অ-ইসলামীকে ইসলামী মনে করা কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয়।

এই জাতীয় বিভ্রান্তির দিনে সর্বগ্রাসী জাহিলিয়াতের অন্ধকার থেকে আমাদেরকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক প্রত্যক্ষ গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনা। তা-ই আমাদের একমাত্র অবলম্বন।

টিকাঃ
১. প্রাচীন মনীষীদের মধ্যে কেবলমাত্র আল-মা-ওয়ার্দী লিখিত গ্রন্থ الاحكام السلطانية ই উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু তাতেও প্রশাসন পদ্ধতি পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা নেই বললেও অত্যুক্তি হবে না। -গ্রন্থকার।

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 ইসলামী হুকুমাতের বিশেষত্ব

📄 ইসলামী হুকুমাতের বিশেষত্ব


কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলামী হুকুমাতের কয়েকটি বিশেষত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ্য। এই বিশেষত্বসমূহ ইসলামী হুকুমাতকে অন্যান্য ধরনের হুকুমাত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্রভাবে প্রতিভাত করে। বর্তমানে যে সব রাষ্ট্র সম্পূর্ণ মিথ্যামিথ্যিভাবে ইসলামী হুকুমাত না হয়েও ইসলামের পতাকা উড়ায় দুনিয়ার মানুষকে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে, সেগুলোও যে আসলে আদৌ ইসলামী নয়, তা এ বৈশিষ্ট্যগুলির ভিত্তিতেই নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়ে যায়।

বস্তুত ইসলামী হুকুমাতের প্রথম ভিত্তি হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। আর দ্বিতীয় ভিত্তি হচ্ছে, আল্লাহ্র কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহ-ই আইনের একমাত্র উৎস।

যে সরকারে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব নিরংকুশভাবে গৃহীত নয় বরং আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কারোর জনগণের, কোন ব্যক্তির, কোন বংশের বা কোন শ্রেণীর সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত, তা কখনই ইসলামী সরকার হতে পারে না।

আল্লাহর শুধু সার্বভৌমত্ব স্বীকার করলেই হবে না, আল্লাহ্র একক আইনকেও পূর্ণ স্বীকৃতি দিতে হবে। আল্লাহ্ কালাম কুরআন মজীদ এবং কুরআনের বাহক রাসূলের সুন্নাতকে আইনের উৎস- তারই আইনকে দেশের আইনরূপে স্বীকৃতি দিতে ও জারি করতে হবে। অন্যথায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকারকারী রাষ্ট্র বা সরকারও 'ইসলামী' পরিচিতি লাভ করতে পারে না। কেননা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বাস্তবতা তো আল্লাহর আইন পালনের মাধ্যমেই সম্ভব। আল্লাহ্র আইন পালনে অনীহা দেখালে আল্লাহর স্বার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যায়।

বস্তুত ইসলামী ও অ-ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে এ দুটি ভিত্তিতেই পার্থক্য হয়ে থাকে। এ পার্থক্য একটি শানিত তীক্ষ্ণ মানদণ্ড। এই মানদণ্ডে ওজন করলে বর্তমানকালের বহু ইসলামী হুকুমাত হওয়ার দাবিদার রাষ্ট্র ও সরকারও সম্পূর্ণ 'গায়র ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার' বলে প্রমাণিত হবে。

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 সার্বভৌম কার

📄 সার্বভৌম কার


'আল-কুরআনের আলোকে শির্ক ও তওহীদ' গ্রন্থে আমরা কুরআন ভিত্তিক আলোচনায় দেখিয়েছি যে, সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। সার্বভৌমত্বের যে সংজ্ঞা ও পরিচিতি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দেয়া হয়েছে, সে দৃষ্টিতেও সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহই হতে পারেন, আসমান-যমীনে আল্লাহ্ ছাড়া সার্বভৌম আর কেউ নেই, কেউ হতেই পারে না।

কুরআনের দৃষ্টিতে সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর, সার্বভৌম আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ-ই নয়; তাঁর মুকাবিলায় মানুষের স্থান ও মর্যাদা শুধু সেই সার্বভৌম আল্লাহর দাসত্ব করা, একান্ত অনুগত দাস হয়ে জীবন যাপন করা। তিনিই মানুষের দাসত্ব-ব্যবস্থা নাযিল করেছেন তাঁরই মনোনীত সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর মাধ্যমে। রাসূল (স) আল্লাহ্ আইন বিধান অনুসরণ ও কার্যকরকরণের মাধ্যমেই আল্লাহর, সার্বভৌমত্ব বাস্তবায়িত করেছেন। এই বাস্তবায়ন পদ্ধতি-ই হচ্ছে রাসূলের সুন্নাত। কুরআন মজীদের বহু সংখ্যক আয়াতে এ কথা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় বলা হয়েছে। এখানে কতিপয় আয়াত আমরা পুনরায় উদ্ধৃত করছিঃ

إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ يَقُصُّ الْحَقَّ وَهُوَ خَيْرُ الْفَاصِلِينَ (الانعام: ٥٧)
চূড়ান্ত হুকুম দেয়ার-সার্বভৌমত্বের অধিকার কারোরই নেই, আছে কেবলমাত্র আল্লাহ্ জন্য। তিনি পরম সত্য কথা বলেন, আর তিনি-ই হচ্ছেন সর্বোত্তম ফয়সালাকারী।

أَلَا لَهُ الْحُكْمُ وَهُوَ أَسْرَعُ الْحَسِبِينَ (الانعام: ٦২)
তোমরা জেনে রাখবে, সার্বভৗমত্ব কেবলমাত্র (সেই) আল্লাহরই, আর তিনিই হচ্ছেন সর্বাধিক দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।

আল্লাহ তা'আলা প্রাকৃতিক জগতের একমাত্র স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রণকারী ও পরিচালক। এখানেই শেষ নয়। বরং তিনি মানব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন-বিধান দাতাও। মৌলিকভাবে এ অধিকারও কেবলমাত্র আল্লাহ্রই জন্য সংরক্ষিত। কেননা এই সৃষ্টি তাঁর, এর উপর হুকুম চালাবার অধিকারও একমাত্র তাঁরই হতে পার! তাই রয়েছেও। তবে তিনি নিজেই যদি কাউকে তাঁর দেয়া শিক্ষা ও বিধানের ভিত্তিতে হুকুম দেয়ার অনুমতি দেন, তবে সেই অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিও 'হুকুম' দিতে পারবে। তবে তার জন্য দুটি শর্ত! একটি, মূলত সার্বভৌমত্ব ও হুকুম দেয়ার অধিকার যে একমাত্র আল্লাহ্-একথা তাকে অকপটে ও নিঃশর্তে মেনে নিতে হবে এবং তা ঘোষণা করতে হবে। আর দ্বিতীয় এই যে, তার হুকুম দেয়ার প্রাপ্ত ক্ষমতা আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যবহার করতে হবে। হুকুম দেয়ার তার নিজের কোন মৌলিক অধিকার নেই-একথা যেমন তাকে মানতে হবে, সেই সাথে আল্লাহ্ নির্ধারিত সীমা লংঘন করে মানুষের উপর নিজের হুকুম চালাবার কোন অধিকারই তার নেই, একথাও তাকে মানতে হবে। কেননা এই উভয় ব্যাপারে আল্লাহর অধিকার নিরংকুশ, অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

আল্লাহর পরে হুকুম দেয়ার অধিকার আল্লাহই দিয়েছেন তাঁর নিজ মনোনীত নবী-রাসূলগণকে! কুরআনে এ পর্যায়ের বহু আয়াত রয়েছে। একটি আয়াতে হযরত দাউদ (আ)-কে সম্বোধন করে আল্লাহ্ বলেছেনঃ
إِنَّا جَعَلْنَكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ (ص: ٢٦)
হে দাউদ, আমরা তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করেছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে পরম সত্যতা সহকারে হুকুম চালাও।

এ আয়াতের প্রথম কথা, হযরত দাউদ (আ) নিজে সার্বভৌম নন, তিনি সার্বভৌমের খলীফা, প্রতিনিধি, স্থলাভিষিক্ত এবং তাঁরই নিয়োজিত। আয়াতে তাঁকে লোকদের মধ্যে হুকুম চালাবার নির্দেশ আল্লাহই দিয়েছেন। কিন্তু তা নিরংকুশ নয়। সে জন্য দুটি শর্ত স্পষ্ট। একটি, তিনি নিজেকে আল্লাহর নিয়োজিত খলীফা মনে করবেন, খলীফা হিসেবেই হুকুম চালাবেন, সার্বভৌম হিসেবে নয়। আর দ্বিতীয়, তিনি নিজ ইচ্ছা ও খাহেশ অনুযায়ী হুকুম চালাতে পারবেন না, তা চালাতে হবে পরম সত্যতা সহকারে। الحق শব্দটির অর্থ প্রায় তাফসীর লেখক-ই বলেছেন السعدل সুবিচার ও ন্যায়পরতা, যা কেবলমাত্র আল্লাহর বিধানভিত্তিক বিচার ও শাসনকার্যেই সম্ভব। মানুষের ইচ্ছামত হুকুম দেয়া বা বিচার করায় সুবিচার ও ইনসাফ হতে পারে না। একথা উপরোদ্ধৃত আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেনঃ
وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلُّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ .
এবং তুমি নিজের ইচ্ছা-বাসনা-খাহেশকে অনুসরণ করে হুকুম দিও না, ফায়সালা করো না। যদি তা-ই কর তাহলে তোমার এই ইচ্ছা-বাসনা কামনা তোমাকে আল্লাহ্র পথ থেকে ভ্রষ্ট করে দেবে।

আর আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট হওয়ার অর্থ জুলুম করা, সুবিচার না করা।
কেননা মানুষের ইচ্ছা-বাসনা-কামনা কখনই নির্ভুল হতে পারে না-নির্ভুল হতে পারে কেবল মাত্র আল্লাহ্র বিধান। মানুষ আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে নিজ ইচ্ছা বাসনা-কামনা অনুযায়ী হুকুম দিলে-বিচার করলে নিজেকেই আল্লাহ্র আসনে আসীন বানানো হয়। তখন সে আল্লাহর বান্দা থাকে না, নিজের বান্দা হয়ে যায়। এ কথা যেমন সাধারণ মানুষ-মুসলমানদের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি নবী-রাসূলগণও যেহেতু মানুষ, তাঁদের বেলায়ও সত্য।

নবী-রাসূলগণের বেলায়ও উক্ত কথা সত্য, তার প্রমাণ উক্ত সূরা'র ২২-২৩ আয়াতে উল্লেখ করা একটি মামলার বিবরণ দিয়ে আল্লাহ নিজেই পেশ করেছেন। দুইজন বিবদমান ব্যক্তি হযরত দাউদ (আ)-এর নিকট বিচার প্রার্থনা করেছিল এবং বলেছিলঃ
فَاحْكُمْ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ وَلَا تُشْطِطْ وَاهْدِنَا إِلَى سَوَاءِ الصِّرَاطِ .
আপনি আমাদের দুইজনের মধ্যে পরম সত্যতা-সুবিচার-ন্যায়পরতা সহকারে ফয়সালা করে দিন, বাড়াবাড়ি বা জুলুম করবেন না এবং আমাদেরকে ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখাবেন।

কিন্তু হযরত দাউদ (আ) রায় হিসেবে যা বলেছিলেন, তিনি নিজেই তা বলতে বলতেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, কথাটি ঠিক হয়নি।
فَاسْتَغْفَرَ رَبَّهُ وَخَرَّرَاكِعًا وَأَنَابَ (ص: ٢٤)
তাই তার রব্ব-এর নিকট মাগফিরাত চাইল, সিজদায় পড়ে গেল এবং রব্ব-এর দিকে প্রত্যাবর্তন করল।

লক্ষণীয় যে, বিচার প্রার্থীরা বিচার চেয়েছিল পূর্ণ ন্যায়পরতা ও ইনসাফ সহকারে। আর নবীর পক্ষেও যে বাড়াবাড়ি-সীমালংঘন-অবিচার করা অসম্ভব নয়, তা বুঝতে পেরে-মনে এই বিশ্বাস রেখেই তারা বলেছিলেনঃ অবিচার ও বাড়াবাড়ি করবেন না। আর আমাদেরকে ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখাবেন। ভারসাম্যপূর্ণ পথ তো ভারসাম্যপূর্ণ-পক্ষপাতহীণ, তা বিচারের মাধ্যমেই দেখানো সম্ভব। আর তারই দাবি তারা জানিয়েছিল।

এ আলোচনা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, নবী আল্লাহর খলীফা, হুকুম দেয়ার অধিকার আল্লাহ্র নিকট থেকে প্রাপ্ত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর নিজের ইচ্ছা-বাসনা-কামনা অনুযায়ী হুকুম করার, রায় দেয়ার কোন অধিকার তাঁর ছিল না। এ অধিকার করোরই থাকতে পারে না।

আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবী-রাসূলগণকে যে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে লোকদের মধ্যে হুকুম চালাবার অধিকার দিয়েছেন, তা যেমন পূর্ববর্তী আয়াত ও আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে, তেমনি একটি আয়াতে সাধারণভাবেই এই অধিকার দেয়ার কথা আল্লাহ নিজেই বলেছেনঃ
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَةَ فِيهَا هُدًى وَنُورَ يَحْكُمُ بِهَا النَّمِنَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا (المائدة: ٤٤)
আমরা তওরাত নাযিল করেছি, তাতে ছিল হেদায়েত ও আলো, সমস্ত নবী যারা মুসলিম ছিল-তদানুযায়ী হুকুম চালাবে- ফয়সালা করবে.....

এ আয়াতে মূলত হুকুম দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর, একথা চূড়ান্তভাবে মনে করিয়েই আল্লাহ্ তওরাত নাযিল করেছেন। বলেছেনঃ সেই তওরাত অনুযায়ী নবীগণ হুকুম চালাবেন। তবে সেজন্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁদেরকে সর্বপ্রথম আল্লাহ্ সার্বভৌমত্বের নিকট আত্মসমর্পিত হতে হবে, তারপরই আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী হুকুম চালাবার অধিকার জন্মাবে নবী-রাসূলগণের, তার পূর্বে নয়।

নবী-রাসূলগণ ছাড়া সাধারণ লোকেরাও লোকদের উপর হুকুম চালাতে পারে। তার জন্যও শর্ত রয়েছে যে, তাদের সুবিচার নীতির অনুসারী হতে হবে। সুবিচার নীতির অনুসারী হওয়ার অর্থ যে আল্লাহর বিধান পালনকারী ও আল্লাহর বিধান-ভিত্তিক হুকুমদাতা সুবিচারক হওয়া, তা পূর্বেই প্রমাণ করা হয়েছে। এ পর্যায়ে আল্লাহর কথা হচ্ছেঃ
يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِنْكُمْ (المائدة: ٩٥)
তোমাদের মধ্য থেকে কেবল তারাই হুকুম চালাবে, যারা সুবিচার নীতির অর্থাৎ আল্লাহ্র বিধানের- ধারক ও অনুসারী।

এ কারণে আল্লাহ্ নিজেকে সকল হুকুমদাতা-সকল বিচারকের তুলনায় অধিক উচ্চমানের হুকুমদাতা-সর্বোচ্চ বিচারক হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। বলেছেনঃ
أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَحْكَمِ الْحَكِمِينَ (التين : ۸)
আল্লাহ কি সকল হুকুমদাতা-বিচারকের তুলনায় অধিক ভালো হুকুমদাতা-বিচারক নন?

আল্লাহর হুকুম দান মৌলিক, অন্যদের হুকুম দান আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা ভিত্তিক। আল্লাহ্ বিচার সর্বাধিক নিরপেক্ষ, অন্যদের বিচার আল্লাহর বিধানের ভিত্তি গ্রহণের মুখাপেক্ষী। আল্লাহর কথাঃ
وَهُوَ خَيْرُ الحكمين ( الاعراف: ۸۷)
তিনি-ই সর্বোত্তম হুকুমদাতা, বিচারক এই পর্যায়েরই।

আল্লাহ মানুষের জন্য বিধান নাযিল করেছেন, কিন্তু সেই বিধান মানব সমাজের দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় ব্যাপারে কার্যকর ও বাস্তবায়িত করা আল্লাহ্র কাজ নয়। সেজন্য তিনি প্রথম দিন থেকেই মানুষের নিকট নবী-রাসূল পাঠাবার ব্যবস্থা করেছেন। নবী-রাসূলগণের কাজ হচ্ছে, একদিকে আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার সাধারণ ও ব্যাপক আহবান জানানো এবং অপরদিকে আল্লাহর নাযিল করা বিধানকে বাস্তবায়িত করা। এ কারণে আল্লাহ্ নিজেই তাদেরকে হুকুম দেয়ার অধিকার দান করেছেন। নবী-রাসূলগণ এ উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ কর্তৃক নিয়োজিত। কাজেই আল্লাহ্র বিধানের ভিত্তিতে নবী-রাসূলগণ যখন কোন হুকুম করেন, তখন তা সেইসব লোকের জন্য অবশ্য পালনীয় হয়ে যায়, যারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্বেই ঈমান এনেছে। তাই আল্লাহ্ বলেছেনঃ

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولَهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخَيْرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ، وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا (الاحزاب: (٣٦)
আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল যখন কোন বিষয়ে আদেশ করেন- চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেন, তখন কোন মু'মিন পুরুষ স্ত্রীর জন্য তাদের ব্যাপার সংক্রান্ত এই হুকুম বা ফয়সালা মেনে নেয়া-না নেয়ার কোন ইখতিয়ারই থাকতে পারে না। যদি কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অমান্য করে, তাহলে সে সুস্পষ্ট গুমরাহীর মধ্যে পড়ে গেল।

নবী-রাসূলগণের যেমন আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ভিত্তিক হুকুম দেওয়ার অধিকার আছে-আল্লাহ-ই দিয়েছেন, অনুরূপভাবে নবী-রাসূলগণের অনুপস্থিতিতে মুসলমানদের মধ্য থেকে বাছাই করে নেয়া সমাষ্টিক দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও হুকুম করার, বিচার-ফয়সালা করার অধিকার রয়েছে-আল্লাহ্ নিজেই এ অধিকার দিয়েছেন। তবে তা কোন অবস্থায়ই স্বতঃস্ফূর্ত বা নিঃশর্ত নয়, তা একান্তভাবে আল্লাহ ও রাসূল প্রদত্ত এবং আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্যের শর্তাধীন। ইরশাদ হয়েছেঃ
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ آمَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِى ٱلْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ (النساء: ٥٩)
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে সামষ্টিক দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও।

এ আয়াতে সর্বপ্রথম নির্দেশ হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্যের, তারপর রাসূলের আনুগত্যের, তারপর সামষ্টিক দায়িত্ব সম্পন্ন লোকদের।
আদেশটি যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ্, তাই তিনি একক ও মৌলিকভাবে আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী হয়েও রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন, কেননা আল্লাহর আনুগত্য বাস্তবায়িত হতে পারে না রাসূলের আনুগত্য না করলে। রাসূলের আনুগত্য করলে আল্লাহ্ও আনুগত্য বাস্তবভাবে হওয়া সম্ভব। তাই আল্লাহ্র আনুগত্যের বাস্তব উপায়ই হচ্ছে রাসূলের আনুগত্য করা। যেমন আল্লাহ্ নিজেই ঘোষণা করেছেনঃ
وَمَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ (النساء: ٨٠)
যে-লোক রাসূলের আনুগত্য করল, সে কার্যত আল্লাহ্রই আনুগত্য করল।

কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য করার স্পষ্ট শব্দগত নির্দেশ দেয়ার পর অনুরূপ শব্দগত নির্দেশ أَطِيعُوا বলে কেবল রাসূল সম্পর্কেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারপরে সামষ্টিক দায়িত্ব-সম্পন্ন ব্যক্তিদের আনুগত্য করার নির্দেশের বেলায় সেই أَطِيعُوا। শব্দের উল্লেখ নেই। কেন নেই? স্পষ্ট বোঝা যায়, রাসূলের আনুগত্য করা মৌলিকভাবেই প্রয়োজন। অন্যথায় আল্লাহর আনুগত্য হতে পারে না। অতঃপর মানুষের নিকট আনুগত্য পাওয়ার ও চাওয়ার মৌলিক অধিকার আর কারোরই নেই। সে আনুগত্য অবশ্যই শর্তাধীন হবে। অর্থাৎ রাসূলের অনুপস্থিতিতে মানব সমাজের নিকট আনুগত্য চাওয়ার ও পাওয়ার অধিকার কেবলমাত্র সেই সব সমাষ্টিক দায়িত্ব সম্পন্ন ব্যক্তিদের, যারা নিজেরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, আল্লাহর বিধান ও রাসূলের বাস্তব অনুসরণ-সুন্নাত-অনুযায়ী হুকুম দেবে। যারা তা করবে না, তাদের কোন অধিকারই থাকতে পারে না মানুষের নিকট আনুগত্য চাওয়ার ও পাওয়ার।

এই ব্যাখ্যার বাস্তব রূপ আমরা পাই রাসূলে করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম জনগণ কর্তৃক 'খলীফায়ে রাসূল' হিসেবে নির্বাচিত হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর প্রথম নীতি নির্ধারণী ভাষণে। তাঁর সেই নাতিদীর্ঘ ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেনঃ
اِنْ اَحْسَنْتُ فَاعِينُونِي وَإِنْ أَسَاتُ فَقَوْمُونِي ................. اَطِيعُونِي مَا أَطَعْتُ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِذَا عَصَيْتُ فَلَا طَاعَةَ لِى عَلَيْكُمْ (বুখারী, হাদীস আয়েশা রা.)
আমি ভালো করলে তোমরা আমার সাহায্য করবে। আর মন্দ করলে তোমরা আমাকে ঠিক করে দেবে। তোমরা আমার আনুগত্য করবে যতক্ষণ আমি নিজে আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য করতে থাকব। আর আমিই যদি নাফরমানী করি তাহলে তোমরা আমার আনুগত্য করতে বাধ্য নও।

রাসূলে করীম (স)-এর নেতৃস্থানীয় সাহাবীগণ মসজিদে নববীতে উপস্থিত থেকে প্রথম খলীফার এই ভাষণ শুনেছিলেন। রাসূলে করীম (স)-এর অনুপস্থিতিতে মুসলমানদের সরকার বা প্রশাসন ব্যবস্থা কি হবে তার স্পষ্ট নীতি নির্দেশ এই ভাষণে ধ্বনিত হয়েছে এবং তা সকল সাহাবী কর্তৃক সমর্থিত ও হয়েছে।

বস্তুত রাষ্ট্র ও প্রশাসনে নাগরিকদের আনুগত্যই হচ্ছে মূল ভিত্তি। যেখানে এই আনুগত্য নেই সেখানে ভৌগোলিক এলাকা ও জনতা ইত্যাদির উপস্থিত থাকলেও প্রকৃতপক্ষে একটি রাষ্ট্র ও সরকার গড়ে উঠতে ও চলতে পারে না। হযরত আবূ বকর (রা) সেই আনুগত্যের কথা-ই বলেছেন, চেয়েছেন, তবে তা নিরংকুশ যেমন নয়, তেমনি নিঃশর্তও নয়।

নিরংকুশ নয় বলেই তিনি বলেছিলেনঃ আমি ভাল কাজ করলে তোমরা আমার সাহায্য করবে। আর মন্দ কাজ করলে তোমরা আমাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেবে।
বোঝা যাচ্ছে, ইসলামী বিধানে নাগরিকদের শুধু অন্ধ-নির্বাক আনুগত্য করে যাওয়াই কাজ নয়। সরকার ও সরকার চালক ভাল করছে কি মন্দ করছে সে দিকে তীক্ষ্ণ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখাও তাদের কর্তব্য। শুধু দৃষ্টি রাখাই নয়, শুধু আনুগত্য করে যাওয়াই নয়- সরকারের সাথে সহযোগিতা করাও কর্তব্য। কিন্তু সে সহযোগিতাও নিঃশর্ত নয়। জনগণ সরকারের সকল কাজে সহযোগিতা করতে সরকারী দায়িত্ব পালনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করতে বাধ্য। তবে জেন্য শর্ত হচ্ছে সরকারের 'ভাল কাজ' করা। সরকার ভাল কাজ করলেই এই সহযোগিতা করা যাবে, ভাল কাজ করলেই সরকার জনগণের নিকট সহযোগিতা চাইতে পারে। আর সেই ভাল কাজে জনগণ সরকারের সাথে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে একান্তই বাধ্য।

এই সহযোগিতা ছাড়া কোন সরকার চলতে পারে না। তাই সরকার-সরকার প্রধানকেই জনগণের নিকট এই সহযোগিতা চাইতে হবে এবং জনগণ যাতে সরকারের কাজে সহযোগিতা করতে পারে তার উপায় ও সুযোগ সরকারকেই বের করতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে সরকার কোন বহির্দেশীয় বা বহির্জগতের ব্যাপার নয়। সরকার ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই যে রাষ্ট্রীয় কাজ সম্পন্ন হয়, তা-ই হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার। আর এ জন্যই ইসলাম নাগরিকদের গঠনমূলক সমালোচনা করার পাশ্চাত্য ধর্মহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যায় শুধু অধিকারই দেয়নি বরং তা করা প্রত্যেকটি নাগরিকের দ্বীনী কর্তব্য বলেও ঘোষিত হয়েছে।

প্রথম খলীফার শেষ কথা ছিলঃ তোমরা আমার আনুগত্য করে চলবে, যতক্ষণ আমি আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য করি। আর আমি-ই যদি আল্লাহ্ ও রাসূলের নাফরমানী করি, তা হলে তোমরা আমার আনুগত্য করতে বাধ্য নও, আমিও তোমাদের নিকট আনুগত্য চাওয়ার কোন অধিকার রাখি না।

এই শর্তাধীন আনুগত্যই ইসলামের তাওহীদী আকীদার সংরক্ষক। এই আনুগত্য নীতিই রাসূল পরবর্তী কালে ইসলামী সরকার গঠনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে নির্ধারিত করে দিয়েছে। তার সারকথা হচ্ছে, আল্লাহ্ সার্বভৌমত্ব ও রাসূলের চূড়ান্ত নেতৃত্ব স্বীকার করা এবং আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাত ভিত্তিক শাসন-প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

টিকাঃ
১. পাশ্চাত্যের রাষ্ট্র বিজ্ঞানীগণও ইসলামী রাষ্ট্রের এই বিশেষত্বকে অকপটে স্বীকার করেছেন। এ পর্যায়ে সাক্ষ্য হিসেবে আমরা এখানে মাত্র একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর উক্তিই উদ্ধৃত করছি। তিনি হচ্ছেন David de santillana.
তিনি বলেছেনঃ
Islam is the direct government of Allah, the rule of God, whose eyes are upon his people. The principle of unity and order which in other societies is called civitas, polis state, in Islam is personified by Allah: Allah is the name of supreme power acting in the common interest. Thus the public treasury is the treasury of Allah, the army is the army of Allah, even the Public functionaries are the employees of Allah. (santillana 'Law and society' The legacy of Islam' ed. Thomas Walker Arnold Coxpord The Etaroandon Press 1931) P. 286

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন

📄 সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন


কুরআন, সুন্নাতে রাসূল ও প্রাথমিক কালের মুসলিম উম্মতের ইতিহাস স্পষ্টভাবে পথ-নির্দেশ করে যে, মুসলিম উম্মত তাদের শাসক, প্রশাসক ও নেতা নির্বাচন করবে। অবশ্য তা তারা করবে ইসলামী নিয়ম-কানুন অনুযায়ী ও ইসলাম নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে। মুসলিম উম্মতের এই শাসক ও নেতা নির্বাচনের অধিকারই ইসলামী সরকারের প্রকৃতি নির্ধারণ করে। আর এ নির্বাচন পদ্ধতিই ইসলামী হুকুমাতকে দুনিয়ায় প্রচলিত গণতান্ত্রিক ও অন্যান্য সরকার পদ্ধতিসমূহ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে।

এ পর্যায়ের দলীলঃ ১. কুরআন মজীদের কতিপয় আয়াত স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছে যে, মানুষ এই যমীনে আল্লাহর খলীফা। খলীফা হওয়ার ব্যাপারে মানুষে মানুষে কোন তারতম্য বা পার্থক্য নেই। সকল মানুষ সম্পূর্ণ সমান ও পার্থক্যহীনভাবেই আল্লাহর খলীফা। মানুষের এই খিলাফত দুনিয়ায় শেষ পর্যন্ত এক চিরন্তন সত্য হিসেবেই স্বীকৃত এবং ঘোষিত। কিয়ামত পর্যন্ত তাতে কোন পরিবর্তনই সূচিত হবে না।

কুরআন মজীদে মানব সৃষ্টির ইতিহাস উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে, মানুষ যখন সৃষ্টি হয় নি সেই সময় মানব সৃষ্টির সংকল্প প্রকাশ করে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা দিয়েছিলেনঃ
رَبِّى جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً (البقرة : ١٣٠)
আমি পৃথিবীতে খলীফা বানাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।

আল্লাহর ঘোষিত এই খিলাফত ব্যক্তি বিশেষের জন্য বা কোন মানুষের জন্য ব্যক্তিগতভাবে নির্দিষ্ট করা হয়নি। বরং অতঃপর তিনি যে 'আদমকে' সৃষ্টি করলেন, তার সমস্ত বংশধর- সমস্ত মানুষই খলীফা রূপে চিহ্নিত হয়েছিল। কেননা আল্লাহর এই ঘোষণা শ্রবণ করে ফেরেশতাগণ 'খলীফা' সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেনঃ
اَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ تُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ ( البقر : ٣٠)
হে আল্লাহ্, তুমি দুনিয়ায় এমন এক মাখলুক বানাবে, যা তথায় বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে এবং রক্তের বন্যা প্রবাহিত করবে?

ফেরেশতাদের এ আশঙ্কা নিশ্চয় প্রথম সৃষ্ট ব্যক্তি আদমের ব্যাপারে ছিল না, তা ছিল সেই আদমের বংশধরদের ব্যাপারে। অর্থাৎ ফেরেশতাদের আশঙ্কা ছিল, সমগ্র বিশ্বলোকের প্রতিটি বস্তু ও অণু-পরমাণু যখন একান্তভাবে আল্লাহর অনুগত হয়ে আছে, সেখানে 'খলীফা' পদবাচ্য কোন স্বাধীন ইচ্ছাসম্পন্ন সৃষ্টির অবকাশ কোথায়? তাহলে তো তারা এমন-এমন কাজ করতে থাকবে, যার ফলে এই দুনিয়ার শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ভাঙন ও বিপর্যয় দেখা দেয়া এবং রক্তের বন্যা বয়ে যাওয়া একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়বে। স্মরণীয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদের এই আশঙ্কা বোধকে প্রতিবাদ করেন নি, অমূলক বলে উড়িয়েও দেন নি।

এ থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, আল্লাহর 'খলীফা' বানানোর ঘোষণাটি কোন বিশেষ ব্যক্তির জন্য ছিল না, ছিল সমগ্র মানব বংশের জন্য, মানব-বংশের প্রতিটি সন্তানের জন্য। প্রতিটি মানুষ-ই-সে পুরুষ হোক বা নারী-আল্লাহর খলীফা। কেননা- ফেরেস্তাদের আশংকা নিশ্চয়ই ব্যক্তি আদম সম্পর্কে ছিল না, ছিল সমগ্র আদম সন্তানের ব্যাপারে, সমস্ত মানুষের ব্যাপারে। অতএব প্রত্যেকটি মানুষেরই আল্লাহ্র 'খলীফা 'হওয়া অনিবার্যভাবে সুনিশ্চিত।

এ পর্যায়ের আরও কতিপয় আয়াত থেকে এই কথায়ই স্পষ্ট সমর্থন পাওয়া যায়। একটি আয়াতঃ
هُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ فِي الْأَرْضِ (فاطر : ৩৯)
সেই আল্লাহ্-ই তোমাদেরকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছেন।

এ আয়াতে একবচনে 'খলীফা' শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি; বরং বহুবচনের শব্দ خَلَائِفَ 'খলীফাগণ' ব্যবহৃত হয়েছে। এ থেকে তো অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা একজন নয়-কোন এক ব্যক্তি নয়, ব্যক্তিগতভাবে কেউ আল্লাহর খলীফা নয়। বরং প্রত্যেকটি মানুষই আল্লাহর খলীফা। এই মানুষগণই আল্লাহর খলীফাগণ।

আর একটি আয়াতঃ
امَنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا وَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلَكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ وَ إِلهُ مَعَ الله (النمل: (৬২)
কে সেই মহান সত্তা, যিনি ব্যাকুল ও বিপন্ন-অস্থির ব্যক্তির দোয়া শুনেন যখন সে তাঁকে ডাকে এবং কে তার কষ্ট ও বিপদ দূর করেন, (আর কে তিনি) যিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করেন?.... আল্লাহ্র সাথে অপর কোন ইলাহ্ আছে কি?

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে যে, বিপন্ন মানুষের দোয়া শুনেন একমাত্র আল্লাহ্ এবং তাদের বিপদ ও দুঃখ-কষ্ট কেবলমাত্র তিনি-ই দূর করেন। তিনি ছাড়া এ কাজ করার আর কেউ কোথাও নেই। এ-ই হচ্ছে কুরআন উপস্থাপিত প্রকৃত তওহীদী আকীদা। এই তওহীদী আকীদারই অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে, আল্লাহই মানুষকে দুনিয়ায় তাঁর খলীফা নিযুক্ত করেছেন। এ দুনিয়ায় মানুষ যা-ই করবে, তা যদি আল্লাহ্ খলীফা হিসেবে করে, তা হলেই সে তা করার অধিকারী হবে। অন্যথায় তা করার কোন অধিকারই তার থাকতে পারে না। এই খলীফা হওয়ার অধিকার সর্বজনীন- সকল মানুষের ক্ষেত্রে একেবারে সাধারণ।

বলা বাহুল্য, মানুষের এ 'খিলাফত' পূর্ববর্তী কোন সৃষ্টি সমষ্টির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দিক দিয়ে নয়। পূর্ববর্তী কোন সৃষ্টির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দিক দিয়ে মানুষকে খলীফা বলা হয়ে থাকলে কথাটি এভাবে বলার কোন প্রয়োজন ছিল না। সে কথার ধরনই সম্পূর্ণ ভিন্নতর। যেমন এ দিক দিয়েও মানুষকে 'খলীফা' করা হয়েছে কোন কোন আয়াতে। যেমন এই আয়াতটিতেঃ
ثُمَّ جَعَلْنَكُمْ خَلْيْفَ فِي الْأَرْضِ مِنْ بَعْدِهِمْ (يونس: ١٤)
অতঃপর তোমাদেরকেই পৃথিবীতে তাদের পরে স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি বানালাম।

উপরোদ্ধৃত আয়াতসমূহের সারকথা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টিকূলের মধ্যে অত্যন্ত মর্যাদাবান বানিয়েছেন, তাকে পৃথিবীতে তাঁর খলীফা বানিয়েছেন। ফলে মানুষ সমগ্র সৃষ্টিলোকের উপর এক বিশিষ্ট সৃষ্টিরূপে গণ্য হতে পারছে। এ মর্যাদা এই অসংখ্য সৃষ্টিকূলের মধ্যে আর কারোরই নেই। আর মানুষ যেহেতু দুনিয়ায় আল্লাহর খলীফা, এজন্যই আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে সিজদা করার জন্য। এই সিজদা আসলে মানুষের অধীনতা ও বশ্যতা স্বীকারের প্রতীক। এ দুনিয়ায় আল্লাহর খলীফা হিসেবে মানুষ যা-ই করবে, ফেরেশতারা তাতে মানুষের আনুকূল্য করবে, সহযোগিতা করবে, সিজদা তারই নিঃশব্দ স্বীকৃতি মাত্র। সেই সাথে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বেরও স্বীকৃতি।

দুনিয়ায় মানুষকে আল্লাহর খলীফা বলে ঘোষণার ফলে দুটি কথা অনিবার্য হয়ে পড়ে।

১. মানুষ আল্লাহর খলীফা—আল্লাহ্ মহান নাম ও উচ্চতর পবিত্র গুণাবলীর বাস্তব রূপায়ণে।
মানুষ আল্লাহর খলীফা, সে তার অস্তিত্ব দ্বারাই মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রমাণ ও প্রকাশ করছে। মানুষ এ দুনিয়ায় নানা জিনিস উদ্ভাবন করবে, নানা শিল্প কর্ম তৈয়ার করবে, আবিষ্কার করবে, নবোদ্ভাবন করবে, দিন-রাত কাজ করবে এবং এই সব করে মানুষ তার দুঃখকে হাল্কা করবে, অনুর্বরকে উর্বর করবে, বিরান স্থানকে আবাদ করবে, স্থলভাগকে জলভাগে ও জলভাগকে স্থলভাগে পরিণত করবে। গাছ-পালা রোপণ করবে, শ্যামল শোভামণ্ডিত বাগান রচনা করবে, পশু পালন করবে, তার বংশ বৃদ্ধি করবে। সে সবের মধ্যে কেউ ছোট হবে, কেউ বড় হবে। কোনটি গৃহপালিত হবে, আবার কোনটি বন্যই থেকে যাবে। এই সকল প্রকারের প্রজাতি দ্বারা মানুষ উপকৃত হবে, তাকে নিজের কাজে ব্যবহার করবে ঠিক যেমন প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক শক্তিসমূহ এবং অন্যান্য যাবতীয় সৃষ্টিকূক্লকে মানুষ নিজের ইচ্ছামত নানা কাজে ব্যবহার করছে।

যে আল্লাহ্ প্রত্যেকটি জিনিসকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্য একটা বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন اعطى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَى : মানুষকে ধন্য করেছেন। মানুষকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছেন, যেন মানুষ আল্লাহর সুন্নাতকে এখানে কার্যকর করে। তাঁর সৃষ্টি কুশলতাকে উদ্ভাসিত করে তোলে, তাঁর হিকমতের তত্ত্ব-রহস্যকে উদ্‌ঘাটিত করে, তাঁর বিধানের সার্বিক কল্যাণ মানুষ গ্রহণ করে। বস্তুত এ দুনিয়ায় আল্লাহর অসীম-বিস্ময়কর শক্তির ও ব্যাপক-গভীর-সূক্ষ্ণ জ্ঞানের বাস্তব নিদর্শনই হচ্ছে মানুষ। মানুষকে তিনি সর্বোত্তম মানে ও কাঠামোয় সৃষ্টি করেছেনঃ
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيْمِ
আর মানুষ তো এই সব দিক দিয়েই পৃথিবীতে আল্লাহ্র খলীফা।

প্রাকৃতিক-স্বাভাবিক ব্যাপারাদির ক্ষেত্রে মানুষ আল্লাহর খলীফা, তাই পৃথিবীকে আবাদ করা, আবর্জনা-জঞ্জাল মুক্ত করা, এখানে বসবাসের বিপদ সংকুলতা দূর করার দায়িত্ব মানুষের উপরই অর্পিত। আর এ দুনিয়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করেই আল্লাহ্ লক্ষ্যকে বাস্তবায়িত করবে মানুষ। যেমন আল্লাহ্ বলেছেনঃ
هُوَ أَنْشَاكُمْ مِّنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا (هود : ٦١)
সেই আল্লাহই তোমাদেরকে যমীন থেকে পয়দা করেছেন এবং এখানেই তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আল্লাহ্ তা'আলাই স্থান-যমীন ও পশুকূলেরও রব্ব। অতএব আল্লাহ্ খলীফা এই মানুষই সেই সম্পর্কিত যাবতীয় কাজের দায়িত্বশীল। হযরত আলী (রা) তাই বলেছেনঃ
إِنَّكُمْ مَسْئُولُونَ حَتَّى عَنِ الْبِقَاعِ وَالْبَهَائِمِ
তোমরাই দুনিয়ার স্থান ও পশুকূলের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।
সারকথা, মানুষ এ দুনিয়ায় প্রাকৃতিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহর দেয়া শক্তি ও ক্ষমতার বলে আল্লাহ্ সুবহানুহু'র প্রতিনিধি।

২. সেই সাথে মানুষ এ দুনিয়ার মানুষের সামষ্টিক ব্যাপারাদিতে নেতৃত্ব ও প্রশাসকত্বের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ খলীফা।
অর্থাৎ দুনিয়ায় মানুষের আল্লাহ্ খলীফা হওয়ার ব্যাপারটি শুধু উপরে উল্লিখিত ব্যাপারসমূহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষ দেশ শাসন ও জনগণকে নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রেও আল্লাহর খলীফা। কেননা মানুষ যখন দুনিয়ার স্থানসমূহের ব্যবস্থাপনা, জন্তু-জানোয়ারের রক্ষণাবেক্ষণ ও যাবতীয় ব্যাপারাদি সূচারুরূপে সম্পাদনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল- কিয়ামতের দিন এইসব বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে তখন মানুষ তাদের নিজেদের ব্যাপারেও জিজ্ঞাসিত হবে অনিবার্যভাবে। মানুষের ব্যক্তিজীবন, সমাজ, রাষ্ট্র সরকার-প্রশাসন, শিক্ষা, অর্থনীতি ও বিচার ইনসাফ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত না হয়ে পারে না। আর জিজ্ঞাসিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, এসব ব্যাপারে তাদের কঠিন দায়িত্ব রয়েছে। অতএব এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দান তাদের কর্তব্য। আর এ কর্তব্যের কারণেই তারা এ ক্ষেত্রেও আল্লাহর খলীফা।

এসব ক্ষেত্রে মানুষের খিলাফতের দায়িত্ব অবশ্যই পালিত হতে হবে আল্লাহর দেয়া বিধানের ভিত্তিতে। নিজেদের ইচ্ছামত এ দায়িত্ব পালন করার কোন অধিকার মানুষের থাকতে পারে না। ফলে মানুষের প্রশাসনিকতা আল্লাহর খলিফা হিসেবেই কার্যকর হবে এবং আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে এই প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব সম্পাদিত হলেই বাস্তবায়িত হতে পারবে এই যমীনে আল্লাহর খিলাফত। মানুষ আল্লাহর খলীফা হিসেবেই প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্বের অধিকারী হবে, যদিও আসল ও প্রকৃত সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণরূপে ও একান্তভাবে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট, যাতে মানুষের কোন অংশ আদপেই নেই।

তাই বলা যায়, মানুষ এ দুনিয়ায় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করবে কেবলমাত্র আল্লাহর খলীফা হিসেবে, আল্লাহ্ প্রতিনিধি রূপে, নিজস্ব ভাবে নয়।

এই প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব বা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অধিকারী সাধারণভাবে সমস্ত মানুষ। কিন্তু সমস্ত মানুষের পক্ষে এ কর্তৃত্ব চালানো সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ একসাথে কখনই সম্ভব হতে পারে না। সেজন্য মানুষের মধ্য থেকেই কতিপয় লোককে বাছাই করে নিতে হবে ও তাদেরকে সুযোগ দিতে হবে এই কর্তৃত্ব পালন ও সার্বভৌমত্ব কার্যত প্রয়োগ করার জন্য। আর এখানেই নির্বাচনের প্রশ্ন।

সকল মানুষ একসাথে প্রয়োজনীয় সার্বভৌমত্ব-প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ব্যবহার করতে পারে না। তা করার জন্য নির্দিষ্ট এক বা একাধিক ব্যক্তির নিযুক্তি ও ভারপ্রাপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেই এক বা একাধিক ব্যক্তি কে বা কারা? তাদের সাধারণ জনগণ থেকে আলাদা করা ও কার্যে নিয়োজিত করা কিভাবে 'সম্ভব হতে পারে?

তার একটি মাত্র উপায়ই আছে এবং সে উপায় হচ্ছে নির্বাচন। অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরা সমানভাবে প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব তথা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অধিকারী হয়েও তারা সকলে একই সময় কার্যত তা করতে পারে না বলে তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে বাছাই করে তাদেরকে এ কাজের দায়িত্ব দেবে, সেই সাথে বাস্তব সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে তাদেরকে প্রাপ্ত দায়িত্ব সুষ্ঠুরূপে পালন করার অবাধ ও নির্বিঘ্ন সুযোগ করে দেবে।

এই পর্যায়ে দুটি মৌলিক কথা অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে। প্রথম এই যে, জনগণ নিজেদের মধ্য থেকে এক বা একাধিক লোককে বাছাই করবে সেই কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের জন্য, যা মূলত তাদের সকলের, কেবল সেই ব্যক্তিদেরই নয়, যাদেরকে বাছাই করা হয়েছে ও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অতএব এই বাছাই কার্যটি নিঃশর্ত ও পক্ষপাতহীনভাবে সম্পাদিত হতে হবে। অর্থাৎ তারা তাদের নিজেদের সুস্থ ও অনাবিল বিবেচনায় যাকে বা যাদেরকেই অধিক যোগ্য মনে করবে অর্পিতব্য দায়িত্ব পালনের দিক দিয়ে, কেবল তাদেরকেই বাছাই করবে। সে জন্য না নিকটাত্মীয়তার কোন শর্ত থাকবে, না নগদ কোন স্বার্থ লাভের প্রশ্ন উঠবে। উপরন্তু এ ভাবে বাছাই করার পর নির্বাচিত ব্যক্তিদেরকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে পূর্ণ সুযোগ ও সহযোগিতাও দেবে। কেননা তারা যে কাজ করছে, তা তাদের একান্ত নিজস্ব কোন কাজ নয়, তা সকল মানুষের কাজ। কাজেই সে কাজে সকলেরই আন্তরিক সদিচ্ছা ও সহযোগিতা থাকা আবশ্যক।

আর দ্বিতীয় এই-যে বা যারা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হলো, সে কখনই মনে করবে না যে, প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কেবল মাত্র তাদেরই, অন্য কারোরই নয়। বরং মনে করবে, এ কর্তৃত্ব সকলেরই। তবে সকলে তা এক সাথে করতে পারবে না বলেই সকলের পক্ষ থেকেই এই দায়িত্ব তাদের উপর অর্পণ করা হয়েছে। তারা এ কাজ 'নিজেদের কাজ' মন করে করবে না, করবে সকলের কাজ মনে করে। অতএব এই 'ক্ষমতা' লাভের সুযোগে তারা কোন ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করার দিকে মনোযোগ দেবে না, সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকবে এই সামষ্টিক দায়িত্ব পালনের জন্য। উপরন্তু তারা ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহ্ খলীফা হওয়া সত্ত্বেও সামষ্টিক খিলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য জনগণ তাদের নিজস্ব খিলাফতের একটা অংশ তাদেরকে দিয়েছে। এ জন্য তারা তাদেরও খলীফা। এ ভাবে এক দিকে আল্লাহ্ খলীফা হওয়ার সাথে সাথে মানুষেরও খলীফা হওয়ার কারণে তারা যেমন আল্লাহ্র নিকট দায়ী-জবাবদিহি করতে বাধ্য-তেমনি জনগণের নিকটও দায়ী, তাদের নিকটও জবাবদিহি করতে বাধ্য। এ উভয় দিকে জবাবদিহি দায়িত্ববোধের তীব্রতায় এই নির্বাচিত ব্যক্তিরা কখনই স্বৈরতান্ত্রিক হতে পারে না। বরং তারা এ দুনিয়ায় যেমন জনগণের নিকট দায়ী হওয়ার কারণে জনগণের স্বাধীন সমালোচনার সম্মুখীন হতে বাধ্য, তেমনি কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে আল্লাহর ও জনগণের খিলাফতের দায়িত্ব যথাযথরূপে পালন না করলে। এই ভয়ে তাকে বা তাদেরকে সদা কম্পমান হয়ে থাকতে হবে।

এমনকি, জনগণ যে সব গুণের অগ্রবর্তিতা দেখে ও যে-সব দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে বা তাদেরকে নির্বাচিত করেছে-নির্বাচিত হওয়ার পর সেই গুণ হারিয়ে ফেললে ও সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জনগণ তাদের দেয়া খিলাফতের অংশ ফিরিয়ে নিতেও পারবে। কেননা খিলাফতের এই অংশ দান বিশেষ গুণের শর্তে ও বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্যই ছিল। তা-ই যখন থাকল না বা দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম হয়ে গেল, তখন জনগণের দেয়া খিলাফতের অংশ দখল করে থাকার তার বা তাদের কোন অধিকারই থাকতে পারে না。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00