📄 মহব্বত ইবাদত নয়
এসব বর্ণনার মাধ্যমে একদিকে যেমন তাবাররুক রাসুলুল্লাহর সঙ্গে সীমাবদ্ধ হওয়ার দাবি নাকচ হয়ে যায়, অপরদিকে ইবাদত ও মহব্বতের পার্থক্য বুঝে আসে। ইবাদতের মাঝে মহব্বত থাকা অনিবার্য। কিন্তু মহব্বত মানেই ইবাদত নয়। ইসলাম এই দুটো বিষয়ের মাঝে সুস্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে। এ কারণে মানুষের আবেগ-অনুভূতি শরিয়ত-বিরুদ্ধ না হলে ইসলাম সেটা বন্ধ করতে যায়নি। তাই যেকোনো তাবাররুকের একমাত্র তাফসির বিদআত নয়।
মারওয়ান ইবনুল হাকাম একদিন মসজিদে নববিতে ঢুকে আল্লাহর রাসুলের কবরের উপর মুখ রেখে এক ব্যক্তিকে বসা দেখলেন। তিনি তার কাছে গিয়ে ঘাড়ে হাত দিয়ে বললেন, 'তুমি কী করছ তা জানো?' লোকটি ফিরে তাকালেন। দেখা গেল, তিনি রাসুলের মেজবান জ্যেষ্ঠ সাহাবি আবু আইউব আনসারি রাজি। তিনি মারওয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, জানি। আমি আল্লাহর রাসুলের কাছে এসেছি, পাথরের কাছে নয়। আমি রাসুলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, যখন যোগ্য মানুষ দ্বীনের দায়িত্ব নেয়, তার জন্য কেঁদো না; যখন অযোগ্যরা দ্বীনের দায়িত্ব নেয়, তার জন্য কাঁদো।'২ উক্ত বর্ণনা উল্লেখের পিছনে আমাদের উদ্দেশ্য রাসুলের কবর স্পর্শ করে বরকত নেওয়া বৈধ প্রমাণ করা নয়। কারণ, সাহাবি কবরের উপর বরকতের উদ্দেশ্যে মুখ রেখেছিলেন কি না তা স্পষ্ট নয়। উপরন্ত চার মাজহাবের অধিকাংশ ইমাম কবর স্পর্শ না করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, যেমনটি আমরা একটু পরে উল্লেখ করব। এ ঘটনা উল্লেখ করার পিছনে আমাদের উদ্দেশ্য হলো, বিদআতের নামে মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে মূল্যহীন করে দেওয়ার বিরোধিতা করা। যেকোনো কাজ দেখার সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে বিদআত আখ্যায়িত করা ভয়ংকর প্রবণতা। আপনি আগে দেখুন তিনি ইবাদতের উদ্দেশ্যে কাজটি করছেন কি না। আপনি আগে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানুন। তাকে জিজ্ঞাসা করুন, কেন তিনি এমন করছেন। এরপর ফয়সালা দিন। কেউ বলতে পারেন, এভাবে সবাইকে জিজ্ঞাসা করা অসম্ভব। ফলে একটা সাধারণ বিধান (তথা বিদআত ও হারাম) ঘোষণা করা জরুরি। জটিলতা এই জায়গাতেই।
যারা পৃথিবীর দূরদূরান্ত থেকে কাবাঘরে যায়, আল্লাহর রাসুলের রওজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, সেগুলোকে একটু স্পর্শ করে, চুমু দেয়, তাদের অনেকেই সেগুলো বরকতের জন্য করে না; বরং আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের ভালোবাসা তাদের মন ও মননকে এতটাই তৃষ্ণার্ত করে রাখে যে, তারা এই পাথর স্পর্শ করে সেই তৃষ্ণা মেটাতে চান। প্রেমাস্পদ যে পথ দিয়ে হেঁটে যায়, আশিকের সেই পথে হাঁটতে ভালো লাগে। কারণ, সে পথে প্রেমিক তার প্রেমাস্পদের দেখা পায়। প্রেmaষ্পদ যে আলো-বাতাসে জীবন-যাপন করে, সেই আলো-বাতাস আশিকের আবে হায়াত। এগুলো তার জীবনে প্রাণ সঞ্জীবনী শক্তি সরবারহ করে। প্রেmaষ্পদের ঘর-বাড়ির ইট-পাথর আশিকের প্রশান্তির পরশমণি। এগুলোর ছোঁয়াতে খরা জীবনে প্রাণবন্ততার বারিধারা নামে। এসবের সঙ্গে ইবাদত কিংবা বরকত অর্জনের কোনো সম্পর্ক নেই।
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উমরের জীবন ও কর্ম এখানে বেশি প্রাসঙ্গিক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব জায়গাতে গিয়েছেন, পরবর্তীকালে আবদুল্লাহ ইবনে উমর সেসব জায়গায় যেতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পথ দিয়ে হাঁটতেন, যেখানে কদম ফেলতেন, তিনিও সে পথে সেই স্থানে কদম ফেলতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জায়গাতে বসতেন, তিনি সেখানে বসতেন। এভাবে জীবনের প্রত্যেকটা মুহূর্ত তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেছেন। এখানে আমরা প্রথম পক্ষের সঙ্গে একমত যে, সকল সাহাবির বিপক্ষে আবদুল্লাহ ইবনে উমরের এই কাজ আমাদের জন্য অনুসরণীয় নয়। এটা তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কারণ, অন্য কোনো সাহাবি এমন করেননি। কিন্তু যে পয়েন্টে আমরা তাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত করছি এবং এটার মাধ্যমে আমাদের যেটা বোঝানো উদ্দেশ্য তা হলো, সালাফের কেউ ইবনে উমরের এই কাজকে বিদআত বলেননি। যারা দিন-রাত মুসলমানদের বিভিন্ন কাজকে বিদআত বিদআত জপেন তারাও ইবনে উমরের এই কাজকে বিদআত বলার দুঃসাহস করতে পারেননি। অথচ তিনি যে কাজটা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কিংবা প্রথম সারির বুজুর্গ সাহাবাগণ থেকে সেটার কোনো সমর্থন পাওয়া যায় না। তা হলে এটাকে কেন বিদআত বলা হচ্ছে না? কারণ, ইবনে উমর সুন্নাহ ও বিদআত বুঝতেন; ইবাদত ও মহব্বতের পার্থক্য জানতেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, শিরায় শিরায় রাসুলের ভালোবাসা টইটম্বুর ছিল। তাই ওফাতের পরেও সর্বদা রাসুলের জীবদ্দশার মতো কাছাকাছি থাকতে চাইতেন। জীবনের প্রত্যেকটা মুহূর্ত, প্রত্যেকটা নিঃশ্বাস রাসুলুল্লাহর সান্নিধ্যে, তাঁর স্মৃতির সঙ্গে কাটাতে চাইতেন। ফিকহের দাঁড়িপাল্লা এই ভালোবাসার ওজন মাপতে অক্ষম। আশিকের দিলের ব্যথা তো রাসুলের মেজবান আবু আইউব আনসারি ও ইবনে উমররা বুঝবেন। অন্যরা সে ব্যথা কীভাবে বুঝবে? কেউ বলবেন, এটা সকল সাহাবির আমল নয়। ফলে দু-একজনের পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবার অনুসরণ করা কি উচিত নয়? আমরা বলব, হ্যাঁ, অবশ্যই উচিত। কিন্তু দু-একজনের আমলের মাধ্যমে এ কাজের বৈধতা প্রমাণিত হয় এবং বিদআত নাকচ সাব্যস্ত হয়। ফলে উত্তম-অনুত্তম আর বৈধতা-অবৈধতার মাঝে ফারাক রক্ষা জরুরি।
উপরন্তু কেবল আবু আইউব আনসারি কিংবা ইবনে উমর নন; অন্যান্য সাহাবি থেকেও বিভিন্ন পবিত্র স্থানের মাধ্যমে বরকত গ্রহণের কথা প্রমাণিত। যেমন: সাহাবি ইতবান ইবনে মালেক রাজি.-এর প্রসিদ্ধ ঘটনা। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর ঘরে ডেকে নামাজ পড়ান এবং সেই জায়গাটা বরকতস্বরূপ নিজের নামাজের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করেন।১ উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজার আসকালানি লিখেন, এর মাধ্যমে যেসব জায়গায় আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ আদায় করেছেন কিংবা যেখানে তিনি পা রেখেছেন, সেগুলো থেকে বরকত নেওয়ার বৈধতা প্রমাণিত হয়। পাশাপাশি এটাও বোঝা যায় যে, কোনো নেককার ব্যক্তিকে যদি বরকত গ্রহণের জন্য ডাকা হয়, তা হলে ফিতনার ভয় না থাকলে সাড়া দেওয়া উচিত।২ সুনানে ইবনে মাজাতে মুআজ বিন জাবাল রাজি.-এর রাসুলের কবরের পাশে বসে কান্নার বর্ণনা আছে।৩ বিলাল রাজি. রাসুলের কবরের মাটিতে গড়াগড়ি করেছেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।৪ আবদুল্লাহ ইবনে উমরের ছেলে তাবেয়ি সালেম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর তাঁর পিতার মতো রাসুলের স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলো অনুসরণ করতেন।৫
এ কারণে কাবাঘরে, মসজিদে নববিতে, রওজাতে অসংখ্য মানুষ যারা ওখানে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, আল্লাহর রাসুলের রওজার দিকে গভীর দৃষ্টিতে অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকে, চোখে অশ্রুর বান নামে, ইট-পাথর স্পর্শ করে, তাদের দেখলেই বিদআতি আখ্যা দেবেন না। কারণ, তারা আল্লাহ ও রাসুলের কাছে এসেছে, সাত সাগর পাড়ি দিয়ে পাথরের কাছে আসেনি। তারা পাথর ছুঁয়ে ইবাদত করে না, মনের তৃষ্ণা মেটায়। সম্ভবত ইমাম জাহাবি এই কষ্টটা ধরতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি যারা বারবার এই যুক্তি দেন যে, 'যদি উত্তম হতো তবে সাহাবারা করতেন', তাদের খণ্ডনে লিখেন, 'সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন। তাঁর হাতে চুম্বন করেছেন। তাঁকে দেখে দেখে তাদের চোখ পরিতৃপ্ত করেছেন। আমাদের পক্ষে যখন সেই সৌভাগ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি, কমপক্ষে তাঁর কবরের সামনে নিজেকে সঁপে দিয়ে তাকে সম্মান জানানো, সেটাকে চুম্বন করা, স্পর্শ করা এতটুকু করা যেতে পারে। এগুলো কোনো মুসলিম তখনই করে, যখন সে রাসুলের মহব্বতে বেকারার হয়ে যায়। কারণ, প্রত্যেক মুসলিম আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে নিজের চেয়ে, নিজের পিতা-মাতার চেয়ে, সকল মানুষের চেয়ে, সম্পদের চেয়ে, জান্নাতের চেয়ে, জান্নাতের হুরের চেয়ে বেশি ভালোবাসতে আদিষ্ট। এই ভালোবাসায় সাহাবায়ে কেরাম তো রাসুলকে সিজদা করতে চেয়েছিলেন। যদি তিনি অনুমতি দিতেন, তা হলে সাহাবারা তাকে সিজদা করতেন-সম্মানের সিজদা, ইবাদতের নয়। এ কারণে কেউ যদি ইবাদতের উদ্দেশ্য ছাড়া কেবল সম্মানের কারণে রাসুলের কবরকে সিজদা করে, সে কাফের হবে না, কিন্তু গুনাহগার হবে। কারণ, ইসলামে এটা নিষিদ্ধ।'১ সিয়ারু আলামিন নুবালাতে ইমাম জাহাবি লিখেন, 'আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসুলের কবরের সামনে মুসলমানের ব্যাকুলতা, চিৎকার, প্রচণ্ড কান্না, দেওয়াল চুম্বন তো আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলকে মহব্বতের কারণে হয়ে থাকে। এগুলোর দ্বারা প্রমাণিত হয়, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসে। আর এই ভালোবাসাটাই জান্নাতি ও জাহান্নামির মাঝে পার্থক্য।২
১. বুখারি (৪২৫); মুসলিম (৩৩)।
২. ফাতহুল বারি (১/৫২২)।
৩. সুনানে ইবনে মাজা (৩৯৮৯)।
৪. তারিখে দিমাশক, ইবনে আসাকির (৭/১৩৭); শিফাউস সিকাম, সুবকি (৫৩); ওয়াফাউল ওয়াফা, সামহুদি (৪/১৮২)।
৫. বুখারি (৪৮৩)।
১. মুজামুশ শুয়ুখ, জাহাবি (১/৭৩-৭৪); ইবাদতের উদ্দেশ্যে সিজদা দিলে সুস্পষ্ট কুফর হবে। আর ইবাদত ছাড়া কেবল সম্মানের উদ্দেশ্যে (সাধারণ তাজিম ও তাহিয়্যাহ তথা অভিবাদন) সিজদা দিলে কবিরা বরং বড় ধরনের কবিরা গুনাহ হবে। দেখুন: তাবয়িনুল হাকায়িক, জাইলায়ি (৬/২৫); শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৫১৫); ফাতাওয়ায়ে গিয়াসিয়্যাহ (১০৭); রদ্দুল মুহতার (৬/৩৮৩); হিফজুল ঈমান, থানভি (৬-৮); ইমদাদুল ফাতাওয়া, থানভি (৫/৩৫৩-৩৫৫); ইমদাদুল আহকাম, জফর আহমদ উসমানি (১/১১৪); কিফায়াতুল মুফতি, কিফায়াতুল্লাহ দেহলভি (১/২৩১); ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়াহ (১/২৮৫)। তবে ইমাম সারাখসি 'মাবসুত' এ সম্মানের উদ্দেশ্যে সিজদাকেও কুফর বলেছেন (আল-মাবসূত, সারাখসি ২৪/১৩০); যদিও অগ্রগণ্য মত প্রথমটি, তথাপি এ ব্যাপারে কঠোরতা করাই উত্তম। নতুবা একদল সম্মানের নামে ইবাদত করা শুরু করবে। ইবাদত করেও বলবে সম্মান করছি। অনেকে হয়তো দুটোর মাঝে পার্থক্যই করতে পারবে না। ফলে উভয় অবস্থাতেই মাজারে/কবরে সিজদা কুফর হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, কেউ যদি সিজদা করেই ফেলে, এক বাক্যে তাকে কাফের/মুশরিক বলা থেকে বিরত থাকা চাই। কারণ, ব্যক্তিবিশেষকে (তাকফিরে মুআইয়ান) কাফের বলার ক্ষেত্রে শরিয়তে সুনির্দিষ্ট মূলনীতি (জাওয়াবিত) রয়েছে, যা রক্ষা করা জরুরি। সামনে সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আসবে।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা (রিসালাহ) (৪/৪৮৪)।
📄 শেষ কথা
পুণ্যবানদের তাবাররুক গ্রহণ ইসলামে একটি স্বীকৃত বিষয়। যারা এটাকে কেবল রাসুলুল্লাহর মাঝে সীমাবদ্ধ রাখেন, তাদের বক্তব্য সঠিক নয়, যার কিছু প্রমাণ আমরা পিছনে উল্লেখ করেছি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখতে গেলে গ্রন্থের কলেবর দীর্ঘ হয়ে যাবে, তাই এখানেই শেষ করা হচ্ছে। উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনায় স্পষ্ট হওয়ার কথা যে, একদিকে যেমন বুজুর্গ-ওলিদের মাধ্যমে তাবাররুক গ্রহণের বৈধতা স্বীকার করতে হবে, অপরদিকে বরকতের নামে প্রচলিত বিদআত ও কুসংস্কারেরও বিরোধিতা করতে হবে।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, সাহাবায়ে কেরাম তাদের স্মৃতি বিজড়িত এ সকল স্থানের প্রতি কতটুকু গুরুত্ব দিতেন আর আমরা কতটা গুরুত্ব দিই।
আজ মক্কাতে বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মস্থান বলে প্রচলিত জায়গাটিতে ভিড় করে এটাকে বরকতময় মনে করতে এবং ওখানে বিভিন্ন ইবাদত করতে দেখা যায়। একইভাবে দেখা যায় মানুষ দলে দলে হেরা গুহায় যাচ্ছে, ওখানে গিয়ে নামাজ-সহ বিভিন্ন ইবাদত করছে। অথচ তাঁর জন্ম কোথায় হয়েছিল সে জায়গাটি আজ সন্দেহাতীতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ, তার জন্ম হয়েছিল জাহেলি যুগে। তখন এসব জায়গার বিশেষ কোনো গুরুত্ব ছিল না। নবুওতের পরে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর জন্য পাগলপারা থাকলেও, তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা সত্ত্বেও এসব জায়গার ব্যাপারে গুরুত্ব দেননি। কারণ, তাদের কাছে রাসুলুল্লাহর জন্মস্থানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাসুলুল্লাহর আনীত জীবনবিধান। নবুওতের আগে তিনি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত হেরা গুহায় ইবাদত করতেন। অথচ নবুওত পরবর্তী বাকি ২৩ বছরে একটি বর্ণনা পাওয়া যায় না যে, তিনি কিংবা সাহাবারা সেই জায়গাটিকে দেখতে গিয়েছিলেন। অথচ আজ মুসলমানরা এসব জায়গাতেই বেশি আগ্রহ নিয়ে যায়, সময় কাটায়।
কারণ কী? কারণ, সাহাবায়ে কেরামের কাছে এগুলোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাসুলের অনুসরণ। জন্মস্থান দর্শনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তিনি যে তাওহিদ নিয়ে এসেছেন সেটার বাস্তবায়ন ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ। এগুলো করতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম অলস সময় কাটানোর সুযোগ পাননি। এখন যেহেতু মুসলমানদের চিন্তাভাবনা বদলে গিয়েছে, চিন্তাভাবনায় অধঃপতন নেমে এসেছে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছেড়ে অগুরুত্বপূর্ণ কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি তাদের মনোযোগ বেড়েছে, ফলে দেখা যাচ্ছে ইসলামের অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিধি-বিধান ও আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে তাদের উল্লেখযোগ্য মনোযোগ নেই, অথচ পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করে সময় কাটানোর ক্ষেত্রে তারা অগ্রগামী। জিহাদের প্রতি অনেকে মনে অজানা বিদ্বেষ রাখে কিংবা বাঁকা দৃষ্টিতে তাকায়, অথচ বদর ও উহুদের ময়দানে ঘোরাঘুরি ও সেলফি তোলায় তারা দারুণ ব্যস্ত। রাসুলুল্লাহর জুতা, চুল, পদচিহ্ন (যার কোনোটাই আজ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়) ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে বিরাট বিরাট ব্যাবসা দাঁড়িয়ে গেছে; অথচ রাসুলুল্লাহর আনীত দ্বীনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এখানেই শেষ নয়।
শরিয়তের নির্দেশ পালনে মুসলমানরা যতটা গাফেল হয়েছে, ততটাই বেড়েছে পির ও কবরের প্রতি মনোযোগ। পির নামে নোংরা লোকদের ওজু-গোসলের পানি পান করা হচ্ছে। সেগুলো দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করে বরকতের উদ্দেশ্যে খাওয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, অনেক দ্বীনি মহলেও বুজুর্গদের ওজু-গোসলের পানি নিয়ে বাড়াবাড়ির উদাহরণ রয়েছে। অথচ স্বয়ং থানভি লিখেছেন, রাসুলুল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ওজুর পানি দিয়ে বরকতগ্রহণ প্রমাণিত নয়।১
বরকতের দোহাই দিয়ে মুসলমানদের মসজিদ শূন্য হয়েছে। আসর-উরশ আর কবর-মাজারে উপচে পড়া ভিড় জমেছে। বুজুর্গদের প্রতি শ্রদ্ধার অর্থ হয়ে গেছে কবরের সামনে এসে গর্দান ঝোঁকানো, কবরে ফুল দেওয়া, চাদর জড়ানো, বাতি জ্বালানো ইত্যাদি। ফলে প্রত্যেকটা কবর একেকটা দানবীয় কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিনা পুঁজিতে চলে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকার ব্যাবসা; চলে কিছু ফাসিক লোকের পেটপূজা। এগুলো সবই সেই তাবাররুক নামক সূত্র থেকে উৎসারিত। তাই এ ব্যাপারে আলিমদের কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিকল্প নেই। তাদের আদর্শ হতে পারেন সাইয়েদুনা উমর ইবনুল খাত্তাব, যিনি হুদাইবিয়ার বৃক্ষের নিচে মানুষ জড়ো হওয়ার কথা জানতে পেরে বৃক্ষটাই কেটে ফেলার নির্দেশ দেন।২ কারণ, অনিষ্টকে সমূলে উপড়ে ফেলাই ইনসাফ।
১. ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৯০)।
২. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৭৬২৭)।