📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 আল্লাহর প্রতিদ্বন্দী-সমকক্ষ নেই

📄 আল্লাহর প্রতিদ্বন্দী-সমকক্ষ নেই


আরও বলেন,
أَمْ نَجْعَلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَ عَمِلُوا الصَّلِحَتِ كَالْمُفْسِدِينَ فِي الْأَرْضِ أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِينَ كَالْفُجَّارِ অর্থ: 'আমি কি বিশ্বাসী ও সৎকর্মীদের পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কাফেরদের সমকক্ষ করে দেবো, না খোদাভীরুদের পাপাচারীদের সমান করে দেবো? [সাদ: ২৮]
আরেক জায়গায় একই অর্থের তাগিদ করেন,
أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ . مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُونَ অর্থ: 'আমি কি আজ্ঞাবহদের অপরাধীদের মতো গণ্য করব? তোমাদের কী হলো? তোমরা কেমন সিদ্ধান্ত দিচ্ছ? [কলম: ৩৫-৩৬]
আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী-সমকক্ষ নেই: কুরআনে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে,
وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ . অর্থ: 'তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।' [ইখলাস: ৪]
আরেক জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَانْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ.
অর্থ: 'অতএব, তোমরা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করো না।' [বাকারা: ২২]
অন্যত্র বলেন,
مَا يَفْتَحِ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَّحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا وَمَا يُمْسِكُ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِنْ بَعْدِهِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ অর্থ: 'আল্লাহ মানুষের জন্য অনুগ্রহের মধ্য থেকে যা খুলে দেন, তা ফেরাবার কেউ নেই এবং তিনি যা বারণ করেন, তা কেউ প্রেরণ করতে পারে না তিনি ব্যতীত। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।' [ফাতির: ২]
এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে বলতেন, اللَّهُمَّ لَا مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ ، وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ অর্থ: 'হে আল্লাহ, আপনি যা দান করবেন তা ফেরানোর সাধ্য কারও নেই; আপনি যা দান করবেন না তা দেওয়ার সাধ্য কারও নেই।'¹
উপরে ইমাম তহাবির বক্তব্য মূলত তাকদিরের ক্ষেত্রে মুতাজিলাদের মতাদর্শের খণ্ডন। মুতাজিলারা তাকদিরের ক্ষেত্রে মানুষকে আল্লাহর সমকক্ষ/প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করায়। কারণ তাদের ধারণা, মানুষের সকল কাজের সৃষ্টিকর্তা মানুষ নিজে। ফলে এভাবে তারা দুইজন সৃষ্টিকর্তা সাব্যস্ত করে: এক. আল্লাহ তায়ালা, দুই. মানুষ নিজেই। তাই ইমাম তহাবি তাদের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেন, আল্লাহই সবার ও সবার সকল কর্মের স্রষ্টা। ভাগ্যের নিয়ন্তা।²

টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (১০৭)।
২. বুখারি (৮৪৪, ৭২৯২); মুসলিম (৪৭১)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 তাঁর নির্দেশের ব্যত্যয় নেই

📄 তাঁর নির্দেশের ব্যত্যয় নেই


তাঁর নির্দেশের ব্যত্যয় নেই: কুরআনে আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেন,
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ. অর্থ: “তিনি যখন কোনোকিছু করতে ইচ্ছা করেন, তখন তাকে কেবল বলে দেন, 'হও', তখনই তা হয়ে যায়।” [ইয়াসিন: ৮২]
আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন,
وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ وَهُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ. অর্থ: 'আর আল্লাহ নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশ স্থগিত করার মতো কেউ নেই। তিনি দ্রুত হিসাবগ্রহণকারী।' [রাদ: ৪১] আরেক আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেন, وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ. অর্থ: 'আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্তে প্রবল। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।' [ইউসুফ: ২১]

টিকাঃ

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 তাকদিরের ভালো-মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে

📄 তাকদিরের ভালো-মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে


তাকদিরের ভালো-মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে: এ ব্যাপারে কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, وَإِنْ تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هُذِهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هُذِهِ مِنْ عِنْدِكَ قُلْ كُلٌّ مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ
অর্থ: ‘তাদের কোনো কল্যাণ সাধিত হলে তারা বলে যে, এটা সাধিত হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তখন বলে, এটা হয়েছে আপনার পক্ষ থেকে। বলুন, এ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে।’ [নিসা: ৭৮]
প্রসিদ্ধ হাদিসে জিবরিলে এসেছে, জিবরিল আলাইহিস সালাম যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি উত্তরে বললেন, ‘আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ, শেষ দিবস এবং তাকদিরের ভালো-মন্দে বিশ্বাস করা।’¹
ইমাম তহাবি রাহি. এখানে ‘ঈমান’ এবং ‘ইয়াকিন’ দুটো শব্দ ব্যবহার করেছেন। দুটোর অর্থ কাছাকাছিই। ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদি রাহি. মনে করেন, ‘ঈমান’ হলো ওহি এবং কুরআন-সুন্নাহ সত্যায়নের নাম। আর ‘ইয়াকিন’ হলো মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও গবেষণা-প্রসূত বিশ্বাসের নাম। কারণ, কুরআনে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জগৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণার উদ্দেশ্য ঘোষণা করা হয়েছিল ‘ইয়াকিন’।² [আনআম: ৭৫]

টিকাঃ
১. মুসলিম (৮); তিরমিজি (২৬১০); আবু দাউদ (৪৬৯৫)।
২. গজনবি (৬৮); তুর্কিস্তানি (৮৬)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 দুই তাবিখবিদের চূড়ান্ত নতিজা কী?

📄 দুই তাবিখবিদের চূড়ান্ত নতিজা কী?


দুই তাফবিজের চূড়ান্ত নতিজা কী? পিছনের আলোচনাতে স্পষ্ট হয়েছে, সিফাতের মাসআলাতে একদল আলিম অর্থ সাব্যস্তকে সঠিক মনে করেন না, আরেক দল তাবিলকে সঠিক মনে করেন না। এই দুটি ক্ষেত্রে দুই দল দুই মেরুতে। ফলে তাদের মাঝে সমন্বয় করা সম্ভব নয়। তবে তাফবিজের ক্ষেত্রে তারা কিছুটা একমত হলেও বিস্তর ব্যাখ্যায় আবার দুই মেরুতে। প্রথম দলের কাছে সালাফের তাফবিজ হলো تفويض المعنى والكيفية أو التفويض المطلق তথা অর্থ ও স্বরূপ-সহ সামগ্রিক তাফবিজ। দ্বিতীয় দলের কাছ সালাফের তাফবিজ হলো إثبات المعنى وتفويض الكيفية অর্থাৎ অর্থ সাব্যস্ত করে স্বরূপ তাফবিজ। প্রশ্ন হলো, দুই তাফবিজের মাঝে আসলেই কি বড় ধরনের পার্থক্য আছে? নাকি দুটোর চূড়ান্ত নতিজা সমান আর পথে উভয় দলের মাঝে একটা সমন্বয় সম্ভব?
প্রথমেই একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি মাথায় রাখতে হবে। কারণ, এ মূলনীতিটা বুঝতে পারলেই সিফাতের ক্ষেত্রে একটা বিশাল ও দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান ঘটা সম্ভব। এটার উপর ভিত্তি করেই গোটা উম্মাহকে এক করা সম্ভব। মূলনীতিটি হলো, প্রত্যেকটা শব্দের দুটো হাকিকি অর্থ থাকে। একটা হলো 'হাকিকতে লফজি' বা শব্দগত অর্থ, আরেকটা হলো 'হাকিকতে উরফি' তথা প্রচলিত অর্থ। যেমন 'ওয়াজহ' তথা চেহারা। 'ওয়াজহ'-এর দুটো হাকিকি অর্থ রয়েছে। একটা হলো হাকিকতে লফজি। এক্ষেত্রে 'চেহারা' অঙ্গ হওয়া জরুরি নয়। যেমন মানুষের চেহারা, সূর্যের চেহারা, আকাশের চেহারা, দিনের চেহারা, গাড়ির চেহারা, দেশের চেহারা-সবার চেহারা ভিন্ন ভিন্ন। ফলে 'হাকিকি মা'না' সাব্যস্ত করার পরেও সবার চেহারা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নয়। মানুষ ও কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে চেহারা একটা নির্দিষ্ট অঙ্গ। কিন্তু অন্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেটা সেই নির্দিষ্ট অঙ্গ নয়। ফলে এক্ষেত্রে হাকিকতে উরফিতে যেতে হবে আমাদের। হাকিকতে উরফিতে গেলে আমরা দেখব, মানুষের চেহারার জন্য যেটা হাকিকত, সূর্যের চেহারার হাকিকত সেটা নয়। আমাদের উরফে মানুষের চেহারা একরকম, সূর্যের চেহারা আরেক রকম। ফলে হাকিকতে লফজির ক্ষেত্রে সবগুলো এক হলেও উরফিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই ভিন্নতা আমরা জানতে পেরেছি হাকিকতে উরফিতে এসে এবং সবগুলোর স্বরূপ জেনে। আমরা যদি সূর্য ও মানুষের স্বরূপ না জানতাম, তবে এই হাকিকতে উরফি পেতাম না। ফলে সবগুলোকে এক মনে করতাম, অথচ সেটা ভুল হতো।
আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যাক! আরবি শব্দ 'নুজুল' তথা অবতরণ করা, নামা। এটার দুটো হাকিকত। একটা হচ্ছে হাকিকতে লফজি তথা নামা। যেমন: মানুষের নামা, বিমান নামা, বৃষ্টি নামা, তাপমাত্রা নামা, রাগ নামা। সবগুলোর অর্থ নিচে নামা। কিন্তু এসব নামার মাঝে উরফে পার্থক্য আছে। মানুষের নামার যে হাকিকত, রাগ নামার হাকিকত সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই যে পার্থক্য আছে সেটা আমরা জানতে পেরেছি এগুলোর স্বরূপ জানার পরেই। স্বরূপ না জানলে এই পার্থক্য জানতে পারতাম না। ফলে সবগুলোকে এক মনে করতাম, অথচ সবগুলো এক নয়।
আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যাক 'হাত' দিয়ে। কুরআন-সুন্নাহে আল্লাহর হাতের কথা এসেছে। আবার মানুষের হাত রয়েছে, বানরের হাত রয়েছে, মশার হাত রয়েছে, কুঠারের হাত রয়েছে, খাটিয়ার হাত রয়েছে; অথচ এই সকল হাত ভিন্ন ভিন্ন। এই ভিন্নতা বোঝার জন্য আমাদের হাকিকতে উরফিতে যেতে হবে। এখানে এসে আমরা দেখব, মানুষের হাত আর মশার হাত এক নয়। বানরের হাত আর কুঠারের হাত এক নয়; অথচ সবগুলোই হাত। এভাবে পার্থক্য জানতে আমাদের হাকিকতে উরফি যেতে হয়েছে। আর হাকিকতে উরফি জানার জন্য স্বরূপ জানতে হয়েছে। স্বরূপ না জানলে আমরা হাকিকতে উরফি বুঝতাম না, পার্থক্যও জানতাম না। সুতরাং যার ক্ষেত্রে স্বরূপই প্রযোজ্য নয়, তার ক্ষেত্রে হাকিকতে উরফিও (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চাই তা যেমন হোক) প্রযোজ্য নয়।
এটা যদি হয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে, তা হলে আল্লাহর ক্ষেত্রেই বিষয়টি কতটা বেশি জরুরি! এ কারণে সালাফের যারা আল্লাহর সিফাতের অর্থ সাব্যস্ত করেছেন, সেটা হাকিকতে লফজি তথা শব্দের মূল অর্থ সাব্যস্ত করেছেন, হাকিকতে উরফি তথা প্রচলিত অর্থ নয়। কারণ, হাকিকতে উরফির জন্য আমাদের সেই বস্তুর স্বরূপ জানা প্রয়োজন, অথচ আমরা আল্লাহর স্বরূপ জানি না। সুতরাং প্রথম দলের বক্তব্য- সালাফ আল্লাহর হাতের হাকিকি অর্থ (মা'না হাকিকি) সাব্যস্ত করতেন না, বরং তাফবিজ করতেন—যদি তারা এর অর্থ নেন, 'সালাফ হাকিকতে উরফি (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ) সাব্যস্ত করতেন না; কারণ আল্লাহর ক্ষেত্রে স্বরূপ কথাটাই প্রযোজ্য নয়; অথচ উরফি অর্থ সাব্যস্তের জন্য স্বরূপ জানা জরুরি।' তবে তাদের বক্তব্য সঠিক। কারণ 'সালাফ তাফবিজ' করতেন' অর্থ হলো, সালাফ হাকিকতে উরফি তাফবিজ করতেন। 'সালাফ হাকিকতে লফজিও তাফবিজ করতেন'—এমন বক্তব্য গলদ। কারণ, তখন সেটা অর্থহীন বক্তব্য বা তাতিল হয়ে যায়। একইভাবে দ্বিতীয় দলের বক্তব্য—সালাফ হাকিকি অর্থ (মা'না হাকিকি) সাব্যস্ত করতেন, তাফবিজ করতেন না—যদি তারা এর অর্থ নেন, 'সালাফ হাকিকতে লফজি সাব্যস্ত করতেন। আর এটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নয়। কারণ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হবে হাকিকতে উরফিতে এসে স্বরূপ জানার পরে, অথচ আল্লাহ স্বরূপ থেকে উর্ধ্বে।' তবে তাদের বক্তব্যও সঠিক। কারণ 'সালাফ তাফবিজ করতেন না' অর্থ হলো, হakikতে লফজি তাফবিজ করতেন না। 'সালাফ হাকিকতে উরফিও তাফবিজ করতেন না'—এমন বক্তব্য গলদ। কারণ, তাতে তাশবিহ ও তাজসিম হয়ে যায়।
ইমাম মালেক রাহি. বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় যেমন: আল্লাহর বাণী, 'ইহুদিরা বলে, আল্লাহর হাত (ঘাড়ে) বাঁধা' [মায়েদা: ৬৪] এরপর সে তার ঘাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে, কিংবা আল্লাহর বাণী 'তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন' [শুরা: ১১] বলে তার চোখ, কান কিংবা শরীরের কোনো অঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করে, তা হলে তা কেটে ফেলা হবে। কারণ, সে আল্লাহকে নিজের সঙ্গে সাদৃশ্য করেছে।¹ এখানে লক্ষণীয়, যে ব্যক্তি এই আয়াতগুলো পড়ে তার নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করবে, সে কিন্তু এটা বলে না, 'আল্লাহর হাত হুবহু তার হাতের মতো, কিংবা আল্লাহর চোখ তার চোখের মতো।' কারণ, কোনো সুস্থ মানুষ এমন বলতে পারে না। সবাই জানে, আল্লাহর চোখ মানুষের চোখের মতো নয়, আল্লাহর হাত মানুষের হাতের মতো নয়। আল্লাহর হাত মানুষের হাতের মতো হবে তো দূরের কথা, বাঘের হাতও তো মানুষের হাতের মতো নয়, কুঠারের হাতও (হাতল) তো মানুষের হাতের মতো নয়। এতৎসত্ত্বেও ইমাম মালেকের এত ক্রুদ্ধ হওয়ার কারণ কী? কারণ একটাই, তিনি আল্লাহর সিফাতগুলোকে শব্দের হাকিকত (الحقيقة اللفظية) অন্য কথায় বাহ্যিক অর্থের উপর ছেড়ে দিতেন। আমাদের মাঝে প্রচলিত হাকিকত (الحقيقة العرفية) (তথা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাব্যস্ত করতেন না।
এখানেই বুঝে আসে ইমাম তিরমিজির বক্তব্য: যদি বলা হয় 'হাতের মতো হাত', 'শ্রবণের মতো শ্রবণ' তখন সেটা তাশবিহ হয়। কিন্তু এভাবে না বলে স্রেফ বাহ্যিক অবস্থা (জাহের বা হাকিকতে লফজি) সাব্যস্ত করলে তাশবিহ হয় না)।² এর মানে বোঝা যায়, ইমাম তিরমিজি-সহ সালাফের কেউ জাহের বলতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বুঝতেন না। কারণ, আরবিতে (اليد) শব্দের অর্থ বলতে যদি সৃষ্টির একটি অঙ্গ হাত বোঝানো হয়, তাতেই কিন্তু তাশবিহ হয়ে যায়, 'আমাদের হাতের মতো নয়' এটা বলার দরকার হয় না। যেমন: মানুষের হাত, মশার হাত, বানরের হাত-এগুলো কি এক? মশার হাতের সঙ্গে যদি মানুষের হাতের সাদৃশ্য না থাকে, সেখানে আল্লাহর হাতের সঙ্গে সাদৃশ্যের তো প্রশ্নই ওঠে না। ফলে আমাদের মতো আল্লাহর হাত আছে (হুবহু সদৃশ) এটা কোনো দেহবাদীও বলবে না। তা হলে 'হাতের মতো হাত' বলতে ইমাম তিরমিজি কোনটাকে নাকচ করেছেন? স্পষ্টই যে, আল্লাহর জন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাব্যস্ত করা নাকচ করেছেন। এভাবেই বুঝতে হবে, অন্যান্য সালাফ যখন দেহবাদীদের বক্তব্য 'আমাদের হাতের মতো হাত'-এর প্রতিবাদ করতেন সেটা। কারণ, আল্লাহর হাত আমাদের হাতের আকৃতিতে নয় এটা সবাই জানে। তারা প্রতিবাদ করতেন, আমরা যেমন হাত বলতে অঙ্গ বুঝি, আল্লাহর হাত তেমন অঙ্গ নয়। পিছনে ইমাম তহাবিও সেটা নাকচ করেছেন। তা হলে তারা শাব্দিক অর্থের হাকিকতকে (হাকিকতে লফজি) ইসবাত করতেন, আমাদের প্রচলিত অর্থের হাকিকতকে (হাকিকতে উরফি) নয়। আবার তারা প্রচলিত অর্থের হাকিকতকে তাফবিজ করতেন। শাব্দিক অর্থের হাকিকতকে নয়।
সুতরাং এভাবে হাকিকতে লফজি ও হাকিকতে উরফিকে যদি বোঝা যায়, তবে সালাফের মতাদর্শ নির্ধারণে উভয় ধারার মাঝে কোনো পার্থক্য থাকে না। এভাবে বুঝলে-তাফবিজ মুতলাক বলা হোক আর তাফবিজুল কাইফিয়্যাহ বলা হোক— উভয়টাই সঠিক। কারণ, উভয়টার অর্থ থাকে আল্লাহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে পবিত্র। বিষয়টি আরেকটু খেয়াল করুন! কেউ যদি বলে, يد الله মানে আল্লাহর হাত। 'আল্লাহর হাত' এটুকু বলব, আমাদের মনে ঘুণাক্ষরেও স্থান দেবো না যে, এটা রক্ত-মাংসের হাত কিংবা আমাদের কারও হাতের মতো (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ)। আল্লাহ বলেছেন يد الله আর ইয়াদের হাকিকি অর্থ (লফজি) যেহেতু হাত, তাই আমরা এটাকে স্রেফ হাত বলেছি। নতুবা সৃষ্টির সঙ্গে এই হাতের কোনো সম্পর্ক নেই لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ তা হলে দেখা যাচ্ছে, এখানে শুধু হাকিকতে লফজিটা সাব্যস্ত করা হচ্ছে; স্বরূপ নয়। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও (হাকিকতে উরফি) নয়। ফলে এটা স্রেফ নসের প্রতি তাজিম দেখানো, নতুবা শেষমেষ এটার হাকিকত অজানাই থেকে যায়। আর দ্বিতীয় দল বলছেন, يد الله -এর অর্থ আল্লাহই ভালো জানেন। আমরা এর হাকিকত (উরফি) জানি না। কারণ يد মানে হাত। তবে আল্লাহর জন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শোভনীয় নয় (কারণ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ফলে এটাকে আমরা হাত বলব না। আমরা বলব এটার অর্থ (হাকিকতে উরফি) আল্লাহই ভালো জানেন। ফলে তাদের কাছেও এটার হাকিকত অজানা।
এভাবে দুই দলের বক্তব্যের মাঝে বাহ্যিক দৃষ্টিতে পার্থক্য থাকলেও ভিতরে পার্থক্য থাকবে না। কারণ, তাদের একদল বলছেন, সালাফের মাজহাব হলো- সিফাতসংক্রান্ত আয়াত ও হাদিসগুলোর হাকিকি অর্থ (হাকিকতে লফজি) ইসবাত করা (উরফি তাফবিজ করা)। অপর দল বলছেন, সালাফের মাজহাব হলো- সিফাতসংক্রান্ত আয়াত ও হাদিসগুলোর হাকিকি অর্থ (হাকিকতে উরফি) তাফবিজ করা (হাকিকত লফজি ইসবাত করা)। ফলে অর্থ সাব্যস্ত করা এবং না করা দুইটি সাংঘর্ষিক বিষয় হলেও ভিতরে আসলে সংঘর্ষ নেই। এ কারণে স্বয়ং ইবনে তাইমিয়ার ছাত্র ইমাম জাহাবি তাফবিজ বা تفويض المعنى -এর ব্যাখ্যায় লিখেন, الإقرار، والإمْرَارُ، وَتَفْويضُ مَعْنَاهُ إِلَى قَائِلِهِ الصَّادِقِ الْمَعْصُومِ স্বীকার করা, চালিয়ে দেওয়া, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এর অর্থ সমর্পণ করা।’³ এখানে অর্থ বলতে (হাকিকতে উরফিকে) তাফবিজ করার কথা বলা হয়েছে; হাকিকতে লফজি নয়। আর যারা হাকিকি মা'নাকে ইসবাত করাকে সালাফের মানহাজ বলেছেন, যেমন কারি তৈয়ব সাহেব বলেছেন: فالطريق الأسلم أن تحمل هذه الأسماء على معانيها الحقيقية অর্থাৎ নিরাপদ পথ হলো, এগুলো হাকিকি অর্থের উপর প্রয়োগ করা।⁴ এখানে মা'না হাকিকি সাব্যস্ত বলতে হাকিকতে লফজি উদ্দেশ্য নিয়েছেন। কারণ, হাকিকতে উরফি জানতে স্বরূপ প্রয়োজন, আর আমরা আল্লাহর স্বরূপ জানি না। এভাবে দুই ধারার তাফবিজের মাঝে বাস্তবে কোনো সংঘর্ষ নেই। চূড়ান্ত নতিজার ক্ষেত্রে উভয়ের বক্তব্য এক ও অভিন্ন।

টিকাঃ
১. আত-তামহিদ, ইবনে আবদুল বার (৭/১৪৫)।
২. তিরমিজি (৬৬২ নং হাদিসের উপর ইমামের বক্তব্য)।
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৭/১৮৩)।
৪. কারি তৈয়ব (৬৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00