📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 অহংকারী নয়

📄 অহংকারী নয়


প্রকৃত মুসলমান অহংকারী নয়। মানুষকে অবজ্ঞা করে না। লজ্জা দেয় না। কারণ, কুরআনের বাণী তার কানে ও হৃদয়ে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, এ নশ্বর পৃথিবীতে যারা অহংকারী, অবিনশ্বর আখিরাতে তাদের ধ্বংস অনিবার্য।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
‘এই পরকাল আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করি, যারা দুনিয়ার বুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না। আর আল্লাহভীরুদের জন্য রয়েছে শুভ পরিণাম। [৪৮৫
তার কানে এ বাণীও বাজে যে, আল্লাহ তাআলা দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না, যে মানুষকে অবজ্ঞা করে এবং দম্ভভরে পৃথিবীতে বিচরণ করে।
তিনি ইরশাদ করেন:
وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
'অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা কোরো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।'৪৭৬
অন্তরসমূহ থেকে অহংকার সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য হাদিসে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, এ সম্পর্কিত হাদিসসমূহ অধ্যয়ন করলে রীতিমতো অবাক হতে হয়। এসব হাদিসে অহংকারকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করা হয়েছে। অণু পরিমাণ অহংকার থাকলেই আখিরাত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে। জান্নাত হারাম হয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ قَالَ رَجُلٌ: إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً، قَالَ: إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ، وَغَمْطُ النَّاسِ
'যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি আরজ করলেন, মানুষ তো নিজের কাপড় ও জুতো উত্তম হওয়াকে পছন্দ করে! (তাহলে এটাও কি অহংকারের অন্তর্ভুক্ত হবে?) রাসুলুল্লাহ বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। (তাই এটাকে অহংকার বলা যাবে না। প্রকৃত অর্থে) অহংকার তো সত্যকে গোপন করা ও মানুষকে অবজ্ঞা করাকে বলা হয়।'৪৭৭
হারিসা বিন ওয়াহাব বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ؟ قَالُوا : بَلَى، قَالَ: كُلُّ عُتُلٌ جَوَاطٍ مُسْتَكْبِرٍ 'আমি কি তোমাদের জাহান্নামবাসী লোকদের পরিচয় দেবো না? (তারা হলো) প্রত্যেক রুক্ষ স্বভাবের, দাম্ভিক ও অহংকারী ব্যক্তি। '৪৭৮
কিয়ামতের দিন অহংকারীদের লাঞ্ছনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সেদিন আল্লাহ তাআলা তাদের দিকে তাকাবেন না, তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না। এটা হবে তাদের অহংকার ও দাম্ভিকতার মানসিক শাস্তি। এ শাস্তি শারীরিক শান্তির চেয়ে অনেকগুণ বেশি কষ্টদায়ক ও যন্ত্রণাদায়ক হবে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: لَا يَنْظُرُ اللهُ يَوْمَ القِيَامَةِ إِلَى مَنْ جَرَّ إِزَارَهُ بَطَرًا 'কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির দিকে তাকাবেন না, যে ব্যক্তি অহংকারবশত তার নিম্নবস্ত্র মাটিতে হেঁচড়ে টেনে চলে। '৪৭৯
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেছেন :
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ - قَالَ أَبُو مُعَاوِيَةَ: وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ - وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: شَيْخُ زَانٍ، وَمَلِكُ كَذَّابٌ، وَعَائِلٌ مُسْتَكْبِرُ 'তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা কথা বলবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না (গুনাহ ক্ষমা করবেন না), তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদের জন্য থাকবে বেদনাদায়ক শাস্তি। (তারা হলো) এক. ব্যভিচারী বৃদ্ধ, দুই. মিথ্যুক শাসক, তিন. অহংকারী দরিদ্র। '৪৮০
অহংকার এত জঘন্য অপরাধ হওয়ার কারণ হলো, তা আল্লাহর একক বৈশিষ্ট্য। এটা মানবজাতির সাথে সম্পর্কিত কোনো বৈশিষ্ট্য বা স্বভাব নয়। তাই যারা অহংকার করে, তারা যেন মানবত্বের সীমা ছাড়িয়ে প্রভুত্বের সীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করতে চায়। মহান প্রভুর একক অধিকার নিয়ে টানাটানি শুরু করে। ফলে তাদের কঠিন ও মর্মন্তুদ শাস্তি দেওয়া মোটেই অবিচার হবে না।
এ সম্পর্কে হাদিসে কুদসিতে ইরশাদ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা বলেন :
الْعِزُّ إِزَارِي، وَالْكِبْرِيَاءُ رِدَانِي، فَمَنْ نَازَعَنِي بِشَيْءٍ مِنْهُمَا عَذَّبْتُهُ
'গৌরব আমার নিম্নবস্ত্র। অহংকার আমার চাদর। এ দুবিষয়ে যে ব্যক্তি আমার সাথে ঝগড়া করবে, তাকে আমি শাস্তি প্রদান করব। '৪৮১
এজন্য পবিত্র সুন্নাহর অসংখ্য জায়গায় মুমিনদের অহংকার পরিত্যাগ করার প্রতি জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং তা বর্জন না করলে শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ تَعَظَّمَ فِي نَفْسِهِ ، أَوِ اخْتَالَ فِي مِشْيَتِهِ، لَقِيَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ وَهُوَ عَلَيْهِ غَضْبَانُ
'যে নিজেকে বড় মনে করে অথবা দম্ভভরে চলাফেরা করে, সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে, যখন তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত থাকবেন। '৪৮২

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 বিনয়ী

📄 বিনয়ী


অহংকারীদের কঠিন শাস্তি সম্পর্কে যেমন অসংখ্য আয়াত ও হাদিস রয়েছে, তেমনই বিনয়ীদের পুরস্কারের ব্যাপারেও এমন অনেক বাণী রয়েছে। এতে বিনয়-নম্রতার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে আর বলা হয়েছে, যে যত বিনয়ী, তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে তত বেশি। বিনয়-সম্পর্কিত নুসুস থেকে এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
مَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ
'কেউ আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করলে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।' ৪৮৩
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
إِنَّ اللهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ، وَلَا يَبْغِي أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ
'আল্লাহ তাআলা আমার নিকট এ মর্মে ওহি প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, যেন তোমাদের একজন অপরজনের সাথে অহংকার না করে এবং একজন আরেকজনের প্রতি অন্যায় না করে।' ৪৮৪
রাসুলুল্লাহ ﷺ ছিলেন বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও মূর্তপ্রতীক। দয়া, বিনম্রতা ও উদারতা তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। তিনি যখন খেলাধুলায় মত্ত শিশুদের পাশ দিয়ে যেতেন, তখন তাদের সালাম দিতেন। তাদের সাথে উদারচিত্তে সহাস্যে কথা বলতেন। নবুওয়াতের শান এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা তাঁর বিনয়ী ও উদার আচরণ করায় প্রতিবন্ধক হতো না। এ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত আছে যে, একবার আনাস রা. বাচ্চাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-ও এমন করতেন।
আনাস রা. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিনয় সম্পর্কে আরেক হাদিসে বর্ণনা করেন :
إِنْ كَانَتِ الأَمَةُ مِنْ إِمَاءِ أَهْلِ المَدِينَةِ، لَتَأْخُذُ بِيَدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَتَنْطَلِقُ بِهِ حَيْثُ شَاءَتْ
‘(রাসুলুল্লাহ এতই বিনয়ী ছিলেন যে,) মদিনার কোনো দাসী (নিজের প্রয়োজন জানানোর জন্য) রাসুলুল্লাহ -এর হাত ধরে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারত। '৪৮৫
তামিম বিন উসাইদ ইসলামের বিবিবিধান সম্পর্কে জানতে মদিনায় এলেন। একজন অপরিচিত ভিনদেশি হওয়া সত্ত্বেও ইসলামি রাষ্ট্রের বাদশা রাসুলুল্লাহ -এর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে তার কোনো বেগ পেতে হয়নি। রাসুলুল্লাহ মিম্বরে বসে লোকদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন তামিম বিন উসাইদ সরাসরি রাসুলুল্লাহ -এর কাছে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসা করলেন। রাসুলুল্লাহ তার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খুবই বিনয় ও উদারতার সাথে তার জিজ্ঞাসার জবাব দিলেন।
চলুন, বিস্তারিত ঘটনা খোদ তামিম বিন উসাইদ -এর মুখেই শুনি :
اِنْتَهَيْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَخْطُبُ، قَالَ: فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ رَجُلٌ غَرِيبٌ، جَاءَ يَسْأَلُ عَنْ دِينِهِ، لَا يَدْرِي مَا دِينُهُ، قَالَ: فَأَقْبَلَ عَلَيَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَتَرَكَ خُطْبَتَهُ حَتَّى انْتَهَى إِلَيَّ، فَأُتِيَ بِكُرْسِيُّ، حَسِبْتُ قَوَائِمَهُ حَدِيدًا، قَالَ: فَقَعَدَ عَلَيْهِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَجَعَلَ يُعَلِّمُنِي مِمَّا عَلَّمَهُ اللهُ، ثُمَّ أَتَى خُطْبَتَهُ، فَأَتَمَّ آخِرَهَا
‘আমি যখন নবিজি -এর নিকট আসলাম, তখন তিনি লোকদের ভাষণ দিচ্ছিলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, এক ভিনদেশি তার দ্বীন সম্পর্কে জানতে এসেছে। সে দ্বীন সম্পর্কে কিছুই জানে না। তখন রাসুলুল্লাহ আমার দিকে ফিরে তাকালেন এবং ভাষণ বন্ধ করে আমার নিকট আসলেন। একটি চেয়ার এনে তাতে বসে আমাকে জ্ঞান দান করলেন, যা তিনি আল্লাহর কাছ থেকে পেয়েছেন। তারপর আবার লোকদের মাঝে ফিরে গিয়ে বাকি ভাষণ শেষ করলেন। '৪৮৬
বিনয়ের এ মহান গুণ-যা ব্যক্তির উদারতা, দয়া ও সাদা মনের পরিচয় দেয়-রাসূলুল্লাহ তাঁর সাহাবিদের মাঝেও বিকশিত করার চেষ্টা করেছেন। তাই তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন:
لَوْ دُعِيتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لَأَجَبْتُ، وَلَوْ أُهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعُ لَقَبِلْتُ
'আমাকে যদি কেবল একটি হাত অথবা পায়ের একটি হাড্ডি খাওয়ারও দাওয়াত দেওয়া হয়, তবুও আমি সে দাওয়াত কবুল করি। আর যদি কেবল একটি হাত অথবা পায়ের একটি হাড্ডি হাদিয়া দেওয়া হয়, তা-ও আমি গ্রহণ করি। '৪৮৭
সুবহানাল্লাহ! বিনয়ের কী উজ্জ্বল নমুনা! উন্নত মনুষ্যত্বের কী জ্যোতির্ময় দৃষ্টান্ত! কী আলোকিত আদর্শ!

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 কারও সাথে বিদ্রূপ করে না

📄 কারও সাথে বিদ্রূপ করে না


প্রকৃত মুসলমান-যার মাঝে বিনয়ের মহান গুণ বিদ্যমান—কখনো কাউকে অবজ্ঞা করে না এবং কারও সাথে বিদ্রূপ করে না। কারণ, তার কুরআন তাকে বিনয় অবলম্বন করতে যেমন নির্দেশ দেয়, তেমনই অহংকার, অবজ্ঞা ও বিদ্রুপ থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দেয়।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِنْ نِسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَنْ لَمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
'হে মুমিনগণ, কোনো দল যেন অপর দলকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী যেন অপর নারীকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ কোরো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গুনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তাওবা না করে, তারাই জালিম। '৪৮৮
তা ছাড়া রাসুলুল্লাহ কোনো মুসলমানকে হেয় প্রতিপন্ন করাকে আগাগোড়া মন্দ বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন : بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ 'মানুষ মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে কোনো মুসলমানকে হেয় প্রতিপন্ন করবে। '৪৮৯

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 বড় ও মর্যাদাবান লোকদের সম্মান করে

📄 বড় ও মর্যাদাবান লোকদের সম্মান করে


ইসলাম মানুষকে সম্মান করার প্রতি উৎসাহিত করে, অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতি নয়। বিশেষ করে যারা সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য, তাদের সম্মান করার প্রতি ইসলাম বিশেষভাবে উৎসাহিত করে। শুধু তাই নয়; বরং বয়স্ক, আলিম ও মর্যাদাবান ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে ইসলাম তার চারিত্রিক মূলনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা বলে অভিহিত করেছে, যে মূলনীতির ওপর ইসলামি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠিত। যার মধ্যে এ গুণ অনুপস্থিত, তাকে ইসলামি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ -এর উম্মত হওয়ার গর্বিত পরিচয় তার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا، وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا 'যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলিমদের মর্যাদা ও অধিকার বুঝে না, সে আমার (সত্যিকার) উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ৪৯০
সমাজে বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের চেয়ে বড়দের বেশি মূল্যায়ন করা সমাজের উন্নতির আলামত। যে সমাজের প্রত্যেক সদস্যের মাঝে মানবিক চরিত্র বিদ্যমান এবং মানসিকতা উন্নত, সে সমাজেই বড়দের সম্মান করা হয় এবং তাদের বেশি মূল্যায়ন করা হয়। এজন্য ইসলামি সমাজব্যবস্থার নীতিনির্ধারক রাসুলুল্লাহ বড়দের সম্মান করার এ মহান গুণটির প্রতি মুসলমানদের খুব তাগিদ দিয়েছেন।
তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হলো, রাসুলুল্লাহ -এর নিকট একদল লোক আসলেন। তাদের পক্ষ থেকে তাদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য আব্দুর রহমান বিন সাহল রাসুলুল্লাহ -এর সাথে কথা বলতে গেলে তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে যে লোক সবার বড়, সে-ই কথা বলো। তখন আব্দুর রহমান চুপ হয়ে গেলেন এবং বড় আরেকজন কথা বললেন। '৪৯১
রাসুলুল্লাহ বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তির সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। বড়দের সম্মান করাকে তিনি আল্লাহকে সম্মান করার নামান্তর বলেছেন।
তিনি বলেন:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।'৪৯২
আগের প্রজন্মের মুসলমানদের মাঝে রাসুলুল্লাহ -এর এ প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়েছিল। এজন্য তাদের মাঝে এসব মহান গুণ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিকে সম্মান করার বিষয়ে তারা ছিলেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উদাহরণস্বরূপ আবু সাইদ সামুরা বিন জুনদুব-এর কথাটা শোনা যাক। তিনি বলেন:
لَقَدْ كُنْتُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غُلَامًا، فَكُنْتُ أَحْفَظُ عَنْهُ، فَمَا يَمْنَعُنِي مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا أَنَّ هَا هُنَا رِجَالًا هُمْ أَسَنُّ مِنِّي
'রাসুলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু তাঁর কথা মনে রাখতে পারতাম। তবে একমাত্র এ কারণে তা আলোচনা করতে আমার বিবেক আমাকে বাধা দিত যে, তখন রাসুলুল্লাহ-এর কাছে আমার চেয়ে বয়সে বড় অনেক লোক উপস্থিত থাকতেন। '৪৯৩
বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন আব্দুল্লাহ বিন উমর। একদিন তিনি রাসুলুল্লাহ-এর দরবারে উপস্থিত ছিলেন। তখন সেখানে আবু বকর ও উমর-ও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে রাসুলুল্লাহ এমন একটি প্রশ্ন করলেন, যার উত্তর ইবনে উমর-এর জানা ছিল। কিন্তু আবু বকর ও উমর-এর প্রতি সম্মানবশত তিনি উত্তর দেননি।
বিস্তারিত খোদ ইবনে উমর-এর মুখেই শুনুন :
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَخْبِرُونِي بِشَجَرَةٍ مَثَلُهَا مَثَلُ المُسْلِمِ، تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا، وَلَا تَحْتُ وَرَقَهَا فَوَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَهُ، فَكَرِهْتُ أَنْ أَتَكَلَّمَ، وَثَمَّ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ، فَلَمَّا لَمْ يَتَكَلَّمَا ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هِيَ النَّخْلَةُ»، فَلَمَّا خَرَجْتُ مَعَ أَبِي قُلْتُ: يَا أَبَتَاهُ، وَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَةُ، قَالَ: مَا مَنَعَكَ أَنْ تَقُولَهَا، لَوْ كُنْتَ قُلْتَهَا كَانَ أَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ كَذَا وَكَذَا، قَالَ: مَا مَنَعَنِي إِلَّا أَنِّي لَمْ أَرَكَ وَلَا أَبَا بَكْرٍ تَكَلَّمْتُمَا فَكَرِهْتُ
'রাসুলুল্লাহ (একদিন উপস্থিত সবাইকে) বললেন, বলো তো দেখি সে কোন গাছ, যার উপমা মুসলমানের সাথে দেওয়া চলে। সব সময় সে তার প্রভুর নির্দেশে ফলদান করে এবং তার পাতা কখনো ঝরে যায় না। তখন আমার মনে আসলো, নিশ্চয় তা খেজুর গাছ। তবে আবু বকর ও উমর-এর উপস্থিতিতে আমি কথা বলা সংগত মনে করলাম না। যখন তাঁরা (আবু বকর ও উমর *) কোনো উত্তর দিলেন না, তখন নবিজি বললেন, তা হচ্ছে খেজুর গাছ। এরপর যখন আমি আমার পিতার সাথে মজলিস থেকে বের হয়ে আসলাম, তখন তাঁকে বললাম, আব্বু, আমার মনে এসেছিল যে, ওটা খেজুর গাছ। তখন তিনি বললেন, তাহলে তা বলতে কী বাধা ছিল তোমার? তুমি যদি তা বলতে, তাহলে অমুক অমুক বস্তুর চেয়েও আমার কাছে তা প্রিয়তর হতো। আমি বললাম, তেমন কোনো বাধা ছিল না, তবে আমি দেখলাম, আপনি আর আবু বকর কেউ-ই উত্তর দিচ্ছেন না, তাই (আপনাদের সম্মানার্থে) আমি উত্তর দেওয়া সমীচীন মনে করিনি। '৪৯৪
ইসলাম সমাজে মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার কথা বলে। সহিহ মুসলিমে আয়িশা সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন: أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نُنَزِّلَ النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ
'রাসুলুল্লাহ মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। '৪৯৫
যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার অর্থ হলো, প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা উপলব্ধি করে, সে অনুযায়ী স্তরবিন্যাস করে মূল্যায়ন করা। সুতরাং প্রথম মূল্যায়ন করতে হবে ক্রমান্বয়ে উলামায়ে ইসলাম, কুরআনের হাফিজ ও সুস্থ বুদ্ধি ও বিবেকসম্পন্ন লোকদের।
কেননা, ইসলামি সমাজে আলিমদের মর্যাদা সবার ওপরে। তবে শর্ত হলো, তাদের আল্লাহর শরিয়তের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, সত্যপথে অবিচল থাকতে হবে এবং ইসলামের নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। স্বয়ং আল্লাহ-ই আলিমদের এ মর্যাদা দিয়েছেন।
তিনি বলেন: قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
'বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান। '৪৯৬
অনুরূপভাবে ইসলামি সমাজে কুরআনের বাহক তথা কারি ও হাফিজদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। একাধিক সহিহ হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদেরকে নামাজের ইমামতির অধিক যোগ্য এবং সভা-মজলিসে সভাপতিত্বের অধিক হকদার বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللهِ، فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءٌ، فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ، فَإِنْ كَانُوا فِي السُّنَّةِ سَوَاءٌ، فَأَقْدَمُهُمْ هِجْرَةً، فَإِنْ كَانُوا فِي الْهِجْرَةِ سَوَاءً ، فَأَقْدَمُهُمْ سِلْمًا ، وَلَا يَؤُمَنَّ الرَّجُلُ الرَّجُلَ فِي سُلْطَانِهِ، وَلَا يَقْعُدْ فِي بَيْتِهِ عَلَى تَكْرِمَتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ
'যে সর্বাপেক্ষা বেশি কুরআনি জ্ঞানের অধিকারী, সে লোকজনের ইমামতি করবে। সবাই যদি কুরআনের জ্ঞানে সমপর্যায়ের হয়, সে ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক পরিজ্ঞাত হবে, সে ইমামতি করবে। সুন্নাহর জ্ঞানেও সবাই সমান হলে হিজরতে যে অগ্রগামী, সে ইমামতি করবে। কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির নিজস্ব প্রভাবাধীন এলাকায় ইমামতি করবে না কিংবা তার অনুমতি ছাড়া তার বাড়িতে তার নির্দিষ্ট আসনে বসবে না। '৪৯৭
একটু পূর্বে আমরা এ সম্পর্কিত রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি হাদিস উল্লেখ করেছি। তা হলো:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।' ৪৯৮
বর্ণিত আছে :
'উহুদ যুদ্ধের শহিদগণকে এক কবরে দুজন করে দাফন করা হয়েছিল। কবর দেওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করতেন, أَيُّهُمَا أَكْثَرُ أَخْذَا لِلْقُرْآنِ؟ 'এ দুজনের মধ্যে কুরআন কার আয়ত্তে বেশি ছিল? যার দিকে ইশারা করা হতো, তাকেই প্রথমে কবরে রাখতেন।' ৪৯৯
মানুষকে যাথাযোগ্য মর্যাদা দিতে ও মূল্যায়ন করতে রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি বিচক্ষণ ও বাস্তববাদী নির্দেশনা তিনি নামাজের পূর্বমুহূর্তে কাতার সোজা করার সময় দিয়েছেন।
ইরশাদ করেছেন :
لِيَلِنِي مِنْكُمْ أُولُو الْأَحْلَامِ وَالنُّهَى
'মর্যাদাসম্পন্ন বিবেকবানরাই (নামাজে) আমার কাছাকাছি থাকবে।' ৫০০
এ একটিমাত্র নির্দেশনায় রয়েছে অনেক শিক্ষা। সর্বপ্রথম শিক্ষা হলো, প্রত্যেক মানুষকে তার মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে হবে এবং সে অনুসারেই স্তরবিন্যাস করত হবে। নামাজের মধ্যে সুষ্ঠু বিবেকসম্পন্ন লোকদের রাসুলুল্লাহ-এর পেছনে প্রথমে রাখার মাধ্যমে মূলত মুসলমানদের বিভিন্ন দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মনোনীত করেছেন। প্রত্যেক বিবেকসম্পন্ন মানুষকে স্ব-স্ব যোগ্যতা, শক্তি ও বিশেষত্ব অনুযায়ী ইসলামি সমাজের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ আদব প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে এবং কোনো কিছু বণ্টন করার ক্ষেত্রে দ্বীনি বিষয়ে মর্যাদা ও ফজিলতসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতেন। প্রত্যেক জাতির সম্মানিত ব্যক্তিকে তিনি সম্মান করতেন। তাকেই সে জাতির গভর্নর নিযুক্ত করতেন। রাসুলুল্লাহ-এর মজলিসে শ্রেষ্ঠ ও ন্যায়বান মুমিনদের অগ্রাধিকার ছিল, যারা তাকওয়ার দিক দিয়ে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। বড়দের সম্মান করতেন। ছোটদের স্নেহ করতেন। অভাবীদের স্বার্থে আপন স্বার্থ বিসর্জন দিতেন। ভিনদেশি অপরিচিতজনদের হিফাজত করতেন।
যে ব্যক্তি উপরোল্লিখিত বাস্তবসম্মত বিষয়সমূহ পূর্ণরূপে অনুধাবন করে সাধারণভাবে সমাজের সকল মানুষের সাথে; বিশেষভাবে আলিম-উলামা, মুত্তাকি ও মর্যাদাবান মানুষদের সাথে সে অনুযায়ী সমাজজীবন পরিচালনা করে, সে-ই হচ্ছে প্রকৃত মুসলমান।

ইসলাম মানুষকে সম্মান করার প্রতি উৎসাহিত করে, অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতি নয়। বিশেষ করে যারা সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য, তাদের সম্মান করার প্রতি ইসলাম বিশেষভাবে উৎসাহিত করে। শুধু তাই নয়; বরং বয়স্ক, আলিম ও মর্যাদাবান ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে ইসলাম তার চারিত্রিক মূলনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা বলে অভিহিত করেছে, যে মূলনীতির ওপর ইসলামি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠিত। যার মধ্যে এ গুণ অনুপস্থিত, তাকে ইসলামি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ -এর উম্মত হওয়ার গর্বিত পরিচয় তার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا، وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا 'যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলিমদের মর্যাদা ও অধিকার বুঝে না, সে আমার (সত্যিকার) উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ৪৯০
সমাজে বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের চেয়ে বড়দের বেশি মূল্যায়ন করা সমাজের উন্নতির আলামত। যে সমাজের প্রত্যেক সদস্যের মাঝে মানবিক চরিত্র বিদ্যমান এবং মানসিকতা উন্নত, সে সমাজেই বড়দের সম্মান করা হয় এবং তাদের বেশি মূল্যায়ন করা হয়। এজন্য ইসলামি সমাজব্যবস্থার নীতিনির্ধারক রাসুলুল্লাহ বড়দের সম্মান করার এ মহান গুণটির প্রতি মুসলমানদের খুব তাগিদ দিয়েছেন।
তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হলো, রাসুলুল্লাহ -এর নিকট একদল লোক আসলেন। তাদের পক্ষ থেকে তাদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য আব্দুর রহমান বিন সাহল রাসুলুল্লাহ -এর সাথে কথা বলতে গেলে তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে যে লোক সবার বড়, সে-ই কথা বলো। তখন আব্দুর রহমান চুপ হয়ে গেলেন এবং বড় আরেকজন কথা বললেন। '৪৯১
রাসুলুল্লাহ বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তির সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। বড়দের সম্মান করাকে তিনি আল্লাহকে সম্মান করার নামান্তর বলেছেন।
তিনি বলেন:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।'৪৯২
আগের প্রজন্মের মুসলমানদের মাঝে রাসুলুল্লাহ -এর এ প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়েছিল। এজন্য তাদের মাঝে এসব মহান গুণ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিকে সম্মান করার বিষয়ে তারা ছিলেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উদাহরণস্বরূপ আবু সাইদ সামুরা বিন জুনদুব-এর কথাটা শোনা যাক। তিনি বলেন:
لَقَدْ كُنْتُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غُلَامًا، فَكُنْتُ أَحْفَظُ عَنْهُ، فَمَا يَمْنَعُنِي مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا أَنَّ هَا هُنَا رِجَالًا هُمْ أَسَنُّ مِنِّي
'রাসুলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু তাঁর কথা মনে রাখতে পারতাম। তবে একমাত্র এ কারণে তা আলোচনা করতে আমার বিবেক আমাকে বাধা দিত যে, তখন রাসুলুল্লাহ-এর কাছে আমার চেয়ে বয়সে বড় অনেক লোক উপস্থিত থাকতেন। '৪৯৩
বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন আব্দুল্লাহ বিন উমর। একদিন তিনি রাসুলুল্লাহ-এর দরবারে উপস্থিত ছিলেন। তখন সেখানে আবু বকর ও উমর-ও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে রাসুলুল্লাহ এমন একটি প্রশ্ন করলেন, যার উত্তর ইবনে উমর-এর জানা ছিল। কিন্তু আবু বকর ও উমর-এর প্রতি সম্মানবশত তিনি উত্তর দেননি।
বিস্তারিত খোদ ইবনে উমর-এর মুখেই শুনুন :
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَخْبِرُونِي بِشَجَرَةٍ mَثَلُهَا مَثَلُ المُسْلِمِ، تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا، وَلَا تَحْتُ وَرَقَهَا فَوَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَهُ، فَكَرِهْتُ أَنْ أَتَكَلَّمَ، وَثَمَّ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ، فَلَمَّا لَمْ يَتَكَلَّمَا ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هِيَ النَّخْلَةُ»، فَلَمَّا خَرَجْتُ مَعَ أَبِي قُلْتُ: يَا أَبَتَاهُ، وَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَةُ، قَالَ: مَا مَنَعَكَ أَنْ تَقُولَهَا، لَوْ كُنْتَ قُلْتَهَا كَانَ أَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ كَذَا وَكَذَا، قَالَ: مَا مَنَعَنِي إِلَّا أَنِّي لَمْ أَرَكَ وَلَا أَبَا بَكْرٍ تَكَلَّمْتُمَا فَكَرِهْتُ
'রাসুলুল্লাহ (একদিন উপস্থিত সবাইকে) বললেন, বলো তো দেখি সে কোন গাছ, যার উপমা মুসলমানের সাথে দেওয়া চলে। সব সময় সে তার প্রভুর নির্দেশে ফলদান করে এবং তার পাতা কখনো ঝরে যায় না। তখন আমার মনে আসলো, নিশ্চয় তা খেজুর গাছ। তবে আবু বকর ও উমর-এর উপস্থিতিতে আমি কথা বলা সংগত মনে করলাম না। যখন তাঁরা (আবু বকর ও উমর *) কোনো উত্তর দিলেন না, তখন নবিজি বললেন, তা হচ্ছে খেজুর গাছ। এরপর যখন আমি আমার পিতার সাথে মজলিস থেকে বের হয়ে আসলাম, তখন তাঁকে বললাম, আব্বু, আমার মনে এসেছিল যে, ওটা খেজুর গাছ। তখন তিনি বললেন, তাহলে তা বলতে কী বাধা ছিল তোমার? তুমি যদি তা বলতে, তাহলে অমুক অমুক বস্তুর চেয়েও আমার কাছে তা প্রিয়তর হতো। আমি বললাম, তেমন কোনো বাধা ছিল না, তবে আমি দেখলাম, আপনি আর আবু বকর কেউ-ই উত্তর দিচ্ছেন না, তাই (আপনাদের সম্মানার্থে) আমি উত্তর দেওয়া সমীচীন মনে করিনি। '৪৯৪
ইসলাম সমাজে মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার কথা বলে। সহিহ মুসলিমে আয়িশা সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন: أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نُنَزِّلَ النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ
'রাসুলুল্লাহ মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। '৪৯৫
যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার অর্থ হলো, প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা উপলব্ধি করে, সে অনুযায়ী স্তরবিন্যাস করে মূল্যায়ন করা। সুতরাং প্রথম মূল্যায়ন করতে হবে ক্রমান্বয়ে উলামায়ে ইসলাম, কুরআনের হাফিজ ও সুস্থ বুদ্ধি ও বিবেকসম্পন্ন লোকদের।
কেননা, ইসলামি সমাজে আলিমদের মর্যাদা সবার ওপরে। তবে শর্ত হলো, তাদের আল্লাহর শরিয়তের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, সত্যপথে অবিচল থাকতে হবে এবং ইসলামের নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। স্বয়ং আল্লাহ-ই আলিমদের এ মর্যাদা দিয়েছেন।
তিনি বলেন: قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
'বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান। '৪৯৬
অনুরূপভাবে ইসলামি সমাজে কুরআনের বাহক তথা কারি ও হাফিজদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। একাধিক সহিহ হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদেরকে নামাজের ইমামতির অধিক যোগ্য এবং সভা-মজলিসে সভাপতিত্বের অধিক হকদার বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللهِ، فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءٌ، فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ، فَإِنْ كَانُوا فِي السُّنَّةِ سَوَاءٌ، فَأَقْدَمُهُمْ هِجْرَةً، فَإِنْ كَانُوا فِي الْهِجْرَةِ سَوَاءً ، فَأَقْدَمُهُمْ سِلْمًا ، وَلَا يَؤُمَنَّ الرَّجُلُ الرَّجُلَ فِي سُلْطَانِهِ، وَلَا يَقْعُدْ فِي بَيْتِهِ عَلَى تَكْرِمَتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ
'যে সর্বাপেক্ষা বেশি কুরআনি জ্ঞানের অধিকারী, সে লোকজনের ইমামতি করবে। সবাই যদি কুরআনের জ্ঞানে সমপর্যায়ের হয়, সে ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক পরিজ্ঞাত হবে, সে ইমামতি করবে। সুন্নাহর জ্ঞানেও সবাই সমান হলে হিজরতে যে অগ্রগামী, সে ইমামতি করবে। কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির নিজস্ব প্রভাবাধীন এলাকায় ইমামতি করবে না কিংবা তার অনুমতি ছাড়া তার বাড়িতে তার নির্দিষ্ট আসনে বসবে না। '৪৯৭
একটু পূর্বে আমরা এ সম্পর্কিত রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি হাদিস উল্লেখ করেছি। তা হলো:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।' ৪৯৮
বর্ণিত আছে :
'উহুদ যুদ্ধের শহিদগণকে এক কবরে দুজন করে দাফন করা হয়েছিল। কবর দেওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করতেন, أَيُّهُمَا أَكْثَرُ أَخْذَا لِلْقُرْآنِ؟ 'এ দুজনের মধ্যে কুরআন কার আয়ত্তে বেশি ছিল? যার দিকে ইশারা করা হতো, তাকেই প্রথমে কবরে রাখতেন।' ৪৯৯
মানুষকে যাথাযোগ্য মর্যাদা দিতে ও মূল্যায়ন করতে রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি বিচক্ষণ ও বাস্তববাদী নির্দেশনা তিনি নামাজের পূর্বমুহূর্তে কাতার সোজা করার সময় দিয়েছেন।
ইরশাদ করেছেন :
لِيَلِنِي مِنْكُمْ أُولُو الْأَحْلَامِ وَالنُّهَى
'মর্যাদাসম্পন্ন বিবেকবানরাই (নামাজে) আমার কাছাকাছি থাকবে।' ৫০০
এ একটিমাত্র নির্দেশনায় রয়েছে অনেক শিক্ষা। সর্বপ্রথম শিক্ষা হলো, প্রত্যেক মানুষকে তার মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে হবে এবং সে অনুসারেই স্তরবিন্যাস করত হবে। নামাজের মধ্যে সুষ্ঠু বিবেকসম্পন্ন লোকদের রাসুলুল্লাহ-এর পেছনে প্রথমে রাখার মাধ্যমে মূলত মুসলমানদের বিভিন্ন দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মনোনীত করেছেন। প্রত্যেক বিবেকসম্পন্ন মানুষকে স্ব-স্ব যোগ্যতা, শক্তি ও বিশেষত্ব অনুযায়ী ইসলামি সমাজের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ আদব প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে এবং কোনো কিছু বণ্টন করার ক্ষেত্রে দ্বীনি বিষয়ে মর্যাদা ও ফজিলতসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতেন। প্রত্যেক জাতির সম্মানিত ব্যক্তিকে তিনি সম্মান করতেন। তাকেই সে জাতির গভর্নর নিযুক্ত করতেন। রাসুলুল্লাহ-এর মজলিসে শ্রেষ্ঠ ও ন্যায়বান মুমিনদের অগ্রাধিকার ছিল, যারা তাকওয়ার দিক দিয়ে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। বড়দের সম্মান করতেন। ছোটদের স্নেহ করতেন। অভাবীদের স্বার্থে আপন স্বার্থ বিসর্জন দিতেন। ভিনদেশি অপরিচিতজনদের হিফাজত করতেন।
যে ব্যক্তি উপরোল্লিখিত বাস্তবসম্মত বিষয়সমূহ পূর্ণরূপে অনুধাবন করে সাধারণভাবে সমাজের সকল মানুষের সাথে; বিশেষভাবে আলিম-উলামা, মুত্তাকি ও মর্যাদাবান মানুষদের সাথে সে অনুযায়ী সমাজজীবন পরিচালনা করে, সে-ই হচ্ছে প্রকৃত মুসলমান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00