📄 মক্কা বিজয়, হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধে আবু বকর
১. অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর মক্কা বিজয়ের কারণ প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাকের একটি বর্ণনা রয়েছে। বর্ণনাটি ইমাম জুহরি উরওয়ার সূত্রে মিসওয়ার ইবনু মাখরামা এবং মারওয়ান ইবনুল হাকাম থেকে উল্লেখ করেছেন। সন্ধির একটি দফা ছিল— 'যারা চায় মুহাম্মাদের সঙ্গে সহযোগিতা-চুক্তি করবে করুক, যারা চায় কুরাইশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হবে, হয়ে যাক।' এর সূত্র ধরে বনু খুজাআ مسلمانوں সঙ্গে এবং বনু বকর কুরাইশের সঙ্গে সন্ধিতে আবদ্ধ হয়। এই অবস্থা ১৭ অথবা ১৮ মাস ভালোই চলতে থাকে; কিন্তু এরপর বনু বকর একরাতে 'ওয়াতির' ঝরনার পাশে বনু খুজাআর ওপর আক্রমণ করে বসে। কুরাইশরা ভাবছিল মুহাম্মাদ কি আর জানতে পারবে? তা ছাড়া রাতের অন্ধকারে আমাদের দেখবেই-বা কে? ফলে তারা রাসুলের সঙ্গে শত্রুতার জের ধরে বনু খুজাআর বিরুদ্ধে বনু বকরকে অশ্বারোহী এবং অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে। এমনকি তারা নিজেরাও ওদের সঙ্গে মিলে বনু খুজাআর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ অবস্থার সংবাদ নিয়ে আমর ইবনু সালিম আল খুজায়ি মদিনায় হাজির হন। তিনি রাসুলের সাহায্য-কামনা করে আবৃত্তি করেন,
আল্লাহ, আমি মুহাম্মাদ থেকে তাঁর অঙ্গীকার এবং তাঁর পিতার পুরানো অঙ্গীকারের দোহাই দিচ্ছি, আল্লাহ আপনাকে হিদায়াত দান করুন, আপনি সর্বোচ্চ সাহায্য করুন, আল্লাহর বান্দাদের ডাক দিন, তারা যেন সাহায্যে এসে যায়। নবিজি বলেন, 'ইবনু সালিম, অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করা হবে।
এর পর নবিজি সাহাবিগণকে নিয়ে মক্কায় চড়াও হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেন। তবে বিষয়টি তিনি গোপন রাখেন এবং আল্লাহর কাছে আবেদন জানান, যে পর্যন্ত-না মুসলমানগণ আচমকা মক্কাবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, ততক্ষণ যেন কুরাইশরা এ ব্যাপারে কিছু অবগত হতে না পারে।
এদিকে কুরাইশরা নিজেদের পরিণাম নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তাদের ভয় ছিল, কী জানি মুহাম্মাদ কখন তাদের সংশ্লিষ্টতার খবরটি জেনে ফেলেন। সুতরাং শঙ্কিত আবু সুফিয়ান মক্কা থেকে মদিনায় পৌঁছান এবং নবিজির কাছে আবেদন করেন, 'মুহাম্মাদ, অঙ্গীকারটি আরও দৃঢ় করে নিন এবং এর মেয়াদও বাড়িয়ে নিন।' নবিজি কিছুটা তীর্যক ভাষায় বলেন, 'তুমি কি এই উদ্দেশ্যেই এসেছ? তবে কি তোমাদের পক্ষে এর বিপরীতে কিছু হয়েছে?' আবু সুফিয়ান বলেন, 'আল্লাহর কাছে পানাহ চাই, আমরা হুদায়বিয়ার সন্ধির ওপর দৃঢ় আছি। এর মধ্যে কোনো প্রকার পরিবর্তন-পরিবর্ধন আনিনি।' এরপর তিনি সাহাবিদের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে নবিজির কাছ থেকে বিদায় গ্রহণ করেন。
ক. আবু বকর রা. এবং আবু সুফিয়ান
আবু সুফিয়ান যখন আবু বকরের কাছে অঙ্গীকার নবায়ন এবং মেয়াদবৃদ্ধির প্রস্তাব রাখেন, তখন আবু বকর রা. স্পষ্ট বলে দেন— 'আল্লাহর শপথ, আমি যদি দেখতে পাই পিপীলিকাও তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তাহলে আমি তোমাদের বিপরীতে তাদের সহায়তা করব।' এখানে আবু বকরের মেধা এবং রাজনৈতিক দক্ষতা প্রকাশ পায়। সর্বোপরি দীপ্তিমান হয় তাঁর ইমানের দৃঢ়তাও। আবু সুফিয়ানের মুখের সামনে কোনো প্রকার ভয়ভীতি ছাড়া স্পষ্ট বলে দেন, 'আমি কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। যদি পিপীলিকাকেও কুরাইশদের বিপরীতে লড়তে দেখেন, তাহলে আমি তাদের সহায়তা দিয়ে যাব।
খ. আবু বকর রা. এবং আয়েশার মধ্যে কথোপকথন
আবু বকর সিদ্দিক রা. উম্মুল মুমিনিনি আয়েশার কাছে আসেন। তিনি তখন গম চালছিলেন। রাসুল তাঁকে বলে রেখেছিলেন, রহস্য যেন কোনোভাবে ফাঁস না হয়। কেউ যেন জানতে না পারে, কোন দিকে অভিযানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। আবু বকর রা. এসে মেয়েকে বলেন, 'মা, কীসের জন্য এই পাথেয় প্রস্তুত হচ্ছে?' আয়েশা তখন কোনো উত্তর না দিয়ে নীরব থাকেন। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, 'রাসুল কি কোনো দিকে হামলার পরিকল্পনা করেছেন?' এবারও সিদ্দিকা চুপ থাকেন, কোনো কথা বলেননি।
তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, 'নবিজি কি রোমানদের বিরুদ্ধে চড়াও হওয়ার ইচ্ছা করছেন?' আয়েশা রা. এবারও নিরুত্তর থাকেন। তিনি বলেন, 'তাহলে কি নাজদবাসীর ওপর চড়াও হওয়ার ইচ্ছা?' আয়েশা রা. আগের মতোই নিরুত্তর থাকেন। আবু বকর রা. পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, 'তাহলে কি কুরাইশদের ওপর আক্রমণ করতে যাচ্ছেন?'
এবারও তাঁর নীরবতা ভাঙানো যায়নি। ইতিমধ্যে নবিজি সেখানে উপস্থিত হলে আবু বকর তাঁকে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আপনি কি যুদ্ধের ইচ্ছা পোষণ করছেন?' নবিজি বলেন 'হ্যাঁ।' আবু বকর বলেন, 'কার বিরুদ্ধে? রোমানদের বিরুদ্ধে?' নবিজি বলেন, 'না।' 'তাহলে কি নাজদবাসীর বিরুদ্ধে?' এবারও রাসুলের উত্তর, 'না।'
আবু বকর বলেন, 'তাহলে খুব সম্ভব আপনি কুরাইশের ওপর হামলার ইচ্ছা পোষণ করছেন?' রাসুল বলেন, 'হ্যাঁ।' আবু বকর বলেন, 'কিন্তু আল্লাহর রাসুল, আপনার আর কুরাইশের মধ্যে তো সন্ধির মেয়াদ এখনো বাকি রয়ে গেছে?' রাসুল বলেন, 'বনু কাবের সঙ্গে কুরাইশরা যা করেছে, তুমি তার কিছুই জানো না?'
তখন রাসুলের দেখাদেখি আবু বকরও যুদ্ধপ্রস্তুতি শুরু করেন। মুহাজির এবং আনসারদের মধ্যে কেউ-ই এ অভিযানে রাসুলের পেছনে থাকেননি। সকলেই অভিযানে অংশগ্রহণ করেন。
গ. মক্কায় প্রবেশকালে আবু বকর মক্কাবিজয়ের পর রাসুল যখন সেখানে প্রবেশ করছিলেন, তখন তাঁর পাশেই ছিলেন আবু বকর। নবিজি দেখতে পাচ্ছিলেন, নারীরা مسلمانوں ঘোড়াগুলোর দিকে হতাশ অবস্থায় তাকিয়ে আছে। নবিজি তখন আবু বকরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেন, 'হাসসান কী জানি বলেছিল?' আবু বকর তখন হাসসানের কবিতাটি আবৃত্তি করেন—
যদি আমাদের অশ্বারোহীদের ধূলি উড়িয়ে কিদার দিকে যেতে না দেখো, তাহলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাও। বর্শা চালাতে আমরা পুরোপুরিভাবে মোকাবিলা করছি, তাদের কাঁধে রয়েছে তির ও তরবারি। আমাদের ঘোড়াগুলো দ্রুততায় পরস্পর পরস্পরের প্রতিযোগী মহিলারা ওড়না দিয়ে ঘোড়ার খুরের ধূলি থেকে নিজেদের রক্ষা করে।
রাসুল বলেন, 'সে দিক দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করো, হাসসান যে দিকে প্রবেশ করতে বলেছেন。
এ সময় আবু বকরের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ পূর্ণতায় পৌঁছে। সোনালি এই সময়ে তাঁর পিতা আবু কুহাফা ইসলামের ছায়াতলে চলে আসেন。
২. হুনাইনযুদ্ধে হুনাইনযুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থায় মুসলমানগণ চরম পরীক্ষার মুখোমুখি হন। যুদ্ধের শুরুতেই مسلمانوں দিকে পরাজয় চোখ রাঙাতে থাকে। মুসলমানগণ কাফিরদের আক্রমণের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে পালাতে শুরু করেন। ইমাম তাবারি যুদ্ধের চিত্রপট এভাবে তুলে ধরেছেন, 'মানুষ প্রাণপণে পালিয়ে যাচ্ছিল। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছিল না।' রাসুল লোকজনকে তাঁর দিকে ডেকে বলছিলেন, 'হে লোকসকল, কোথায় পালাচ্ছ, আমার কাছে এসো। আমি আল্লাহর রাসুল। আমি মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহ। আনসারগণ, আমি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসুল।' এরপর তিনি তাঁর চাচা আব্বাসকে ডাক দেন। তাঁর আওয়াজ ছিল খুবই উঁচু। তাঁকে লক্ষ করে বলেন, 'আব্বাস, ডাক দাও। হে আনসারগণ, হে বাবলাগাছের নিচে শপথকারীরা!'
যুদ্ধের প্রথম দিকের দৃশ্য-ময়দানে দাঁড়ানো ছিলেন কেবল রাসুল। তাঁর পাশে ছিলেন স্বল্পসংখ্যক মুসলমান। যাঁরা ময়দানে রাসুলের পাশে ছিলেন, তাঁরা ছিলেন শীর্ষস্থানীয় সাহাবি। তাঁদের সামনে ছিলেন আবু বকর। এরপর আল্লাহ তাঁর পূর্ণ সাহায্য ও সমর্থন দ্বারা মুসলিমবাহিনীকে ধন্য করায় তারা বিজয় লাভ করেন। এ যুদ্ধে সিদ্দিকের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান প্রকাশ পায়।
ক. আল্লাহর রাসুলের উপস্থিতিতে সিদ্দিকের ফাতওয়া প্রদান আবু কাতাদার বর্ণনা; হুনাইনের দিন আমি দেখতে পাই, জনৈক মুসলিম এক মুশরিকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আরেক মুশরিক ওই মুসলমানকে ধোঁকা দিয়ে হত্যা করতে চাচ্ছে। আমি দ্রুত ওই মুশরিকের দিকে এগিয়ে যাই, যে মুসলিমকে হত্যা করতে চেয়েছিল, সে আমাকে মারতে উদ্যত হয়; কিন্তু আমি তার হাতে তরবারি দিয়ে আঘাত করি। এতে তার হাতটি কাটা পড়ে। পরে সে আমাকে শক্তভাবে জাপটে ধরে। আমি তখন মৃত্যুর ব্যাপারে ভীত হয়ে পড়ি। একসময় তার হাত ঢিলে হয়ে এলে আমি ধাক্কা দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দিই। এরপর হত্যা করে ফেলি।
শুরুতে মুসলমানগণ কাফিরদের তীব্র হামলা সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। আমিও ছিলাম পলায়নকারীদের একজন। ইতিমধ্যে উমরের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, 'মানুষের এ কী হলো?' তিনি বলেন, 'এটাই আল্লাহর নির্দেশ ছিল। ভাগ্যে এটাই নির্ধারিত ছিল।' খানিক পর লোকজন নিজেদের সামলে নিয়ে রাসুলের কাছে ফিরে আসেন। আল্লাহ তাঁদের সাহায্য করেন এবং বিজয়ের বন্দরে তাঁদের পৌঁছে দেন।
নবিজি তখন ঘোষণা দিয়েছিলেন, 'যে ব্যক্তি কোনো নিহত শত্রুর ওপর তার হত্যার কথা প্রমাণিত করবে, সে-ই হবে নিহত ব্যক্তির সম্পদের মালিক।' আমি তখন আমার নিহত ব্যক্তির প্রমাণ সংগ্রহের জন্য বের হই; কিন্তু কোনো সাক্ষী না পেয়ে হতাশা নিয়ে বসে পড়ি। এরপর বিষয়টি স্মরণ হতেই আমি রাসুলের দরবারে উপস্থিত হয়ে পুরো ঘটনা খুলে বলি। তখন সেখানে বسا জনৈক ব্যক্তি বলেন, 'ওই নিহত ব্যক্তির মালসামানা আমার কাছে জমা আছে। আপনি এগুলো আমাকে দিয়ে দিন।' আবু বকর তৎক্ষণাৎ বলে উঠেন, 'না, না, কখনো এটা হতে পারে না। আল্লাহর এই সিংহকে ছেড়ে এক দুর্বল কুরাইশিকে তা দিয়ে দেওয়া হবে, এটা হতে পারে না।' এরপর নবিজি তা আমার দায়িত্বে ছেড়ে দেন। আমি তা দিয়ে একটি বাগান কিনে নিই। এটিই ছিল আমার প্রথম সম্পদ, যা আমি মুসলিম অবস্থায় অর্জন করেছিলাম।
রাসুলের উপস্থিতিতে সিদ্দিক কর্তৃক লোকটিকে ধমকানো, শাসানো, শপথ করা এবং ফাতওয়া দেওয়া, এরপর রাসুল কর্তৃক তাঁর সত্যায়নে নির্দেশ প্রদান-এ ছিল সিদ্দিকের অনন্য বৈশিষ্ট্য, যেখানে অন্য কেউ তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না।
এ ঘটনায় আমরা দেখতে পাই, আবু কাতাদা তাঁর এক মুসলিম ভাইকে রক্ষার জন্য অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তাঁকে বাঁচানোর জন্য তিনি বিপদের মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কাফিরকে হত্যা করেছিলেন। একইভাবে আবু বকরের এই অবস্থান থেকে এটাও প্রকাশ পায় যে, তিনি সত্যকে সত্য বলতে এবং সত্যের পক্ষ নিতে বুকে কীরূপ আগ্রহ ধারণ করতেন। একইভাবে এখান থেকে তাঁর দৃঢ় ইমান, ইসলামি ভ্রাতৃত্বের পক্ষপাত এবং সম্মানদানের বিষয়টিও ফুটে ওঠে। এ ছিল তাঁর বিশাল মর্যাদাময় অবস্থানের স্পষ্ট দলিল।
খ. আবু বকর রা. এবং আব্বাস ইবনু মিরদাসের কবিতা কবি আব্বাস ইবনু মিরদাস হুনাইনের গনিমতের অংশ পেয়েছিলেন; কিন্তু তা তার কাছে অল্প মনে হওয়ায় রাসুলের সমালোচনা করে বলছিলেন,
আমি ময়দানে ধাবমান ঘোড়ায় চড়ে গনিমত সংগ্রহ করেছিলাম, আমি মানুষকে জাগ্রত রেখেছিলাম, মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, আমি তখন সজাগ ছিলাম।
এরপরও আমার এবং আমার ঘোড়া উবায়দের অংশ উয়াইনা ইবনু হিসন এবং আকরা ইবনু হাবিসের মাঝামাঝি ছিল। আমি যুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম, তথাপি না মূল্যবান কিছু দেওয়া হয়, না বাধা দেওয়া হয়। কেবল কয়েকটি ছোট ছোট উট দেওয়া হয়েছিল, যেগুলোর পা-চতুষ্টয় গণনা করা যেত। অথচ হিসন এবং হাবিসরা আমার পিতার মোকাবিলায় সমাজে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব রাখত না। আমি তাদের থেকে কোনোভাবে কম ছিলাম না
আজ যাকে নীচু করা হবে, সে আর মাথা তুলতে পারবে না। এসব কথা যখন রাসুলের কানে পৌঁছে, তখন রাসুল বলেন, 'ওর কাছে গিয়ে ওর জিহ্বাটা বন্ধ করে দাও।' এরপর সাহাবিগণ তাকে এত সম্পদ দেন যে, সে খুশি হয়ে যায়। এভাবে রাসুলের নির্দেশমতো তার জিহ্বা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একবার আব্বাস ইবনু মিরদাস রাসুলের কাছে গেলে নবিজি তাকে বলেন, 'তুমিই কি এই পঙ্ক্তি উচ্চারণ করেছিলে—
এরপরও আমার এবং আমার ঘোড়া উবায়দের অংশ উয়াইনা ইবনু হিসন এবং আকরা ইবনু হাবিসের মাঝামাঝি ছিল?' তখন আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, এখানে কি 'বাইনা উয়াইনা ওয়া আকরা?' নবিজি বলেন, 'তারা একই সত্তা।' আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমি এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ঠিক তা-ই, যেমনটি আপনার ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
আমি রাসুলকে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি, আর এটা তার জন্য শোভনীয়ও নয়, এটা তো এক উপদেশ এবং স্পষ্ট কুরআন। [সুরা ইয়াসিন: ৬৯]
৩. তায়েফের ময়দানে
তায়েফের ময়দানে সাহাবিগণ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। তাঁদের অনেকে শাহাদাতবরণ করেছিলেন। রাসুল অবরোধ উঠিয়ে মদিনায় ফিরে আসেন। তায়েফযুদ্ধের শহিদদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন আবি বকরও ছিলেন। তাঁর গায়ে একটি তির বিদ্ধ হয়েছিল, যার প্রতিক্রিয়ায় তিনি পিতা আবু বকরের শাসনামলে শাহাদাতবরণ করেন।
বনু সাকিফের লোকজন তাদের ইসলামগ্রহণের কথা নবিজিকে জানাতে যখন মদিনার উপকণ্ঠে এসে পৌঁছায়, তখন তাদের ইসলামগ্রহণের বিষয়টি বুঝতে পেরে সংবাদটি নবিজিকে পৌঁছে দিতে আবু বকর ও মুগিরা ইবনু শুবা অস্থির হয়ে দৌড়াতে থাকেন। তাঁরা উভয়েই চাচ্ছিলেন আগে সংবাদটি নবিজি বরাবরে পৌঁছে দেবেন। শেষপর্যন্ত আবু বকরই জিতে যান।
বনু সাকিফের লোকজন নবিজির কাছে ইসলামগ্রহণের পর তারা মদিনায় কিছুদিন অবস্থান করেন। এরপর রাসুল ইসলামি নিরাপত্তানামা লিখিতভাবে প্রদান করেন এবং তাদের থেকে একজনকে আমির নির্ধারণের ইচ্ছা করেন। এ ব্যাপারে পরামর্শ চাইলে আবু বকর বলেন, 'উসমান ইবনু আবিল আসকে আমির নিযুক্ত করে দিন'; অথচ তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে বয়সে ছোট। আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমি এই যুবককে ইসলামি জ্ঞানার্জন এবং কুরআন শিক্ষার প্রতি সবচেয়ে বেশি আগ্রহী দেখেতে পয়েছি।
উসমান ইবনু আবিল আসের অবস্থা ছিল- লোকজন দুপুরে ঘুমিয়ে গেলে তিনি রাসুলের খিদমতে ইলম অর্জনের জন্য হাজির হতেন। তাঁর কাছে দীনি বিষয়াদি নিয়ে প্রশ্ন করতেন। কুরআন শিখতেন। এভাবে তিনি ধর্মীয় বিষয়ে বিশেষ যোগ্যতা ও প্রজ্ঞা অর্জন করেন। রাসুল-কে শায়িত অবস্থায় পেলে তিনি আবু বকরের কাছে চলে যেতেন। আপন সম্প্রদায়কে তা জানতে দিতেন না। নবিজি তাঁর শেখার এই আগ্রহ দেখে মুগ্ধ হন। তিনি তাঁকে ভালোবাসতে থাকেন।
আবু বকর যখন সে লোকটির সন্ধান পান- যে তার প্রিয় পুত্রের ওপর তির নিক্ষেপ করেছিল-তখন তিনি যে কথাটি বলেছিলেন, সেটি ছিল তাঁর ইমানের শ্রেষ্ঠত্বের স্পষ্ট প্রমাণ। ইমাম কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ রাহ. থেকে বর্ণিত: তায়েফে আবদুল্লাহ ইবন আবি বকর আহত হয়েছিলেন। তাঁর এই আঘাত রাসুলের ইনতিকালের ৪০ দিন পর আবার সতেজ হয়ে ওঠে। আর এতেই তিনি শাহাদাতবরণ করেন। আবু বকরের কাছে সেই তিরটি সংরক্ষিত ছিল। বনু সাকিফের প্রতিনিধিদল আসার পর তিনি তিরটি বের করে তাদের দেখান এবং বলেন, 'তোমাদের কেউ কি এই তিরটি চেনে?' তখন বনু আজলানের সায়িদ ইবনু উবাইদ বলেন, 'আমিই এই তিরটি সুচালো করে তুলেছিলাম এবং আমিই তা ছুড়েছিলাম।' আবু বকর তখন কেবল এটুকু বলেন, 'এটাই সেই তির, যার আঘাতে আবদুল্লাহ শহিদ হয়েছে। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা যে, তিনি তোমার হাতে তাঁকে শাহাদাতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন এবং তোমাকে তাঁর হাতে অপদস্থ করেননি। নিঃসন্দেহে তোমাদের উভয়ের জন্য আল্লাহর রহমত খুবই প্রশস্ত। '
টিকাঃ
২৪২ এখানে সেই অঙ্গীকারের দিকে ইঙ্গিত বিদ্যমান, যে অঙ্গীকারটি বনু হাশিম এবং বনু খুজাআর মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের সময় থেকে চলে আসছিল। - অনুবাদক।
২৪০ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু হিশাম : ৪/৪৪।
২৪৪ আত-তারিখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারি, ড. মুতি: ৩৬৫; তারিখুত তাবারি: ৩/৪৩।
তারিখুদ দাওয়াতিল ইসলামিয়া: ১৪৫।
২৪৬ মাগাজি, আল ওয়াকিদি: ২/৭৯৬।
২৪৭ মুসতাদরাকুল হাকিম, ৩/৭২। সনদটি সহিহ, জাহাবিও এর বিশুদ্ধতায় একমত।
২৪৮ মুসতাদরাকুল হাকিম, ৩/৭২; তাবারি: ৩/৪২।
২৪৯ তারিখুদ দাওয়াতিল ইসলামিয়া: ১৪৭।
২৫০ তারিখুত তাবারি: ৩/৭৪।
২৫১ সহিহ মুসলিম, আল-জিহাদ ওয়াস সিয়ার, বাবু গাজওয়াতি হুনাইন: ১৭৭৫।
২৫২ মাওয়াকিফুস সিদ্দিক মাআন নাবি ফিল মাদিনা: ৪৩।
২৫০ সহিহ বুখারি, আল-মাগাজি: ৪৩২২।
২৫৪ আর-রিয়াজুন নুসরাহ ফি মানাকিলি আশরাহ: আবু জাফর মুহিব্বুদ্দিন: ১৮৫।
২৫০ আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি, ৮/২৬।
*** আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু হিশাম: ৪/১৪৭।
২৫৭ তারিখুদ দাওয়াতিল ইসলামিয়া: ১৫১।
২৫৮ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু হিশাম: ৪/১৯৩।
২৫৯ তারিখুদ দাওয়াতিল ইসলামিয়া: ১৫২।
২৬০ তারিখুল ইসলাম, জাহাবি: আল-মাগাজি: ৬৭০।
২৬১ খুতাবু আবি বাকরিনিস সিদ্দিক রা., মুহাম্মাদ আহমাদ আশুর ১১৮। তবে এই বর্ণনাটি মুনকাতা।
📄 তাবুকযুদ্ধ, হজকাফেলার নেতৃত্ব এবং বিদায়হজ
১. তাবুকযুদ্ধে আবু বকর
রাসুল ৩০ হাজার সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী নিয়ে রোমানদের মোকাবিলার উদ্দেশ্যে শামের দিকে রওনা হন। যখন তাঁর নেতৃত্বে মুসলমানগণ 'সানিয়াতুল বিদা' উপত্যকার পাশে সমবেত হন, তখন নেতা এবং অধিনায়ক মনোনীত করা হয়। তাদের জন্য বিভিন্ন পতাকা নির্ধারণ করেন। তখন সবচেয়ে বড় পতাকাটি অর্পণ করেন আবু বকরের হাতে। এই যুদ্ধে আবু বকরের স্বতন্ত্র অবস্থান স্পষ্ট হয়।
ক. আবদুল্লাহ জুল বিজাদাইনের ইনতিকালের ব্যাপারে তাঁর অবস্থান
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের বর্ণনা; আমি রাসুলের সঙ্গে তাবুকযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। রাতে ঘুম থেকে উঠলে একদিকে মশাল জ্বলতে দেখি। কী হচ্ছে তা দেখতে সেদিকে এগিয়ে যাই। দেখতে পাই সেখানে নবিজি, আবু বকর ও উমর উপস্থিত। আবদুল্লাহ জুল বিজাদাইন ইনতিকাল করেছেন। তাঁর কবর খনন করা হয়ে গিয়েছিল। রাসুল নিজে কবরে নেমে আবু বকর ও উমরকে বলছিলেন, 'তোমাদের ভাইকে আমার নিকটে পৌঁছে দাও।' তাঁরা উভয়ে তাঁকে কবরে পৌঁছে দেন। নবিজি তাঁকে কবরে শুইয়ে রেখে বলেন, 'হে আল্লাহ, আমি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলাম, আপনিও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান।' ইবনু মাসউদ বলতেন, 'আহ! আমি যদি এই কবরের অধিবাসী হতাম।'
আবু বকর যখনই কোনো মৃতকে কবরে রাখতেন তখন বলতেন, 'আল্লাহর নামে, রাসুলের মিল্লাতের ওপর, বিশ্বাসের সঙ্গে, মৃত্যুর পরে জীবিত হওয়ার বিশ্বাসের সঙ্গে।'
খ. রাসুলের কাছে مسلمانوں জন্য দুআর প্রার্থনা উমর রা. বর্ণনা করেন; আমরা কঠিন গরমের মৌসুমে তাবুকের উদ্দেশে বের হয়েছিলাম। পথে একজায়গায় শিবির স্থাপন করি। আমাদের খুব তৃষ্ণা পেয়েছিল। মনে হচ্ছিল মৃত্যু খুব কাছেই। তৃষ্ণার পরিমাণ এতই তীব্র ছিল যে, জীবন বাঁচাতে মানুষ তাদের উটগুলো জবাই করে এর ভেতরকার থলেতে থাকা পানি পান করছিল। এমতাবস্থায় আবু বকর রাসুলের কাছে গিয়ে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ তো আপনাকে কল্যাণের আধার বানিয়েছেন; অতএব আপনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন।' রাসুল বলেন, 'তুমিও কি তা চাও।' তিনি উত্তরে বলেন, 'হ্যাঁ।' নবিজি তখন দুআর জন্য হাত ওঠান। ফলে এমন বৃষ্টিপাত হয় যে, সকল মানুষ তাদের পাত্রগুলো পানি দ্বারা পূর্ণ করেন। এরপর আমরা বের হয়ে দেখি, সেনাবাহিনীর অবকাশস্থলের বাইরে বৃষ্টির কোনো চিহ্নও নেই।
গ. তাবুকযুদ্ধে আবু বকরের দান তাবুকযুদ্ধের সময় রাসুল সাধ্যানুসারে যথাসম্ভব যুদ্ধ-তহবিলে দান করতে মানুষকে উৎসাহ দেন। কেননা, সফর ছিল দূরপাল্লার এবং কষ্টসাধ্য। শত্রুরাও সংখ্যায় ছিল অগণন এবং প্রশিক্ষিত। নবিজি দানকারীদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণের অঙ্গীকার দিয়েছিলেন। প্রত্যেকেই নিজের সাধ্যানুযায়ী দান করেন। এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি দান করেছিলেন উসমান রা.। উমর রা. তাঁর সম্পদের অর্ধেক আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দেন। তাঁর ধারণা ছিল, আজ আমি আবু বকরকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি।
তিনি নিজেই বর্ণনা করেন; রাসুল দান করতে আমাদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তখন আমার কাছে ভালোই সম্পদ ছিল। আমি মনে করেছিলাম, এবার আমি আবু বকরকে ছাড়িয়ে যেতে পারব। সুতরাং আমি পুরো সম্পদের অর্ধেক আল্লাহর রাসুলের খিদমতে নিয়ে আসি। রাসুল তখন আমাকে জিজ্ঞেস করেন, 'উমর, ঘরে কিছু রেখে এসেছ?' আমি বলি, 'ঠিক এই পরিমাণ অর্থাৎ, অর্ধেক রেখে এসেছি।' ইতিমধ্যে আবু বকর তাঁর ঘরের সমুদয় মাল নিয়ে হাজির হন। নবিজি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'আবু বকর, সন্তানদের জন্য কী রেখে এসেছ?' তিনি বলেন, 'তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে এসেছি।' আমি তখন তাঁকে বলি, 'আবু বকর, আমি কোনো ব্যাপারেই আপনার থেকে এগিয়ে যেতে পারলাম না।' পুণ্যকাজে উমরের এ ঈর্ষাপোষণ জায়িজ; কিন্তু আবু বকরের অবস্থান ছিল তাঁর থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁর অন্তরে প্রতিযোগিতার কোনো ধারণাও ছিল না। নিজের দানকে অন্যের দানের সঙ্গে তুলনা করারও কোনো ইচ্ছা ছিল না। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি।
২. হজকাফেলার আমির হিসেবে আবু বকর রাসুলের যুগে সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রগঠনের প্রশিক্ষণ ছিল আকিদা, অর্থনীতি, সামাজিক ঐক্য, রাজনৈতিক, সামরিক ব্যবস্থাপনাসহ ইবাদতের সমন্বয়ে। আগের বছর হজ আদায় করা সম্ভব হয়নি। মক্কাবিজয়ের পর অষ্টম হিজরিতে আত্তাব ইবনু উসায়দের ওপর হজের দায়িত্ব অর্পণ করা হলেও মুসলিম এবং অমুসলিমদের হজনীতির মধ্যে কোনো ভেদরেখা টানা সম্ভব হয়নি। সুতরাং নবম হিজরিতে হজের মৌসুম এলে রাসুল হজ আদায়ের ইচ্ছা পোষণ করেন; কিন্তু পরে এই বলে ইচ্ছা বাদ দিয়ে দেন যে, 'মুশরিকরা উলঙ্গ হয়ে কাবাঘর প্রদক্ষিণ করবে, এটা আমার কাছে মোটেও পছন্দনীয় নয়। আমি এ অবস্থায় হজ করতে পারি না।' তাই রাসুল হজ আদায়ের জন্য আবু বকরকে কাফেলার আমির বানিয়ে পাঠান।
আবু বকর লোকজনকে নিয়ে মক্কায় রওনা হন। ইতিমধ্যে রাসুলের ওপর সুরা তাওবা অবতীর্ণ হয়। নবিজি তখন আলিকে ডেকে পাঠান। তাঁকে নির্দেশ দেন, 'তুমি গিয়ে আবু বকরের সঙ্গে মিলিত হও।' আলি তখন রাসুলের উট আজবায় চড়ে বেরিয়ে পড়েন। জুলহুলায়ফায় পৌঁছে আবু বকরের সঙ্গে মিলিত হন। আবু বকর তাঁকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'আমির হয়ে এসেছ, নাকি সাধারণ অনুসারী হিসেবে?' আলি বলেন, 'সাধারণ একজন অনুসারী হিসেবে।' এরপর কাফেলা রওনা হয়ে যায় এবং তাঁরা আবু বকরের নেতৃত্বে হজের কাজ সম্পাদন করেন।
সঠিক বর্ণনামতে, ওই বছর হজ জিলহজ মাসে আদায় করা হয়। অনেকে জুলকাদা মাসের কথা বলেছেন; কিন্তু তা সঠিক নয়। আবু বকর ইয়াওমে তারবিয়ার পূর্বে (জিলহজ মাসের ৮ তারিখ), ইয়াওমে আরাফা (৯ জিলহজ), ইয়াওমে নাহার (১০ জিলহজ) এবং ইয়াওমে নাফারিল উলায় (১২ জিলহজ) খুতবা প্রদান করেন।
খুতবায় তিনি মানুষকে হজের গুরুত্বপূর্ণ বিধান, আরাফায় অবস্থান, তাওয়াফে ইফাজা, মিনায় নির্ধারিত স্থানে পাথর ছোড়া এবং মিনা থেকে রওনা হওয়া- সংক্রান্ত যাবতীয় মাসআলা শিক্ষা দেন। আলি রা. সকল ব্যাপারেই তাঁর পেছনে অবস্থান করছিলেন। তিনি লোকজনকে সুরা তাওবার প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে শোনাতেন; আর জনগণের মধ্যে এই চারটি বিষয়ের ঘোষণা দিতেন- ১. জান্নাতে কেবল মুমিনগণ প্রবেশ করবে। ২. আগামী বছর থেকে কেউ উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করতে পারবে না। ৩. রাসুলের সঙ্গে যাদের অঙ্গীকার রয়েছে, তা নির্ধারিত তারিখ পর্যন্ত বহাল থাকবে। ৪. এবারের পর মুশরিকদের আর হজের অনুমতি দেওয়া যাবে না।
আবু বকর আবু হুরায়রার নেতৃত্বে সাহাবিদের একটি দলকে এই বিশাল খিদমতের জন্য আলির সহযোগী হিসেবে নিযুক্ত করেন।
মুশরিকদের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার অকার্যকর করে দিতে রাসুল কর্তৃক আলিকে নিযুক্তির কারণ, তৎকালে সমাজের সাধারণ রীতি ছিল-কোনো অঙ্গীকার স্থিতিশীল রাখা বা ভঙ্গের ঘোষণা দিতে হলে গোত্রের সর্দার কিংবা তাঁর ঘনিষ্ঠ নিকটাত্মীয়কেই ঘোষণাটি দিতে হতো। যেহেতু রীতিটা ইসলামের কোনো বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল না, তাই রাসুল আলিকে এর জন্য নিযুক্ত করেন। তাঁকে সুরা তাওবার প্রথমিক আয়াতগুলো প্রচারের জন্য পাঠানোর এটাই ছিল মূল কারণ। রাফিজিদের এ ধারণা মোটেও সঠিক নয় যে, আলি রা. খিলাফতের অধিক হকদার ছিলেন বিধায় তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। শায়খ মুহাম্মাদ আবু শাহবা এতে সংযুক্ত করে বলেন, জানি না, এই দুষ্ট লোকগুলো সিদ্দিকের এ কথাটি কীভাবে হজম করে নিল যে, "তুমি নেতা হয়ে এসেছ, নাকি অনুসারী হয়ে।" আর অনুসারী নেতা থেকে খিলাফতের অধিক হকদার হয় কীভাবে? আবু বকরের নেতৃত্বে এই হজ ছিল বিদায়হজের ভূমিকাস্বরূপ। এই হজে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল—‘আজ থেকে মুর্তিপুজার যুগ শেষ, এখন থেকে ইসলামের নতুন যুগের শুরু।’ এখন মানুষের জন্য দরকার হচ্ছে, আল্লাহর শরিয়তের অনুসরণ করা। আরব গোত্রগুলোর কাছে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার পর তাদের বিশ্বাস জন্মে যায় যে, এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এখন থেকে মূর্তিপুজার আর কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং তারা নিজেদের মুসলমান ঘোষণা দিয়ে স্ব স্ব গোত্রের প্রতিনিধিদল রাসুলের কাছে পাঠাতে থাকে।
৩. বিদায়হজ
আসমা বিনতু আবি বকর রা. থেকে বর্ণিত; "আমরা বিদায়হজে রাসুলের সহযাত্রী হই। ওয়াদিয়ে আরাজে পৌঁছালে নবিজি সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। আয়েশা নবিজির পাশে বসা ছিলেন। আবু বকরের কাছে তখন মালসামানার জন্য একটিমাত্র বাহন ছিল; আর সেটি ছিল তাঁর গোলামের সঙ্গে। তিনি বাহনটির অপেক্ষা করছিলেন। ইতিমধ্যে গোলাম এসে হাজির হয়; কিন্তু তার সঙ্গে কোনো বাহন ছিল না। আবু বকর গোলামকে জিজ্ঞেস করেন, 'উট কোথায়?' গোলাম জবাব দেয়, 'রাতে পালিয়ে গেছে।' আবু বকর রেগে বলেন, 'একটিমাত্র উট ছিল, সেটিও হারিয়ে ফেললে?' কথাটি বলে তিনি গোলামকে পেটাতে শুরু করেন। দৃশ্যটি দেখে নবিজি মুচকি মুচকি হাসছিলেন আর বলছিলেন, 'দেখো, এই বঞ্চিত লোকটিকে কী করা হচ্ছে!’
টিকাঃ
২৬২ সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৪৩।
সাহিহুস সিরাতিন নাবাবিয়াহ: ৫৯৮।
মুসান্নাফু আবদির রাজ্জাক: ৩/৪৯৭; মাওসুআতু ফিকহিস সিদ্দিক থেকে উদ্ধৃত: ২২২।
সাহিহু ইবনি হিব্বان, কিতাবুল-জিহাদ, বাবু গাজওয়াতি তাবুক ১৭০৭।
আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ ফি জুইল মাসাদিরিল আসলিয়াহ : ৬১৫।
২৮৭ সুনান আবি দাউদ, কিতাবুজ জাকাত: ২/৩১২-৩১৩ (১৬৭৮) আলবানি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
২৬৮ মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবন তাইমিয়া: ১০/৭২-৭৩।
২৯ দিরাসাতুন ফি আহদিন নুবুওয়াহ, ইমাদুদ্দিন খলিল: ২২২।
২৭০ এর অপর নাম তাওয়াফে জিয়ারাহ, এটি ফরজ তাওয়াফ।
২৭১ সাহিহুস সিরাতিন নাবাবিয়াহ: ৬২৫।
২৭২ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু আবি শাহবা: ২/৫৩৭।
২৭০ সাহিহুস সিরাতিন নাবাবিয়াহ: ৫২৪১
২৭১ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ: ইবনু আবি শাহবা: ২/৫৪০।
২৭৫ কিরাআতুন সিয়াসিয়াহ লি সিরাতিন নাবাবিয়াহ, কালআজি: ২৮৩।
২৭৬ হিজাজের তিহামাস্থ ওয়াদি ফাহালে অবস্থিত। মুজামুল মাআলিমিল জু'রাফিয়া: ২০২।
২৭৭ মুসনাদু আহমাদ: ৬/৩৪৪।