📄 ভোগান্তি
ব্যক্তি, দল, সম্প্রদায়, জাতি এবং রাষ্ট্রসমূহের ইতিহাসে বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ ও পরীক্ষার কুদরতি সুন্নাহ চলে আসছে। সাহাবিগণকেও এই সুন্নাহর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। তাঁরা এত কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন যে, যদি কোনো বিশালকায় পাহাড়ের এমন পরীক্ষা নেওয়া হতো, তাহলে পাহাড়ও ধসে যেত; কিন্তু ওই পবিত্রাত্মাগণ তাঁদের জানমাল আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করে দেন। তাঁরা প্রশান্তচিত্তে সব দুর্ভোগ মেনে নেন। ওই পরীক্ষা থেকে উঁচু মর্যাধাধারী কোনো পরিবারও বাদ যায়নি। আবু বকরের মতো মহান ব্যক্তিকেও সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সামলে উঠতে হয়েছে। তাঁর মাথায় মাটি দেওয়া হয়েছে। মসজিদুল হারামে জুতো দিয়ে পেটানো হয়েছে। এই পরিমাণ আহত করা হয়েছিল যে, তাঁকে চেনা দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। অর্ধমৃত অবস্থায় কাপড়ে শুইয়ে তাঁকে ঘরে নিয়ে আসা হয়েছিল।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. বর্ণনা করেন; যখন নবিজির সাহাবিদের সংখ্যা ৩৮ জনের মতো, তখন আবু বকর এই মর্মে পীড়াপীড়ি করতে থাকেন—এবার জনগণকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া হোক। নবিজি বলছিলেন, 'আমরা তো সংখ্যায় এখনো অল্প।' কিন্তু আবু বকর তবু আবেদন করতে থাকেন। তাঁর পীড়াপীড়িতে একদিন রাসুল সাহাবিদের নিয়ে মসজিদুল হারামে যান। ভেতরে প্রবেশ করে তাঁরা স্ব স্ব গোত্রের লোকদের কাছে বসেন। আবু বকর তখন দাঁড়িয়ে ভাষণ শুরু করেন। নবিজি তখন বসা ছিলেন। তিনিই ছিলেন প্রথম বক্তা, যিনি বক্তৃতা দিচ্ছিলেন আর নবিজি তা শুনে যাচ্ছিলেন। বক্তব্যে তিনি মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকছিলেন। মুশরিকরা তখন ক্ষিপ্ত হয়ে আবু বকর ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মসজিদের পাশে তাঁদের প্রচন্ড মারধর করে। বিশেষ করে আবু বকরকে পদদলিত করে। অভিশপ্ত উতবা ইবনু রাবিয়া কাঁটাদার তলাবিশিষ্ট জুতো দ্বারা তাঁকে সজোরে দলতে থাকে। ফলে তাঁর নাকের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
তখন বনু তায়িমের লোকজন এগিয়ে এলে অত্যাচারীরা পালিয়ে যায়। এরপর তায়িমের লোকজন তাঁকে কাপড়ে জড়িয়ে ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে আসে।
সে দিন আবু বকর রা. এতটাই আহত হয়েছিলেন, তিনি যে মারা যাচ্ছেন—এ ব্যাপারে কারও সংশয় ছিল না। এ অবস্থা দেখে বনু তায়িমের লোকদের রক্ত মাথায় চড়ে যায়। তারা পুনরায় মসজিদুল হারামে এসে শপথ করে দীপ্তকণ্ঠে বলে, 'আল্লাহর শপথ, যদি আবু বকর মারা যান, তাহলে অবশ্যই আমরা উতবাকে হত্যা করব।' এরপর তারা পুনরায় আবু বকরের কাছে যায়। তাঁর পিতা আবু কুহাফাসহ বনু তায়িমের প্রতিটি মানুষ তখন তাঁর মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েন। বিকেলের দিকে তিনি কথা বলতে সক্ষম হন। হুঁশ ফেরার পর তাঁর প্রথম জিজ্ঞাসাই ছিল— 'রাসুলের অবস্থা কী?'
তাঁর এমন কথায় গোত্রের লোকজন তাঁকে দোষারোপ করতে থাকে। তাঁর মা বলেন, 'আগে ওকে কিছু খেতে দাও।' তারা চলে গেলে মা তাঁর পাশে এসে বসেন। তিনি তাঁকে কিছু খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। তিনি বার বার জিজ্ঞেস করছিলেন, 'রাসুলের অবস্থা কী?' মা জবাবে বলেন, 'শপথ আল্লাহর, তোমার সাথির সংবাদ আমার জানা নেই।' তিনি বলেন, 'মা, দয়া করে উম্মু জামিল বিনতু খাত্তাবের কাছে গিয়ে রাসুল সম্পর্কে জেনে আসুন।' মা বলেন, 'ঠিক আছে যাচ্ছি।'
উম্মুল খায়ের তখন উম্মু জামিলের কাছে গিয়ে বলেন, 'আমার ছেলে আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে। আপনি কি জানেন, তিনি বর্তমানে কোথায় কোন অবস্থায় আছেন?' উম্মু জামিল বলেন, 'আমি আবু বকর বা মুহাম্মাদ কাউকেই চিনি না। তবে আপনি চাইলে আমি আপনার ছেলের কাছে যেতে পারি।' উম্মুল খায়ের বলেন, 'চলুন।'
উম্মু জামিল আবু বকরকে এই অবস্থায় দেখতে পেয়ে বলেন, 'যে আপনার সঙ্গে এমন আচরণ করেছে, সে অবশ্যই জঘন্য কাফির। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আল্লাহ তার থেকে এ জুলুমের শোধ নেবেনই।' আবু বকর রা. তাঁকে বলেন, 'আগে বলুন, নবিজির অবস্থা কী?' উম্মু জামিল বলেন, 'কিন্তু কথাগুলো তো আপনার মাতা-পিতা শুনতে পাচ্ছেন।' তিনি বলেন, 'কোনো সমস্যা নেই।' উম্মু জামিল বলেন, 'তিনি সুস্থই আছেন।' আবু বকর জিজ্ঞেস করেন, 'এখন কোথায় আছেন?' উম্মু জামিল জানান, 'আরকামের বাড়িতে অবস্থান করছেন।' কথাটি শুনে তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, যতক্ষণ-না আমি তাঁর দরবারে উপস্থিত হচ্ছি, ততক্ষণ আহার করছি না।'
এরপর যখন মানুষের চলাফেরা কমে আসে, পরিবেশও অনেকটা শান্ত হয়ে যায়, তখন উম্মু জামিল এবং উম্মুল খায়ের তাঁকে নবিজির কাছে নিয়ে যান। তাঁকে ওই অবস্থায় দেখে রাসুল বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু দেন। অন্য সাহাবিগণও তাঁকে তখন জড়িয়ে ধরেন। তাঁর অবস্থা দেখে রাসুলের আবেগ যেন বাঁধনহারা হয়ে ওঠে। নবিজির অস্থিরতা দেখে আবু বকর রা. বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, পেরেশানির দরকার নেই। আফসোস কেবল এটাই যে, হারামিটা আমার চেহারার এই অবস্থা করল। এই হচ্ছেন আমার মা। আমাকে অন্তহীন ভালোবাসেন। আপনি তো বরকতময় সত্তা। আপনি মাকে ইসলামের দাওয়াত দিন, আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য দুআ করুন। আমার বিশ্বাস, আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাঁকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত রাখবেন।' রাসুল তাঁর জন্য দুআ করেন। তাঁকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানান। উম্মুল খায়ের তখনই ইসলামগ্রহণ করেন।
এই মহান ঘটনা ওই লোকদের জন্য শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যারা সাহাবিদের অনুসরণ করতে চায়। আমরা এখানে সে শিক্ষা ও উপদেশের কিঞ্চিৎ তুলে ধরছি: ১. আবু বকর রা. ইসলামের প্রচার এবং কাফিরদের সামনে সত্য দীন তুলে ধরার প্রবল আগ্রহ লালন করতেন। এর মাধ্যমে তাঁর ইমানি শক্তি এবং বাহাদুরির পরিচয় মেলে। দীনের খাতিরে তিনি অন্তহীন কষ্ট স্বীকার করেছেন। জাতি তাঁকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁর অন্তরে আপন সত্তার চেয়ে রাসুলের ভালোবাসা ছিল অনেকগুণ বেশি। ইসলামগ্রহণের পর তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল, কীভাবে দীনের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরা যায়। কীভাবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর বাণী ব্যাপ্ত করা যায়। এতে প্রাণ দিতে হলেও তাঁর কোনো পরোয়া ছিল না। তাই দেখা যায়, ইসলামের ইতিহাসে তিনিই প্রথম মারাত্মক আহত হয়েছিলেন।
২. জাহিলিয়াতের সর্বধ্বংসী তুফানের প্রবল ঝাপটার মুখে দাঁড়িয়ে ইসলামের প্রচার-প্রসারে আবু বকরের দৃঢ় অবস্থান ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার আকুলতা তাঁর অন্তরের গভীরে ঢুকে পড়েছিল। এর মধ্যেই তিনি প্রশান্তি লাভ করতেন। অথচ তিনি জানতেন, এ পথে তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের কী পরিমাণ বিপদে পড়তে হবে। এগুলো তো স্পষ্ট প্রমাণ যে, তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তার অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছিলেন।
৩. আল্লাহ ও রাসুলপ্রেম তাঁর আত্মপ্রেমের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে নিয়েছিল। এর স্পষ্ট দলিল তো তা-ই যে, লোকজন যখন তাঁর জীবনের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল, তখন জ্ঞান ফিরলে তাঁর প্রথম কথা ছিল— 'আল্লাহর রাসুল কেমন আছেন? কোথায় আছেন?' সর্বোপরি তাঁর শপথ ছিল, যতক্ষণ-না রাসুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি খাবার গ্রহণ করবেন না। প্রত্যেক খাঁটি মুমিনের অন্তরে এমন রাসুলপ্রেম থাকা দরকার, যদিও এর জন্য তাকে জানমাল বিসর্জন দিতে হয়।
৪. মতাদর্শ ভিন্ন হয়ে থাকলেও ব্যক্তির সঙ্গে ব্যবহার, নানামুখী ঘটনাপ্রবাহ এবং সংকটময় পরিস্থিতিতে আসাবিয়া তথা গোত্রপ্রীতি বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। যদিও আমরা দেখতে পাই, আবু বকরের আকিদা-বিশ্বাস তাঁর গোত্রের লোকজনের বিশ্বাসের বিপরীত ছিল, তথাপি রক্তের টানে তাঁর গোত্র ঘাতক উতবাকে এই চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছিল—যদি আবু বকর মারা যান, তাহলে অবশ্যই তারা এর প্রতিশোধ নেবে। উতবাকে হত্যা করে ফেলবে।
৫. এ ঘটনা থেকে উম্মু জামিলের সতর্কতা অবলম্বনের সুন্দর দিকটিও ফুটে ওঠে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, প্রথম থেকেই রাসুল তাঁর অনুসারীদের দীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে আগ্রহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি প্রশিক্ষণও দিয়ে রেখেছিলেন। আবু বকরের মা তাঁকে নবিজি সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন, 'আমি আবু বকর বা মুহাম্মাদ কাউকে জানি না, চিনি না। পরিস্থিতি কিন্তু এমন সতর্কতার দাবি জানাচ্ছিল। কারণ, তখনো উম্মুল খায়ের মুসলমান ছিলেন না। আর উম্মু জামিল তাঁর মুসলিম পরিচয় গোপন রাখতে চাচ্ছিলেন। তাই সতর্কতা হিসেবে উম্মুল খায়েরকে রাসুলের অবস্থানস্থলের সন্ধান দিতে চাচ্ছিলেন না। তিনি সন্দেহ করছিলেন, হতে পারে উম্মুল খায়ের কুরাইশের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছেন। তবে আবু বকরের অবস্থা জানা এবং তাঁর ব্যাপারে প্রশান্তিদায়ক সংবাদ পাওয়ার তীব্র একটা আকাঙ্ক্ষাও তাঁর অন্তরে কাজ করছিল। ফলে তিনি উম্মুল খায়েরের কাছে তাঁর ছেলের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা বলেন। এরপর যখন তিনি আবু বকরের কাছে পৌঁছান, তখনো কথাবার্তায় পূর্ণ সচেতন থাকেন, যেন তাঁর থেকে রাসুলের অবস্থানস্থলের বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে না যায়। সবশেষে মানুষের চলাচল কমে এলে এবং পরিবেশ কিছুটা শান্ত হয়ে এলে রাসুলের দরবারে তাঁদের উপস্থিতি পূর্ণ সাবধানতার পরিচয় বহন করে। কারণ, তখন মানুষকে ইসলামে প্রতিষ্ঠিত দেখতে পেলে তাদের ওপর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসত। নির্মম-নিষ্ঠুর আচরণে তাদের বিপর্যস্ত করা হতো।
৬. এ ঘটনা থেকে মায়ের জন্য আবু বকরের আত্মিক টান কেমন ছিল, তা অনুভব করা যায়। তিনি মায়ের হিদায়াতের প্রচণ্ড আগ্রহী ছিলেন বিধায় নবিজির কাছে আবেদন করেন, 'এই হচ্ছেন আমার মা। আমাকে অন্তহীন ভালোবাসেন। আপনি তো বরকতময় সত্তা। মাকে ইসলামের দাওয়াত দিন, আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য দুআ করুন। আমার বিশ্বাস, আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাঁকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত রাখবেন।' নবিজি তখন তাঁর জন্য দুআ করেন। তাঁকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানান। ফলে তখনই তিনি ইসলামগ্রহণ করে মুমিনদের সেই দলভুক্ত হয়ে যান, যাঁরা ছিলেন আল্লাহর দীনপ্রচারের কাজে নিয়োজিত। এ ছাড়া ঘটনাটি থেকে জানা যায়, আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি কতটা দয়ালু। অনুরূপ এখানে 'অনুগ্রহের ওপর অনুগ্রহ' দৃষ্টিগোচর হয়।
৭. নবিজির পর সাহাবিদের মধ্যে আবু বকরই সবচেয়ে বেশি কঠিন পরীক্ষার শিকার হয়েছিলেন। কারণ, তিনি সর্বক্ষণ রাসুলের ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকতেন। যেখানে মানুষ তাঁকে কষ্ট দিত, সেখানে তিনি উপস্থিত থাকতেন। নিজের সর্বস্ব দিয়ে রাসুলের পক্ষে প্রতিরোধ চালিয়ে আত্মোৎসর্গের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতেন। এর ফলে তিনি মুশরিকদের উগ্রতা ও অমানুষিক আচরণের শিকার হতেন। যদিও তিনি ছিলেন কুরাইশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় এবং জ্ঞান-বুদ্ধিতে বিখ্যাত একজন ব্যক্তি।
টিকাঃ
* আত-তামকিন লিল উম্মাতিল ইসলামিয়াহ: ২৪৩।
* আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু কাসির ১/৪৩৯-৪৪১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৩০।
* ইসতিখলাফু আবি বাকরিনিস সিদ্দিক, ড. জামাল আবদুল হাদি: ১৩১-১৩২।
** মিহনাতুল মুসলিমিন ফি আহদিল মাক্কি, ড. সুলায়মান সুয়াইকিত: ৭৯।
* আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ কিরাআতুন লি জাওয়ানিবিল হাজরি ওয়াল হিমায়া: ৫০, ৫১।
* ইসতিখলাফু আবি বাকরিনিস সিদ্দিক, ড. জামাল আবদুল হাদি: ১৩২।
১০০ মিহনাতুল মুসলিমিন ফি আহদিল মাক্কি, ড. সুলায়মান সুয়াইকিত: ৭৫।
📄 রাসুলের পক্ষে প্রতিরোধ
বীরত্ব ও বাহাদুরিতে আবু বকর ছিলেন অনুপম, অনন্য। সত্য তুলে ধরতে কোনো দ্বিধা করতেন না। দীনের সাহায্য, দীনের ওপর আমল, রাসুলের পক্ষ থেকে প্রতিরোধের প্রশ্নে তিনি কোনো সমালোচকের সমালোচনার পাত্তা দিতেন না। উরওয়া ইবনু জুবায়ের রা. বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আসকে প্রশ্ন করি, 'রাসুলের সঙ্গে মুশরিকদের সবচেয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ অসদাচরণ কী ছিল?'
জবাবে তিনি বলেন, 'একবার রাসুল কাবাপ্রাঙ্গণে সালাত পড়ছিলেন। এ সময় উকবা ইবনু আবি মুয়িত সেখানে পৌঁছায়। সে তার কাপড় রাসুলের গলায় প্যাচিয়ে অত্যন্ত কঠিনভাবে টেনে ধরে। ইতিমধ্যে আবু বকরও সেখানে পৌঁছান। তিনি উকবার উভয় কাঁধ ধরে রাসুল থেকে দূরে সরিয়ে দেন; আর তিলাওয়াত করেন-
أَتَقْتُلُوْنَ رَجُلًا أَنْ يَقُوْلَ رَبِّيَ اللَّهُ
তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ। [সুরা মুমিন: ২৮]
আনাস রা. থেকে বর্ণিত; একবার মুশরিকরা রাসুল-কে এত জঘন্যভাবে প্রহার করে যে, তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন। তখন আবু বকর রা. দাঁড়িয়ে উঁচু আওয়াজে বলতে থাকেন, 'তোমরা ধ্বংস হয়ে যাও, "তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ।"' [সুরা মুমিন: ২৮]
আসমা থেকে বর্ণিত; জনৈক সংবাদদাতা আবু বকরের কাছে এসে বলে, 'দ্রুত তোমার সাথির কাছে যাও।' আবু বকর কথাটি শুনে পত্রপাঠ বেরিয়ে পড়েন। তাঁর চুলগুলো ছিল চারটি বেণিতে বাঁধা। তিনি তখন এই বলে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, 'তোমরা ধ্বংস হও। "তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ।”” তিনি সেখানে গেলে তারা নবিজিকে ছেড়ে তাঁর উপর হামলে পড়ে। এরপর তিনি বাড়িতে এমন করুণ অবস্থায় ফেরেন যে, চুলের যে বেণিতেই হাত দিতেন তা হাতে চলে আসত।
আলির বর্ণনা; একবার তিনি ভাষণে বলেন, 'লোকসকল, বলো তো দেখি, মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বাহাদুর কে?' লোকজন বলল, 'আমিরুল মুমিনিন, আপনি।' তিনি বলেন, 'যে আমার মোকাবিলায় এসেছে, আমি তার থেকে পাওনা আদায় করে নিয়েছি। তবে সবচেয়ে বড় বাহাদুর হচ্ছেন আবু বকর। আমরা বদরযুদ্ধে নবিজির জন্য শামিয়ানা বানিয়েছিলাম। তখন প্রশ্ন উঠে, তাঁর পাশে কে থাকবেন? তাঁর ওপর হামলা হলে কে তা প্রতিহত করবেন? আল্লাহর শপথ, তখন কেবল আবু বকরই তরবারি হাতে নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। যে শত্রুই নবিজির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তিনি তার সামনে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন। অতএব নিঃসন্দেহে বলা যায়, তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বড় বাহাদুর। আমরা দেখেছি, কুরাইশরা রাসুলের পেছনে আঠার মতো লেগে গিয়েছিল। কেউ তাঁর ওপর ক্রোধ ঝাড়ত। কেউ তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিত। বলত, তুমি এতসকল মাবুদকে বাদ দিয়ে এক মাবুদ গ্রহণ করেছ। আল্লাহর শপথ, যে-ই তাঁর পাশে যেত, আবু বকর তাকে আক্রমণ করতেন এবং পালিয়ে যেতে বাধ্য করতেন। অনেককে ভালোমন্দ বলে দূর করে দিতেন। বলতেন, 'তোমরা ধ্বংস হও। "তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ।""
এরপর আলি রা. তাঁর চাদর সরিয়ে এ পরিমাণ কাঁদেন যে, অশ্রুতে তাঁর দাড়ি ভিজে যায়। তখন বলেন, 'আমি আল্লাহর শপথ দিয়ে তোমাদের জিজ্ঞেস করছি, 'বলো তো দেখি, ফিরআউন-পরিবারের (যে মুসা আ.-কে সাহায্য করেছিল) লোকটি উত্তম, নাকি আবু বকর?' প্রশ্নটি শুনে লোকজন নীরব হয়ে যায়। আলি রা. তখন বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আবু বকরের এক ঘণ্টার পুণ্য ফিরআউন- পরিবারের মুমিন ব্যক্তির সারা জীবনের পুণ্যের চেয়েও উত্তম। কেননা, ফিরআউন- পরিবারের ওই মুমিন তার ইমান লুকিয়ে রেখেছিল; আর আবু বকর তাঁর ইমান প্রকাশ করে বেড়াচ্ছিলেন।
আলির এই বর্ণনা হক-বাতিল এবং ইমান ও ভ্রষ্টতার মধ্যকার লড়াইয়ের চিত্র প্রদর্শন করে। আবু বকর এসব লড়াইয়ে যেসব কষ্ট ও বিপদ মোকাবিলা করেছেন, এর দ্বারা এসব লড়াইয়ের গুরুত্ব প্রকাশ পায়। আমাদের সামনে তাঁর ব্যক্তিত্ব উজ্জ্বল হয়ে ধরা দেয়। অনেক দিন গত হয়ে গেলেও আলি রা. সেই সত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন এবং তা বলতে গিয়ে নিজে এবং উপস্থিত জনতা এতটাই প্রভাবিত হন যে, সকলেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।
নবিজির পর আবু বকরই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যাঁকে দীনের জন্য কষ্ট দেওয়া হয়েছে। তিনিই ছিলেন প্রথম নির্ভীক বীর, যিনি আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ চালিয়ে গেছেন। অনুরূপ তিনিই ছিলেন সেই প্রথম মুবাল্লিগ, যিনি মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকেছিলেন।
তিনি ছিলেন নবিজির ডান বাহু; যিনি দীনের দাওয়াতে, তাঁর সঙ্গদানে, নতুন মুসলমানদের শিক্ষাদীক্ষা প্রদানে, তাদের সম্মান প্রদর্শন এবং রাসুলের সহায়তায় নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। আবু জার গিফারি রা. তাঁর ইসলামগ্রহণের কাহিনি বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, আবু বকর নবিজির কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আজ আবু জারকে পানাহার করানোর জিম্মাদারি আমাকে দিয়ে দিন।' নবিজি তাঁর আবেদন গ্রহণ করলে তিনি খাবারে তায়েফের মনক্কা পরিবেশন করেছিলেন।
তিনি যখন নবিজিকে সঙ্গ দিতেন, তখন নিজের ব্যাপারে কোনো শঙ্কাকে গুরুত্ব দিতেন না। তখন মূল চিন্তা থাকত রাসুল যেন কষ্ট না পান। স্বল্প হোক বা বেশি—যেখানেই নবিজির বিপদ দেখতেন, সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করতেন। মানুষ তাঁকে ঘেরাও করেছে দেখতে পেলেই তিনি তাঁর হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। নিঃশঙ্কচিত্তে তাদের ভেতর ঢুকে তাদের তাড়িয়ে দিতেন এবং চিৎকার দিয়ে বলতেন, 'তোমরা ধ্বংস হও। "তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ।” লোকজন তখন নবিজিকে ছেড়ে তাঁর ওপর হামলে পড়ত। ভীষণ মারধর করত। চুল ছিঁড়ে ফেলত তাঁর। অবস্থা করুণ না হওয়া পর্যন্ত পেটাতেই থাকত।
টিকাঃ
১০১ সহিহ বুখারি: ৩৮৫৬।
১০২ আস সাহিহুল মুসনাদ ফি ফাজায়িলিস সাহাবা, আদাবি: ৩৭।
১০০ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৩/৪; ফাতহুল বারি: ৭/১৬৯।
১০৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/২৭১, ২৭২।
১০০ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., মুহাম্মাদ আবদুর রহমান কাসিম: ২৯, ৩০, ৩২।
📄 নির্যাতিতদের মুক্তির লক্ষ্যে সম্পদ-ব্যয়
মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে গিয়ে রাসুল ও সাহাবিদের ওপর, বিশেষ করে দুর্বল ও সঙ্গীহীন মুসলিমদের ওপর মক্কার কাফিরদের জুলুম-অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। তারা চেয়েছিল অত্যাচারের মাধ্যমে দীন থেকে তাঁদের ফিরিয়ে নেবে। অন্যদের জন্য শিক্ষার উপাদান বানাবে, যাতে কেউ ইসলামগ্রহণের দুঃসাহস না দেখায়। দুর্বলদের তাই ভয়াবহ কষ্ট দেওয়া হতো। এর মাধ্যমে ইসলামের প্রতি কাফিরদের হিংসাই ফুটে উঠছিল।
এই ক্ষেত্রে বিলালের মতো দাসরা ছিলেন তাদের প্রধান টার্গেট। বিলালের কোনো পৃষ্ঠপোষক ছিল না। মক্কায় তাঁর পক্ষ হয়ে তরবারি ধারণ কিংবা নির্যাতন প্রতিরোধ করার মতো কোনো স্বজন ছিল না। তা ছাড়া জাহিলি যুগে মক্কার মানুষের কাছে তাঁদের মতো মানুষের কানাকড়ি মূল্যও ছিল না। সাধারণ পণ্য মনে করা হতো তাঁদের। সেবার জন্য চতুষ্পদ জন্তুর মতো বেচাকেনা করা হতো। তাঁদের পক্ষে কোনো দাওয়াতি মিশন অথবা চিন্তাচেতনা নিয়ে দাঁড়ানোর অধিকার ছিল না। মক্কার জাহিলি পরিবেশে তাঁদের জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া ছিল চরম অপরাধের শামিল। কারণ, এর ফলে তাদের জাহিলি সমাজব্যবস্থার ভিত নড়ে যাবে। এটা ওই সমাজব্যবস্থার জন্য বিধ্বংসী ভূমিকম্পের চেয়ে কম ছিল না।
কিন্তু নতুন এই দাওয়াত—যার দিকে যুবসমাজ আকৃষ্ট হচ্ছিল, যারা তাদের পূর্বপুরুষের সমাজব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল, সেই দাওয়াত হাবশি একজন গোলামের অন্তরে গেঁথে যায়। তাঁকে এক নতুন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
দীনের ওপর ইমান আনার এবং মুসলমানদের সঙ্গে জড়িত হওয়ার পর ইমান তাঁর অন্তরের গভীরে জায়গা করে নেয়। অন্তরের ভেতর সেই ইমানের তেজ টগবগ করে ফুটতে থাকে। সংবাদটি যখন তাঁর মালিক উমাইয়া ইবনু খালফের কানে পৌঁছায়, তখন সে তাঁকে কখনো শাসাতে থাকে, কখনো বিভিন্ন লোভ দেখাতে থাকে; কিন্তু যখন বুঝতে পারে বিলালের মনমানসিকতা ক্রমশ দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে, কোনো অবস্থায়ই তিনি আর কুফরির দিকে ফিরতে প্রস্তুত নন, তখন প্রচন্ড ক্রোধে তাঁকে কঠিন শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে তাঁকে ২৪ ঘণ্টা উপবাস রেখে প্রখর রোদে নিয়ে যায়। এরপর জ্বলন্তপ্রায় বালিতে চিত করে শুইয়ে রেখে গোলামদের নির্দেশ দেয়, 'ও যাতে নড়াচড়া করতে না পারে, এর জন্য ওর বুকের উপর ভারী পাথর রেখে দাও।' ইবনু খালফের গোলামরা তাঁর হাত বেঁধে বুকে পাথরচাপা দিয়ে রাখলে সে এগিয়ে এসে বিলালকে বলে, 'যতক্ষণ তুমি মুহাম্মাদের সঙ্গ ছেড়ে লাত ও উজ্জার পূজা না করবে, ততক্ষণ এই শাস্তি পেতে থাকবে।' ধৈর্যের প্রতিমূর্তি বিলাল জবাব দেন, 'আহাদ আহাদ। অভিশপ্ত ইবনু খালফ এই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাঁকে শাস্তি দিতে থাকে।
একদিন রাসুলের আস্থাভাজন আবু বকর সে দিক দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। বিলালকে এ অবস্থায় দেখে তিনি উমাইয়ার সঙ্গে কথা বলেন। আবু বকর বলেন, 'অসহায় এ লোকটির ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে না? আর কত দিন একে এভাবে নির্যাতন করবে?' উমাইয়া জবাব দেয়, 'তোমরাই তো ওকে নষ্ট করেছ, অতএব তোমরাই তাকে বাঁচাতে পারো।' তিনি বলেন, 'ঠিক আছে, আমি তোমাকে এর পরিবর্তে তোমাদের দীনের অনুসারী শক্তিমান গোলাম দিচ্ছি, তুমি একে আমার কাছে দিয়ে দাও।' সে বলে, 'ঠিক আছে, আমি মেনে নিলাম।' এরপর তিনি এক কালো গোলামের বিনিময়ে বিলালকে কিনে নিয়ে তাঁকে মুক্ত করে দেন। এক বর্ণনামতে, তিনি তাঁকে সাত কিংবা ৪০ উকিয়া স্বর্ণের বিনিময়ে ক্রয় করে মুক্ত করেছিলেন।”
বিলালের ধৈর্য ও সহনশীলতা ছিল সত্যিই প্রশংসার্হ। তাঁর ইসলামগ্রহণ ছিল সত্য এবং অন্তর ছিল পবিত্র। তাই শত নির্যাতনের মুখেও অনড় থাকেন। সব ধরনের চ্যালেঞ্জকে স্বাগত জানান। নির্যাতন সহ্য করেন; কিন্তু তারপরও তাঁর দৃঢ়তা একটুখানি টলেনি। তাঁর ধৈর্য দেখে মুশরিকরা জ্বলে ছাই হয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে দুর্বল মানুষদের মধ্যে তিনিই ছিলেন মহান সেই ব্যক্তি, যিনি অসংখ্য অমানবিক নির্যাতনের পরও ইসলামের ওপর অবিচল ছিলেন। বিলাল রা. মুশরিকদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হতে দেননি। তাওহিদের কালিমার মাধ্যমে তাদের ওপেন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। আল্লাহর রাস্তায় তিনি তাঁর ব্যক্তিসত্তার কোনো পরোয়া করেননি।
রাতের অন্ধকার শেষে হেসে ওঠে সূর্যালোক। তেমনই নির্যাতন-নিপীড়নের শেষে থাকে অনন্ত নিয়ামত। বিলালও একসময় সেই লাঞ্ছনা ও শাস্তি থেকে মুক্তি পান। দাসত্বের নাগপাশ কাটিয়ে অর্জন করেন স্বাধীনতা। প্রশান্তচিত্তে বাকি জীবন অতিবাহিত করেন নবিজির সাহচর্যে। রাত-দিন পড়ে থাকতেন তাঁর পাশে। তাঁর ওপর সন্তুষ্ট থেকেই বিদায় জানান নশ্বর এই পৃথিবীকে।
আবু বকর রা. নির্যাতিত মুসলমানদের মুক্ত করা এবং শাস্তি থেকে রক্ষার যে রাজনীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা দেখে অনেকেই সে পথে হেঁটেছিলেন। সিদ্দিকি সেই পন্থা হয়ে উঠেছিল আজাদির এক মাইলফলক। তাঁরাও তাঁর দেখাদেখি গোলাম-বাঁদি কিনে কিনে মুক্ত করে দিচ্ছিলেন।
আবু বকর রা. যাঁদের ক্রয় করে আজাদ করে দিয়েছিলেন, তাঁরা হচ্ছেন :
১. আমির ইবনু ফুহায়রা রা.। তিনি বদর এবং উহুদে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এরপর বিরে মাউনার ঘটনায় শাহাদাতবরণ করেন।
২. উম্মু উবাইস।
৩. জিন্নিরা রা.। তাঁকে যখন মুক্ত করা হয়, তখন তাঁর চোখে জ্যোতি ছিল না। কাফিরগণ বলাবলি করছিল, লাত ও উজ্জা ওর দৃষ্টিক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। জিন্নিরা বলছিলেন, কাফিররা মিথ্যা বলছে। আল্লাহর ঘরের শপথ, লাত-উজ্জাদের মধ্যে ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা নেই। কাফিরদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে আল্লাহ তখন তাঁর চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন।
৪. নাহদিয়া ও তাঁর কন্যা। এঁরা মা-মেয়ে বনু আবদিদ্দারের এক মহিলার বাঁদি ছিলেন। একবার তিনি তাঁদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তাঁদের মালকিন তাঁদের আটা দিয়ে পাঠাচ্ছিল আর বলছিল, 'তোমাদের কখনো মুক্ত করব না।' আবু বকর মহিলার কথা শুনে তাকে বলেন, 'তুমি এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে নাও।' তখন মহিলাটি তাঁকে বলে, 'আমি শপথ ভঙ্গ করব? তোমরাই তো এদের নষ্ট করেছ, তাই তোমরাই ওদের মুক্ত করে নাও।' তিনি বলেন, 'ঠিক আছে, কত হলে এদের বিক্রি করবে?' মহিলা একটি নির্ধারিত পরিমাণ মুদ্রার কথা বললে তিনি বলেন, 'ঠিক আছে আমি এদের কিনে নিলাম। আর শুনো, আজ থেকে এরা মুক্ত-স্বাধীন।'
এরপর তিনি নাহদিয়া ও তাঁর কন্যাকে মুক্তির সুসংবাদ জানিয়ে বলেন, 'আটাগুলো তাকে দিয়ে এসো।' তাঁরা তখন বলেন, 'আবু বকর, আমরা কি হাতের কাজটা শেষ করে আসব না?' তিনি বলেন, 'সেটা তোমাদের ইচ্ছা।
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ইসলাম কীভাবে আবু বকর এবং ওই দুই মহিলার মধ্যে সমতা সৃষ্টি করে দিলো। তাঁরা তাঁর সঙ্গে এমন ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন, যেভাবে আমরা পরস্পর কথা বলে থাকি। তাঁদের কথাবার্তায় গোলাম-মালিকের ভেদরেখা ছিল না। আর আবু বকর জাহিলি যুগের একজন অভিজাত ব্যক্তি হিসেবে এমন কথাবার্তায় অভ্যস্ত না থাকলেও কী অসীম সাম্যবোধে তাড়িত হয়ে তাদের সঙ্গে একান্তজনের মতো কথা বলছিলেন; অথচ তিনিই তাঁদের স্বাধীন করেছিলেন। ইসলাম অল্প দিনে কী সুন্দর চরিত্রে তাঁদের চরিত্রবান করে তুলেছিল। ইচ্ছা করলে তাঁরা তখনই মহিলার আটাগুলো জায়গায় রেখে চলে আসতে পারতেন। সেগুলো উড়ে গেলে কিংবা পাখিরা খেয়ে নিলে তাদের কোনো দায় ছিল না; কিন্তু সুবহানাল্লাহ! তাদের উন্নত চরিত্র এটা করতে সায় দেয়নি। তারা কাজ শেষ করেই আটাগুলো মালিকের কাছে ফেরত দিয়ে এসেছিলেন।
একবার আবু বকর রা. আদি গোত্রের শাখাগোত্র মুআম্মালের এক নওমুসলিম বাঁদির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। উমর রা. - যিনি তখনো ইসলামগ্রহণ করেননি- বাঁদিটিকে ইসলাম থেকে ফিরে আসার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। তাকে এত পেটাচ্ছিলেন যে, নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ক্লান্ত হয়ে পড়লে বলতেন, 'ক্লান্তির দরুন তোমাকে ছেড়ে দিলাম।' বাঁদি জবাবে বলত, 'আল্লাহ তোমার সঙ্গে এমন করুন।' আবু বকর তাকেও ক্রয় করে মুক্ত করে দেন।
তিনি ছিলেন গোলামদের মুক্তিদূত। ছিলেন করুণার আধার। সমাজে এ কথা সুখ্যাত ছিল, তিনি অভাবীদের সাহায্য করেন। তাদের সঙ্গে নম্র আচরণ করেন। মানুষের বোঝা অর্থাৎ, ঋণ নিজের কাঁধে উঠিয়ে নেন। মেহমানদারির আয়োজন করেন। বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন। জাহিলি যুগেও কখনো পাপ কাজের মাধ্যমে তাঁর চাদর পঙ্কিল হয়নি। সবার অন্তরে ছিল তাঁর প্রতি ভালোবাসা। দুর্বল গোলামদের জন্য তাঁর বুকের ভেতর ছিল আলাদা একটা জায়গা, যা সব সময় ভালোবাসায় কানায় কানায় পূর্ণ থাকত। আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তাদের কিনে কিনে মুক্ত করে দিতেন; অথচ তখনো গোলাম মুক্ত করার ব্যাপারে উৎসাহমূলক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়নি।
তিনি অসহায়দের যেভাবে সম্পদ বিলিয়ে দিচ্ছিলেন, তা দেখে মক্কাবাসী স্তম্ভিত হয়ে যায়। তাদের দৃষ্টিতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিস্ময়কর ব্যক্তি; কিন্তু সিদ্দিকের দৃষ্টিতে এঁরা ছিলেন তাঁর দীনি ভাই। তাঁর দৃষ্টিতে ওদের একজনের মোকাবিলায় পুরো বিশ্বের কাফির-মুশরিকের কোনো মূল্য ছিল না। এমন মানসিকতা ও বোধের ওপরই ইসলামি সভ্যতা অস্তিত্বে এসেছিল। আবু বকর যেমন প্রশংসা চাইতেন না, তেমনই জাগতিক সম্মানপ্রাপ্তিও তাঁর লক্ষ্য ছিল না; বরং এর দ্বারা তাঁর লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। একদিন পিতা আবু কুহাফা তাঁকে বলেন, 'বেটা, আমি দেখতে পাই তুমি দুর্বল গোলামদের কিনে কিনে মুক্ত করছ। সবল ও শক্তিমান গোলামদের কিনে মুক্ত করলে তো পরিণামে তুমিই উপকৃত হতে?' আবু বকর বলেন, 'আব্বাজান, আমি উপকার পাওয়ার আশায় এমনটি করি না। আমি তো এ কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় করে থাকি।'
তাঁর কথায় আশ্চর্যান্বিত হওয়ার মতো কিছু ছিল না। তাঁর সম্পর্কে আল্লাহর এ বাণী তো কিয়ামত পর্যন্ত পঠিত হতে থাকবে,
সুতরাং কেউ দান করলে, মুত্তাকি হলে এবং যা উত্তম তা সত্য হিসেবে গ্রহণ করে নিলে আমি তার জন্য সুগম করে দেবো সহজ পথ। আর কেউ কার্পণ্য করলে ও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলে, আর যা উত্তম তা অস্বীকার করলে তার জন্য আমি সুগম করে দেবো কঠোর পথ। তার সম্পদ তার কোনো কাজে আসবে না, যখন সে ধ্বংস হবে। আমার কাজ তো কেবল পথনির্দেশ করা, আমি তো মালিক ইহকাল ও পরকালের। আমি তোমাদের লেলিহান আগুন সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি। তাতে প্রবেশ করবে সে-ই, যে নিতান্ত হতভাগা— যে অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর তা থেকে দূরে রাখা হবে পরম মুত্তাকিকে, যে নিজের সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির জন্য এবং তার প্রতি কারও অনুগ্রহের প্রতিদানে নয়, কেবল তার মহান পালনকর্তার সন্তুষ্টির প্রত্যাশায়; সে তো অচিরেই সন্তোষ লাভ করবে। [সুরা লাইল: ৫-২১]
আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদ খরচ করেছেন আবু বকর রা.। প্রথম যুগের মুসলিম সামাজিকতায় এমন উদারতা ছিল সত্যিই কল্যাণ ও মর্যাদার মিনারস্বরূপ। ইসলামের বরকতে গোলামরাও বিশ্বাসে বলীয়ান ও উন্নত চিন্তাচেতনার অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন। ইসলামের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা, এর পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, এর নিরাপত্তার লক্ষ্যে জিহাদে প্রবৃত্ত হওয়া ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য। আবু বকর কর্তৃক তাঁদের ক্রয় করে আজাদ করে দেওয়ার মাধ্যমে ইসলামের বড়ত্বের প্রকাশ পায়। অনুরূপ তা এই চিত্রও তুলে ধরে যে, তাঁর অন্তরে দীন কতটা জায়গা দখল করে রেখেছিল। বর্তমানের মুসলমানদের জন্য উচিৎ, তারা যেন এ ধরনের উন্নত দৃষ্টিভঙ্গিই গড়ে তোলে, যাতে পরস্পরের মধ্যে ঐক্য সুদৃঢ় হয়। পারস্পরিক মুহাব্বাত ও দরদ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে সে-সকল মুসলিমদের প্রতি নজর দেয়, শত্রুরা যাদের সমূলে উচ্ছেদের ধান্দায় তৎপর।
টিকাঃ
১০৮ আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ১/১৩৬।
১০৯ আতিকুল উতাকা (আবু বকরিনিস সিদ্দিক), মাহমুদ আল বাগদাদি: ৩৯, ৪০।
১১০ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু হিশাম: ১/৩৯৪।
১১১ আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ১/১৪০১
১১২ মিহনাতুল মুসলিমিন ফি আহদিল মাক্কি, ড. সুলায়মান সুয়াইকিত: ৯২।
১১০ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু হিশাম: ১/৩৯৩।
১১৪ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, আবু শাহবা: ১/৩৪৬।
১১৪ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, ইবনু হিশাম: ১/৩৯৩।
১১৬ আস-সিরাতুন নাবাবিয়াহ, আবু শাহবা: ১/৩৪৫।
১১১ আত-তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ১/৩৪২।
১১১ তাফসিবুল আলুসি: ৩০/১৫২; অধিকাংশ মুফাসসির বলেছেন, এমনকি এ ব্যাপারে ইজমার কথাও বলেছেন যে, এ আয়াতগুলো আবু বকরের শানে অবতীর্ণ হয়েছে। - অনুবাদক।
📄 প্রথম হিজরত এবং ইয়াহুদি যাজনায় অবস্থান
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. বর্ণনা করেন; আমি চোখ খুলে পিতাকে ইসলামে অটল দেখতে পাই। নবিজি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা আমাদের বাড়ি আসতেন। যখন মুসলমানদের ওপর বিপর্যয়কাল অতিক্রান্ত হচ্ছিল, তখন পিতাজি হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে 'বারকুল গিমাদ' পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন। সেখানে কারাহ গোত্রের সরদার ইবনুদ দাগানার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।
ইবনুদ দাগানা তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'আবু বকর, কোথায় যাচ্ছেন?' পিতা জি বলেন, 'আমার জাতি আমাকে নিরুদ্দেশ হতে বাধ্য করেছে। আমি চাই বিশ্বব্যাপী পরিভ্রমণ করব এবং স্বাধীনভাবে আপন রবের ইবাদত করব।' ইবনুদ দাগানা বলেন, 'আবু বকর, আপনার মতো মানুষকে এখান থেকে যেতে দেওয়া যায় না। আপনি তো অভাবীদের সাহায্য করেন। আত্মীয়দের খেয়াল রাখেন। মানুষের ঋণভার নিজের কাঁধে তুলে নেন। মেহমানদের আতিথেয়তা করান। বিপদগ্রস্তদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। আমি আপনাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি। চলুন, আপনি আপনার শহরে থেকে আপন প্রতিপালকের ইবাদত করবেন।'
আবু বকর তখন ইবনুদ দাগানার সঙ্গে আবার মক্কায় ফিরে আসেন। বিকেলে ইবনুদ দাগানা কুরাইশের নেতৃবর্গের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তাদের বলেন, 'আবু বকরের মতো বিরল গুণধর ব্যক্তি এখান থেকে চলে যেতে পারেন না। তাঁকে চলে যেতে বাধ্য করা ঠিক হচ্ছে না। তোমরা কি এমন ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দিচ্ছ, যিনি অভাবীদের সাহায্য করেন? আত্মীয়স্বজনের খেয়াল রাখেন? অন্যের ঋণভার নিজের কাঁধে উঠিয়ে নেন? বিপদগ্রস্তদের সর্বস্ব দিয়ে সহায়তা করেন?'
কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ইবনুদ দাগানার কোনো কথাই অস্বীকার করতে পারেনি। তারা বলে, 'ঠিক আছে; তবে তাঁকে বলেন, তিনি যেন তাঁর ঘরের ভেতর ইবাদত-বন্দেগি, সালাত আদায় ও কুরআন তিলাওয়াত করেন। তাঁর ইবাদত ও তিলাওয়াত যেন আমাদের সমস্যায় না ফেলে। সকলের সামনে প্রকাশ্যে যেন ইসলামের দাওয়াত দিয়ে না বেড়ান। কারণ, আমরা আমাদের নারী ও যুবকদের বিভ্রান্ত হয়ে পড়ার ভয় করছি।'
ইবনুদ দাগানা কুরাইশ নেতৃবৃন্দের এ কথাগুলো আবু বকরের কাছে পৌঁছে দেন। আবু বকর তখন নিজের ঘরেই ইবাদত করতে থাকেন। কিছু দিন পর তিনি একটি কৌশল অবলম্বন করেন। সেটি হচ্ছে, ঘরের আঙিনায় একটি মসজিদ বানিয়ে নেন। সেখানেই সালাত ও কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি তিলাওয়াত শুরু করলে কুরাইশের নারী ও যুবকরা সেখানে ভিড় জমাত। তাদের কাছে তা অস্বাভাবিক আকর্ষণীয় লাগত। তারা কান পেতে শুনত। আবু বকর ছিলেন স্বভাবজাত নম্র। তিলাওয়াত শুরু করলে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে কান্না শুরু করে দিতেন। এতে তিলাওয়াতের প্রভাব আরও বেড়ে যেত।
কুরাইশ নেতৃবৃন্দ এ অবস্থা দেখে ভীত হয়ে ওঠে। তারা ইবনুদ দাগানাকে ডেকে পাঠায়। তিনি এলে তাকে বলে, 'আমরা আপনার কারণে আবু বকরকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। শর্ত ছিল তিনি ঘরে সালাত পড়বেন, সেখানেই কুরআন তিলাওয়াত করবেন; কিন্তু তিনি শর্ত লঙ্ঘন করে ঘরের আঙিনায় একটি মসজিদ নির্মাণ করে নিয়েছেন। সেখানে প্রকাশ্যে সালাত পড়েন, কুরআন তিলাওয়াত করেন। আমরা আশঙ্কা করছি, তাঁর কারণে আমাদের নারী ও যুবকরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। আপনি তাকে বলুন, তিনি যেন পূর্বশর্ত অনুযায়ী ঘরের ভেতরে সালাত পড়েন ও তিলাওয়াত করেন। নয়তো আপনি আপনার নিরাপত্তার জিম্মাদারি উঠিয়ে নেন। আমরা আপনাকে লজ্জা দিতে চাই না। আবু বকরকে আমরা এভাবে চলতে দিতে পারি না।'
ইবনুদ দাগানা আবু বকরের কাছে এসে বলেন, 'আমার এবং আপনার মধ্যে যে কথা হয়েছিল, আশা করি সেটা আপনার স্মরণ আছে। অতএব হয় আপনি আগের সিদ্ধান্তের ওপর চলুন, নতুবা আমার জিম্মা আমার কাছে ফিরিয়ে দেন। আমি চাই না আরবরা বলাবলি করুক; ইবনুদ দাগানা একজনকে আশ্রয় দিয়েছিল; কিন্তু সে তার শর্ত লঙ্ঘন করেছে।'
উত্তরে আবু বকর বলেন, 'ঠিক আছে, আমি আপনার জিম্মা আপনার হাতে ফিরিয়ে দিলাম। আমি আল্লাহর জিম্মার ওপরই সন্তুষ্ট।'
ইবনুদ দাগানার জিম্মা থেকে মুক্ত হওয়ার পর একদিন তিনি কাবাপ্রাঙ্গণে যাওয়ার সময় কুরাইশের এক নির্বোধ ব্যক্তির মুখোমুখি হন। সে তাঁর এই পেরেশানির অবস্থার সুযোগ নিয়ে তাঁর মাথায় মাটি ঢেলে দেয়। তখন তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন ওয়ালিদ ইবনু মুগিরা কিংবা আস ইবনু ওয়ায়িল। তিনি তাকে বলেন, 'দেখুন, এই নির্বোধটা আমার সঙ্গে কী আচরণ করছে?' সে জবাবে বলে, 'তুমি তো নিজেই নিজের ওপর অত্যাচার করেছ।' আবু বকর তখন এ কথা বলে চলে যেতে থাকেন— 'আমার রব, তুমি কতই-না ধৈর্যশীল। আমার রব, তুমি কতই-না ধৈর্যশীল। আমার রব, তুমি কতই-না ধৈর্যশীল।'
শিক্ষা ও তাৎপর্য এ ঘটনার মধ্যে অনেকগুলো শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছ। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: ১. নবিজির আবির্ভাবের পূর্বে সমাজে তাঁর মর্যাদার আসন অনেক উপরে ছিল। মানুষের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন অনেক বিপুল সম্মানের অধিকারী।
ইবনুদ দাগানার মতো গোত্রপতি এই সাক্ষ্য দিতে বাধ্য ছিলেন যে, 'আপনার মতো মহান মানুষ এখান থেকে এভাবে যেতে পারেন না। আপনার মতো মানুষকে যেতে দেওয়া উচিত হবে না। আপনি অসহায়দের সহায়তা করেন। আত্মীয়স্বজনের খেয়াল রাখেন। অন্যের ঋণভার নিজের কাঁধে উঠিয়ে নেন। আতিথ্যেও আপনি অতুলনীয়। বিপদগ্রস্তদের সাহায্যে আপনি সতত তৎপর থাকেন।'
ইবনুদ দাগানার কথা থেকে স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়, আবু বকর কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসায় ইসলামগ্রহণ করেছিলেন। সম্মান কিংবা প্রতিপত্তি অর্জন তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। আল্লাহর সন্তুষ্টিই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য, যে কারণে তাঁকে অসংখ্য বিপদ মোকাবিলা করতে হয়েছে। আল্লাহর জন্য পরিবার- পরিজন এবং জন্মভূমিকে তাঁর বিদায় জানাতে হয়েছে। কেননা, মাতৃভূমিতে তাঁকে স্বাধীনভাবে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিরত রাখা হচ্ছিল।
২. দাওয়াতি জীবনে তাঁর একমাত্র পাথেয় ছিল কুরআনুল কারিম। এই জন্য কুরআন মুখস্থ করা, উপলব্ধি করা, এর ফিকহ অনুধাবন এবং তদনুযায়ী আমল করার প্রতি মনোযোগ দেন। কুরআনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই তিনি দাওয়াতি কাজে দক্ষতা, পদ্ধতিতে চমৎকারিত্ব, চিন্তায় গভীরতা, আলোচ্যবিষয় উপস্থাপনে বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাবাহিকতা, শ্রোতাকে মনোযোগী ও বিমোহিত করে তোলার যোগ্যতা, উপস্থাপনাকে দলিল- প্রমাণের সহযোগে দৃঢ়ীকরণের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে নিয়েছিলেন।
কুরআন তিলাওয়াতের সময় তিনি অনেকটা আত্মহারা হয়ে পড়তেন। খুব কান্নাকাটি করতেন। এ থেকে তাঁর বিশ্বাসের দৃঢ়তা, আল্লাহর প্রতি একাগ্রতার প্রমাণ পাওয়া যায়। বেশি চিন্তা অথবা গভীর আনন্দ থেকে কান্নার ক্ষমতা তৈরি হয়ে থাকে। প্রকৃত মুমিন সিরাতুল মুসতাকিমের দিকে আল্লাহর দেওয়া হিদায়াত পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হয়। অপরদিকে এ থেকে সামান্য বিচ্যুতির কারণে ভয়ে কেঁপে ওঠে। আর সে যদি হয় আবু বকরের মতো জীবন্ত, তীব্র অনুভূতিপ্রবণ ও জাগ্রত চেতনাধারী, তখন কুরআন ওই ব্যক্তিকে পরকালের জীবন এবং সেখানে সংঘটিতব্য হিসাব- কিতাব, শাস্তি ও সাওয়াবের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে, যার প্রতিক্রিয়ায় তার শরীরে কম্পন শুরু হবে। চক্ষুযুগল সজল হয়ে উঠবে। আর দৃশ্যটি প্রত্যক্ষকারীদের মধ্যেও এ মানসিকতা সংক্রমিত হয়ে পড়বে। এ কারনেই মুশরিকরা আবু বকরের এই অবস্থাকে ভীষণ ভয় করত। তাদের মনে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শঙ্কা কাজ করত; কী জানি ওরা প্রভাবিত হয়ে ইসলামগ্রহণ করে নেয়।
রাসুলের তত্ত্বাবধানে তাঁর দীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি কুরআন মুখস্থ করে নিয়েছিলেন। নিজের জীবনে কুরআনকে পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়িত করেছিলেন। এ নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করেছেন। তিনি ইলম ছাড়া কোনো কথা বলতেন না। একবার তাঁকে একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, যা তাঁর জানা ছিল না, তখন প্রতি-উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘কোন জমিন আমাকে জায়গা দেবে, কোন আকাশ আমাকে ছায়া দেবে, যখন আমি আল্লাহর কালাম সম্পর্কে এমন কথা বলব, যা আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়!’
কুরআন নিয়ে তাঁর চিন্তা-গবেষণা কেমন ছিল, তা তাঁর এ কথা থেকেই স্পষ্ট অনুমান করা যায়—‘আল্লাহ যখন জান্নাতবাসীর আলোচনা করেছেন, তখন তাদের সৎকর্মের কথাও আলোচনা করেছেন। তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। বান্দা বলে, আমরা এমন লোকদের মধ্যে কীভাবে গণ্য হতে পারি? তখন বক্তা বলেন, আমি তো তাদের মধ্য থেকে নই; অথচ তিনি ওদের মধ্যে গণ্য।
কুরআনের যে আয়াত সম্পর্কে তাঁর খটকা লাগত, অত্যন্ত বিনয় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে রাসুলের কাছে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে নিতেন। যখন কুরআনের আয়াত— ‘তোমাদের ও কিতাবিদের খেয়ালখুশিমতো কাজ হবে না। কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে পাবে এবং আল্লাহ ব্যতীত তার জন্য কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।’ [সুরা নিসা: ১২৩] অবতীর্ণ হয়, তখন আবু বকর রাসুলকে বলেন, ‘এ আয়াত তো কোমর ভেঙে দেওয়ার মতো। আমাদের মধ্যে তো এমন কেউ নেই, যে গুনাহের কাজ করে না।’ নবিজি তখন তাঁকে বলেন, ‘আবু বকর, তুমি কি কষ্টে নিপতিত হও না? তোমাকে কি চিন্তা ও মর্মযাতনায় পেয়ে বসে না? তুমি কি কষ্টকর পরিস্থিতির শিকার হও না? এভাবেই তুমি সাজা ভোগ করে থাকো।’
আবু বকর কুরআনের অনেক আয়াতের ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছেন। যেমন:
যারা বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, এরপর অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা এসে বলে, তোমরা ভীত ও চিন্তিত হয়ো না এবং যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছিল, তার জন্য আনন্দিত হও। [সুরা হা-মিম সাজদা: ৩০]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আবু বকর রা. বলেন, ইমান থেকে তারা তাদের মস্তক ডান-বাম কোনো দিকে সরায়নি। মনে মনেও গায়রুল্লাহর অভিমুখী হয়নি-না ভালোবাসার সঙ্গে, না ভয়ের সঙ্গে। না আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে, না প্রশ্ন কিংবা নির্ভরতার মাধ্যমে; বরং তারা আল্লাহকেই ভালোবাসে। এ যেমন পার্থিব কোনো উপকারের জন্য নয়, তেমনই কোনো ক্ষতি দূর করার জন্যও নয়। যে-ই হোক না কেন, আল্লাহ ছাড়া তারা কাউকে ভয় করে না। তিনি ছাড়া কারও সামনে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে না, অন্তর থেকেও তিনি ছাড়া অন্য কারও দিকে ধাবিত হয় না। এভাবে আরও কিছু আয়াতের ব্যাখ্যা তাঁর থেকে বর্ণিত আছে।
আলিম ও দায়িদের সর্বক্ষণ কুরআনের সাহচর্যে থাকা দরকার। সর্বদা কুরআন তিলাওয়াত করা, কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা, কুরআনের জ্ঞান, শিক্ষা, হিকমাহ ও সূক্ষ্ম সব বিষয় বের করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা উচিত। কুরআনের মধ্যে ইলমি, শরয়ি ও বর্ণনাগত যত অলৌকিকত্ব রয়েছে, তা তুলে ধরাসহ যুদ্ধ ও বিপদে জড়িত মানুষের জন্য আল্লাহ তাঁর কিতাবে যে রাস্তা বলে দিয়েছেন, তা সমকালের উপযোগী করে উপস্থাপন করা, অনুরূপ সমকালের উন্নত মাধ্যমগুলো ধারণ করে দাওয়াতের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার। আবু বকর এ বিষয়টি জানতেন যে, কুরাইশের সামনে কুরআনের তিলাওয়াত আল্লাহর দিকে দাওয়াতের ভূমিকা পালন করে।
টিকাঃ
১২০ ফাতহুল বারি: ৭/২৭৪।
১২১ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৯৫।
১২২ ইসতিখলাফ আবি বাকরিনিস সিদ্দিক রা.: ১৩৪।
১২৩ তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম ফি আহদিল খুলাফায়ির রাশিদিন: ৮৮।
১২৪ আত-তারিখুল ইসলামি: হুমায়দি: ১৯, ২০/২০৯।
১২৫ তারিখুল খুলাফা, সুয়ুতি: ১১৭। এই বর্ণনার মধ্যে সনদের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন।
১২৬ আল-ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়া: ৬/২১২।
১২৭ মুসনাদু আহমাদ: ১/১১ আল্লামা আহমাদ শাকির রাহ. বলেন, এই বর্ণনার সব সনদ দুর্বল। তবে অধিক সমর্থন থাকায় সহিহের পর্যায়ভুক্ত হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। দেখুন মুসনাদু আহমাদ : ৬৮।
১২৮ মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৮/২২।
১২৯ তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম ফি আহদিল খুলাফায়ির রাশিদিন: ৯৫।