📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 ওহীকে অকার্যকর করা

📄 ওহীকে অকার্যকর করা


অনেক মানুষ ওহীর গুরুত্ব ও মর্যাদা বিশ্বাস করা সত্ত্বেও জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে ওহীকে অকার্যকর করার কারণে বিভ্রান্তির মধ্যে নিপতিত হন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুভাবে ওহীর কার্যকরিতা অস্বীকার করা হয়: (১) ওহীর স্বাভাবিক ও সরল অর্থ প্রত্যাখ্যান করে 'রূপক' অর্থ গ্রহণ করা, অথবা (২) ওহীর নির্দেশনার একটি ব্যাখ্যা প্রদান করা এবং এ ব্যাখ্যার ভিত্তিতে অমুক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সমাজের জন্য তা প্রযোজ্য নয় বলে দাবি করা। এ হলো মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশ বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 লোকাচার, সামাজিক প্রচলন বা ব্যক্তিগত পছন্দ

📄 লোকাচার, সামাজিক প্রচলন বা ব্যক্তিগত পছন্দ


বিশ্বাস বিষয়ক বিভ্রান্তির মূল কারণ বিশ্বাসের বিষয়ে ওহী ছাড়া অন্যান্য উৎসেরর উপর নির্ভর করা। এ সকল ওহী-অতিরিক্ত বিষয়াদির মধ্যে রয়েছে: লোকাচার, ব্যক্তিগত পছন্দ, ওহীর ব্যাখ্যা, ওহী-ভিত্তিক যুক্তি, ধর্মগুরুদের মতামত, ইলকা, ইলহাম বা কাশফ, আকল বা মানবীয় জ্ঞান ইত্যাদি।

আমরা দেখেছি যে আরবের কাফিরগণ মূলত ওহীর অস্তিত্ব অস্বীকার করত না। তবে তারা বিভিন্ন ওজুহাতে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর ওহী নাযিল হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করত। তাদের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি ছিল লোকাচার, সামাজিক প্রচলন বা তাদের নিজস্ব পছন্দ। এ সকল লোকাচারকে তারা পিতাপিতামহের মাধ্যমে প্রাপ্ত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ)-এর ধর্মবিশ্বাস বলে বিশ্বাস করত। এগুলির ভিত্তিতেই তাঁরা রাসূলুল্লাহ-এর দাও'আত অস্বীকার করে। তাদের নিকট ইবরাহীম (আ) ও ইসলামঈল (আ)-এর প্রতি অবতীর্ণ কোনো ওহী তাদের নিকট সংরক্ষিত ছিল না, বরং বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তারা প্রচলনের উপরেই নির্ভর করত। বিভিন্ন মুসলিম সমাজের অধিকাংশ বিভ্রান্তিও এরূপ লোকাচারের ভিত্তিতে প্রসার লাভ করেছে। পূর্ববর্তী ধর্মের প্রভাব, বিশেষ কোনো ব্যক্তি মতামত, নিজের পছন্দ ইত্যাদির ভিত্তিতে কোনো একটি 'আকীদা' বা বিশ্বাস গড়ে ওঠে এবং ক্রমান্বয়ে তা প্রসার লাভ করে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 ওহীর তাফসীর ও ওহী ভিত্তিক যুক্তি

📄 ওহীর তাফসীর ও ওহী ভিত্তিক যুক্তি


কুরআনের আলোকে আমরা জানতে পারি যে, আরবের কাফিরগণ ও ইহুদী-খৃস্টানদের শিরক ও কুফরের একটি বিশেষ কারণ ছিল ওহীর ব্যাখ্যা ও ওহী-ভিত্তিক বিভিন্ন যুক্তিকে ওহীর সম্পূরক বিষয় হিসেবে বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। এ বিষয়ে আমরা বিভিন্ন উদাহরণ পরবর্তী অধ্যায়গুলি দেখব, সেগুলির মধ্যে রয়েছে (১) তাকদীর সম্পর্কে কাফিরদের বিশ্বাস এবং (২) ঈসা (আ) ও ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে খৃস্টানদের বিশ্বাস। ওহী এবং ওহীর তাফসীরের মধ্যে পার্থক্য অনুধাবনের জন্য নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ আলোচনা করছি। মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে বলেছেন: إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ "তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং যারা ঈমান গ্রহণ করেছে, যারা সালাত কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে এবং তারা রুকু-রত।"৭৭

এ আয়াতের তাফসীরে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা), আলী ইবনু আবী তালিব (রা), আম্মার ইবনু ইয়াসার (রা), মুজাহিদ ইবনু জাবর প্রমুখ সাহাবী ও তাবিয়ী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আয়াতটি আলী (রা)-এর সম্পর্কে অবতীর্ণ। এ বিষয়ক বর্ণনাগুলির অধিকাংশ সনদই অত্যন্ত দুর্বল। এ বিষয়ে বর্ণিত হাদীসগুলির সার সংক্ষেপ এই যে, একজন ভিক্ষুক মসজিদের মধ্যে ভিক্ষা চান। কেউ তাকে কোনো ভিক্ষা প্রদান করেন না। আলী (রা) তখন মসজিদের মধ্যে নফল সালাত আদায়ে রত ছিলেন। তিনি এ সময় রুকুরত অবস্থায় ছিলেন। এ অবস্থাতেই তিনি ইশারায় ভিক্ষুককে ডাকেন এবং নিজের হাতের আংটি খুলে ভিক্ষককে প্রদান করেন। ভিক্ষুক রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আগমন করে বিষয়টি জানান। তখন মহান আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেন। রাসূলুল্লাহ আয়াতটি পাঠ করে বলেন, "আমি যার বন্ধু আলীও তার বন্ধু। হে আল্লাহ, আলীকে যে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে তাকে আপনি বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করুন এবং আলীর সাথে যে শত্রুতা করে আপনি তার সাথে শত্রুতা করুন।"৭৮

উপরের তাফসীরকে শীয়াগণ তাদের আকীদার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তারা বলেন, এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আলীকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা বা তাঁর দলভুক্ত হওয়া ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজেই মু'আবিয়া (রা) ও অন্যান্য সকল সাহাবী

(রা) যারা আলী (রা)-এর সাথে শত্রুতা করেছেন, বা তাঁকে ক্ষমতা দেন নি এবং তাঁদের যারা অনুসরণ করেন বা তাঁদেরকে ভালবাসেন তাঁরা সকলেই কুরআনের নির্দেশ অস্বীকার করার কারণে কাফির বা মুরতাদ বলে গণ্য (নাউযূ বিল্লাহ!)।

এখানে কুরআন ও তাফসীরের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করুন। কুরআনের নির্দেশ যা তার স্পষ্ট অর্থ থেকে বুঝা যায়, তা হলো, মুমিনদেরকে অবশ্যই আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং সালাত কায়েমকারী ও যাকাত প্রদানকারী মুমিনগণকে সামগ্রিকভাবে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আলী (রা) ও সকল সাহাবী ও অন্যান্য মুমিন এর অন্তর্ভুক্ত। আলী (রা)-এর বিশেষত্ব কুরআন দ্বারা প্রমাণিত নয়, বরং কোনো কোনো যয়ীফ বা খাবারু ওয়াহিদ পর্যায়ের হাদীসে বর্ণিত এবং কোনো কোনো মুফাস্সিরের মত। এ সকল মত দ্বারা আলী (রা)-এর মর্যাদা জানা যায়, তবে কখনোই বিষয়টিকে মুমিনের বিশ্বাস বা আকীদার অংশ বানানো যায় না। এজন্য যে কোনো ভাবে আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের (ﷺ) বিরোধিতা বা বিদ্বেষপোষণ ঈমান বিনষ্টকারী, কিন্তু জাগতিক বা ইজতিহাদী কারণে আলী (রা)-এর বিরোধিতা করা বা অন্য কোনো মুমিনের বিরোধিতা করা তদ্রূপ নয়। কিন্তু শীয়াগণ তাফসীরকে বিশ্বাসের অংশ বানিয়েছেন। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً “যখন তোমার প্রতিপালক মালাকগণকে বললেন: আমি পৃথিবীতে 'স্থলাভিষিক্ত' সৃষ্টি করছি।"৭৯ খলীফা অর্থ 'স্থলাভিষিক্ত' বা 'গদ্দিনশীন', যিনি অন্যের অনুপস্থিতিতে তার স্থলে অবস্থান বা কর্ম করেন। এখানে মহান আল্লাহ বলেছেন যে, তিনি আদমকে পৃথিবীতে 'খলীফা' বা স্থলাভিষিক্ত হিসেবে প্রেরণ করবেন। কার স্থলাভিষিক্ত তা আল্লাহ বলেন নি। মুফাস্সিরগণ থেকে তিনটি মত প্রসিদ্ধঃ (১) ইবনু আব্বাস (রা), ইবনু মাসউদ (রা) প্রমুখ সাহাবীর মতে এখানে 'স্থলাভিষিক্ত' বলতে পূর্ববর্তী জিন্ন জাতির স্থলাভিষিক্ত বুঝানো হয়েছে। (২) ইবনু যাইদ ও অন্যান্য কোনো কোনো মুফাস্সিরের মতে এখানে 'খলীফা' বা স্থলাভিষিক্ত বলতে বুঝানো হয়েছে যে, আদম সন্তানগণ এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম পৃথিবীতে বসবাস করবে এবং পরবর্তী প্রজন্ম পূর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত হবে। (৩) ইমাম তাবারী ও অন্যান্য কতিপয় মুফাস্সির বলেন যে, এখানে খলীফা অর্থ আল্লাহর খলীফাও হতে পারে। অর্থৎ আদম ও তাঁর সন্তানগণ পৃথিবীতে আল্লাহর নিয়ম-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরই স্থলাভিষিক্ত।৮০

খলীফা শব্দ, এর বহুবচন এবং এর ক্রিয়াপদ কুরআন কারীমে প্রায় ২০ স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। এ সকল ব্যবহারের আলোকে সুস্পষ্ট যে, খলীফা বলতে পূর্ববর্তী প্রজন্মের স্থলাভিষিক্ত বুঝানো হয়। এজন্য কুরআনের ব্যবহারের আলোকে প্রথম ও দ্বিতীয় মতই অধিক গ্রহণযোগ্য। তৃতীয় মতটির বিষয়ে প্রথম যুগের অনেক আলিম আপত্তি করেছেন। তাঁরা বলেছেন যে, মানুষকে আল্লাহর খলীফা বলা ইসলামী বিশ্বাসের পরিপন্থী। কারণ, কারো মৃত্যু, স্থানান্তর বা অবিদ্যমানতার কারণেই তার স্থলাভিষিক্ত, গদ্দিনশীন বা খলীফার প্রয়োজন হয়। আর মহান আল্লাহ তো এরূপ কোনো প্রয়োজনীয়তা থেকে মহা পবিত্র। কুরআন বা হাদীসে মানুষকে আল্লাহর খলীফা বলা হয় নি, বরং হাদীস শরীফে বলা হয়েছে যে, আল্লাহই মানুষের খলীফা বা স্থলাভিষিক্ত হন। যেমন সফরের দু'আয় রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতেন: "আপনিই সফরে (আমাদের) সাথী এবং পরিবারে (আমাদের) খলীফা বা স্থলাভিষিক্ত।"৮১ একব্যক্তি আবূ বাকর (রা)-কে সম্বোধন করে বলেন, হে আল্লাহর খলীফা। তখন তিনি বলেন, "আমি আল্লাহর খলীফা নই, বরং আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খলীফা বা স্থলাভিষিক্ত।"৮২

এতদসত্ত্বেও পরবর্তীকালে এ আয়াতের তাফসীরে এই তৃতীয় মতটিই প্রসিদ্ধি লাভ করে। শীয়াগণ এ তাফসীরকে ওহীর সমতুল্য এবং ওহীর সম্পূরক বলে গণ্য করে একে তাদের আকীদার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা দাবি করেন যে, মানুষ আল্লাহর খলীফা এবং এ খিলাফাতের চূড়ান্ত রূপ নবীগণ ও আলী বংশের ইমামগণের মধ্যে বিরাজমান। আর কারো খলীফা বা স্থলাভিষিক্ত হতে হলে অবশ্যই তাকে তার মত ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী হতে হবে। এ যুক্তিতে তারা দাবি করেন যে, আলী বংশের ইমামগণ মহান আল্লাহর মতই অলৌকিক গাইবী জ্ঞান, ও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী, তা না হলে তাঁরা আল্লাহর খিলাফত কিভাবে চালাবেন? এভাবে তারা একটি তাফসীরকে ওহী হিসেবে গণ্য করে তার উপরে কিছু যুক্তি তর্ক দিয়ে একটি আকীদা বা বিশ্বাস তৈরি করেছেন, যা কুরআন বা হাদীসে কখনো কোথাও এভাবে বলা হয় নি।

এখানে ওহী ও তাফসীরের পার্থক্য লক্ষ্য করুন। ওহীর নির্দেশনা যে, আদমকে মহান আল্লাহ পৃথিবীতে 'খলীফা' হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এতটুকু বিশ্বাস করা মুমিনের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। কেউ যদি তা অস্বীকার করে তবে তা অবিশ্বাস বলে গণ্য। তবে কার খলীফা তা আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে কোথাও বলেন নি। এ বিষয়ে মুফাস্সিরগণের মতামত ইলমী আলোচনা বটে, কিন্তু ওহীর সমতুল্য নয়।

এভাবে আমরা দেখছি যে, উপরের তাফসীরগুলি গ্রহণযোগ্য এবং সাহাবী, তাবিয়ী বা পরবর্তী যুগের প্রসিদ্ধ মুফাস্সিরগণ থেকে বর্ণিত হলেও এগুলি কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনার মত বিশ্বাসের ভিত্তি নয়। এগুলি ইলমী ও ফিকহী আলোচনার সূত্র হলেও আকীদার উৎস নয়। এরূপ গ্রহণযোগ্য তাফসীরের পাশাপাশি তাফসীর নামে অনেক উদ্ভট ও আজগুবি কথাও পাঠক অনেক গ্রন্থে দেখবেন, যেগুলির সাথে কুরআনের বাণীর কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলি তাফসীরের নামে বিকৃতি বৈ কিছুই নয়। যেমন সূরা

ফাতিহার শেষ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন "যারা ক্রোধে নিপতিত নয় এবং পথভ্রষ্টও নয়"৮৩। এর তাফসীরে কোনো কোনো শীয়া মুফাস্সির বলেছেন যে, ক্রোধে নিপতিত অর্থ যারা আলীর সাথে যুদ্ধ করেছেন এবং পথভ্রষ্ট অর্থ যারা নিরপেক্ষ থেকেছেন বা উভয়দলকে ভাল বলেছেন। সূরা রাহমানে মহান আল্লাহ বলেন: "দয়াময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন। তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ এবং শিক্ষা দিয়েছেন তাকে বর্ণনা।"৮৪ এর তাফসীরে (!) এরূপ কেউ কেউ বলেছেন যে, মানুষ সৃষ্টি করেছেন অর্থ মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে সৃষ্টি করেছেন এবং বর্ণনা শিক্ষা দিয়েছেন অর্থ আল্লাহর সকল গাইবী জ্ঞান তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। আর এ জ্ঞান তাঁর থেকে আলী বংশের ইমামগণ লাভ করেছেন!!!

পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখব যে, মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশ বিভ্রান্তির পিছনে এ কারণটি বিদ্যমান। কুরআনের অমুক আয়াতের তাফসীরে অমুক মুফাস্সিরের বক্তব্য, অমুক হাদীসের ব্যাখ্যায় অমুক মুহাদ্দিসের বক্তব্য ইত্যাদিকে 'আকীদা'র ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করার ফলে বিভিন্ন প্রকারের বিভ্রান্তি জন্ম নিয়েছে। ওহীর ব্যাখ্যায় আলিমগণের মতামতের মূল্য রয়েছে, তবে তা অবশ্যই মানবীয় মতামত মাত্র। কখনোই তা ওহীর সমতুল্য বা ওহীর সম্পূরক নয়।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা > 📄 ধর্মগুরুগণ বা আলিমগণের মতামত

📄 ধর্মগুরুগণ বা আলিমগণের মতামত


সকল ধর্মেই আলিমগণ বা ধর্মগুরুগণ ধর্মের ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং ধর্মের বিধিবিধান ও ধর্মবিশ্বাস শিক্ষা প্রদান করেন। তবে ইহুদী-খৃস্টান সম্প্রদায়, বিশেষত খৃস্টান সম্প্রদায় ধর্মগুরু বা বুজুর্গদের ইসমাত বা অভ্রান্ততা ও পবিত্র-আত্মা থেকে প্রাপ্ত কাশফ-ইলহামে বিশ্বাস করে তাদের মতামতকেই দীনের চূড়ান্ত সত্য বলে গ্রহণ করেছে। তাদের বুজুর্গি, কারামত, কাশফ ও বিশেষ জ্ঞানের উপর নির্ভর করে তাদের মতামতকে তারা ওহীর মতই মর্যাদা দান করেছে। বরং ওহীর আর বিশেষ কোনো মূল্য থাকে নি। এ সকল ধর্মগুরু ওহীর যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাই চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হয়েছে। তাদের বক্তব্যের সারকথা ছিল, ওহীর বক্তব্য আমরা বুঝব না, এগুলি সাধারণ মানুষদের জন্য নয়, পবিত্র আত্মায় পূর্ণ হয়ে কাশফ, ইলহাম ও বিশেষ জ্ঞানের মাধ্যমে ধর্মগুরু, পাদরি বা পোপ যে সিদ্ধান্ত দিবেন সেটিই ওহীর একমাত্র ব্যাখ্যা বলে গণ্য হবে। মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে এরূপ বিশ্বাসকে শিরক বলে আখ্যায়িত করেছেন। পরবর্তীকালে আমরা তা বিস্তারিত আলোচনা করব।

মুসলিম উম্মাহর আকীদাগত বিভক্তি ও বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ পরবর্তী আলিমগণের বক্তব্যকে আকীদার উৎস হিসেবে গ্রহণ করা। মূলত শীয়া ফিরকার অনুসারীগণই প্রথমত ইমাম ও নেককারদের ইসমাত ও তাদের ইলমু লাদুন্নী, কাশফ, ইলহাম ইত্যাদির অভ্রান্ততার বিশ্বাস প্রচার করে। পরবর্তীকালে মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক দুর্বলতার দিনগুলিতে কারামিতা, ফাতিমিয়‍্যাহ, ইসামঈলিয়‍্যাহ, বাতিনিয়‍্যাহ, নুসাইরিয়‍্যাহ, দুরুষ ইত্যাদি শীয়া ফিরকা সকল মুসলিম সমাজে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। অনেক সাধারণ নেককার মানুষও তাদের মতামত দ্বারা প্রভাবিত হন। ফলে আলিম-বুজুর্গগণের মতামতকেই আকীদার মূল ভিত্তি ধরা হয়। অমুক আলিম অমুক কথা বলেছেন, তিনি কি কিছুই জানতেন না? কাজেই কথাটি ঠিক এবং শুধু ঠিকই নয়, এর বিপরতীত কথা বিভ্রন্তি।

নিঃসন্দেহে ইসলামে আলিম ও নেককারগণের মর্যাদা রয়েছে। তবে তাঁরা মা'সূম নন, তাদের মতামত কুরআন সুন্নাহর আলোকে বিচার করে গ্রহণ করতে হবে। ভুলের কারণে যেমন কোনো নেককার ব্যক্তি বিষয়ে কু-ধারণা পোষণ করা যায় না, তেমনি কোনো নেককার বলেছেন বলেই তা অভ্রান্ত বলে বিশ্বাস করা যায় না।

আমরা উপরে দেখেছি যে, কুরাআন ও হাদীসের পরে ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্মকে কুরআন ও হাদীসে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে কথা কুরআনে বা প্রথম তিন যুগে প্রসিদ্ধ ইমামগণ কর্তৃক গৃহীত সহীহ হাদীসে নেই সে কথা আকীদার অংশ হতে পারে না, ইলমী আলোচনার বিষয় হতে পারে। আকীদা একমাত্র কুরআন ও হাদীস থেকেই শিখতে হবে। যদি কুরআন বা হাদীসের কোনো নির্দেশন সুস্পষ্টতই পরস্পর বিরোধী হয় অথবা সে বিষয়ে মতভেদের সষ্টি হয় এবং ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় তবে সে বিষয়ে ব্যাখ্যার অধিকার সাহাবীগণের। তাঁরা যদি কিছু না বলেন তবে আমাদের কিছু বলার আর প্রয়োজন নেই। যে বিষয়ে যতটুকু বলে অথবা কিছু না বলে সাহাবীগণের ঈমান সঠিক থেকেছে সে বিষয়ে ততটুকু বললে অথবা কিছু না বললে আমাদের ঈমানও সঠিক থাকবে।

পরবর্তী যুগের আলিমগণ অনেক কথা বলেছেন। প্রথম তিন মুবারক শতাব্দীর পরে, এবং বিশেষত, ক্রুসেড যুদ্ধে আক্রান্ত এবং পরে তাতার আক্রমনে পরাজিত ছিন্নভিন্ন মুসলিম সমাজগুলিতে অনেক আলিম, বুজুর্গ অনেক কথা বলেছেন, তাদের বিপরীতেও অনেকে অনেক কথা বলেছেন। আমাদের দেখতে হবে, এ সকল কথা কি সাহাবীগণ বলেছেন? যদি তাঁরা কিছু না বলেন তবে আমাদের মুক্তির পথ হলো কিছু না বলা। কিছু বললে তা অলস ইলমী বিতর্ক হতে পারে, তবে আকীদার বিষয় হতে পারে না। উম্মাতের সকল আলিম ও বুজুর্গই সম্মানিত। তাদের সম্মান করা মুমিনের দায়িত্ব। তাদের মাধ্যমেই দীন আমরা পেয়েছি। তবে সম্মান করা এবং অভ্রান্ততায় বিশ্বাস করা এক নয়। উম্মাতের পরবর্তী যুগের আলিমগণ অনেক কথা বলেছেন, তাদের মতামতের সম্মান করতে হবে এবং কোনো মত বাহ্যত সুন্নাতের বিপরীত হলে তার ভাল ব্যাখ্যা করতে হবে। তবে কখনোই তাকে আকীদার মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা যায় না বা এরূপ মতের ভিত্তিতে কুরআন বা সুন্নাতের নির্দেশনার ব্যাখ্যা করা যায় না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00