📄 ইসলামী খেলাফতের মেয়াদ হবে ৩০ বছর
হাদীস: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আমার উম্মতের খেলাফতের মেয়াদ হবে ৩০ বছর। তারপর শুরু হবে রাজতন্ত্র। (তিরমিযী শরীফ, ৪র্থ খন্ড, ২১৯৩ নং হাদীস, বাংলাদেশ ইসলামি সেন্টার কর্তৃক প্রকাশিত)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী খেলাফত পরিচালনা করেন খুলাফায়ে রাশেদীন। খুলাফায়ে রাশেদীন হলেন সত্য পথ প্রাপ্ত চারজন শ্রেষ্ঠ সাহাবী হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমর (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ)। এই চারজন খুলাফায়ে রাশেদীনের খেলাফতের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ২৯ বছর ৬ মাস। হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ) ৬ মাস খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। ছয় মাস পর তিনি হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) এর অনুকূলে খেলাফতের দায়িত্ব ত্যাগ করেন। হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) এর শাসনকাল থেকে ইসলামী খেলাফতের স্বর্ণ যুগ রাজতন্ত্রের সূচনা হয়। এ ব্যাপারে উম্মতে মুহাম্মাদীর আলেম সমাজ একমত। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীস অনুযায়ী ইসলামী খেলাফতের মেয়াদ ছিল পুরোপুরি ৩০ বছর। আর পৃথক ভাবে খলিফাদের খেলাফতের মেয়াদকাল ছিল এরূপঃ হযরত আবুবকর (রাঃ)- ২ বছর ৩ মাস (৬৫২-৬৫৪ খ্রি.); হযরত ওমর (রাঃ):- ১০ বছর (৬৫৪-৬৪৪ খ্রিঃ); হযরত উসমান (রাঃ) - ১২ বছর (৬৪৪-৬৫৬ খ্রিঃ); হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত হাসান (রাঃ)-৬ বছর (৬৫৬-৬৬১ খ্রিঃ)।
📄 একশত বছর পর এখনকার কেউ জীবিত থাকবে না
হাদীস: আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর জীবনের শেষ দিকে আমাদেরকে নিয়ে এশার নামায আদায় করেন। সালাম ফিরানোর পর শয্যা দিয়ে দাঁড়িয়ে তিন বেলা বলেন, তোমরা কি লক্ষ্য করেছ আজকের এই রাতের প্রতি? যারা এখন জীবিত আছে তার একশত বছর পর পৃথিবীর বুকে জীবিত থাকবে না। (তিরমিযী শরীফ, ৪র্থ খণ্ড, ২১৬৭ নং হাদীস, বাংলাদেশ ইসলামি সেন্টার কর্তৃক প্রকাশিত)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর ইন্তেকালের একমাস পূর্বে উপরোক্ত কথা বলেছিলেন। তার বক্তা অনুযায়ী ঠিক একশত বছরের মাথায় তার সাহাবাগণের মধ্যে কেউ জীবিত ছিলেন না। ১১০ হিজরীতে তার সর্বশেষ সাহাবী আবুত তুফাইল আমের ইবনে ওয়াসিলা ইন্তেকাল করেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়।
📄 রোম পারস্যের উপর বিজয়ী হবে
আল কুরআনে তিরিশ নম্বর সুরার নাম ‘রোম’ (আরবী উচ্চারণ রম)। রোম সাম্রাজ্য এবং পারস্য সাম্রাজ্য বিশ্বের দুটি বৃহৎ পরাশক্তি। এই রোম নামটি সূরা রুমের মধ্যে রয়েছে। সূরা রুমের প্রাথমিক আয়াতগুলোতে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে তা আল কুরআন আল্লাহর তাআলার বাণী হওয়ার এবং মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) আল্লাহর সত্য নবী হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণগুলোর অন্যতম। এ আয়াতগুলোতে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে কয়েক বছরের মধ্যেই পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রোম বিজয়ী হবে।
এ কথার মধ্যে দুটি ভবিষ্যত বাণী ছিল। এক-রোমান্স বিজয় লাভ করবে। দুই-মুসলমানদেরও সে সময় বিজয় সূচিত হবে। মূলতঃ এ দুটি ভবিষ্যদ্বাণী সফল হওয়ার কোন লক্ষণই তখন দেখা যাচ্ছিল না। একদিকে ছিল মুসলিমরা যখন মক্কায় নিষ্পেষিত-নির্যাতিত হচ্ছিল। অপরদিকে রোমানদের পরাজয় দিন দিন বেড়েই যাচ্ছিল। কারণ তৎকালীন সময়ে পারস্য সাম্রাজ্য ছিল রোমান সাম্রাজ্যের চেয়ে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী।
৬২৩ খ্রিস্টাব্দে পারস্য বাহিনী দামেষ্ক জয় করে। শহর বছর তারা জেরুজালেম জয় করে খ্রিস্টানদের উপর অকথ্যভাবে অত্যাচার শুরু করে। এ শহরের নগরই হাজার হাজার খ্রিস্টানকে হত্যা করে। এরপর এক এক বিজয় পারস্য পারস্যকে জয়লাভ করতে করতে পারছিল তার আশার পাওয়া যায় তার কোন পথ রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস (কায়সার) কাছে পাঠান। তাতে তিনি লেখেনঃ “সকল খোদার বড় খোদা, সারা জাহানের মালিক খসরুর পক্ষ থেকে এ হীন এবং কাজ্জাবধান বাণী হেরাক্লিয়াস প্রতি। তুই বলিস যে, তোর খোদার উপর তোর পূর্ণ আশা আছে। তাহলে কেন তোর খোদা জেরুজালেমকে আমার হাত থেকে রক্ষা করল না?”
সে সময় রোমের উপর পারস্যের বিজয়ের চর্চা সবার মুখে মুখে শুনে যেত। মক্কার মুশরিকরা আনন্দে নাচতো এবং মুসলমানদেরকে বলতো, “দেখ, পারস্য অগ্নিপূজারীরা জরাথ্রুষ্ট এবং ও রিসালাতে বিশ্বাসী রোমানরা পরাজিত হয়েছে। এমনিভাবে আমরা অগ্নিপূজা তোমাকে নির্মূল করে দিব।” ইতিহাসবিদেরা ভাষায় কুরআন মজীদের এই ভবিষ্যদ্বাণীর পর সাত-আট বছর পরও এমন অবস্থা চলছিল, কেউই এ ঘটনাকে অবাস্তব মনে করতো পারতো না যে, রোমান ইরানীদের উপর বিজয় হবে। (* Gibbon – Decline and Fall of the Roman Empire, Vol- 11, Page – 788. Modern Library, New York)
কুরআনের এ আয়াতগুলো যখন নাযিল হয় তখন মক্কার কাফেররা এ নিয়ে খুব বিদ্রুপ-উপহাস করতে থাকে। হযরত আবু বকর (রাঃ) যখন আয়াতগুলোতে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীর কথা জানতে পারেন তখন তিনি তা মক্কার কুরাইশ কাফেরদের কাছে ঘোষণা করতে লাগিলেন। মক্কায় বিশিষ্ট ধনী কুরাইশ নেতা উবাই ইবনে খালফ হযরত আবু বকর (রাঃ) এর সাথে এ বিষয়ে বাজি রেখে বলল, যদি তিন বছরের মধ্যে রোমান্যণ বিজয়ী হয় তো আমি দশটি উট দিতে বাধ্য থাকব। এ বাজি রাখার পর মুহাম্মদ (সাঃ) কাছে গেলে তিনি বলেন, দশ বছরের মধ্যে সময়কালের শর্ত এর উপর উটের সংখ্যা বাড়িয়ে একশ কর। হযরত আবু বকর (রাঃ) উবাই এর সাথে দেখা করলেন এবং নতুন করে এ শর্ত স্থিরকৃত হল যে, দশ বছরের মধ্যে যার কথা মিথ্যা প্রমাণিত হবে তাকে একশত উট দিতে হবে।
৬২২ খ্রিস্টাব্দে নবী (সাঃ) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। ওদিকে একই বছরে রোমান সম্রাট কায়সার পারস্যের উপর আক্রমণ করার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে আজারবাইজানে দখল করে পারস্যের এক যুদ্ধে পারস্পরিক শক্তি পুলিশিং করে দেয়। আল্লাহর কুদরতের लीला এই যে, একই বছর বদরের যুদ্ধে প্রথমবারের মত মুসলমানগণও কাফেরদের উপর বিজয় লাভ করে। এই ভাবে সূরা রোমে বর্ণিত আল্লাহ তায়ালার ভবিষ্যদ্বাণী কার্যকর হয়।
📄 পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয়িত হবে
হাদীস: হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, (পারস্য সম্রাট) কিসরার (খসরু) পতনের পর আর কোন কিসরা ক্ষমতাসীন হবে না এবং (রোম সম্রাট) কাইজারের পতনের পর আর কোন কাইজার ক্ষমতাসীন হবে না। যে মহান সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ! এই দুই সাম্রাজ্যের সমস্ত ধনভান্ডার আল্লাহর পথে ব্যয় করা হবে। (জামি’ আত-তিরমিযী)
উক্ত হাদীসের অনুরূপ আরও কিছু হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তৎকালীন বিশ্বের দুই সুপার পাওয়ার রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে তাদের ধনভান্ডার আল্লাহর পথে ব্যয় করার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষী তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছিল। অথচ তিনি যখন এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তখন তিনি ছিলেন নিতান্ত সহায়সম্বলহীন। ক্ষুধা নিবারণের আহার এবং নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও তাঁর ছিল না। যে কারণে মুশরিকরা তাঁর এসব কথা নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করত। মক্কার কুরাইশদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি যখন তাঁর সাহাবীদের নিয়ে মদীনার চারদিকে খন্দক খুঁড়ছিলেন তখন তিনি ক্ষুধায় পেটে পাথর বেঁধেছিলেন।
খন্দক (পরিখা) খুঁড়ার এক পর্যায়ে মাটির অভ্যন্তরে একটা বিরাট পাথর দেখা গেল। পাথরের উপর আঘাত করতেই তিনবার আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হল। মহানবী (সাঃ) বললেন, এই আলোকচ্ছটার মধ্যে আমাকে রোম, পারস্য ও ইয়ামেনের রাজ্য প্রাসাদগুলো দেখানো হয়েছে এবং অচিরেই আমরা এগুলো হস্তগত করব!
কয়েক দশকের মধ্যেই এসব ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত করে দিয়ে মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইসলামকে বিশ্বে বিজয়ী আদর্শ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর পর্যন্ত মুসলমানগণ বিশ্বের নেতৃস্থানীয় আসনে অধিষ্ঠিত ছিল।
এটি ৬০৫ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। এর প্রায় ৮ বছর পূর্বে ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজকে ইসলামের আহ্বান জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ৬১০ খ্রিস্টাব্দে নবুয়াতের দায়িত্ব প্রাপ্তির পর দশ বছর তাঁর জন্মস্থান মক্কায় ইসলাম প্রচারের কাজে ব্যাপৃত থাকেন। কিন্তু মক্কার কায়েমী স্বার্থবাদী কুরাইশদের প্রবল বাধা, নির্যাতন ও ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি মক্কায় টিকতে পারেননি। ফলে কোমল মনের অধিকারী মদীনাবাসীদের আমন্ত্রণে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। মক্কা থেকে ২৭০ মাইল দূরে অবস্থিত মদীনায় গিয়ে তিনি অনেকটা নিরাপদে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। মদীনায় তিনি একটি ক্ষুদ্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্র প্রধান হন।
এদিকে মক্কাবাসীদের ইসলামে বিদ্বেষ যুদ্ধরুপে থেমে থাকেনি। তারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও ক্ষুদ্র মদীনা রাষ্ট্রকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য মারিয়া হয়ে ওঠে। ফলে বদর, উহুদ ও খন্দক নামের প্রসিদ্ধ তিনটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পরপর তিনটি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে কুরাইশরা মহানবী (সাঃ) এর সাথে সন্ধি চুক্তি করতে বাধ্য হয়। এই সন্ধির ফলে ইসলাম প্রচারের গতি বিরোধাবাস অপাতত দূর হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নির্বিঘ্নে ইসলাম প্রচারের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।
হাযারিফা সাহাবী অবহিত তিনি একদিন সাহাবীদেরকে সমবেত করে বললেন, আমি সমগ্র জগতের জন্য রহমত ও রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি। তোমরা হযরত ঈসা (আঃ) এর লোকদের মত মতভেদ করো না। যাও, আমার তরফ হতে তোমরা সত্যের আহ্বান জানিয়ে দাও। ইসলাম বিশ্বের সুনিশ্চিত। তিনি আন্ত র্জাতিক পরিমণ্ডলে সেভাবে আহ্বান জানান এবং আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের ইসলামী আদর্শের ব্যবস্থা করলেন।
তৎকালীন বিশ্বে যে কয়টি রাজনীতি বিদ্যমান ছিল, তন্মধ্যে ইউরোপের রোমান সাম্রাজ্য, এশিয়ার পারস্যর সাম্রাজ্য এবং আফ্রিকার হাবসা সাম্রাজ্যই প্রধান ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এই সব রাষ্ট্রপ্রধানসহ মোট ছয়জনের নিকট একই দিনে ছয়টি পত্রে ছয়জন দূত প্রেরণ করেন। আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাফা (রাঃ) কে দূত হিসাবে পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের নিকট পাঠান। সম্রাট পারভেজের দরবার ছিল কিসরা। তিনি অত্যন্ত অহংকারী এবং উদ্ধত স্বভাবের ছিলেন। তার বিশাল সেনাবাহিনী, অতিরোধ্য শক্তিমান ও শান শওকতের তুলনা তখন কোথাও ছিলনা। মক্কায বিজয়ী ফেরদৌসী 'শাহানামা' মহাকাব্যে তার শক্তিধর ও জাঁক-জমকতার যে বর্ণনা দিয়েছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। শাহানামা অনুসারে তার দরবারে এমন জাহোশ জলুস ছিল যে, সূর্যের সত্তর বছর গমন ও তাহাদের সিংহাসনে নির্মীয়মাণ কোন কিছুই উন্নত করা হলঃ
“সম্রাট হয়ে তার পরে পারস্যে এক সময় যাওয়ায় ইচ্ছুক প্রকাশ করলেন। রাজ-রাজাদের সুযোগ হলেন বসে থাকার সঙ্গে মোমের সত্তর হাজার সোনায় সাজানো হলো। সে এক বিশাল ব্যাপারে। সম্রাটের পুরো হলে কী কথা! সম্রাট বছর নির্দেশ দিলেন তিন হাজার শুভাকাঙ্ক্ষী প্রস্তুত করতে। সম্রাটের সঙ্গে এক হাজার এগারশ যোজন অনুগত ও শুভ আর বাণী হাতে পায়ে হেঁটে গেলেন। আর কিংবা সজ্জিত যোজন চতুষ্পদ ঘোড়া এক হাজার বত্রিশ জন পুরুষ চলেছেন সম্রাটের পিছে। এদের সবারই হাতে তরবারি। অশ্বারোহীদের পেছনে গেলো সোয়াশো শিকারি বাঘ, বাঁচার মধ্যে সত্তরটি সিংহ ও বাঘ। এদের খাওয়ার জন্য শিক্ষিত করা হয়েছে। সোনার শিকল দিয়ে এদের মুখ বাঁধা। সাতেশো কুকুরের গলায় সোনার শিকল। শিকারের সময় এরা ধরনের পেছনে ধাওয়া করবে।
এই বিশাল বাহিনীর পেছনে চললো দুই হাজার সঙ্গীতকর। শিকারের সময় তারা বাদ্য বাজনাতে গাইবেন। এদের সবারই বাহন ছিল উট। সঙ্গীতকরদের সকলের মাথায় শোভা পাচ্ছিলো সোনার টুপি।
আর এতোগুলো মানুষের জন্য খাদ্য, তাঁবু, শিবির এবং পশুর আস্তাবল নিয়ে চললো ছয়শো উটের সারি। উইহলো দাস পুরুষগণ এবং অনুসরণ নিয়ে চললো সামনের দিকে। তাদের আগে গেল দুইশো অনুগত তরুণ। তাদের হাতে জাফরানের পরে আর পুষ্পদানি। আর সবার আগে আগে চললো জলপ্রবাহী সুগন্ধি সুগন্ধিত বাহকের দল। এরা গোলাপজলের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছে তরল সুগন্ধি। মৃগনাভি দলের যাত্রা পথের সামনে তারা ছিটিয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে যে সুগন্ধি পানি। সম্রাটের যাত্রাপথ হয় উচুঁতে ভেজা এবং সুগন্ধি ভারি। দমকা হাওয়ায় উড়ে এসে যেন সম্রাটের বিরক্তি উৎপাদন না করে। যেন মৃগনাভি সাত্রা পারে।
সম্রাটের পেছনে পেছনে চললো তিন হাজার সমস্ত রাজা। লাল, হলুদ, ও বেগুনি রঙের পোশাকে তারা সজ্জিত। সম্রাটের সঙ্গে সঙ্গে যখন কথা হলো বড়ো বড়ো সুসজ্জিত সজ্জিত পতাকা। বারো এগিয়ে চললো রাজন্যবর্গের পুরোভাগে। বাহিনীর সাজ-সজ্জা আয়োজন এবং বছর ছিল অতিশয় জাঁকজমকপূর্ণ।
বিবরণ থেকেই বোঝা যায়, সম্রাট খসরুর আড়ম্বরে যেমন ছিল পরিকল্পনা, তেমনি ছিল শৃঙ্খল। যেমন ছিলো সুন্দর সুঠাম, তেমনি বস্তু আশ্রয়স্থল। নাহলে তিন হাজার সমস্ত রাজার সঙ্গ উপভোগ করতে পারতেন না।
তাঁর সময়ে পারস্যের সিংহাসনে যে কেবল আল্লাহ ইবন হুযাইফা, ইত্যবসরে আর কথাও সেঁকাপ হয়নি। কিন্তু পরেই তিনি কায়সারের সাথে যুদ্ধ করে শৌর্যবীর্যতে পরাজিত হয়েন; কিন্তু তাঁর স্বভাব কোন পরিবর্তন ঘটেনি।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হযরত 'আবদুল্লাহ্ ইবন হুযাইফা (রা)' -এর মাধ্যমে তাঁর নিকট ইসলামের আহ্বানলিপি প্রেরণ করলেন। যায়াকালে রাসূল (সাঃ) তাঁকে বললেনঃ “তুমি বাহরাইনের শাসনকর্তা মুনযিরের হাতে পত্রখানা দিয়ে তাঁকে কিসরার নিকট পৌঁছাতে বলে দিও।” হযরত আবদুল্লাহ্ তাই করলেন। মুনযিরও যথাসময়ে পত্রখানা কিসরার দরবারে পৌঁছিয়ে দিলেন এরপরঃ
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের নিকট হতে পারস্যের প্রধান কিসরার সমীপে। যারা হিদায়াতের অনুসরণ করে, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করে এই কথা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইবাদাতের যোগ্য নয় এবং সমগ্র বিশ্বের লোকদেরকে সতর্ক করার জন্য তিনি আমাকে রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন, তার প্রতি সালাম।
আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, মুক্তি লাভ করতে পারবেন। অন্যথায় অগ্নি উপাসক প্রজাদের পাপের জন্যও আপনি দায়ী হবেন।”
প্রবল প্রতাপান্বিত পারস্য সম্রাট এই পত্র পেয়ে ক্রোধে আত্মহারা হয়ে উঠলেন। তিনি পত্রখানি টুকরা টুকরা করে ছিঁড়ে ফেললেন। এতেও তার ক্রোধ স্থিমিত হয়নি। তিনি তাৎক্ষণিক ইয়ামেনের শাসনকর্তা ‘বাযান’কে হুকুম দিয়ে পাঠালেন “মুহাম্মদ (সা)-কে গ্রেফতার করে অনতিবিলম্বে আমার দরবারে হাজির কর।”
সম্রাটের আদেশ পাবার পর বাযান ভয়ভীত অবস্থায় পারস্যরাজ বাদশাহের বরযখ নামক দুজন রাজকর্মচারীকে মদীনায় প্রেরণ করলেন। কর্মচারীদ্বয় পথ চলতে চলতে ভাবতে লাগিলেন, আমরা মহাশক্তিধর পারস্য সম্রাটের দূত। আমাদের ভয়ে কাঁপবে দেখে মুহাম্মদ (সা)। হয়ত ভয়ে ভয়ে কাঁপবে।
দূতদ্বয় রাসূল (সা)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে দেখলেন, সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যাপার। তাঁর নূরানী চেহারা দেখেই তারা ভয়তে কাঁপতে লাগল। কাঁপতে কাঁপতে তাঁকে বাহ্যাহর পত্রখানা জানিয়ে প্রার্থনা করলঃ
আপনি তাঁর আদেশ পালন করুন, অন্যথায় তিনি রাগন্বিত হবেন এবং তাঁর অগণিত সৈন্য প্রেরণ করে শুধু আপনাকেই নয় বরং সমগ্র ‘আরবদের ধ্বংস করে ফেলবেন। তিনি অত্যন্ত দুর্বল ও ভয় স্বভাবের লোক।
রাসূল (সা) তাদের কথা শুনে বললেনঃ “তোমরা কাল আমার নিকট এসো, তোমাদের এ কথার উত্তর দিব। এখন তোমরা একটা কথা শোন। বল ত আল্লাহ্ অন্যান্য পুরুষগণসহ সৌন্দর্যমণ্ডিত দেবী দেবী এবং লম্বা রেশম কোরা তোমরা তোমাদের মুখেমাঝে একরূপ বিপ্লবী করে ফেললে কেন? তোমাদেরকে এ বুদ্ধিমত্তা কে দিয়েছে? তারা ভয় কম্পিত কণ্ঠে উত্তর দিলঃ এটা আমাদের প্রভু (সম্রাটের) হুকুম। রাসূল (সা) বললেনঃ কিন্তু আমাদের আল্লাহ্ আমাদের দাড়ি রাখতে এবং গোঁফ কেটে খাট করতে হুকুম দিয়েছেন। বড়ই পরিতাপের বিষয় তোমরা প্রভুর প্রভু প্রভুর আদেশ পালন কর।
পরদিন দূতদ্বয় উপস্থিত হলে রাসূল (রা) বললেনঃ “কার পত্রখানা?” দূতদ্বয় বিস্মিত হয়ে বললঃ “কেন, শাহেনশাহ্ খসরু পাঠিয়েছে।” খসরু পারস্য? সে ত জীবিত নেই। যাও বাযাকে গিয়ে বল, শীঘ্রই পারস্যের রাজধানী ইসলামের রাজ্যভুক্ত হবে। দূতদ্বয় বিস্মিত হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। তারা বাযানকে ফিরে গিয়ে বাযানকে সব কথা জানাল। বাযান এই সংবাদ শুনে স্তম্ভিত হয়ে রইলেন। তিনি ভাবতে লাগলেনঃ “কি আশ্চর্য কথা! সেদিন মাত্র সম্রাটের পত্রখানা আসল। তাঁর কোন অসুস্থও ছিল না। হঠাৎ কি করে তার মৃত্যু হল? যদি আরবের রাসূলের এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয় তবে আমি নিশ্চয়ই তাঁর প্রতি ঈমান আনব।”
বেশি দিন বিলম্ব হল না। নতুন সম্রাট শেরওয়াইযাহ্ বাযানকে লিখে পাঠালেনঃ “আমি আমার পিতা খসরু অত্যাচারী সম্রাটকে হত্যা করে পারস্য সিংহাসন অধিকার করেছি। আমি তোমাকে তোমার পদে বহাল রাখলাম। তুমি আমার আনুগত্য স্বীকার করে শীঘ্র কর্তব্য পালন করতে থাক। আর সেই ‘আরবীয় নবী সম্পর্কে দ্বিতীয় আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত কোন কিছুই করবে না।” সম্রাট শেরওয়াইযাহ্ এই পত্র পাবার পর বাযান তার দু’পুত্রসহ ইসলাম গ্রহণ করেন। রাজদরবারের আরও বহু কর্মচারী তাকে অনুসরণ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। বাযান সাথে সাথেই মদীনায় লোক পাঠিয়ে তাদের সকলের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানিয়ে দিলেন।
সম্রাট পারস্যের পত্র পেয়ে আরও সোৎসাহে আল্লাহ্ এর পত্র তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ্, তুমি তাঁর সাম্রাজ্যকে টুকরো টুকরো করে দাও।” আল্লাহর মধ্যে তা-ই তো হল। আল্লাহ রাসূল (সা)-এর সাথে বেয়াদবি করার ফল এরূপই হয়ে থাকে।