📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 গাধা ও খচ্চরের নিষেধাজ্ঞা

📄 গাধা ও খচ্চরের নিষেধাজ্ঞা


নিষিদ্ধ খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত গৃহপালিত গাধা ও খচ্চর। আল্লাহ বলেন: خَلَقَ الْخَيْلَ وَالْبِغَالَ وَالْحَمِيرَ لِتَرْكَبُوهَا وَزِينَةً . তোমাদের আরোহণের জন্য ও সৌন্দর্যের জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা।' (সূরা নাহল: আয়াত ৮)।
এ ধারণা ঠিক নয় যে, হারাম খাদ্যের বিবরণ সংবলিত আয়াতের অর্থ আয়াতে বর্ণিত তালিকার মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা সীমাবদ্ধ এবং এগুলো ছাড়া আর কিছুই হারাম নয়। কুরতুবি এ ধারণা খন্ডন করে বলেন: এ আয়াত মক্কায় নাযিল হয়। এরপর রসূলুল্লাহ (সা) যদি কোনো জিনিস হারাম করে থাকেন বা কুরআনে অন্য কিছু হারাম করা হয়ে থাকে, তবে তাও এর সাথে যুক্ত হবে। রসূলুল্লাহ্ যা হারাম করেন, তা রসূলের মুখ দিয়ে আল্লাহ্রই একটি বর্ধিত হুকুম। এটাই অধিকাংশ ফকিহ ও হাদিস বিশারদর অভিমত।
১. ইমাম আবুদাউদ ও ইমাম তিরমিযি মিকদাদ ইবনে মাদীকারাব (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'জেনে রেখ, আমাকে কিতাব দেয়া হয়েছে, সেই সাথে অনুরূপ আরো কিছু দেয়া হয়েছে। জেনে রেখ, অচিরেই কোনো ব্যক্তি পরিতৃপ্ত অবস্থায় তার সুসজ্জিত খাটে বসে হয়তো বলবে: 'তোমরা এই কুরআনকে আঁকড়ে ধর, এতে যা হালাল পাও, তা হালাল বলে মেনে নাও, আর এতে যা হারাম পাও, তা হারাম বলে মেনে নাও। (অর্থাৎ হাদিসকে অগ্রাহ্য করে কেবল কুরআনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে) জেনে রেখ, গৃহপালিত গাধা তোমাদের জন্য হালাল নয়, কর্তন দাঁতধারী হিংস্র জন্তুও হালাল নয় এবং চুক্তিবদ্ধ নাগরিকের হারানো বস্তুও তার মালিক তার দাবি ছেড়ে না নিলে হালাল নয়। কোনো ব্যক্তি কোনো জনগোষ্ঠীর অতিথি হলে তার আপ্যায়ন করা তাদের কর্তব্য। যদি না করে তবে তার অধিকার রয়েছে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিস তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক হলেও আদায় করার।'
২. আনাস (রা) সূত্রে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন খয়বর দখল করলেন, তখন আমরা কিছু গাধা পেলাম। তা থেকে কিছু জবাই করে রান্না করলাম। এ সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) ঘোষণা করলেন: সাবধান, আল্লাহ্ ও তার রসূল (সা) তোমাদেরকে এটা খেতে নিষেধ করেছেন। কেননা এটা অপবিত্র ও শয়তানের কাজ। তৎক্ষণাৎ ডেগচিগুলো উল্টে ফেলে দেয়া হলো। অথচ তখনো রান্না করা জিনিস তাতে টগবগ করছিল পাঁচটি সহিহ হাদিস গ্রন্থ।
৩. জাবির (রা) বলেন: খয়বরের যুদ্ধের দিন রসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে গাধা ও খচ্চর খেতে নিষেধ করেছেন, তবে ঘোড়া খেতে নিষেধ করেননি।
ইবনে আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ্ (সা) গৃহপালিত গাধার অনুমতি দিয়েছেন। তবে বিশুদ্ধ বর্ণনা এই যে, ইবনে আব্বাস এ ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বন করে বলেন: আমি জানিনা, গৃহপালিত গাধা মানুষের পরিবহনের উপকরণ বিধায় এটি নষ্ট হবে ভেবে রসূলুল্লাহ্ (সা) নিষেধ করেছেন, না খয়বরে যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাধা হারাম ঘোষণা করেছেন। (বুখারি)।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 হিংস্র পশু ও পাখি হারাম

📄 হিংস্র পশু ও পাখি হারাম


ইসলাম যে সব প্রাণী হারাম করেছে, তন্মধ্যে হিংস্র পশু ও পাখি অন্যতম। ইবনে আব্বাস (রা) সূত্রে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন: প্রত্যেক কর্তন দাঁত বিশিষ্ট হিংস্র পশু ও প্রত্যেক নখরধারী পাখি রসূলুল্লাহ্ (সা) নিষিদ্ধ করেছেন। কর্তন দন্তধারী জন্তু দ্বারা সেই সব জন্তু বুঝায়, যারা মানুষের জান ও মালের উপর দাঁত বের করে আক্রমণ চালায়, যেমন: বাঘ, সিংহ, কুকুর, নেকড়ে বাঘ, চিতা বাঘ, বন্য বিড়াল। এ সব অধিকাংশ ফকিহের মতে হারাম। ইমাম আবু হানিফার মতে গোশত খায় এমন প্রত্যেক জন্তুই হিংস্র জন্তু। হাতি, হায়েনা, বিড়াল, ইঁদুর এ সবই তাঁর নিকট হারাম। ইমাম শাফেয়ির মতে মানুষের উপর আক্রমণ করে এমন জন্তুই নিষিদ্ধ হিংস্র জন্তু, যথা সিংহ ও বাঘ।
ইমাম মালিক মুয়াত্তা গ্রন্থে আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'প্রত্যেক কর্তন দাঁতধারী হিংস্র জন্তু খাওয়া হারাম।' ইমাম মালিক হাদিসটি উদ্ধৃত করার পর বলেন: আমাদের নিকট এটাই কার্যকর মত। ইবনুল কাসেম বর্ণনা করেন, এগুলো খাওয়া মাকরূহ এবং এটাই অধিকাংশ সাহাবির মত। ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আবু হানিফার শিষ্যরা শিয়াল খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। আর ইবনে হাযম হাতি ও বেজী খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। বানর খাওয়া হারাম। আবু উমর বলেন: মুসলমানদের এ ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে যে, বানর খাওয়া জায়েয নেই। কেননা রসূলুল্লাহ্ (সা) ওটা খেতে নিষেধ করেছেন। নখধারী পাখি বলতে সেই সব পাখিকে বুঝানো হয়েছে, যারা তাদের নখর দ্বারা আক্রমণ করে, যেমন চিল, শকুন, ঈগল ইত্যাদি। অধিকাংশ আলিমের নিকট এগুলো হারাম, যদিও তা ময়লা ভক্ষণকারী না হয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ময়লা ভক্ষণকারী প্রাণী হারাম

📄 ময়লা ভক্ষণকারী প্রাণী হারাম


যে সকল উট, গরু, ছাগল, ভেড়া, মোরগ, মুরগি বা হাঁস ইত্যাদি মল খায়, তার উপর আরোহণ করা, তার গোশত খাওয়া ও তার দুধ পান করা হারাম।
১. ইবনে আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণিত: মল ভক্ষণকারী প্রাণীর দুধ পান করতে রসূলুল্লাহ (সা) নিষেধ করেছেন। -ইবনে মাজা ব্যতীত পাঁচটি সহিহ হাদিসগ্রন্থ। তিরমিযির মতে হাদিসটি সহিহ। আবু দাউদের বর্ণনা অনুযায়ী রসূলুল্লাহ (সা) মল ভক্ষণকারী প্রাণীর উপর আরোহণ করতে নিষেধ করেছেন।
২. আম্র ইবনে শুয়াইব (রা) বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) মল ভক্ষণকারী জন্তু ও গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে, ও তার উপর আরোহণ করতে নিষেধ করেছেন। (আহমদ, নাসায়ি, আবুদাউদ)।
তবে এ ধরনের প্রাণীকে কিছুকাল মল থেকে দূরে আটক রাখা হয়, পবিত্র খাবার খাওয়ানো হয়, আর তার ফলে তার গোশত পবিত্র হয়ে যায় এবং তার মলভক্ষণকারী নাম মুছে যায়, তবে হালাল হয়ে যাবে, কেননা হারাম হওয়ার কারণটি দূর হয়ে গেছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 জঘন্য জিনিস হারাম

📄 জঘন্য জিনিস হারাম


এই বিবরণের পাশাপাশি পবিত্র কুরআন একটা সর্বব্যাপী মূলনীতি দিয়ে হারাম নির্ণয়ের উপায় জানিয়ে দিয়েছে। সেটি সূরা আরাফের ১৫৭ নং আয়াতে রয়েছে: وَتُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَيثَ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ
অপবিত্র জিনিসগুলো হারাম করে দেবেন। পবিত্র জিনিস বলে সেই সব জিনিস বুঝানো হয়েছে, যা কোনো নিষিদ্ধকারী ওহির বাণী ছাড়াই মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে পবিত্র মনে করে ও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। মানুষ যদি স্বতস্ফূর্তভাবে অপবিত্র মনে করে তবে তা হারাম।
ইমাম শাফেয়ি ও হাম্বলি মযহাবের মতানুসারে পবিত্র জিনিস হচ্ছে, যা শুধু আরবরা অর্থাৎ জনপদ ও নগরবাসীরা পবিত্র মনে করে ও যার প্রতি আকৃষ্ট হয়, গ্রামবাসী ও বেদুইনরা নয়। তবে 'আদ্দরারিল মুযিয়া' গ্রন্থে বলা হয়েছে, সাধারণ জনগণ যাকে পবিত্র মনে করে, সেটাই পবিত্র, শুধু আরবরা বা অভিজাত এলাকার অধিবাসীরা নয়। উক্ত গ্রন্থে বলা হয়েছে:
'কোনো কারণ বশত: নয় এবং অনভ্যস্ততা বশত:ও নয়, বরং কেবলমাত্র স্বতস্ফূর্তভাবে নোংরা ও অপবিত্র মনে করার কারণে যে প্রাণীকে সাধারণ মানুষ অপবিত্র মনে করে, সেটাই অপবিত্র। আর যদি কিছু লোক অপবিত্র মনে করে এবং কিছু লোক অপবিত্র মনে না করে, তবে অধিকাংশ মানুষের মনোভাবই গ্রহণযোগ্য হবে, যেমন পোকা মাকড় ও বহু জীবজন্তু কোনো নির্দিষ্ট দলিল-প্রমাণ ছাড়াই জনসাধারণ খাওয়া বর্জন করেছে। বস্তুত: এ সব প্রাণী প্রধানত: নোংরা ও অপবিত্র মনে হওয়ার কারণে বর্জিত হয়েছে। এ সব নোংরা ও অপবিত্র জিনিসের মধ্যে থু থু, কফ, বীর্য, গোবর, উকুন ইত্যাদিও অন্তর্ভুক্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00