📄 ভ্রূণ আংশিকভাবে গঠিত ও আংশিকভাবে অগঠিত
مُضْغَة (মুদগাহ) এর পর্যায়ে ভ্রূণকে এবং এর অভ্যন্তরীণ কোন অঙ্গকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে এর অধিকাংশই গঠিত হয়েছে, কিন্তু অন্যান্য কিছু অংশ সম্পূর্ণরূপে গঠিত হয়নি।
প্রফেসর জনসনের মতে, আমরা ভ্রূণকে পূর্ণ সৃষ্টি হিসেবে বর্ণনাকালে আমরা কেবলমাত্র সৃজিত অংশেরই বর্ণনা করি। আমার যদি ভ্রূণকে অপূর্ণ সৃষ্টি হিসেবে বর্ণনা করি, তখন কেবল অপূর্ণ অংশেরই বর্ণনা করি। তাহলে, ভ্রূণ কী পূর্ণ সৃষ্টি না অপূর্ণ সৃষ্টি? নিম্নে বর্ণিত আয়াতে ভ্রূণের উৎপত্তির এই স্তর সম্পর্কে কুরআনের আয়াত "আংশিকভাবে গঠিত এবং আংশিকভাবে গঠিত হয়নি" অপেক্ষা কোন উত্তম বর্ণনা নেইঃ
"আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর রক্তপিণ্ড থেকে, এরপর পূর্ণাকৃতি বিশিষ্ট ও অপূর্ণাকৃতি বিশিষ্ট মাংসপিণ্ড থেকে, তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্য।" -সূরা হাজ্বঃ ৫
বৈজ্ঞানিকভাবে জানা যায় যে, বিকাশের প্রাথমিক ধাপে পার্থক্যসূচক কিছু কোষ এবং অপার্থক্যসূচক কিছু কোষ রয়েছে-অর্থাৎ কিছু অঙ্গ গঠিত এবং কিছু অঙ্গ তখনও অগঠিত।
কর্ণ ও চক্ষুঃ ক্রমান্বয়ে বিকাশমান মানব ভ্রূণের মধ্যে প্রথমে শ্রবণশক্তির অনুভূতি আসে। ২৪ সপ্তাহ পরে ভ্রূণ শব্দ শুনতে পায়। পরবর্তীতে দৃষ্টিশক্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয় এবং ২৮ সপ্তাহ পরে রেটিনা আলোর প্রতি সংবেদনশীল হয়। ভ্রূণে ইন্দ্রিয়ের বিকাশ সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতটিতে দেখা যায়ঃ
وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ
"এবং তোমাদেরকে দেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্তঃকরণ।” -সাজদাহঃ ৯
"আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি। সংমিশ্রিত শুক্রবিন্দু থেকে তাকে পরীক্ষা করার জন্য, এজন্য তাকে করেছি শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির অধিকারী।" -আদ-দাহরঃ ২
"তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের; কান, চোখ ও অন্তঃকরণ, তোমরা খুবই অল্প কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে থাক।” -আল-মুমিনূন : ৭৮
উপরোক্ত আয়াতসমূহে চোখের আগে কানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে কুরআনের বর্ণনা সম্পূর্ণরূপে মিলে যায়।
📄 হস্তাঙ্গুলির রেখাসমূহের ছাপ
أَيَحْسَبُ الْإِنسَانُ أَلَّن نَّجْمَعَ عِظَامَهُ - بَلَىٰ قَادِرِينَ عَلَىٰ أَنْ نُّسَوِّيَ بَنَانَهُ
"মানুষ কী মনে করে যে, আমি কখনো তার অস্থিসমূহ একত্রিত করব না? হ্যাঁ, আমি তার আংগুলগুলো সঠিকভাবে পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম,।" -আল-ক্বিয়ামাহঃ ৩-৪
মৃত মানুষের হাড়গুলো মাটির মধ্যে বিভিন্ন অংশে খণ্ডিত ও বিভক্ত হওয়ার পরেও এগুলোর পুনরুত্থান এবং বিচারের দিন সকল মানুষকে পৃথক পৃথক কিভাবে চিহ্নিত করা হবে সে ব্যাপারে কাফেররা প্রশ্ন করে। আল্লাহ উত্তর দেন যে, তিনি কেবলমাত্র আমাদের হাড়গুলোকে একত্রিত করা নয় বরং আমাদের আঙ্গুলের ছাপও নিখুঁতভাবে পুনরায় তৈরি করতে সক্ষম।
পৃথক পৃথকভাবে মানুষের ব্যক্তি পরিচয় নির্ধারণের কুরআন কেন বিশেষভাবে আঙ্গুলের ছাপে কথা বলেছে? ১৮৮০ সালে স্যার ফ্র্যান্সিস গোল্টন-এর গবেষণায় ফলাফলের উপর ভিত্তি করে পরিচয় নির্ধারণে আঙ্গুলের ছাপ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সারা দুনিয়ায় দু'ব্যক্তি এমনকি অভিন্ন দুই জমজও নেই যাদের আঙ্গুলের ছাপ সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। এ কারণে সমগ্র বিশ্বব্যাপী পুলিশবাহিনী অপরাধীদের শনাক্ত করতে আঙ্গুলের ছাপ পরীক্ষা করে।
১৪'শ বছর পূর্বে প্রত্যেক মানুষের আঙ্গুলের ছাপের অনন্যতা সম্পর্কে কে জানত? নিশ্চিতভাবে এটা সর্বজ্ঞানী সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ জানত না!
📄 ত্বকে ব্যথা উপলব্ধিকারী উপকরণের উপস্থিতি
ধারণা করা হত যে, অনুভূতি ও ব্যথার উপলব্ধি শুধুমাত্র মস্তিষ্কের উপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, ত্বকে ব্যথা উপলব্ধিকারী উপকরণ বিদ্যমান রয়েছে, যা ছাড়া কোন ব্যক্তি ব্যথা উপলব্ধি করতে পারে না।
আগুনের পোড়ার ফলে ক্ষতে আক্রান্ত কোন রোগীর চিকিৎসায় ডাক্তার একটি সরু পিনের সাহায্যে পোড়ার মাত্রা পরীক্ষা করেন। রোগী ব্যথা অনুভব করলে ডাক্তার খুশি হন, কেননা এতে বোঝে নেন যে অগ্নিক্ষতটি অগভীর এবং ব্যথা উপলব্ধিকারী উপকরণ অক্ষত রয়েছে। কিন্তু রোগী ব্যথা অনুভব না করলে, বোঝে নেন যে, অগ্নিক্ষতটি গভীর এবং ব্যথা উপলব্ধিকারী উপকরণ নষ্ট হয়ে গেছে।
আয়াতে কুরআন ব্যথা উপলব্ধিকারী উপকরণের অস্তিত্বের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়ঃ
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُم بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ
"যারা আমার আয়াতসমূহকে প্রত্যাখ্যান করে, নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে আগুনে দগ্ধ করব, যখন তাদের গায়ের চামড়া দগ্ধ হবে, আমি সেই চামড়াকে নতুন চামড়া দ্বারা বদলে দেব যেন তারা (শাস্তির পর) শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়। -আন-নিসা: ৫৬
থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবদেহের গঠনসংক্রান্ত বিজ্ঞান (Anatomy) বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাগাতাত তেজাসেন ব্যথা উপলব্ধিকারী উপকরণের উপর দীর্ঘদিন ব্যাপী গবেষণা করেছেন। প্রথমে তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি যে, এই বৈজ্ঞানিক সত্যই কুরআন ১৪০০ বছর পূর্বে উল্লেখ করে গেছে। পরবর্তীতে তিনি কুরআনের এই বিশেষ আয়াতটির অনুবাদ পরীক্ষা করেন।
প্রফেসর তেজাসেন কুরআনের আয়াতের বৈজ্ঞানিক যথার্থতায় এত বেশি মুগ্ধ হন যে, রিয়াদে অনুষ্ঠিত কুরআন ও হাদীসের বৈজ্ঞানিক নিদর্শন বিষয়ক অষ্টম সৌদি চিকিৎসা সম্মেলনে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন:
لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ
"আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।"
📄 কুরআন ও বৈজ্ঞানিক সত্য
কুরআনে বৈজ্ঞানিক সত্যগুলোর উপস্থিতিকে সমকালীনতা হিসেবে অভিহিত করা সাধারণ জ্ঞান ও সত্যিকার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর বিরোধী।
প্রকৃতপক্ষে কুরআনের আয়াতের বৈজ্ঞানিক যথার্থতা কুরআনের উন্মুক্ত ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করে।
سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ ۗ أَوَلَمْ يَكْفِ بِرَبِّكَ أَنَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ
আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব দূর দিগন্তে (অর্থাৎ দূর পর্যন্ত ইসলামের আলো বিচ্ছুরিত হবে) আর তাদের নিজেদের মধ্যেও (অর্থাৎ কাফিররা নতজানু হয়ে ইসলাম কবুল করবে) যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ কুরআন সত্য। এটা কী যথেষ্ট নয় যে, তোমার প্রতিপালক সব কিছুরই সাক্ষী। -হামীম সিজদাহঃ ৫৩
আয়াতটির মাধ্যমে কুরআন সকল মানুষকে এ বিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে ভাবতে বলেঃ
"নিশ্চয় আসমান ও যমীন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে, নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানী লোকদের জন্যে।"
কুরআনের বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য প্রমাণ এটি যে আল্লাহর ওহী তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। ১৪০০ বছর পূর্বে কোন মানুষের দ্বারা এরূপ নিগূঢ় বৈজ্ঞানিক সত্য সম্বলিত বই রচনা সম্ভব ছিল না।
কুরআন অবশ্য বিজ্ঞানের কোন গ্রন্থ নয়, বরং নিদর্শন গ্রন্থ। এ নিদর্শনগুলো মানুষকে পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব ও প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে বাস করার উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে শেখায়। কুরআন সত্যিকারভাবে সমগ্র বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ও রক্ষক আল্লাহর বাণী। এতে আল্লাহর একত্ববাদের বাণী রয়েছে যা আদম, মূছা, ঈসা ও মুহাম্মদ (সা.) সহ সকল নবী ও রাসূল প্রচার করেছিলেন ও যার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের জন্য দৃঢ়ভাবে সকলকে আহ্বান করেছিলেন।
'কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান' বিষয়ে বিস্তারিত বহু বৃহৎ গ্রন্থ লেখা হয়েছে এবং এ নিয়ে আরও অনেক গবেষণা চলছে। ইনশাআল্লাহ, এই গবেষণা মানবজাতিকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর আরও সন্নিকটে আসতে সাহায্য করবে। এই ক্ষুদ্র পুস্তিকাটিতে শুধুমাত্র কুরআনের বৈজ্ঞানিক সত্যগুলোর কয়েকটি উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য, আমি বিষয়টিতে পূর্ণ গবেষণা করতে পেরেছি বলে দাবী করি না।
কুরআনে উল্লিখিত একটিমাত্র বৈজ্ঞানিক নিদর্শনের শক্তির কারণে প্রফেসর তেজাসেন ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কুরআন যে আসমানী গ্রন্থ তা নিশ্চিত হতে প্রমাণস্বরূপ কারো প্রয়োজন হতে পারে ১০ টি নিদর্শন, আবার কারো ১০০ টি নিদর্শন। আবার কেউ ১০০০ নিদর্শন দেখার পরও সত্য (ইসলাম) গ্রহণ করবেনা। নীচের আয়াতে কুরআন এ ধরণের বন্ধ মানসিকতার নিন্দা করে:
صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ
"তারা বধির, বোবা ও অন্ধ। সুতরাং তারা ফিরে আসবে না।"-বাকারাহঃ ১৮
ব্যক্তি ও সমাজের জন্য কুরআন একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। আলহামদুলিল্লাহ, সম্পূর্ণ অজ্ঞতার ভিত্তিতে আধুনিক মানুষের তৈরি বিভিন্ন মতবাদের চেয়ে কুরআনের জীবনব্যবস্থা অনেক বেশি উন্নত। সৃষ্টিকর্তার চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভাল পথনির্দেশনা আর কে প্রদান করতে পারে?।
আমি দো'আ করি, আল্লাহ যেন এ সামান্য প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন, আমি তাঁর কাছে ক্ষমা ও হিদায়াত প্রার্থনা করি। (আমীন)
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়াবিহামদিকা আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লা আনতা ওয়া আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইহি।