📄 তরল পদার্থের নির্যাস (সুলালাহ)
ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِن سُلَالَةٍ مِّن مَّاءٍ مَّهِينٍ
"অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেন, তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে।" -সূরা সাজদাহ : ৮
আরবী শব্দ سُلَالَة 'সুলালাহ' মানে তরল পদার্থের নির্যাস বা অবিভক্ত কোন বস্তুর সর্বোত্তম অংশ।
আমরা এখন জানতে পেরেছি যে, পুরুষের দেহে উৎপন্ন কয়েক মিলিয়ন শুক্রাণু থেকে ডিম্বাণুতে প্রবেশকারী একটি মাত্র শুক্রাণুই নিষিক্তকরণের জন্য প্রয়োজন হয়। কয়েক মিলিয়ন থেকে ঐ একটি মাত্র শুক্রাণুকেই কুরআনে 'সুলালাহ' বলা হয়েছে। আমরা বর্তমানে এটাও জানতে পেরেছি যে, নারীদেহে উৎপন্ন দশ হাজারের অধিক ডিম্বাণু থেকে একটি মাত্র ডিম্বাণুই নিষিক্ত হয়। দশ হাজার ডিম্বাণু থেকে ঐ একটি ডিম্বাণুকে কুরআনে 'সুলালাহ' বলা হয়েছে। তরল পদার্থ থেকে সুষমভাবে বের করে আনার অর্থেও 'সুলালাহ' শব্দটি ব্যবহৃত হয়। তরল পদার্থ দ্বারা জননকোষ ধারণকারী নারী ও পুরুষের ডিম্বাণু ও শুক্রাণু সংক্রান্ত তরল পদার্থকে বুঝায়। ডিম্বাণু উভয়কে নিষিক্তকরণের প্রক্রিয়ায় সুষমভাবে তাদের নিজস্ব পরিমণ্ডল থেকে বের করে আনা হয়।
📄 মিশ্রিত তরল পদার্থ (নুতফাতুন আমশা-জ)
নীচের আয়াতটির দিকে লক্ষ্য করা যাক:
إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن نُّطْfَةٍ أَمْشَاجٍ
"আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে।” (আদ-দাহরঃ ২
আরবী শব্দ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ (নুতফাতুন আমশাজ)-এর অর্থ হচ্ছে, মিশ্রিত তরল পদার্থ। কুরআনের অনেক তাফসীরকারকের মতে, মিশ্রিত তরল পদার্থ বলতে পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ জাতীয় ধারক বা তরল পদার্থকে বোঝায়। নারী ও পুরুষের ডিম্বাণু ও শুক্রাণু মিশ্রিত হওয়ার পরেও ভ্রূণ নুতফা আকারে অবস্থান করে। মিশ্রিত তরল পদার্থ বলতে শুক্রাণুজাতীয় তরলকেও বুঝানো হতে পারে যা বিভিন্ন লালাগ্রন্থির নিঃসৃত রস হতে আসে। সেহেতু, نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ (নুতফাতুন আমশাজ)- এর অর্থ দাঁড়ায়, নারী ও পুরুষের ডিম্বাণু ও শুক্রাণু এবং এগুলোর চতুর্পার্শ্বের তরল পদার্থের কিছু অংশ।
📄 ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ
ডিম্বাণুর প্রকৃতি দ্বারা নয় বরং শুক্রাণুর প্রকৃতি দ্বারাই ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারিত হয়ে থাকে। শিশুটি পুরুষ বা স্ত্রী কী হবে তা 'XX' বা 'XY' জাতীয় ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের উপর নির্ভর করে। ডিম্বাণু নিষিক্তকারী শুক্রের লিঙ্গ-ক্রোমোজোমের উপর ভিত্তি করে নিষিক্তকরণের সময়েই প্রাথমিকভাবে লিঙ্গ নির্ধারিত হয়। যদি 'X' বহনকারী শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে, তাহলে ভ্রূণ হয় স্ত্রীলিঙ্গ এবং যদি 'Y' বহনকারী শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে, তাহলে ভ্রূণ হয় পুংলিঙ্গ।
কুরআন মাজীদে আল্লাহপাক বলেন-
وَأَنَّهُ خَلَقَ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالْأُنثَىٰ - مِن نُّطْفَةٍ إِذَا تُمْنَىٰ
"তিনিই সৃষ্টি করেন যুগল পুরুষ ও নারী, এক বিন্দু থেকে, যখন নির্গত হয়।" -সূরা আন্-নাজম্ঃ ৪৫-৪৬
আরবী শব্দ نُطْفَة (নুতফাহ) অর্থ, সামান্য পরিমাণ তরল এবং تُمْنَىٰ (তুমনা) অর্থ স্খলিত বা নির্গত হওয়া। সেহেতু, নুতফাহ দ্বারা শুক্রানুকেই বোঝানো হয় কারণ শুক্রই স্খলিত হয়।
কুরআন মাজীদে আল্লাহপাক আরো বলেন-
أَيَحْسَبُ الْإِنسَانُ أَن يُتْرَكَ سُدًى - أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِّن مَّنِيٍّ يُمْنَىٰ
"সে কী স্খলিত শুক্র ছিল না? অতঃপর সে ছিল রক্তপিণ্ড, অতঃপর (আল্লাহ) সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। অতঃপর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন যুগল, নর ও নারী।" -সূরা আল-ক্বিয়ামাহ : ৩৭-৩৯
এখানে আয়াতে مِّن مَّنِيٍّ يُمْنَىٰ শব্দ দিয়ে ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারনের জন্য দায়ী পুরুষ থেকে স্খলিত খুবই সামান্য পরিমাণ (এক ফোঁটা) শুক্রকে বুঝানো হয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ শাশুড়ীরা নাতি আকাঙ্ক্ষা করে এবং যদি নাতনী হয় তাহলে সেজন্য প্রায় পুত্রবধূকে দায়ী করে। যদি তারা জানত যে, নারীর ডিম্বাণু নয় বরং পুরুষের শুক্রের প্রকৃতি লিঙ্গ নির্ধারণ করে! যদি দোষারোপ করতে হয়, তাহলে পুত্রবধূদেরকে দোষারোপ না করে বরং তাদের ছেলেদেরকে দোষারোপ করা উচিত; কারণ কুরআন ও বিজ্ঞান উভয় পুরুষের শুক্রকে শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য দায়ী হিসেবে উল্লেখ করে!
📄 তিনটি পর্দার অভ্যন্তরে ভ্রূণ সুরক্ষিত
يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِّن بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلَاثٍ
"তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভে পর্যায়ক্রমে একের পর এক ত্রিবিধ অন্ধকারে।" -সূরা আল-যুমার: ৬
প্রফেসর ড. কেইথ মূরের মতে, কুরআনের এ তিন স্তরের অন্ধকার বলতে বোঝায়-
১) মায়ের গর্ভের সম্মুখের প্রাচীর
২) জরায়ুর প্রাচীর
৩) ভ্রূণের আবরণ অর্থাৎ ভ্রূণকে আবৃতকারী গর্ভফুলের অভ্যন্তরীণ অতি পাতলা পর্দা (অ্যামনিও-কোরিওনিক গর্ভফুল, ভ্রূণের পর্দা বা ঝিল্লি, অ্যামনিওটিক ফ্লুয়িড ইত্যাদি বলা হয়)