📄 পিঁপড়ার জীবনপ্রণালী ও যোগাযোগ
এপ্রসঙ্গে আল্লাহ পাক কোরআনে বলেন-
"আর সুলাইমানের সামনে তাঁর বাহিনীকে সমবেত করা হয়েছিল, জীন ও মানুষ ও পাখিদের থেকে; আর তাদের কুচকাওয়াজ করানো হলো। তারপর যখন তাঁরা পিঁপড়াদের উপত্যকায় এসেছিলেন তখন একজন পিঁপড়া বলল- "ওহে নমল জাতি! তোমাদের বাড়িঘরে ঢুকে যাও, সুলাইমান ও তাঁর বাহিনী যেন তাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের পিষে না ফেলে" -আন-নমলঃ ১৭-১৮
পিঁপড়াদের একে অপরের সাথে কথা বলা এবং উন্নত পর্যায়ের বার্তা আদান-প্রদান করার বিষয়টি কুরআনে বর্ণিত হওয়ার কারণে অতীতে কিছু মূর্খ মানুষ কুরআনকে রূপকথার গল্প হিসেবে আখ্যায়িত করে এর প্রতি ব্যঙ্গ- বিদ্রুপ করত। সাম্প্রতিক কালে গবেষণায় পিঁপড়ার জীবনপ্রণালী সম্পর্কে কিছু বাস্তবতা জানা গেছে, যে সম্পর্কে মানুষ পূর্বে জ্ঞাত ছিল না। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের জীবনপ্রণালীর সাথে যে প্রাণী বা কীটপতঙ্গের জীবনপ্রণালীর সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য রয়েছে তা হল পিঁপড়া। এ সম্পর্কে নীচের তথ্যগুলো থেকে বিষয়টির যথার্থতা প্রমাণ করা যায়:
(ক) মানুষের মতই তাদের মৃতদেহকে মাটিতে সমাহিত করে।
(খ) পিপীলিকাদের উন্নত পর্যায়ের শ্রম বিভাজন পদ্ধতি রয়েছে ফলে তাদের মধ্যে ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক, সর্দার (শ্রমিকদের প্রধান), শ্রমিক ইত্যাদি রয়েছে।
(গ) কোন কোন সময় তারা খোশগল্প করতে একত্রিত হয়।
(ঘ) নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য পিঁপড়াদের অত্যন্ত অগ্রসর পন্থা রয়েছে।
(ঙ) পিপীলিকারা নিয়মিত বাজার বসায় যেখানে তারা পণ্য বিনিময় করে।
(চ) শীতকালে তারা দীর্ঘদিনের জন্য খাদ্যশস্য মজুদ করে রাখে এবং খাদ্যশস্য অঙ্কুরিত হলে তারা শিকড় কেটে দেয়; মনে হয় তারা এটা বুঝতে পারে যে, খাদ্যশস্যকে অঙ্কুরিত অবস্থায় রেখে দিলে তা পচে যাবে। যদি তাদের মজুদকৃত খাদ্যশস্য বৃষ্টির কারণে ভিজে যায়, তাহলে তারা এগুলোকে রোদ্রে শুকাতে বাইরে যায় এবং শুকানোর পর আবার ভিতরে নিয়ে যায়; মনে হয় তারা এটাও জানে যে, আর্দ্রতায় খাদ্যশস্য অঙ্কুরিত হবে, ফলে তা পচে যাবে।
📄 চিকিৎসা বিজ্ঞান
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 মধু : মানুষের জন্য রোগমুক্তি
মৌমাছি বিভিন্ন প্রকারের ফুল ও ফলের রস আহরণ করে এবং নিজের শরীরের ভিতরে মধু তৈরির পর তা মোমের কোষে জমা করে। মাত্র কয়েক শতাব্দী পূর্বে মানুষ জানতে পেরেছে যে, মধু মৌমাছির পেট থেকে আসে। অথচ এ ধ্রুবসত্যটি ১৪০০ বছর আগে কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে:
يَخْرُجُ مِن بُطُونِهَا شَرَابٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِّلنَّاسِ
"তাদের পেট থেকে বেরিয়ে আসে একটি পানীয়, বিচিত্র যার বর্ণ, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য রোগমুক্তি।"
-আন-নাহল: ৬৯
আমরা শুধুমাত্র এখন এ ব্যাপারে অবহিত যে, মধুর রোগ নিরাময়ের গুণ রয়েছে এবং এটা মৃদু অ্যান্টিসেপটিক জাতীয় (বিশেষত জীবাণু নাশ করে ক্ষত ইত্যাদির পচন রোধ করতে পারে এমন রাসায়নিক পদার্থকে অ্যান্টিসেপটিক বলে)। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে রাশিয়ানরা ক্ষত শুকানোর জন্য মধু ব্যবহার করত। মধুর ঘনত্বের কারণে ক্ষত স্থানে কোন ছত্রাক বা ব্যাকটিরিয়া জন্মাতে পারে না।
ইংল্যান্ডের নার্সিং হোমে ২২ জন দুরারোগ্য বক্ষব্যাধি এবং অ্যালঝেইমার্স আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসার জন্য সন্ন্যাসিনী সিস্টার ক্যারোলির দ্বারস্থ হয় এবং তাদের চিকিৎসায় নাটকীয় উন্নতি পরিলক্ষিত হয়, কারণ তিনি এদের চিকিৎসায় 'propolis' নামক একটি বিশেষ ধরণের উপাদান ব্যবহার করেন যা মৌমাছি মধুকোষকে ব্যাকটিরিয়ার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে উৎপন্ন করে।
বিশেষ গাছের এলার্জিতে আক্রান্ত কোন ব্যক্তিকে সেই গাছের মধু খাওয়ালে তার সেই এলার্জির প্রতিরোধক্ষমতা বাড়বে। মধু শর্করা (বহু ফলে ও মধুতে যে ধরণের চিনি পাওয়া যায়) ও ভিটামিন 'K' সমৃদ্ধ।
মধুর উৎস ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কুরআন ধারণকৃত জ্ঞান কুরআন আসার কয়েক শতাব্দী পরে আবিষ্কৃত হয়েছে।
📄 ভ্রুণতত্ত্ব
কয়েক বছর আগে ইয়েমেনের প্রখ্যাত পণ্ডিত শাইখ আবদুল মাজিদ আযিনদানীর নেতৃত্বে একদল মুসলিম বিদ্বান কুরআন ও হাদীস থেকে ভ্রূণ বিজ্ঞানে তথ্য ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে ইংরেজীতে অনুবাদ করেন। সেক্ষেত্রে তারা কুরআনের এ উপদেশকে দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করেনঃ
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
"অতএব জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর, যদি তোমাদের জানা না থাকে।"
কুরআন ও হাদীস থেকে ভ্রূণসংক্রান্ত সকল তথ্য একত্রিত করে তা ইংরেজীতে অনুবাদের পর এগুলো সম্পর্কে মন্তব্যের জন্য কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্রূণতত্ত্বের অধ্যাপক ও 'Anatomy' (জীবদেহের গঠনসংক্রান্ত বিজ্ঞান) বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. কেইথ মূরের কাছে নেয়া হয়। বর্তমান যুগে সমগ্র বিশ্বের মধ্যে তিনি ভ্রূণতত্ত্বে সর্বোচ্চ প্রামাণ্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষক।
সেখানে উপস্থাপিত বিষয়বস্তু সর্ম্পকে তাঁর মত প্রদান করতে তাঁকে অনুরোধ করা হয়। সতর্কতার সাথে সেগুলো যাচাই করার পর ড. মূর বলেন যে, ভ্রূণতত্ত্ব সম্পর্কে কুরআনে ও হাদীসে উল্লিখিত অধিকাংশ তথ্য ভ্রূণতত্ত্বের আধুনিক আবিষ্কারের সাথে হুবহু মিলে যায় এবং কোনক্রমেই এগুলোর মধ্যে পার্থক্য করা যায় না। তিনি আরও বলেন, কিছু আয়াত রয়েছে যার বৈজ্ঞানিক যথার্থতা সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করতে অপারগ। সেগুলো সত্য না মিথ্যা তাও তিনি বলতে পারেননি, কারণ ঐ আয়াতগুলোতে বর্ণিত তথ্যসমূহ সম্পর্কে তিনি নিজেই জ্ঞাত নন। তাছাড়া আধুনিক ভ্রূণবিদ্যায় ও ভ্রূণবিদ্যা সংক্রান্ত আধুনিক লেখায় তথ্যগুলো সম্পর্কে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। ভ্রূণবিজ্ঞান হচ্ছে মানুষের জন্মের পূর্বের বিকাশ সম্পর্কিত জ্ঞানালোচনা।
তেমনি একটি আয়াত হল:
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ - خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ
"পড়ুন আপনার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।" -সূরা আলাকঃ ১-২
আরবী শব্দ عَلَق ('আলাক্ব') এর অর্থ 'জমাট রক্ত' ছাড়াও আরেকটি অর্থ রয়েছে, তা হল, জোঁকের মত এক প্রকার বস্তু যা দৃঢ়ভাবে আটকে থাকে।
ড. মূর জানতেন না যে, প্রাথমিক দশায় একটি ভ্রূণকে জোঁকের মত দেখায় কিনা। একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্রের (Microscope) সাহায্যে তিনি ভ্রূণের প্রাথমিক দশা পরীক্ষা করতে গবেষণা শুরু করেন এবং দেখেন যে, প্রাথমিক দশায় ভ্রূণের আকৃতির সাথে একটি জোঁকের আকৃতি মিল রয়েছে। এ দুইয়ের মধ্যে বিস্ময়কর মিল দেখে তিনি অভিভূত হন। একইভাবে ভ্রূণতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর অজানা অনেক জ্ঞান তিনি কুরআন থেকে লাভ করেন।
কুরআন ও হাদীসে উল্লিখিত ভ্রূণতাত্ত্বিক তথ্য সম্পর্কে ড. মূর আশিটির মত প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রফেসর মূর বলেন, ভ্রূণসংক্রান্ত বিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কারের সাথে কুরআন ও হাদীসে উল্লিখিত তথ্যগুলো সম্পূর্ণ সংগতিশীল; কিন্তু যদি ত্রিশ বছর পূর্বে আমাকে এই প্রশ্নগুলো করা হত, তাহলে আমি বৈজ্ঞানিক তথ্যের অভাবে এগুলোর অর্ধেকেরও উত্তর দিতে পারতাম না।
১৯৮১ সালে সৌদি আরবের দাম্মামে অনুষ্ঠিত সপ্তম চিকিৎসা সম্মেলনে তিনি বলেন, 'কুরআনের মাধ্যমে মানুষের বিকাশ সম্পর্কিত তথ্যের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে সাহায্য করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। মুহাম্মাদ (সা.)-এর কাছে এগুলো যে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে তা আমার কাছে পরিষ্কার, কারণ এগুলোর অধিকাংশ জ্ঞান বহু শতাব্দি পরেও আবিষ্কৃত হয়নি। তাছাড়া আমার কাছে এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, মুহাম্মাদ (সা.) অবশ্যই আল্লাহর নবী।
আগে ড. মূর 'The Developing Human' নামে একটি বই রচনা করেছিলেন। কুরআন থেকে নতুন জ্ঞান অর্জনের পর তিনি ১৯৮২ সালে বইটির তৃতীয় সংস্করণ লিখেন। একক লেখকের চিকিৎসা বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ বই হিসেবে বইটি পুরষ্কৃত হয়। বইটি বিশ্বের বহুভাষায় অনুদিত হয়েছে এবং চিকিৎসাশাস্ত্রের (Medical) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ভ্রূণতত্ত্বের পাঠ্য বই হিসেবে বিবেচিত হয়।
আমেরিকার হিউস্টনের বেইলার কলেজ অভ্ মেডিসিনের ধাত্রীবিদ্যা এবং স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. জো লিগ সিম্পসান বলেন যে, মুহাম্মাদের বর্ণিত হাদীসগুলো সপ্তম শতাব্দীতে বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক সত্যের ভিত্তিতে সংগৃহীত হয়নি। তাই পরবর্তীতে দেখা যায় যে, ধর্মের (ইসলামকে ইঙ্গিত করে) সাথে বংশগতিবিষয়ক বিজ্ঞান বা প্রজনন-শাস্ত্রের কোন পার্থক্য নেই; উপরন্ত প্রচলিত বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে ধর্ম (ইসলাম) তাঁর বিস্ময়কর জ্ঞানকে যুক্ত করার মাধ্যমে বিজ্ঞানকে পথ দেখাতে পারে... কুরআনে উল্লিখিত তথ্যগুলো কয়েক শতাব্দি পরে যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে, যা কুরআনের জ্ঞান ইশ্বর (আল্লাহ) থেকে আসার কথাই প্রমাণ করে।