📄 পাহাড়-পর্বত দৃঢ়ভাবে প্রোথিত
পৃথিবীর উপরিভাগ বহুসংখ্যক দৃঢ় প্লেটে বিভক্ত যার ঘনত্ব প্রায় ১০০ কি. মি.। অ্যাসথেনোস্ফিয়ার নামে অংশত গলিত মণ্ডলে এই প্লেটগুলো ভাসমান। প্লেটগুলোর সীমানায় পাহাড়-পর্বত গঠিত হয়। পৃথিবীর কঠিন উপরিতল সমুদ্রের ৫ কি. মি. নীচ পর্যন্ত বিস্তৃত, এবং বৃহৎ পাহাড়-পর্বতের প্রায় ৮০ কি. মি. নীচ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সুদৃঢ় ভিত্তির উপর পাহাড়-পর্বত দৃঢ়, নিশ্চল রয়েছে। তাছাড়া পবিত্র কুরআনে পাহাড়-পর্বতের ভূমিকা সম্পর্কে বলা হয়েছে:
وَالْجِبَالَ أَرْسَاهَا
"তিনি পাহাড়-পর্বতকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।" -সূরা আন-নাযি'আতঃ ৩২
একই রকম বর্ণনা কুরআনের অন্যান্য আয়াতেও রয়েছে।
"তারা কী লক্ষ্য করে না পাহাড়ের দিকে যে, তা কিভাবে স্থাপন করা হয়েছে?" -সূরা আল-গাশিয়াহঃ ১৯
"তিনি পৃথিবীতে পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, যাতে এটি তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে।" -সূরা লুকমানঃ ১০
"এবং তিনি পৃথিবীর উপর বোঝা রেখেছেন যেন তা তোমাদেরকে নিয়ে হেলে না পড়ে।" -সূরা নাহল: ১৫
এভাবেই পাহাড়-পর্বতের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কুরআনে বর্ণিত তথ্যসমূহ ভূতত্ত্ব বিদ্যার সাম্প্রতিক আবিষ্কারের সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ।
📄 সমুদ্রের গভীরে অন্ধকার
প্রফেসর দুর্গা রাও, বিশ্ববিখ্যাত অভিজ্ঞ সামুদ্রিক ভূতত্ত্ববিদ এবং জেদ্দার 'King Abdul Aziz University'-এর প্রফেসর তাঁকে নীচের আয়াতের উপর মন্তব্য করতে বলা হয়েছিল:
أَوْ كَظُلُمَاتٍ فِي بَحْرٍ لُّجِّيٍّ يَغْشَاهُ مَوْجٌ مِّن فَوْقِهِ مَوْجٌ مِّن فَوْقِهِ سَحَابٌ ۚ ظُلُمَاتٌ بَعْضُهَا فَوْقَ بَعْضٍ إِذَا أَخْرَجَ يَدَهُ لَمْ يَكَدْ يَرَاهَا ۗ وَمَن لَّمْ يَجْعَلِ اللَّهُ لَهُ نُورًا فَمَا لَهُ مِن نُّورٍ
"অথবা (তাদের কর্ম) প্রমত্ত সমুদ্রের বুকে গভীর অন্ধকারের ন্যায়, যাকে উদ্বেলিত করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ, যার উপরে ঘন কালো মেঘ আছে। একের উপর এক অন্ধকার। যখন সে তার হাত বের করে, তখন সে তাকে একেবারেই দেখতে পায় না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দেন না, তার কোন জ্যোতি নেই।" -সূরা আন-নূর ৪০
প্রফেসর রাও বলেন, সমুদ্রের গভীরে অন্ধকার সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা অতিসম্প্রতি আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে নিশ্চিত হতে পেরেছে। কোন কিছুর সাহায্য ব্যাতিরেকে মানুষ ২০ মিটার থেকে ৩০ মিটারের অধিক পানির নীচে মানুষ ডুব দিতে পারে না এবং মহাসাগরীয় অঞ্চলসমূহের ২০০ মিটারের অধিক পানির নীচে বাঁচতে পারে না। এই আয়াতটি সকল সমুদ্রের দিকে নির্দেশ করে না, কারণ সব সমুদ্রের পুঞ্জীভূত অন্ধকারের স্তর নেই। আয়াতটি শুধুমাত্র গভীর সমুদ্র সম্পর্কে বলা হয়েছে, "এক বিশাল গভীর সমুদ্রের অন্ধকার"। দুটি কারণের স্বাভাবিক ফল হচ্ছে একটি গভীর সমুদ্রের এই স্তরবিশিষ্ট অন্ধকার:
১. রংধনুতে সাতটি রংয়ের সমন্বিত একটি আলোক রশ্মি দৃশ্যমান হয়। রংগুলো হল-বেগুনী, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল (বেনীআসহকলা)। আলোক রশ্মিটি পানিকে ভেদ করার সময় প্রতিসরণ (রশ্মি বাঁকিয়ে যাওয়ার নাম প্রতিসরণ) ঘটে। উপরিভাগের ১০ মিটার থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত পানি প্রায় লাল রং শোষণ করে নেয়। সে কারণে কোন ডুবুরি পানির ২৫ মিটার নীচুতে আহত হলে সে তার রক্তের লাল রং দেখতে পায় না, কেননা ঐ গভীরতায় লাল রং পৌঁছে না। একইভাবে কমলা রং ৩০ মিটার থেকে ৫০ মিটারের মধ্যে, হলুদ রং ৫০ থেকে ১০০ মিটারের মধ্যে, সবুজ রং ১০০ থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে এবং সবশেষে আসমানি রং ২০০ মিটার এবং বেগুনী ও নীল রং ২০০ মিটারের অধিক দূরত্ব অতিক্রমের পর শোষিত হয়। বিভিন্ন স্তরে রংগুলোর ক্রমাগত শোষিত হবার ফলে ক্রমশ সমুদ্র অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় অর্থাৎ আলোর স্তর অন্ধকারে পরিণত হয়। পানির ১০০০ মিটার গভীরতার নীচে সম্পূর্ণ অন্ধকার।
২. সূর্যের রশ্মি মেঘ দ্বারা শোষিত হয়ে বিক্ষিপ্ত আলোতে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে মেঘের নীচে অন্ধকারের একটি স্তর তৈরি করে। যা অন্ধকারের প্রথম স্তর। যখন আলোক রশ্মি সমুদ্রের উপরিভাগে পৌঁছে তখন তা পৃষ্ঠভাগের ঢেউয়ের সাথে প্রতিফলিত হয়ে এটিকে আলোকিত করে তোলে। সেহেতু ঢেউগুলোই আলোকে প্রতিফলিত করে এবং অন্ধকারের সৃষ্টি করে। অপ্রতিফলিত আলো সমুদ্রের গভীরতায় প্রবেশ করে। তাই সমুদ্রের দুটি অংশ রয়েছে। এর উপরিভাগ আলোয় ও উষ্ণায়িত এবং গভীরতায় অন্ধকার। ঢেউয়ের কারণে সমুদ্রের গভীর অংশ থেকে উপরিভাগ ভিন্ন।
অভ্যন্তরীণ ঢেউয়ের মধ্যে সাগর ও মহাসাগরের গভীর পানি অন্তর্ভুক্ত কারণ গভীর সমুদ্রের পানির ঘনত্ব তার উপরিভাগের পানির চেয়ে বেশি। অভ্যন্তরীণ ঢেউয়ের নীচ থেকেই অন্ধকার শুরু হয়। এমনকি গভীরসাগরে গভীরে বসবাসকারী মাছও কিছু দেখতে পায় না, নিজেদের শরীরের আলোই তাদের আলোর একমাত্র উৎস।
কুরআন এ বিষয়টি যথাযথভাবে বর্ণনা করে
"অথবা (তাদের কর্ম) প্রমত্ত সমুদ্রে গভীর অন্ধকারের মত, যাকে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ উদ্বেলিত করে।"
অপরকথায়, এ ঢেউগুলোর উপর বিভিন্ন রকমের ঢেউ রয়েছে, যেমন- মহাসাগরের উপরে যা পাওয়া যায়। কুরআনের আয়াতটি বলতে থাকে, "যার উপরে ঘন কালো মেঘ আছে। একের উপর এক অন্ধকার।”
মেঘগুলো একের উপর এক প্রতিবন্ধক যা পরবর্তীতে বিভিন্ন স্তরে রংয়ের শোষণের মাধ্যমে গভীর অন্ধকারের সৃষ্টি করে।
পরিশেষে প্রফেসর দুর্গা রাও এই বলেন যে, "১৪০০ বছর পূর্বে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে এ বিষয়টি এত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা সম্ভবপর নয়। তাই তথ্যগুলো অবশ্যই কোন অলৌকিক উৎস থেকে প্রাপ্ত।".
📄 জীব বিজ্ঞান প্রতিটি জীবকে পানি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে
কুরআনের আয়াতটিতে লক্ষ্য করি:
أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا ۖ وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ ۖ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ
"কাফেররা কী ভেবে দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি সৃষ্টি করলাম পানি থেকে। এরপরও কী তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না?" -সূরা আম্বিয়া: ৩০
বিজ্ঞানের অনেক অগ্রগতির কারণে বর্তমানে শতকরা ৮০ ভাগ পানি দ্বারা তৈরি কোষের সারবস্তু সাইটোপ্লাজম সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞান এটাও জানিয়েছে যে, অধিকাংশ জীবের গঠনে শতকরা ৫০-৯০ ভাগ পানি এবং প্রত্যেক জীবের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পানি অপরিহার্য। প্রত্যেক প্রাণী যে পানি থেকে সৃষ্টি তা ১৪ শতাব্দি পূর্বে কোন মানুষের পক্ষে কী অনুমান করা সম্ভবপর ছিল? আরবের মরুঅঞ্চলের কোন মানুষের পক্ষে এ ধরণের অনুমান কী কল্পনাযোগ্য হতো যেখানে সর্বদা পানির দুষ্প্রাপ্যতা ছিল?
কুরআনের পানি দ্বারা প্রাণীর সৃষ্টি সম্পর্কে বলা হয়েছে- وَاللَّهُ خَلَقَ كُلَّ دَابَّةٍ مِّن مَّاءٍ
"আল্লাহ প্রত্যেক প্রাণীকে পানি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।" -সূরা আন-নূরঃ ৪৫
নীচের আয়াতটি পানি দ্বারা মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে বলে-
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا فَجَعَلَهُ نَسَبًا وَصِهْرًا ۗ وَكَانَ رَبُّكَ قَدِيرًا
"তিনিই পানি থেকে মানবকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে রক্তগত, বংশ ও বৈবাহিক সম্পর্কশীল করেছেন। তোমার পালনকর্তা সবকিছু করতে সক্ষম।" -সূরা আল-ফুরক্বান: ৫৪
📄 অতিপারমাণবিক কণিকার অস্তিত্ব
'পরমাণুবাদ' প্রাচীনকালে একটি সুপরিচিত তত্ত্ব ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছিল। মূলত প্রায় ২৩ শতাব্দিকাল পূর্বে গ্রীকরা বিশেষতঃ গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস কর্তৃক এই তত্ত্বটি প্রস্তাবিত হয়েছিল। এই তত্ত্বটি মূলত গ্রীকরা প্রস্তাব করেছিল, তবে ডেমোক্রিটাস এবং তার পরবর্তী লোকেরা ধারণা করত যে, পরমাণু হচ্ছে বস্তুর ক্ষুদ্রতম একক। আরবরাও একই রকম বিশ্বাস করত। আরবী শব্দ ذَرَّة (জাররাহ)-এর অতিসাধারণ অর্থ হচ্ছে পরমাণু। বর্তমানে বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে যে, পরমাণু বিভাজ্য। পরমাণু যে বিভাজিত হতে পারে তা বিংশ শতাব্দির আবিষ্কার। এমনকি ১৪০০ বছর পূর্বে এই ধারণা আরবের কারও জানা ছিল না। সেজন্য ذَرَّة (জাররাহ) ছিল একটি সীমা যা কেউ অতিক্রম করতে পারত না। তথাপি নিচের আয়াতটি এই সীমা স্বীকার করে নাঃ
কাফিরগণ বলে-ক্বিয়ামত আমাদের নিকট আসবে না। বল, না, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমাদের নিকট তা অবশ্য অবশ্যই আসবে। তিনি যাবতীয় অদৃশ্যের জ্ঞানী। তাঁর থেকে লুক্কায়িত নেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুকণা, আকাশ ও পৃথিবীতে, না তার থেকে ছোট আর না তার থেকে বড় (কোনটাই নেই লুক্কায়িত)। সবই আছে (লাওহে মাহফুয নামক) এক সুস্পষ্ট কিতাবে। -সূরা সাবা: ৩
"আর তোমার প্রতিপালকের দৃষ্টির আড়ালে নেই এমন অণু পরিমাণ, যা আছে পৃথিবীতে, আর না আছে আসমানে, না তাথেকে ছোট বা না তাথেকে বড় কোন বস্তু, যা (লেখা) আছে এক সুস্পষ্ট কিতাবে। -সূরা ইউনূস: ৬১
এ আয়াত দ্বারা আল্লাহর অসীম জ্ঞান, তাঁর প্রকাশ্য ও গোপন সকল কিছুর জ্ঞানের কথাই বলে। তারপর এটি বলে যে, পরমাণু অপেক্ষা ক্ষুদ্র বা বৃহৎ সবকিছুর ব্যাপারে আল্লাহ সচেতন। এভাবে আয়াতটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, পরমাণু অপেক্ষা ক্ষুদ্র কোন কিছুর অস্তিত্ব রয়েছে, যে সত্যটি আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা অতি সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে।