📄 ছায়াপথ সৃষ্টির পূর্বে প্রাথমিক গ্যাস
বিজ্ঞানীরা একমত যে, বিশ্বে ছায়াপথ সৃষ্টির পূর্বে আকাশ সম্পর্কীয় বস্তুগুলি প্রাথমিকভাবে গ্যাস জাতীয় পদার্থের আকারে ছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ছায়াপথ তৈরির পূর্বে প্রচুর পরিমাণে গ্যাস পদার্থ অথবা মেঘ বিদ্যমান ছিল। আকাশ সম্পর্কীয় আদি পদার্থ বর্ণনা করতে 'ধোঁয়া' শব্দটি গ্যাসের চেয়ে বেশি উপযুক্ত। কুরআনের আয়াতে ব্যবহৃত 'দুখান' শব্দটি দ্বারা বিশ্বের এই অবস্থাকেই বুঝায় যার অর্থ ধোঁয়া।
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন-
ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ فَقَالَ لَهَا وَلِلْأَرْضِ ائْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا قَالَتَا أَتَيْنَا طَائِعِينَ
"তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ, তারপর তিনি তাকে এবং পৃথিবীকে বললেন, তোমরা আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। তারপর তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় এলাম।" -সূরা ফুসসিলাত: ১১
তাছাড়া 'বিগ ব্যাঙ' এর স্বাভাবিক পরিণতি হল এই ঘটনা এবং নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর পূর্বে এটি কারও কাছেই পরিচিত ছিল না। তাহলে, তখন এই জ্ঞানের উৎস কী হতে পারত?
📄 আন্তর্নাক্ষত্রিক বস্তুর অস্তিত্ব
পূর্বে মহাকাশের জ্যোতির্বিজ্ঞান পদ্ধতির সুসংগঠিত ধারণার বাইরের স্থানকে শূন্য মনে করা হত। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে এ আন্তর্নাক্ষত্রিক মহাশূন্যে বস্তুর সেতুর অস্তিত্বের সন্ধান পায়।
আদি-নীহারিকার অন্তঃস্থিত বস্তু সমূহের ঘনীভূত হওয়া এবং পরিণতিতে সেসব বিভক্ত হয়ে খণ্ড-বিখণ্ড হওয়াটাই ছিল বিশ্বসৃষ্টির মৌল প্রক্রিয়ার সূচনা পর্ব। এসব খণ্ডই পরে ছায়াপথের আদিতে পরিণত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে ছায়াপথের এই খন্ডগুলো আবারও খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে মহাকাশের অসংখ্য নক্ষত্র সৃষ্টি করে। এসব নক্ষত্র টুকরা টুকরা হয়ে পরবর্তী বস্তু অর্থাৎ গ্রহসমূহ সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রতিবারের এই সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় প্রতিটি মূল বস্তুতে কিছু না কিছু অবশিষ্টাংশ থাকে, সেগুলোকে বলা হয় 'ধ্বংসাবশেষ'। আর এগুলোর সঠিক বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে, 'আন্তর্নাক্ষত্রিক ছায়াপথ বস্তু'। এসব আন্তর্নাক্ষত্রিক বস্তু বিভিন্নভাবে পরিচিতি পায়, যেমন কিছু 'অবশিষ্ট' নীহারিকা রয়েছে, যেসব নীহারিকার মধ্যে অন্যান্য নক্ষত্র থেকে প্রাপ্ত আলোর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞান বিশারদদের ভাষায়, এসব নীহারিকা সম্ভবত 'ধূলি' অথবা 'ধোঁয়ার' দ্বারা পরিগঠিত। এছাড়াও এমন নীহারিকা রয়েছে, যেসব নীহারিকা অন্ধকারাচ্ছন্ন অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত কম ঘনীভূত। এসব নীহারিকায় আন্তর্নাক্ষত্রিক এমন সব বস্তু যা আকারে তেমন বৃহৎ নয়। তবুও তাদের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার কারণে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ফটোম্যাট্রিক গণনায় তাদের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এক প্রক্রিয়ায় এ ধরণের বস্তুর দ্বারা বিভিন্ন ছায়াপথের মধ্যে যে 'সেতু' গঠিত রয়েছে, সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নাই। এসব বস্তু তথা গ্যাস খুবই তরলিত আকারে বিদ্যমান। আমরা জানি যে, একটি ছায়াপথ থেকে আরেকটি ছায়াপথের দুরত্বকে প্লাজমা বলা হয়, যা সমান সংখ্যক মুক্ত ইলেকট্রন ও ধনাত্মক আধান বিশিষ্ট সম্পূর্ণ আয়নিত গ্যাস দিয়ে গঠিত। প্লাজমাকে অনেক সময় বস্তুর চতুর্থ অবস্থাও বলা হয় (অন্য পরিচিত তিনটি অবস্থা হচ্ছে-কঠিন, তরল এবং গ্যাস)। কুরআনে এই আন্তর্নাক্ষত্রিক বস্তুর উপস্থিতি সম্পর্কে বলেছে
الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا
"তিনিই সে সত্তা, যিনি সৃষ্টি করেছেন আকাশ, ও জমিন এবং যা এর মধ্যে আছে তা।" -সূরা আল-ফুরকান: ৫৯
তারপরও যদি কেউ বলে যে আন্তর্নাক্ষত্রিক ছায়াপথবর্তী বস্তুর উপস্থিতি ১৪০০ বছর আগেই জানা গিয়েছিল, তাহলে তা সবার জন্য হাস্যকর ব্যাপার ছাড়া কিছুই নয়!
📄 সম্প্রসারণশীল বিশ্ব
১৯৫২ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী 'এডউইন হাবল' পর্যবেক্ষণমূলক সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করেন যে, সকল ছায়াপথ একে অপর থেকে অপসৃত হচ্ছে বা দূরে সরে যাচ্ছে অর্থাৎ বিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য। কুরআন বিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে বর্ণনা করতে একই কথা বলেঃ
وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ
"আমি নিজ হাত দ্বারা আকাশ নির্মাণ করেছি এবং অবশ্যই আমি এর সম্প্রসারণকারী।" -সূরা যারিয়াত: ৪৭
ছায়াপথের ব্যবধান বিরাট। সেই নিরিখে, এসব তরলিত গ্যাস বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে। তাছাড়া এসব তরলিত গ্যাস ক্রমান্বয়ে গ্যাসপিণ্ডে পরিণত হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কোন কোন ক্ষেত্রে ঘনত্ব কম হলেও এসব গ্যাসপিণ্ড ছায়াপথ সমূহে অবস্থিত গ্যাসপিণ্ডের চেয়ে বিশাল হওয়াই স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে বিজ্ঞানী এ. বয়চট বলেন, আন্তঃছায়াপথ সংযোগকারী এসব গ্যাসপিণ্ডের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অত্যাধিক। কেননা, 'বিশ্বসৃষ্টির বিবর্তন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে যে ধারণা বর্তমানে চালু আছে, এসব সংযোগকারী গ্যাসপিণ্ড সে ধারণা অনেকাংশেই বদলে দিতে পারে।' (ড. মরিস বুকাইলি, বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান, ইন্টারনেট সংস্করণ, পৃথিবী ও বিশ্বের সৃষ্টি অধ্যায়)
আরবী শব্দ مُوسِعُونَ (মূসিউন)- এর সঠিক অনুবাদ করা হয় 'সম্প্রসারণকারী' হিসেবে, এবং বিশ্বের সম্প্রসারণশীল বিশালতার সৃষ্টির দিকেই এটি ইঙ্গিত করে।
অন্যতম খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তার 'সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস' (A Brief History of Time) নামক গ্রন্থে বলেন, "মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে", এ আবিষ্কারটি বিংশ শতাব্দির অন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব।" কিন্তু কুরআন এমন সময় বিশ্বের সম্প্রসারিত হবার কথা বলেছে, যখন মানুষ সামান্য টেলিস্কোপও আবিষ্কার করতে পারেনি।
কেউ কেউ বলতে পারেন যে, কুরআনে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক সত্যের উপস্থিতি বিস্মিত হওয়ার মত কিছু না, কারণ আরবজাতি জ্যোতির্বিজ্ঞানে অগ্রসর ছিল। জ্যোতির্বিদ্যায় আরবদের অগ্রসরতা স্বীকার করার ক্ষেত্রে তারা সঠিক। তবুও তারা এটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় যে, আরবজাতি জ্যোতির্বিজ্ঞানে অগ্রসর হওয়ার কয়েক শতাব্দি পূর্বেই কুরআন নাযিল হয়েছিল। তদুপরি, আরবরা তাদের বৈজ্ঞানিক অগ্রসরতার স্বর্ণ শিখরে অবস্থানকালে- বিগ ব্যাঙ-এর কারণে মহাবিশ্বের উৎপত্তি ছাড়াও উপরে উল্লেখিত অনেক বৈজ্ঞানিক সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। কুরআনে উল্লেখিত বৈজ্ঞানিক সত্যসমূহ তাই আরবদের জ্যোতির্বিজ্ঞানে অগ্রগতির ফল নয়। বরং বিপরীত মতটাই সত্য যে, কুরআনে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয় জ্ঞানালোচনা বিদ্যমান রয়েছে বলেই তারা জ্যোতির্বিজ্ঞানে অগ্রগতি সাধন করেছিল।
📄 ভূ-বিজ্ঞান
পানিচক্র: ১৫৮০ সালে বের্নার্ড প্যালিসি সর্বপ্রথম পানিচক্রের বর্তমান ধারণা প্রবর্তন করেন। ১. সমুদ্র থেকে পানির বাষ্পীভূত হওয়া এবং পরবর্তীতে তা ঠাণ্ডা হয়ে মেঘে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াটি তিনি ব্যাখ্যা করেন। মেঘমালা ভূখণ্ডের উপরে সমুদ্র দূরবর্তী স্থানে উঠে গিয়ে ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হয় এবং ক্রমান্বয়ে তা বৃষ্টি আকারে নীচে নেমে আসে। এই বৃষ্টির পানি বা জলাশয় ও নদীনালার মাধ্যমে পুনরায় সাগরে ফিরে আসে, বিরামহীনভাবে এই প্রক্রিয়াটির বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীতে মিলেটুসের থেলেস এ মতবাদ পোষণ করতেন যে, সমুদ্রের উপরিভাগের ছড়ানো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণাকে বাতাস ধারণ করে উপরে তুলে নেয় এবং সমুদ্র দূরবর্তী স্থানে নিয়ে তা বৃষ্টিরূপে ছড়িয়ে দেয়।
প্রাচীনকালের মানুষেরা ভূ-গর্ভস্থ পানির উৎস সম্পর্কে জানত না। তারা ভাবত যে, বাতাসের তোড়ে সমুদ্রের পানি দ্রুতগতিতে মহাদেশের অভ্যন্তরভাগে এসে পতিত হয়। তারা আরও বিশ্বাস করত যে, পানি একটি গোপন পথে বা অতল গহ্বরের মাধ্যমে ফিরে আসে। আর এপথ সমুদ্রের সাথে সংযুক্ত এবং এটিকে প্লেটোর যুগ থেকে 'টারটারুস' বলা হয়েছে। ২ এমনকি ১৮০০ শতাব্দির বিখ্যাত চিন্তাবিদ দেকার্তও একই মত দিতেন। উনবিংশ শতাব্দিতে (১৮৭৭ সাল অবদি) এরিস্টটলের তত্ত্ব সর্বত্র ব্যাপকভাবে বিদ্যমান ছিল। এ তত্ত্ব অনুসারে, ঠাণ্ডা পর্বতের গভীর গহ্বরে পানি ঘনীভূত হয়ে সেখানে এক গভীর ভূগর্ভস্থ হ্রদ সৃষ্টি হয় যা ঝর্ণা হয়ে প্রবাহিত হয়। বর্তমানে আমরা জানি যে, বৃষ্টির পানি মাটির ফাটল দিয়ে চুয়ে পড়াই এজন্য দায়ী।
নিম্নে বর্ণিত কুরআনের আয়াতগুলোতে পানিচক্র সম্পর্কে বলা হয়েছে:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَسَلَكَهُ يَنَابِيعَ فِي الْأَرْضِ ثُمَّ يُخْرِجُ بِهِ زَرْعًا مُّخْتَلِفًا أَلْوَانُهُ
"তুমি কী দেখনি যে, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, অতঃপর সে পানি যমিনের ঝর্ণাসমূহে প্রবাহিত করেছেন, এরপর তদদ্বারা বিভিন্ন রঙের ফসল উৎপন্ন করেন।" -সূরা যুমারঃ ২১
وَيُنَزِّلُ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَيُحْيِي بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ
"তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তদদ্বারা ভূমির মৃত্যুর পর তাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।" -সূরা আররুম: ২৪
وَأَنزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً بِقَدَرٍ فَأَسْكَنَّاهُ فِي الْأَرْضِ ۖ وَإِنَّا عَلَىٰ ذَهَابٍ بِهِ لَقَادِرُونَ
"আমি আকাশ থেকে পরিমাণ মত পানি বর্ষণ করে থাকি, অতঃপর আমি জমীনে সংরক্ষণ করি এবং তা অপসারণও করতে সক্ষম।” -সূরা মু'মিনূনঃ ১৮
১৪০০ বছর পূর্বে এমন কোন গ্রন্থ ছিল না যা পানিচক্র সম্পর্কে এমন নির্ভুল বর্ণনা দিতে পারে।