📄 হিকমাহ ও উত্তম উপদেশ
দাওয়াতদানকারীর বক্তব্য তর্ক-বিতর্ক কিংবা জ্ঞান-বুদ্ধির দাপট দেখানোর জন্যে হবে না। কথার জোরে প্রতিপক্ষকে জব্দ করার মনোভাব তার মধ্যে থাকতে পারবে না। বরঞ্চ তাকে অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য পন্থায় এবং মর্মস্পর্শী উপদেশ পেশ করতে হবে। এ ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশনা হচ্ছে :
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
“তোমার রবের পথের দিকে মানুষকে ডাকো হিকমাহ্ এবং মাওযিয়ায়ে হাসানার মাধ্যমে।” (সূরা ১৬ আন নাহল : আয়াত ১২৫)
এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী রহ. তাঁর তাফসীরে লিখেছেন :
“দাওয়াতে হিকমাহ্ প্রয়োগের মানে হচ্ছে, বোকামির সাথে যেনো দাওয়াত দেয়া না হয়, বরং বুদ্ধিমত্তার সাথে শ্রোতার মানসিকতা ও সামর্থ্য এবং তার ধারণ ক্ষমতা বুঝে উপযুক্ত স্থান, সময় ও সুযোগ অনুযায়ী কথা বলতে হবে। সব ধরনের লোকদের একই ঢংয়ে নিয়ে সোজা করার চেষ্টা করা ঠিক নয়। যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়া হবে, প্রথমে তার রোগ নির্ণয় করতে হবে। অতঃপর এমনসব যুক্তি ও প্রমাণের সাহায্যে তার চিকিৎসা করতে হবে, যা তার মন-মানসিকতার গভীরে থেকে সমস্ত রোগের টলমল উপড়ে ফেলতে সমর্থ হবে। ‘মাওয়ায়েযায়ে হাসানা’ বা উত্তম উপদেশের দুটি অর্থ রয়েছে। এক. প্রত্যেক শুধুমাত্র যুক্তি প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে ক্ষান্ত হলে চলবে না, বরং মানুষের মধ্যে জন্মগতভাবে অন্যায়ের প্রতি যে ঘৃণা ও নফরত রয়েছে তাকে জাগ্রত করে তুলতে হবে এবং সৎকাজের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি সম্পর্কে সতর্ক করে দিতে হবে। হিদায়াত ও আমলের সালেহর সৌন্দর্য ও বিশুদ্ধতার যুক্তি ও বুদ্ধিগত প্রমাণই যথেষ্ট নয়, সাথে সাথে শ্রোতার প্রতি শ্রোতার আকর্ষণ ও মহব্বত পয়দা করে দিতে হবে।
দুই. সহানুভূতি আন্তরিকতা ও একান্ত দরদের সাথে উপদেশ দান করতে হবে। শ্রোতা যেনো অনুভব করতে না পারে যে, উপদেশদানকারী তাকে ক্ষুদ্র জ্ঞান করছে এবং নিজেকে বিরাট কিছু মনে করে তার সাথে বিদ্রূপ করছে।
বরং এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেনো শ্রোতা অনুভব করতে পারে যে তার সংশোধনের জন্যে উপদেশদানকারীর অন্তরে সত্যিই দরদ ও সহানুভূতিপূর্ণ অনুভূতি রয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে তিনি তার কল্যাণ কামনা করছেন।” -তাফহীমুল কুরআন, সূরা ১৬ আন-নাহল, টীকা : ১২২।
📄 বিতর্কের পথ পরিহার
দাওয়াতদানকারী প্রতিপক্ষের সাথে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়বেন না। কারণ তর্ক-বিতর্ক এমন একটি জিনিস, যা দাওয়াতদানকারীর উদ্দেশ্য পশু করে দেয়। প্রতিপক্ষের সাথে অধিকতর দুরত্ব সৃষ্টি করে। এতে প্রতিপক্ষ জিদের বশবর্তী হয়ে অধিকতর অন্যায়ের দিকে ধাবিত হয়। বিতর্ক এমন একটি জিনিস, যাতে উভয় পক্ষই জিততে চায়। আর যেখানে জেত-জিতের পালা এসে যায়, সেখানে কিছুতেই দাওয়াতি কাজের পরিবেশ থাকে না। তাই কুরআন বলছে :
وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
“আহলে কিতাবের সাথে উত্তম পন্থা ছাড়া ছাড়া বিতর্ক করো না।” (সূরা ২৯ আনকাবুত : আয়াত ৪৬)
وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
“আর লোকদের সাথে বিতর্ক করবে উত্তম পন্থায়।” (সূরা ১৬ আন নাহল : আয়াত ২৫)
‘উত্তম পন্থা’ মানে তোমার প্রতিপক্ষ যদি তোমার সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, তবে তুমি তাতে অংশ নেবে কেবল যুক্তি সংগত, প্রমাণসিদ্ধ, সত্য শাহীনের এবং বুঝানোর ভাষায়। তর্কের জন্যে তর্ক এবং যে কোনোভাবে জেতার জন্যে বিতর্কে লিপ্ত হবে না। কারণ তাতে তোমার দ্বারা লোকেরা অধিকতর গোমরাহির দিকে ধাবিত হবে।
📄 ভালো কথা দিয়ে মন্দ কথার জবাব দান
এ ব্যাপারে কুরআন বলছে :
ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ ۚ نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَصِفُونَ
“মন্দকে সেই ভালো দ্বারা দূর করো যা সর্বোত্তম। প্রতিপক্ষ তোমাদের বিরুদ্ধে যেসব কথা রচনা করছে, তা আমি জানি।” (সূরা ২৩ মুমিনূন : ৯৬)
সূরা হামীম আস সাজদায় বলা হয়েছে :
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
“ভালো আর মন্দ এক নয়। মন্দকে সেই ভালো দিয়ে দূর করো যা সর্বোত্তম।” (সূরা ৪১ হামীম আস সাজদা : আয়াত ৩৪)
সত্য পথের দাওয়াতদানকারী যে কোনো সময় মন্দ আচরণের সম্মুখীন হতে পারেন। কিন্তু মন্দ আচরণের জবাবে তিনিও মন্দ আচরণ করবেন না। তিনি এমন সুন্দর আচরণ করবেন, যা দ্বারা মন্দকরকারী লজ্জিত হবে এবং তার আচরণে বিমুগ্ধ হবে।
📄 যাদের পেছনে সময় বেশি দিতে হবে
দাওয়াতের দায়িত্ব পালনে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে একটা সুবিধা দিয়েছেন। তাহলে অভিযুক্তদের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, লোকটা উপদেশ (দাওয়াত) গ্রহণ করতে পারে, তার পেছনে সময় বেশি দিতে হবে। আর যার ব্যাপারে মনে হবে যে, তার দাওয়াত গ্রহণ করার কোনো সম্ভাবনা নেই, তার পেছনে অযথা সময় নষ্ট করার দায়িত্ব মুমিনদের নেই। সূরা আল আ'লায় রাসূল সা.-কে বলা হয়েছে :
وَذَكِّرْ إِن نَّفَعَتِ الذِّكْرَىٰ
“আমি তোমাকে সহজ পন্থার সুবিধা দিচ্ছি। তাহলে উপদেশ দান সেখানেই অব্যাহত রাখো, যেখানে তা ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করবে।” (সূরা আ'লা : আয়াত ৮-৯)
সূরা আবাসায় এ কথাটি আরো বলিষ্ঠভাবে বলা হয়েছে।