📄 মু’জিজা : ১৬০: আকাশ উন্মোচন
সেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তোমরা দলে দলে আসবে। আর আসমান খুলে দেয়া হবে, ফলে তা হবে বহু দ্বার বিশিষ্ট। (নাবা, ৭৮ : ১৮-১৯)
আর আসমান বিদীর্ণ হয়ে যাবে। ফলে সেদিন তা হয়ে যাবে দুর্বল বিক্ষিপ্ত। (হাক্কাহ, ৬৯ : ১৬)
আসমানের দ্বার উন্মোচনের বিষয়টি এমন একটি ধারণা যা ‘Black Holes’ বা কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। এধরনের দরজা উন্মোচন হতে পারে অন্যজগত যেমন- জান্নাত কিংবা জাহান্নামের প্রবেশপথ হিসেবে।
কৃষ্ণগহ্বর বলতে আকাশের সেসব অবস্থানসমূহকে নির্দেশ করে যা নক্ষত্রসমূহের মৃত্যুর ফলে শূন্য পড়ে পড়ে। একটি নক্ষত্রের মৃত্যু অর্থ, তাঁর মাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। যখন নক্ষত্রের মৃত্যু হয় তা স্বীয় মাধ্যাকর্ষণশক্তির প্রভাবে ঘনীভূত হতে থাকে, যে পর্যন্ত না অণুসমূহের নিউক্লিয়াস অবশিষ্ট থাকে। একটি মৃত নক্ষত্র তাঁর প্রকৃত আকার থেকে কয়েক মিলিয়ন গুণ কুঁচকে ছোট হয়ে যায়। যদি মৃত নক্ষত্রটি আমাদের সূর্যের মত একটি ছোট নক্ষত্র হয়, তবে তা একটি পালসার (এমন ছোট নক্ষত্র যাকে কেবল এক্সরে থেকে আসা বেতার সংকেত দিয়ে চিহ্নিত করা সম্ভব) হয়ে যায় এবং প্রতি ০.০৩ সেকেন্ডে রঞ্জনরশ্মি (X-Ray) নির্গত করে। যদি মৃত নক্ষত্রটি বড় হয়, তবে তার মাধ্যাকর্ষণশক্তিজনিত ভাঙন এতই তীব্র হয় যে, তা কেবল নিউক্লিয়ার স্তরে গিয়েই থামে না, বরং তা চলতে থাকে যতক্ষণ না তাঁর সকল পদার্থ ও শক্তি একটি বিন্দুতে গিয়ে ঘনীভূত হয়- যাকে বলা হয় ‘Singularity’। এই Singularity মহা জাগতিক কৃষ্ণগহ্বর গঠন করে। এমন বস্তু কণিকায় মাধ্যাকর্ষণশক্তি এতই তীব্র যে, এমনকি আলো পর্যন্ত তা থেকে বিচ্ছুরিত হতে পারে না এবং সেগুলি অদৃশ্য হয়ে যায়। এ কারণে এগুলিকে বলা হয় কৃষ্ণগহ্বর।
জ্যোতির্বস্তুবিদরা বিশ্বাস করেন, মহাশূন্য সময় সম্পর্ক কৃষ্ণগহ্বরে এই মহাবিশ্বের পেছনে প্রবেশপথ তৈরি করে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। মহাবিশ্বের বিস্তৃতির বর্তমান অবস্থায় কৃষ্ণগহ্বরে অবস্থিত বস্তুকণাসমূহ এই দরজা উন্মোচনে বাধার সৃষ্টি করে। মহাবিশ্বের সংকোচনের ধাপে এই সমস্যা আর থাকবে না। বিচার দিবসে মাধ্যাকর্ষণশক্তির উল্টোচক্র পৃথিবী ও তার চারপাশে বেষ্টিত সকল মহাকাশীয় বস্তুসমূহকে পরিবর্তিত করে দেবে। সময় তখন মহাশূন্যেও সংকোচন কিংবা মাধ্যাকর্ষণের ঊর্ধ্ববর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে। মহাশূন্যের এই স্বীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংকোচন পরিণামে মহাশূন্য ও সময়ের কাঠামোকে ভেঙে দেবে এবং অবশেষে এই মহাবিশ্বেও পেছনের প্রবেশ দ্বারের আকারে মহাশূন্য বিদীর্ণ হবে। এই আয়াতে (৬৯ : ২৬) আমাদের বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তা বলে, আসমান শেষ বিচারের দিন বিদীর্ণ হয়ে যাবে এবং তা হবে ভঙ্গুর। তাঁর অনিবার্য অর্থ এই দাঁড়ায় যে, বর্তমান মহাবিশ্বের এই সম্প্রসারণশীল অবস্থায় আসমান ভঙ্গুর নয়। এটি একটি মনোমুগ্ধকর বিষয় যে, কুরআন মাজিদের বর্ণনা খুবই সংক্ষিপ্ত, অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
অতিক্রান্ত পৃষ্ঠাগুলি কুরআন মাজিদের মু’জিজার ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। জ্যোতির্বস্তুবিদ্যার সাম্প্রতিক অগ্রগতি বিষয়ক কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ খুব কমই অধ্যয়ন করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছেন যে, তারা কেবল এই মহাবিশ্বের পরিসমাপ্তি সম্পর্কেই ভবিষ্যৎবাণী করেন না, বরং তার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কেও মতামত ব্যক্ত করেন। এটি কুরআন মাজিদের একটি অনুপম মু’জিজা যে, জ্যোতির্বস্তুবিদদের কোনো ভবিষ্যৎবাণী কিংবা কোনো তথ্যই কুরআন মাজিদের একটি সাধারণ বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। পক্ষান্তরে এটি প্রমাণ করে যে, সকল আধুনিক বিজ্ঞানই অনুসন্ধান করে এবং ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। বাস্তবতা হল, কুরআন মাজিদ মানব জ্ঞানের ওপর সর্বদা শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও মানবজ্ঞানের ওপর তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকবে। সকল যুগের মানুষই কুরআন মাজিদে নতুন নতুন মু’জিজা আবিষ্কার করেছে এবং এই আবিষ্কারের ধারা অব্যাহত থাকবে।
‘যখন সূর্য (অন্ধকারে) গুটিয়ে নেয়া হবে। আর নক্ষত্ররাজি যখন পতিত হবে। আর পর্বতগুলোকে যখন সঞ্চালিত করা হবে। আর যখন দশমাসের গর্ভবতী উষ্ট্রীগুলো উপেক্ষিত হবে। আর যখন বন্য পশুগুলোকে একত্র করা হবে। আর যখন সমুদ্রগুলিকে অগ্নিউত্তাল করা হবে। আর যখন আত্মাগলোকে (সমগোত্রীয়দের সঙ্গে) মিলিয়ে দেয়া হবে। আর যখন জীবন্ত কবরস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে? আর যখন আসমানকে আবরণমুক্ত করা হবে। আর জাহান্নামকে যখন প্রজ্বলিত করা হবে। আর জান্নাতকে যখন নিকটবর্তী করা হবে। তখন প্রত্যেক ব্যক্তিই জানতে পারবে সে কী উপস্থিত করেছে? (তাকবির, ৮১ : ০১-১৪)