📄 মু’জিজা : ১৫০: মৃত্যু থেকে পলায়ন
তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবে যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর। (নিসা, ০৪ : ৭৮)
বল, ‘তোমাদেরকে মৃত্যু দেবে মৃত্যুর ফেরেশতা যাকে তোমাদের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। তারপর তোমাদের রবের নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে। (সাজদাহ, ৩২ : ১১)
একজন সাধারণ পাঠক এই আয়াতগুলোতে কোনো বিশেষ কিছু কিংবা স্বতন্ত্র বিষয় দেখতে নাও পেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হল, এই আয়াতগুলো মানব সমাজের জন্য একটি শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ।
আয়াতগগুলিতে দুটি বিষয় ব্যক্ত হয়েছে। প্রথমত, মৃত্যু অনস্বীকার্য এবং কেহ তা থেকে পালাতে পারে না। দ্বিতীয়ত, মৃত্যুর দিনক্ষণ একটি গুপ্ত বিষয়, যা কেবল আল্লাহ তাআলাই জানেন এবং কেহ তা কখনো জানতে পারবে না। এমনকি একজন নাস্তিকও স্বীকার করে যে, আল্লাহর শক্তির কাছে সে অসহায় এবং নিজের মৃত্যুর সময়টাকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অধিকন্তু কোনো বিজ্ঞানীই এ পর্যন্ত কারো মৃত্যুর সময় সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে নি। আমরা জীবন ও মৃত্যুর ওপর আল্লাহ তাআলার সার্বভৌম ক্ষমতার অসংখ্য প্রমাণ প্রত্যক্ষ করি।
অনেকেই আছে যারা সাময়িক রোগ-যন্ত্রণায় ভোগে এবং বহু বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। আবার অনেকেই এমন আছে যারা সুস্থ জীবন যাপন করে এবং হঠাৎ করে মৃত্যুবরণ করে। অধিকন্তু কারও অসুস্থতা যতই তীব্র হোক না কেন তা কোনো ব্যাপার নয়, কোনো চিকিৎসকই কারো মৃত্যুর সময় সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে না। এটি এমন একটি জ্ঞান, যা না এ পর্যন্ত কেহ অর্জন করতে পেরেছে, আর না অর্জন করতে পারে। কারো মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন।
📄 মু’জিজা : ১৫১: আল্লাহ তা’আলার সার্বভৌম ক্ষমতা
তবে কি তোমরা এই বাণীকে (কুরআনকে) তুচ্ছ জ্ঞান করছ? আর তোমরা রিযিক বানিয়ে নিয়েছ যে, তোমরা মিথ্যা আরোপ করবে। সুতরাং কেন নয়- যখন রূহ কণ্ঠদেশে পৌঁছে যায়? আর তোমরা তখন কেবল চেয়ে থাক। আর তোমাদের চাইতে আমি তাঁর খুব কাছে; কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমাদের যদি প্রতিফল দেয়া না হয়, তাহলে তোমরা কেন ফিরিয়ে আনছ না রূহকে, যদি তোমরা সত্যবাদী হও? (ওয়াকিয়া, ৫৬ : ৮১-৮৭)
এই আয়াতগুলি ব্যাখ্যা ব্যতীতই বোধগম্য। কুরআন মাজিদ মানব জাতিকে এই ওপেন চ্যালেঞ্জ প্রদান করে যে, কোনো মানুষই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার পথে অন্তরায় হতে পারে না। এক আল্লাহ তাআলাই মানব জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেন। কোনো মানুষই কখনো সাহায্যপ্রাপ্ত হয় নি কিংবা সেই ব্যক্তিকে কখনো সাহায্য করতে পারে নি যাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। প্রায়ই এমন ঘটে থাকে যে, ডাক্তাররা কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যরা এমন রোগে মৃত্যুবরণ করে, যে রোগে তারা বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এই আয়াতগুলি সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলার সার্বভৌম আদেশ ও ক্ষমতার কথা বলে। চলুন আমরা তাঁর আদেশের কাছে মাথা নত করি এবং আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ও চলনে-বলনে কুরআন মাজিদকে আসমানি বার্তা ও নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করি।
বরকতময় তিনি যাঁর হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব। আর তিনি সবকিছুর ওপর শক্তিমান। যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম? আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, অতিশয় ক্ষমাশীল। (মূলক, ৬৭ : ০১-০২)
(লক্ষ কর,) নিশ্চয় আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের বিবর্তনের মধ্যে রয়েছে বিবেকসম্পন্নদের জন্য বহু নিদর্শন। যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে ও কাত হয়ে এবং আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে। (বলে) ‘হে আমাদের রব, তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি কর নি। তুমি পবিত্র মহান। সুতরাং তুমি আমাদেরকে আগুনের আজাব থেকে রক্ষা কর’।
📄 মু’জিজা : ১৫২: নক্ষত্রের পতন
(তখন তোমরা কী করবে) যখন আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, অতঃপর তা রক্তিম গোলাপের ন্যায় লাল চামড়ার মত হবে। (রহমান, ৫৫ : ৩৭)
‘নাসা’ সম্প্রতি আসমানসমূহের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছবি প্রকাশ করেছে। আগ্রহী ব্যক্তিগণ ‘নাসা’ থেকে এই ছবিটি সংগ্রহ করতে পারেন। এর নামকরণ করা হয়েছে Cats Eye Nebula (বিড়াল চক্ষু নীহারিকা)। নাসা এই চিত্রটি ধারণ করে ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ তারিখে। এর অফিসিয়াল সংকেত হল ‘NGC 6543’। এই ছবিটি দেখতে লাল গোলাপের পাপড়ির মত। এই আয়াতে কুরআন মাজিদ বলে, এমন একদিন আসবে যখন আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে। এবং তা গোলাপের মত লাল বস্তুতে পরিণত হবে। নাসা’র মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বলেন, এই চিত্রটি একটি নক্ষত্রের মুত্যু ও ধ্বংসের চিত্র প্রদর্শন কিংবা প্রতিনিধিত্ব করে যা আসমানে সংঘটিত হয়েছে তিন হাজার আলোক বর্ষের দূরত্বে। কুরআন মাজিদ কিভাবে আজ থেকে শত শত বছর পূর্বে একথা বলতে পারল যে, যখন মহাবিশ্বে একটি নক্ষত্র সশব্দে বিদীর্ণ হবে, যা দেখতে একটি গোলাপের লাল পাপড়ির মত দেখাবে- তা সর্বজ্ঞাতা, জ্ঞানময় প্রভু আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতরণ ব্যতিরেকে হতে পারে না।
তাঁর সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে যে, মহাবিশ্ব নিয়ত সম্প্রসারণশীল অবস্থায় রয়েছে। একদল বিজ্ঞানী অসংখ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ধারণা পোষণ করেন যে, এই সম্প্রসারণ একদিন থেমে যাবে এবং সংকোচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। মহাবিশ্ব তখন একটি বেলুনের মত সংকুচিত হবে এবং কুঁচকে যাবে। সকল গ্রহ-উপগ্রহ যা বর্তমানে মহাকাশে পরস্পর বহুদূরে এবং ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রয়েছে সেগুলি খুব নিকটে চলে আসবে একটি বেলুনের উপরিভাগের বিন্দুসমূহের মত করে। যেহেতু সংকোচন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে, ফলে গ্রহ-উপগ্রহের বিভিন্ন দল পরস্পর সংযুক্ত হয়ে যাবে এবং একটির সঙ্গে আরেকটির ধাক্কা লেগে সশব্দে বিস্ফোরিত হয়ে আরও অধিক লাল গোলাপী চিহ্নের সৃষ্টি করবে। শেষের দিকে পুরো মহাবিশ্বই লাল গোলাপের পাপড়ির মত দেখাবে। (আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) এটি হতে পারে কিয়ামত দিবস এবং পৃথিবীর সমাপ্তি। তবে এই আয়াতে মহাকাশে নক্ষত্রের বিস্ফোরণ ও মৃত্যু’র একটি স্বচ্ছ বৈজ্ঞানিক উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়েছে এবং তেমনিভাবে কিয়ামতের দিবসে এই পৃথিবীর পরিসমাপ্তির বিষয়টিও পরিষ্কার হয়েছে। আরও উল্লেখ্য যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশে অসংখ্য লাল গোলাপী চিহ্নের প্রমাণ পেয়েছেন, এসব কিছু পূর্বেকার নক্ষত্রসমূহের মৃত্যুর কথাই ব্যক্ত করে।
📄 মু’জিজা : ১৫৩: কিয়ামত দিবসের সুনির্দিষ্ট সময়
তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে, ‘তা কখন ঘটবে?’ তুমি বল, ‘এর জ্ঞান তো রয়েছে আমার রবের নিকট। তিনিই এর নির্ধারিত সময়ে তা প্রকাশ করবেন। (আরাফ, ০৭ : ১৮৭)
কিয়ামত নিকটবর্তী। আল্লাহ ছাড়া কেহ তা প্রকাশ করতে সক্ষম নয়। (নাজম, ৫৩ : ৫৭-৫৮)
মহাবিশ্ব বর্তমানে সম্প্রসারণশীল অবস্থায় আছে। কেহ জানে না কিংবা ধারণা করতে পারে না কখন এই সম্প্রসারণ ও বিস্তৃতি বন্ধ হবে এবং সংকোচন শুরু হবে। এর অর্থ হল, কেহ কখনো ভবিষ্যৎবাণী করতে পারবে না কিংবা জানতে পারবে না, কিয়ামত দিবস কখন শুরু হবে। কেবল সৃষ্টিকর্তা ও এই মহাবিশ্বের প্রভু আল্লাহ তাআলাই এই মহাবিশ্বের সংকোচনের সময় সম্পর্কে জানেন এবং কিয়ামত দিবসের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে অবহিত আছেন। এটি মানবজাতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ যা কুরআন মাজিদ এই আয়াতে ঘোষণা করেছে।