📄 মু’জিজা : ১৪৭: কুরআন মাজিদের মত একটি বাণী তৈরি কর
তারা কি বলে, সে এটা বানিয়ে বলছে? বরং তারা ঈমান আনে না। অতএব তারা যদি সত্যবাদী হয় তবে তাঁর অনুরূপ একটি বাণী নিয়ে আসুক। (তূর, ৫২ : ৩৩-৩৪)
কুরআন মাজিদ একটি জীবন্ত মু’জিজা, যা তাঁর ভাষা, যুক্তি উপস্থাপন, অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনার বর্ণনা, শ্রোতাদের ওপর তার প্রতিক্রিয়া, সতর্কবাণী ও সুসংবাদ পরিবেশন, তাঁর অন্তহীন জ্ঞান-ভান্ডার, মানব জীবনের ওপর তার প্রভাব এবং মানব ইতিহাস বিনির্মাণে এর ভূমিকা— সর্বত্র পরিব্যপ্ত। এই আয়াতগুলি মানব জাতিকে কুরআন মাজিদের মত একটি বাণী রচনার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। এ পর্যন্ত কোনো মানুষই কুরআন মাজিদের মত একটি বাণী রচনা করতে পারে নি। এ থেকে বুঝা যায়, কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এক আসমানি গ্রন্থ। তা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামক একজন মানুষের রচিত নয়।
📄 মু’জিজা : ১৪৮: কুরআন মাজিদের একটি অসঙ্গতি খুঁজে বের কর
তারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? আর যদি তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হত, তবে অবশ্যই তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেত। (নিসা, ০৪ : ৮২)
আসুন আমরা মানব ইতিহাসের একটি সাধারণ ঘটনা স্মরণ করি। যখন থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর ওপর কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়, একদল কাফির সর্বদা এর বিরুদ্ধাচরণ করে আসে। তারা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, কুরআন মাজিদ সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ নয়। বলাবাহুল্য, তারা উপর্যুক্ত আয়াতটি পড়েছে। বিগত চৌদ্দশ বছরে কোনো ব্যক্তিই এ যাবৎ পুরো কুরআন মাজিদে একটি বৈপরীত্য খুঁজে বের করতে পারে নি।
যদি বর্তমান সময়ের বাইবেলের ভার্সন থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া হয় তবে পাঠকবৃন্দ বিষয়টি ভালভাবে হৃদয়াঙ্গম করতে পারবেন। বাস্তব কথা হল, বর্তমান সময়ের বাইবেলে এত বেশি বৈপরীত্য ও অসঙ্গতি বিদ্যমান এবং তা এত ভালভাবে প্রমাণিত যে, খ্রিস্টানদের প্রতিটি দলই তা স্বীকার করে নেয়। নিম্নে বর্তমান বাইবেলের কিছু সুপরিচিত অসঙ্গতি তুলে ধরা হল :
‘ম্যাথিউ ১০ : ২-৪— এর মধ্যে বারোজন ঈসায়ি ধর্ম প্রচারকের যে নাম দেয়া হয়েছে তা ‘লুক’ ৬ : ১৪-১৬— এর মধ্যে প্রদত্ত নামগুলি থেকে ব্যতিক্রম। আর স্যামুয়েল ৬ : ২৩ অনুসারে সল (Saul) এর কন্যা মৃত্যুর সময় কোনো ছেলে সন্তান রেখে যান নি। পক্ষান্তরে স্যামুয়েল ২১ : ১ অনুসারে তিনি পাঁচ সন্তান রেখে যান। অনুরূপভাবে জুডাস (Judas)-এর মৃত্যু সম্পর্কে বাইবেল দু’টি ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রদান করে। ম্যাথিউ ২৭ : ৫ বলে, ‘আর গীর্জার রূপার টুকরোগুলো নিক্ষেপ করে তিনি নিষ্ক্রান্ত হন এবং चले গিয়ে নিজেকে ফাঁসিতে ঝুলান।’ এ্যাক্ট ১ : ১৮ বলে, ‘এই লোকটি তাঁর দুষ্টামির পুরস্কার নিয়ে একটি মাঠ ক্রয় করে এবং অধোমুখে পতিত হয়ে মাঝখানে ছিঁড়ে আর ফেটে যায়। তার সকল নাড়ি-ভূঁড়ি দ্রুতবেগে বের হয়ে পড়ে।’ বাইবেলের নিম্নোক্ত বাক্যটিতে অন্য একটি অসঙ্গতি দেখা লক্ষণীয়। ম্যাথিউ ১২ : ৪০ অনুসারে যীশুখ্রিস্ট বলেন, ‘যেহেতু যোনাহ (Jonah) তিমিমাছের পেটে তিনদিন তিনরাত ছিল, তাই মানব সন্তানও মাটির অভ্যন্তরে তিনদিন তিনরাত থাকবে।’ যীশুকে দাফন করা হয় শুক্রবার সন্ধ্যায় এবং উত্তোলন করা হয় রবিবার সকালে, কেবল একদিন দুইরাত্রি পর; তিনদিন তিনরাত পরে নয়। বাইবেলের এটিও একটি অসঙ্গতি যে, লুক ২৪ : ৫১ অনুসারে যীশুর আরোহণ সংঘটিত হয় কবর থেকে উত্তোলনের দিন। পক্ষান্তরে Acts (এ্যাক্টস) ১ : ৩-৯ বলে, তা সংঘটিত হয় কবর থেকে উঠানোর চল্লিশ দিন পর। অধিকন্তু জেনেসিস (Genesis) ৬ : ৩ বলে, প্রভু মানুষের জীবনকালের ব্যাপ্তি ১২০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন। পক্ষান্তরে জেনেসিস (Genesis) ১১ : ১০-৩২ বলে, কিন্তু অতি শীঘ্রই মানুষ ১৪০-৬০০ বছর জীবন লাভ করবে। তাছাড়া এক্সোডাস (Exodus) ৪ : ২২ অনুসারে প্রভুর প্রথম পুত্র হল জ্যাকব (Jacob)। কিন্তু ‘জারমিয়াহ’ (Jermiah) ৩১ : ৯ অনুসারে এফ্রাইম (Ephraim)।
এই হল, আধুনিক বাইবেলে বিদ্যমান সুস্পষ্ট অসঙ্গতি, যা একজন সাধারণ পাঠকও লক্ষ করতে সক্ষম। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এ পর্যন্ত কেহ সমগ্র কুরআন মাজিদে একটি সামান্য অসঙ্গতিও আবিষ্কার করতে পারে নি। কুরআন মাজিদকে আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ গ্রন্থ বলতে বর্তমানযুগেও যারা নারাজ তাদের জন্য এ চ্যালেঞ্জ এখনও উন্মুক্ত।
📄 মু’জিজা : ১৪৯: কুরআন মাজিদের সংরক্ষণ
নিশ্চয় আমি (আল্লাহ) কুরআন নাজিল করেছি, আর আমিই তাঁর হেফাজতকারী। (হিজর, ১৫ : ০৯)
আর আমি তো কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব কোনো উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি? (ক্বামার, ৫৪ : ১৭, ২২, ৩২, ৪০)
যেসব উপায়ের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদের সংরক্ষণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করেছেন তার মধ্যে একটি হল, তিনি ঈমানদারদের জন্য কুরআন মুখস্থ করাকে সহজ করে দিয়েছেন। বস্তুত কুরআন মাজিদই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা তাঁর অনুসারীরা মুখস্থ করে থাকে। প্রতিটি মুসলিম সমাজে প্রচুর সংখ্যক ব্যক্তি কুরআন অবতরণের প্রথম দিন থেকে তা সম্পূর্ণরূপে মুখস্থ করে আসছে। পাঁচ বছরের ছোট শিশু থেকে নিয়ে ৫০ বছরের বৃদ্ধ পুরুষ-মহিলা পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার কিতাবের প্রতি ভালবাসা ও ভক্তি নিয়ে পুরো কুরআন মুখস্থ করে থাকে। যে ব্যক্তি কুরআন মাজিদ মুখস্থ করেন তাঁকে ‘হাফিজ’ বলা হয়। এটি একটি বিস্ময়কর ব্যাপার যে, একজন হাফিজ কেবল পুরো কুরআন মাজিদই মুখস্থ করে না, বরং সে কুরআন মাজিদের সকল যতিচিহ্ন, প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের বর্ণসমূহ পর্যন্ত মুখস্থ করে নেয়। মুসলমানরা সারা বিশ্বে রমজান মাসে পুরো কুরআন মাজিদের তেলাওয়াত শ্রবণ করে থাকে। অধিকাংশ মুসলিম সমাজ তারাবির নামাজের ব্যবস্থা করে, যেখানে একজন হাফিজের মাধ্যমে পুরো কুরআন মাজিদ তেলাওয়াত করানো হয়। সে সর্বদা হাফিজদের একটি দলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, যারা তাঁর তেলাওয়াতকে পরীক্ষা করে। এটি কুরআন মাজিদের একটি অনন্য রহস্য ও অনুপম মু’জিজা। যদি একটি পুরো গ্রন্থ মুখস্থ করা মানুষের দ্বারা সম্ভব হত, নিদেনপক্ষে কিছু সংখ্যক লোক হলেও তাদের পবিত্র-কিতাবগুলো মুখস্থ করে নিত। যেহেতু, আল্লাহ তাআলা তাদের কিতাবগুলো সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেন নি, তাই তিনি সেসব কিতাবের অনুসারীদেরকে তা মুখস্থ করার ক্ষমতা দেন নি।
যাহোক, আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং এভাবে তাঁর অনুসারীদেরকে তা মুখস্থ করার ক্ষমতা দান করেছেন। যে কোনো ধরনের বিকৃতি ও বিচ্যুতি থেকে কুরআন মাজিদের নিরাপদ থাকা এবং তার বিশ্বাসীদের দ্বারা তা মুখস্থ করা মানব জাতির জন্য একটি ওপেন চ্যালেঞ্জ।
📄 মু’জিজা : ১৫০: মৃত্যু থেকে পলায়ন
তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবে যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর। (নিসা, ০৪ : ৭৮)
বল, ‘তোমাদেরকে মৃত্যু দেবে মৃত্যুর ফেরেশতা যাকে তোমাদের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। তারপর তোমাদের রবের নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে। (সাজদাহ, ৩২ : ১১)
একজন সাধারণ পাঠক এই আয়াতগুলোতে কোনো বিশেষ কিছু কিংবা স্বতন্ত্র বিষয় দেখতে নাও পেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হল, এই আয়াতগুলো মানব সমাজের জন্য একটি শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ।
আয়াতগগুলিতে দুটি বিষয় ব্যক্ত হয়েছে। প্রথমত, মৃত্যু অনস্বীকার্য এবং কেহ তা থেকে পালাতে পারে না। দ্বিতীয়ত, মৃত্যুর দিনক্ষণ একটি গুপ্ত বিষয়, যা কেবল আল্লাহ তাআলাই জানেন এবং কেহ তা কখনো জানতে পারবে না। এমনকি একজন নাস্তিকও স্বীকার করে যে, আল্লাহর শক্তির কাছে সে অসহায় এবং নিজের মৃত্যুর সময়টাকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অধিকন্তু কোনো বিজ্ঞানীই এ পর্যন্ত কারো মৃত্যুর সময় সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে নি। আমরা জীবন ও মৃত্যুর ওপর আল্লাহ তাআলার সার্বভৌম ক্ষমতার অসংখ্য প্রমাণ প্রত্যক্ষ করি।
অনেকেই আছে যারা সাময়িক রোগ-যন্ত্রণায় ভোগে এবং বহু বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। আবার অনেকেই এমন আছে যারা সুস্থ জীবন যাপন করে এবং হঠাৎ করে মৃত্যুবরণ করে। অধিকন্তু কারও অসুস্থতা যতই তীব্র হোক না কেন তা কোনো ব্যাপার নয়, কোনো চিকিৎসকই কারো মৃত্যুর সময় সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে না। এটি এমন একটি জ্ঞান, যা না এ পর্যন্ত কেহ অর্জন করতে পেরেছে, আর না অর্জন করতে পারে। কারো মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন।