📄 মু’জিজা : ১৪৫: কুরআন মাজিদের মত একটি সূরা নিয়ে আস
এ কুরআন তো এমন নয় যে, আল্লাহ ছাড়া কেহ তা রচনা করতে পারবে; বরং এটি, যা তাঁর সামনে রয়েছে, তাঁর সত্যায়ন এবং কিতাবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা, যাতে কোনো সন্দেহ নাই, যা সৃষ্টিকুলের রবের পক্ষ থেকে। নাকি তারা বলে, ‘সে তা বানিয়েছে?’ বল, তবে তোমরা তার মত একটি সূরা (বানিয়ে) নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো (তোমাদের সাহায্যের জন্য) ডাক, যদি তোমরা (তোমাদের সন্দেহের ক্ষেত্রে) সত্য হয়ে থাক। (ইউনুস, ১০ : ৩৭-৩৮)
আয়াতদ্বয় সমগ্র মানব সমাজের জন্য একটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ এবং প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। আয়াতগুলি পরিষ্কার ভাষায় বলছে, কুরআন মাজিদ এমন একটি গ্রন্থ যা আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কেহ রচনা করতে পারে না। অতঃপর বলে, যদি কেহ ধারণা করে এটি একজন মানুষ কর্তৃক রচিত গ্রন্থ সে যেন নিদেনপক্ষে কুরআন মাজিদের মত একটি সুরা তৈরি করে নিয়ে আসে। বাস্তবতা হল, এ যাবৎ কেহ একটি সুরাও তৈরি করতে সক্ষম হয় নি, যা কুরআন মাজিদের কোনো সুরার অনুরূপ হতে পারে। আমরা এখানে একটি ঘটনার কথা স্মরণ করি, যা তৎকালীন আরব সমাজ কুরআন মাজিদের এই চ্যালেঞ্জকে কিভাবে গ্রহণ করেছিল, তার চিত্র তুলে ধরবে।
কুরআন মাজিদের সর্বকনিষ্ঠ সুরা হল আল-কাউসার (১০৮)। এতে কেবল ছোট ছোট তিনটি আয়াত রয়েছে, যা কেবল একটি সাধারণ সারিতে লেখা যেতে পারে। ঐতিহাসিকগণ বলেন, যখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘোর শত্রু আবু জেহেল এই সুরা শুনতে পেল সে এতই অভিভূত হয়ে পড়েছিল যে, সে বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠল, ‘সকল মহিমা প্রভুর জন্য!’ উল্লেখ্য যে, আরবরা ছিল খুবই কাব্যানুরাগী। আর কবিতা প্রতিযোগিতা ছিল তাদের সামাজিক অনুষ্ঠান-সমাবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঐতিহাসিকগণ লিখেন, বহুদিন যাবৎ সাতটি আরবি কবিতা তৎকালীন আরবি সাহিত্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত ছিল। এই কবিতাগুলি পৃথক পৃথকভাবে কাগজের টুকরায় লিখে কাবা শরিফের প্রধান দরজায় ঝুলানো ছিল। ইতিহাসের গ্রন্থে সেগুলি ‘সাবআ মুআল্লাকাত’ বা ঝুলন্ত সপ্তক নামে খ্যাত।
যখন সুরা কাউসার অবতীর্ণ হয় তখন এসব কবিতার লেখকদের মধ্যে একজন ব্যতীত সবাই মৃত্যুবরণ করে। আবু জেহেল একটি কাগজের টুকরায় সুরা কাউসার লিপিবদ্ধ করে এবং তা একমাত্র জীবিত কবির কাছে নিয়ে যায়। যখন কবি সুরা কাউসার পড়ল, সে বিস্ময়ে ফেটে পড়ল এবং বলল, ‘সকল মহিমা প্রভুর জন্য! এটি কোনো মানুষের কথা হতে পারে না।’ সে তখন কাবা শরিফে গেল, নিজের কবিতার টুকরা সেখান থেকে সরিয়ে ফেলল এবং সেখানে সুরা কাউসার লিখিত কাগজটি ঝুলিয়ে দিল। এমনও বর্ণিত আছে যে, সুরা কাউসারের শেষ তৃতীয় আয়াত অর্থাৎ ‘ইন্না আতাইনাকাল কাউসার’-এর নিচে সে একটি ছন্দপূর্ণ লাইন যোগ করে দেয়- ‘মা হাযা কালামুল বাশার’। অর্থাৎ এটি কোনো মানুষের কথা নয়।
📄 মু’জিজা : ১৪৬: কুরআন মাজিদের মত দশটি সূরা রচনা করে নিয়ে আস
নাকি তারা বলে, সে এটি রটনা করেছে? বল, ‘তাহলে তোমরা নিদেনপক্ষে দশটি সুরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার (তোমাদের সাহায্যের জন্য) ডেকে নিয়ে আস, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (হূদ, ১১ : ১৩)
আমরা এ ক্ষেত্রে মুসলমান ও কুরআনের বিপক্ষে মক্কাবাসীদের বিদ্বেষ ও শত্রুতার কথা একটু স্মরণ করি। এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, কুরআন নাজিলের সময় সকল আরব, বিশেষত যারা মক্কায় ছিল, কুরআনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। তারা কুরআনের বাণীকে মিটিয়ে দিতে এবং মুসলমানদেরকে সমূলে উৎখাত করতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যায়। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাথী-সঙ্গীগণসহ মদিনায় হিজরত করা পর্যন্ত তাদের এ তৎপরতা অব্যাহত থাকে। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে কতিপয় যুদ্ধেও লিপ্ত হয়। এতে তাদের কিছু পরাজয়, অপমান ও জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি গুণতে হয়। তারা তাদের একজন কবিকে ডেকে কুরআন মাজিদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কুরআন মাজিদের মত কিছু আয়াত রচনা করিয়ে নিলে এসকল ভোগান্তি এবং জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি সহজে এড়াতে পারত। তবে বাস্তবতা হল, আরবরা কুরআন মাজিদের চ্যালেঞ্জের মুকাবিলা করতে সক্ষম হয় নি, না এর অবতরনকালে, আর না বিগত চৌদ্দশ বছরের দীর্ঘ সময়ে।
📄 মু’জিজা : ১৪৭: কুরআন মাজিদের মত একটি বাণী তৈরি কর
তারা কি বলে, সে এটা বানিয়ে বলছে? বরং তারা ঈমান আনে না। অতএব তারা যদি সত্যবাদী হয় তবে তাঁর অনুরূপ একটি বাণী নিয়ে আসুক। (তূর, ৫২ : ৩৩-৩৪)
কুরআন মাজিদ একটি জীবন্ত মু’জিজা, যা তাঁর ভাষা, যুক্তি উপস্থাপন, অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনার বর্ণনা, শ্রোতাদের ওপর তার প্রতিক্রিয়া, সতর্কবাণী ও সুসংবাদ পরিবেশন, তাঁর অন্তহীন জ্ঞান-ভান্ডার, মানব জীবনের ওপর তার প্রভাব এবং মানব ইতিহাস বিনির্মাণে এর ভূমিকা— সর্বত্র পরিব্যপ্ত। এই আয়াতগুলি মানব জাতিকে কুরআন মাজিদের মত একটি বাণী রচনার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। এ পর্যন্ত কোনো মানুষই কুরআন মাজিদের মত একটি বাণী রচনা করতে পারে নি। এ থেকে বুঝা যায়, কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এক আসমানি গ্রন্থ। তা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামক একজন মানুষের রচিত নয়।
📄 মু’জিজা : ১৪৮: কুরআন মাজিদের একটি অসঙ্গতি খুঁজে বের কর
তারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? আর যদি তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হত, তবে অবশ্যই তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেত। (নিসা, ০৪ : ৮২)
আসুন আমরা মানব ইতিহাসের একটি সাধারণ ঘটনা স্মরণ করি। যখন থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর ওপর কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়, একদল কাফির সর্বদা এর বিরুদ্ধাচরণ করে আসে। তারা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, কুরআন মাজিদ সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ নয়। বলাবাহুল্য, তারা উপর্যুক্ত আয়াতটি পড়েছে। বিগত চৌদ্দশ বছরে কোনো ব্যক্তিই এ যাবৎ পুরো কুরআন মাজিদে একটি বৈপরীত্য খুঁজে বের করতে পারে নি।
যদি বর্তমান সময়ের বাইবেলের ভার্সন থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া হয় তবে পাঠকবৃন্দ বিষয়টি ভালভাবে হৃদয়াঙ্গম করতে পারবেন। বাস্তব কথা হল, বর্তমান সময়ের বাইবেলে এত বেশি বৈপরীত্য ও অসঙ্গতি বিদ্যমান এবং তা এত ভালভাবে প্রমাণিত যে, খ্রিস্টানদের প্রতিটি দলই তা স্বীকার করে নেয়। নিম্নে বর্তমান বাইবেলের কিছু সুপরিচিত অসঙ্গতি তুলে ধরা হল :
‘ম্যাথিউ ১০ : ২-৪— এর মধ্যে বারোজন ঈসায়ি ধর্ম প্রচারকের যে নাম দেয়া হয়েছে তা ‘লুক’ ৬ : ১৪-১৬— এর মধ্যে প্রদত্ত নামগুলি থেকে ব্যতিক্রম। আর স্যামুয়েল ৬ : ২৩ অনুসারে সল (Saul) এর কন্যা মৃত্যুর সময় কোনো ছেলে সন্তান রেখে যান নি। পক্ষান্তরে স্যামুয়েল ২১ : ১ অনুসারে তিনি পাঁচ সন্তান রেখে যান। অনুরূপভাবে জুডাস (Judas)-এর মৃত্যু সম্পর্কে বাইবেল দু’টি ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রদান করে। ম্যাথিউ ২৭ : ৫ বলে, ‘আর গীর্জার রূপার টুকরোগুলো নিক্ষেপ করে তিনি নিষ্ক্রান্ত হন এবং चले গিয়ে নিজেকে ফাঁসিতে ঝুলান।’ এ্যাক্ট ১ : ১৮ বলে, ‘এই লোকটি তাঁর দুষ্টামির পুরস্কার নিয়ে একটি মাঠ ক্রয় করে এবং অধোমুখে পতিত হয়ে মাঝখানে ছিঁড়ে আর ফেটে যায়। তার সকল নাড়ি-ভূঁড়ি দ্রুতবেগে বের হয়ে পড়ে।’ বাইবেলের নিম্নোক্ত বাক্যটিতে অন্য একটি অসঙ্গতি দেখা লক্ষণীয়। ম্যাথিউ ১২ : ৪০ অনুসারে যীশুখ্রিস্ট বলেন, ‘যেহেতু যোনাহ (Jonah) তিমিমাছের পেটে তিনদিন তিনরাত ছিল, তাই মানব সন্তানও মাটির অভ্যন্তরে তিনদিন তিনরাত থাকবে।’ যীশুকে দাফন করা হয় শুক্রবার সন্ধ্যায় এবং উত্তোলন করা হয় রবিবার সকালে, কেবল একদিন দুইরাত্রি পর; তিনদিন তিনরাত পরে নয়। বাইবেলের এটিও একটি অসঙ্গতি যে, লুক ২৪ : ৫১ অনুসারে যীশুর আরোহণ সংঘটিত হয় কবর থেকে উত্তোলনের দিন। পক্ষান্তরে Acts (এ্যাক্টস) ১ : ৩-৯ বলে, তা সংঘটিত হয় কবর থেকে উঠানোর চল্লিশ দিন পর। অধিকন্তু জেনেসিস (Genesis) ৬ : ৩ বলে, প্রভু মানুষের জীবনকালের ব্যাপ্তি ১২০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন। পক্ষান্তরে জেনেসিস (Genesis) ১১ : ১০-৩২ বলে, কিন্তু অতি শীঘ্রই মানুষ ১৪০-৬০০ বছর জীবন লাভ করবে। তাছাড়া এক্সোডাস (Exodus) ৪ : ২২ অনুসারে প্রভুর প্রথম পুত্র হল জ্যাকব (Jacob)। কিন্তু ‘জারমিয়াহ’ (Jermiah) ৩১ : ৯ অনুসারে এফ্রাইম (Ephraim)।
এই হল, আধুনিক বাইবেলে বিদ্যমান সুস্পষ্ট অসঙ্গতি, যা একজন সাধারণ পাঠকও লক্ষ করতে সক্ষম। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এ পর্যন্ত কেহ সমগ্র কুরআন মাজিদে একটি সামান্য অসঙ্গতিও আবিষ্কার করতে পারে নি। কুরআন মাজিদকে আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ গ্রন্থ বলতে বর্তমানযুগেও যারা নারাজ তাদের জন্য এ চ্যালেঞ্জ এখনও উন্মুক্ত।