📄 মু’জিজা নং- ১৪২: মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খ্যাতি ও মর্যাদা
আমি কি তোমার জন্য তোমার বক্ষ প্রশস্ত করি নি? আর আমি নামিয়ে দিয়েছি তোমার থেকে তোমার বোঝা, যা তোমার পিঠ ভেঙে দিচ্ছিল। আর আমি তোমার (মর্যাদার) জন্য তোমার স্মরণকে সমুন্নত করেছি। (ইনশিরাহ ০৯ : ১-৪)
এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর মাক্কি জীবনের প্রথম দিকে, যখন তিনি ছিলেন এমন দুর্বল ও কঠিন পরিস্থিতিতে যে, তিনি শহরের মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা, ইসলাম প্রচার কিংবা নামাজ আদায় পর্যন্ত করতে পারতেন না। এমন প্রেক্ষাপটে কুরআন মাজিদ বলে, তাঁর নাম সমুন্নত হয়েছে মহা সম্মানে। এই ভবিষ্যৎবাণী কিভাবে পূর্ণতা লাভ করেছিল তা দেখার জন্য আবশ্যক হল, সেসব উপায়-উপকরণের প্রতি লক্ষ করা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যশ-খ্যাতি ও মর্যাদাকে সমুন্নত করেছেন।
প্রথমত. ‘মুহাম্মদ’ হল বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় নাম। মুসলমানদের নামের শুরুতে, মাঝখানে কিংবা শেষে মুহাম্মদ শব্দ থাকাটা তাদের একটি অতি সাধারণ রীতি। এটি একটি অনুপম মর্যাদা যা আল্লাহ তাআলা কেবল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে প্রদান করেছেন। লক্ষ লক্ষ মুসলমান সর্বদা এই নামটি বহন করে চলে। যা সারা বিশ্বে এই নামটিকে সর্বাধিক পরিচিতি ও সর্বাপেক্ষা পুনরাবৃত্ত নামের মর্যাদা দান করেছে।
দ্বিতীয়ত. মুসলমানরা জ্ঞানের একটি নতুন শাখার সূচনা করেছে, যা ছিল মানুষের অজ্ঞাত। এ শাখাটি সিরাত নামে পরিচিত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন বৃত্তান্ত রচনার সঙ্গে এটি সম্পর্কিত। মুসলমানদের প্রতিটি প্রজন্ম ‘সিরাত’ রচনার ক্ষেত্রে একেকটি নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনী লেখার ধারা অব্যাহত রাখে।
তৃতীয়ত. মুসলমানরা সাহিত্যের একটি নতুন ধারাও শুরু করেছে, যা অদ্যাবধি মানুষের অজানা, এটি না’ত নামে পরিচিত। এটি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে কবিতা রচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতি বছরই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে না’ত সম্পর্কিত অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়।
চতুর্থত. আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামকে ইসলামের মূল কালিমার একটি সম্পূর্ণ অংশ করেছেন। অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল)। প্রত্যেক আমলদার মুসলমানই এই কালিমা তাদের জীবনের প্রাত্যহিক রুটিন হিসেবে বারবার উচ্চারণ করে। এভাবে অসংখ্য মানুষ তাদের জীবনের প্রতিটি দিন অসংখ্যবার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম উচ্চারণ করে থাকে।
পঞ্চমত. আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করার আদেশ দিয়েছেন। অসংখ্য মানুষ তা সম্পাদন করে এবং এভাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম উচ্চারণ করে এবং তাদের প্রাত্যহিক জীবনে তাঁর গুণগান করে।
ষষ্ঠত. আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামকে আযানের অবিচ্ছেদ্য অংশ করেছেন, যা প্রতিদিন পাঁচবার করে পৃথিবীর প্রতিটি মসজিদ থেকে ধ্বনিত হয়। সেহেতু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামও সারা বিশ্বে দৈনিক পাঁচবার উচ্চারিত হয়। অধিকন্তু যদি কেহ ভূগোলকের দিকে লক্ষ করে তবে দেখতে পাবে, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সবসময় কোনো না কোনো নামাজের ও আযানের সময় বিরাজ করে। এভাবে দিন-রাতের চক্রাবর্তের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে এমন কোনো ঘন্টা অতিক্রান্ত হয় না, যখন পৃথিবীর কোথাও না কোথাও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম উচ্চারিত হয় না। এ কথাকেই কুরআন মাজিদে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে- ‘আর আমি তোমার (মর্যাদার) জন্য তোমার স্মরণকে সমুন্নত করেছি।’
পূর্বোক্ত পৃষ্ঠাসমূহ কুরআন মাজিদের বহু ভবিষ্যৎবাণীর বর্ণনা দেয়। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কোনো মানুষই এমন জ্ঞানের অধিকারী হতে পারে না যা কুরআন মাজিদের এসব ভবিষ্যৎবাণী ধারণ করবে। একজন মানুষ কিছু সঠিক অনুমান তৈরি করতে পারে। কিন্তু কুরআন মাজিদের ভবিষ্যৎবাণীর বৈচিত্র্যময়তা ও গুণগত মান পরিষ্কার সাক্ষ্য বহন করে যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলাই কুরআন মাজিদের জ্ঞানের উৎস।
এটা লক্ষ করা ও পর্যবেক্ষণ করা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, কুরআন মাজিদ দুই ধরনের ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। কিছু ভবিষ্যৎবাণী নির্দিষ্ট ও স্বল্পস্থায়ী। কিন্তু অধিকাংশই সাধারণ ও দীর্ঘস্থায়ী। যদি কুরআন মাজিদ কেবল বিশেষ ও স্বল্পস্থায়ী ভবিষ্যৎবাণীসমূহ উল্লেখ করত, যেমন- আবু লাহাবের ধ্বংস সাধন, রোমকদের বিজয়, মদিনা থেকে ইহুদিদের উচ্ছেদ- তবে অবিশ্বাসী ও কাফিররা এগুলোকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ধারণা-অনুমান বলে আখ্যা দিতে পারত। যাহোক, কুরআন মাজিদ বহু সাধারণ ও দীর্ঘ মেয়াদী ভবিষ্যৎবাণীর উল্লেখ করে, যেমন মক্কার নিরাপত্তা, হজ্জের জন্য সফর, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ভূমিকা ইত্যাদি।
একজন সচেতন মানুষ ধারণা করতে পারে না যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সময় থেকে এত অগ্রসর হয়ে এসব বিষয় অনুমান করেছেন। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে এসব ভবিষ্যৎবাণী তাঁর নিদর্শন হিসেবে রেখেছেন যাতে মানুষ এসব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে এবং তাঁর এই কিতাবকে তাদের জীবন পরিচালনার জন্য আসমানি নির্দেশিকা হিসেবে গ্রহণ করে।
‘নিশ্চয় এটি মহিমান্বিত কুরআন। যা আছে সুরক্ষিত কিতাবে। কেহ তা স্পর্শ করবে না পবিত্রগণ ছাড়া। তা সৃষ্টিকুলের রবের কাছ থেকে নাজিলকৃত। তবে কি তোমরা এই বাণীকে তুচ্ছ জ্ঞান করছ? আর তোমরা তোমাদের রিযিক বানিয়ে নিয়েছ যে, তোমরা মিথ্যা আরোপ করবে? সুতরাং কেন নয়, যখন রূহ কন্ঠদেশে পৌঁছে যায়। আর তোমরা তখন কেবল চেয়ে থাক। আর তোমাদের চাইতে আমি তাঁর খুব কাছে; কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। তোমাদের যদি প্রতিফল দেয়া না হয়, তাহলে তোমরা কেন ফিরিয়ে আনছ না রূহকে, যদি তোমরা (তোমাদের স্বাধীনতা ও কুরআন অমান্য করার ক্ষেত্রে) সত্যবাদী হও? (ওয়াকিয়া, ৫৬ : ৭৭-৮৭)