📄 মু’জিজা নং- ১৩৩: খ্রিস্টান ও ইহুদিদের পারস্পরিক সম্পর্ক
হে মুমিনগণ, ইহুদি ও নাসারাকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ জালিম কওমকে হেদায়েত দেন না। (মায়েদা, ০৫ : ৫১)
চারপাশে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বর্তমানের পারস্পরিক ঘটনা-প্রবাহের দিকে তাকিয়ে একজন সাধারণ পাঠক এই আয়াতে কুরআন মাজিদের মু’জিজা খুঁজে পাবে না। একজন পাঠক কেবল তখনই এই আয়াতের মর্ম উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে যখন সে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করবেন।
ইহুদিরা বহু শতাব্দী পর্যন্ত আরবে বসবাস করত। দু’টি প্রধান শহরে তাদের শক্তিশালী বসতি ছিল। একটি মদিনা এবং অপরটি খায়বার। তারা ছিল ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতি। তারা মাত্রতিরিক্ত সুদের ওপর টাকা ঋণ দিত এবং এই শহরদ্বয়ের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত। তারা এতই শক্তিশালী ছিল যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনায় হিজরত করেন, তিনি তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য একটি বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। আরবে কোনো খ্রিস্টানপল্লী ছিল বলে ইতিহাসে নজির নেই। অধিকন্তু ইতিহাসে ইহুদি কিংবা খ্রিস্টানদের কোনো ধরনের পারস্পরিক সম্পর্ক কিংবা মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্যে সম্পর্কের কোনো নজিরও নেই।
এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল মদিনায় ৬ষ্ঠ হিজরির দিকে। সে সময় কেহ একথা ধারণা করতে পারে নি যে, মানব ইতিহাসে এমন একটি সময় আসবে যখন ইহুদি ও খ্রিস্টানরা পরস্পর বন্ধুত্বে পরিণত হবে। কুরআন মাজিদ এই ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে শত শত বছর পূর্বে।
📄 মু’জিজা নং- ১৩৪: মুশরিকদের মাধ্যমে তাদের ধর্মকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করা
আর মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। যারা নিজেদের দীনকে বিভক্ত করেছে এবং যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে (তাদেরও অন্তর্ভুক্ত হয়ো না)। প্রত্যেক দলই নিজেদের যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত। (রূম, ৩০ : ৩১-৩২)
এই আয়াতে কুরআন মাজিদ তাদের অবস্থার বর্ণনা দেয় যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যকে শরিক করে। বলাবাহুল্য, বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক প্রভাবশালী ধর্ম হল খ্রিস্টান ধর্ম, যারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর সঙ্গে অন্য প্রভুকে শরিক করে। এই আয়াত বলে, এ সকল লোক তাদের ধর্মকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করবে এবং প্রত্যেক দলই নিজেদের বিশেষ বিশ্বাস নিয়ে আনন্দিত হবে। এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় তখন মক্কায় কোনো খ্রিস্টান ছিল না। মক্কার অধিকাংশ লোকই ছিল মূর্তিপূজারী।
এই আয়াতে কুরআন মাজিদ ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে যে, খ্রিস্টানরা অবশেষে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হবে। এখন যে কেহ এই ভবিষ্যৎবাণীর সত্যতা প্রত্যক্ষ করতে পারে। পুরো খ্রিস্টান বিশ্ব বর্তমানে বহুভাগে বিভক্ত, যেখানে একদল অন্যদলকে ভ্রান্ত বলে মনে করে। এভাবে পুরো ধর্মটি বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এদের প্রত্যেকেই নিজেকে একটি ভিন্নধর্মের অনুসারী বলে মনে করে। এটি কুরআন মাজিদের অন্য একটি মু’জিজা যে, কুরআন মাজিদ এই ভবিষ্যৎবাণীটি প্রদান করেছে শত শত বছর পূর্বে।
📄 মু’জিজা নং- ১৩৫: কুরআন মাজিদকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারে নি
বাতিল এতে (কুরআন মাজিদে) অনুপ্রবেশ করতে পারে না, না পেছন থেকে, না সামনে থেকে, এটি প্রজ্ঞাময়, সপ্রশংসিতের পক্ষ থেকে নাজিলকৃত। (ফুসসিলাত, ৪১ : ৪২)
কুরআন মাজিদের ভাষ্যকারগণ বলেন, বাতিল এতে ‘সামনে থেকে’ বক্তব্যটির উদ্দেশ্য, কেহ কুরআন মাজিদের একটি সাধারণ আয়াতকে সরাসরি আক্রমণ কিংবা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। প্রমাণ করতে পারবে না তা অযথার্থ, মিথ্যা বা মেয়াদোত্তীর্ণ। আর ‘পেছন থেকে বাতিল’ দ্বারা উদ্দেশ্য, কেহ কোনো ধরনের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাধ্যমে কখনো এমন কিছু আবিষ্কার করতে পারবে না এবং এই চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হবে না যে, কুরআন মাজিদের একটি সাধারণ আয়াতও বাস্তবিকপক্ষে ত্রুটিপূর্ণ। বিগত চৌদ্দশ বছরের বিস্তৃত কাল পর্বে কুরআন মাজিদের এতদুভয় মু’জিজা সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
📄 মু’জিজা নং- ১৩৬: হজ্জের উদ্দেশে সফর
আর (হে ইবরাহিম,) মানুষের নিকট হজ্জের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং কৃশকায় উটে চড়ে দূর- দূরান্তের পথ পাড়ি দিয়ে। (হজ্জ, ২২ : ২৭)
এখানে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার অবতারণা করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। প্রথমত, আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে হজ্জের এই ঘোষণা দিতে বলেন যখন তিনি কাবা শরিফের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে। দ্বিতীয়ত, তিনি কাবা শরিফ নির্মাণ করেন একটি নিতান্ত ঊষর ও জনমানবহীন স্থানে। আমাদের আরও স্মর্তব্য যে, যখন তিনি কাবা শরিফ নির্মাণ করেন তখন মক্কা শরিফে কোনো শহর ছিল না। তৃতীয়ত, কাবা শরিফ এমন এক অঞ্চলে নির্মিত হয় যাতে কোনো ধরনের সফর ও ভ্রমণের সুবিধাদি ছিল না। রাস্তা ও সরাইখানা তো দূরের কথা, বিস্তৃত মরুভূমিতে ভ্রমণকারীদের জন্য কোথাও পানির ব্যবস্থা পর্যন্ত ছিল না। তথাপি কুরআন মাজিদ ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে যে, ভ্রমণকারীরা এই কষ্টকর ভ্রমণের ক্লান্তি সহ্য করবেন এবং দূর-দূরান্তের স্থান থেকে কাবা শরিফে এসে সমাগত হবেন। এটি একটি বাস্তব সত্য যে, এই ভবিষ্যৎবাণী বিগত চার হাজার বছর ধরে নিরন্তর বাস্তবায়িত হয়ে আসছে। প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ কাবা শরিফে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ থেকে হজ্জের সফরে আসে।