📄 মু’জিজা নং- ১২৫: মুহাজিরদের জন্য একটি উত্তম আবাসভূমি
আর যারা হিজরত করেছে আল্লাহর রাস্তায় অত্যাচারিত হওয়ার পর, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম আবাস দান করব। আর আখিরাতের প্রতিদান তো বিশাল, যদি তারা (তা) জানত। (নাহল, ১৬ : ৪১)
ইসলামের সূচনালগ্নে কাফেরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মক্কা থেকে মুসলমানদেরকে তাদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে হিজরত করতে হয়। প্রথমে তারা হিজরত করে আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়ায়) এবং পরবর্তীতে মদিনায়। উভয় সময়েই হিজরতকালে তাদের সকল সহায়-সম্পত্তি মক্কায় ফেলে যায়। ইতিহাস বলে, যখন তারা আবিসিনিয়ায় হিজরত করে তখন আবিসিনিয়ার বাদশাহ তাদেরকে পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করে। পরবর্তীতে যখন তারা মদিনায় হিজরত করে, মদিনার মুসলমানরা তাদের জন্য তাদের গৃহ ও অন্তরের দরজা উন্মোচিত করে দেয়। তারা কেবল তাদেরকে আশ্রয়ই প্রদান করে নি, বরং তাদের অর্ধেক সম্পত্তির অধিকারীও বানিয়ে দেয়। এমনকি যাদের দু’জন স্ত্রী ছিল একজনকে তালাক দিয়ে তাঁর মুহাজির মুসলিম ভাইকে দিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা এভাবে ইহজগতে তাদের উত্তম আবাস প্রদানের ভবিষ্যৎবাণীকে বাস্তবায়ন করেন।
📄 মু’জিজা নং- ১২৬: একটি বিস্ময়কর ও চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি
‘নিশ্চয় আমি তোমার জন্য মঞ্জুর করেছি একটি সুস্পষ্ট বিজয়। (ফাত্হ, ৪৮ : ০১)
এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় একটি অনন্য সাধারণ পরিস্থিতিতে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের ছয় বছর পর ১৪০০ সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে ওমরাহ করার উদ্দেশে মদিনা থেকে মক্কার দিকে রওনা হন। মক্কাবাসীরা মুসলামানদের ওমরাহ পালন প্রতিহত করতে তাঁকে শহরে প্রবেশে বাধা দেয়। অবস্থা এতই নাজুক হয়ে ওঠে যে, মুসলমান ও মক্কাবাসীদের মধ্যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। মক্কাবাসীরা তখন একটি শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্য একটি প্রতিনিধি দল পাঠায়। চুক্তির পুরো প্রক্রিয়া এবং তার অধিকাংশ ধারা বাহ্যত মুসলামানদের জন্য পরাজয় ও অবমাননাকর ছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লেখককে লিখতে বললেন, ‘এটি আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ ও মক্কাবাসীদের মধ্যে সন্ধিপত্র।’ তখন মক্কার প্রতিনিধি দলের প্রধান বলল, সে তাঁকে আল্লাহর রাসুল মনে করে না। তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লেখককে ‘আল্লাহর রাসুল’ কথাটি মুছে ফেলতে বললেন এবং লিখতে বললেন, এটি আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ ও মক্কাবাসীদের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র।’ এটি মুসলমানদেরকে খুব বেশি মনঃক্ষুণ্ণ করে।
চুক্তিপত্রে আরও বলা হয়, যদি কোনো মুসলমান মক্কা থেকে মদিনায় পালিয়ে যায় তবে তাঁকে মক্কার কাফিরদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। পক্ষান্তরে, যদি কোনো মুসলমান মদিনা থেকে মক্কায় পালিয়ে আসে তবে তাঁকে মদিনার মুসলামানদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না। এটি মুসলমানদের আরও বেশি পীড়িত করে। যখন সন্ধিচুক্তি লিখিত হচ্ছিল এমন সময় একজন পলাতক মুসলিম মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আসলেন এবং তাঁকে মুসলমানদের সঙ্গে থাকতে দিতে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। সাহাবায়ে কেরাম দেখতে পেলেন, লোকটি শৃঙ্খলবদ্ধ এবং তার শরীরে দৈহিক নির্যাতনের চিহ্ন সুস্পষ্ট। যেহেতু সন্ধিচুক্তিতে এখনও সই করা হয় নি, তাই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকটিকে মুসলমানদের সঙ্গে অবস্থানের অনুমতি দিতে চাইলেন। মক্কার লোকেরা যুক্তি পেশ করল, এটিও সন্ধির একটি ধারা এবং লোকটিকে মক্কাবাসীদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই পরিস্থিতিতে তা মেনে নিলেন। মুসলমানরা এতে সাংঘাতিকভাবে মর্মাহত হল এবং এতে তারা পরাজয় ও অবমাননা বোধ করল। এহেন পরিস্থিতিতে এই বার্তা নিয়ে ওহি অবতীর্ণ হয় যে, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে একটি সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছেন।
পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করে, এই চুক্তি ছিল মুমিনদের জন্য সুস্পষ্ট বিজয়। এই চুক্তি মদিনার মুসলমানদের অধিক নিরাপত্তা ও শান্তি প্রদান করে। তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এবং চারপাশের সকল গোত্র ও তাদের এলাকাগুলো জয় করে নেয়। দুই বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে তারা এতই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, অষ্টম হিজরি সনে তাঁরা ১০,০০০ সৈন্যের একটি শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করে এবং কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াই শহরটি অধিকার করে নেয়। যখন মক্কা মুসলমানদের অধীনে এল আরব উপদ্বীপের সকল প্রান্ত থেকে বিভিন্ন গোত্র মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে ইসলামে দীক্ষিত হতে লাগল। অল্প সময়ের মধ্যে পুরো দেশ ইসলামের পতাকাতলে চলে এল। মুসলমানরা তখন বুঝতে পারল, সন্ধিচুক্তি তাদের জন্য একটি সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে।
📄 মু’জিজা নং- ১২৭: ইহুদিদের সঙ্গে মুনাফিকদের বিশ্বাসঘাতকতা
তুমি কি মুনাফিকদের দেখনি যারা আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে তাদের ভাইদেরকে (ইহুদিদের) বলে, ‘তোমাদের বের করে দেয়া হলে আমরাও অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে বেরিয়ে যাব এবং তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা হলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব।’ আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা মিথ্যাবাদী। তারা (ইহুদিরা) যদি বহিষ্কৃত হয় এরা (মুনাফিকরা) কখনো তাদের সঙ্গে বেরিয়ে যাবে না। আর তাদের সঙ্গে যদি যুদ্ধ করা হয় এরা কখনো তাদের সাহায্য করবে না। (হাশর, ৫৯ : ১১-১২)
আয়াতদ্বয় ইহুদি গোত্র বনু নাযিরকে নির্দেশ করছে। তারা মুসলমানদের সঙ্গে একটি সন্ধিচুক্তি সই করেছিল। যেহেতু তারা বারবার তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে চতুর্থ হিজরি সনে দশ দিনের মধ্যে মদিনা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে আল্টিমেটাম (সময়সীমা বেঁধে) দেন। মদিনার মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তাদেরকে এই বলে বার্তা পাঠায় যে, সে তাদের সাহায্যে ২,০০০ সৈন্যের একটি দল নিয়ে আসছে এবং সে তাদেরকে মদিনা ছেড়ে যেতে বারণ করে। সে এও নিশ্চয়তা দেয় যে, তারা যদি মদিনা ছেড়ে চলে যায়, সেও তাদের অনুগামী হবে। ইতিহাস বলে, বনু নাযির দশ দিনের মধ্যে মদিনা থেকে বহিষ্কৃত হয়। মুনাফিকরা না তাদেরকে সাহায্য করতে আসে, আর না মদিনা থেকে চলে যাওয়ার সময় তাদের অনুগামী হয়।
📄 মু’জিজা নং- ১২৮: শত্রুদের ইসলাম গ্রহণ
যাদের সঙ্গে তোমরা (এখন) শত্রুতা করছ, আশা করা যায় আল্লাহ তোমাদের ও তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। আর আল্লাহ তাআলা (সবকিছুর ওপর) সর্বশক্তিমান এবং আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (মুমতাহিনা, ৬০ : ০৭)
মুসলমানরা পৌত্তলিক কাফেরদেরকে ঘৃণা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাদের হাতে তারা অকথ্য নির্যাতন ভোগ করেছে। এই মূর্তিপূজকরা কেবল তাদেরকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করেই ক্ষান্ত হয় নি, বরং তারা মদিনায় তাদের ছোট্ট কমিউনিটিকেও ধ্বংস করতে সচেষ্ট ছিল। এটি একটি সম্পূর্ণ অসম্ভব বিষয় যে, মুসলমানরা তাদেরকে কখনো ভালবাসবে।
কিন্তু ইতিহাস বলে, মূর্তিপূজারীদের অধিকাংশ নেতাই পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে। আবু সুফিয়ান, সাহল ইবনে উমর, হাকীম ইবনে হাযাম, ইকরামা ইবনে আবু জেহেলের মত ব্যক্তিগণ, যারা ছিল ইসলামের ঘোর দুশমন, তারা পরবর্তীতে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করে এবং সকল মুসলমানের ভালবাসা ও বন্ধুত্ব লাভ করে।