📄 মু’জিজা নং- ১২১: অবিশ্বাসীর কাফিরদের পরাজয়
(হে মুহাম্মদ) তুমি কাফিরদেরকে বল, তোমরা অচিরেই পরাজিত হবে এবং তোমাদেরকে জাহান্নামের দিকে সমবেত করা হবে। আর সেটি কতইনা নিকৃষ্ট আবাসস্থল। (আলে-ইমরান, ০৩ : ১২)
তোমরা (মক্কার) কাফিররা কি তাদের (নূহ, সালিহ, লূত প্রমুখের কওম) থেকে ভাল? না কি তোমাদের জন্য মুক্তির কোনো ঘোষণা রয়েছে (আসমানি) কিতাবসমূহে? না কি তারা বলে, ‘আমরা সংঘবদ্ধ বিজয়ী দল’? (হে মুহাম্মদ) তাদের সংঘবদ্ধ দলটি শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পিঠ দেখিয়ে পালাবে। (ক্বামার, ৫৪ : ৪৩-৪৫)
সুরা ক্বামারের আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়েছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বে। তখন মুসলমানরা এতই নিপীড়িত ও দুর্বল ছিল যে, তাদের একদলকে ইথিওপিয়ায় হিজরত করতে হয়েছে। অপরদিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরিবারবর্গসহ মক্কার বাইরে একটি ঊষর উপত্যকায় নির্বাসিত ও বয়কটের স্বীকার হন। এমন প্রেক্ষাপটে এই আয়াতসমূহ মক্কার কাফিরদের পরাজয়ের ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। সুরা আলে ইমরানের আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাদানী জীবনের প্রথম দিকে। এসময় মুসলমানরা ছিল সর্বদা উৎকণ্ঠা ও ভীতির মধ্যে। মক্কার কাফিররা তখন মদিনার ওপর একটি বড় ধরনের আক্রমণ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একই সময়ে মদিনার ইহুদিরা মক্কাবাসীদের সঙ্গে মিলে মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য ফন্দি আঁটছিল। অধিকন্তু মুহাজির মুসলিমরা তাদের সকল সহায়-সম্পত্তি মক্কায় ফেলে এসেছিল এবং মদিনার মুসলিম অধিবাসীদের ওপর তারা অর্থনৈতিক ও বস্তুগতভাবে অতিরিক্ত ভার হিসেবে আপতিত হয়েছিল। এমনতর পরিস্থিতিতে কুরআন মাজিদ ভবিষ্যৎবাণী করে যে, কেবল মদিনার ইহুদি এবং মক্কার কাফিররা নয় বরং যারা ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করেছে শীঘ্রই তারা পরাজিত হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে, এই ভবিষ্যৎবাণী বাস্তব রূপ লাভ করে হিজরতের দ্বিতীয় বছর, যখন কাফির বাহিনী বদর প্রান্তরে পরাজিত হয়।
📄 মু’জিজা নং- ১২২: মক্কা থেকে অমুসলিমদের বিতাড়ন
আর তাদের (অমুসলিমদের) অবস্থা এমন ছিল যে, তারা তোমাকে (মক্কার) জমিন থেকে উৎখাত করে দিবে যাতে তোমাকে সেখান থেকে বের করে দিতে পারে এবং তখন তারা তোমার পরে স্বল্প সময়ই (মক্কায়) টিকে থাকতে পারত। (বনী ইসরাইল, ১৭ : ৭৬)
এসব আয়াত অবতরনের এক বছর পর মক্কার মুশরিকরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করে এবং তাঁকে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করে। সে সময় কেহ এ কথা বিশ্বাস করতে পারে নি যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরবর্তীতে মক্কা থেকে মুশরিকদের বহিষ্কার করবেন। ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে, হিজরী অষ্টম বর্ষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন বিজেতার বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন। অধিকন্তু, দুই বছর পর, কুরআন মাজিদের নবম সুরায় বর্ণিত আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুসারে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে সকল মুশরিক ও অমুসলিমদের বহিষ্কার করেন। কুরআন মাজিদের এই ভবিষ্যৎবাণী তাঁর পূর্ণ মর্ম সহকারে বাস্তবতার রূপ পরিগ্রহ করে এবং এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে কোনো কাফিরই মক্কায় বসবাস করত না।
📄 মু’জিজা নং- ১২৩: মদিনা থেকে মুনাফিকদের বহিষ্কার
যদি মুনাফিকরা ও যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা এবং (মদিনা) শহরে মিথ্যা সংবাদ প্রচারকারীরা বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে ক্ষমতাবান করে দেব। অতঃপর তারা সেখানে তোমার প্রতিবেশি হয়ে অল্প সময়ই থাকবে। (আহযাব, ৩৩ : ৬০)
মদিনায় মুসলমানদের শক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুনাফিকদের সংখ্যা দিন দিন ভারি হতে থাকে। তাদের কেহ কেহ যোগ দেয় ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য। অন্যরা যোগ দেয় মুসলমানদের ঐক্য ও শক্তিকে বিনষ্ট করার জন্য। ৩য় হিজরি সনে উহুদ যুদ্ধে ৩,০০০ সৈন্যের একটি মুসলিম বাহিনী মক্কা থেকে আক্রমণ করতে আসা ১০,০০০ সশস্ত্র কাফির দলের মুকাবিলায় মদিনা থেকে রওনা করে। পরবর্তীতে ৭০০ জনের একটি দল মুসলিম বাহিনী থেকে একটি খোঁড়া অজুহাতে মদিনায় ফিরে আসে। তাদের সকলেই ছিল মুনাফিক। এটি পাঠককে মদিনায় মুনাফিকদের সংখ্যা ও শক্তি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে সাহায্য করবে। এই আয়াতে কুরআন মাজিদ মুনাফিকদের সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে যে, তারা মদিনায় থাকতে পারবে না। ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে যে, মুনাফিকদের প্রতিপত্তি সেখানে ধুলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবদ্দশাতেই মদিনা একটি নির্ভেজাল আদর্শ মুসলিম সমাজে পরিণত হয়েছিল।
📄 মু’জিজা নং- ১২৪: মুমিনদের বিজয়
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এই মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে জমিনে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাঁদের পূর্ববর্তীদের এবং তিনি অবশ্যই তাঁদের জন্য শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন তাঁদের দীনকে, যা তিনি তাঁদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তিনি তাঁদের ভয়-ভীতি (এর অবস্থা) শান্তি-নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। (নূর, ২৪ : ৫৫)
এই আয়াত অবতীর্ণ হয় যখন সবেমাত্র মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরত করেছেন। এটি অবশ্যই লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, তখন মুসলমানরা নিত্য ভয়-ভীতি ও শঙ্কায় কালাতিপাত করতেন। মক্কার কাফিরদের পক্ষ থেকে আক্রমণের শঙ্কা সদা বিরাজ করত এবং মদিনার ইহুদিদের বিরুদ্ধাচরণের ভয়ও ছিল। পরিস্থিতি এতই সঙ্কটাপন্ন ছিল যে, কিছু কিছু সাহাবি কেঁদে উঠে বলেন, ‘এমন কোনো দিন ছিল না যখন আমরা আমাদের শরীর থেকে রণসজ্জা ত্যাগ করতে পারি এবং শত্রুদের পক্ষ থেকে আক্রমণের ভয় ব্যতিরেকে কোনো সকাল কিংবা সন্ধ্যা অতিক্রম করতে পারি।’ এই ছিল অবস্থা যখন কুরআন মাজিদ তিনটি বিশেষ ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। প্রথমত. আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাঁর জমিনে শক্তিশালী করবেন। দ্বিতীয়ত. তিনি তাঁদের দীনকে (ইসলামকে) সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন। আর তৃতীয়ত. তিনি তাঁদের ভয়-ভীতির অবস্থাকে শান্তি ও নিরাপত্তায় বদলে দেবেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, খায়বার, যা ছিল ইহুদিদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধ, যা সংঘটিত হয় হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে-এতে ইহুদিরা মুসলমানদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। দেশের রাজধানী শহর মক্কার কাফিররা মুসলমানদের কাছে আত্মসমর্পণ করে হিজরি অষ্টম শতাব্দীতে। ইসলাম তখন রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয় এবং মুসলমানরা একটি শান্তিময় ও নিরাপদ রাষ্ট্র লাভ করে। এভাবে দশ বছরের সংক্ষিপ্ত পরিসরে কুরআন মাজিদের ভবিষ্যৎবাণীসমূহ বাস্তব রূপ লাভ করে।