📄 মু’জিজা : ১১৮: সময়ের আপেক্ষিকতা
আর তারা তোমাকে আজাব ত্বরান্বিত করতে বলে। অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। আর তোমার রবের নিকট নিশ্চয় একদিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান। (হজ্জ, ২২ : ৪৭)
ফেরেশতাগণ ও রূহ এমন একদিনে আল্লাহর পানে ঊর্ধ্বগামী হবে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর। (মা‘আরিজ, ৭০ : ০৪)
একজন সাধারণ পাঠক এই আয়াতগুলিকে কুরআন মাজিদের একটি অসঙ্গতি বলে ধরে নিতে পারে। বর্তমানে আপেক্ষিক তত্ত্ব (The theory of relativity) প্রমাণ করেছে যে, সময় হল একটি আপেক্ষিক ধারণা। আর তাই তা পরিবেশ ও অবস্থা অনুসারে পরিবর্তিত হতে পারে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন দেখিয়েছেন, সময়- ভর ও গতিবেগের ওপর নির্ভরশীল এবং তা অভিকর্ষশক্তির ওপরও নির্ভর করে। এখন এটা প্রমাণিত যে, পৃথিবীতে ও মহাশূন্যে সময়ের ব্যাপারটি একই রকম নয়। কুরআন মাজিদ সময়ের এই আপেক্ষিকতার ধারণার সত্যতা স্বীকার করেছে আইনস্টাইন তা আবিষ্কার করারও শত শত বছর আগে।
বিগত পৃষ্ঠাগুলি কুরআন মাজিদের বিস্ময়কর প্রকৃতির সঙ্গে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। পৃথিবীর আকৃতি-সম্পর্কিত বিস্ময়কর বর্ণনা, কুরআন মাজিদে শব্দসমূহের সংখ্যাগত সাদৃশ্য, মহাশূন্যে মানুষের পরিভ্রমণ ইত্যাদি আরও উজ্জ্বল প্রমাণ সরবরাহ করে যে, কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার কালাম। এই পৃষ্ঠাগুলিও এমন অনেক ফেনোমেনার বর্ণনা দেয় যা ছিল সেই পরিবেশে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, যেখানে কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও, কুরআন মাজিদ এসব ফেনোমেনার যথার্থ ও সঠিক বর্ণনা প্রদান করে। অধিকন্তু এই পৃষ্ঠাগুলি এমন অনেক ঘটনারও বর্ণনা দেয় যা ছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অজানা এবং সেসব লোকদেরও অজ্ঞাত যাদের প্রতি এই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। তথাপি এসব বর্ণনার প্রতিটিই সত্য ও যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে।
পূর্ববর্তী যুগের মুসলমানরা এসব আয়াতকে কুরআন মাজিদের রহস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। যতদিন তাঁরা এসব রহস্যের পাঠোদ্ধারের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অধিকারী হতে পারেন নি, তাঁরা সেগুলিকে আল্লাহ তাআলার কালাম বলে গ্রহণ করে নিয়েছিল। মানুষের জ্ঞানের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী যুগের মুসলমানরা তাদের জ্ঞানের পরিসীমা অনুসারে এসব ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়। এভাবে প্রত্যেক যুগের মুসলমানরাই কুরআন মাজিদের কিছু কিছু রহস্যকে ইতিহাস ও বিজ্ঞানের বাস্তবতায় রূপায়িত করেন। এভাবেই কুরআন মাজিদ সকল প্রজন্মের মানুষের জন্য একটি জীবন্ত মু’জিজা হিসেবে চলমান থেকেছে। কুরআন মাজিদ সর্বদাই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে এবং তা ভবিষ্যতেও সর্বদা মানব জ্ঞানের পরিধিকে ছাপিয়ে তার শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ রাখবে। এটি মানুষের জন্য সর্বদা একটি শাশ্বত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিরাজিত থাকবে। সব যুগের মানুষই কুরআন মাজিদের নতুন নতুন মু’জিজা আবিষ্কার করেছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
আর আসমানসমূহ ও জমিনে কত নিদর্শন রয়েছে, যা তারা অতিক্রম করে চলে যায়, অথচ সেগুলো থেকে তারা বিমুখ। তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (ইবাদতে) শিরক করা অবস্থায়। আর তারা কি নিরাপদ বোধ করছে যে, তাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সর্বগ্রাসী আজাব আসবে না, অথবা হঠাৎ তারা টের না পেতেই কিয়ামত উপস্থিত হবে না? (ইউসুফ, ১২ : ১০৫-১০৭)
📄 মু’জিজা নং- ১১৯: রোমানদের বিজয়
রোমানরা পরাজিত হয়েছে। নিকটবর্তী অঞ্চলে। আর তারা তাদের এ পরাজয়ের পরে অচিরেই বিজয়ী হবে। কয়েক বছরের মধ্যেই। ভূত ও ভবিষ্যতের সব ফয়সালা আল্লাহরই। আর সেদিন মুমিনরাও আনন্দিত হবে। (রূম, ৩০ : ০২-০৪)
এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ৬ বছর পূর্বে, মোতাবেক ৬১৫-১৬ খ্রিস্টাব্দে। এই সময় পারসিয়ানরা রোমানদের পরাজিত করে এবং তাদেরকে জেরুজালেমসহ তাদের অধিকাংশ ভূখন্ড থেকে উচ্ছেদ করে। এটি সম্পূর্ণ কল্পনাতীত ছিল যে, অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। আর রোমানরা আক্রমণ করে পারসিয়ানদেরকে একই ধরনের পরাজয়ের স্বাদ আস্বাদন করাবে। যদিও কুরআন মাজিদ তেমনটি ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। মক্কার কাফিররা একথা শুনে এতই বিস্মিত হয় যে, তারা আবু বকর রা.- যিনি সর্বপ্রথম পুরুষ হিসেবে ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন-এর সঙ্গে একথার সত্যতার বিরুদ্ধে বড় ধরনের বাজি ধরে বসে। ঠিক আট বছরের মাথায় এই ভবিষ্যৎবাণী বাস্তব রূপ লাভ করে। রোমানরা কেবল তাদের হারানো এলাকাগুলি ফিরিয়েই পায় নি, বরং পারস্য সাম্রাজ্যকে সংকুচিত করে পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়।
যেহেতু রোমানরা ছিল খ্রিস্টান এবং পারসিকরা অগ্নিপূজারী, তাই মুসলমানদের সহানুভূতি ছিল রোমানদের প্রতি এবং মক্কার কাফেরদের সহানুভূতি ছিল পারসিকদের প্রতি। অতএব পারসিকদের কাছে রোমানদের পরাজয় মুসলমানদের ব্যথিত করল। কুরআন মাজিদ এই আয়াতগুলিতে এও ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে যে, মুসলমানরা অচিরেই আনন্দিত হবে। এই ভবিষ্যৎবাণীর বাস্তবায়ন ঘটে একটি বিস্ময়কর পন্থায়। দ্বিতীয় হিজরিতে বদর যুদ্ধ ছিল এক হাজার (১,০০০) সশস্ত্র কাফিরের সঙ্গে ৩১৩ জনের একটি দুর্বল নিরস্ত্র মুসলিম বাহিনীর প্রথম মুখোমুখি সংঘর্ষ। মুসলমানরা সব ধরনের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে, কাফিরদের পরাজিত করে। এই বিজয় প্রকৃতই মুসলমানদের জন্য আনন্দ ও খুশি বয়ে এনেছিল। এটি একটি বিস্ময়কর কাকতালীয় ব্যাপার যে, মুসলমানদের কাছে রোমানদের বিজয়ের সংবাদ ঠিক সেদিনই এসে পৌঁছেছিল যেদিন মক্কার মুশরিকদেরকে বদর প্রান্তরে তারা পরাজিত করেছিল। কুরআন মাজিদের উভয় ভবিষ্যৎবাণীই, এভাবে, বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ পায়।
📄 মু’জিজা নং- ১২০: আবু লাহাবের ধ্বংস
‘ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দু’হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার ধন-সম্পদ এবং যা সে অর্জন করেছে তা তাঁর কাজে আসবে না। অচিরেই সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে।’ (লাহাব, ১১১ : ০১-০৩)
এটিই কুরআন মাজিদের একমাত্র স্থান যেখানে ইসলামের একজন শত্রুকে তাঁর নাম ধরে তিরস্কৃত করা হয়েছে। আবু লাহাব ছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা এবং তাঁর সবচেয়ে কঠিন শত্রু। সে ছিল খুব ধনী এবং মক্কার অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। সে তার সকল সহায় সম্পত্তি ও ক্ষমতা নিযুক্ত করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কষ্ট ও নির্যাতন পৌঁছাতে এবং তাঁকে ইসলাম প্রচার থেকে নিবৃত করতে। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটবর্তী প্রতিবেশী হওয়ায় প্রায় প্রতি রাতেই তাঁর নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটাত। এও বর্ণিত আছে যে, সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিবারের সদস্যদেরকে প্রাত্যহিক খাবার প্রস্তুত করার ক্ষেত্রেও সে ব্যাঘাত ঘটাত। উপরোল্লিখিত আয়াতগুলি আবু লাহাব সম্পর্কে কিছু বিশেষ ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে।
কুরআন মাজিদের বর্ণনা, ‘অচিরেই সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে।’ ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে যে, সে কাফির হিসেবেই মৃত্যুবরণ করবে। আবু লাহাব যদি তাঁর ন্যূনতম জ্ঞানকে ব্যবহার করত, সে লৌকিকভাবে (মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে হলেও) ইসলাম গ্রহণ করতে পারত এবং এই দাবি করতে পারত যে, কুরআন মাজিদের এই বর্ণনা ‘সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে’ মিথ্যা। তবে, বাস্তবতা হল, সে কাফির হিসেবেই মৃত্যুবরণ করেছে। তাঁর চূড়ান্ত আবাস হবে জাহান্নামের তেমন একটি স্থান, যাকে কুরআন মাজিদ ‘একটি লেলিহান অগ্নিকুন্ড’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কুরআন মাজিদের বর্ণনা, ‘ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।’ এটিও একটি ভবিষ্যৎবাণী। এখানে যা ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে এমন ঘটনাকে কুরআন মাজিদে অতীতকালীন শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে, যা ছয় বছর পরে বাস্তব রূপ লাভ করে, যখন মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লাঞ্ছনদায়ক পরাজয়ের মনোকষ্টে ভুগছিল।
কুরআন মাজিদের ভাষ্য, ‘তার ধন-সম্পদ এবং যা সে উপার্জন করেছে তা তাঁর কাজে আসবে না।’- বাস্তবরূপ লাভ করেছে ধিক্কারজনক ও বীভৎস মৃত্যুর মাধ্যমে। সে সংক্রামক ফুসকুড়ি রোগে আক্রান্ত হয়েছিল এবং পরিবারের সকল সদস্য থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরও কেহ তিনদিন যাবৎ তাঁর মৃতদেহের কাছে আসে নি। যখন মৃতদেহ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে, মক্কাবাসীরা তাঁর সন্তানদের ধিক্কার দিতে শুরু করল। তখন তারা কিছু লোক ভাড়া করে। তারা তাঁর মৃতদেহটিকে কাঠ দিয়ে ঠেলে ঠেলে একটি গর্তে ফেলে দেয়। তাঁর সম্পদ তাঁকে কোনো সাহায্য করতে পারে নি, এমনকি সাধারণ দাফনকার্য পর্যন্ত তাঁর ভাগ্যে জোটে নি। কুরআন মাজিদের এই তিন ভবিষ্যৎবাণীই শব্দে শব্দে বাস্তব রূপ লাভ করেছে।
📄 মু’জিজা নং- ১২১: অবিশ্বাসীর কাফিরদের পরাজয়
(হে মুহাম্মদ) তুমি কাফিরদেরকে বল, তোমরা অচিরেই পরাজিত হবে এবং তোমাদেরকে জাহান্নামের দিকে সমবেত করা হবে। আর সেটি কতইনা নিকৃষ্ট আবাসস্থল। (আলে-ইমরান, ০৩ : ১২)
তোমরা (মক্কার) কাফিররা কি তাদের (নূহ, সালিহ, লূত প্রমুখের কওম) থেকে ভাল? না কি তোমাদের জন্য মুক্তির কোনো ঘোষণা রয়েছে (আসমানি) কিতাবসমূহে? না কি তারা বলে, ‘আমরা সংঘবদ্ধ বিজয়ী দল’? (হে মুহাম্মদ) তাদের সংঘবদ্ধ দলটি শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পিঠ দেখিয়ে পালাবে। (ক্বামার, ৫৪ : ৪৩-৪৫)
সুরা ক্বামারের আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়েছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বে। তখন মুসলমানরা এতই নিপীড়িত ও দুর্বল ছিল যে, তাদের একদলকে ইথিওপিয়ায় হিজরত করতে হয়েছে। অপরদিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরিবারবর্গসহ মক্কার বাইরে একটি ঊষর উপত্যকায় নির্বাসিত ও বয়কটের স্বীকার হন। এমন প্রেক্ষাপটে এই আয়াতসমূহ মক্কার কাফিরদের পরাজয়ের ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। সুরা আলে ইমরানের আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাদানী জীবনের প্রথম দিকে। এসময় মুসলমানরা ছিল সর্বদা উৎকণ্ঠা ও ভীতির মধ্যে। মক্কার কাফিররা তখন মদিনার ওপর একটি বড় ধরনের আক্রমণ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একই সময়ে মদিনার ইহুদিরা মক্কাবাসীদের সঙ্গে মিলে মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য ফন্দি আঁটছিল। অধিকন্তু মুহাজির মুসলিমরা তাদের সকল সহায়-সম্পত্তি মক্কায় ফেলে এসেছিল এবং মদিনার মুসলিম অধিবাসীদের ওপর তারা অর্থনৈতিক ও বস্তুগতভাবে অতিরিক্ত ভার হিসেবে আপতিত হয়েছিল। এমনতর পরিস্থিতিতে কুরআন মাজিদ ভবিষ্যৎবাণী করে যে, কেবল মদিনার ইহুদি এবং মক্কার কাফিররা নয় বরং যারা ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করেছে শীঘ্রই তারা পরাজিত হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে, এই ভবিষ্যৎবাণী বাস্তব রূপ লাভ করে হিজরতের দ্বিতীয় বছর, যখন কাফির বাহিনী বদর প্রান্তরে পরাজিত হয়।