📄 মু’জিজা : ১১৬: পৃথিবীর চারপাশে সুরক্ষিত ছাদ
আর আমি (আল্লাহ) আসমানকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ (পৃথিবীর চতুর্দিকে); কিন্তু তারা তাঁর নিদর্শনাবলি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। (আম্বিয়া, ২১ : ৩২)
পৃথিবীর চারপাশে যে বায়ুমন্ডল বেষ্টন করে আছে তা আমাদের জীবনের জন্য সহায়ক সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করে যায়। মহাকাশীয় ভৌত রসায়নবিদ্যার সাম্প্রতিক অগ্রগতি আমাদেরকে এই বিষয়টি এবং উল্লিখিত আয়াত অনুধাবন ও হৃদয়াঙ্গম করার জ্ঞান প্রদান করেছে।
বায়ুমন্ডল সেসব উল্কাকে ধ্বংস করে দেয় যা পৃথিবী অভিমুখে আসার চেষ্টা করে; পাছে যাতে তা সকল প্রকার জীবের ধ্বংসের কারণ না হয়।
পৃথিবীর চারপাশে যে ওজোন-স্তর আছে তা মহাশূন্য থেকে আগত আলোক রশ্মিসমূহের জন্য ছাকনির কাজ করে। তা কেবল ক্ষতিকর নয় এমন এবং উপকারী রশ্মিসমূহকেই মহাশূন্য থেকে প্রবেশের অনুমতি দেয়। বায়ুমন্ডল পৃথিবীকে মহাশূন্যের জমানো ঠান্ডা থেকেও রক্ষা করে, যা আনুমানিক মাইনাস ২৭০. সেন্টিগ্রেড।
বায়ুমন্ডল একটি চৌম্বক স্তর ধারণ করে যাকে বলা হয় Van Allen Belt। এটি সেসব ক্ষতিকর আলোক রশ্মির বিরুদ্ধে ঢালের কাজ দেয়, যা আমাদের এই গ্রহের দিকে বিস্ফোরিত হয়। এসব বিস্ফোরণের একটি যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে তা হিরোশিমায় যে পারমাণবিক বোমা নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সে ধরনের ১০০ বিলিয়ন পারমাণবিক বোমার শক্তির সমান।
সংক্ষেপে বলা চলে, বায়ুমন্ডলে একটি শক্তিশালী সিস্টেম কাজ করে, তা যেন পৃথিবীর চারপাশে একটি সুরক্ষিত ছাদ। বৈজ্ঞানিকরা কেবল সম্প্রতিই তা উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে, যা কুরআন বর্ণনা করেছে শত শত বছর পূর্বে।
📄 মু’জিজা : ১১৭: আবর্তনকারী আকাশ
কসম, আবর্তন প্রক্রিয়াসম্পন্ন আসমানের। (তারিক, ৮৬ : ১১)
কুরআন মাজিদ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুবই স্বতন্ত্র। প্রায়ই আমরা তাঁর একটি শব্দ, শব্দটির তাৎপর্য ও আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক উদ্ঘাটনের চেষ্টা ব্যতিরেকে অনুধাবন করতে পারি না। উপরোক্ত আয়াত বলে যে, আসমানে একটি চক্রাবর্ত রয়েছে।
এখন এটা ভালভাবে জানা যে, পৃথিবীর চারপাশে যে বায়ুমন্ডল আছে তার অনেক স্তর রয়েছে। প্রত্যেক স্তরেরই বস্তু কিংবা রশ্মিকে মহাশূন্যে ফিরিয়ে দেয়া কিংবা পৃথিবীতে পুনরায় নামিয়ে দেয়ার নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে। নিম্নে বায়ুমন্ডলের সেসব চক্রাবর্তের একটি সংক্ষিপ্ত নমুনা দেওয়া হল :
বায়ুমন্ডলের যে স্তরকে Trophosphere বা বারিমন্ডল বলা হয় তা জলীয় বাষ্পকে ঘনীভূত হওয়া এবং তা বৃষ্টির আকারে পৃথিবীতে আসতে সাহায্য করে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫ কিলোমিটার ওপরে যে ওজন স্তর রয়েছে তা ক্ষতিকর অতি বেগুনী রশ্মিকে প্রতিফলিত করে মহাশূন্যে ফিরিয়ে দেয়।
আয়নমন্ডল নামে যে স্তর রয়েছে তা পৃথিবী থেকে সম্প্রচারিত বেতার তরঙ্গকে প্রতিফলিত করে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ফেরত পাঠায়।
‘চৌম্বকমন্ডল’ নামে যে স্তর রয়েছে তা সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্র থেকে নির্গত ক্ষতিকর বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় উপাদান মহাশূন্যে ফেরত পাঠায়।
কুরআন মাজিদ ‘আবর্তনকারী’ বা ‘চক্রাবর্ত সাধনকারী’ আসমান পরিভাষা ব্যবহারের এটি একটি কারণ হতে পারে। কেবল আল্লাহ তাআলাই প্রকৃত সত্য সম্পর্কে অবগত।
📄 মু’জিজা : ১১৮: সময়ের আপেক্ষিকতা
আর তারা তোমাকে আজাব ত্বরান্বিত করতে বলে। অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। আর তোমার রবের নিকট নিশ্চয় একদিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান। (হজ্জ, ২২ : ৪৭)
ফেরেশতাগণ ও রূহ এমন একদিনে আল্লাহর পানে ঊর্ধ্বগামী হবে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর। (মা‘আরিজ, ৭০ : ০৪)
একজন সাধারণ পাঠক এই আয়াতগুলিকে কুরআন মাজিদের একটি অসঙ্গতি বলে ধরে নিতে পারে। বর্তমানে আপেক্ষিক তত্ত্ব (The theory of relativity) প্রমাণ করেছে যে, সময় হল একটি আপেক্ষিক ধারণা। আর তাই তা পরিবেশ ও অবস্থা অনুসারে পরিবর্তিত হতে পারে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন দেখিয়েছেন, সময়- ভর ও গতিবেগের ওপর নির্ভরশীল এবং তা অভিকর্ষশক্তির ওপরও নির্ভর করে। এখন এটা প্রমাণিত যে, পৃথিবীতে ও মহাশূন্যে সময়ের ব্যাপারটি একই রকম নয়। কুরআন মাজিদ সময়ের এই আপেক্ষিকতার ধারণার সত্যতা স্বীকার করেছে আইনস্টাইন তা আবিষ্কার করারও শত শত বছর আগে।
বিগত পৃষ্ঠাগুলি কুরআন মাজিদের বিস্ময়কর প্রকৃতির সঙ্গে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। পৃথিবীর আকৃতি-সম্পর্কিত বিস্ময়কর বর্ণনা, কুরআন মাজিদে শব্দসমূহের সংখ্যাগত সাদৃশ্য, মহাশূন্যে মানুষের পরিভ্রমণ ইত্যাদি আরও উজ্জ্বল প্রমাণ সরবরাহ করে যে, কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার কালাম। এই পৃষ্ঠাগুলিও এমন অনেক ফেনোমেনার বর্ণনা দেয় যা ছিল সেই পরিবেশে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, যেখানে কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও, কুরআন মাজিদ এসব ফেনোমেনার যথার্থ ও সঠিক বর্ণনা প্রদান করে। অধিকন্তু এই পৃষ্ঠাগুলি এমন অনেক ঘটনারও বর্ণনা দেয় যা ছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অজানা এবং সেসব লোকদেরও অজ্ঞাত যাদের প্রতি এই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। তথাপি এসব বর্ণনার প্রতিটিই সত্য ও যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে।
পূর্ববর্তী যুগের মুসলমানরা এসব আয়াতকে কুরআন মাজিদের রহস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। যতদিন তাঁরা এসব রহস্যের পাঠোদ্ধারের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অধিকারী হতে পারেন নি, তাঁরা সেগুলিকে আল্লাহ তাআলার কালাম বলে গ্রহণ করে নিয়েছিল। মানুষের জ্ঞানের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী যুগের মুসলমানরা তাদের জ্ঞানের পরিসীমা অনুসারে এসব ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়। এভাবে প্রত্যেক যুগের মুসলমানরাই কুরআন মাজিদের কিছু কিছু রহস্যকে ইতিহাস ও বিজ্ঞানের বাস্তবতায় রূপায়িত করেন। এভাবেই কুরআন মাজিদ সকল প্রজন্মের মানুষের জন্য একটি জীবন্ত মু’জিজা হিসেবে চলমান থেকেছে। কুরআন মাজিদ সর্বদাই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে এবং তা ভবিষ্যতেও সর্বদা মানব জ্ঞানের পরিধিকে ছাপিয়ে তার শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ রাখবে। এটি মানুষের জন্য সর্বদা একটি শাশ্বত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিরাজিত থাকবে। সব যুগের মানুষই কুরআন মাজিদের নতুন নতুন মু’জিজা আবিষ্কার করেছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
আর আসমানসমূহ ও জমিনে কত নিদর্শন রয়েছে, যা তারা অতিক্রম করে চলে যায়, অথচ সেগুলো থেকে তারা বিমুখ। তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (ইবাদতে) শিরক করা অবস্থায়। আর তারা কি নিরাপদ বোধ করছে যে, তাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সর্বগ্রাসী আজাব আসবে না, অথবা হঠাৎ তারা টের না পেতেই কিয়ামত উপস্থিত হবে না? (ইউসুফ, ১২ : ১০৫-১০৭)
📄 মু’জিজা নং- ১১৯: রোমানদের বিজয়
রোমানরা পরাজিত হয়েছে। নিকটবর্তী অঞ্চলে। আর তারা তাদের এ পরাজয়ের পরে অচিরেই বিজয়ী হবে। কয়েক বছরের মধ্যেই। ভূত ও ভবিষ্যতের সব ফয়সালা আল্লাহরই। আর সেদিন মুমিনরাও আনন্দিত হবে। (রূম, ৩০ : ০২-০৪)
এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ৬ বছর পূর্বে, মোতাবেক ৬১৫-১৬ খ্রিস্টাব্দে। এই সময় পারসিয়ানরা রোমানদের পরাজিত করে এবং তাদেরকে জেরুজালেমসহ তাদের অধিকাংশ ভূখন্ড থেকে উচ্ছেদ করে। এটি সম্পূর্ণ কল্পনাতীত ছিল যে, অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। আর রোমানরা আক্রমণ করে পারসিয়ানদেরকে একই ধরনের পরাজয়ের স্বাদ আস্বাদন করাবে। যদিও কুরআন মাজিদ তেমনটি ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে। মক্কার কাফিররা একথা শুনে এতই বিস্মিত হয় যে, তারা আবু বকর রা.- যিনি সর্বপ্রথম পুরুষ হিসেবে ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন-এর সঙ্গে একথার সত্যতার বিরুদ্ধে বড় ধরনের বাজি ধরে বসে। ঠিক আট বছরের মাথায় এই ভবিষ্যৎবাণী বাস্তব রূপ লাভ করে। রোমানরা কেবল তাদের হারানো এলাকাগুলি ফিরিয়েই পায় নি, বরং পারস্য সাম্রাজ্যকে সংকুচিত করে পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়।
যেহেতু রোমানরা ছিল খ্রিস্টান এবং পারসিকরা অগ্নিপূজারী, তাই মুসলমানদের সহানুভূতি ছিল রোমানদের প্রতি এবং মক্কার কাফেরদের সহানুভূতি ছিল পারসিকদের প্রতি। অতএব পারসিকদের কাছে রোমানদের পরাজয় মুসলমানদের ব্যথিত করল। কুরআন মাজিদ এই আয়াতগুলিতে এও ভবিষ্যৎবাণী প্রদান করে যে, মুসলমানরা অচিরেই আনন্দিত হবে। এই ভবিষ্যৎবাণীর বাস্তবায়ন ঘটে একটি বিস্ময়কর পন্থায়। দ্বিতীয় হিজরিতে বদর যুদ্ধ ছিল এক হাজার (১,০০০) সশস্ত্র কাফিরের সঙ্গে ৩১৩ জনের একটি দুর্বল নিরস্ত্র মুসলিম বাহিনীর প্রথম মুখোমুখি সংঘর্ষ। মুসলমানরা সব ধরনের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে, কাফিরদের পরাজিত করে। এই বিজয় প্রকৃতই মুসলমানদের জন্য আনন্দ ও খুশি বয়ে এনেছিল। এটি একটি বিস্ময়কর কাকতালীয় ব্যাপার যে, মুসলমানদের কাছে রোমানদের বিজয়ের সংবাদ ঠিক সেদিনই এসে পৌঁছেছিল যেদিন মক্কার মুশরিকদেরকে বদর প্রান্তরে তারা পরাজিত করেছিল। কুরআন মাজিদের উভয় ভবিষ্যৎবাণীই, এভাবে, বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ পায়।