📄 মু’জিজা : ১১৪: মহাশূন্যে ভ্রমণ
আর আসমানসমূহ ও জমিনে কত নিদর্শন রয়েছে, যা তারা অতিক্রম করে চলে যায়। অথচ সেগুলো থেকে তারা বিমুখ। (ইউসুফ, ১২ : ১০৫)
পথপূর্ণ আসমানের শপথ। (যারিয়াত, ৫১ : ০৭)
অতঃপর আমি কসম করছি পশ্চিম আকাশের লালিমার। আর রাতের কসম এবং রাত যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তাঁর। আর চাঁদের কসম, যখন তা পরিপূর্ণ হয়। অবশ্যই তোমরা এক স্তর থেকে আরেক স্তরে (কিংবা এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহে) আরোহণ করবে। অতএব তাদের কী হল যে তারা ঈমান আনছে না? (ইনশিক্বাক, ৮৪ : ১৬-২০)
কুরআন মাজিদের ভাষাই একটি স্বতন্ত্র মু’জিজা। কুরআন মাজিদ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা (phenomena) এমন এক ভাষায় বর্ণনা করে যা একটি ব্যাপক অর্থ ও বার্তা বহন করে। আমরা এখন কুরআন মাজিদের এসকল আয়াত, মহাশূন্যের নিরেট বাস্তবতা হিসেবে, সাম্প্রতিক আবিষ্কারের আলোকে যথার্থরূপে অনুধাবন করতে সক্ষম, যেমন- ‘কসম পথপূর্ণ আসমানের’ এবং ‘আকাশের নিদর্শনসমূহ’ এজাতীয় আয়াত। অধিকন্তু কুরআন মাজিদের আয়াত, ‘আসমানসমূহের কত নিদর্শন তারা অতিক্রম করে চলে যায়’ এবং ‘তোমরা আরোহণ করবে একস্তর থেকে আরেকস্তরে’ এটিও সাম্প্রতিক সময়ে মহাশূন্যে মানুষের ভ্রমণের পরিভাষায় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
📄 মু’জিজা : ১১৫: মহাশূন্যে বিভিন্ন কক্ষপথ
কসম, কক্ষপথ- গতিপথ- পথপূর্ণ আসমানের। (যারিয়াত, ৫১ : ০৭)
এই মহাবিশ্বে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ছায়াপথ রয়েছে, যার প্রত্যেকটি ধারণ করে আছে প্রায় ২০০ বিলিয়ন নক্ষত্র। অধিকন্তু এসব নক্ষত্রের অধিকাংশেরই রয়েছে গ্রহপুঞ্জ। আর এই গ্রহপুঞ্জের অধিকাংশেরই রয়েছে উপগ্রহ। এসব মহাকাশীয় বস্তুর প্রতিটিই রয়েছে একটি নিত্য-গতিময় অবস্থায়। একই সময়ে ছায়াপথগুলি অসাধারণ গতিতে পরিক্রমণ করছে পরিকল্পিত নির্দিষ্ট পথরেখায়। মহাশূন্যের বহিরাংশ এভাবে অসংখ্য গতিপথ, পথরেখা কিংবা কক্ষপথের স্তরসমূহে পূর্ণ। এ কথা সুনিশ্চিত যে, যখন এই আয়াতগুলি অবতীর্ণ হচ্ছিল তখন মানুষ জানত না, মহাশূন্য বিভিন্ন গতিপথ কিংবা কক্ষপথে পূর্ণ। মহাকাশবিজ্ঞানীগণ কেবল সাম্প্রতিককালেই এই জ্ঞান লাভ করেছেন। এই আয়াতও আল্লাহর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার কথা বলে যে, এই গতিপথ অতিক্রমণের সময় এসব মহাকাশীয় দেহগুলির কোনোটিই অন্যটির পথ কর্তন করে না কিংবা অন্যদের সঙ্গে ধাক্কা খায় না।
📄 মু’জিজা : ১১৬: পৃথিবীর চারপাশে সুরক্ষিত ছাদ
আর আমি (আল্লাহ) আসমানকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ (পৃথিবীর চতুর্দিকে); কিন্তু তারা তাঁর নিদর্শনাবলি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। (আম্বিয়া, ২১ : ৩২)
পৃথিবীর চারপাশে যে বায়ুমন্ডল বেষ্টন করে আছে তা আমাদের জীবনের জন্য সহায়ক সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করে যায়। মহাকাশীয় ভৌত রসায়নবিদ্যার সাম্প্রতিক অগ্রগতি আমাদেরকে এই বিষয়টি এবং উল্লিখিত আয়াত অনুধাবন ও হৃদয়াঙ্গম করার জ্ঞান প্রদান করেছে।
বায়ুমন্ডল সেসব উল্কাকে ধ্বংস করে দেয় যা পৃথিবী অভিমুখে আসার চেষ্টা করে; পাছে যাতে তা সকল প্রকার জীবের ধ্বংসের কারণ না হয়।
পৃথিবীর চারপাশে যে ওজোন-স্তর আছে তা মহাশূন্য থেকে আগত আলোক রশ্মিসমূহের জন্য ছাকনির কাজ করে। তা কেবল ক্ষতিকর নয় এমন এবং উপকারী রশ্মিসমূহকেই মহাশূন্য থেকে প্রবেশের অনুমতি দেয়। বায়ুমন্ডল পৃথিবীকে মহাশূন্যের জমানো ঠান্ডা থেকেও রক্ষা করে, যা আনুমানিক মাইনাস ২৭০. সেন্টিগ্রেড।
বায়ুমন্ডল একটি চৌম্বক স্তর ধারণ করে যাকে বলা হয় Van Allen Belt। এটি সেসব ক্ষতিকর আলোক রশ্মির বিরুদ্ধে ঢালের কাজ দেয়, যা আমাদের এই গ্রহের দিকে বিস্ফোরিত হয়। এসব বিস্ফোরণের একটি যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে তা হিরোশিমায় যে পারমাণবিক বোমা নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সে ধরনের ১০০ বিলিয়ন পারমাণবিক বোমার শক্তির সমান।
সংক্ষেপে বলা চলে, বায়ুমন্ডলে একটি শক্তিশালী সিস্টেম কাজ করে, তা যেন পৃথিবীর চারপাশে একটি সুরক্ষিত ছাদ। বৈজ্ঞানিকরা কেবল সম্প্রতিই তা উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে, যা কুরআন বর্ণনা করেছে শত শত বছর পূর্বে।
📄 মু’জিজা : ১১৭: আবর্তনকারী আকাশ
কসম, আবর্তন প্রক্রিয়াসম্পন্ন আসমানের। (তারিক, ৮৬ : ১১)
কুরআন মাজিদ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুবই স্বতন্ত্র। প্রায়ই আমরা তাঁর একটি শব্দ, শব্দটির তাৎপর্য ও আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক উদ্ঘাটনের চেষ্টা ব্যতিরেকে অনুধাবন করতে পারি না। উপরোক্ত আয়াত বলে যে, আসমানে একটি চক্রাবর্ত রয়েছে।
এখন এটা ভালভাবে জানা যে, পৃথিবীর চারপাশে যে বায়ুমন্ডল আছে তার অনেক স্তর রয়েছে। প্রত্যেক স্তরেরই বস্তু কিংবা রশ্মিকে মহাশূন্যে ফিরিয়ে দেয়া কিংবা পৃথিবীতে পুনরায় নামিয়ে দেয়ার নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে। নিম্নে বায়ুমন্ডলের সেসব চক্রাবর্তের একটি সংক্ষিপ্ত নমুনা দেওয়া হল :
বায়ুমন্ডলের যে স্তরকে Trophosphere বা বারিমন্ডল বলা হয় তা জলীয় বাষ্পকে ঘনীভূত হওয়া এবং তা বৃষ্টির আকারে পৃথিবীতে আসতে সাহায্য করে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫ কিলোমিটার ওপরে যে ওজন স্তর রয়েছে তা ক্ষতিকর অতি বেগুনী রশ্মিকে প্রতিফলিত করে মহাশূন্যে ফিরিয়ে দেয়।
আয়নমন্ডল নামে যে স্তর রয়েছে তা পৃথিবী থেকে সম্প্রচারিত বেতার তরঙ্গকে প্রতিফলিত করে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ফেরত পাঠায়।
‘চৌম্বকমন্ডল’ নামে যে স্তর রয়েছে তা সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্র থেকে নির্গত ক্ষতিকর বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় উপাদান মহাশূন্যে ফেরত পাঠায়।
কুরআন মাজিদ ‘আবর্তনকারী’ বা ‘চক্রাবর্ত সাধনকারী’ আসমান পরিভাষা ব্যবহারের এটি একটি কারণ হতে পারে। কেবল আল্লাহ তাআলাই প্রকৃত সত্য সম্পর্কে অবগত।