📄 মু’জিজা : ১১২: শ্রবণেন্দ্রিয় ও দর্শনেন্দ্রিয়ের বর্ণনা
(অবিশ্বাসীদের) বল, তোমরা আমাকে জানাও, যদি আল্লাহ তোমাদের শ্রবণ (কান) ও তোমাদের দৃষ্টিসমূহ (চক্ষুসমূহ) কেড়ে নেন এবং তোমাদের অন্তরসমূহে মোহর এঁটে দেন, কে আছে ইলাহ আল্লাহ ছাড়া, যে তোমাদের এগুলো নিয়ে আসবে? (আনআম, ০৬ : ৪৬)
তোমরা কিছুই গোপন করতে না (ইহজগতে এই বিশ্বাসে) যে, তোমাদের কান, চোখসমূহ ও চামড়াসমূহ তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না। বরং তোমরা মনে করেছিলে তোমরা যা কিছু করতে আল্লাহ তাঁর অনেক কিছুই জানতেন না। (ফুসসিলাত, ৪১ : ২২)
আর আমি তাদেরকে কান, চোখ ও হৃদয় দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন তারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করত, তখন তাদের কান, তাদের চোখ ও তাদের হৃদয়সমূহ তাদের কোনো উপকারে আসে নি। আর তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত তা-ই তাদেরকে পরিবেষ্টন করল। (আহকাফ, ৪৬ : ২৬)
একজন সাধারণ পাঠকের চোখে এসব আয়াত পাঠ করার সময় বিশেষ কিছু ধরা নাও পড়তে পারে। কিন্তু একজন মনোযোগী পাঠক লক্ষ্য করবে, কুরআন মাজিদ এসব আয়াতে শ্রবণের (‘সামআ’) ক্ষেত্রে একবচনের শব্দ, কিন্তু দর্শনের ক্ষেত্রে বহুবচনের শব্দ (‘আবসার’) ব্যবহার করেছে। লক্ষ্য করলে আরও অধিক বিস্মিত হতে হয় যে, আমাদের দুটি চোখের মত দুটি কান রয়েছে। এতদসত্ত্বেও কুরআন মাজিদ শ্রবণেন্দ্রিয়ের ক্ষেত্রে একবচন এবং দর্শনেন্দ্রিয়ের ক্ষেত্রে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করেছে। কেবল আল্লাহ তাআলাই জানেন এধরনের শব্দ চয়নের রহস্য। আমরা আমাদের কর্ণ ও চক্ষুর ব্যবহারের ভিন্নতার ভিত্তিতে এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারি।
দেখার ক্রিয়া মানুষের এমন একটি অনুভূতির অন্তর্ভুক্ত যা সামগ্রিকভাবে তাঁর ইচ্ছাশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মানুষের এ স্বাধীনতা রয়েছে যে, যা সে পছন্দ করে তা দেখবে এবং যা সে পছন্দ করে না তা দেখা থেকে দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। পক্ষান্তরে আগত শব্দ থেকে সে তার কানকে বন্ধ করে রাখতে পারে না, চাই সে পছন্দ করুক বা না করুক। যেখানে দেখার বিষয়টি ঐচ্ছিক ও নৈর্ব্যক্তিক, সেখানে শ্রবণের বিষয়টি আবশ্যিক এবং অনৈর্ব্যক্তিক। অধিকন্তু আমাদের চোখের ওপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আমরা একটি চোখ ইচ্ছা করলে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে পারি, কিন্তু একটি কানের ক্ষেত্রে তেমনটি পারি না। এভাবে চোখের বহুমুখী ও ঐচ্ছিক ক্রিয়া রয়েছে। এ কারণেই কুরআন মাজিদ দর্শনের ক্ষেত্রে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করেছে। শ্রবণের ক্ষেত্রে এই ব্যবহার প্রযোজ্য নয়। এজন্যেই শ্রবণের ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদ একবচনের শব্দ ব্যবহার করেছে।
📄 মু’জিজা : ১১৩: কুরআন মাজিদের সংরক্ষণ
নিঃসন্দেহে আমি এই বার্তা (কুরআন মাজিদ) অবতীর্ণ করেছি, এবং আমিই তার (বিকৃত হওয়া থেকে) রক্ষণাবেক্ষণকারী। (হিজর, ১৫ : ০৯)
মুসলিম-অমুসলিম সকলে একবাক্যে স্বীকার করে যে, কুরআন মাজিদের টেক্সট এর মধ্যে কখনো কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় নি। কুরআন মাজিদের শাশ্বত সংরক্ষণ ও তার বিশুদ্ধতার ভবিষ্যৎবাণী কেবল তার টেক্সট এর ক্ষেত্রেই সত্য প্রমাণিত হয়নি; বরং তাঁর ক্ষুদ্রতম যতিচিহ্নের ক্ষেত্রেও অনুরূপভাবে সত্য। আরও লক্ষ্যণীয় যে, এই বিচারে আরবি ভাষা সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী যে, বর্ণমালার প্রত্যেকটি বর্ণই বিশেষ সাংকেতিক চিহ্নের (হরকতের) মাধ্যমে লিখা হয়, যা তার নির্দিষ্ট উচ্চারণ প্রদান করে। নিম্নলিখিত উপাত্তটি কুরআন মাজিদের একটি বিস্তারিত বিবরণ সরবরাহ করে। এই তথ্যগুলি নেয়া হয়েছে ‘শরিয়া ডাইজেস্ট’, কুরআন সংখ্যা, ভলিউম ১৩ নম্বর -৫, পৃ. ১৮৭-৮৯, ১৯৬৯, লাহোর, পাকিস্তান থেকে।
সর্বমোট আয়াত সংখ্যা : ৬,১৩৬।
সর্বমোট শব্দ সংখ্যা : ৮৬,৪৩০।
সর্বমোট বর্ণ সংখ্যা : ৩,২৩,৭৬০।
প্রতিটি বর্ণের মোট সংখ্যা :
‘আলিফ’ : ৪,৮৮,৭৭২; বা : ১১,৪২৮, তা : ১,১৯৯, ছা : ১,২৬৭, জীম : ৩,২৭৩, হা : ৯৭, খা : ২,৪১৬, দাল : ৫৬০২, যাল : ৪,৫৭৭, রা : ১১,৭৯৩ যা : ১,৫৯০, সীন : ৫৯৯১, শীন : ২,১১০, সাদ : ২,০১২, দুয়াদ : ১, ত্বা : ১২৭৭, যোয়া : ৮৪, আইন : ৯,২২০, গাইন : ২,২০৮, ফা : ৮,৪৯৯, ক্বাফ : ৬,৮১৩, কাফ : ৯৫০০, লাম : ৩,৪২২, মীম : ৩৬,৫৩৫, নূন : ৪০,১৯০, ওয়াও : ২৫,৫৩৬, হা : ১৯,০৭০, হামজা : ৩,৭২০, ইয়া : ৪৫,৯১৯।
হরকত বা বিশেষ ভাষাতাত্ত্বিক চিহ্নের মোট সংখ্যা :
ফাতহা (যবর) : ৫৩,২২৩, কাসরা (যের) : ৩৯,৫৮২ যম্মা (পেশ) : ৮,৮০৪, মাদ্দ : ১,৭৭১ তাশদীদ : ১,২৭৪ নুকতা : ১০৫৬৮৪।
এটি কুরআন মাজিদের একটি মু’জিজা যে তার কোনো শব্দ, কোনো বর্ণ, কোনো যতিচিহ্ন কিংবা কুরআন মাজিদের কোনো হরকত পর্যন্ত বিগত চৌদ্দশত বছরে পরিবর্তিত হয় নি।
📄 মু’জিজা : ১১৪: মহাশূন্যে ভ্রমণ
আর আসমানসমূহ ও জমিনে কত নিদর্শন রয়েছে, যা তারা অতিক্রম করে চলে যায়। অথচ সেগুলো থেকে তারা বিমুখ। (ইউসুফ, ১২ : ১০৫)
পথপূর্ণ আসমানের শপথ। (যারিয়াত, ৫১ : ০৭)
অতঃপর আমি কসম করছি পশ্চিম আকাশের লালিমার। আর রাতের কসম এবং রাত যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তাঁর। আর চাঁদের কসম, যখন তা পরিপূর্ণ হয়। অবশ্যই তোমরা এক স্তর থেকে আরেক স্তরে (কিংবা এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহে) আরোহণ করবে। অতএব তাদের কী হল যে তারা ঈমান আনছে না? (ইনশিক্বাক, ৮৪ : ১৬-২০)
কুরআন মাজিদের ভাষাই একটি স্বতন্ত্র মু’জিজা। কুরআন মাজিদ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা (phenomena) এমন এক ভাষায় বর্ণনা করে যা একটি ব্যাপক অর্থ ও বার্তা বহন করে। আমরা এখন কুরআন মাজিদের এসকল আয়াত, মহাশূন্যের নিরেট বাস্তবতা হিসেবে, সাম্প্রতিক আবিষ্কারের আলোকে যথার্থরূপে অনুধাবন করতে সক্ষম, যেমন- ‘কসম পথপূর্ণ আসমানের’ এবং ‘আকাশের নিদর্শনসমূহ’ এজাতীয় আয়াত। অধিকন্তু কুরআন মাজিদের আয়াত, ‘আসমানসমূহের কত নিদর্শন তারা অতিক্রম করে চলে যায়’ এবং ‘তোমরা আরোহণ করবে একস্তর থেকে আরেকস্তরে’ এটিও সাম্প্রতিক সময়ে মহাশূন্যে মানুষের ভ্রমণের পরিভাষায় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
📄 মু’জিজা : ১১৫: মহাশূন্যে বিভিন্ন কক্ষপথ
কসম, কক্ষপথ- গতিপথ- পথপূর্ণ আসমানের। (যারিয়াত, ৫১ : ০৭)
এই মহাবিশ্বে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ছায়াপথ রয়েছে, যার প্রত্যেকটি ধারণ করে আছে প্রায় ২০০ বিলিয়ন নক্ষত্র। অধিকন্তু এসব নক্ষত্রের অধিকাংশেরই রয়েছে গ্রহপুঞ্জ। আর এই গ্রহপুঞ্জের অধিকাংশেরই রয়েছে উপগ্রহ। এসব মহাকাশীয় বস্তুর প্রতিটিই রয়েছে একটি নিত্য-গতিময় অবস্থায়। একই সময়ে ছায়াপথগুলি অসাধারণ গতিতে পরিক্রমণ করছে পরিকল্পিত নির্দিষ্ট পথরেখায়। মহাশূন্যের বহিরাংশ এভাবে অসংখ্য গতিপথ, পথরেখা কিংবা কক্ষপথের স্তরসমূহে পূর্ণ। এ কথা সুনিশ্চিত যে, যখন এই আয়াতগুলি অবতীর্ণ হচ্ছিল তখন মানুষ জানত না, মহাশূন্য বিভিন্ন গতিপথ কিংবা কক্ষপথে পূর্ণ। মহাকাশবিজ্ঞানীগণ কেবল সাম্প্রতিককালেই এই জ্ঞান লাভ করেছেন। এই আয়াতও আল্লাহর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার কথা বলে যে, এই গতিপথ অতিক্রমণের সময় এসব মহাকাশীয় দেহগুলির কোনোটিই অন্যটির পথ কর্তন করে না কিংবা অন্যদের সঙ্গে ধাক্কা খায় না।