📄 মু’জিজা : ১০৯: রাসুল সা.-এর সাহাবীদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও সহানুভূতি
(আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।) আর তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতকে (কৃতজ্ঞতার সঙ্গে) স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালবাসার সঞ্চার করলেন। অতঃপর তোমরা তাঁর অনুগ্রহে ভাই ভাই হয়ে গেলে। (আলে ইমরান, ০৩ : ১০৩)
আর যদি তারা তোমাকে ধোঁকা দিতে চায়, তাহলে তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই তোমাকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর সাহায্য ও মুমিনদের দ্বারা। আর তিনি তাদের অন্তরসমূহে প্রীতি স্থাপন করেছেন। যদি তুমি জমিনে যা আছে তার সবকিছু ব্যয় করতে, তবুও তাদের অন্তরসমূহে প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। নিশ্চয় তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান। (আনফাল, ০৮ : ৬২-৬৩)
এই আয়াতগুলি অনুধাবন ও উপলব্ধির জন্য ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আরবের অবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপে কোনো সুসংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না। দেশটি বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল। গোত্র প্রতিহিংসা ও গোত্রযুদ্ধ ছিল সেই ভূখণ্ডের আইন। প্রায়ই যুদ্ধ সংঘটিত হত কোনো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যেমন : কোনো কূপ থেকে পানি পান ইত্যাদি। আর এই সৃষ্ট যুদ্ধ যুগযুগ ধরে চলতে থাকত। গোত্র সংঘাত ও গোত্র শত্রুতা মদিনার মধ্যে ছিল অধিক বেশি প্রকট। তাতে ছিল দু’টি সমান শক্তিধর গোত্র, একটির নাম আউস, অপরটি খাযরাজ। যেহেতু উভয় গোত্রই ছিল শক্তিধর, তাই তারা জীবনের সব ক্ষেত্রেই ছিল একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। নিত্য যুদ্ধ, প্রতিহিংসা ও অবিশ্বাসের একটি দুর্গন্ধময় পরিবেশে ছিল তাদের নিত্যদিনের বসবাস। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হল, তারা ইসলাম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে এসব কিছু ভালবাসা ও সহানুভূতির পরিবেশে রূপান্তরিত হয়ে যায়। অধিকন্তু, পুরো আরব সমাজ পারস্পরিক এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ একটি অবিচ্ছিন্ন জাতিতে পরিণত হয় পুরো মানবজাতির ইতিহাসে যার কোনো তুলনা মিলে না। কুরআন মাজিদ এ কথাই বলছে, আল্লাহ তাআলাই মুমিনদের ওপর এই অনুগ্রহ করেছেন এবং তা কেহ কোনো জাগতিক উপায়ে অর্জন করতে পারে নি।
📄 মু’জিজা : ১১০: সংখ্যাসূচক সমতার রহস্য
কুরআন মাজিদের বিভিন্ন শব্দের সংখ্যাসূচক সম্পর্কের বিবরণ দিয়ে বহু বই ও প্রবন্ধ লিখা হয়েছে। এই সংখ্যাতাত্ত্বিক সম্পর্কের ব্যাপারে এ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যায় নি। তবে তা এতই অনুপম যে, কুরআন মাজিদের বিস্ময়কর প্রকৃতিতে তা নতুন ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে। নিম্নে কুরআন মাজিদের কিছু সংখ্যাতাত্ত্বিক সাদৃশ্যের দৃষ্টান্ত পেশ করা হল :
১. কুরআন মাজিদ বলে, সাতটি আসমান রয়েছে। কুরআন মাজিদের কেবল সাতটি সুরার মধ্যেই এই বর্ণনা পাওয়া যায়।
২. কুরআন মাজিদ বলে, আল্লাহ তাআলা কর্তৃক স্থিরীকৃত মাসের সংখ্যা হল ১২ (বারো)। ‘মাস’ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ ‘শাহর’ (شَهْرٍ)। এই ‘শাহর’ শব্দটি কুরআন মাজিদে কেবল বারো বার উল্লিখিত হয়েছে।
৩. আরবি শব্দ ‘ঈমান’ অর্থ বিশ্বাস। এই শব্দের বিপরীত শব্দ ‘কুফর’, যার অর্থ অস্বীকৃতি। কুরআন মাজিদে এই (إِيمَان) ঈমান শব্দটি ১৭ (সতের) বার দেখা যায়। বিস্ময়ের ব্যাপার হল কুরআন মাজিদে কুফর শব্দটিও এসেছে ১৭ (সতের) বার। অধিকন্তু ‘মুমিনূন’ শব্দটি কুরআন মাজিদে পাওয়া যায় ৮ (আট) স্থানে এবং ‘কাফিরূন’ শব্দটিও পাওয়া যায় ৮টি স্থানে।
৪. আরবি শব্দ ‘মালাইকা’ অর্থ ফেরেশতা এবং ‘শয়তান’ শব্দ নির্দেশ করে ইবলিশ। শব্দদুটি তাদের বৈশিষ্ট্য ও ভূমিকার ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী। কুরআন মাজিদে এই ‘মালাইকা’ শব্দটি সর্বমোট ৬৮ (আটষট্টি) বার ব্যবহৃত হয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হল ‘শয়তান’ শব্দটিও কুরআন মাজিদে ৬৮ (আটষট্টি) বার ব্যবহৃত হয়েছে।
৫. আরবি শব্দ ‘দুনিয়া’ অর্থ ইহকাল এবং ‘আখিরাহ’ অর্থ পরকাল। কুরআন মাজিদে ‘দুনিয়া’ শব্দটি এসেছে ১১৫ বার। অনুরূপভাবে ‘আখিরাহ’ শব্দটিও এসেছে ১১৫ মোট ১০৮ বার।
৬. আরবি শব্দ ‘ত্বীন’ অর্থ কাদা মাটি এবং ‘নুতফা’ অর্থ ‘শুক্রবিন্দু’। কুরআন মাজিদ বলে, মানুষ প্রথমে সৃষ্টি হয়েছে ‘ত্বীন’ থেকে এবং পরে ‘নুতফা’ থেকে। কুরআন মাজিদে ‘ত্বীন’ শব্দটি দেখা যায় মোট ১২ (বারো) বার। ‘নুতফা’ শব্দেরও একই অবস্থা, তাও রয়েছে ১২ (বারো) বার।
৭. আরবি শব্দ ‘ফে’ল’ মানে কাজ এবং ‘আজর’ অর্থ প্রতিদান। কুরআন মাজিদে ‘ফে’ল’ শব্দটি দেখা যায় মোট ১০৮ (একশত আট) বার। ‘আজর’ শব্দের ক্ষেত্রেও তা সত্যি, তাও দেখা যায় ১০৮ বার।
৮. ‘রহমান’ ও ‘রহিম’ আল্লাহ তাআলার দু’টি গুণবাচক নাম, উভয় শব্দই রহম, যার অর্থ দয়া- থেকে নির্গত। ‘রহমান’ এমন দয়াকে ইঙ্গিত করে যার সঙ্গে আছে ন্যায় বিচার। পক্ষান্তরে ‘রহিম’ এমন দয়াকে নির্দেশ করে যার সঙ্গে আছে ক্ষমা। কুরআন মাজিদে ‘রহমান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে মোট ৫৭ (সাতান্ন) বার, কিন্তু ‘রাহিম’ শব্দটি দেখা যায় মোট ১১৪ (একশত চৌদ্দ) বার। যা ৫৭ (সাতান্ন) এর ঠিক দুই গুণ। বিভিন্ন হাদিস এই সম্পর্কে প্রমাণ বহন করে যে, আল্লাহ তাআলার দয়া তাঁর ক্রোধ ও রাগের ওপর প্রবল।
৯. আরবি শব্দ ‘জাযা’ অর্থ বিনিময় বা প্রতিদান এবং ‘মাগফিরাহ’ শব্দের অর্থ ক্ষমা। কুরআন মাজিদে ‘জাযা’ শব্দটি মোট ১১৭ বার দেখা যায়। ‘মাগফিরাত’ শব্দটি দেখা যায় ২৩৪ (দুইশত চৌত্রিশ) বার, যা ১১৭-এর ঠিক দুই গুণ। তা আবারও নির্দেশ করে, আল্লাহ তাআলার ক্ষমা তাঁর ন্যায় বিচারের ওপর ছায়া বিস্তার করে।
অনেকেই কুরআন মাজিদের এমন অসংখ্য সংখ্যাতাত্ত্বিক সাদৃশ্য বের করেছেন। আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে প্রত্যেক সাদৃশ্যের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। বলাবাহুল্য, কুরআন মাজিদের সকল শব্দ হিসাব করার জন্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এমন কোনো কম্পিউটার ছিল না, যা তাঁকে কুরআন মাজিদে একটি বিশেষ শব্দকে তাঁর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দের সঙ্গে একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যবহার করতে সক্ষম করেছে।
📄 মু’জিজা : ১১১: অন্ধকার ও আলোর বর্ণনা
এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে ‘যুলুমাত’ (অনেক অন্ধকার) থেকে ‘নূর’ (আলো)-এর দিকে বের করেন। (মায়েদা, ০৫ : ১৬)
কুরআন মাজিদ যখন অন্ধকারের (যুলমাত)- বর্ণনা দেয় তখন তা একবচন ও বহুবচন উভয় ধরনের শব্দ ব্যবহার করে। পক্ষান্তরে, তা যখন আলো (নূর)-এর বর্ণনা দেয় তখন তা সর্বদা একবচনের শব্দই ব্যবহার করে। বস্তুত, কুরআন মাজিদে এমন একটি আয়াতও পাওয়া যায় না যেখানে নূর শব্দটি বহুবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআন মাজিদে অন্ধকার বলতে বিভিন্ন ধরনের মানবীয় দুর্বলতা ও অজ্ঞতাকে নির্দেশ করে। একজন মানুষের বিভিন্ন ধরনের মানবিক দুর্বলতা থাকতে পারে। যেমন, অহম, লোভ, কৃপণতা ইত্যাদি। তাঁর বিভিন্ন ধরনের অজ্ঞতাও থাকতে পারে। যেমন, মিথ্যা উপাস্যের আরাধনা কিংবা ভ্রান্ত মতবাদের অনুসরণ, যেমন, নাস্তিক্যবাদ, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি। একই সময়ে একজন মানুষ বিভিন্ন মাত্রা ও পরিমাণের অন্ধকারের অনুসরণ করতে পারে। অতএব বিভিন্ন প্রকার ও বিভিন্ন মাত্রার অন্ধকার রয়েছে। এজন্যেই কুরআন মাজিদ অন্ধকারের বর্ণনার ক্ষেত্রে একবচনের পাশাপাশি বহুবচনের শব্দও ব্যবহার করেছে।
যখন কুরআন মাজিদ আলোর কথা বলে তখন তা সেই সত্য হেদায়েতের প্রতিই নির্দেশ করে যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম) ও আসমানি কিতাবের মাধ্যমে অবতীর্ণ করেছেন। পুরো মানব ইতিহাসে সত্য কেবল একটিই ছিল। এজন্যেই কুরআন মাজিদ আলো বুঝাতে সর্বদা ‘নূর’ শব্দটিকে একবচনে উল্লেখ করেছে। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি কুরআন মাজিদের প্রতিটি শব্দেরই একটি বিশেষ অর্থ ও বার্তাবাহী অবতীর্ণ করেছেন।