📄 মু’জিজা : ১০৪: মেরু অঞ্চলে দিনের দৈর্ঘ্য
অবশেষে যখন সূর্যোদয়ের স্থানে এসে পৌঁছল তখন সে দেখতে পেল, তা এমন এক জাতির ওপর উদিত হচ্ছে যাদের জন্য আমি সূর্যের বিপরীতে কোনো আড়ালের ব্যবস্থা করি নি। (কাহফ, ১৮ : ৯০)
এই আয়াত এমন একজন রাজার বিজয় অভিযানের বর্ণনা দেয় যাকে কুরআন মাজিদ ‘যুল-কারনাইন’ বলে অভিহিত করেছে। এই আয়াত বলে, তিনি এমন এক স্থানে গমন করেন যেখানে তিনি সূর্যকে উদিত হওয়ার অবস্থায় দেখতে পান এবং সেই স্থানের লোকদের সূর্যের বিপরীতে কোনো আড়ালের ব্যবস্থা ছিল না। আমরা এখন জানতে পারি, এটি হল মেরু অঞ্চলের সূর্যের অবস্থা যেখানে তা ছয় মাসের জন্য অস্ত যায় না। অধিকন্তু, সূর্য সর্বদা নিম্নে উদিত হওয়ার অবস্থায় থাকে, যেমনটি কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে। না মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আর না কোনো আরবি ব্যক্তির এই সূর্যোদয়ের অবস্থা সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা ছিল। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে, কুরআন মাজিদে এই তথ্য সন্নিবেশিত করতে পারেন?
📄 মু’জিজা : ১০৫: বৃষ্টির চক্রাবর্তন
শপথ আসমানের, যা প্রদান করে আবর্তিত বৃষ্টি। শপথ পৃথিবীর, যা বিদীর্ণ হয় (বৃষ্টির কল্যাণে)। নিশ্চয় এটা (কুরআন মাজিদ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) ফয়সালাকারী বাণী। আর তা উপহাসের বিষয় নয়। (আত-তারিক, ৮৬ : ১১-১৩)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবতীর্ণ করেছেন যা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পরও বহু শতাব্দী পর্যন্ত মানুষের অজানা ছিল। এই আয়াত যে ‘বৃষ্টির আবর্তন’ -এর কথা বলে তা ছিল আরব বেদুঈনদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। এখন আমরা জানি যে, ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ ও সাগরের পানি সূর্যের তাপে বাষ্পীভূত হয়ে মেঘে রূপান্তরিত হয়, ঘনীভূত হয় এবং বৃষ্টি রূপে পুনরায় পতিত হয়। এভাবে আকাশ পৃথিবীকে সেই পানি ফিরিয়ে দেয় যা একটি নিত্য চক্রাবর্তে তার কাছে উঠে। এই বিষয়টি বর্ণনার পর কুরআন মাজিদ মানব জাতিকে পৃথিবী বিদীর্ণ হওয়ার প্রতি মনোনিবেশ করার দাওয়াত দেয়। যেমন, ‘বৃষ্টির ফলে জীবনের উদ্ভব। কুরআন মাজিদ অবশেষে মানব জাতিকে দাওয়াত দেয় তাঁর যথার্থতা ও প্রাজ্ঞতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে। এটিকে নিছক मनोरঞ্জনের বিষয় হিসেবে নেয়া মানুষের জন্য অনুচিত।
📄 মু’জিজা : ১০৬: ফিরাউনের মৃতদেহ সংরক্ষণ
‘আজ আমি (আল্লাহ) তোমার দেহটি রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাক। আর নিশ্চয় অনেক মানুষ আমার নিদর্শনসমূহের ব্যাপারে গাফেল। (ইউনুস, ১০ : ৯২)
চৌদ্দশত বছর পূর্বে কুরআন মাজিদ ভবিষ্যৎবাণী করেছে, আল্লাহ তাআলা ফিরাউনের দেহ সংরক্ষণ করবেন। প্রত্নতত্ত্ববিদরা সম্প্রতি ফিরাউন ‘মাইনপথ’-এর দেহ আবিষ্কার করেছে, যে মুসা আঃ-এর পশ্চাদ্ধাবন করতে গিয়ে ডুবে গিয়েছিল। এটি বর্তমানে কায়রোর একটি মিউজিয়ামে কুরআন মাজিদের একটি জীবন্ত মু’জিজারূপে তাদের জন্য সংরক্ষিত আছে যারা আল্লাহ তাআলার নিদর্শনের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। স্মর্তব্য যে, বাইবেলেও বর্ণিত আছে, ফিরাউন সমুদ্রে নিমজ্জিত হবে। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর দেহ কি হবে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই। পক্ষান্তরে বাস্তবতা হল, কুরআন মাজিদ উল্লেখ করেছে, আল্লাহ তাআলা ফিরাউনের দেহ সংরক্ষণ করবেন। যা অন্য একটি প্রমাণ যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন মাজিদ বাইবেল থেকে নকল করেন নি। বরং তাঁর জ্ঞানের উৎস হল সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসমানি ওহি।
📄 মু’জিজা : ১০৭: কুরআন মাজিদের উল্লিখিত শব্দ ‘হামান’
আর ফিরাউন বলল, ‘হে পরিষদবর্গ, আমি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ আছে বলে আমি জানি না। অতএব হে হামান, আমার জন্য তুমি ইট পোড়াও, তারপর আমার জন্য একটি প্রাসাদ তৈরি কর। যাতে আমি মুসার ইলাহকে দেখতে পাই। আর আমি নিশ্চয় মনে করি সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (কাসাস, ২৮ : ৩৮)
কুরআন মাজিদ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে, মিসরের পূর্ববর্তী ইতিহাস সম্পর্কে, যা বহু শতাব্দী পর্যন্ত মানুষের অজানা ছিল। ‘হামান’ একটি চরিত্র, যার নাম কুরআন মাজিদে উল্লিখিত হয়েছে ফিরাউনের সঙ্গে। সে ফিরাউনের একজন নিকটতম লোক হিসেবে কুরআন মাজিদের ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে লক্ষ্য রাখা নিতান্ত আবশ্যক যে, তাওরাতের সেসব পরিচ্ছেদে হামানের নাম মোটেই উল্লিখিত হয় নি, যেখানে মুসার (আলাইহিস সালাম)- জীবন সংক্রান্ত আলোচনা আছে। পুরাতন সমাচারের শেষ অধ্যায়ে একজন ব্যবিলনীয় রাজার সহযোগী হিসেবে হামানের নাম উল্লেখ রয়েছে, যার আগমন ঘটেছে মুসা আলাইহিস সালাম-এর প্রায় ১,১০০ বছর পরে। এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরাতন সমাচার থেকে কুরআন মাজিদ নকল করতেন তবে ফিরাউনের সঙ্গে কিছুতেই হামানের উল্লেখ করতেন না।
নৃতত্ত্ববিদরা মিসরের পিরামিড থেকে বিচিত্র রকমের বর্ণলিপির ফলক উদ্ধার করেছে। দীর্ঘদিন কেহ এই বর্ণলিপিগুলির পাঠোদ্ধার করতে পারে নি। ১৭৯৯ সালে একটি স্বতন্ত্র ধরনের শিলালিপি উদ্ধার করা হয়। এটিকে বলা হয় ‘Rosetta’ শিলা, এতে তারিখ লিখা আছে ১৯৬ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ। এই শিলালিপিতে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় লিখিত শিলালিপি রয়েছে : চিত্র লিখন (Hiero glyphics), ডেমোক (Democ) ও গ্রীক। গ্রীক ভাষার সহযোগিতায় অপর দুই ভাষার পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়। এই অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছিল Jaen-Francoise Champollin নামক একজন ভাষাবিদের মাধ্যমে। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, এই শিলালিপিতে হামানের নামও রয়েছে। ‘People in the New Kingdom’ নামক অভিধানে (Herman Rank, Die Agyptischen Personennamen, Verzeichnis dor Namen, Verlag Ven, J.J. Augustin in Gluckstadt, Born 11-1952) যা তৈরি হয়েছিল শিলালিপির সকল সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করে, তাতে হামানকে বলা হয়েছে শিলা ছেদনকারী কর্মীদের নেতা। লক্ষণীয় বিষয় হল, কুরআন মাজিদ কেবল ফিরাউনের সঙ্গে হামানের নামকে একত্রেই করে নি, বরং এও বলেছে যে, সে নির্মাণ বিষয়ক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। এজন্যেই ফিরাউন তাঁকে একটি উঁচু টাওয়ার নির্মাণ করতে আদেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে এই তথ্যটি অবতীর্ণ না করলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে তাঁর বর্ণনা দিলেন?