📄 মু’জিজা : ৯৯: লোহার রহস্য
নিশ্চয় আমি আমার রাসুলদেরকে পাঠিয়েছি স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ এবং তাদের সঙ্গে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদন্ড নাজিল করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আমি আরও নাজিল করেছি লোহা, তাতে প্রচন্ড (রণ) শক্তি ও মানুষের জন্য বহু কল্যাণ রয়েছে। আর যাতে আল্লাহ জেনে নিতে পারেন, কে না দেখেও তাঁকে এবং তাঁর রাসুলদেরকে সাহায্য করে। অবশ্যই আল্লাহ মহা শক্তিধর, পরাক্রমশালী। (হাদিদ, ৫৭ : ২৫)
লক্ষণীয় বিষয় যে, কুরআন মাজিদ পৃথিবীতে লোহার অবতরণ বুঝাতে ‘নাযালা’ (نَزَّلَ) শব্দটি ব্যবহার করেছে। নৃতত্ত্ববিদরা এখন স্বীকার করে যে, আমাদের সৌর জগতের পুরো শক্তি এক পরমাণু লোহা উৎপাদনের জন্যও যথেষ্ট নয়। অধিকন্তু তারা বলে, পৃথিবীর উপরিভাগে এক পরমাণু পরিমাণ লোহা উৎপাদন করার জন্য আমাদের সৌর জগতের চারগুণ শক্তির প্রয়োজন হবে। এভাবে নৃতত্ত্ববিদরা এই উপসংহারে পৌঁছেছে যে, লোহা একটি অতি জাগতিক বস্তু, যা পৃথিবীতে এসেছে অন্য কোনো গ্রহ থেকে।
Chemical Education নামক আমেরিকান এক সাময়িকীতে ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় এবং New Scientists -এর ১৩ জানুয়ারি ১৯৯০ সংখ্যায় বলা হয়েছে : লোহার পরমাণু কণিকাসমূহ সাধ্যাতীত দৃঢ়ভাবে ঘনীভূত। লোহা হল সর্বাধিক ভারী পদার্থ যা মানসম্মত পারমাণবিক প্রজ্বলনের মাধ্যমে একটি নক্ষত্রে তৈরি হয়েছে। এতে রয়েছে সর্বাধিক সুদৃঢ় নিউক্লিয়াস। লোহাকে संश्लेषण করার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন তা পৃথিবীতে সুলভ নয়। তাই, পৃথিবীতে যে লোহা পাওয়া যায় নিঃসন্দেহে তা বাইরের মহাকাশে संश्লেষিত।
‘নাযালা’ শব্দটি পূর্বকার ভাষ্যকারদের কাছে ছিল কুরআন মাজিদের এক রহস্য। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক উৎকর্ষতা কুরআন মাজিদের এই রহস্যকে বিজ্ঞানের একটি বাস্তব সত্যে রূপান্তরিত করেছে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কার এমন সুনিশ্চিত জ্ঞান থাকতে পারে, যা মানব জ্ঞানের সকল স্তরকে অতিক্রম করে ও ছাপিয়ে যায়।
📄 মু’জিজা : ১০০: সাগরের অভ্যন্তরের অন্ধকারাচ্ছন্নতা
অথবা (অবিশ্বাসীদের অবস্থা) গভীর সমুদ্রের ঘনীভূত অন্ধকারের মত, যাকে আচ্ছন্ন করে ঢেউয়ের ওপরে ঢেউ, তার ওপরে মেঘমালা। অনেক অন্ধকার, এক স্তরের ওপর আরেক স্তর। কেহ হাত বের করলে আদৌ তা দেখতে পায় না। (নূর, ২৪ : ৪০)
মানুষ, বিশেষত: যারা সমুদ্রে মুক্তা সংগ্রহ করে, সাধারণত সমুদ্রের ২০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত গভীরে ডুব দেয়, যেখানে তারা সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পায়। যা হোক, সাবমেরিন পর্যন্ত সমুদ্রে ৫০ মিটারের গভীরে যেতে পারে নি যে, মানুষ সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার সম্পর্কে জানতে পারবে। এটি কুরআন মাজিদের একটি মু’জিজা, তা কেবল সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার সম্পর্কেই বর্ণনা দেয় নি; বরং তার অন্ধকারের অবস্থা সম্পর্কেও বর্ণনা দিয়েছে। বলেছে, ‘অন্ধকার’ এক স্তরের ওপর আরেক স্তর’।
অন্ধকারের এই অবস্থা সম্পর্কে বর্তমানে সমুদ্র বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, সমুদ্রের ওপর যে আলো পতিত হয় তা সমুদ্রের তরঙ্গের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। এভাবে তার একটি অংশ সমুদ্রে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়। সমুদ্রে নিয়ত गतिशील তরঙ্গমালার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। এই তরঙ্গগুলি স্তরে স্তরে একটির ওপর আরেকটি সঞ্চালিত হয়। এ কারণে তরঙ্গের গতি ও গভীরতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্তরের तरंगे ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার আলো প্রতিফলিত হয়। ফলে, সাগরে যে আলো প্রবেশ করে তা গভীরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পেতে থাকে এবং অবশেষে তলদেশ পর্যন্ত কোনো আলোই পৌঁছতে পারে না। এই ব্যাপারটি কুরআন মাজিদের উপরোক্ত আয়াতের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ যে, ‘অন্ধকারের স্তরসমূহ একটির ওপর আরেকটি।’
এই আয়াতের অপর একটি ব্যাখ্যা আলোর প্রতিসরণের রহস্যের মধ্যে নিহিত। সমুদ্রের পানিতে আলো প্রবেশ করার পর তা তাঁর অঙ্গীভূত সাত বর্ণে বিভক্ত হয়। সমুদ্র বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এ কথা প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, সমুদ্রের গভীর অংশ একটি সুনির্দিষ্ট বর্ণ বা নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো শুষে নেয়। তারা সম্প্রতি দেখিয়েছেন, লাল বর্ণই সর্বপ্রথম ৩০ মিটার গভীর পর্যন্ত শোষিত হয়। অন্য কথায়, যদি কোনো ডুবুরী আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং এই গভীরতার মধ্যে তাঁর শরীর থেকে রক্ত বের হয় সে তা দেখতে পায় না। দ্বিতীয় যে রং শোষিত হয় তা হল কমলা। পরে হলুদ বর্ণ, যা শোষিত হয় ৫০ মিটার পর্যন্ত। এরপরে সবুজ ও বেগুনী বর্ণ ১০০ মিটার গভীর পর্যন্ত শোষিত হয় এবং সর্বশেষ যে বর্ণ শোষিত হয় তা হল নীল, যা ২০০ মিটার পর্যন্ত প্রবেশ করে। এভাবেই সাগরের তলদেশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে যায় এবং এই অন্ধকারাচ্ছন্নতা বিরাজ করে বিশেষ স্তরসমূহে, একটির পর অন্যটি। এটা শুরু হয় ৩০ মিটার গভীরতা থেকে এবং পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে বিভিন্ন বর্ণ স্তরে ২০০ মিটারের গভীরতা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে, এরপরে বিরাজ করে পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্নতা। সমুদ্র সম্পর্কে সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত এই তথ্য কুরআন মাজিদে ওপরে বর্ণিত আয়াতের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।
📄 মু’জিজা : ১০১: ফসলহীন উপত্যকা
‘হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমি আমার কিছু বংশধরকে ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের (মক্কার কাবা শরিফের) নিকট বসতি স্থাপন করালাম। (ইবরাহিম, ১৪ : ৩৭)
এটি সেই বিবৃতি যা আল্লাহর নবি ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আজ থেকে চার হাজার বছরেরও আগে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে দিয়েছিলেন। এই আয়াতে উপত্যকা বলতে বুঝানো হয়েছে মক্কা নগরী এবং বলা হয়েছে, এটি এমন একটি উপত্যকা যেখানে চাষাবাদ হয় না। আরব উপদ্বীপের ভূভাগে বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যে কেহ এখন দেখতে পাবে কিছু পানির ড্যাম, পানি সেচের জন্য প্রচুর পানির কূপ এবং বহু চারণভূমি ও খামারবাড়ি। এটি লক্ষণীয় বিষয়, এই চার হাজার বছরের দীর্ঘ সময়েও এই উপত্যকার ভূমিতে তাঁর চারপাশে কোনো পরিবর্তন আসে নি। মক্কা এখনও অনাবাদী ভূমি হিসেবে রয়ে গেছে।
📄 মু’জিজা : ১০২: মেঘ সৃষ্টি ও বৃষ্টি বর্ষণ
তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ মেঘমালাকে পরিচালিত করেন, তারপর তিনি সেগুলোকে একত্রে জুড়ে দেন, তারপর সেগুলো স্তুপীকৃত করেন, তারপর তুমি দেখতে পাও তার মধ্য থেকে বৃষ্টি বের হয়। আর তিনি আকাশস্থিত পাহাড় (সদৃশ) মেঘমালা থেকে শিলা বর্ষণ করেন, (অথবা মহসিন খানের অনুবাদ মতে : আকাশে শিলার পর্বতমালা রয়েছে)। অতঃপর তা দ্বারা যাকে ইচ্ছে আঘাত করেন। আর যার কাছ থেকে ইচ্ছা তা সরিয়ে দেন। এর বিদ্যুতের ঝলক দৃষ্টিশক্তি প্রায় কেড়ে নেয়। (নূর ২৪ : ৪৩)
আল্লাহ, যিনি বাতাস প্রেরণ করেন ফলে তা মেঘমালাকে ধাওয়া করে, অতঃপর তিনি মেঘমালাকে যেমন ইচ্ছা আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তাকে খন্ড-বিখন্ড করে দেন, ফলে তুমি দেখতে পাও, তার মধ্য থেকে নির্গত হয় বারিধারা। অতঃপর যখন তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের ওপর ইচ্ছা বারি বর্ষণ করেন, তখন তারা হয় আনন্দিত। (রূম, ৩০ : ৪৮)
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মত একজন বেদুঈন আরব একটি মরুময় অঞ্চল থেকে মেঘ সৃষ্টি, বৃষ্টিপাত, বিদ্যুতের ঝলকানি এসব ঘটনা খুব কমই প্রত্যক্ষ করেছেন। আল্লাহ তাআলা মেঘের গঠন ও বৃষ্টিপাত সম্পর্কিত এসব তথ্য তাঁর কাছে নাজিল না করলে তিনি এসবের এমন প্রাণবন্ত বর্ণনা দিতে পারতেন না। আবহাওয়াবিদগণ মেঘের গঠন ও বৃষ্টিপাত সম্পর্কে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি পেয়েছেন।
বাতাস মেঘমালাকে ধাবিত করে যাতে সেগুলি ঘনীভূত হতে শুরু করে। অতঃপর মেঘগুলি পরস্পর জুড়ে যায় এবং বড় মেঘ তৈরি করে এবং লম্বভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে মনে হয় যেন সেগুলি স্তুপীকৃত। নবগঠিত মেঘের ওপর অংশে পানির ফোঁটা পুঞ্জিভূত হতে শুরু করে এবং যখন তা খুব ভারী হয়ে যায়, তখন পৃথিবীতে বৃষ্টির আকারে নেমে আসে। আমাদের উচিত, এই তথ্যটিকে উপরিউক্ত কুরআনের আয়াতের সঙ্গে তুলনা করা এবং এতে যে কেহ এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, কেবল আল্লাহ তাআলাই কুরআন মাজিদের এই তথ্যের উৎস।