📄 মু’জিজা-৯৭: ইউসুফ ও মুসা আ.-এর বৃত্তান্ত
কুরআন মাজিদ নবী ইউসুফ আ. ও নবী মুসা আ. এর বিরুদ্ধাচরণের বৃত্তান্ত সমকালীন রাজা-বাদশাহদের আলোচনাসহ সবিস্তারে বর্ণনা দিয়েছে। এটি অধিক লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, ইউসুফ আ. ও তাঁর সমকালীন বাদশাহর আলোচনা প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদ সর্বদা ‘রাজা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। পক্ষান্তরে যখন মুসা আ. ও তাঁর সমকালীন রাজা প্রসঙ্গে আলোচনা এসেছে সেক্ষেত্রে কুরআন সর্বদা ‘ফিরাউন’ শব্দ ব্যবহার করেছে। ইহুদি ঐতিহাসিকগণ অনুরূপভাবে বাইবেলের পুরাতন ও নতুন সমাচার এমন সুনির্দিষ্ট পার্থক্য দেখায় নি। উভয়ের বর্ণনাতেই আছে, উভয় নবীই ফিরাউনের সঙ্গে মুকাবিলা করেন।
সাম্প্রতিক ঐতিহাসিকরা এই নবীদ্বয়ের সময়কাল নির্দিষ্ট করেছে। ধারণা করা হয়, ইউসুফ আ. জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯০৬ খ্রিস্টপূর্বে। মিসর সে সময় শাসন করত ‘হায়কস’ নামক এক রাজা, ফিরাউন নয়। ‘আপফিস’ নামক ‘হায়কস’ রাজা ১৮৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হযরত ইউসুফ আ. কে কারারুদ্ধ করেন। মিসরের ইতিহাসে ‘ফিরাউন’ নাম আসে অনেক পরে। বর্ণিত আছে, মুসা আ. কে যে ফিরাউন লালন-পালন করে সে ছিল ‘দ্বিতীয় রামসিস’। সে মিসর শাসন করে ১২৯২ থেকে ১২২৫ খ্রি.পূর্বাব্দ পর্যন্ত। যে ফিরাউন মুসা আ.-এর সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল সে ছিল মাইনপথ (Minepath)। সে ‘দ্বিতীয় রামসিস’-এর জীবদ্দশাতেই মিসরের রাজমুকুট ধারণ করে। অধিকন্তু বর্ণিত আছে, মুসা আ. মৃত্যুবরণ করেন ১২৭২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এই তারিখসমূহের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিকরা সম্প্রতি একথা প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, ইউসুফ আ. ফিরাউনের মুকাবিলা করেন নি।
একথা স্মর্তব্য যে, না পুরাতন সমাচার, না নতুন সমাচার, আর না পূর্বের ইহুদি ঐতিহাসিকরা এ বিষয়টি শনাক্ত করতে পেরেছিল। পক্ষান্তরে, কুরআন মাজিদ এই সত্যটি চিহ্নিত করেছে। তা হযরত ইউসুফ আ.-এর আলোচনা প্রসঙ্গে সর্বদা ‘রাজা’ শব্দ ব্যবহার করেছে এবং মুসা আ. এর আলোচনা করার সময় তার বিপরীতে সর্বদা ‘ফিরাউন’ শব্দ ব্যবহার করেছে। তিনি আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে হতে পারেন, যিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রদান করেছেন?
📄 মু’জিজা : ৯৮: রোমানদের পরাজয়ের এলাকা
আলিফ, লাম, মিম। রোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হয়েছে। একটি নিম্নতম স্থানে। তারা অচিরেই বিজয় লাভ করবে, তাদের পরাজয়ের পর। (রূম, ৩০ : ১-৩)
এই আয়াতে যে আরবি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তা হল আদ্নাল-আরদ (أَدْنَى الْأَرْضِ)। ‘আরদ’ শব্দের অর্থ ভূমি এবং ‘আদ্না’ শব্দটির দু’টি অর্থ রয়েছে- একটি হল, নিকটবর্তী এবং অন্যটি নিম্ন। এই আয়াত সেই যুদ্ধের দিকে ইঙ্গিত করে যা সংঘটিত হয় রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের মধ্যে। হিজরতের দ্বিতীয় বছরে (মোতাবেক ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে)। সকল আরব, মুসলিম-অমুসলিম সকলে এই যুদ্ধ সম্পর্কে সজাগ ছিল এবং এও জানত যে, তা সংঘটিত হয় জর্ডানের বর্তমান মৃত সাগরের সন্নিকটে একটি নির্দিষ্ট স্থানে। কুরআন মাজিদের পূর্ববর্তী ভাষ্যকারগণ ‘আদ্না’ শব্দের কেবল প্রথম অর্থ ব্যবহার করে এই আয়াতের ব্যাখ্যা দেন এবং বলেন, এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় আরব উপদ্বীপের সন্নিকটবর্তী একটি স্থানে। সাম্প্রতিক সময়ের একদল মুসলিম বিজ্ঞানী জানতে চাইলেন, ‘আদ্না’ শব্দের অন্য অর্থ ‘নিম্নভূমি’ এর সঙ্গে এই আয়াতের কোনো সম্পর্ক আছে কি না? তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন সুপ্রসিদ্ধ ভূতত্ত্ববিদ পলমারকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্নতম ভূমি চিহ্নিত করতে বললেন। উল্লেখ্য যে, প্রফেসর পলমার ছিলেন সেই কমিটির সভাপতি যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Geology Society-র শত বার্ষিকী উৎসবের আয়োজন করে। প্রফেসর পলমার বলেন, পৃথিবীতে বহু সংখ্যক নিম্নভূমি রয়েছে। তখন তাঁকে বলা হল, পৃথিবীর সর্বনিম্ন স্থানটি চিহ্নিত করতে। তিনি জর্ডানের মৃত সাগরের সন্নিকটে একটি বিশেষ স্থানের দিকে নির্দেশ করলেন। তখন মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাঁকে কুরআন মাজিদের এই আয়াতটি দেখালেন এবং তাঁকে এও জানালেন যে, এটি হচ্ছে হুবহু সেই স্থান যেখানে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। প্রফেসর পলমার বললেন, তিনি জানেন না, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়কালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কি অবস্থা ছিল। তবে এটি পরিষ্কার যে, কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসমানি আলো।
📄 মু’জিজা : ৯৯: লোহার রহস্য
নিশ্চয় আমি আমার রাসুলদেরকে পাঠিয়েছি স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ এবং তাদের সঙ্গে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদন্ড নাজিল করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আমি আরও নাজিল করেছি লোহা, তাতে প্রচন্ড (রণ) শক্তি ও মানুষের জন্য বহু কল্যাণ রয়েছে। আর যাতে আল্লাহ জেনে নিতে পারেন, কে না দেখেও তাঁকে এবং তাঁর রাসুলদেরকে সাহায্য করে। অবশ্যই আল্লাহ মহা শক্তিধর, পরাক্রমশালী। (হাদিদ, ৫৭ : ২৫)
লক্ষণীয় বিষয় যে, কুরআন মাজিদ পৃথিবীতে লোহার অবতরণ বুঝাতে ‘নাযালা’ (نَزَّلَ) শব্দটি ব্যবহার করেছে। নৃতত্ত্ববিদরা এখন স্বীকার করে যে, আমাদের সৌর জগতের পুরো শক্তি এক পরমাণু লোহা উৎপাদনের জন্যও যথেষ্ট নয়। অধিকন্তু তারা বলে, পৃথিবীর উপরিভাগে এক পরমাণু পরিমাণ লোহা উৎপাদন করার জন্য আমাদের সৌর জগতের চারগুণ শক্তির প্রয়োজন হবে। এভাবে নৃতত্ত্ববিদরা এই উপসংহারে পৌঁছেছে যে, লোহা একটি অতি জাগতিক বস্তু, যা পৃথিবীতে এসেছে অন্য কোনো গ্রহ থেকে।
Chemical Education নামক আমেরিকান এক সাময়িকীতে ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় এবং New Scientists -এর ১৩ জানুয়ারি ১৯৯০ সংখ্যায় বলা হয়েছে : লোহার পরমাণু কণিকাসমূহ সাধ্যাতীত দৃঢ়ভাবে ঘনীভূত। লোহা হল সর্বাধিক ভারী পদার্থ যা মানসম্মত পারমাণবিক প্রজ্বলনের মাধ্যমে একটি নক্ষত্রে তৈরি হয়েছে। এতে রয়েছে সর্বাধিক সুদৃঢ় নিউক্লিয়াস। লোহাকে संश्लेषण করার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন তা পৃথিবীতে সুলভ নয়। তাই, পৃথিবীতে যে লোহা পাওয়া যায় নিঃসন্দেহে তা বাইরের মহাকাশে संश्লেষিত।
‘নাযালা’ শব্দটি পূর্বকার ভাষ্যকারদের কাছে ছিল কুরআন মাজিদের এক রহস্য। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক উৎকর্ষতা কুরআন মাজিদের এই রহস্যকে বিজ্ঞানের একটি বাস্তব সত্যে রূপান্তরিত করেছে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কার এমন সুনিশ্চিত জ্ঞান থাকতে পারে, যা মানব জ্ঞানের সকল স্তরকে অতিক্রম করে ও ছাপিয়ে যায়।
📄 মু’জিজা : ১০০: সাগরের অভ্যন্তরের অন্ধকারাচ্ছন্নতা
অথবা (অবিশ্বাসীদের অবস্থা) গভীর সমুদ্রের ঘনীভূত অন্ধকারের মত, যাকে আচ্ছন্ন করে ঢেউয়ের ওপরে ঢেউ, তার ওপরে মেঘমালা। অনেক অন্ধকার, এক স্তরের ওপর আরেক স্তর। কেহ হাত বের করলে আদৌ তা দেখতে পায় না। (নূর, ২৪ : ৪০)
মানুষ, বিশেষত: যারা সমুদ্রে মুক্তা সংগ্রহ করে, সাধারণত সমুদ্রের ২০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত গভীরে ডুব দেয়, যেখানে তারা সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পায়। যা হোক, সাবমেরিন পর্যন্ত সমুদ্রে ৫০ মিটারের গভীরে যেতে পারে নি যে, মানুষ সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার সম্পর্কে জানতে পারবে। এটি কুরআন মাজিদের একটি মু’জিজা, তা কেবল সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার সম্পর্কেই বর্ণনা দেয় নি; বরং তার অন্ধকারের অবস্থা সম্পর্কেও বর্ণনা দিয়েছে। বলেছে, ‘অন্ধকার’ এক স্তরের ওপর আরেক স্তর’।
অন্ধকারের এই অবস্থা সম্পর্কে বর্তমানে সমুদ্র বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, সমুদ্রের ওপর যে আলো পতিত হয় তা সমুদ্রের তরঙ্গের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। এভাবে তার একটি অংশ সমুদ্রে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়। সমুদ্রে নিয়ত गतिशील তরঙ্গমালার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। এই তরঙ্গগুলি স্তরে স্তরে একটির ওপর আরেকটি সঞ্চালিত হয়। এ কারণে তরঙ্গের গতি ও গভীরতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্তরের तरंगे ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার আলো প্রতিফলিত হয়। ফলে, সাগরে যে আলো প্রবেশ করে তা গভীরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পেতে থাকে এবং অবশেষে তলদেশ পর্যন্ত কোনো আলোই পৌঁছতে পারে না। এই ব্যাপারটি কুরআন মাজিদের উপরোক্ত আয়াতের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ যে, ‘অন্ধকারের স্তরসমূহ একটির ওপর আরেকটি।’
এই আয়াতের অপর একটি ব্যাখ্যা আলোর প্রতিসরণের রহস্যের মধ্যে নিহিত। সমুদ্রের পানিতে আলো প্রবেশ করার পর তা তাঁর অঙ্গীভূত সাত বর্ণে বিভক্ত হয়। সমুদ্র বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এ কথা প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, সমুদ্রের গভীর অংশ একটি সুনির্দিষ্ট বর্ণ বা নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো শুষে নেয়। তারা সম্প্রতি দেখিয়েছেন, লাল বর্ণই সর্বপ্রথম ৩০ মিটার গভীর পর্যন্ত শোষিত হয়। অন্য কথায়, যদি কোনো ডুবুরী আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং এই গভীরতার মধ্যে তাঁর শরীর থেকে রক্ত বের হয় সে তা দেখতে পায় না। দ্বিতীয় যে রং শোষিত হয় তা হল কমলা। পরে হলুদ বর্ণ, যা শোষিত হয় ৫০ মিটার পর্যন্ত। এরপরে সবুজ ও বেগুনী বর্ণ ১০০ মিটার গভীর পর্যন্ত শোষিত হয় এবং সর্বশেষ যে বর্ণ শোষিত হয় তা হল নীল, যা ২০০ মিটার পর্যন্ত প্রবেশ করে। এভাবেই সাগরের তলদেশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে যায় এবং এই অন্ধকারাচ্ছন্নতা বিরাজ করে বিশেষ স্তরসমূহে, একটির পর অন্যটি। এটা শুরু হয় ৩০ মিটার গভীরতা থেকে এবং পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে বিভিন্ন বর্ণ স্তরে ২০০ মিটারের গভীরতা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে, এরপরে বিরাজ করে পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্নতা। সমুদ্র সম্পর্কে সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত এই তথ্য কুরআন মাজিদে ওপরে বর্ণিত আয়াতের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।